ঋণজর্জর জীবন : চরম কৃষিসংকট এবং কৃষক আত্মহত্যা সম্পর্কে

অজয় দান্ডেকর , শ্রীদীপ ভট্টাচার্য

 

মহারাষ্ট্রের ইয়াবতমল এবং পাঞ্জাবের সাঙ্গরুর। এমন দুটি জেলা যেখানে কৃষক আত্মহত্যার সংখ্যা চমকে দেওয়ার মতো। এই দুটি জেলায় সমীক্ষা চালিয়ে এই মর্মান্তিক ঘটনাসমূহের প্রকৃত কারণগুলির সুলুক পাওয়া গেল। দেখা যাচ্ছে যে শুধু ঋণগ্রস্ততার লজ্জাই— বিশেষত, পরিবারের সদস্যদের থেকে নেওয়া ঋণ হলে—নয়, এর পেছনে আরও কিছু কারণ ক্রিয়াশীল। তার মধ্যে রয়েছে ত্রুটিপূর্ণ চাষের ধারা, ক্রমবর্ধমান চাষের খরচ, উচ্চাকাঙ্ক্ষী এবং বেহিসেবী ক্রয় এবং আয়ের বিকল্প উৎসের অভাব। লিখছেন শিব নাদার বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অফ হিউম্যানিটিজ অ্যান্ড সোসাল সায়েন্সের অধ্যাপক অজয় দান্ডেকর (ajay.dandekar@snu.edu.in) এবং ঐ বিশ্ববিদ্যালয়েরই সেন্টার অফ পাবলিক অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড ক্রিটিকাল থিওরির ফেলো শ্রীদীপ ভট্টাচার্য (sb514@snu.edu.in)

 

এই লেখাতে আমরা মহারাষ্ট্র এবং পাঞ্জাবে আমাদের ফিল্ডওয়ার্কের ওপর ভিত্তি করে কৃষক আত্মহত্যার বিষয়টিকে ভারতের কৃষি সংকটের বৃহত্তর পরিপ্রেক্ষিতে দেখেছি। প্রথম পর্যায়ে আমরা বিভিন্ন সরকারী রিপোর্ট এবং সার্ভেতে যেভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে তার ওপর ভিত্তি করে ভারতীয় কৃষিব্যবস্থার একটা সামগ্রিক রূপরেখা টেনেছি। এবং পরবর্তী পর্যায়গুলিতে মহারাষ্ট্রের ইয়াবতমলএবং পাঞ্জাবের সাঙ্গরুর জেলায় ফিল্ডওয়ার্ক চালিয়ে পাওয়া আমাদের পর্যবেক্ষণগুলি উপস্থিত করেছি। একই সঙ্গে এই দুই আপাত বৈপরীত্যপূর্ণ এলাকার আগে-থেকে-ভেবে-রাখা বৈসাদৃশ্যগুলি এবং আমাদের চাক্ষুষ করা সাদৃশ্যগুলিকেও বিশ্লেষণ করেছি।

কৃষক আত্মহত্যার সাথে জমির মালিকানার ধরন এবং অনাদায়ী ঋণের সম্পর্ক টানতে গিয়ে আমরা আত্মীয়দের থেকে নেওয়া ঋণকেই সবচেয়ে জোরালো হিসেবে লক্ষ করেছি। এই জাতীয় ঋণ পরিশোধের জন্য সামাজিক এবং নৈতিক বাধ্যতা এবং চাপ থাকে অনেক বেশি। আবার শুধু ঋণগ্রস্ততাকেই তুলে ধরার বিরুদ্ধে আমরা যুক্তি দিয়ে দেখিয়েছি যে আরও অনেকগুলি কারণ এই হৃদয়বিদারক ঘটনাগুলির জন্য দায়ী। যেমন, ত্রুটিপূর্ণ চাষের ধরন, চাষের খরচের ক্রমাগত বৃদ্ধি, ঋণের প্রকৃতি এবং অপ্রচলিত জায়গা থেকে ঋণগ্রহণ, এবং এমনকি কৃষকদের উচ্চাকাঙ্ক্ষী এবং বেহিসেবী ঋণগ্রহণের স্বভাবও, যারা দেখা গেছে অনেক সময়েই অ-কৃষি কারণেও ঋণ নিয়েছেন। যেহেতু প্রচলিত ঋণদাতারা কৃষকদের প্রয়োজন মেটাতে পুরোপুরি সমর্থ ছিল না, সেই সুযোগে প্রচুর নতুন মানুষও এই ঋণব্যবসায় ঢুকে পড়ে।

সিদ্ধান্তের পর্যায়ে আমরা কৃষির– বিশেষত চাষের ধারা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ঋণদান ব্যবস্থার– একটি সামগ্রিক সংহত রূপরেখা তৈরি করতে উৎসাহ দেওয়ার জন্য সংস্কার চালানোর কথা বলেছি।

১. প্রেক্ষিত : বিপর্যয়ের চিত্র

ভারতীয় কৃষির যে অদ্ভুত বৈশিষ্ট্যটি সবচেয়ে লক্ষণীয় সেটি হল, ছোট ছোট জোতের ক্রমহারে বিস্তার পেয়ে চলা। প্রান্তিক কৃষকদের মালিকানাধীন জমির পরিমাণ বিপুলভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৫৩-৫৪ সালে যার পরিমাণ ছিল ৩৮ শতাংশ, ২০০৩-এ সেটা দাঁড়িয়েছে ৭০ শতাংশে, এবং ৮০ শতাংশের বেশি জোতই ক্ষুদ্র এবং প্রান্তিক (কৃষি মন্ত্রক ২০১৪)। অন্যদিকে, ভারতীয় অর্থনীতিতে কৃষির অবদানও খুব দ্রুত হারে কমেছে। স্বাধীনতার সময়ে জিডিপিতে যে কৃষির অনুপাত ছিল ৪৭ শতাংশ, তা আজ এসে মাত্র ১৩.৭ শতাংশে ঠেকেছে। কিন্তু জিডিপিতে কৃষির অনুপাত কমে গেলেও তার সাথে সামঞ্জস্য রেখে কর্মসংস্থানে এর অনুপাত কমেনি। ভারতীয় কৃষিতে বিনিয়োগ বহু বছর ধরেই কমছে। জিডিপি’র শতাংশ হিসেবে দেখলে কৃষিতে বিনিয়োগ ১৯৯১ সালের ১.৯১ শতাংশ থেকে কমে ২০০৪ সালে ১.৩১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে (ঝা এবং নেগড়ে ২০০৭)। অবশ্যই তার থেকেও উদ্বেগের বিষয় হল কৃষিক্ষেত্রে মোট মূলধন গঠনের প্রবণতা। বিভিন্ন হিসেব থেকে দেখা যাচ্ছে বিগত ১৫ বছর ধরে এই মোট মূলধন গঠনের পরিমাণ ৩ শতাংশের নিচে রয়ে গেছে।

ন্যাশনাল ব্যাঙ্ক ফর এগ্রিকালচার অ্যান্ড রুরাল ডেভেলপমেন্ট (নাবার্ড ২০১৩)-এর রিপোর্ট থেকে যদিও ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে ২০০-০১ থেকে ২০১১-১২ তে প্রচলিত সূত্র থেকে ঋণের পরিমাণ প্রায় দশ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, তবুও তাতে অপ্রচলিত সূত্র থেকে ঋণের আধিপত্যকে নাকচ করে দেওয়া যায় না। উপরন্তু, বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কগুলি ঋণকে “প্রসারিত” করার থেকে “গভীরতর” করা বেশি পছন্দ করে। ফলে বড় জমির মালিকদের কাছেই ঋণগ্রহণ সুবিধাজনক থেকে গেছে। এন এস এস ও ২০১৪এ (NSSO 2014a) রিপোর্টেও এই প্রবণতা সমর্থিত, তাতে বলা হচ্ছে বেশি জমির মালিক সচ্ছল কৃষকদেরই প্রাতিষ্ঠানিক ঋণগ্রহণের সুযোগ অনেক বেশি।

হিসাবে দেখা যাচ্ছে দেশে কৃষক পরিবারদের ৫২ শতাংশ ঋণগ্রস্ত। পরিবারপিছু গড় বকেয়া ঋণের পরিমাণ ৪৭,০০০ টাকা, এবং মহারাষ্ট্র (৫৭%) ও পাঞ্জাব (৫৩%) উভয় রাজ্যেই ঋণগ্রস্ত কৃষক পরিবারের সংখ্যা জাতীয় গড় (৫২%)-এর বেশি (NSSO 2014a)। ২০০২-এ ১২,৫৮৫ টাকা থেকে ২০১২-তে ৪৭,০০০ টাকা, অর্থাৎ ভারতে গড় বকেয়া ঋণের পরিমাণ সাড়ে তিন গুণ বেড়েছে, আর এই বৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি প্রান্তিক কৃষকদের মধ্যে, ২০০২-এ পরিবারপিছু ৬,১২১ টাকা থেকে ২০১২-তে ৩১,১০০ টাকা (NSSO 2014b)।

ভারতবর্ষের কৃষক আত্মহত্যাকে এই বিপর্যয়কর অবস্থার প্রেক্ষিতে বিচার করতে হবে। সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে, গত দেড় দশকে প্রায় ২,৭০,০০০ কৃষক আত্মহত্যা করেছেন। শুধু ২০১৪-তেই ১২,৩৬০ জন কৃষক আত্মহত্যা করেন (NCRB 2014)। এই প্রেক্ষিতেই আমরা ইয়াবতমলএবং সাঙ্গরুর জেলায় কৃষকদের অবস্থা সম্পর্কে আমাদের বছরভর চালানো ফিল্ডওয়ার্কের ফল দেখাব। এই দুই জেলাকে আমরা কাজের ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিয়েছিলাম কারণ এই দু’জায়গাতেই কৃষক আত্মহত্যার হার ব্যাপক। ইয়াবতমল একটি বৃষ্টিধৌত কৃষি অঞ্চল, বিটি কটন এবং সোয়াবিন বা তুর চাষের জন্য একফসলি কৃষি-অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। সাঙ্গরুর মূলত ধান এবং গম সহ বছরে তিন বা ততোধিক ফসল ফলায়, আর এর মূল্য হিসেবে আগের ‘সবুজ বিপ্লব’ অঞ্চলগুলির ভূগর্ভস্থ জল ব্যাপকভাবে নিঃশেষ করে দিয়ে। অনেক ক্ষেত্রেই এই দুই অঞ্চলের ব্যাপক বৈসাদৃশ্য বর্তমান। যেমন জমির ভাড়া (ইয়াবতমলে একরপিছু ৩,০০০-৫,০০০ টাকা হলে, সাঙ্গরুরে ৩০,০০০-৫০,০০০ টাকা), সেচ পদ্ধতি, অপ্রাতিষ্ঠানিক সূত্র থেকে নেওয়া ঋণে সুদের হার, ফসলের নিশ্চয়তা, চাষের ঝুঁকি এবং উৎপাদক অর্থাৎ কৃষকের সাথে সংগ্রাহকের যোগাযোগ ব্যবস্থা। কিন্তু এত অমিল সত্ত্বেও এই দুই জায়গায় সংকটের প্রতিচ্ছবির মধ্যে চমকে দেওয়া মিল।

