শান্তিলতার অশান্তি

অবিন সেন

 

শান্তিলতা তার স্তিমিত তন্দ্রার ভিতর ক্রমাগত ভঙ্গুর হতে হতে জেগে উঠল, দেখল পর্দার আড়ালে ভোরের আলো জাগবে কি জাগবে না সহসা এমন দোটানার ভিতর কুয়াশার গাঙুরে সন্তরণ দিচ্ছে। পাশে অরূপ নেই। সে বাথরুমের ভিতর থেকে বালতিতে জল পড়বার শব্দের প্রত্যাশায় কয়েক মুহূর্ত অবধি অপেক্ষায় থাকল, ভাবল অরূপ বাথরুম থেকে ফিরে এসে তাকে জড়িয়ে ধরলে সে ফের ঘুম থেকে জেগে ওঠবার ভঙ্গি করবে। অরূপের বাসি মুখের গন্ধ, ভিজে হাত তাকে খুনসুটি দিলে, তা এক প্রকার বাতাসের ব্যজন, যেমন শান্তিলতা মনে করতে পারে, ফুলশয্যার পরদিনই তারা দীঘার হোটেলে প্রথমবার সঙ্গম করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়। সে এক খুনসুটি বটে।

সহসা শান্তিলতার মনে পড়ল। অরূপ তার পাশে নেই। বিছানায় নেই। বাথরুমে নেই। এতক্ষণ যে জলের শব্দ শুনছিল, তা কি এক ব্যর্থ স্বপ্নের মতো? পাখির ডানার সঞ্চার সে একদিন শুনেছিল, মনে পড়ল তার। কী এক নিগূঢ় বেদনা, ক্রমাগত ছাদে ওঠবার সিড়ির অপরিসর বাতাসে আহত হচ্ছিল। আহা রে! এমনি বেদনার্ত ডানার সঞ্চার! সেইদিনও ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছিল। ভোরবেলা।

সেই শব্দের রেশ তার মনের ভিতর থেকে ক্রমশ অপসৃত হবার পরমুহূর্তে, মনে পড়ল অরূপ বাড়িতে নেই। ঠিক। এতক্ষণ সে একটি ভ্রাম্যমান শব্দের রেশকে মনের ভিতর লালিত করতে ব্যস্ত ছিল। লালিত করছিল বাথরুমে জল পড়ার এক অলীক শব্দের অনুপ্রাসকে। সেই অলীক ঘুম থেকে নিজেকে জাগিয়ে তোলবার অছিলায় সে বিছানায় উঠে বসল। অরূপ আজ এক সপ্তাহ হল বিদেশে ট্যুরে গিয়েছে। এমন সে মাঝে মধ্যেই যায়। হয়ত ট্যুরেই যায়। হয়ত অন্য কোনওখানে। শান্তিলতা তা জানতে চায় না। সুতরাং অরূপও তা বলবার কোনওরূপ প্রয়োজন মনে করে না।

শান্তিলতা বিছানায় অন্যমনা হয়ে বসে থাকল। বসেই থাকল। জানালার পর্দার আড়ালে তখনও কাকভোর, বাইরে।

বিছানায় বসে থাকতে থাকতে একটা গান অলীকের মতো তার মাথার ভিতর বেজে ওঠে। এমনটা রোজ হয় তার। এবং রোজ একটি মাত্র গান। ‘আমার সকল নিয়ে বসে আছি’। বিছানায় বসে বসে মাথার ভিতর অনুরণিত গানটি শোনে শান্তিলতা। কী যেন এক শান্তি আছে গানটির ভিতর। গানটি ক্রমাগত তার অন্তরের ভিতর থেকে আরও অন্তরের গভীরের দিকে বহে যেতে থাকে। তারপর অনুরণনের শেষ অন্তরীপে পৌঁছে গানটি থেমে যায়। গানটি থেমে গেলে শান্তিলতা বিছানা থেকে উঠে পড়ে। অরূপ এই সব জানে না।

