সোমেন বসুর লেখা

সোমেন বসু

 

আপাতত পরিস্থিতি মোটের ওপর নিয়ন্ত্রণে। এবং সুকৃত বা বিকৃত আকারে এ খবর ছড়িয়েছেও বিস্তর। ফলে কিছু বলা যাক।

বাদুড়িয়া-বসিরহাটের কথা বলছি।

প্রসঙ্গত, এ নিয়েও কূটকচালি আছে। সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার খবর না ছড়ানো কেন উচিত, সেটা সবার মাথায় নাকি ঢোকে না! স্বাভাবিক। মাথার পুরুত্ব, অবস্থান, আকৃতি অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করে কোন মাথায় কী ঢুকবে এবং কী নয়! মানুষের পাঁচটা মাথা সমান নয়! এই যে এ প্রসঙ্গে অনেকেই ভাবের ঘোরে কাছাখোলা হয়ে বলে ফেলছে, তাহলে জুনেইদের খুনের খবরটা ছড়ানোও ভুল, সেও তো মাথার বিভিন্ন প্যারামিটারের তারতম্যেরই ব্যাপার।

একটা কথা বলে মূল প্রসঙ্গে ঢুকব। গত ছ’মাসের মধ্যে পশ্চিমবাংলারই দুটো জায়গায় সাম্প্রদায়িক হানাহানির খবর ছবি ভিডিও সমেত ফেসবুক সূত্রেই আমি দেখেছি এবং আমি খুবই খাটোহাত মানুষ। ফলে ধরে নিতে পারি আরও অনেকেই দেখেছেন। এর মধ্যে এক জায়গায় র‍্যাফও নেমেছিল বলে জানি। এবং সেগুলি নিয়ে কোনও প্রচার হয়নি। সঠিকভাবেই। আর হ্যাঁ, দু’জায়গাতেই যারা আক্রমণকারীর ভূমিকায় ছিল ঘটনাচক্রে তারা হিন্দু। জাস্ট জানিয়ে রাখলাম।

এই সূত্র ধরেই মূল প্রসঙ্গে ঢুকে পড়া যায়। বাদুড়িয়া এত ছড়াতে হল কেন? কার স্বার্থে?

সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার খবর ছড়ানো হয় না একটাই কারণে। প্রশাসনকে নির্বিঘ্নে নিজেদের কাজ করতে দেওয়ার জন্য। খবরের সাথে উত্তেজনার নিজেরই ছড়িয়ে পড়ার বেবাক সম্ভাবনা থাকে।

কিন্তু এই সবই সেইরকম প্রশাসনের কথা ধরে বা ভেবে নিয়ে, যে প্রশাসন এই ঘৃণ্য বদমাইশিগুলি দমন করতে আন্তরিক। বাস্তবে যা ঘটল, তাতে সেই আন্তরিকতা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ তৈরি হয়।

ঘটনার সূত্রপাত কাগজে বেরনো একটি খবর। এক বিজেপি নেতা জানাল ঈদের দিন পাকিস্তানের পতাকা ওড়ানো হয়েছে। বাদুড়িয়ায়। প্রসঙ্গত পতাকাটি ছিল ইসলামের চাঁদ তারা আঁকা পতাকা। পাকিস্তানের পতাকার সাদা অংশটি তাতে ছিল না। থাকার দরকারও ছিল না। ওই নেতার বা ওই কাগজের। বিষ ছড়াতে গেলে মিথ্যাই প্রকৃষ্ট পন্থা।

কিন্তু এর প্রেক্ষিতে এত কিছু হয়ে যাওয়ার পরেও ওই নেতা বা ওই কাগজের বিরুদ্ধে প্রশাসন কোনও স্টেপ নিয়েছে বলে শুনিনি।

সৌভিক ছেলেটির বাড়িতে প্রথম যারা বিক্ষোভ দেখায়, থানা ঘেরাও করে, পুলিশ তাদের প্রতি নির্বিকার থাকে।

ঘটনা শুরু এবং নানা গুজবের কাঁধে ভর দিয়ে বসিরহাট থেকে বারাসাত অব্ধি ছড়িয়ে যাওয়াটা পুলিশ প্রশাসন চরম নির্লিপ্তি নিয়ে খালি লক্ষ করে!
বসিরহাটের বর্তমান তৃণমূল সাংসদ ইদ্রিশ আলি ২০০৭-এর পার্ক সার্কাসে দাঙ্গায় এবং পূর্বতন সাংসদ হাজি নুরুল ইসলাম ২০১০-এর দেগঙ্গা রায়টে অভিযুক্ত।

বসিরহাট অঞ্চলে জামাতপন্থীদের আনাগোনা এখন একটা ওপেন সিক্রেট।

নিউজ ১৮-এর ভিডিও রিপোর্টিং-এ পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে বাদুড়িয়ায় পুলিশের জিপ পোড়ানো ইত্যাদি যারা করেছিল, তারা বহিরাগত এবং হিন্দিভাষী বলে জানাচ্ছেন স্থানীয় জনতা। পুলিশের ভূমিকা লক্ষণীয়।

সৌভিক ছেলেটি হিন্দু সংহতির সদস্য।

সর্বোপরি, যে ঘটনা থেকে এই বিষয়টি সবচেয়ে বেশি করে ছড়াল, সেটা হল রাজ্যের দুই সাংবিধানিক প্রধানের বালখিল্য তরজা।

সেই তরজার প্রেক্ষিতে মুখ্যমন্ত্রী সাংবাদিক সম্মেলন করে বলে বসলেন, “আপনাদের” অনেক প্রোটেকশন দিয়েছি… ইত্যাদি!! ‘আপনাদের’ কথাটার সবচেয়ে ভালো অর্থ দাঁড়ায় সংখ্যালঘু মুসলিম জনগণ। সেক্ষেত্রে ওনার কথার অর্থ দাঁড়ায়, সব মুসলিমই দাঙ্গাবাজ। এবং সেক্ষেত্রে এ কথা কাদের সাথে মেলে, উল্লেখ নিষ্প্রয়োজন। নির্মম পরিহাস হল, অন্যান্য অর্থগুলোও তাদের সাথেই মিলে যায়!

