জলপথ

সাধন দাস

 

–মাটিয়ারি যাব, বাসস্ট্যান্ড কোন দিকে?

সে আবার কোন দেশরে! দু’জন আকাশ থেকে পড়লেন। মুখ চাওয়াচায়ি করলেন। ঠোঁট উলটে ইশারায় চোখ কপালে তুলে  জানালেন, ভ-জা। মানে ভগবান জানে। তৃতীয়জন বুদ্ধি খরচ করে চায়ের দোকান দেখিয়ে আঙুল তুলে দিলেন। সামনে ঝাঁপতোলা দরমার খুপরি। চায়ের দোকান। পিছনে ডোবা, আশপাশে ঝোপ-জঙ্গল। আমি নিশ্চিত, ওই ডোবা জঙ্গল পেরিয়ে মাটিয়ারি যাওয়া যাবে না। তবে আঙুলের মাথায় দোকানিকে পেয়ে চায়ের অর্ডার দিলাম। বিনি পয়সায় উত্তর মিলছে না। যদি চায়ের দামে মিলে যায়।

-–মাটিয়ারি চেনেন?

দোকানির মাথা ঝুঁকিয়ে দিয়েছি। বেচারি! চুল থাকলে দু’এক খামচা তুলে ফেলত। কপালে টোকা মেরে মুঠো থেকে বেরিয়ে আসা তর্জনী আমার মুখের সামনে ছুড়ে দিয়ে বললেন-– ওঃহো, মেটিরি! তা-ই বলেন। যাবেন নাকি! এমন ঘাব্‌ড়ে দেন। তা যাবেন কী করে? বাস খুব ঘনো ঘনো, এঁ হেঁ হেঁ,  আজদুকুরে কালদুকুরে আজদুকুরে কালদুকুরে।

–মানে?

–সেই দেড়খানায়।

–মানে?

–বুইলেন না? সেই দুপুর দেড়টায় তিনি আবিব্‌ভাব দেবেন। নাও দিতে পারেন। বসেন, আরাম করেন, ডাল-ভাতে ভাত চাপিয়ে দিচ্ছি। নগদ আড়াইটাকা দেবেন। পাতা পোস্কার করে খেয়ে আঙুল চেটে, ঢেঁকুর তুলে বাস ধরবেন। পারলে বেঞ্চিতে গড়িয়ে নিন। বাস মাতাঠাকুরাণি না এলে আবার কাল দুপুর দেড়টায়। ভয় কি? আমি তো আছি।

পথে দেহ রাখতে রাখতে চোখের পানি ফেলতে ফেলতে ঢকাৎ ঢনাৎ বাজতে বাজতে তিনি এলেন। বিকেল কাত হওয়ার আগে দয়াবতী বাস মাতাঠাকুরাণি নাচতে নাচতে এবং কুঁততে কুঁততে পৌঁছে দিলেন সাধের মেটিরিতে। নাঃ, যতটা ভয় পেয়েছিলুম, ততখানি নয়। মেটিরির আকাশ ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের মতই উদার। ঢঙ ঢঙ, ঢনাৎ ঢনাৎ শব্দে বাতাস মুখরিত। আদ্যিকালের এক জমিদার বাড়ির উঠোনে বাসল্যান্ডিং টার্মিনাস। উঠোনের জমাটবাঁধা ঘাসের মধ্যে দিয়ে সরু পায়ে চলা পথ গিয়েছে চৌকো চৌকো পাথর বসানো জমিদারি আমলের ভেঙে পড়া রাস্তায়। মাটির রাস্তা বললেই মানায়।

ব্যাঙ্ককর্মচারী হয়ে এসেছি। এখন এ গাঁয়ের পথই আমার পথ। চলতে শুরু করি।

দিন-রাত ঢনাঢ্‌ঢন আওয়াজ, নিশব্দ চলাচল, মনে হচ্ছে, মেটিরি কল-কারখানা পূর্ণ গ্রাম। ময়লা পোশাক, রোগা, আধমরা শ্রমিকেরা, পথ চলে নিঃশব্দে। দ্রুত। কেঊ কারও দিকে তাকায় না। একজনকে ইশারায় ডেকে জিজ্ঞেস করলুম-– পিটুলিতলা কোন দিকে?

অবাক, যেন পিটুলিতলা কেউ যায় না। মুখের দিকে তাকিয়ে বললে-– জামাইপাড়া?

বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করলুম-– জামাইপাড়া!

উত্তর দিল– কাঁচা পেতল।

বলে হনহন করে চলে গেল। বুঝলুম, কালার পাল্লায় পড়েছিলুম। আর একজনকে শুধালুম-– যাচ্ছ কোথায়?

সে উত্তর দিল– ভাঙরি।

মজা পেয়ে জিজ্ঞেস করলুম– মাথায় কী?

–পিটুলিতলা।

এও আর এক কালা। পিটুলিতলা যাচ্ছে। অগত্যা আমিও মধুসূদন, উহার পশ্চাদ্দেশ শরণ নিলুম। বুঝলুম, এক কালার দেশে গতি হয়েছে। ট্রান্সফার কর্তার দয়ায় এখানে বাস করতে হবে আমাকে। এদের সাথেই চলতে হবে। ইচ্ছে ছিল, গল্পে গল্পে ভেসে যাব তা নয়, মুখের ঠোঁটে দাঁড়িয়ে থাকা গল্পের ভীষণ ইচ্ছে গিলে ফেললাম। শেষে ধান শুনতে গান শুনবে। ‘রবিবাবুর বাড়ি কোথায়?’ জিজ্ঞেস করলে, ‘কপি খাবার হাঁড়ি সাঁটায়’ বুঝবে। ডেকে বিপদ আনার ইচ্ছে নেই, মুখে কুলুপ এঁটে পিছু নিলুম। পৌঁছে রবিবাবুর বাড়ি খুঁজে নেব।

সংক্ষেপে, এই হচ্ছে আমার মেটিরি প্রবেশের ইতিকথা।

ছাদে, চাঁদের আলোয় নাতিকে কোলে বসিয়ে ‘নুন দিয়ে তারা সাঁচি পান সাজে/চুন দেয় তারা ডালনায়’ রবিঠাকুর শোনাতে খুব মজা লাগে। নাতি যখন একরাশ চুন খেয়ে-মেখে, চুন-পোড়া যন্ত্রণায় ছটফট করে দুনিয়ার রাগ গিয়ে পড়ে অগাচন্দুরে ছেলের ঘাড়ে। রাগে গরগর করছিলেন। নতুন অফিস, কাজ বুঝে নিতে হচ্ছে। ফিরতে রাত হয়ে গেছে। বাবা সেই সুযোগে যা নয় তাই ঝাড়ছেন আমাকে–

