মন খারাপ – আ ফেমিনিস্ট সাইকোলজিক্যাল ডিস-অর্ডার

জিনাত রেহেনা-ইসলাম

 

একুশ শতকের প্রথমার্ধে টাইম ম্যাগাজিনের একটি নিউজ আর্টিকেল প্রায় অনেকের নজর এড়িয়ে গিয়েছিল। নিয়েলসন উওম্যান অফ টুমরো অর্গানাইজেশন তথ্য দিয়ে প্রকাশ করে ‘Indian Women are the most stressed on earth’। স্টাডি রিপোর্টে দেখানো হয় ৮৭% মহিলা সবসময় স্ট্রেসে থাকার কথা বলে এবং ৮২% বলে তাদের অবসরের কোনও অবকাশ নেই। এর কারণ হিসেবে মেয়েদের পারিবারিক প্রত্যাশা, সামাজিক পরম্পরা এবং পরিবার ও বাইরে নানারকম দায়িত্বের বিষয়গুলিকে চিহ্নিত করা হয়। সময়ের সাথে সাথে এই স্ট্রেসের প্যাথলজিক্যাল নাম হয় ডিপ্রেশন। আজকের এই ডিপ্রেশনই যা নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে স্যাডনেস কিন্তু উন্মাদনার চেয়ে কম এবং অনিয়ন্ত্রিত দুঃখের চেয়ে বেশি, তা বিভিন্ন সময়ে ম্যাডনেস, স্যাডনেস, হিস্টিরিয়া, ক্রেজি নামে স্থান পেয়েছিল ইতিহাসের পাতায়। বিশের শতকের গোড়ার দিকে ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন ‘হেলথ’ বা ‘স্বাস্থ্য’ শব্দের ব্যাখ্যা দিয়েছিল এমন– ‘এ স্টেট অফ কমপ্লিট ফিজিক্যাল, মেন্টাল অ্যান্ড সোশ্যাল ওয়েল বিইং নট মেয়ারলি দ্য অ্যাবসেন্স অব ডিজিজ’। মেনে নেওয়া হয়েছিল মহিলার ওয়েল বিইং বা ভালো থাকা তার একার ব্যক্তিগত সমস্যা শুধু নয়, এটা একটি পাবলিক ইস্যু। এই শতকের শেষের দিকে প্রকাশ পায় দুটি বই ‘উওম্যান ম্যাডনেস’ এবং ‘উওম্যান ম্যাডনেস অ্যান্ড ইংলিশ কালচার, ১৮৩০-১৯৮০’। এখানে পাগলামি ও নারীত্বপনার ইকুইভ্যালেন্সের উপর জোর দেওয়া হয়। হিস্টিরিক্যাল মহিলা কনসেপ্টের জন্ম তখন থেকেই। যার ভিত্তি ছিল পুরুষ নির্মিত সামাজিক পরিবেশ যা চ্যালেঞ্জ করে নারীর অধিকার ও অস্তিত্বকে। ম্যাডনেস সব মহিলার ক্ষেত্রেই সাবজেক্টিভ বলে অনেকে মানতে থাকে। একুশ শতকে এসে হিস্টিরিয়া বা কাছাকাছি সব শব্দগুলিকেই নন এক্সিটেন্স হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। এমন কোনও স্বাভাবিক সমস্যা নেই, যা আছে সবটা প্যাথলজিক্যাল বা ‘উওম্যান ইস্যু’– সমাজে এই ধারণা বা বিশ্বাস চালু হয়। যেহেতু হিস্টিরিয়া শব্দটি গ্রীক শব্দভাণ্ডার থেকে নেওয়া যার মানে ইউটেরাস তাই নারীর ক্লান্তি, বিরক্তি, কাজের চাপ, আত্মকেন্দ্রিকতা, সহিষ্ণুতার অভাব এমনকি অবিবাহিত মেয়েদের সামাজিক ও মানসিক চাপকে হিস্টিরিয়ার তালিকায় ফেলে দেওয়া হয়। কোনও মেয়ে যখন সতীত্বের ধারণা, অকারণ আত্মসমর্পণে কুণ্ঠিত, বাধ্যতার দায়কে অস্বীকার করেছে বা টিপিক্যাল ডোমেস্টিক দৃষ্টিকোণ নীরবে মানতে অস্বীকার করেছে তখন সে মেয়ে ক্রেজি বা পাগল বলে আখ্যায়িত হয়েছে। ‘দ্য ফেমিনাইন মিস্টিক’-এ বিটি ফ্রাইডান বলেন, মেয়েদের এই জাতীয় সমস্যাগুলির কোনও নাম নেই। একসময় এক সুপরিচিত অভিজাত পরিবারের পুত্রবধূকে অ্যাসাইলামে পাঠানোর ঘটনায় মার্ক্স নিউ ইয়র্ক ট্রিবিউনে লিখেছিলেন, খোপে না ফেলতে পারলেই পুরুষ মেয়েদের পাগল ঠাওরায়। আসলে এই সমাজে খোপের আদর্শ মেয়েদের জীবনের সুস্থতার চেয়ে অনেক দামী। একুশ শতকে এসেও সে ধারণা পাল্টায়নি। এটিও মূলত সমাজের তৈরি কনসেপ্ট বা কন্ডিশন। বিখ্যাত মেয়েদের ওয়েল বিয়িং-এর ধারণাকে প্রায় জবরদখল করে নেয় উওম্যান এমপাওয়ারমেন্ট।