২. কৃষক আত্মহত্যা : ইয়াবতমল এবং সাঙ্গরুর

২০১৪ সালে মহারাষ্ট্রে ২,৫৬৮ জন কৃষক আত্মহত্যা করেন (Table 1), যে সংখ্যাটি সমস্ত রাজ্যের মধ্যে সর্বোচ্চ। ২০১৩ সালে এই সংখ্যাটি ছিল ৩,১৪৬। এই ২,৫৬৮ জনের মধ্যে ১,০৫২ জন কৃষিজনিত কারণে— বেশিরভাগই ফসল না পাওয়ার ফলে— এবং ৪৭৫ জনের মৃত্যু হয় অসুস্থতার জন্য (NCRB 2013 2014)। এ দিয়ে বোঝা যায় কেমন করে চিকিৎসার খরচাও কৃষকদের ঋণের বোঝা বাড়িয়ে তুলেছে। সুতরাং এটা বলা যায়, কৃষক আত্মহত্যার জন্য শুধুই কৃষিজনিত ক্ষয়ক্ষতি দায়ী নয়।

২০০১-১৩-র মধ্যে ইয়াবতমল জেলায় যে ২,৬৭৮ জন কৃষক আত্মহত্যা করেছেন, তার মধ্যে ১,২১১ জন ইয়াবতমল, কলাপুর, ঘাতঞ্জি, রালেগাঁও এবং কালাম্ব, এই পাঁচ তালুকার। সরকারি তথ্য অনুযায়ী ২০১৫-র জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ১৩৯ জন কৃষক আত্মহত্যা করেছেন। এর মধ্যে কিন্তু সেই আত্মহননকারী কৃষকদের ধরা নেই যারা ভাড়ায় জমি নিয়ে চাষ করছিলেন, বা কৃষির জন্য ঋণ নিলেও মোটা টাকা জমির ভাড়া দিতেই শেষ করে ফেলছিলেন। যাই হোক, যারা আত্মহত্যা করেছেন, তাদের মধ্যে মাত্র ৩৫ শতাংশ সরকারি ক্ষতিপূরণ পাওয়ার জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হয়েছেন।

লেখ ১: ইয়াবতমলে বছরভিত্তিক কৃষক আত্মহত্যা (২০০১-১৩)

সূত্র: কৃষক আত্মহত্যার তালিকা, ইয়াবতমল। ফিল্ডওয়ার্কের সময় ডিএমও থেকে সংগৃহীত

এক্স অক্ষ: সাল; ওয়াই অক্ষ: কৃষক আত্মহত্যা

 

লেখ ২: ইয়াবতমলে কৃষক আত্মহত্যার হারের চতুর্মাসিক খতিয়ান

সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যা ঘটেছে ২০০৬ এবং ২০০৭-এ (লেখ : ১)। আগের বছরগুলিতে লাগাতার ফসলে মার খাওয়ায় বকেয়া ঋণের পরিমাণ প্রচুর বেড়ে গেছিল, যা শোধ করার সামর্থ্য ছিল না, নতুন ঋণও পাওয়া যাচ্ছিল না, ফলে চাপ বাড়ছিল। ফসল না হওয়া এবং কৃষক আত্মহত্যা এমন ঘনঘন পর পর হতে থাকছে যেটা রীতিমতো শঙ্কাজনক।

ইয়াবতমল জেলায় আগস্ট থেকে অক্টোবর এবং নভেম্বর থেকে জানুয়ারি, এই পর্যায়ে কৃষক আত্মহত্যার সংখ্যা বৃদ্ধি পায় (লেখ : ২)। জেলার পরিসংখ্যান থেকেও দেখা যায়, ২০০১ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যা ঘটেছে সেপ্টেম্বর মাসে। এর কারণ, তুলো চাষে সাধারণভাবে অক্টোবর থেকে জানুয়ারি ফসল লাগানোর সময়। ফলে ফসল না হলে বা কোনও অপ্রত্যাশিত ক্ষতি হলেই একটা সংকট তৈরি হয়, যার পরিণতি এই মর্মান্তিক ঘটনাগুলি।

সমীক্ষা তথ্যে নিশ্চিত হচ্ছে ক্ষুদ্র এবং প্রান্তিক কৃষকদের কোনও বিকল্প আয়ের উৎস না থাকায় তারাই বেশি করে আত্মহত্যার পথে ঝুঁকছেন (লেখ : ৩)। এখন এই কোনও কৃষি-বহির্ভূত পেশায় যুক্ত হতে না পারাটা শুধুই কৃষি সংকট নয়, বরং অ-গ্রামীণ (শহুরে) বিকল্প পেশার অপ্রতুলতাকেও চিহ্নিত করে, যা প্রায়শই মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

সাঙ্গরুর জেলায় ১৯৯৫ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত ২,২১৩ জন কৃষক আত্মহত্যা করেছেন। মালেরকোটলা তহশিলের এক কিষাণগড় গ্রামেই শুধু ১৯৮০ থেকে ২০১৫-র মধ্যে ৭৯টি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। দশ কিলোমিটারেরও কম দূরত্বে অবস্থিত দুই গ্রাম কুলরিয়ান (৩১টি ঘটনা) এবং বাহাদুরপুর (২০টি ঘটনা)-এও সংখ্যাটি যথেষ্ট মর্মান্তিকভাবে বেশি। ১৯৮৮ থেকে ২০১৫ অব্ধি এই জেলার মুনাক, লেহরাগাগা এবং বুধলাড়া ব্লকে কেউ আত্মহত্যা করেছেন এমন ২,০০০টিরও বেশি পরিবারে এক ব্যাপক সমীক্ষা থেকে দেখা যায় পরিবারপিছু গড় বকেয়া ঋণের পরিমাণ ২ লাখ থেকে ২.৫০ লাখ টাকা। আত্মহত্যার গ্রামভিত্তিক তালিকা থেকেও দেখা যায়, যে সমস্ত পরিবারে আত্মহত্যা ঘটেছে তারা ব্যতিক্রমহীনভাবেই ঋণগ্রস্ত ছিল। তারা যে আর্থি (দালাল)-দের কাছেও ঋণগ্রস্ত ছিল এবং ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ পাওয়ার সমস্ত রাস্তাই যে তাদের জন্য বন্ধ হয়ে গেছিল, বাছাই করা কেস স্টাডিতে তারও মান্যতা মেলে

লেখ ৩: ইয়াবতমলে জমির পরিমাণের সঙ্গে আত্মহত্যার সম্পর্কের চিত্র

সূত্র: বন্দনা ফাউন্ডেশনের সমীক্ষা

এক্স অক্ষ: একরে জমির পরিমাণ; ওয়াই অক্ষ: কৃষক আত্মহত্যা

 

লেখ ৪: সাঙ্গরুরে জমির পরিমাণের সঙ্গে আত্মহত্যার সম্পর্কের চিত্র

সূত্র: সাঙ্গরুর জেলায় গ্রামীণ আত্মহত্যার গ্রামভিত্তিক তালিকা, ১৯৮৮ থেকে নভেম্বর, ২০১৫

এক্স অক্ষ: একরে জমির পরিমাণ; ওয়াই অক্ষ: কৃষক আত্মহত্যা

 

লেখ ৫: সাঙ্গরুরে কৃষক আত্মহত্যার হারের ত্রৈমাসিক খতিয়ান

সূত্র: সাঙ্গরুর জেলায় গ্রামীণ আত্মহত্যার গ্রামভিত্তিক তালিকা, ১৯৮৮ থেকে নভেম্বর, ২০১৫

এক্স অক্ষ: ত্রৈমাসিক বিভাজন; ওয়াই অক্ষ: কৃষক আত্মহত্যা

 

ইয়াবতমলের মতো সাঙ্গরুরেও ঋণের অভিঘাত সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষীদের ওপর (লেখ : ৪)। বৃহৎ জোতসম্পন্ন একজন কৃষক বলছেন:

যারা লিজে জমি নিয়ে চাষ করে তাদের ঝুঁকিটা যাদের জমি আছে তাদের থেকে অনেক বেশি। শেষবার আমি আমার জমি লিজে দিয়েছিলাম ৫৩,০০০ টাকায়। সেবার অত্যধিক বৃষ্টিতে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হল, আর সে একরপিছু মাত্র দেড় কুইন্টাল ফসল পেয়েছিল। সেই ফসল সে বিক্রি করে কুইন্টাল প্রতি ১,৮০০ টাকায়। এর মানে সে ভাড়ার টাকাটাও তুলতে পারেনি। ওইজন্য সে আর এ বছর আমার জমি লিজ নেয়নি।

সাঙ্গরুরে অনেকগুলি আত্মহত্যাই ঘটেছে যারা জমি লিজে নিয়ে চাষ করেন তেমন কৃষকদের মধ্যে। এই কারণে তারা ভূমিহীন তালিকাভুক্তও হয়েছেন, এবং তাদের ব্যাঙ্কঋণ পাওয়ার সুযোগও বন্ধ হয়ে গেছে।

এখানে বেশিরভাগ আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে মে থেকে অক্টোবরের মধ্যে (লেখ : ৫)। এই সময়ে আত্মহত্যার হার বেড়ে যাওয়ার পেছনে খরিফ ফসলের তুলনামূলক কম ফলন এবং বকেয়া ঋণের বৃদ্ধিকে কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। এইরকম পরিস্থিতিতে ঋণ পরিশোধের চাপ তীব্র হয়, এবং তার সঙ্গে পরবর্তী ফসলের জন্য ঋণ না পাওয়া সেই চাপকে তীব্রতর করে তোলে। ঋণ পাওয়ার যোগ্যতা নষ্ট হওয়ায় পরের মরশুমের ফসল বোনা শুরু করা যায় না। ফলে এই মাসগুলিতে আত্মহত্যার পরিমাণ অনেক বেড়ে যায়।