–ভূ-ভারতে লাট-বেলাটরাও এত রাত করে বাড়ি ফেরে না। অফিস করা শেখাচ্ছেন।

হাঁপানির রুগি। পান থেকে চুন খসলেই বাড়ি মাথায় করে তোলেন। বিদেশ বিভূঁই, নতুন অগাছালো সংসার, কিছুই হুঁশ করেন না। আর হাপরের মতো হাঁফাতে থাকেন। অচিন দেশে একা না বোকা, বউ দু’জন রুগিকে সামলাতে নাজেহাল। এক হাতে ছেলে কোলে নাচাচ্ছে, অন্য হাতে শ্বশুর ম’শায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে আপ্রাণ বোঝাবার চেষ্টা করে চলেছে—

-–চুনের হাঁড়ি খাটের নীচে অনেক ভিতরে রাখা ছিল।

ঘরে ঢুকতেই রবীন্দ্রনাথের চুন মাথায় আগুন হয়ে জ্বলে উঠল। ডাক্তারবাবু বারণ করেছেন, পান খাবেন না। শ্বাসকষ্ট বাড়বে। জোরে বলার তাগদ নেই। মনে মনেই জপ করলুম, সেই পান খাবেন আর অনাসৃষ্টি কাণ্ড বাধাবেন। আদরের বৌমাকে কিছু বলবেন না। যতদোষ নন্দঘোষ আমি। ওদিকে বউয়ের কোলে ছেলে তারস্বরে চিৎকার করছে আর দাপাচ্ছে। বুঝতে পারছি, পাতলা চামড়ার কচি মুখ, পোড়ার জ্বালায় তছনছ করে দিচ্ছে। কী করব দিশেহারা মুহূর্ত। অফিসের ব্যাগ নামিয়ে ছেলেকে কোলে নিলাম। অবুঝ শিশু ভাবলে বাবার কোলে মধু আছে। ঝাঁপিয়ে এল। জ্বালা জুড়োবে। বউকে মুখের ভিতর আঙুল দিয়ে চুন সব বের করে দিতে বললুম। বউ বলল— দিয়েছি।

বললুম-– জল দিয়ে মুখ ধুয়ে দাও।

বউ বলল-– দিয়েছি।

ইশারায় বললুম, বুকের দুধ দাও।

ইশারায় উত্তর দিল, দুধ নিচ্ছে না। মুখ পোড়াচ্ছে।

বাবা হাঁফাতে হাঁফাতে বললেন-– মুখে মধু দাও, বৌমা।

বউ ঘাড় হেঁট করে দাঁড়িয়ে রইল। বুঝলুম ঘরে মধু নেই। বুদ্ধি শেষ। জ্বালা-পোড়ায় ছেলে যা ছটফট করছে, চোখে সহ্য হচ্ছে না। খুব কষ্ট পাচ্ছে। এখনই ডাক্তার দরকার। বিদেশ না বিপাক। কাউকেই চিনি না। মহা মুশকিল।

কোয়ার্টারের গায়ে একঘর কর্মকারের বাস। যেতে আসতে ঢকা-ঢাঁই শুনি। চেঁচামেচি কান্নাকাটি শুনে কামারকাকা দরোজায় এসে দাঁড়িয়েছেন। বুকে জল এল। জিজ্ঞেস করলাম-– কাকা, কী করি? ভিতরে আসেন।

কাকা মাথা চুলকে বললেন— ডাক্তার তো নেই। তবে এক হোমিও আছেন জামাইপাড়ায়।

নিরুপায়ের মতো জিজ্ঞেস করি-– হঠাৎ অসুখ-বিসুখে আপনারা কী করেন?

কাকা নির্বিকার উত্তর দিলেন-– কী আর করি? এ ভাবেই বেঁচে আছি। এইতো গতবর্ষায়, রাতে কামারশালায় শুয়ে আছি। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি হচ্ছে। কিসে কামড়ালে বুঝতে পারলাম না! বিষজ্বালায় জ্বলছে। হেরিকেনের আলোয় দেখি, মশারির পাশের দেওয়ালে সাপের ছায়া। এঁকে বেঁকে চলে যাচ্ছে।  নির্ঘাত সাপে কামড়েছে। কী করব? ভয়ে চেঁচামেচি করলাম। বউ ছেলে মেয়েরা এল। পায়ে বাঁধন দিলে। বুকে হাঁটু দিয়ে বসে থাকলাম সারারাত। হাতের কাছে এক বান্ডিল বিড়ি ছিল। তামাকে বিষ আছে। বিষে বিষক্ষয় হবে ভেবে বিড়িগুলো চিবিয়ে খেয়ে একগেলাশ জল খেয়ে, ভগবানের নাম নিয়ে শুয়ে পড়লাম। ঘুম ভেঙে সকালে দেখি দিব্যি বেঁচে আছি। বউ বললে-– সাপ নয় কালিবিছে। হেরিকেনের আলোয় ছায়া লম্বা দেখাচ্ছিল।

গল্প শুনলে আমার চলবে না। –কাকা, এখন কী করি?

কাকাই একজনকে জোগাড় করে দিলেন যার মটরবাইক আছে। কোথায় যাবে, কী করবে সে জানে না।

বললুম-– জামাইপাড়া। হোমিওপ্যাথ ডাক্তার।

ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে ভাগীরথীর বাঁধ ধরে চললুম। ফটফটফটফট। অন্ধকারে, শূন্যতায় সাইলেন্সার ভাঙা মটরবাইক ছেলের আর্তনাদকে বাড়িয়ে নিয়ে হাহাকার করে চলল। বাঁদিকে ভাগীরথী। রাত্রি মাখামাখি, বিস্তীর্ণ জলদৈর্ঘ্য। যেন কালো পিচবাঁধানো রাস্তা পড়ে আছে। জন-মানব শূন্য। পথচারী হীন। অব্যবহৃত। ওপারে কাটোয়া শহর। হাসপাতাল। বারো-তেরো কিলোমিটার পথ হবে, ডাক্তার ছড়াছড়ি। পথটুকু পার হতে পারলেই খোকা সুস্থ হয়ে যায়।  কষ্টের জ্বালা থেকে বাঁচে। কিন্তু হওয়ার নয়। নিপথ জলরাশি। সারাদিনে দুটো মালবাহী নৌকো ছাড়ে মেটিরি থেকে। সকাল সাতটায়,  আর একটা সকাল আটটায়। ফেরে সন্ধে সাতটা/সাড়ে সাতটায়। আর কোনও যোগাযোগ নেই। মেটিরির সমস্ত ভরণ-পোষণ সুস্থতা-অসুস্থতা এভাবেই আসা-যাওয়া করে।