আগামী ২০২০-তে বিশ্বায়নে যে বোঝাবর্ধক সূচির নির্দিষ্টকরণ করা হয়েছে তাতে উওম্যান ডিপ্রেশন বড় ভূমিকায়। এই ডিপ্রেশন জন্ম নেয় মন খারাপের দীর্ঘমেয়াদ থেকে। কোনও কোনও মনোবিজ্ঞানী বলছেন মিজারি আর ম্যালাইজ মিলে ডিপ্রেশন। আবার কেউ কেউ বলছেন স্যাডনেস হল ডিপ্রেশন। বিবাহিত মহিলাদের আবার মনমরা-ভাব আরও বেশি। মন খারাপের ঘরে বিশ্বব্যাপী নারী বসত করছে। কি আছে সেই মরবিড হিমঘরে? প্রখ্যাত আন্তর্জাতিক মডেল কাম সফল ভারতীয় অভিনেত্রী দীপিকা পাদুকোনের ভাষায়, স্যাডনেস কামস ফ্রম ডিফারেন্ট প্লেস ইন মাই বডি। আসলে স্যাডনেস শব্দের হেরফেরে আর স্বাভাবিক এবং প্যাথলজিক্যাল বাউন্ডারির গেঁরোয় আটকে থেকে গেছে। বিষণ্ণতা, গ্লুমি, মেলাংকলি-দের মতো একসময় সাহিত্য ও ডিকশনারির পাতার বহুল চর্চিত শব্দগুলির ব্যবহার ও প্রয়োগ কমেছে। সেগুলির রি-মডেলিং হয়েছে নতুন ধাঁচে। কিন্তু সমস্যার নাম ও চেহারা প্রায় এক থেকে গেছে। হু প্রকাশিত ‘Psychological And Mental Health Aspect of Women’s Health 1993’ এবং ‘Women’s Mental Health 2000’ এই দুটি রিভিউ আলোকপাত করে নারীদের ঘর, বাহির, কর্মক্ষেত্র সম্পর্কিত নানাবিধ সমস্যার যা তাকে নিরন্তর মনমরা করে তোলে। ডিপ্রেসিভ ইলনেসে ভোগায়। তামাম দুনিয়ায় পুরুষের তুলনায় নারীদের হতাশার অভিজ্ঞতা দ্বিগুণ করে বেশিমাত্রায় বেড়েই চলেছে। মানসিক স্বাস্থ্যের ভগ্নদশায় বেহাল মহিলা স্ট্রাকচারাল ও সোশ্যাল বেরিয়ারের নানা প্যারামিটারে দুনিয়া জুড়ে হেরেই চলেছে পুরুষের সুবিধা ও প্রাপ্ত অধিকারের স্বাভাবিক অনুপাতে। স্বাধিকার অর্জনের রেসে সে দৌড়চ্ছে কিন্তু ফিনিশিং পয়েন্ট এখনও অনেক দূরে। এই ক্রম-বিকাশমান বৈষম্যের কলেবরের প্রকাণ্ড উপস্থিতি স্বীকার করে নিয়েই ইউএনডিপি ১৯৯৭-তে এক রিপোর্টে বলেছে, ‘no society treats its women as well as its men’।