বাথরুম থেকে হাতে মুখে জল দিয়ে এসে শান্তিলতা টুবলুর ঘরে উঁকি দিল। না, টুবলু এখনও ঘুম থেকে ওঠেনি। ওঠার কথাও নয়। সে আর একটু পরে ওঠে। ঠিক সাড়ে ছটা নাগাদ শান্তিলতা তাকে তুলে দেয়। আটটা থেকে টুবলুর স্কুল। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে সে কিছুক্ষণ টুবলুর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। টুবলুর ঘরটা আধো অন্ধকার। পর্দার এক টুকরো ফাঁক দিয়ে অল্প একটু আলো এসে নীল দেওয়ালে পড়েছে। কোলবালিশ জড়িয়ে ধরে আরাম করে, টুবলু ঘুমিয়ে কাদা হয়ে আছে। দেখতে দেখতে সাত বছর বয়স হয়ে গেল ছেলেটার। অথচ নাকে মুখে নল গোঁজা সেই অপার্থিব আনন্দের দিনটির কথা এখনও যেন শান্তিলতার চোখের সামনে ভাসে। শান্তিলতা ভেবে আপ্লুত হয়, তার আর অরূপের ভালোবাসার শ্রেষ্ঠ নির্মাণ টুবলু। একমাত্র নির্মাণ কি! না, না, এখন আর এই নিয়ে ভাবনা কোলে করে বসবে না শান্তিলতা। বসলে চলবে না। টুবলুর স্কুলের টিফিন বানাতে হবে। সকালের খাবার বানাতে হবে। শান্তিলতা দূর থেকেই যেন একটা আদরের পরশ বুলিয়ে দিল ছেলের গায়ে।

ছেলেকে কোলের কাছে নিয়ে শুতে ইচ্ছা করে শান্তিলতার। কিন্তু অরূপ তা হতে দেয় না। অরূপ চায় না। অরূপ না থাকলেও শান্তিলতা ছেলেকে কোলের কাছে নিয়ে শুতে পারে না। কারণ ফিরে এসে অরূপ তা ঠিক টুবলুর কাছ থেকে জেনে নেবে।নিয়ে শুরু হবে অশান্তি। শান্তিলতার ভয় করে।

ঠিক সাতটা কুড়িতে টুবলুকে স্কুলবাসে তুলে দেবার পরে শান্তিলতার সকালের একটা পর্ব শেষ হয়। একটু হাঁফ নিয়ে সে বাঁচে। তারপর তার আর অরূপের জন্যে চা বানায়। অরূপকে ঠেলে ঠেলে ঘুম থেকে তোলে। চায়ের কাপটা বিছানার পাশের টেবিলে রেখে, সে নিজের কাপটা নিয়ে ছাদে চলে যায়। এই সময়টুকুর মধ্যে তার আর অরূপের মধ্যে কোনও কথা হয় না। একরকম মূক আর নীরব জীবনযাত্রায় তারা অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে। তাদের মধ্যে কলহ হয় না। বিবাদ হয় না। তবু অরূপের প্রতি একটা ভয় কাজ করে শান্তিলতার। একটা অলীক অচেনা ভয় আর ভালোবাসায় জড়িয়ে আছে সে অরূপকে। কিন্তু অরূপ? তাদের প্রেমের বিয়ে। অরূপের সঙ্গে দশ বছরের পরিচয় তার। তবু! তবু কি শান্তিলতা চিনে উঠতে পেরেছে অরূপকে, আজও? চায়ের কাপ হাতে শান্তিলতা ছাদের বাগানে গিয়ে বসে। ছোট ছোট টবে নানা রকম বাহারি ফুলের চারা লাগিয়ে এই বাগানটি করেছে শান্তিলতা। তার আদর আর আহ্লাদের বাগান। এই বাগানে তার মুক্তি। শীতের শুরুতে হিমেল হাওয়া এসে যেন আড়ি পেতে ছোট ছোট ফুলের কথা শোনে। সেই সব অলীক কথার আস্কারায় ফুলেরা যেন আরও সেজে ওঠে। শান্তিলতা টের পায়। ছাদে সকালে চায়র কাপ হাতে শান্তিলতা সেই সব গাছপালাকে মুখর হতে দেখতে ভালোবাসে।