মটরবাইক ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে গেল। অন্ধকারে ডুবে আছে ডাক্তারের পোড়োবাড়ি। হাঁকাহাঁকি করে ছেলেটিই ডাক্তারবাবুকে ডেকে তুলল। খুপরি জানালা খুলতেই যেন একযুগ। মশারি তুলে মটমটে পাল্লার ফাঁকে উঁকি দিলেন এক খুনখুনে বৃদ্ধ, তার হাতে ঝুলে আছে, সাতজন্মের কালিপড়া একটা ছোট্ট হেরিকেন। শুনে মনে হল, মুখে একটাও দাঁত নেই। খলবলে আওয়াজ করে বললেন-– রাতে দেখতে পাই না। তুমি বাবা কাল সকালে এসো।

কাকুতি-মিনতি করে বললুম— শুনছেন তো, ছেলেটা কেঁদে কেঁদে এলিয়ে পড়েছে। আর কাঁদতেও পারছে না। যন্ত্রণায় ছটফট করছে।

অনেক ভেবেচিন্তে বললেন-– তাহলে বাছা, বাড়ি গিয়ে খানিক নারকেল তেল দিয়ে মুখের ভিতরটা মেজে দাও। বোধ হয় নরম পড়বে।

–পেটের অসুখ করবে যে।

জানালা বন্ধ হয়ে গেল।

আবার ফটফটফটফট। ফিরে চললুম। যেতে যেতে যুবকটিকে জিজ্ঞেস করলুম-– তোমাদের বাড়িতে মধু আছে?

–হ্যাঁ দাদা, একদম চাকভাঙা মধু।

যুবকটির বাড়িতেই খাইয়ে দিলুম। ছেলে কষ্টে-যন্ত্রণায় বুকের মধ্যে নেতিয়ে পড়েছে। আর কাঁদছেও না। জোর করে খাইয়ে দিলুম। ছেলে ঘুমিয়ে গেল।

অজানা ভয়ে আমার ঘুম মাথায় উঠে বসল। অসুখবিসুখ নিয়ে বাস। চিকিৎসকহীন হাতুড়ে ধাতব কোলাহলে, বুড়ো, শিশু, নারী এই তিন অবলাপ্রাণী নিয়ে সংসার পাড়ি দিতে এসেছি। বাইরে বেরুলে স্বস্তি নেই। ঘরে ফিরলে কী দেখব কী জানি? উঠতে বসতে খেতে শুতে ভয় আমাকে তাড়িয়ে নিয়ে চলল।

ছুটতে ছুটতে এসেও খেয়াঘাটে গড়াগড়ি। প্রথম নৌকো বেরিয়ে গেছিল। শেষপর্যন্ত দ্বিতীয় নৌকোর মাঝিকে চিরকুটখানা ধরাতে পেরেছিলুম। বাবার হাঁপানি ঠেকানোর ওষুধ। আনতেই হবে, গতকাল ফুরিয়েছে। যেখেনে বাঘের ভয় সেখেনেই সন্ধে হয়। পরশু রাতে বউ ওষুধের কাগজখানা পকেটে গুঁজে দিয়েছিল। গুঁজে দিলে কারও মনে থাকে? ভুলে গেছি। পরদিন সকালে ঘরেই অফিসের কাজ নিয়ে বসেছিলুম। কাজের ঘোর কাটিয়ে যখন মনে পড়ল, পড়ি কি মরি ছুটে এসেও দ্বিতীয় নৌকো ধরতে পারিনি। ঘাটে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ হাঁফিয়েছি, তবু বুক হালকা হয়নি। সকালের কুসুম রোদ্দুর এত ঠাণ্ডা আর নিষ্প্রাণ হয় তখন হাড়েহাড়ে বুঝেছি। বাবা এমনিতেই রাগী মানুষ। হুট করতেই চণ্ডাল। হাঁপানির টান উঠলে মাথার ঠিক রাখতে পারেন না। বাড়ি ফিরিনি ভয়ে। আগুন-জল গিলে বসে থাকবেন। সরকারি অনুগ্রহে চাকরি করি, সভ্যতার বে-নাগালে। বাবা বলেন, ভারতবর্ষের বাইরে। দ্বীপান্তর হয়েছে আমার।

বদ্ধ জলাশয়ের মতো কাঁসা-পেতলের কারখানাবহুল একটা ছোট্ট গ্রাম। পথ নেই। ঘাট নেই। ডাক্তার নেই, ওষুধ নেই। পড়াশুনোর পাটা-পাট নেই, রিক্রিয়েশান নেই, দিনে ঢঙ ঢঙ ঢনাৎ, রাতে বাংলামদ গিলে চিত-পটাং।

এখানে আসার সময় বাবা বাস পাননি। পাওয়ার কথাও নয়। একটা লরির পিছনে চেপে এসেছিলেন। টলটলায়মান লরির পাটাতনে এক গোয়ালার দুধের হাঁড়িতে উল্টে পড়ে আঘাত পেয়েছিলেন। বয়স্ক-বৃদ্ধ বলে ছাড় মেলেনি। নষ্ট দুধের দাম গুণাগার দিতে হয়েছিল। সে দোষে অভিযুক্ত হয়েই আছি। গেলেই ঝাঁপিয়ে পড়বেন। সাততাড়াতাড়ি অফিস গুটিয়ে নদীর ঘাটে এসে দাঁড়িয়েছি। সামনে তাকিয়ে আছি। কখন নৌকো ওষুধ নিয়ে ফিরবে। ধু ধু জল। দীর্ঘ জল-পথ। জল শুধু খেলা করে উড়ন্ত জলপিপি পাখিদের পায়ে। রাত যত হোক ওষুধ নিয়েই ফিরব। আমার মতো অনেকেই তীর্থের কাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।  দ্বিতীয় নৌকো ফিরতে রাত্রি সাতটা/সাড়ে সাতটা।

সন্ধে পেরিয়ে ঘড়ি রাতের দিকে গড়াচ্ছে। নৌকো ফিরছে না। বাঘের ভয় চেপে বসছে বুকের মধ্যে। ওষুধ খাওয়ার সময় সন্ধে ছ’টায়। সাড়ে সাতটা বেজে গেছে। এতক্ষণ টান উঠে গেছে। বাবা বিছানায় বসে হাঁপাচ্ছেন। বুকের হাপর ফুলছে, চুপসাচ্ছে। মুখ হাঁ করে নিশ্বাস নিচ্ছেন। সমস্ত শরীর অস্থিরতায় সামনে পিছনে দুলছে। নৌকো ফিরছে না। আমি বালি-মাটিতে পুঁতে তবু দাঁড়িয়ে আছি। দমবন্ধ। একজন যুবক আমার চেয়েও যন্ত্রণা দগ্ধ। দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ-জনের পাশ কাটিয়ে অস্থির পায়চারি করছে। ঘাড় হেঁট। ওর বুঝি বিপদ আরও বেশি। ওকে চিনি। মেটিরি বাজারে পান-বিড়ির দোকান আছে। স্বজন হালদার। জিজ্ঞেস করি–

–কী খবর?