আসলে আমাদের সামাজিক প্যাটার্নটা বিশ্বব্যাপী একরকম ধাঁচে গড়া। বিশ্বাস বা সংস্কারের বিধান বা নির্দেশকের মানদণ্ড হয়ত আলাদা উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলিতে। কিন্তু হিউমিলিয়েশন ও ক্ষমতার অবমূল্যায়নের নিরিখে গ্লোবালাইজড সোসাইটিতে প্রায় সব মহিলার অবস্থান এক সরলরেখায়। মন খারাপ এক মৌলিক আবেগ-বোধ থেকে জন্ম নেয়। যার কারণ সামাজিক ও ব্যক্তিগত। এই দুটি ক্ষেত্রেই মেয়েদের লড়তে হয় মন ও শরীর দিয়ে যার অনেকটাই কখনও সমাজের নিয়ম বা পরিবর্তনশীল অভিভাবকের দ্বারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নিয়ন্ত্রিত বা অবদমিত। থিয়োরিটিক্যাল সমস্যা এই যে সে যাতে যুক্তি খুঁজে পায় না তা তাকে বাধ্যতামূলকভাবে বিশ্বাস করানো হয়। বাস্তবে তার যুক্তি ও জ্ঞানার্জিত ভাবনা তাকে সামাজিক আইসোলেশনের মুখোমুখি করে। মতামত বা প্রতিবাদ প্রতিষ্ঠার মিছিলে প্রায় সব ক্ষেত্রেই তার একক পদযাত্রা। এই ধারাবাহিক সেট-ব্যাক তার উপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। এক্সটারনাল ট্রুথ আর হিস্টোরিক্যাল ট্রুথের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলতেই থাকে। সে মনমরা হয়ে থাকে বেড়ে ওঠার নানা পর্যায়ে। মেয়েদের জীবনের বাস্তব প্রেক্ষিত ও তাদের মানসিক অবস্থা বা সুস্বাস্থ্য একে অন্যের সাথে ইন্টারলিঙ্কড এবং এক্ষেত্রে নির্ণায়কের ভূমিকায় দুটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এক, তার লাইফ বা জীবনের প্রকৃত অবস্থান। দুই, শারীরিক নিগ্রহ পরিবার ও বাইরে। দুঃখবোধ যদি একটি মৌলিক আবেগ হয় তবে তা কমব্যাট করার কতখানি ক্ষমতা একজন মহিলার থাকে তা নিয়ে বিজ্ঞান নীরব। চিকিৎসাশাস্ত্র কাউন্সেলিং বা ট্রিটমেন্টের পথ দেখায়। সমাজ তাকে সর্বংসহা বলে দায় সারে। সারি সারি সংকট গোপন করা ও মেনে নেওয়ার মোকাবিলায় ক্লান্ত মহিলা একসময় মন খারাপকে তার চারিত্রিক প্রতিফলনের এক অঙ্গে পরিণত করে। সমস্যা কিন্তু অসুখ নয়। সমস্যার চিকিৎসা বিজ্ঞান করে না। করে সামাজিক বিধান, আইন, রাষ্ট্র। সংকটের ধারাবাহিকতা একটি অসমাপ্ত সিরিয়ালের মতো। যেমন–

