দুর্জয় আশরাফুল ইসলামের কবিতা

সন্ধ্যা বন্দনা

 

অবসন্ন সন্ধ্যা। রঙিন বাতির স্বরাজ। স্মৃতিঘোর হৃদয়।
গতদিনের কথা প্রিয়, বৃষ্টি হলো খুব। যেন ভাসে তল্লাট।
আমাদের কাগজে নৌকা নিশ্চিহ্ন। যৌথ চিন্তার দীনতা।
আমাদের ভিজে ছড়া আর নেই। কাগজ ধুলোয় মরা।
আমাদের কাদাছিটে জামা। সোঁদাগন্ধ মোড়ানো আদর।
তুমি কি দেখতে পাও এখন, উড়ে বেড়ানো পাখি বহর?
অবসন্ন সন্ধ্যা। নিভু নিভু মোমের আলো। ঝড়ঝাপটানো।
আরেক দিনের কথা প্রিয়, আকাশ এমন শান্ত সুন্দর।
মেঘে মেঘে জড়িয়ে থাকে তখন। আমাদের স্পষ্ট দূরত্ব।
বাতাসে সুর অবিরত বাজে। আমাদের না-থাকা আঙুল।
আমি লিখি রৌদ্রছায়ার গল্প। আমি লিখি পতনোন্মুখ।
তুমি তখন অন্য আলয়। অন্য রকম ভাষার সন্ধানকারী।
কেউ কি কোন দিন দেখতে পায়, বুকের ভেতর হুলস্থূল!
অবসন্নতা কিছু নয়। তুমি কিছু নও। সন্ধ্যাকাল শাশ্বত।
পৃথিবী প্রকৃত জল রঙ মতো, যা দেখতে চাও সে মতো

 

বেদনাসূত্র

 

(ক)

আমি তার উৎকণ্ঠারে প্রাণভরে উপভোগ করি। যখন সে শঙ্কায় মুখ করে কালো, আমি তখন সুনীল আকাশ দেখি, আকাশে একটি ঈদরকম চাঁদ। আমি তার উদ্বিগ্নতা নিয়ে সে আকাশতলে খেলি। আর বলি, একটু অন্য কারো হোক, আমার আর কত, আমার তো বয়স বাড়লো উৎকণ্ঠায় অব্যাহত। আমি এইরকম আনন্দ নিয়ে আড়াল আসি, ভাবি উদযাপন আরেকটু অতিরিক্ত হোক। দেখি বিষণ্ণতা ফিরে আসে উলটো আমার দেশে, আমি অন্য মুখের আড়ালে তার মতো হই, আমি এইবার হারানোর কষ্টে ভুগি। দেখি বুকের গহন আমার, পাতায় পাতায় লিখে তার জন্য একশো রকম বেদনা!

(খ)

যে জানে ভিতর বাহির তাকেও আমি পাশ কাটাই। আর নিজেকে বলি, পৃথিবীর চক্রাধারে কত কি আশ্চর্য ঘটে! হিম আধিক্যের দেশে যেমন মধ্যরাতের সূর্য খেলে গভীর নিঝঝুমে, তেমন কোন রহস্য আলোক চুপটি মেরে বসে আছে কোথাও, গোপনীয়তার অনন্ত ধামে পাশ কাঁটাই আর বেঁচে থাকি, যেহেতু ধীর লয় ছুটে চলা পথও কোনভাবে স্বীকৃত, মিথ্যে নয়। যেহেতু অনন্ত নক্ষত্র ভিড়ে বীক্ষণ যন্ত্রে ধরা কীট, সেও জেনেছে জীবন এক হেঁটে চলা মাঠ, অনাশ্চর্যেও হেঁটে যেতে হয় আশ্চর্যের লোভে, যে জানে অতি সামান্য তাকেও অতিক্রম করতে হয় একই অনুষঙ্গ রেখা নিশ্চিহ্নের পথে …

 

স্বপ্নের কথা

 

জলজ্যোৎস্নার স্বপ্ন দেখে কত রাত নির্ঘুম কেটেছে, কতরাত ঘুমের পর পৃথিবীর শেষ স্থলপথ তাড়িয়ে নিয়ে গেছে জাগ্রত বোধকে আগলে বেড়ে ওঠা শয়ন সঞ্চয়নের ক্যানভাস!