–স্যর, ভাই কাটোয়া হাসপাতালে ভর্তি। মাঝে মাঝে যাই। ওর কাছে থাকি। এদিকে বাবা মা আছেন। দোকানটা খুলতে হয়। সবদিন যেতে পারি না। প্রথম নৌকোয় খবর এসেছে, অবস্থা ভালো নয়।

–স্বজল?

–হ্যাঁ স্যর, চেনেন!

–কী হয়েছে?

–মেটিরির অসুখ। সিরোসিস অফ লিভার।

বাচ্চাছেলে স্বজল। মিষ্টি ব্যবহার। হাতে ঘড়ি। চোখে গগল্‌স। চুল ব্যাকব্রাশ করা। জামা ইন করে পরে আমার কাছে এসেছিল, ব্যাঙ্ক এ্যাকাউন্ট খুলবে। বগলে ছোট্ট ট্রাঞ্জিস্‌টর সেট রেডিও। লেখাপড়া শেখেনি। গান শুনতে ভালবাসে। মৃদুস্বরে গান বাজছিল রেডিওতে। ধমক দিতে রেডিও বন্ধ করেছিল। ভোটার কার্ডে অচলিত নামের বানান আর বগলে রেডিওর জন্যে মনে আছে। বলেছিলাম-– তিনটে মাত্র অক্ষর। নিজের নামটা লিখতেও শেখোনি। যাও, নাম লেখা শিখে তবে আসবে।

লজ্জা পেয়েছিল। বলেছিল-– হ্যাঁ স্যার, তাই আসব।

হাতে ধরে নাম লেখা শিখিয়েও ছিলুম। বলেছিলুম-– লিখতে লিখতে সরে আর মদ গিলতে গিলতে মরে।

ওর মুখ দিয়ে বাংলা মদের গন্ধ বেরুচ্ছিল।

স্বজন বলছিল-– স্যার, এখেনে হাতুড়ি পিটলেই পয়সা। অভাবে পয়সার স্বাদ পেলে কে আর বই পড়ে! মালিকেরা কারখানার গায়েই খুলে রেখেছে বাংলু, চুল্লুর ঠেক। কারখানা থেকে মজুরি নিয়ে বেরোও, আর ভাটিখানায় পয়সা ঢেলে গলা পর্যন্ত মদ গিলে বাড়ি যাও। পয়সা যথা হইতে আসে তথায় ফিরিয়া যায়। মাঝখানে ভাইটা আমার…

ওর গলা বুঁজে আসছিল কান্নায়। নদীর দিকে মুখ ফিরিয়ে বলল-– দেখবেন স্যর, আজ হোক, কাল হোক, ও মরবে। বাঁচবে না। ডাক্তারবাবু বলেছিলেন, একটা খারাপ খবরের জন্যে রেডি থাকতে। আমি তো রেডি আছি।

বলতে বলতে, অন্ধকারেও বুঝতে পারছি, একটা দশাসই যুবক কেঁদে ফেলেছে। কান্না জড়ানো গলায় বলছে-– ঘরে বুড়ো বাবা মা। তাঁদের কী রেডি রাখব বলুন তো?

–জানো স্বজন, স্বজল আমাকে বলেছিল, স্যার, এবার আমি ভালো হয়ে যাব। শুধু এই ফর্মটা ভরে দিন। নাম লেখা ঠিক শিখে নেব। দেখবেন, এ্যাকাউন্টে রাশ রাশ টাকা জমাব। স্বজন, আমি এ্যাকাউন্ট খুলে দিইনি। সই করাটা শুধু শিখে আসতে জেদ ধরেছিলুম।

অনেক দূরে ঝাপসা, আলোর বিন্দু দেখা গেল। নৌকো আসছে। বাতাসেরও আড়াল হয়। আলোর বিন্দু দুলছে আবার অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে বাতাসে। কিন্তু নৌকো আসছে। সোঁতের গায়ে আসছে। তবু এত দেরি করছে কেন? রাত ন’টা বাজে। অস্থির লাগছে। বাবা এতক্ষণ বাড়ি মাথায় করে তুলেছেন। বউটা দিশেহারার মতো ঘরবার করছে। হয় নুনজল গরম করে খাওয়াচ্ছে, নয় বুকে তেল মালিশ করে দিচ্ছে। নয়… জানি না কী করছে। খোকা, ওইটুকু দুধের বাচ্চা সেও জেনে গেছে, এ সময় দাদাইয়ের খুব কষ্ট হয়। সেও আষ্টেপৃষ্ঠে দাদাইকে জড়িয়ে রাখতে চায়। আর বাবা অসহ্য রোগ যন্ত্রণায় প্রাণপ্রিয় নাতিকেও ছিটকে ফেলে দেন। অবুঝ নাতি হাউমাউ করে কাঁদে। চোখের সামনে ভাসছে, হাপরের মতো বুকের প্রাণপণ ওঠানামা। আর ঠিকরে বেরিয়ে আসা চোখ। ভয় হচ্ছে হার্টফেল না করে যায়!

স্বজলকে ডাক্তার জবাব দিয়েছে। যে ক’দিন বাঁচে বাড়িতেই সাধ-আহ্লাদ নিয়ে বাঁচুক। হাসপাতাল থেকে গুছিয়ে-গাছিয়ে আনতে গিয়েই যত গোল, যত দেরি।

ফিরলুম রাত দশটায়। ঢোকার গেটে দাঁড়িয়ে শুনলুম, সারা বাড়ি জুড়ে হাঁপানির শব্দ। বুকের সাথে গোটাবাড়ির বাতাস ওঠানামা করছে। সাঁ সাঁ শব্দ টের পাচ্ছি। মনে হচ্ছে, শ্বাস উঠে গেছে। হাঁপানি রুগিদের হার্ট খুব শক্ত হয়। এখনও খাঁচায় আটকে আছে, গা বেয়ে ঘাম ছাড়ল, ছেড়ে যায়নি। এলিয়ে পড়েছে দেহ। কিছু বলার ক্ষমতাও নেই।