জীবনের প্রকৃত অবস্থান-জন্মসূত্রে উপঢৌকন না পেয়ে মাটিতে ভূমিষ্ঠ কন্যার বেশিরভাগ সেকেন্ড ক্লাস সিটিজেন। সে তার শরীরের গঠন ও বর্ণের কারণে সমাদৃত বা অবহেলিত। তার চলাফেরা, পোশাক, হাসি–কাশি নিয়ন্ত্রিত। পরিবার বেঁধে দেয়। পারিবারিক গৃহ-কাজের যাবতীয় তাকে একে একে রপ্ত করানো হয়। সাথে চলে শিক্ষা। সোশ্যাল মিডিয়ায় আপলোডেড কিছু ভিডিও কন্যাসন্তানের সার্বিক বাস্তব পরিস্থিতি ও স্বপ্নকে প্রতিফলিত করে। উত্তরপ্রদেশের ১১ বছরের এক কন্যাশিশু, খুশবু। জুলজুলে চোখ দুটিতে কি গভীর স্বপ্ন! ডাক্তার হতে চায় সে। সকাল ৫ টা থেকে চুলা ফোঁকে, রুটি তৈরি করে, রাতে খাবার বানায়, দুই ভাইকে স্নান করিয়ে নিজের জন্য মাত্র ২ ঘণ্টা পড়াশুনার সময় পায় সে। আবার সামাজিক পরম্পরার মিসলিডিং কনসেপ্ট তাকে বিভিন্ন পরিস্থিতির মুখোমুখি করে যা তাকে হতাশা বা দ্বন্দ্বে ভোগায়। যেমন একজন কর্মরত মহিলাকে বিবাহের রাতে শিক্ষিত স্বামীর হাতে সাদা চাদর দেখে চমকে উঠতে হচ্ছে। শ্বশুরবাড়ির সতীত্বের ধারণাকে চিট করার জন্য মেয়েদের সামনে এসেছে বিশ্ব হাইমেন বাজার। বিকোচ্ছে নকল হাইমেন। কন্যা সন্তান জন্ম দেওয়ার ফলে মহিলার উপর নানা মানসিক অত্যাচার হচ্ছে, পরে তার মানসিক জটিলতাকে স্ত্রীরোগ বলে দেগে দেওয়া হচ্ছে। একটা ধারাবাহিক টানাপোড়নে মহিলাদের জীবন আবর্তিত হচ্ছে।

শারীরিক নিগ্রহ, পরিবার ও বাইরে  : পরিবার একটি মেয়েকে আশ্রয় দেয়, খাবার দেয়, বড় করে তোলে। যেটা দিতে ব্যর্থ হয় সেটা তার সিকিউরিটি বা নিরাপত্তা। অনেক ক্ষেত্রেই ভিক্টিমদের দেখা যায় সে পারিবারিক সদস্য দ্বারা আক্রান্ত হয়ে ট্রমাটাইজড। পরিবারের বাইরে সে নিগৃহীত হলে একসাথে অপরাধবোধ, ভয়, নিরাপত্তাহীনতা কাজ করে। মানসিক জটিলতা বাড়ে। সমীক্ষায় আরও দেখা গেছে রেপড ভিক্টিম বেশিরভাগ হার্ট ফেল করে এবং প্রেগন্যান্ট উওম্যানদের পেটকে বেশিরভাগ সময় টার্গেট করা হয়ে থাকে। মেয়েদের মানসিক দুর্বলতা আক্রান্ত হয় বার বার। দাম্পত্যে পার্টনারের কাছে সে আক্রান্ত। এই অত্যাচার শারীরিক ও মানসিক। ল্যাভিক এট আল তার ১৯৯৬-এর গবেষণায় বলেন ‘টর্চার ইজ এক্সট্রিমলি নেগেটিভ অ্যান্ড ডেস্ট্রাক্টিভ ইন্টার-পার্সোন্যাল এক্সপিরিয়েন্স’। মেয়েদের সেলফ পারসেপশন যা গড়ে দেয় পরিবার আর প্র্যাক্টিক্যাল সিচুয়েশন যার সঙ্গে তাকে লড়তে হয় এই দুইয়ের একটি দ্বন্দ্ব থাকে। বুদ্ধিনির্মিত পারসেপশন নাকি সমাজনির্মিত নারীত্ব কাকে সে মান্যতা দেবে তার লড়াই থাকে জারি। কম বেশি সব মেয়েকেই বিভিন্ন নিগ্রহের অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যেতে হয় যা সহন করাকেই মান্যতা দেওয়া হয়। অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল উওম্যান হেলথ পলিসিতে একসময় উল্লেখ করা হয়েছিল ‘উওম্যান হু সাফার সেক্স্যুয়াল অ্যান্ড ফিজিক্যাল ভায়োলেন্স আর অ্যাট গ্রেটার রিস্ক অফ সাইকোলজিক্যাল প্রবলেম’।