. দুর্দশার কারণ

৩.১ ঋণের গ্লানি

ঋণগ্রস্ততা আর ঋণশোধের অপারগতার কারণে সমাজে মুখ দেখানো কঠিন হয়ে যায়। ঋণখেলাপী মানুষটি সকলের উপহাসের পাত্র হয়ে ওঠেন। ইয়াবতমলে আমরা দেখেছি ঋণের জন্য পরিবারের সদস্যদের ওপর নির্ভরশীলতা। সেই নির্ভরশীলতা আরও বাড়ে যদি ধার নেওয়ার অন্য পথগুলি– যেমন সুদের কারবারি-– বন্ধ হয়ে যায়। গ্রামীণ সমাজে ঋণশোধের অপারগতা অত্যন্ত লজ্জার কারণ। আর সেই ঋণ যদি আত্মীয়দের থেকে নেওয়া হয় তবে সেই গ্লানি বহুগুণ বেশী হয় বলাই বাহুল্য। সুদের কারবারি বা ব্যাঙ্ক ঋণ দিয়ে তাগাদা মারে ঠিকই, কিন্তু আত্মীয়দের কাছে ঋণী হলে কৃষক মৃত্যুর পথ বেছে নিলেও তাঁর পরিবারের জীবিত সদস্যদের ওপর সেই ঋণের ভার গিয়ে পড়ে।

পারিবারিক ঋণের ক্ষেত্রে জড়িত লজ্জা আর সামাজিক গ্লানির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে গুপ্তা (২০১৫) বলছেন,

মহারাষ্ট্রের কৃষকদের মধ্যে মামাতো-পিসতুতো সম্পর্কে বিবাহের ঘটনা যথেষ্ট চালু, যা কি না উত্তর ভারতের থেকে অনেক আলাদা। এর ফলে কন্যাদাতা এবং কন্যাগ্রহীতা দুই পরিবারের মধ্যে একটা সমতার সম্পর্ক রক্ষিত হয় যা কি না উত্তর ভারতে বিরল। সম্পর্কে সমতা থাকলে ঋণ পরিশোধে অপারগতার জ্বালা আরও তীব্র হয়। সমস্যার তীব্রতা আরও বাড়ে যদি ঋণী পুরুষ মানুষটি সময়মতন সেই টাকা ফেরত দিতে না পারেন। বিয়ে বা যে কোনো পারিবারিক অনুষ্ঠান থেকে তিনি পালিয়ে বাঁচতে চান। বিশেষ করে নিজ স্ত্রীয়ের কোনো আত্মীয়ের সামনে মুখ দেখাতে তিনি খুবই কুণ্ঠিত বোধ করেন। মহারাষ্ট্রের এই মানুষটির উত্তরপ্রদেশী বা বিহারী প্রতিরূপটির এমন কোনো সমস্যা নেই। তাঁরা জানেন, কন্যাদাতা সব সময়েই গ্রহীতার নীচে। মেয়েটির মা-বাপ বা ভাইয়ের থেকে বিবাহের সময়ে পণ এবং পরবর্তীকালে সময় সময়ে উপঢৌকন নেওয়া তাই গ্রহীতা পরিবারের কাছে লজ্জার কারণ হয় না।

এ কথা অবশ্যই ধরে নেওয়া সমীচীন হবে না যে আত্মহত্যা অপরিশোধিত ঋণের সমস্যার থেকে মুক্তির পথ, বা এই সমস্যার কোনো সমাধান। কারণ, ঋণ তাঁর মৃত্যুর পর মকুব হয়ে যায় না, অথচ তাঁর মৃত্যুর পর পরিবারের বাকীদের পক্ষে সেই ঋণ শোধ করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। ইয়াবতমলের এক স্থানীয় ব্যাঙ্ক ম্যানেজারের কথায় – “ঋণী মরলেও ঋণ থেকে যায়। আত্মহত্যা সমস্যার সমাধান আনে না। কৃষকের মৃত্যুর পর জমি যাঁর নামে হস্তান্তর হবে, ঋণ পরিশোধও তাঁরই দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়।”

সুতরাং, আত্মহননের পর সমস্যা গভীরতর হয় কারণ পরিবারটি একজন রোজগেরে মানুষ হারায়, সঙ্গে পায় তাঁর করা ঋণের বোঝা। ফলে ওই পরিবারের আরও প্রাণহানির রাস্তা খোলা থেকে যায়। সাঙ্গরুরের এক পরিবারে তিন ভাই এইভাবে আত্মহননের পথ বেছে নিলেন। তাঁদের স্ত্রীরা জানালেন তাঁদের প্রত্যেকেরই আত্মহননের কারণ ঋণ। তিন ভাইয়ের মোট জমি ছিম চার একরের। তাঁদের মৃত্যুর পর প্রতি পরিবারের কাছে এখন পড়ে আধ একরেরও কম জমি। প্রত্যেক ভাইয়ের বাকী ঋণের পরিমাণ ছিল চার থেকে পাঁচ লক্ষ টাকা। তাঁদের মৃত্যুর পর এই তিন পরিবার তাই বাধ্য হয়েছে জমি বিক্রী করে দিতে। জমি বেচেও তাঁদের আরও কিছু্ধার নিতে হয়েছে বাড়ির খরচ মেটানোর জন্য। স্বামীরা যখন ছিলেন, স্ত্রীদের কারোরই ঋণের অঙ্ক সম্বন্ধে কোনো ধারণা ছিল না, যেটা খুব স্বাভাবিক একটা অবস্থা। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, এইসব ক্ষেত্রে পাওনাদার না কি সাধারণত তাগাদা করেন না, অধমর্ণ পরিবারের কেউ আত্মহত্যা করতে পারেন সেই ভয়ে। তাঁরা শুধু ওই পরিবারকে আরও ধার দেওয়া বন্ধ করে দেন, আর সেই খবর ছড়িয়ে যায় অঞ্চলের সব সুদের কারবারির কাছে। ধারকর্জের বাকী পথও বন্ধ হয়ে গিয়ে ঋণখেলাপী পরিবারে চরম সর্বনাশ নেমে আসে।

৩.২ ত্রুটিপূর্ণ চাষের ধরন

সাঙ্গরুর আর ইয়াবতমলে – যেখানে ধান এবং তুলো দুইই উৎপন্ন হয় – জলবায়ু আর জমির বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে ফসলের নির্বাচন সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

প্রতিকূল পরিবেশে ছোট জমিতে শুকনো চাষের সঙ্গে সবসময়েই কিছু বিপদ জড়িয়ে থাকে। এই বিপদের সম্ভাবনা একজন কৃষকের ঋণ পরিশোধের ক্ষমতা আর নতুন ঋণ পাবার সম্ভাবনাকে অনেকটা কমিয়ে দেয়। বারংবার ফসল নষ্ট হওয়ার সমস্যা গত দশকে ইয়াবতমলের চাষীদের কাছে এক বিরাট প্রতিকূলতা হয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে। বপনের পর সময়মতন মৃষ্টি না হওয়া, বা মাত্রাতিরিক্ত বৃষ্টিপাত, বা ধান কাটার আগের অবস্থায় শিলাবৃষ্টি এ সবই ফসলের পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকারক। বৃষ্টির এই অনিশ্চয়তা আর অনিয়ম এবং তাঁর কারণে ফসল নষ্ট হওয়া নিয়ে তাঁদের দুশ্চিন্তার কথা জানালেন জোমোড়া গ্রামের চাষীরা:

গত তিন বছরে ফসল নষ্ট হয়ে যাবার কারণে আমরা ঋণ শোধ করতে পারি নি। এর মধ্যে যদি পরিবারে কোনো বিয়েশাদির অনুষ্ঠান লাগে তবে অবস্থা একেবারে তলানিতে গিয়ে ঠেকে। প্রকৃতি সদয় হলে তাও কিছু হয়ে যায়। গত বছরে ফসল খুব ভালো হচ্ছিল, কিন্তু হঠাত বৃষ্টি এসে সব নষ্ট করে দিল।

অধিকাংশ ফিল্ড রিপোর্ট থেকেই দেখতে পাচ্ছি যে নিয়মিত বৃষ্টির অভাব বছরের পর বছর ধরে ফসল বিনষ্টির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।১০ বিটি কটন আর নিয়মিত বৃষ্টিপাতের মধ্যে একটা নিবিড় সম্পর্ক স্পষ্ট হয়। সুতরাং, যে অঞ্চলে বৃষ্টিপাত অনিয়মিত ও জলসেচের সুবন্দোবস্ত নেই সেখানে চাষের জন্য বিটি কটনকে বেছে নেওয়া সঠিক সিদ্ধান্ত হতে পারে না।

২০১৫ সালে, যখন আমাদের ফিল্ড ওয়ার্ক হয়, সময় হয়ে গেলেও বর্ষার দেখা পাওয়া যাচ্ছিল না। প্রথম বর্ষার জন্য চাষীদের মধ্যে আকুলতা আর উৎকণ্ঠা আমরা টের পেয়েছিলাম। বপনের এক মাস পর আমরা আবার যখন সেখানে যাই, তখনও দেখি জরুরী বৃষ্টিপাতের জন্য চাষীদের উৎকণ্ঠা। বর্ষার দেরী মানেই আবার দ্বিতীয় বা তৃতীয় দফার বীজ বপন, যার অর্থ বীজের জন্য হিসাবের বাইরে খরচ। এমতাবস্থায়, এই সব অঞ্চলে বিটি কটন চাষের – যার জন্য কি না নিয়মিত ও নির্দিষ্ট পরিমাণে বৃষ্টিপাত প্রয়োজনীয় – যৌক্তিকতা বা কার্যকারিতা সম্বন্ধে প্রশ্ন জাগে। বৃষ্টির সমস্যার ফসল আশানুরূপ না হওয়াই শুধু নয়, চাষের খরচ বেড়ে যাওয়াটাও চাষীর জন্য সমস্যা তৈরী করে। বিলম্বিত বর্ষার কারণজনিত উৎকণ্ঠায় বীজ বপনে তাড়াহুড়ো হয়ে যায়। কখনও বা বারবার বীজ বপন করতে হয়।

ইয়াবতমলে চাষের ত্রুটি শুধু বিটি কটনের বাছাইতেই সীমাবদ্ধ নয়, বিটির অধিক ফলনের জন্য দেশীয় পদ্ধতির অন্যান্য ফসলের চাষ বন্ধ করে দেওয়ার ফলেও সমস্যা দেখা দিচ্ছে। কৃষকেরা আগে জোয়ার আর ডাল ফলাতেন যার থেকে তাঁদের রোজকার প্রয়োজনও কিছুটা মিটত। গত দুই দশকে তুলোচাষের বাড়বাড়ন্ত হওয়ায় এই সুঅভ্যাস গেছে চলে। এর ফলে পশুখাদ্যের যোগানেও টান পড়ছে, আবার মাটিও নতুন করে চাষের জন্য তৈরী হয়ে উঠতে পারছে না।