কী বোঝা গেল? বোঝার আর কী বাকি থাকল?

একটা তত্ত্ব হল, ক্ষমতায় থাকা দল কখনওই চায় না তার শাসনকালে দাঙ্গা হোক। কেননা সেটা তার ব্যর্থতা বলে গণ্য হয়, নেগেটিভ পয়েন্ট স্কোরড হয়। আর উল্টোদিকে, একই উদ্দেশ্যে, বিরোধী দল চায় দাঙ্গা হোক। ঠিকই, তবে সব নিয়মেরই বিশিষ্টতা এবং ব্যতিক্রম থাকে। উদাহরণ, গুজরাট।

বিরোধীর যুক্তিতে বিজেপি বা হিন্দু সংহতির ক্রিয়াকলাপের ব্যাখ্যা মেলে। অবশ্য ওদের কাজের ব্যাখ্যা দেওয়াই বাহুল্য!
তবুও কিছু ক্রিয়াকলাপের কথা তো বলতেই হবে। আসছি পরে।

আগে দেখা যাক, তৃণমূলের বিশেষ আকুতিটা কী?

তৃণমূল রাখঢাক না করে ভোটের রাজনীতি করে। এই ভোটের জন্য যা করতে হয়, জাত, ধর্ম, গোষ্ঠীর মেরুকরণ, যা গোবলয়ে লালু-মুলায়ম-মায়াবতীরা এবং সারা দেশে বিজেপি দীর্ঘদিন চর্চা করছে, এ রাজ্যের তৃণমূলও সে পথের পথিক। সেই জন্যই ইদ্রিশ আলিরা সাংসদ, কপিল ঠাকুর-মঞ্জুল ঠাকুররা জনপ্রতিনিধি।

অসুবিধেটা সেই ভোটেই। ২০১৬-র বিধানসভা ভোটে বসিরহাটের তিনটে বিধানসভার মধ্যে দুটোই গেছে জোট প্রার্থী, অর্থাৎ সিপিএম আর কংগ্রেসের দখলে।

অনেক কিছুই পরিষ্কার হল।

যেমন এটাও পরিষ্কার যে বিজেপি তাদের ঘৃণ্য অ্যাজেন্ডা চালিয়েই যাবে। ভোজপুরী ছবির ধর্ষণদৃশ্যকে বাদুড়িয়ায় হিন্দু নারীর ‘ইজ্জতলুণ্ঠন’ বলে প্রচার থেকে কার্তিক ঘোষের লাশ নিয়ে কামড়াকামড়ি, সবই চলছে স্বভাবসিদ্ধ নির্লজ্জতায়।

কার্তিক ঘোষের ছেলে জানিয়েছেন, তারা এই নোংরামো চান না। স্বাভাবিক। কোনও সুস্থ মানুষই চান না।

ফলে সবচেয়ে স্পষ্ট, রাজ্যের রাজনীতি আজ আক্ষরিকভাবেই পাঁকে নেমেছে। এবং কারবারিদের উদ্দেশ্য সেই পাঁকের রং লাল করা।
ভুগছে সমাজজীবন, মানুষ।

সেই সমাজজীবন আসলে কেমন?

সৌভিকের গ্রাম মাগুরখালিতে বহিরাগত লুম্পেনদের হামলার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন ধর্ম নির্বিশেষে সাধারণ মানুষ। বাবলুর বাড়ির আগুন নিভিয়েছেন আমিরুল, মকসুদরা। (http://eisamay.indiatimes.com/…/ba…/articleshow/59466670.cms)

বসিরহাটের বর্মা কলোনিতে ঘরছাড়া ২৫০ মানুষকে নিজের হাতে খিচুড়ি রেঁধে খাওয়াচ্ছেন অসীম-কওসররা।(http://www.anandabazar.com/…/giving-shelter-to-pregnant-wom…)

ফরিদ-গোপাল-ইয়াসিন-বাবু-আসলাম-সলিল। দেগঙ্গা-বেড়াচাঁপার এই বাসিন্দারা মিলে খেদিয়ে দিয়েছেন অশান্তি ছড়াতে আসা অবরোধকারীদের। বলেছেন, “আমরা দেখেছি এই হানাহানিতে কারও লাভ হয় না। রামের পুড়ে যাওয়া বাড়ির চাল রহিমকেই ছাইতে হয়। আর রহিমের খেতের আনাজ হাটে পৌঁছতে ভরসা রামেরই ভ্যান।” (http://www.anandabazar.com/…/people-of-deganga-lifted-the-b…)

অতএব… বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি.. এখনও। একটু সামলে চলা ভালো…

 

2 Comments

  1. খুব ভালো বিশ্লেষণ। মূল জায়গাটা স্পষ্ট দেখানো হয়েছে। এটা প্রয়োজন ছিল

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*