স্ট্রেস বা চাপ : মহিলাদের দু ধরনের চাপ সহ্য করতে হয়। বায়োলজিক্যাল ও সাইকোলজিক্যাল। প্রতিদিনের জীবনে লাজারাস ও কোহেনের ভাষায় ‘ডেইলি হ্যাসেল’ বাড়তেই থাকে। কিশোরীর হরমোন্যাল হ্যাজার্ডের বাইরে পিরিয়ড চলাকালীন ভয় ও লজ্জা তার জীবনকে স্ট্রেসফুল করে তোলে। প্যাড কেনার এবং রাস্তা অতিক্রম করে বিদ্যালয়ে যাওয়ার সময় সে প্যানিকগ্রস্ত হতে থাকে। তার জামায় স্টেইন পড়ে গেলে তা খুব লজ্জার, এই বোধ তাকে তাড়া করে। আবার এই সময়কালীন নানা ধর্মীয় বিধিনিষেধও তাকে পেরোতে হয়। রাস্তায় নিরাপত্তার অভাব ও ইভ-টিজিং, হ্যারাসমেন্ট এইসব পরিস্থিতি পেরিয়ে আসা তার কাছে খুব চ্যালেঞ্জিং। সাইকোলজিক্যাল স্ট্রেস দেয় তাকে পরিবার ও সামাজিক রীতি। বিবাহের প্রস্তুতি, ব্যয় ও পাত্র দেখতে আসার পর্ব এবং পণের বার্তা তাকে হীনম্মন্যতায় ভোগাতে থাকে। এই ধরনের পারিবারিক ও সামাজিক চাহিদা তার কাছে খুব ফ্রাস্টেটিং হয়ে উঠতে থাকে। সমঝোতায় সে নিজকে সফল করে ফেললেও মানসিক বৈপরীত্য নিয়ে লড়াই তার জারি থাকে। নেগেটিভ সেলফ কনসেপ্ট, ডগমাটিজম, আত্মবিশ্বাসের অভাব তাকে আরও পারফেকশনিস্ট করে তোলে। সমাজের সঙ্গে প্রথাগতভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ আদর্শ মেয়ে মডেল হয়ে ওঠার জন্য সমাজ তার কাছে তাগাদা দিতে থাকে। এই সমঝোতা তাকে নানাবিধ সামাজিক ইস্যু থেকে মুখ ফেরাতে বাধ্য করে। এভাবে সেন্সিটিভিটি মরতে থাকলেও একসময় তার নিজেকে আত্মপ্রবঞ্চিত মনে হতে থাকে। মন খারাপ দানা বাঁধে।

মাল্টি-টাস্কিং : মহিলাদের জীবনে দুই ধরনের দায়িত্ব অর্পিত। এক তার প্রাকৃতিক দায়িত্ব অন্যটি সামাজিক। দাম্পত্যের একটি বড় পিলার যৌন সম্পর্ক তা নিয়ে মেয়েদের যাবতীয় ফ্যান্টাসি সিমোন দ্য বুভ্যুয়ার মতে ‘সার্জিক্যাল অপারেশনের’ মতো। সকলের চোখে একতাল সার্বিক মাংসপিণ্ড থেকে তার নতুন পরিচয়ে মুক্তি মেলে। এবারে তার মাতৃত্ব চর্চিত নানাভাবে। ক্রোমোজোম হ্যাজার্ডের মুখে তারপর সন্তানের লিঙ্গ প্রশ্নের মুখে। তাকে বড় করে তোলা, চরিত্র গঠনের দায়ও তার উপর বর্তিত। সেখানে সে ইমোশন্যালি স্ট্রেসড। আবার পারিবারিক দায়িত্বপালনের ক্ষেত্রে তার যে শারীরিক ও মানসিক ইনভেস্টমেন্ট তা সঠিকভাবে মূল্যায়িত না হওয়ায় নারী হিসেবে মর্যাদার সামাজিক শিরোপার অপ্রাপ্তিতে সে ভুগতে থাকে। পারদর্শিতার সাথে রান্না করে স্বামী ও পরিবারকে সন্তুষ্ট করা তার পারিবারিক কর্তব্যের একটি ‘কস্ট অফ কেয়ারিং’-এর নৈতিক মানদণ্ড যা নারীর মর্যাদার প্রতীক এবং নারীত্বের আত্মমূল্যায়নের প্রতিষ্ঠিত অবয়ব আরও বেশি পরিমাণে তার আবেগকে প্রভাবিত করে যখন সে প্রত্যাখ্যাত ও অবমূল্যায়নের শিকার হয়। ভালো মা, ভালো গৃহিণী, ভালো ওয়াইফ হওয়ার প্রতিযোগিতায় সে নিজের কাছে নিজে পরাস্ত হতেই থাকে। আরেকটি দোষ সে খুঁজে বার করে ফেলে নিজে। পরিবারে অর্থনৈতিক প্যাসিভ ভূমিকা। অবশেষে নিজেকে সে হাসিবিহীন মোনালিসার পোর্ট্রেট-এ বেশি খুঁজে পায়।