চার বছর হল এই বাড়িটা করেছে অরূপ। অরূপের একটা ছোট কেমিক্যাল কারখানা ছিল। রোজগারপাতি ছিল সামান্য। সারা মাসের রোজগারের টাকা সারা মাসের খরচ খরচাতেই বেরিয়ে যেত। বিবাহের আগে তাদের প্রেম ছিল কৃপণের মতো। কিন্তু ভালাবাসায় কোথাও কোনও অভাব ছিল না। সার সপ্তাহে একদিন রবিবার তাদের দেখা হত। গঙ্গার ঘাট। মিলেনিয়ম পার্ক। ময়দান। ভিক্টোরিয়া। বড় মায়া ভরে সে অরূপের দিকে তাকিয়ে থাকত। অরূপের চোখে মুখে তখন ভীষণ ক্লান্তি। একটা বিষণ্ণতার প্রতিমূর্তি হয়ে থাকত সে। শীতের কার্নিভালে যখন সমস্ত পার্কগুলি ফুলে ফুলে আলোকিত হয়ে থাকত তখনও অরূপ সেই সব উচ্ছাসের ভিতর শান্তিলতার সঙ্গে একটা বিষণ্ণ মুখ নিয়ে বসে থাকত।

দুই বাড়ির অমতে একদিন তারা পালিয়ে বিয়ে করে নিল। বিয়ের পরে দুই পক্ষের বাড়ির সঙ্গেই তাদের কোনও সম্পর্ক নেই। তারা রাখতে চায়নি কোনও তিক্ততার সম্পর্ক। সস্তার ভাড়া বাড়িতেও তারা আলোয় আলোয় বেঁচেছিল। বিয়ের দু বছরের মাথায় টুবলু এসেছিল শান্তিলতার কোলে। তারপর দু তিনবছরের অমানুষিক পরিশ্রমের ফলে অরূপের কারখানা ফুলে ফেঁপে ওঠে। প্রভূত অর্থ এসে জমা হয় শান্তিলতা আর অরূপের জীবনের মাঝখানে। তাদের জীবনের কোলাহলের জায়গায় এসে দাঁড়ায় নীবরতা, অর্থ, শীতলতা। ভাড়া বাড়ি পেরিয়ে শহরের উপকণ্ঠে তাদের নিজস্ব বাড়ি হয়।

ছাদের বাগান থেকে নীচে নেমে শান্তিলতা দেখতে পায় অরূপ চানঘরে ঢুকে গিয়েছে। শান্তিলতার আবার ব্যস্ততা শুরু হয়।

ঠিক নটার সময় অরূপ কারখানায় চলে যায়। শান্তিলতার প্রতিদিনের আর একটা পর্ব শেষ হয়।

আজ অরূপ নেই। টুবলু স্কুলে চলে যাবার পরে শান্তিলতা চায়ের কাপ হাতে ছাদে চলে যায়। মোবাইল ক্যামেরায় ফুলের ছবি তোলে। ফুলের পাশে বসে নিজের সেলফি তোলে। ফেসবুকে ছবি পোস্ট করে বসে বসে। অন্যের ছবিতে লাইক দেয়। কমেন্ট দেয়। ইদানীং এটা একটা অভ্যাস তার।