হতাশ বউ কান্না ভুলে পুঁটুলি পাকিয়ে বসে আছে ঘরের কোণে। বিদেশ-বিভূঁই জায়গা। সান্ত্বনা দেওয়ার মতো কাঊকে খুঁজে পাইনি। ছেলেটা একা একা ঘরের মেঝেতে ঘুমিয়ে কাদা। বাবা আমাকে দেখলেন। তাঁর হাড়সর্বস্ব মুখের কোটরে ঢুকে যাওয়া বিস্ফারিত চোখ যেন জ্বলছে। আমাকে ভস্ম করে দেবেন। প্রাণের সমস্ত শক্তি জুটিয়ে ফ্যাঁসফেসে তীব্র নিভু গলায় বললেন-– আমি জানতাম, তুই এটাই চাইছিস। আমাকে মেরে ফেলার প্ল্যান। সম্পত্তি হাতাবার ফন্দি। তোর মতো ছেলে থাকলেই বা কি, গেলেই বা কি? বাবার ওষুধ যোগাড় করার মুরোদ নেই, ব্যাঙ্কের অফিসার হয়েছেন। দূর হয়ে যা সামনে থেকে।

মাথা হেঁট করে ছিলুম।

ফার্স্ট বাস ছাড়ে ভোর পাঁচটায়। তখন অন্ধকার। বৌমা আর নাতিকে নিয়ে বাবা চলে গেলেন। বলে গেলেন-– এ দেশে মানুষ বাস করে? ছুঁচো, বেড়ালের দেশ। ঠিক হয়েছে, দ্বীপান্তরের শাস্তি তুই ভোগ কর। তোর মতো জানোয়াররাই বাস করে এই জঙ্গলে। যেমন কুকুর তেমন মুগুর।

মানুষজন ভরা বাসের মধ্যে দাঁড়িয়ে বাবা বকবক করেই চলেছেন। আমাকে, মাটিয়ারিকে গাল পেড়ে কিছুতেই আশ মিটছে না। লজ্জায়, দুঃখে, কষ্টে বাসস্ট্যান্ডে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইলাম। কুয়াশাময় পথে বাস ছেড়ে গেল।

মাটিয়ারি এক রহস্যময় গ্রাম। ঘুরপথে একা একা বাঁধ ধরে ফিরছি। কুয়াশায় ডুবে আছে নদী। শিশিরে ভিজেছে পথ। দূরে নদীর চরে চিতা জ্বলছে। পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে কেউ চলে গেল। বহুদিন মাটিতে পা রেখে হাঁটিনি। সেই আপশোষে, চটি খুলে হাতে নিলুম। শিশিরভেজা বালির স্পর্শ আমাকে মসৃণতা দিল, মুগ্ধ হলাম। ইচ্ছে হল, নদীর চর বরাবর হাঁটি। মৃত মানুষের উদ্দেশে খালি পায়ে হাঁটতে হয়। আমার পা মুক্ত হয়েই আছে। চিতার আগুন লক্ষ করে হাঁটতে শুরু করি।

মনে পড়ে, বরানগরের ঘরে একটা ক্যালেন্ডার ঝুলত। সেখানে ভগীরথ শঙ্খ বাজিয়ে গঙ্গা আবাহন করে নিয়ে চলেছেন। ভগীরথের সে কী তেজোদ্দীপ্ত উর্ধ্বমুখ ভঙ্গি! আমাদের ছোটবেলায় সে ছবির মাহাত্ম্য ফুটিয়ে তুলতেন বাবা। বলতেন, সগরমুনির আশ্রমে ভগীরথের ষাটহাজার পূর্বপুরুষ অভিশাপে ভস্ম হয়ে পাপ-বন্দি ছিল। গঙ্গার স্পর্শে তাঁদের শাপমুক্তি ঘটে।

এই সেই নদী, বহে গেছে সগরমুনির আশ্রম স্পর্শ করে। নদীর চর বরাবর যতদূর চোখ যায় তাকিয়ে আছি। ভগীরথ এই পথে গিয়েছেন। তাঁর সেই তেজোদ্দীপ্ত গতি, ঊর্ধ্বমুখ শঙ্খবাদনের ভঙ্গি, এমন কী শঙ্খের ধ্বনি পর্যন্ত মনে পড়ে যাচ্ছে। পরিত্যক্ত চিতার কাছাকাছি  নিচু হয়ে ভাগীরথীর কুল স্পর্শ করি। দেখা হল, স্বজন হালদারের সাথে। স্বজল কাল রাতেই মারা গেছে। ওরা পুড়িয়ে জন্ম-অস্থি ভাগীরথীর স্রোতে ভাসিয়ে ফিরে যাচ্ছে।

মৃত্যু মানুষকে স্লথ, স্থবির করে দেয়। অথচ সাদা উত্তরীয় গায়ে, লম্বা লম্বা পা ফেলে বাড়ির পথে হাঁটা ধরেছে স্বজন।  পিছিয়ে পড়ছে বাড়ির লোকজন, হুঁশ নেই। যেন হুতোশে টানছে ওকে। কোনও কথা বলছে না, তবু উঁচু-লম্বা, স্বজনের পাশে বেঁটে আমি ছুট-পায়ে। তার সাথে তাল রেখে চলার চেষ্টা করছি। কেন করছি জানি না। স্বজন আমাকে টানছে। এ কোন মানুষ!  কাঁদছে না। সহানুভূতি চাইছে না, এক অসহায়, অস্থির, যন্ত্রণা যেন তাকে তাড়িয়ে চলেছে। আমার কোনও কথাই ওর কানে ঢুকছে না।

হতাশ হয়ে-– ব্যাঙ্কে দেখা কোরো, বলে, সঙ্গ ছেড়ে দিলুম। এই মুহূর্তে ওর একা থাকা একান্ত দরকার।

সেদিন অফিস গেলুম না। এক অসহায় আবেশ, আমাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। আমিও শোকগ্রস্ত। বাড়ি খাঁ খাঁ। কেউ কোত্থাও নেই। বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে আছি। খাটখানায় আড়াইজন মানুষ হেসেখেলে শুতে পারে। সেখানে আমি একা। শাখাপলা সোনার চুড়ি পরা দুখানা নরম পেলব হাত এইখানে পাশ ফেরে। রিনঝিন শব্দ হয়। নিরাবরণ দু’খানা নরম ধবধবে ঊরু, কবি কালিদাসের ভাষায় ‘কদলীস্তম্ভ প্রায়’ আমার কোমর জড়িয়ে রাখে। কচি কচি দু’খানা হাত, মাকে না পেয়ে আমার নাক মুখ হাঁচড়ে কামড়ে ছিঁড়ে দেয়। কাঁদে, চিৎকার করে। আমি কোথায় পাব তাদের!

মাঝ রাত্তিরে উঠে-– আমি দাদাইয়ের কাছে যাব।

সেই ঘুম চটকে দেওয়া একটানা নাকি সুরে ঘ্যানঘ্যানে কান্না আমি কোথায় পাব!