জীবিকার লড়াই : প্রথমত বিদ্যালয়ে, কলেজে অ্যাকাডেমিক, স্পোর্টস নানা ক্ষেত্রে অসমতা যখন তার সয়ে যায় তখন চাকরি জোটাতে গিয়ে সেই এক জেন্ডার বায়াসনেসের শিকার হতে হয় তাদের। প্রথমত পোশাকের স্বাধীনতা ও বৌদ্ধিক সীমাবদ্ধতার ধারণার সাথে তাকে লড়তে হয়। গভীর রাত পর্যন্ত ডিউটি বা অফিসের কাজে বারে বারে বাইরে যেতে হলে তাকে পারিবারিক অসন্তোষের মুখোমুখি হতে হয়। পারিশ্রমিকে সে পিছিয়ে, উচ্চপদে সে ব্রাত্য। বাকী আনঅফিসিয়াল হ্যারাসমেন্ট নিত্যসঙ্গী। একসাথে মা ও কর্মরত থাকায় সে মানসিক দ্বন্দ্বে ভুগতে থাকে। স্টিরিওটাইপ ভাবনায় সে আক্রান্ত হতে থাকে। ২০১২ সালের পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্যানুসারে ৪২% মানুষ মনে করে মায়ের পার্ট টাইম কাজ ভালো এবং ১৬% মনে করে ফুল টাইম ভালো। কর্মরত মা নিজের পেশায় সাফল্যের বদলে আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে ভোগে। নারীত্ব নাকি সফল মানুষের জীবন এই সীমানার অস্পষ্টতা থেকে সে নিজে বেরিয়ে আসতে পারে না। অন্যদিকে আত্মনির্ভর থাকাটা তার কাছে সিকিউরিটি ও স্বাধীনতা। সেটা সে হারাতে চায় না। কর্মচ্যুত মহিলা নিয়ে হু-এর রিপোর্টে উদ্ধৃত এক মহিলার উক্তি এইরকম, ‘আই ক্রাইড, আই ট্রায়েড টু কমিট সুইসাইড, আই ওয়ান্টেড টু এস্কেপ ফ্রম দ্য ওয়ার্ল্ড।’

মিসলেনিয়াস সংকটের তালিকা আরও দীর্ঘ। শিক্ষার স্বল্পতা, সম্পর্কের ভাঙ্গন, বাল্যবিবাহ, বিতাড়ন, সম্পত্তি ও উত্তরাধিকার নিয়ে জটিলতা, পারিবারিক হত্যা, সুইসাইড যাবতীয় কিছু আবেগের অভিমুখকে ইনডেফিনাইট ডাইরেকশনে নিয়ে যেতে থাকে।