চানঘরে ঢুকে অনেকক্ষণ ধরে স্নান করে সে। শখ করে চানঘরের একদিকের একটা দেওয়াল জুড়ে বিশাল আয়না লাগিয়েছে শান্তিলতা। এটা একটা তার ছেলেমানুষী, নিজেকে সম্পূর্ণ উম্মোচিত করে আয়ানায় দেখা। শান্তিলতার খুব সুপ্ত এক আকাঙ্খা ছিল সে আর অরূপ পরস্পরকে আয়নায় প্রতিফলিত হতে দেখতে দেখতে স্নান করবে। এক সঙ্গে। পুরনো ভাড়া বাড়িতে সেই আহ্লাদ পূরণ করবার সুবিধা ছিল না। কিন্তু এই বাড়ি, এই চানঘর জোড়া আয়না হবার পরে অরূপ তার এই সাধকে অবহেলায় ঠেলে সরিয়ে দিয়েছে। শান্তিলটা আহত হয়েছে।

শান্তিলতা নিজেকে উন্মোচিত করে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ভাবে। তার কি বয়স বেড়ে বেড়ে বয়সের পার হয়ে গিয়েছে? গর্বিত স্তনদুটি কি ঈষৎ আনত হয়ে গিয়েছে! দুই হাত দিয়ে তার অনুভব নেয় সে। সে জানে, রাস্তায় বের হলে এখনও পুরুষের চোখ তার দিকে তাকিয়ে লোলুপ হয়। মুগ্ধ হয়। সে চুল খুলে দেয়। তার চুল এখনও অঢেল। তবে কেন অরূপের জীবনে নমিতা? কেন? কেন? শান্তিলতা তার ছবি দেখেছে অরূপের মোবাইলে। সে ছবির নমিতা কি ততটা সুন্দর? যতটা শান্তিলতা! সে মনে মনে নমিতার ছবি তার পাশে দাঁড় করিয়ে আয়নায় দুজনার প্রতিবিম্ব দেখতে দেখতে যেন ম্লান হয়ে যায়। একবার অরূপের কাছে সরাসরি জানতে চেয়েছিল–

–কে গো মেয়েটি? অত ছবি তার তোমার মোবাইলে?

শান্তিলতার ঠোঁটে মৃত প্রজাপতির মতো ক্লিষ্ট হাসি খেলা করেছিল তখন।

অরূপ, গা হাত দুলিয়ে হো হো করে হেসেছিল। বাতাসে হাত নাড়িয়ে মাছি তাড়াবার মতো সে অভিযোগ নস্যাৎ করে দিয়েছিল।

–ও নমিতা! ওদের কোম্পানি আমার ফ্যাক্টরি থেকে কিছু কেমিক্যাল কেনে। অ্যাকাউন্ট অফিসার তো, তাই পেমেন্ট টেমেন্টের জন্য একটু যোগাযোগ রাখতে হয়।

সন্তোষজনক উত্তর। তবু বুকের ভিতর একটা কীটের দংশন টের পেয়েছিল শান্তিলতা। সে বলেছিল ম্লান–

–ভাবলাম, প্রেমে পড়েছ!

অরূপ এমন ভাবে হেসেছিল, সে যেন ভীষণ আমোদ পেয়েছে।

–ন্যাড়া একবারই বেলতলা দিয়ে যায় লতা। সারাদিন বাড়িতে বসে থেকে থেকে তুমি সেকেলে হয়ে যাচ্ছ দিন দিন।

শান্তিলতার মুখের আগায় এসে গিয়েছিল ‘তোমার সংসারের ইট বালি পাথরের নীচে চাপা পড়ে গিয়েছি অরূপ’। সে সামলে নিল নিজেকে। সে জানে অরূপ আজকাল সকল কথার অন্য মানে করে। ভুল বোঝে। মুখে বলল–

–বাইরে বেড়াতে বের হব কি একা?