বিছানা ছেড়ে কী একটা যন্ত্রণায় উঠে বসি। অস্থির পায়চারি করি ঘরের মধ্যে। ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ি। নদীর ঘাটে স্বজনের গতিতে হাঁটতে শুরু করি ব্যাঙ্কের দিকে।

মাথার মধ্যে ঘুরছে, একটা মটরবোট-লোন যদি স্বজনকে ধরিয়ে দেওয়া যায়? ওর পক্ষে ভ্রাতৃহত্যার প্রতিশোধ সহজ হবে। এখনই সময়। ছেলেটা শোকে ফুটছে। ভগীরথের আনা জলে অভিশাপটা আর একবার স্বজনের হাতে মুক্তি পাক। কাটোয়া আসা যাওয়ার পথ অন্তত জল-সহজ হোক। মেটিরির ছাইভস্ম মানুষজনের মুক্তি হোক বা না হোক, আমার বাবা, আমার ছেলে, আমার বউ আর স্বজনের বাবা মা অন্য ভাইয়েদের অন্তত যোগাযোগের অভাবে মরা অত সহজ হবে না।

সবচেয়ে হিল্লে হয় এই নরাধম জানোয়ারের। যেটা কেউ জানবে না। কাটোয়া থেকে বাবার ওষুধ আনার ব্যবস্থা যদি করে ফেলতে পারি, বউ ছেলে আসার রাস্তাটা খুলে যায়। ছেলে, বাবা, বউ ছাড়া থাকা আমার পক্ষে অসম্ভব।

উত্তেজনায় ভুলে গেছি আজ ম্যানেজারবাবু রণিত দে অফিসে নেই। মিটিং-এ বেরিয়ে গেছেন। অকারণ অফিসে ঢুকলুম না। অস্থির পায়ে উত্তেজনায় অফিস বিল্ডিংকে ফালতু একপাক দিয়ে ঢুকে পড়লুম স্বজনের বাড়ি।

ম্যানেজারবাবু রণিত দে আমার রণিতদা, ঘরের মানুষ। মাটিয়ারির ইনফ্রাস্ট্রাকচারের র‍্যাডিক্যাল চেঞ্জ, কমুনিকেশন ডেভেলপমেন্ট, একটা বড় অ্যামাউন্ট অ্যাডভান্স মানে সুদ, মানে ইনকাম,  ব্রাঞ্চের প্রফিট বেড়ে যাওয়া, এক কথায় না হোক, আগডুম বাগডুম এলোয় পাক লাগিয়ে সাত কথায় রাজি করিয়ে ফেলব। অসুবিধে হবে না।

স্বজন গরীব মানুষ, সৎ, লোন নিতে ভয় পায়। ব্যাঙ্কের ত্রিসীমানায় ভেড়ে না। ওকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে মাথা ঝাঁকিয়ে ‘হ্যাঁ’ বলানোই একটা কাজের মতো কাজ। ওটাই করতে হবে। ঢোকার মুখে বাঁশের বেড়ার গেটটা উদোম খোলা। পেতল পেটানো বন্ধ। বাবা মা ভাই বোন সবাই বাড়িতে। তবু নিঃঝুম। খাঁ খাঁ। যেন কেউ কোত্থাও নেই। কোনও শব্দ নেই। ঢনাঢ্‌ঢন মাটিয়ারিতে বড্ড বেমানান। একটা ভুতুড়ে বাড়িতে ঢুকে পড়েছি। স্বজন এসে আমাকে নিয়ে গেল ওর ঘরে।

অনেক সময় খরচ করে, স্বজনকে শুধু রাজি নয়, ভায়ের মৃত্যুর প্রতিশোধের আগুনে টগবগে তাতিয়ে তবেই ঘরে ফিরলাম। আমিও স্বজনের মতো টগবগ করে ফুটছি।

রাতেই বাবাকে চিঠি লিখলাম।

শ্রী চরণকমলেষু বাবা,

আমার প্রণাম নিবেন। নদীপথ খুলিবার সবিশেষ উদ্যোগ লইয়াছি। আশা করি, অনতিবিলম্বে ডাক্তার, ওষুধ সমস্যার দ্রুত (অতি দ্রুত বোঝাইবার নিমিত্ত, অনতিবিলম্ব এবং দ্রুত) উপশম হইবে। এখানে বাস করা আপনার পক্ষে আর কষ্টসাধ্য হইবে না।

আপনি কেমন আছেন? আপনার বৌমা ও নাতির জন্য মন কেমন করে! উহারা নিশ্চই ভালো আছে? বৌমাকে আপনার প্রতি যত্নশীল রাখিবেন। আমি ভালো আছি।

ইতি,

শ্রদ্ধাবনত

দেবল।

বাবা চলিত ভাষাকে বলেন, চাঁড়ালের ভাষা। চাঁড়ালের ভাষায় চিঠি লিখলে কাগজ, কলম, কালি এমন কি আঙুল পর্যন্ত অপবিত্র হয়। চলিত ভাষায় লেখা বই পড়লে অখণ্ডনীয় পাপ হয়।

আর আমার চিঠিতে (ঔষধের পরিবর্তে ‘ওষুধ’ ইচ্ছাকৃত লেখা) গুরুচণ্ডালি দোষ পেলে উৎফুল্ল মনে বাবা গম্ভীর হয়ে যান। এই অপেক্ষাতে যেন ওৎ পেতে থাকেন। কারণ আমার লেখাপড়া শেখার পিণ্ডি চটকে ষষ্ঠীপুজো করতে পারবেন। ওষুধ আর ঔষধের ব্যুৎপত্তিগত চোদ্দপুরুষের তফাৎ বোঝাবার জন্যে গুরুচণ্ডালি দোষ নোটবুকে খোদাই করে রাখবেন। অধমের অজ্ঞানতা, দোষ, এবং বাঁদরামির সংখ্যা তাঁর নোটবুকে যত বাড়বে, বাঁদরকে মানুষ করার বাসনা তত প্রবল হবে, ফলশ্রুতিতে এখানে আসার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে।

সেই সম্ভাবনায় সুড়সুড়ি দেওয়ার চেষ্টা করছি মাত্র। শুনেছি, প্রেমে এবং যুদ্ধে কোনও কৌশলই পাপ নয়।