ইয়াবতমলের ক্ষেত্রে বিটি কটন যেমন অনুপযুক্ত, সাঙ্গরুরের ক্ষেত্রে তেমন ধান। জমির উর্বরতা রক্ষা করতে ধান ও গমের বাইরে অন্যান্য ফসলের চাষও জমির জন্য দরকারী। ধানের চাষের ফলে এখানে ভূগর্ভস্থ জলের সঞ্চয়ে টান পড়েছে। কারণ এক কিলো ধান ফলাতে প্রয়োজন হয় ২০০০ থেকে ৪০০০ লিটার জল।১১ ক্রমশ নীচে নামতে থাকা জলস্তর সারা রাজ্যের চাষীদের কাছেই সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিশেষ করে ছোট জমির চাষীদের কাছে, কারণ নলকূপ বানানোর খবর নলকূপের গভীরতার ওপর নির্ভর করে। জমির মাপের ওপর করে না। প্রতি বছরে জলস্তর কমে যাবার সঙ্গে সঙ্গে কৃষককে আরও গভীরে নল নিয়ে যেতে হয়, যদিও নতুন অবস্থাতেও কতদিন জলের যোগান পাওয়া যাবে সে বিষয়ে কোনো নিশ্চয়তা থাকে না।

পাঞ্জাব সরকারের কাছে দাখিল করে জোহল কমিটির রিপোর্ট (১৯৮৬) সেই রাজ্যের চাষের ধরন সম্বন্ধে সতর্কতার বাণী দিয়েছিল। ত্রিশ বছর আগেই সেই রিপোর্টে ধান চাষজনিত সমস্যার কথা উল্লেখ করা হয়, এবং বলা হয় অন্তত ২০ শতাংশ চাষের জমি ধানচাষের আওতার বাইরে এনে অন্যান্য ফসল চাষের কথা। ২০০২ সালে জোহল কমিটির পুনরাবির্ভাব হয়েছে, এবং কমিটি আবারও বলেছেন:

রাজ্যের উচিত অন্তত ১০ লক্ষ হেক্টর জমি, যেখানে এখন ধান বা গমের চাষ হচ্ছে, অন্যান্য ফসলের চাষের জন্য ছেড়ে দেওয়া। সেইসব ফসল যাদের বাজারে চাহিদা আছে, অথচ চাষে জল কম লাগে এবং পরিবেশের পক্ষে অধিকতর সুপ্রযুক্ত… ১০ লক্ষ হেক্টর জমি অন্য চাষের জন্য ছেড়ে দেওয়ার লক্ষ্য পূরণ করতে খরচ হবে আনুমানিক ১,২৮০ কোটি টাকা, যা চাষীদের ধান চাষ না-করার ক্ষতিপূরণ এবং অন্য ফসলে যাবার খরচ হিসাবে ফসল সমন্বয় কার্যক্রমের মাধ্যমে ব্যয় করা হবে।

৩.৩ ক্রমবর্ধমান চাষের খরচ

চাষের খরচের (বীজ, জল, বিদ্যুৎ, সার, কীটনাশক এবং জমির ভাড়া) ক্রমাগত বৃদ্ধি এবং সেই অনুপাতে ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের বৃদ্ধি না হওয়া নিয়ে এই দুই অঞ্চলের সমস্ত কৃষকরাই অভিযোগ করেছেন। ইয়াবতমলের কৃষকদের থেকে যা বোঝা গেল সেই অনুযায়ী বক্স ১-এ খরচ এবং দামের একটা সারসংক্ষেপিত সমীকরণ দেওয়া হল।

এটা পরিষ্কার যে একজন বিটি কটন চাষীর পক্ষে তার পরিবার ঠিকভাবে চলার জন্য যে মুনাফাটা করার দরকার তাকে ব্যাহত না করে চাষের খরচ জোগাড় করে ফেলতে পারাটা প্রায় দুঃসাধ্য। কৃষকদের ফসল মজুত রেখে দাম বাড়ার জন্য অপেক্ষা করার ক্ষমতা নেই, ফলে সেই সুযোগ নিয়ে ব্যবসায়ী এবং ফড়েরা মুনাফা করে নেয়। ইয়াবতমলের অন্তরগাঁও গ্রামের কৃষকরা দামের অস্থিরতা সম্পর্কে প্রশ্ন তুলছেন এবং প্রাতিষ্ঠানিক ঋণপ্রদানকারী সংস্থাগুলি থেকে ঋণের পরিমাণ বাড়ানোর দাবী তুলছেন, যাতে তারা চাষের খরচ মোকাবিলা করে কৃষিকাজ চালিয়ে যেতে পারেন:

যদি বীজ, সার এবং কীটনাশকের দাম একই থেকে যায়, তবে ফসলের দাম কমে যায় কী করে? যখন আমরা বিক্রি করি, তখন দাম কম থাকে। কিন্তু যেই আমাদের বিক্রিবাটা শেষ হয়ে যায়, দাম ওমনি বেড়ে যায়! তাহলে এই টাকাটা কারা খাচ্ছে? এর পরেও চাষী আত্মহত্যা করবে না কেন? আমরা চাই সরকার প্রতি মরসুমে একটা দাম ঠিক করে দিক, আর যেন কেউ সে দামের কমে না কিনতে পারে। একদিকে, সরকার মহাজনদের থেকে টাকা ধার নিতে বারণ করছে, অন্যদিকে আবার সে হেক্টর প্রতি ৩০,০০০ টাকার বেশি ধার দিতে নারাজ। আমাদের জমির দামই যেখানে একর প্রতি ৩-৪ লাখ টাকা, সেখানে চাষের খরচের জন্য সে একরপিছু মাত্র ১২,০০০ টাকা কেন ঋণ দেবে আমাদের?

সাঙ্গরুরে চাষের খরচ বৃদ্ধির বিষয়টি ভিন্ন। এখানে চাষের ধরন, যার মধ্যে নগদে জমি লিজ, মজুর খরচ, ট্রাকটর, ডিপ টিউবওয়েল, জ্বালানী, বীজ, পশুখাদ্য, ফসল কাটামাড়ার যন্ত্র, রাসায়নিক সার, কীটনাশক এবং আগাছানাশক, এই সব মিলিয়েই চাষের খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে। গত দশকে ধানের সর্বোচ্চ বিক্রয়মূল্য যদি বার্ষিক ১.৮ শতাংশ হারে বেড়ে থাকে, তবে উৎপাদন খরচ সে জায়গায় বার্ষিক ৮ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে (পট্টনায়ক এট অল ২০০৮)। উৎপাদন খরচের এই বৃদ্ধির ফলে ধান চাষের জন্য সেচের খরচও বী গেছে এবং ক্রমাগত মাটির গভীরে খুঁড়ে জল তোলার ফলে ভূগর্ভস্থ জলস্তরেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

কী ইন্ডিকেটরস অফ সিচুয়েশন অফ এগ্রিকালচারাল হাউসহোল্ডস ইন ইন্ডিয়া (NSSO 2014a) পরিষ্কার দেখাচ্ছে যে চাষের খরচ ধরে পাঞ্জাবের কৃষক পরিবারপিছু গড় মাসিক খরচ ১১,৭৬৮ টাকা, যা জাতীয় গড়ের (২,১৯২ টাকা) অনেকটাই বেশি। অন্য সমস্ত খরচেই (জীবজন্তুদের পেছনে খরচ বাদ দিয়ে)— যেমন, বীজ, সার, রাসায়নিক, যন্ত্রপাতি সারাই এবং রক্ষণাবেক্ষণ, মজুর— পাঞ্জাব ভারতের অন্যান্য রাজ্যগুলির থেকে অনেক এগিয়ে প্রথম স্থানে এবং জাতীয় গড়ের থেকেও অনেক বেশি। চাষের খরচের বৃদ্ধি সম্পর্কে একজন আর্থি বলছেন:

খরচ প্রচণ্ড বেড়ে গেছে। এক মরসুমে দুই থেকে তিনবার কীটনাশক স্প্রে করতে হয়। এক একর জমিতে কীটনাশক স্প্রে করার খরচা পড়ে দেড় থেকে দু’হাজার টাকা। তিন থেকে চার বছর আগে এক প্যাকেট ডিএপি (ডাই অ্যামোনিয়াম ফসফেট)-র দাম ছিল ৪৭০ টাকা। এখন তার দাম হয়েছে ১,২০০ টাকা। এক প্যাকেট ইউরিয়ার দাম ছিল ১৫০ টাকা, এখন ৩০০ টাকা। তিন বছর আগে এক দিনের জন্য মজুর নিলে মাত্র ৫০ টাকা দিতে হত, এখন সেটা ৩০০ টাকারও বেশি দিতে হয়।

শুধু যে কৃষিকাজের খরচ বেড়েছে তাই নয়, জমি লিজ নেওয়ার রেটও মারাত্মকভাবে বেড়ে গেছে। পট্টনায়েক এট অল ২০০৮-এ গোটা পাঞ্জাবের ৬০টি ব্লকের ৪২০টি গ্রাম জুড়ে যে সমীক্ষা চালিয়েছিলেন তাতে দেখা গেছিল সমস্ত জেলার তুলনায় সাঙ্গরুরে একরপিছু জমি লিজের রেট সবচেয়ে বেশি। এবং ২০০৬-এ বছরে এক একর ১৫,০০০ টাকা দরে লিজ নেওয়া জমির পরিমাণ সাঙ্গরুরে মোট আবাদী জমির প্রায় ৭০ শতাংশ। ২০১৫-তে ফিল্ডওয়ার্কের সময় দেখা গেল, সেই দর বেড়ে ৫০,০০০ টাকায় পৌঁছে গেছে, যা চাষের খরচ বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। স্থানীয় পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাঙ্কের ম্যানেজার জমি লিজের এই চড়া দরের ব্যাপকতাকে সমর্থন দিলেন: “জমির ভাড়া বেড়ে বছরে একরপিছু ৪৫,০০০-৫২,০০০ টাকা হয়ে গেছে। এক মরসুমে একরপিছু ধান চাষে ২৫,০০০ টাকার কাছাকাছি খরচ হয়। আর কৃষকের আয় হয় ৫০,০০০-৬০,০০০ টাকা।”