একটা সময় তারা প্রতি রবিবার, ছুটির দিনে কোথাও না কোথাও বেরিয়ে পড়ত। বেড়িয়ে আসত। সে সব এখন বহুযুগের ওপারের কথা বলে মনে হয়। অরূপ এখন রোজই ব্যস্ত থাকে। তার ট্যুর থাকে।

অরূপ শান্তিলতার কথার কোনও উত্তর দেয়নি। তার মোবাইলে একটা ফোন এসে গিয়েছিল। ফোন কানে দিয়ে সে বারান্দায় উঠে গিয়েছিল।

অরূপের কথাটা মনে ধরেছিল শান্তিলতার। একদিন অরূপ ফ্যাক্টরি চলে যাবার পরে সেও স্নান করে একটু চলনসই গোছের সেজে নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিল। কোথায় যাবে ঠিক ছিল না। তা ছাড়া কলকাতার খুব বেশী রাস্তাঘাট সে চেনে না। মাঠ ময়দান পার্ক সে চেনে না। যখন প্রেম করেছে তখন মাত্র কয়েকটি জায়গায় সে বারবার গিয়েছে। সঙ্গে অরূপ থাকত। রাস্তাঘাট চেনা হয়নি শান্তিলতার। ফলত সে রাস্তায় রাস্তায় যতটা পারল ঘুরে বেড়াল। পথে চলতে চলতে রাস্তার নেড়ি কুকুর, ফেরিওলা, ভিখারি, অনেকের সঙ্গে তার দেখা হল। অনেকের সঙ্গে অচেনা হাসি বিনিময় হল। শহরের রোদ, ধুলো ধোঁয়ায় তার ভালো লাগছিল। শহরের একটা অচেনা গন্ধ তার ভালো লাগছিল। মোটেই নিজেকে তার একা লাগছিল না। সমস্ত পথচারী বাস ট্রাম সব্বার মাঝে নিজেকে ভরভরন্ত লাগছিল। একটা সিনেমার পোস্টারের সামনে সে অযথা দাঁড়িয়ে থাকল। পোস্টারে একা একটি মেয়ে। কি বিষণ্ণ! কতকাল তার সিনেমা হলে সিনেমা দেখা হয়নি।

টুবলুর স্কুল থেকে ফেরার সময় হলে সে ফিরে আসে। সারাদিন রোদে রোদে ঘুরে ঘুরেও তার ক্লান্তি লাগেনি।

সারা শহরে শান্তিলতার চেনা পরিচিতি নেই বিশেষ। সে এই শহরের মেয়ে না। এই শহরের কলেজে সে পড়তে এসেছিল। এই শহরের সঙ্গে তার যেটুকু পরিচয় সেটুকু অরূপের কারণে। অরূপের সঙ্গে রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে।

একদা কোনও এক দিন বৃষ্টিভেজা বিকেলে, নন্দনের পিছনদিকে একটা গাছের নীচে তারা বসেছিল। গাছের পাতা চুঁইয়ে ফোঁটা ফোঁটা জল ঝরে পড়ে তাদের পোশাক ভিজিয়ে দিচ্ছিল। সে দিকে তারা মন দিচ্ছিল না। অরূপের ঠোঁট তার ঠোঁটের উপর নেমে এসেছিল। অসভ্যের মতো শব্দ করে সে অরূপের ঠোঁট চেটে নিচ্ছিল। অরূপের জিভ তার জিভের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে থর থর করে কাঁপছিল। অরূপের নিশ্বাসে সিগারেটের গন্ধ। শান্তিলতা মেদুর হয়ে গিয়েছিল।