কিন্তু কাকস্য পরিবেদনা। চিঠির কোনও উত্তর নেই।

খোকার হাতে কাগজের নৌকো ভাসানো নয়। কী করে কী করে গাঁ-জুড়ে জানাজানি হয়ে গেছে। স্বজন হালদার মটরবোট ছাড়ছে ভাগীরথীতে। ব্যাঙ্ক তাঁকে লোন দিচ্ছে। দিনের আলোয় ভারতবর্ষের মধ্যে ঢুকে পড়বে মাটিয়ারি। কী সাংঘাতিক, মহামূর্খ আমি, ভীমরুলের চাকে ঢিল মেরেছি! গাঁ জুড়ে কানাকানি, গুজুর গুজুর, ফুসুর ফুসুর, গোপন বৈঠক। মেটিরি গাঁয়ের আব্রু যায় যায়। নিরাপত্তা বিলিয়ে দেওয়া হচ্ছে। যখন তখন পুলিশ ঢুকে পড়বে। সোনার মাটিয়ারি ধুলোয় মিশে যাবে। সর্বনাশ! ঢঙ ঢঙ ঢনাৎ বন্ধ। মানে মুখের ভাত কেড়ে নেওয়া, পেটে লাথি। বেকারে ছেয়ে যাবে। চুরি, ছ্যাচড়ামি, ডাকাতিতে ভরে যাবে গ্রাম।

সমাজের হোমরা-চোমরা, মাথার মণি কারখানার পয়সাওয়ালা মালিকরা ম্যানেজারের চেম্বারে ঘনঘন মিটিং-এ বসছেন। আমি হচ্ছি মহান কালপ্রিট। গাঁয়ের সরল সহজ ভালো ছেলে স্বজন। আমিই তাকে পিনিক দিয়ে দিয়ে মাথার পোকা নড়িয়ে দিয়েছি। এখন সেও জেদ ধরেছে মটরবোট নদীতে নামাবেই। কখনও আদর যত্ন করে বোঝানোর জন্যে, কখনও ধমকানোর জন্যে আমাকে গোপন বৈঠকে ডাকা হচ্ছে। কখনও আমাকে ছাড়াই শলাপরামর্শ চলছে। আরে বাবা, আমারও ঘুম নষ্ট হচ্ছে। তোমরা যেমন শান্তিতে ঘুমুতে চাও, আমিও বউ পাশে নিয়ে ঘুমুতে চাই। যতই বোঝাও আর মাথায় ঘোল ঢালো, সাত কথার এক কথা। দাবার চাল আমি ফেরাচ্ছি না। ভাগীরথীতে মটরবোট ভাসাবই।

মাটিয়ারির আসল রহস্য তো রাতের বেলা। থানা-পুলিশ, জজ-ব্যারিস্টার, হুদো-মুধো সবাই জানে, কিন্তু কেউ জানে না। দুনিয়ার যত চোরাই, টানা, দু’নম্বরি তামা, দস্তা, রাঙ (কাঁসা, পেতল, ভরন তৈরির কাঁচামাল) অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে লরি লরি ঢুকে পড়ে মাটিয়ারিতে। রাতবিরেতে অসুস্থ রুগির আর্তনাদ আর লরি, ম্যাটাডোরের জান্তুব উল্লাসে মেটিরির মানুষ আর তামা দস্তা গলাবার ভাঁটির আগুন হঠাৎ হঠাৎ জেগে ওঠে। কালো অন্ধকার মাখা দু’নম্বরি তামা দস্তা রাতারাতি গলিয়ে ফেলতে পারলেই একনম্বরি। দিনের আকাশ বাতাসের মতোই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

এলাকার জয়েন্ট বিডিও আমার বন্ধু, দেবু। গল্প লেখে। বলল-– এক ইঞ্চি সুযোগ ছাড়বিনে। জলপথ খুলতেই হবে। আমি তোর সঙ্গে আছি।

ছা-পোষা মানুষ। বউ পাশে নিয়ে শোয়ার লোভ যেমন হয়, খুনখারাবি হয়ে যাওয়ার ভয়ও করে। দেবুর চোখে চোখ রেখে মনে বেশ জোর এল। হুম, এই হচ্ছে বন্ধু! যে বিপদের সময় পাশে দাঁড়ায়। ভিতরে ভিতরে গর্ব অনুভব করলুম। গল্পলেখকদের এরকম ডাকাবুকো হওয়াই দরকার।

রণিতদাও ইয়াং, পিঠ চাপড়ে বলল-– আমি সামনে আছি, তুই লড়ে যা। ঘোড়েলগুলোকে সামলে নিয়েছি।

মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করি– কী ভুজুং দিলে?

–আরে ভুজুং কেন? সত্যিই তো, কাটোয়া অন্য জেলা। অন্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশান। ওরা নদিয়াতে এসে হুজ্জুতি করবে না। দুই জেলায় কারও জল-পুলিশ নেই। জলপথ খুলে গেলে দু’নম্বরির গায়ে তো আঁচ কিছু লাগছে না। স্বজনের ভুটভুটিটা নামুক, দেখবি, হুড়মুড় করে কুমিরের মতো লাইন দিয়ে ভুটভুটি জলে নামছে। স্বজন বেশ করিৎকর্মা। রাইটার্স থেকে রুট পারমিশান বের করে ফেলল! এটাই ঝক্কি ছিল। ওয়াটার রুট পারমিশানের সুবিধের জন্য সবাই ব্যাঙ্ক থেকে লোন নিতে চাইবে। অ্যাডভান্সের ভালো একটা উইং খুলে দিলি।

–যাঃ! আমি আর কী করলুম। সবই তো তুমি।

–যা যা, রুট পারমিট দিয়ে ফাইলটা রেডি করগে। বোষ্টম অফিসের বড়বাবু হতে হবে না।

সেই রাতেই শূন্য খাটে বসে লিখলুম–

পরম পূজনীয় পিতৃদেব,

সফলতা যদিও প্রস্ফুটিত হয় নাই, তথাপি উদ্যোগ বৃক্ষাকার লইয়াছে। যেন কুসুম দৃষ্ট হইতেছে। জল-পথে চলাচল প্রায় আসন্ন। প্রণাম লইবেন।

স্নেহাকাঙ্খী

দেবল।

ভেবেছিলাম, দু’লাইনের চিঠি বাবা ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেবেন, উত্তর আসবে না।

কিন্তু উত্তর এল।

বীরপুঙ্গব পুত্র,

এই পত্র পঠনেও তোমার পাপ কিঞ্চিত খণ্ডাইবে। যদিও, তথাপি, যেন, প্রায় ইত্যাদি ছুছুন্দর পুরুষের ক্কিচ ক্কিচ ধ্বনি মাত্র। উহার প্রতিধ্বনিতে কিছুমাত্র হিমালয় গলিবে স্বপ্ন দেখিও না। আপন চরকা (চরকা শব্দটি চাঁড়াল জাতীয়। ইহার সাধুরূপ নাই। লিখিতে বাধ্য হইলাম।)-য় তৈল মর্দন করো। তোমার ভুতভুত্তির ভাগীরথীতে শুভ মহরত হইলে পত্র লিখিতেও পারো।