শেরগিল ১৯৯৮ সালে গ্রামীণ ঋণগ্রস্ততা এবং চাষের খরচের উত্তরোত্তর বৃদ্ধি নিয়ে একটা সমীক্ষা চালিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন খরচ করার বা বকেয়া ঋণ পরিশোধের জন্য কৃষকের হাতে খুব সামান্য উদ্বৃত্তই পড়ে থাকে। যদিও চাল সেই গুটিকয় ফসলের একটি যার একটি ন্যূনতম সহায়ক মূল্য আছে, কিন্তু দামের ব্যাপক ওঠাপড়া সেই সুবিধাকে নাকচ করে দেয়। যদিও সহায়ক মূল্য নির্ধারণের আদর্শ পদ্ধতি হল চাষের এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচের বৃদ্ধিকে হিসেবে রেখে তা নির্ধারণ করা, কিন্তু বাস্তবে গরমিলগুলি প্রকট। একজন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের বক্তব্যে সেটা আরও সুস্পষ্ট হয়:

এমনকি ফসল যদি একই থাকে, তাতেও দাম ওঠানামা করে। কুইন্টাল প্রতি ১,৮০০ থেকে ৫,০০০ টাকার মধ্যে দাম যা খুশি হতে পারে। বিভিন্ন রকম ধানের জন্য বিভিন্ন রকম দর। যার মধ্যে অল্প কয়েক রকমের জন্যই সহায়ক মূল্য বাঁধা আছে। যদি ভালো দাম পাওয়া যায়, তখনই কৃষক পরের মরসুমে বেশি জমি ভাড়ায় নিতে চায়। কিন্তু এতে ব্যাপক ঝুঁকি, কারণ দামের কোনও নিশ্চয়তা নেই। যদি পরের মরসুমে দাম পড়ে যায়, তবে যে কৃষক এই ঝুঁকিটা নিল তাকে একদম ধ্বংস হয়ে যেতে হয়।

পাঞ্জাবে জমি লিজের এত চড়া দর হওয়ার কারণে জমির মালিক অনেক কৃষকই চাষের ঝক্কি না উঠিয়ে আয় করার উদ্দেশ্যে তাদের জমি ভাড়া দিতে উৎসাহী হয়ে উঠেছেন। যারা ইতিমধ্যেই বাইরে চলে গেছেন বা যারা কৃষি ছেড়ে অন্য পেশার দিকে ঝুঁকছেন, তাদের জন্যও এটা খুবই লাভদায়ক হয়, কারণ এতে তাদের জমি থেকে আয়টা পুরোমাত্রায়ই হয়ে যায়। জমির ভাড়া নিয়ে একটা সাক্ষাতকারে শেরগিল বলেছিলেন:

যারা জমি ভাড়া দেয় তাদের ৫০ শতাংশই অনুপস্থিত জমিদার, যারা হয় আর চাষবাস করেন না, নয় শহরাঞ্চলে থাকেন। বড় মালিকরা চাষ করতে চায় না। ফলে ভাড়া দেওয়ায় সব দিকেই লাভ। যেহেতু বেশিরভাগ চুক্তিই মৌখিক হয়, ফলে ফসল মার খেলে ভাড়া পুনর্বিবেচিত হয়। ফসল না হলে যারা জমি ভাড়ায় নিয়েছিল, তাদেরকেই ক্ষতির বোঝা বইতে হয়…

৩.৪ অপ্রচলিত ঋণদাতাদের ওপর নির্ভরতা

অ-প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের চড়া সুদের কারণে কৃষকরা ব্যাঙ্ক ঋণ শোধ করার আগে এদের টাকা শোধ করতে বাধ্য হন। একদিকে ইয়াবতমলে ব্যাঙ্কের ঋণখেলাপীদের শতাংশ (৮০-র ওপরে) চমকে দেওয়ার মতো, অন্যদিকে সাঙ্গরুরে ব্যাঙ্কঋণের টাকায় অত চড়া উৎপাদন খরচ সামলানোই যায় না।

এক বছর বাজে ফসল হওয়া এবং বকেয়া ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক আছে ধরে নিয়ে ইয়াবতমলে দুটো স্পষ্ট ছবি দেখতে পাওয়া যায়। একটা দৃশ্যে, কৃষক মহাজন এবং আত্মীয়দের কাছ থেকে প্রচণ্ড চড়া সুদে (মাসিক ১০-১২ শতাংশ পর্যন্ত) টাকা ধার নেন যাতে তিনি ব্যাঙ্কের টাকা শোধ করতে পারেন এবং ফলত ব্যাঙ্ক থেকে আবার টাকা ধার নিতে পারেন। একজন খেলাপীকে ব্যাঙ্ক কখনওই নতুন ধার দেবে না যতক্ষণ না তার আগের ধার পুরোপুরি শোধ হয়। ব্যাঙ্কের স্বল্পমেয়াদী কৃষিঋণ ঠিক সময়ের মধ্যে, অর্থাৎ প্রতি অর্থবর্ষ শেষের (৩১শে মার্চ) মধ্যে শোধ করে দিতে হয়, যাতে পরে আবার বিনা সুদে ঋণ অথবা বেশি ঋণ পাওয়া যায়। ব্যাঙ্কও অগ্রাধিকার প্রাপ্ত ক্ষেত্রে ঋণ দেওয়ার অংশ হিসেবে একটি সুদ-মুক্ত কৃষি ঋণের ওপর প্রথম বছরের পর ৪ শতাংশ সুদ চার্জ করে এবং এটা প্রতি বছর বাড়তে থাকে। ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার মধ্যে থাকার এই ব্যাকুলতাকে ইয়াবতমলের মেতিক্ষেরা গ্রামের এক কৃষক ব্যাখ্যা করলেন:

প্রাইভেট জায়গা থেকে ধার নেওয়া হয় ব্যাঙ্কে টাকা শোধ করার জন্য। আবার ব্যাঙ্ক থেকে নতুন ধার নিয়ে এই মহাজনদের টাকা শোধ করা হয়। বাকি টাকাটা আমাদের কাছে থাকে। স্বাভাবিকভাবেই সেই টাকা দিয়ে চাষের সব খরচ চালিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। ফলে আমরা আবার দৌড়ই মহাজনদের কাছে।

যে সব কৃষকরা এখনও ঠিকঠাকভাবে ব্যাঙ্কঋণ শোধ করতে পারছেন, তারা সংখ্যালঘু। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বড় কৃষকরা ব্যাঙ্কের বকেয়া শোধের জন্য একদম শেষ মুহূর্তে মহাজনদের থেকে ধার নেন। কৃষিতে লাভ যেভাবে কমছে (বক্স ১) এবং যে হারে ঘনঘন ফসল নষ্ট হচ্ছে, তাতে এটা নিশ্চিত করেই বলা যায় যে একজন ক্ষুদ্র এবং প্রান্তিক চাষীর পক্ষে ব্যাঙ্কের ঋণ শোধ দেওয়াটা প্রচণ্ডই কঠিন। ফলে এতে বিস্ময়ের কিছু নেই যে কেন্দ্রীয় এবং সমবায় ব্যাঙ্কগুলিতে অনাদায়ী ঋণের খতিয়ান বিপজ্জনকভাবে বেড়ে উঠবে। স্থানীয় ব্যাঙ্ক ম্যানেজার স্বীকার করলেন, “অ্যাকাউন্ট হোল্ডারদের মধ্যে ৮০ শতাংশই কৃষিঋণ খেলাপ করেছেন। ২০০৬-এর পর থেকে মানুষ আর ধারের টাকা ফেরত দিচ্ছে না।”

সেই সময়টাও দ্রুতই আসছে যে বকেয়া বেড়ে যাওয়ার জন্য মহাজন আর অগ্রিম ধার দিতে চাইবে না। আর সেই পরিস্থিতিতে কৃষকরা একদমই ঋণচক্রের বাইরে বেড়িয়ে যাবেন, কারণ ব্যাঙ্কঋণ শোধ করার সামর্থ্য তাদের নেই। এ যেন এক ভয়ানক চক্রের অবস্থার সংহত চক্র, একজন অফিসিয়াল যেভাবে এই চরম বিপর্যয়কে ব্যাখ্যা করলেন:

ওরা একটা চক্রের মধ্যে চলছে। ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নিল, খেলাপ করল। মহাজনের থেকে ঋণ নিল, সেটাও খেলাপ হল। তখন গেল আত্মীয়ের কাছে। যদি তুমি ব্যাঙ্কের টাকা না শুধতে পারো, মহাজনের টাকাও পারবে না, আর তখনই তোমার অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে পড়বে।

৩.৫ অ-প্রাতিষ্ঠানিক সূত্রের এবং ব্যাঙ্কের ঋণ

এখানেই আমরা দ্বিতীয় দৃশ্যে প্রবেশ করি, যেখানে কৃষক ব্যাঙ্কঋণের থেকে মহাজনদের কাছ থেকে নেওয়া ঋণ পরিশোধ করাকে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকেন। কারণ, মহাজনদের সাথে সম্পর্ক ভালো রাখা, সামনাসামনি গালিগালাজ এড়ানো এবং আবার টাকা ধার পাওয়া। এই অগ্রাধিকারকে ব্যাখ্যা করে একজন কৃষক বললেন:

প্রাইভেট জায়গা থেকে নেওয়া ধারগুলিকে সাধারণভাবে আগে শোধ করা হয়। ব্যাঙ্কের টাকা পরে। বেশিরভাগ ধারই নেওয়া হয় পরিবারের লোকেদের থেকে, কারণ বাইরের লোকেরা আমাদের ধার দেয় না। চাষীরা ব্যাঙ্ক থেকে নেওয়া কৃষিঋণের টাকায় অন্যান্য খরচও চালায়। যেমন, চিকিৎসা, পড়াশোনা, ঘরবাড়ি, পালাপার্বন বা রোজকার বাড়ির খরচ।

প্রচুর পরিবারের মাথায় বিপুল ঋণের বোঝার কারণ হল সাধ্যাতীত চিকিৎসা খরচ বা বিয়ে১২ কি আসবাবপত্র কেনাতে বিপুল অর্থব্যয়। ইয়াবতমলের সাবিত্রী ফুলে সমাজ কার্য মহাবিদ্যালয়ের প্রিন্সিপাল বললেন:

শহুরে সংস্কৃতির প্রভাব একটা ছাপ ফেলেছে। যদি আমি গ্রামে আর আমার ভাই শহরে থাকে, তবে আমাদের সামাজিক পরিবেশ মিশ খায় না। শহরে দেখা জীবনযাত্রা আকাঙ্ক্ষার ওপরে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। এই প্রভাব দেখা যায় বিয়েতে। উপহার বা অন্যান্য জিনিসপত্রের ক্ষেত্রে গ্রামের লোকেরা সমানে শহরের আত্মীয়দের সমকক্ষ হয়ে ওঠার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