একুশ শতকের এই গ্লোবালাইজড বিশ্বে মেয়েদের আবার নতুন চাপ। পারফেক্ট টেনের মডেলে তাকে ভালো অফিস-মেট কিন্তু ভালো স্ত্রী, সফল পেশাদার কিন্তু আদর্শ মা, ভালো গার্লফ্রেন্ড কিন্তু স্বাধীনচেতা এবং ভার্জিনের উদাহরণের ছকে পথ বেঁধে দেওয়া হবে। একা থাকা যে উত্তরোত্তর আনসেফ, তার বিশ্বজোড়া ঘটনার উদাহরণ তুলে ধরা হবে। দুঃখের সাথে মোকাবিলা করে মডেল হয়ে ওঠো নইলে সমাজের মূলস্রোতের বাইরে অবস্থান করো। প্রশ্ন আসে আগামী ২০ বা ৫০ বছরে কি কমবে এই স্যাডনেস? মেয়েদের আচরণ, অনুভব, কাজ, চিন্তাধারাকে প্যাথোলজাইজড করা হয়েছে যার প্রেসক্রিপশন আছে ডায়াগনোসিস আছে, কিন্তু নাই যেটা সেটা সমস্যা সমাধানের প্রকৃত অভিমুখ। মেয়েদের মানসিক সমস্যার কারণ সমাজনির্মিত এক অসামান্য মডেল। তাকে ছুঁতে দৌড় করানো হচ্ছে আপামর নারীকে। সে লক্ষ্য যতদিন তাদের সামনে রাখা হবে ততদিন তারা যন্ত্রণায় থাকবে। একবার নিজেদের আদর্শ বা মডেল নির্মাণের দায়িত্ব পেলে তারা সেই লক্ষ্যে অদম্য প্রয়াসে এগোবে যেমন মানুষ এগোয়। মন খারাপের এই অ-নথিভুক্ত সংকট থেকে মহিলাদের মুক্তির জন্য জরুরি নির্দিষ্ট কালচারাল স্ট্র্যাটেজির। সামাজিক, শিক্ষাগত, অর্থনৈতিক, চিকিৎসাক্ষেত্রের প্রতিবন্ধকতাকে নারীর সুরক্ষার জন্য উন্মুক্ত করা সমাজের একটি মহান কর্তব্য। উপযুক্ত উপার্জন, নিরাপদ বাসস্থান, সেফ ট্রান্সপোর্ট, জেন্ডার বিভেদ বাতিল করে মেয়েদের সামাজিক অবস্থা ও মর্যাদাকে সুনিশ্চিত করা জরুরি। নইলে এই প্রতিবন্ধকতা মানবিক ক্ষমতার দুঃখজনক অপচয় ঘটিয়ে চলবে। অ্যানড্রুজ অ্যান্ড ব্রাউন তার উওম্যান নিয়ে সাত বছরের গবেষণায় দেখিয়েছেন মহিলাদের সাধারণত নিজেদের নিয়ে একটি নেগেটিভ ভাবনা তৈরি হয়ে থাকে। এর পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব যদি তার জীবনে দুটি বিষয়ে পরিবর্তন আসে। এক, তার কাছের সম্পর্কগুলির গুণমানে পরিবর্তন ও দুই, তার ওয়ার্ক স্ট্যাটাসের সঙ্গে জড়িত বিষয়গুলির উপযুক্ত পরিবর্তন। জাতিপুঞ্জের সেই ধারাভাষ্যেই লুকিয়ে আছে নিরাময়ের প্রতিষেধক, বিশ্ব পরিবর্তনের পথে হাঁটছে নারীদের জন্য, নারীরা নিশ্চয় পরিবর্তন ঘটাবে। ফেমিনিজম নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার বলিষ্ঠ আন্দোলন যার প্রতিটি ওয়েভ মূল ধারার মানুষের মনে জায়গা পায়নি। আদর্শগত বিভেদ থাকলেও লক্ষ্য ছিল রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক অধিকার আদায় যা এখনও অর্জিত হয়নি। সমাজের সিংহভাগ যখন বিশ্বাস করে এটি কোনও ইডিওলজি বা রেভোলিউশন নয় একটি ধাপ্পা মাত্র, এমন ভাবনায় আক্রান্ত সমাজে মন খারাপ কখনও একটি ইস্যু বলে বিবেচিত হতে পারে না। পেতে পারে অসুখ হিসেবে স্বীকৃতি। প্ল্যাথ একসময় মন্তব্য করেছিলেন ‘if you are normal you are mad by implication and if you are abnormal  you are mad by definition.’

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*