জয় বজরঙ্গবলী।

তোমার কীর্তিক্লান্ত,

লজ্জাবনত,

পিতৃদেব।

আশায় চাষা খাটে। চিঠির ‘স্বপ্ন দেখিও না’ আর ‘পত্র লিখিতেও পারো’ অংশদুটো পড়ে পড়ে কালি কাগজ আর পাপ ক্ষইয়ে ফেলার চেষ্টা করে যাচ্ছি। সারাদিন ভালো থাকি। রাতে বিছানায় শুতে এলেই মাথা গরম হয়ে যায়। শূন্য বিছানা কিছুতেই সহ্য হয় না। চুড়ির খনখন নাগালের মধ্যে বাজে না। কেবলই দূরে খালি বিছানায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে বাজে, সারারাত বাজে। ধরতে পারি না। মাঝে মাঝে কেঁদে ওঠে খোকার কান্না-– আমি দাদাইয়ের কাছে যাব।

ছুঁতে পারি না। কোথায় খোকা!

কচি কান্নার শব্দে ঘুম ভেঙে ওঠার উপায়ও নেই। কারণ ঘুমই তো আসে না। উত্তেজনায়, কষ্টে, জ্বালা ধরে যায়। ‘স্বপ্ন দেখিও না’ ‘পত্র লিখিতেও পারো’ বাক্যাংশ দুটিতে ভর করে দ্বিগুণ উৎসাহে পরদিন কাজ শুরু করি।

শেষ পর্যন্ত ‘স্বজল’ নাম খোদাই করা স্বজনের মটরবোট ভাগীরথীর জলে ভাসল। নদীর মন্দমন্দ বাতাসে মৃদু ঢেউয়ে ‘স্বজল’ নাচছে। তার ছায়া বরানগরের গোপাল লাল ঠাকুর রোডের বাড়িতে দুলে উঠল, মাটিয়ারির ঘাটে দাঁড়িয়ে আমি দেখতে পাচ্ছি।

বিডিওসাহেব গাড়ি, লোকলস্কর, পুলিশ এনে হৈ হৈ বক্তৃতায় উদ্বোধন করে গেলেন। খুশিতে কেঁদে ফেলেছিলুম। আকাশের দিকে তাকিয়ে রণিতদা মুচকি হেসে রুমাল বের করে দিয়েছিল। চোখ মুছিনি। রোদ লাগার বাহানায় লজ্জায় রুমালে মুখ ঢেকেছিলুম।

রণিতদা অফিসে ফিরে বলেছিল, আমাকে তখন নাকি মুখ ঢাকা বেহারি নতুন বরের মতো দেখাচ্ছিল।

সংশোধন করে, হেসে বলেছিলুম-– না, না, রাজস্থানি বরেদের মতো।

খুকখুকে হাসি হেসে রণিতদা বলেছিল-– বেঁটে ইউপিয়ানদের মতো।

গম্ভীর মুখে বলেছিলুম– এককথায় প্রকাশ করো, বলো, ভারতীয়দের মতো।

দুজনেই বুক উজাড় করে হেসে উঠলুম।

হাসির মধ্যে অহংকার ছিল। চিঠি লিখলুম—

শতকোটি প্রণামান্তে নিবেদন মিদং,

পিতা,

অপরাধ নেবেন না। আপনি আমার বাবা। সাতপাকে বিয়ে করা আমার বউ, সে আপনার বউমা বটে। আমার ছেলে, আপনার নাতি ঠিকই। আমি কি আপনাদের কেউ নই!

পিতা, স্ত্রী, পুত্র লইয়া সংসার করিবার সাধ কি এ জীবনে মিটিবে না?

নদীপথ খুলিয়াছে। ঘাটে উপস্থিত হইলেই দেখিবেন আপনার ‘ভুতভুত্তি’ বাঁধা আছে। কাটোয়া এখন কুড়ি মিনিটের পথ। এক্ষণে করুণা হউক।

পরম আশায়,

অপদার্থ পুত্র

দেবল।

চিঠি পেয়ে বাবা খাপচুরিয়াস। রাগে হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে গুরু-চাঁড়ালী ভাষাতেই লিখে পাঠালেন–

দেখো বাবা,

নদী থাকিলেই নৌকো চলবে। নৌকো চললেই মানুষের সুবিধে হবে। গোরুর পেটে গোবর আছে, গোরু নাদে। সবাই জানে। আহামরি শিং কিছু তোমার গজায়নি। ঘুঁটে মাত্র দিয়েছ। আসল কাজ ভগীরথ করে থুয়ে গেছে। সংসারের জন্য আঁটঘাট বাঁধিতে হয়। কান্নাকাটি পুরুষমানুষের মানায় না।

হাঁপানির রুগি। এককথার মানুষ। আজ আছি কাল নেই। খেপিও না। মেঘে মেঘে কতবেলা হল সে হুঁশ আছে? কাল বাদে পরশু গৌরাঙ্গ স্কুলে ভর্তি হবে। ওখানে কদম গাছের নীচে গরু আর মাস্টার একসাথে ঘুমোয়। কুকুর এসে মাস্টারের চেয়ারে পেচ্ছাব করে যায়। ছাগল আর ছাত্তররা একসাথে কাঁঠাল আর বইয়ের পাতা চিবোয়। ওখানে কি আমার সোনার গৌরাঙ্গ বই পড়তে যাবে? তুমি বাবা সংসারের জন্য মিছিমিছি কান্নাকাটি করিও না, মন দিয়া অফিসের কাজকম্ম করো, উন্নতি হইবে।

যে ক’দিন বাঁচি বরানগরে, কোলকাতা শহরে বাঁচিতে চাই। প্রতি হপ্তায় বাড়ি আসিবার চেষ্টা করিও।

ইতি বাবা।

সেদিন রাত জেগে একখানা চিঠি লিখলুম,

পরম পূজ্যপাদ পিতা,

একটা জলপথ খুলতে পেরেছি, বেড়ালের শিকে ছেঁড়া বই কিছু না। ট্রান্সফারের চাকরি। গোটা ভারতবর্ষের যেখানে খুশি কাজ করার ওয়াদা নিয়ে জয়েন করেছি। বাবার পছন্দমতো ভারতবর্ষ সাজিয়ে দেওয়ার বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ক্ষমতা আমার নেই। বাবা, বউ, ছেলে নিয়ে সংসার করার সাধ আমার এ জীবনে পূর্ণ হবে না। কলুর ঘানিই টেনে যাব।

ইতি

তোমাদের বলদ।

 

ছবিঋণ – ইন্টারনেট

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*