অরূপ তখন সবে একটা ছোট গুদামঘর ভাড়া নিয়ে তার ছোট ফ্যাক্টরি খুলেছে। অরূপের বাবা তাদের শরিকি সম্পত্তির একটা অংশ বিক্রি করে মোটা টাকা পেয়েছিল। সেই টাকার একটা অংশ পেয়েছিল অরূপ। তার চোখে তখন অনন্ত স্বপ্ন। শান্তিলতার তখন সেকেন্ড ইয়ার। বাংলা বিভাগ। প্রেসিডেন্সি কলেজ। শিয়ালদার কাছে একটা মেয়েদের মেসে সে তখন থাকত। কলেজে তার একমাত্র বন্ধু ছিল রমলা। রমলা কলকাতার মেয়ে। তার বাবা মা বিশাল বড় চাকুরে। টালিগঙ্গের পশ এলাকায় তাদের বিলাসবহুল ফ্ল্যাট।

এক বিষণ্ণ রবিবারে সে আর অরূপ হুট করে রমলার ফ্ল্যাটে চলে গিয়েছিল। রমলার বাবা মা বাড়িতে ছিলেন না। তাদের দেখে রমলা যেন অপ্রস্তুতে পড়ে গিয়েছিল। সে খুশি হয়েছিল না। একটা পাতলা হাতকাটা নাইটি পরেছিল রমলা। দেখে মনে হচ্ছিল ভিতরে কোনও অন্তর্বাস পড়েনি সে। চুল আলুথালু। শান্তিলতা আর অরূপ বসার ঘরে গিয়ে বসতেই আর একটি ছেলে ভিতরের কোনও ঘর থেকে বেরিয়ে এসে সোফায় বসল। তার পরনে শুধুমাত্র একটা বক্সার। হাতে জ্বলন্ত সিগারেট।

তাদের দেখে রমলা যে দারুণ রকমের অখুশি হয়েছে সেটা খুব কষ্ট করে গোপন করতে হচ্ছিল। কিন্তু যেন পারছিল না! অনেক কষ্টে সেটা কাটিয়ে উঠে বলল–

–কি রে তোরা এমন হুট করে চলে এলি? কোনও ফোন টোন না করে!

সেই ছেলেটি কথা বলল–

–বুঝতে পারছ না হানি! ওরাও একটা নির্জন জায়গা খুঁজছে।

কথাটা বলে সে হেসে উঠল। রমলার মুখও হাসিতে ভরে এল। সে চোখ নাচিয়ে বলল–

–কি রে শান্তি? তাই নাকি?

শান্তিলতা যেন ভীষণ লজ্জায় পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু মুখে কিছু বলতে পারছিল না। মুখ নীচু করে মৃদু হাসছিল।

রমলা তাদের গেস্ট রুম খুলে দিয়ে মুখ টিপে হাসল।

–যা!

রমলা মৃদু ধাক্কা দিয়েছিল শান্তিলতার পিঠে।

দরজা বন্ধ করে দিয়ে দরজায় পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে শান্তিলতা বলেছিল–

–নাও। আমাকে আদর করো। খুব আদর করো।

 

অনেকক্ষণ ধরে স্নান করে বেরিয়ে শান্তিলতা সাজতে বসেছে। আজ সে খুব করে সাজবে। কিন্তু আজ সে কোথায় যাবে? ইদানীং এই একটা সমস্যা তার। কোথায় যাবে? দিনের পরে দিন ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে শহরের সমস্ত পার্ক, মল, গঙ্গার ঘাট, তার ঘোরা হয়ে গিয়েছে। মন্দির, কবরখানা ঘোরা হয়ে গিয়েছে তার। জাহাজঘাটা। বাসস্টপ। কত রেস্তোরার কত খাবারদাবার মুখস্থ হয়ে গিয়েছে শান্তিলতার। কিন্তু তার কোনও বন্ধু নেই। ল্যাম্পপোস্ট, দু একটা গাছপালা, ট্রামের দ্বিতীয় শ্রেণীর কামরা ইত্যাদির সঙ্গে তার কথা হয়। গল্প হয়।