কৃষিপণ্যের দাম চাষের খরচ বাড়ার সাথে সমানুপাতিক হচ্ছে না, এবং সাধারণভাবে পাঞ্জাবে, ও বিশেষ করে সাঙ্গরুরে জমির ভাড়া গোটা দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি, এই বিষয়গুলিকে মাথায় রাখলে এর মধ্যে অবাক হওয়ারকিছুই থাকে না যে, শুধু কৃষিকাজের ওপর নির্ভর করে এখানে একটা পরিবারের সুষ্ঠুভাবে চলা মুশকিল। বাড়ির প্রতিদিনের খরচ, বুনিয়াদী স্বাস্থ্য এবং শিক্ষা– যেগুলির সবেরই খরচ গুণিতক হারে বেড়ে চলেছে— সেগুলি চালানোর জন্য টাকার একটা ধারাবাহিক প্রবাহ থাকার দরকার। স্বল্প জমির মালিক কৃষকদের কাছে, যাদের আর কোনও আয়ের উৎস নেই, তাদের জন্য এটা একটা বড় সমস্যা। আগেই বলা হয়েছে, প্রায় সমস্ত ক্ষুদ্র এবং প্রান্তিক চাষীদেরই কৃষি থেকে আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি, এবং এটাও আমরা আগে দেখেছি, কীভাবে কৃষি থেকে হওয়া আয় দিয়ে তাদের দৈনন্দিন সাংসারিক দাবীপূরণ অসম্ভব। আয় এবং ব্যয়ের এই বৈষম্যই পাঞ্জাবে চরম আকার ধারণ করেছে। মোবাইল ফোন, সাইকেল, টিভি, ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিন, এয়ার কন্ডিশনার, মোটরসাইকেল এবং গাড়ি জাতীয় ভোগ্যপণ্য ক্রয়ে গোটা দেশের তুলনায় পাঞ্জাব প্রথম স্থানে (শেরগিল ২০১৫)। যেহেতু এই সমস্ত অ-কৃষি খরচের জন্য টাকার জোগান পেতে প্রাতিষ্ঠানিক উপায়গুলি খুবই সীমিত, ফলে অ-প্রাতিষ্ঠানিক উৎসের দ্বারস্থ হওয়া অনিবার্য।

প্রাতিষ্ঠানিক ঋণব্যবস্থার অপ্রতুলতার জন্যই আর্থিদের ওপর একটা অনিবার্য নির্ভরতা তৈরি হয়। আর্থির ভূমিকা দ্বৈত। সে বাজারে ফসল বিক্রি করে, এবং কৃষকের যখন দরকার হয় তখন তাকে নগদ টাকা দেয়। অনেক চাষীরই নিজের জমি নেই, লিজে চাষ করেন। ফলে তারা ব্যাঙ্কঋণও পাবেন না। আর্থিরা চিরাচরিত মহাজনদের মতো নয়, এরা দরকারের সময় খুবই সহায়ক হয়ে দাঁড়ায়। ফলে একজন কৃষক একজন আর্থির সাথে তার সম্পর্কটা নষ্ট করতে চান না। আর্থিরাও অন্যদিকে, সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে তার ফসলের ভাগটা নিশ্চিত করে নিয়ে টাকা ফেরত পাওয়ার ব্যবস্থা করেই রাখে। ফলে মূলধন ফেরত পাওয়ার জন্য তার মারমুখী হওয়ার কোনও প্রয়োজন পড়ে না।

সাঙ্গরুরে আমরা এমন একটাও পরিবার খুঁজে পাইনি যে পরিবারে কোনও আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে অথচ কোনও অ-প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের বোঝা নেই। বেশিরভাগ বকেয়া ঋণই আর্থিদের কাছে। ধারের পরিমাণ, প্রয়োজনীয়তা, আর্থির সঙ্গে চাষীর সম্পর্ক এবং চাষীর ধার শোধের ক্ষমতা, এসব বিচার করে সুদের পরিমাণ মাসিক ২ থেকে ৩ শতাংশের মধ্যে ঘোরাফেরা করে। সাঙ্গরুরে, বিশেষ করে ক্ষুদ্র চাষীরা এবং যারা ভাড়ার জমিতে চাষ করেন, তারা ব্যাপকভাবে (যদি সম্পূর্ণভাবে নাও বলি) স্বল্পমেয়াদী কৃষিঋণ এবং সাংসারিক খরচাপাতির জন্য আর্থিদের ওপর নির্ভরশীল। এই ঋণের চরিত্র মরশুমি। ফসল বোনার সময়ে নেওয়া হয়, এবং ফসল উঠলে ফেরত দেওয়া হয়।

কৃষকদের মজুত রাখার ব্যবস্থার অভাব আছে। ফলে তারা ভালো দাম না পেলেও ফসল ওঠার সাথেসাথেই তা বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন, কারণ তাদের ওপর চড়া সুদে নেওয়া অ-প্রাতিষ্ঠানিক ধারগুলি শোধ করার চাপ থাকে। সাঙ্গরুরের একজন প্রান্তিক চাষী বললেন:

আর্থিরা সাধারণভাবে চাষীদের অবস্থা জানে এবং তার ঘরে কতটা ফসল মজুত আছে সেটাও জানে। যতক্ষণ না চাষীদের মজুত ফুরাচ্ছে, ততক্ষণ তারা দাম বাড়তে দেয় না। বিক্রেতারা তার পর দাম বাড়াতে শুরু করে। আর্থিরা মিলমালিকদের সাথে যোগসাজশ করে দাম বেঁধে দেয়, ফলে সেই দামে বিক্রি করা ছাড়া চাষীদের উপায় থাকে না। চাষীরা তিন মাসের বেশি ফসল রাখতে পারে না, কারণ তার পর তা নষ্ট হতে শুরু করে।

৪. ঋণ বেড়ে চলার ভয়ানক পরিণতি

ঋণের বোঝা যত বাড়ছে, তার সব ভয়ানক পরিণতি আসছে গোটা কৃষিকাজেই। ইয়াবতমলে কৃষকদের ঋণ পাওয়ার যোগ্যতা নষ্ট হয়েছে, এবং সাথে সাথে অ-প্রাতিষ্ঠানিক সূত্র থেকে ঋণ পাওয়াও কঠিন হয়ে গেছে। সাঙ্গরুরে অত্যধিক ব্যয়বৃদ্ধির ফলে ঋণের সাথে চাহিদার একটা ধারাবাহিক পার্থক্য রয়েই যাচ্ছে। প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের অপ্রতুলতার কারণে ব্যক্তিগত সূত্র থেকে ধার নেওয়া ইয়াবতমলে কোনও নতুন চিত্র নয়। তাতেও, সেখানে সাম্প্রতিক কালে ঋণের প্রবাহ বিরাটভাবে কমেছে কারণ ঋণদাতারা আর জমি বা গয়না বন্ধক রেখে ধার দিতে চাইছে না। ফসলে ধারাবাহিক মার খেয়ে খেলাপী হয়ে থাকার ফলে বেশিরভাগ কৃষকই এখন প্রচলিত ঋণব্যবস্থার বাইরে। সবচেয়ে ভয়ানক বিষয় হল, অ-প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের উৎসগুলি শুকিয়ে যাওয়া। কেউই ধার দিতে চাইছে না, কারণ তারা জানে যে সাধারণভাবে সেই ধার ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। ঋণদাতারা এককালীন লেনদেন পছন্দ করে। গয়নাগাটি গ্যারান্টি হিসেবে বন্ধক রাখার চাইতে সাথে সাথে কিনে টাকা দিয়ে দেওয়াতে তারা বেশি আগ্রহী। ক্ষুদ্র এবং প্রান্তিক চাষীরা, যারা এখন অ-প্রাতিষ্ঠানিক জায়গা থেকেও আর ধার পাচ্ছেন না, বিশেষ করে তাদের জন্য পরিস্থিতি কেন এমন অন্ধকার হয়ে গেল ইয়াবতমলে এক বড় চাষী ব্যাখ্যা করলেন:

এখন মহাজনরা আর চাষীদের ধার দিচ্ছে না। টাকা ধার দেওয়ার আইন চালু হওয়ার পরে মহাজনের নামে জমি হস্তান্তর অসম্ভব হয়ে গেছে। খরচ বেড়ে যাওয়ায় চাষীকে বাধ্য হয়ে অন্য জায়গা দেখতে হচ্ছে, কারণ ব্যাঙ্কের কৃষিঋণে মেটানো যাচ্ছে না। আজকে মহাজনরা আর বন্ধকে উৎসাহ দেখাচ্ছে না কারণ তারা জমিটা নিতে পারবে না। বড় চাষী ছাড়া, যেরকম আছে কয়েকজন, কেউই আর ধার দিতে চাইছে না।

এই পরিস্থিতিতে স্বর্ণকাররাও এককালীন লেনদেনে আগ্রহী হয়ে উঠেছে, যেখানে তাদের টাকা ফেরত পাওয়া নিশ্চিত। ইয়াবতমলে এক নতুন শ্রেণী ঋণব্যবসায় ঢোকার ফলে সেখানে ঋণব্যবস্থাই একটা বড়সড় পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, যেমনটা শোনা গেল এক কৃষকের মুখে:

শিক্ষিত চাকুরিজীবী অথবা ঠিকাদারেরা স্বল্পমেয়াদে ধার দিচ্ছে। এরা ৫,০০০ বা ১০,০০০ টাকার ছোট ছোট ধার দেয়। কোনও লেখাপড়া হয় না। পুরোটাই বিশ্বাস এবং পারিবারিক সম্পর্কের ওপরে। বীজ ডিলাররাও ধার দেয়। ধারে জিনিসপত্র দেয় এবং সেই অনুপাতে ফসল নিয়ে নেয়।

সাঙ্গরুরে বকেয়া ঋণের একটা বড় অংশ শুধু যে অন্যান্য খরচাপাতি চালাতেই ব্যয় করা হয়েছে তা-ই নয়, বাইরের বাজার থেকে ভোগ্যপণ্য ক্রয়ের কাজেও ব্যবহৃত হয়েছে। এই ধরনের ক্রয় শ্রেণী-অবস্থান জাহির আর উচ্চাকাঙ্ক্ষার পরিচায়ক। ব্যয়ের একটা বড় অংশ জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানগুলিতে, বিশেষত বিয়েতে, হয় এবং গাড়ি, গ্যাজেট, মেশিনারি এসব কেনাকাটিতে স্ট্যাটাস রক্ষিত হয়। জমির পরিমাণ যাই হোক না কেন, কৃষকরা টাকা ধার করেও সামাজিক স্ট্যাটাস রক্ষা করেন। শেরগিল যেমন বলেছেন:

তাদের মধ্যে একে অপরকে ছাপিয়ে যাওয়ার একটা অদম্য বাসনা দেখা যায়। বিয়েতে তারা প্রচুর খরচ করে। তারা কূপজাতীয় শৌচাগার পালটে ফ্ল্যাশ লাগানো সৌচাগার বসাচ্ছে। ওপরে ওঠার একটা ভয়াবহ চাপ থাকে। তিন একর মাত্র জমি আছে এমন কৃষকও তার ছেলেমেয়েকে অস্ট্রেলিয়ায় পাঠাচ্ছে উচ্চশিক্ষার জন্য। আগে এলপিজি, বৈদ্যুতিন গ্যাজেট, মোবাইল ফোন ইত্যাদির জন্য কোনও খরচ ছিল না। আগে পরিবারের সদস্যরা একসাথে সময় কাটাত। এখন প্রত্যেকের আলাদা আলাদা জীবন রয়েছে। প্রত্যেক কৃষকের নিজস্ব যান রিয়েছে যদিও সেটা কেনা তার জন্য কঠিন। একজন কৃষক যদি কৃষিকাজের জন্য টাকা নিয়ে তা দিয়ে অন্যান্য খরচ করে, নিশ্চিতভাবেই সে ওই টাকা শোধ দিতে পারবে না।

এই অত্যধিক ব্যয়ের ধরন আর্থিদের সাথে নিচের আলোচনাতেও বোঝা যায়:

কৃষকেরা বিয়েতে প্রচুর খরচ করে। এখানে বিয়ের খরচ নিয়ে গ্রামে গ্রামে প্রতিযোগিতা চলে। যাদের ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা খরচ করার সামর্থ্য তারাও ২৫ লাখ টাকা খরচ করে। এই মাত্রায় খরচ করার সামর্থ্য একটা সামান্য অংশের কৃষকেরই আছে। বাকি কৃষকরা তাকে ছাপিয়ে যেতে চায়। এতেই সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে খরচ করার প্রবণতা তৈরি হয় এবং ঋণের জালে জড়ানো শুরু হয়। কৃষক ফসল পায় ছ’মাস অন্তর অন্তর কিন্তু তাকে ধার শোধ করতে হয় প্রতি মাসে। এখন প্রতিটা পরিবারেরই প্রায় একটা করে ট্রাকটর আছে, যেখানে একটা ট্র্যাকটরে চারটে পরিবারের চলে যায়।

৫. সংস্কারমূলক পদক্ষেপ

যদি কৃষক পরিবারপিছু গড় আয়ের খতিয়ান দেখা যায়, তাহলেই কাঠামোগত সমস্যাগুলি পুরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সমস্ত সূত্র থেকে একটি কৃষক পরিবারের গড় আয় মাসে ৬,৪২৬ টাকা। এর মধ্যে ২,০৭১ টাকা আসে মজুরি বাবদ, ৫১২ টাকা অ-কৃষি ব্যবসা থেকে এবং বাদবাকি চাষ থেকে যেটা ৭০ শতাংশ পরিবারের ক্ষেত্রেই ব্যয়ের থেকে কম (NSSO 2013)।

ম্যাক্রো এবং মাইক্রো ডেটা থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়, চাষ থেকে হওয়া আয় খুব কম সময়েই খরচের বেশি হয়। এর ফলে কৃষক বাধ্য হন এমন সুদে টাকা ধার নিতে যা তার সামর্থ্যের বাইরে, এবং আস্তে আস্তে অ-প্রাতিষ্ঠানিক ঋণদাতাদের ওপর তার নির্ভরতা তৈরি হয়ে যায়।

৫.১ জরুরি ব্যবস্থা

৫.১.১ চাষের ধরন

(১) সাঙ্গরুর এবং ইয়াবতমল, এই দু’ জায়গাতেই চাষের ধরন এলাকার কৃষি-জলবায়ুর সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ নয়। এই সমস্যা সমাধানের জন্য সবচেয়ে জরুরি হল কৃষি-জলবায়ু অঞ্চলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চাষের ধারা বদলানো।১৩ প্রকৃতি এবং প্রাকৃতিক সম্পদের জন্য ক্ষতিকারক ফসলের চাষে নিরুৎসাহ করতে সহায়ক মূল্য এবং কৃষিঋণ বন্ধ করতে হবে, তা সে ফসল স্বল্পমেয়াদে যতই লাভদায়ক হোক না কেন। একইভাবে তাদের কৃষি-অঞ্চলের পক্ষে উপযোগী ফসল চাষ করার জন্য ইনসেনটিভ ঘোষণা করতে হবে।

(২) সাশ্রয়কারী দেশীয় মিশ্র কৃষি পদ্ধতিতে চাষে উৎসাহ দিতে হবে। পরিবারগুলিকে খাদ্যসুরক্ষা দেওয়ার জন্য এই পদ্ধতি সহায়ক হবে, সাথে সাথে মাটির নষ্ট হয়ে যাওয়া ঊর্বরাশক্তিও ফিরে আসবে।

৫.১.১ প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ ব্যবস্থা

(১) ব্যাঙ্কে ঋণখেলাপীদের সংখ্যা কমিয়ে আনার জন্য ঋণ পরিশোধ করলে ইনসেনটিভের ব্যবস্থা এবং ইনস্টলমেন্টে ঋণ পরিশোধের সুযোগ দেওয়া খুব জরুরি। ঋণ পরিশোধের সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যাবে যদি বকেয়া ঋণকে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে দেওয়া যায়।

(২) ঋণ-জমির পরিমাণের একটি সুষ্ঠু অনুপাত কৃষককে তার বাকি জমির ওপর অধিকার বজায় রাখতে সাহায্য করবে, যেটা পরে নগদের উৎস হিসেবেও ব্যবহার হতে পারে। বর্তমানে যেহেতু একটা ব্যাঙ্কঋণ একজন কৃষকের সমস্ত জমিকেই অবরুদ্ধ করে রাখে, তাই সে জমির কোনও অংশ বিক্রিও করা যায় না বা অন্যত্র বন্ধক রাখাও যায় না।

(৩) শুষ্ক অঞ্চলের জন্য একটি বিশিষ্ট ঋণ পলিসি বিবেচনা করা উচিত। কারণ এরকম অঞ্চলের চাষ-পদ্ধতি বর্ষণ অঞ্চলের থেকে মূলগতভাবেই আলাদা, এবং বিশেষ মনোযোগ দাবী করে।

(৪) ক্যাশলেস ঋণের ব্যবস্থাগুলি চালু করা উচিত যাতে কৃষিঋণ অন্যত্র ব্যয়িত না হয়। সরাসরি বিক্রয়স্থলে, যেমন ফ্যাক্টরি বা ডিলারের কাছে ঋণের টাকা দেওয়া যেতে পারে।

(৫) স্থানীয় ফসল বিপর্যয়ের কথা মাথায় রেখে ঋণ কাঠামোর পুনর্গঠন করা। যেখানে আবহাওয়ার চরম দুর্ঘটনা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কথা মাথায় রেখে বিশিষ্ট এবং লক্ষ্যপূর্ণ ক্ষতিপূরণ প্যাকেজ দেওয়া হবে। একই সাথে বর্তুকির নীতিগুলিও আরও কার্যকর হতে পারে, যদি সেগুলিকে গ্রুপ ইনসিওরেন্স স্কিমের সাথে সাযুজ্য রেখে তৈরি করা হয়। কারণ কৃষক ঝুঁকি একা নেন না, নেন গ্রুপগতভাবে।

৫.২ দীর্ঘমেয়াদী ব্যবস্থা

দীর্ঘমেয়াদী ব্যবস্থার মধ্যে অবশ্যই ভূমিসংস্কার এবং যে সব ব্যবসার নিয়মগুলি কৃষিজীবী শ্রেণীর স্বার্থের বিরুদ্ধে যায় সেগুলির সংশোধন করা থাকতে হবে। যাই হোক, এটা পরিষ্কার যে দৈন্য এবং বঞ্চনার সামগ্রিকভাবে অর্থনীতির ওপরেই একটা মন্দ প্রভাব থাকে। সরকারের অবস্থান সহায়ক নয়, কারণ গত দেড় দশক ধরে কৃষিক্ষেত্রে সরকারি ব্যয় জিডিপি-র আনুপাতিক হিসেবে ১ শতাংশেরও কম রয়ে গেছে। আমরা একটা দূরদৃষ্টিসম্পন্ন এবং সুসংহত নীতিমালা চাই, যাতে আমাদের কৃষকদের একটি সম্মানজনক জীবন দেওয়া যায়। কৃষিকে সংহত করার জন্যই এগুলি জরুরি, কারণ আমাদের সামগ্রিক ভালো থাকার জন্য কৃষি জরুরি। এমন একটা অর্থনীতি, যা চালিত হচ্ছে কর্মহীন বৃদ্ধি দিয়ে, সেখানে শহরাঞ্চলে বাধ্যতামূলক অনুপ্রবেশ প্রায়শই বিপর্যস্ত মনুষ্যত্বের প্রকাশ। এই অনুপ্রবেশকারীরাই ধীরে ধীরে হয়ে উঠবে নিয়মবহির্ভূত ক্ষেত্র এবং নির্মাণ ক্ষেত্রের নতুন “ক্রীতদাস”, এবং যে গ্রামীণ ও কৃষি সমস্যাগুলি রয়ে গেল তা রয়েই যাবে।

 

মূল রচনাটি ইংরাজিতে লেখা। “Lives in Debt: Narratives of Agrarian Distress and Farmer Suicides” – এই শীর্ষকে ‘The Economic & Political Weekly’ পত্রিকার Vol. 52, Issue No. 21, 27 May, 2017 সংখ্যায় প্রকাশিত। পত্রিকার পাতায় রচনাটি পড়তে হলে এখানে ক্লিক করুন

 

টীকা—

 

১) এই রিসার্চ পেপারটি রিজার্ভ ব্যাঙ্কের হয়ে শিব নাদার বিশ্ববিদ্যালয়-দ্বারা কৃত, ২০১৪-১৫। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের কাছে রিপোর্টটি পেশ করা হয় ২০১৬ সালে। এই পেপারে ধৃত মতামত সবটাই রচনাকারদের। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের নয়।