এইসব স্বপ্নের কথা ভাবি, ধূলিঝড় ঝঞ্ঝার মতো আমাদের মুহূর্তকাল আঁচড় কেটে রেখে যায় ভাঙন চরে, পৃথিবীর শেষ গান চিত্রিত হতে পারে এখানে কোথাও এরকম ভাবতে ভাবতে আমরা গায়ে মাখি আবছায়া শাদা ঘন অন্ধকার!

সন্ধিক্ষণ প্রকৃতার্থে কোথায়, সহজ কবিতার দুষ্প্রাপ্যতার ন্যায় আমাদের চোখ চিরদিন পেয়েছে ব্যর্থ মনোরথের অধিবাস। আর খিলখিল হাসি উড়ে আসে ভিনগ্রহ দূরত্ব অতিক্রম করে, তাদের প্রাচুর্যের পথ কেন আগলে রেখেছে ভুঁইফোড় সীমান্ত

কোনদিন যদি জানতে ইচ্ছে করে, তাদেরও থাকে কি না জলজ্যোৎস্নার স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা পুঞ্জীভূত কোনো, আমরা কি ধাবিত হবো হাওয়ায় ভাসা কোন নৌকোর খোঁজে, মাস্তুলে যার ঐশ্বর্য রূপ, অনুবাদ জ্ঞান!

 

ভেসে যায় সে এক

 

সে পৌরাণিক অববাহিকার মতো, পৃথিবী জন্মেই পেয়েছে স্রোত
নিরবধি বয়ে চলা। পেয়েছে সর্বনাম, আদরিণী প্রিয়তমার মতো
ঈশ্বরী জন্মের বহুকাল আগেই হয়েছে সে ঈশ্বরী, অপার মমতায় 
চতুর্দিকে সে ছড়িয়েছে বিন্দু বিন্দু জল, কুয়াশা দিনের প্রশস্তি ; 
তার বিচরণ সর্ব ঋতুতে, ষড় বৈচিত্র্যের অধিক কোন রহস্য দেশ
জন্মাবধিই তাঁর স্তুতি লেখা হয়ে আছে প্রণয় আর প্রার্থনার বেশ ; 
স্তব্ধ রাতে বাঁশি ঠোঁটে কত দেবতারা হয়েছে প্রেমিক তাঁর তীরে 
কত ধ্যানী ভাবতে ভাবতে হারিয়ে গেছে অদৃশ্য জনতার ভিড়ে 
এইসব লিখি আমি, অন্তহীন ভাবনা আরো ঘিরে থাকে তাঁকে ঘিরে
সে কি মানবী ছিলো কোনোদিন, উদাত্ত আহ্বানে একা হৃদয়নীড়ে 
ছিলো কি তাঁর ব্যাকুল স্পর্শ মন, এতশত সামষ্ঠিক মুগ্ধতার পরে 
নৈঃশব্দ্যের আড়ালে কার হাঁসি আসে, নক্ষত্রমণ্ডল দেখি যায় ভেসে

 

দূরত্বের গান

 

মাকড়শার ঘরবসতি দেখে মনে পড়ে যাযাবর চিরকাল 
বাতাসে দোল খাওয়া শয্যা যেন বহুদূরের সমুদ্র সকাল;

কপালে সিঁদুর মেখেছো যদি ইঙ্গিতবাহী সীমান্ত প্রাচীর 
দৌড়িনি তো অল্প আমি জীবন দেখিয়েছে অনাবশ্যক ভিড় ;

এইবার ক্ষান্ত বেলায়, মিছেমিছি অবসরে আকাশ গুনে
দেখি আরো দ্রুত তেড়ে আসে বর্ষাকাল পৃথিবী প্রাচীরে ;

ভেসে যায় পিপীলিকার গুহাবাড়ি, জলে মেশা লঘু বাতাসে 
ভাসমান সব রূপসী লাগে কেবল, ঈশ্বরীর চিত্রিত ক্যানভাসে!

 

 

ছবিঋণ – ইন্টারনেট

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*