আজ সে সিঁথিতে নামমাত্র সিঁদুর ছোঁয়াল। সেটা প্রায় দেখাই যায় না। রঙিন তরুণীর মতো সেজে উঠল সে। অনেক ভেবে শেষে লটারি করে সে ঠিক করল মিলেনিয়ম পার্কে গঙ্গার ধারে গিয়ে বসবে। অনেক দিন গঙ্গার ধারে গিয়ে বসা হয়নি। শীতের দুপুরে গঙ্গার ধারে গিয়ে সে বসবে। গঙ্গার অঢেল জলের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে সে নিজেকে নিয়ে ভাববে। অরূপকে নিয়ে সে ভাববে না? অরূপের জন্য এখনও ভালোবাসা বুক উপচে পড়ে। বাথরুমে নগ্ন হয়ে কল খুলে দিয়ে যখন সে অরূপের কথা ভাবে তখন তার বুকের ভিতর রক্তের তোলপাড় সে টের পায়। তার স্তনবৃন্ত দুটি হিমেল হয়ে ওঠে। তবে?

মিলেনিয়ম পার্কে আজ যেন বড় ভিড়। প্রায় সমস্ত বেঞ্চে লোক। একদিকের একটা মাত্র বেঞ্চে সে দেখল একটি অল্পবয়সী ছেলে একা বসে। বাকি বেঞ্চটা ফাঁকা। হয়তো প্রেমিকার অপেক্ষায় বসে আছে।

শান্তিলতা গিয়ে সেই বেঞ্চের এক পাশে বসল। তাদের মাথার উপরে গাছের ডালপালার অনেক হলুদ পাতা। অনেক হলুদ পাতা ছড়িয়ে আছে পায়ের কাছে। সামনে জলের উপরে দুলছে হলুদ পাতা।

পাশের ছেলেটি ক্রমাগত শান্তিলতার দিকে তাকিয়ে যাচ্ছে। কতই বা বয়স হবে ছেলেটির। হয়ত কুড়ির নীচে বা সেই রকমই কিছু।

শান্তিলতা ছেলেটির দিকে তাকায়। ছেলেটির চোখে ইঙ্গিত। কী এক নগ্ন নির্লজ্জ ইঙ্গিত। শান্তিলতা পড়তে পারছে। এমনটা তো নতুন নয়। এমন নগ্ন ইঙ্গিত কি সে আগে দেখেনি? রোজ রোজ এই শহরের পথে পথে ঘুরতে ঘুরতে এমন চাহনি সে অনুভব করেছে। অনেক।

কিন্তু আজ সহসা তার বুকের ভিতরে একটা কীট দংশন করল। সে ভাবল অরূপের কথা। অরূপও কি নমিতার দিকে এমনই তাকায়? কিংবা শান্তিলতা যা ভাবছে অরূপ আর নমিতার সম্পর্ক তেমনটা নয়। হয়ত অরূপ সত্যি কথাই বলেছে। কিন্তু শান্তিলতা ঠিক বুঝতে পারে না। অরূপের প্রতি তার অঢেল ভালোবাসা একটা ভয়ের মতো হয়ে আছে। একটা আশ্চর্য ভয়। এক অলীক কীটের মতো ক্রমাগত তার বুকের ভিতর দংশন করে চলেছে। সে কি অরূপকে হারাবার ভয়? শান্তিলতার জীবন এখন তিনজন মানুষকে নিয়ে। এই অলীক কীট, টুবলু, আর অরূপ। সে জানে এই তিনজনের কাছে সে বন্দী হয়ে আছে। তবে কেন এই দিনের পরে দিন এই অকারণে শহর ভ্রমণ? কার কাছ থেকে শান্তিলতা পালাতে চাইছে। কোথায়ই বা সে পালাবে? যখন সে জানে ওই তিনজনের কাছ থেকে তার কোনও মুক্তি নেই।

শান্তিলতা ঘড়ি দেখল। তার বাড়ি ফেরার সময় হয়ে গিয়েছে।

 

(ছবি: ইন্টারনেট)

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*