২) নাগরাজের (২০০৮) যুক্তিতে কিছুটা এগিয়ে নিয়ে গিয়ে বলা যায়, এই গবেষণা কৃষক আত্মহত্যার যে তথ্য পাওয়া যায় তার প্রতি সম্পূর্ণ আস্থাভাজন নয়। একজন কৃষকের আত্মহত্যা পঞ্জীকৃত হতে হলে কৃষকটির নিজস্ব জমি এবং ব্যাঙ্কের কাছে ঋণ থাকা আবশ্যক। এই শর্তগুলি পূরণ না হলে মৃত কৃষকের পরিবার সরকারের কাছে ক্ষতিপূরণ পান না। অতএব, যে সমস্ত ভূমিহীন কৃষক বা ভাগচাষী ঋণ (ব্যাঙ্ক ব্যতীত অন্য কোনো উৎস থেকে নেওয়া) বা অন্যতর সমস্যার কারণে আত্মহত্যা করলেন, তাঁদের নাম কৃষক আত্মহত্যার সরকারী হিসাবে ওঠে না। এ ছাড়াও, কোনো কৃষক আত্মহত্যা করলে তার কারণ নিজেদের রুচিমতন ঠিক করেন স্থানীয় নীচুতলার সরকারী বাবুরা।

৩) ফিল্ডওয়ার্কের সময় দেখা গেছে ইয়াবতমলে জমির ভাড়া প্রতি একর প্রতি বছর তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা। যদিও সাঙ্গরুরের তুলনায় (ত্রিশ থেকে পঞ্চাশ হাজার টাকা) এই ভাড়া অনেকটাই কম, তবু শুকনো চাষের কারণে ইয়াবতমলে ফলনের সম্ভাবনা কম এবং ঝুঁকি অনেক বেশী এই কথা ভুলে গেলে চলবে না।

৪) যেহেতু কৃষক আত্মহত্যার তথ্যে মৃত কৃষকের জমির পরিমাণ সম্বন্ধীয় কোনো তথ্য রাখার ব্যবস্থা নেই, সেই কারণে ইয়াবতমলে জমির পরিমাণ আর কৃষক আত্মহত্যার মধ্যে সম্পর্ক বুঝতে ফিল্ডওয়ার্কের সময় ত্রিশটি কেস স্টাডির ও গত দশ বছরেরবন্দনা ফাউন্ডেশনের সার্ভের থেকে সাহায্য নেওয়া হয়েছে। বন্দনা একটি অলাভজনক সংস্থা। এঁরা মৃত কৃষকদের স্ত্রীদের সঙ্গে কাজ করেন এবং তাঁদের নানাপ্রকার সহায়তা প্রদান করেন।

৫) বাবা নানক এডুকেশনাল সোসাইটি-দ্বারা সংগৃহীত এবং রক্ষিত সাঙ্গরুরের কৃষক আত্মহত্যা-সংক্রান্ত তথ্যের থেকে তোইরী করা হয়েছে। এই সোসাইটি একটি অলাভজনক সংস্থা, এবং আত্মহত্যা-পীড়িত পরিবারগুলির সঙ্গে আশির দশক থেকে কাজ করে আসছেন। কোনো সরকারী তথ্য না থাকায় এই অঞ্চলের কৃষক আত্মহত্যা সম্বন্ধে জানতে এ ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। এই সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা শ্রী ইন্দরজিত সিং জয়জী পঞ্চায়েত-স্তরে কৃষক আত্মহত্যার ঘটনাগুলিকে চিহ্নিত করে তাঁদের প্রয়োজনীয় নথি দেবার ব্যবস্থা করেছেন যাতে এই ধরণের আত্মহত্যার ঘটনাগুলি সাধারণ আত্মহত্যার ঘটনার সঙ্গে মিলিয়ে ফেলা না হয়। পঞ্চায়েত এই মর্মে কাগজ দিয়ে থাকেন যে আত্মহত্যার ঘটনা ঋণের কারণে ঘটেছে।

৬) সুদের কারবারিরা কৃষক আর পাইকারি বাজারের মধ্যে ফড়ে হিসাবে কাজ করে, এবং ফসল কাটার পরেই বাজারে বিক্রীর ব্যবস্থা করে। এই কারবারিরা, যাদের অর্থী বলা হয়, ফসল ওজন করে এবং গুণগত মান অনুসারে বেছে দিয়ে পাইকারি ক্রেতার থেকে টাকা নেয়। এরা কৃষকদের ঋণও দেয়, যা অনেক সময় ফসলে এদের দাবির সঙ্গে হিসাব করে নেওয়া হয়।

৭) সাঙ্গরুরের আত্মহত্যা-পীড়িত পরিবারদের (স্যাম্পল সাইজ ৩০) থেকে নেওয়া কেস স্টাডি অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে – প্রতিটি কৃষক পরিবারের ওপরে ঋণের বোঝা আনুমানিক তিন লক্ষ একত্রিশ হাজার টাকার মতন।

৮) সমস্ত উদ্ধৃতি ফিল্ডওয়ার্কের সময় করা সাক্ষাৎকার থেকে নেওয়া। নতুবা উৎস পৃথকভাবে উল্লেখিত।

৯) দেখার বিষয় হল – বিহার, ওড়িশা, উত্তর প্রদেশ, রাজস্থান, মধ্য প্রদেশ, ঝাড়খণ্ড, হরিয়ানা, পশ্চিমবঙ্গ ইত্যাদি রাজ্যে, যেখানে কৃষকের আত্মহত্যার ঘটনা তুলনামূলকভাবে কম – পণের কারণে মৃত্যুর সংখ্যা বেশী।

১০) প্রতিটি তালুকার দিকে ভালোভাবে নজর করলে প্রতিটি জেলায় চাষের ধরন এবং ঘাটতির সম্বন্ধে দেখা যাবে (http://yavatmal.nic.in)। জেলাভিত্তিক বৃষ্টিপাতের পরিসংখ্যান আর গ্রামভিত্তিক পরিসংখ্যানের মধ্যে বিস্তর ফারাকও নজর করা যায়। ফসল নষ্ট হওয়ার পরিমাণ সম্বন্ধে ধারণা করতে গিয়ে তালুকাভিত্তিক পরিসংখ্যান দেখা হয়েছে। যদিও, এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামেও বৃষ্টিপাতের প্রচুর তারতম্য লক্ষ্য করা গেছে।

১১) বিভিন্ন খাদ্যবস্তুর জল-পদাঙ্ক বা water footprint দেখতে হলে-Institution of Mechanical Engineers-দ্বারা রক্ষিত পরিসংখ্যান (এখানে পুনঃপ্রচারিত-https://www.theguardian. com/news/datablog/2013/jan/10/how-muchwater-food-production-waste)।

১২) অধমর্ণতা, অর্থনৈতিক পতন এবং পারিবারিক বিবাহ – এই তিনটিকে কৃষক আত্মহত্যার তিন প্রধান কারণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে – “Causes of Farmer Suicides in Maharashtra: An Enquiry,” মুম্বাই হাইকোর্টের কাছে অন্তিম রিপোর্ট পেশ করা হয়েছে (Dandekar et al 2005)।

১৩) অ্যাগ্রোক্লাইম্যাটিক জোন এবং প্রতিটির পক্ষে উপযুক্ত শস্যের সম্বন্ধে তথ্যের উৎস – Ministry of Water Resources, Government of India।

 

সন্ধানগ্রন্থ

 

Dandekar et al (2005): “Causes of Farmer Suicides in Maharashtra: An Enquiry,” Final Report submitted to the Mumbai High Court, Tata Institute of Social Sciences, Tuljapur.

Gupta, D (2015): “Home and the World: Why Do Farmers Commit Suicide? It’s a Man Thing and

More,” Times of India, New Delhi, 10 October.

Jha, P and M Negre (2007): “Indian Economy in the Era of Contemporary Globalisation: Some Core

Elements of the Balance Sheet,” http://www.macroscan.org/anl/may07/pdf/Indian_Economy.pdf.

Johl, S S et al (1986): “Report of the Expert Committee on Diversifi cation of Agriculture in Punjab,” submitted to Government of Punjab.

— (2002): “Agricultural Production Pattern Adjustment Programme in Punjab for Productivity

and Growth,” Johl Committee report submitted to Government of Punjab.

Ministry of Agriculture (2014): Agriculture Census 2010–11: All India Report on Number and Area of Operational Holdings, Agriculture Census Division, Department of Agriculture & Co-Operation, Ministry of Agriculture, Government of India.

NABARD (2013): “Annual Report, 2012–13,” National Bank for Agriculture and Rural Development,

Mumbai.

Nagraj, K (2008): “Farmers’ Suicide in India: Magnitudes, Trends and Spatial Patterns,” Madras Institute of Development Studies, http://www.macroscan.org/anl/mar08/pdf/Farmers_Suicides.pdf.

NCRB (2013): “Accidental Deaths and Suicides in India,” National Crime Records Bureau, Ministry

of Home Affairs, Government of India.

— (2014): “Accidental Deaths and Suicides in India,” National Crime Records Bureau, Ministry of

Home Affairs, Government of India.

NSSO (2003): “Situation Assessment Survey of Farmers 2003, NSS 59th Round,” National Sample Survey Office, Ministry of Statistics and Programme Implementation, Government of India.

— (2013): Debt & Investment, NSS 70th Round, National Sample Survey Office, Ministry of Statistics and Programme Implementation, Government of India.

— (2014a): Key Indicators of Situation of Agricultural Households in India 2014, National Sample Survey Office, 70th Round, Ministry of Statistics and Programme Implementation, Government of India.

— (2014b): “Situation Assessment Survey of Agricultural Households, January–December 2013,” National Sample Survey Office, Ministry of Statistics and Programme Implementation, Government of India.

Pattanaik et al (2008): Contract Farming System in Punjab: An Appraisal, Chandigarh: Centre for

Research in Rural and Industrial Development.

Shergill, H S (1998): Rural Credit and Indebtedness in Punjab, Monograph Series IV, Chandigarh: Institute of Development and Communication.

— (2015): “Has Punjab Lost Number One Position in Level of Development,” Journal of Agricultural

Development and Policy, Vol 25, No 1, pp 1-10.

 

(ছবি: ইন্টারনেট)

2 Comments

  1. খুব দরকারি লেখা। ফলে বড় হলেও পড়ে ফেললুম। তবে অনুবাদটা আরেকটু সহজ হলে ভালো হত…

1 Trackback / Pingback

  1. দৈন্যের সাতকাহন – ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*