বাঙালির আড্ডার রাজনীতি ও সংস্কৃতি

বুবুন চট্টোপাধ্যায়

 

ব্যাসদেবের মহাভারতে আছে, “নৈমিষারণ্যে মহর্ষিরা দৈনন্দিন কর্ম সমাধান করতঃ সকলে সমবেত হইয়া কথা-প্রসঙ্গ সুখে”। অর্থাৎ আড্ডা দিচ্ছিলেন। এমন সময় এই আড্ডায় ঋষি লোমহর্ষণের ছেলে সৌতি কোথা থেকে এসে উপস্থিত হলেন এবং যথারীতি তিনিও আড্ডায় জমে গেলেন। সৌতি কোথা থেকে আসছেন, সেখানে কী দেখলেন, কী শুনলেন সব জমিয়ে বলার পর সৌতি যখন আড্ডার থেকে বেরোলেন দেখা গেল মহাভারতের অষ্টাদশ পর্ব পর্যন্ত লেখা হয়ে গেছে। বলাই বাহুল্য এর থেকে স্পষ্ট আড্ডার ইতিহাস সুপ্রাচীন। সেই মহাভারতের কাল থেকে চলছে। মুনিঋষিরাও দান-ধ্যানের ফাঁকে জমিয়ে আড্ডা মারতেন। এবং আড্ডা শুধু আলস্য বিনোদন নয়। সেখান থেকে মহাভারত অবধি জন্ম নিতে পারে।

রোমানরা নাকি ব্যাপক আড্ডাবাজ ছিলেন। প্রাচীন গ্রীস এবং রোমে মূল বাজার এলাকায় ফোরাম বলে একটি জায়গা থাকত। এই ফোরামই ছিল রোমান এবং গ্রীকদের মূল আড্ডার জায়গা। শুধু আড্ডা নয়, বক্তৃতা, রাজনৈতিক চাপান-উতোরেও রোমানদের বিশেষ প্রতিভা ছিল। সেই কারণে প্রতিটি রোমান শহরের মূল কেন্দ্রে একটি করে ফোরাম থাকত। এখনও রোমান ধ্বংসাবশেষে এই ফোরামগুলোর দেখা পাওয়া যায়। গ্রীকরা এই ফোরামকে বলত “অ্যাগোরা”। ফ্রান্সে মূলত ক্যাফেগুলোই মূল আড্ডাকেন্দ্র। আড্ডার ব্যাপারে ফরাসিদের সঙ্গে বাঙালিদের বেশ একটা মিল আছে। এখানে যেমন ফুটপাতে ঝুপড়ি চায়ের দোকানে সকাল থেকেই আড্ডাবাজদের দেখা পাওয়া যায়, প্যারিসেও দেখেছি ফুটপাথ বা বুলেভার্ডের ওপর ক্যাফেগুলোতে সকাল থেকেই ফরাসিরা কফির কাপে তুফান তুলছে। অবশ্য শুধু চা-কফি নয় ফরাসি ক্যাফেগুলোতে বেশ ভাল পছন্দসই ওয়াইনও মেলে। এবং ফরাসিরা ওয়াইন খাওয়ার ব্যাপারে দিন-রাতের পাত্তা দেয় না বিশেষ। ওয়াইন পানের আবার সকাল-বিকেল হয় নাকি? ওয়াইন-মুগ্ধ ফরাসিরা এই দর্শনে বিশ্বাসী। প্যারিসের বিখ্যাত ক্যাফে ‘দ্য-ম্যাগো’ (Les duex magot)-য় নাকি সারাদিন আড্ডা মারতেন সার্ত্র এবং বোভয়া। এবং মাঝেমাঝেই তাঁদের সঙ্গী হতেন পিকাসো-হেমিংওয়ে-ব্রেখট্-জেমস জয়েস প্রমুখেরা। এই ক্যাফেটি সম্পর্কে লেখক স্টিভ ম্যাশেট বলেছিলেন, “The first cafe in the quarter to be blessed by the morning sun…”

কোলকাতা শহরের আড্ডার ইতিহাস যদি কোনওদিন লেখা হয় তাহলে বাঙালির মনস্তত্ত্বের অনেক গোপন খবর পাওয়া যেত। এই শতাব্দীর গোড়ায় কোলকাতা শহরে বেশ কয়েকটি জমাটি আড্ডার ঠেক ছিল। বাংলাদেশের বহু জ্ঞানী-গুণী ইন্টেলেকচুয়ালরা সেইসব আড্ডার মধ্যমণি ছিলেন। বাইরের জগতে বিশিষ্ট, গুরুগম্ভীর সেই মানুষগুলোর আড্ডায় নিরাভরণ মুখগুলোর যেমনই স্বাদ ছিল, তেমনই রসের ঝাঁঝ। ওইসব আড্ডায় তাদের ভিতরের মুখটি প্রকাশিত হত।

আড্ডা শব্দটিই অ-সংষ্কৃত। মনে হয় উর্দু শব্দ থেকে জাত। অন্তত আওয়াজটা শুনলে তাই মনে হয়। শব্দটির মধ্যে যদি কিঞ্চিৎ হিদুঁয়ানি ঢেলে দেওয়া যায় তাহলে সভা বলতে হয়। সভা বললেই কেমন হরিসভা গোছের মনে হয়। জাত থাকে না। ইংরেজিতে পার্টি বললেও যেন দম আটকে মরে। কাজেই আড্ডা যেখান থেকেই উড়ে আসুক এক এবং অদ্বিতীয়। ইংরেজি, বাংলা, উর্দু করলেই আসল প্রাণবায়ুটাই চলে গেল মনে হয়। আসলে আড্ডার মতোই আড্ডা শব্দেরও কোনও বিকল্প হয় না। এ বিষয়ে একদা এ শহরের মহা আড্ডাবাজ বুদ্ধদেব বসু বলেছিলেন, “আড্ডা জিনিসটা সর্বভারতীয় কিন্তু বাংলাদেশের সজল কোমল মাটিতেই তার পূর্ণবিকাশ। আমাদের ঋতুগুলো যেমন কবিতা জাগায়, তেমনই আড্ডাও জমায়।” এই বাংলাদেশে যেন এক এক ঋতুতে এক এক রকম আড্ডার মোড়ক খোলে। এক এক কালের আড্ডার গায়ে আবার এক এক রকম গন্ধ। ঘামে ভেজা এপ্রিলের আড্ডার গায়ে বেলফুল আর পন্ডস পাউডারের গন্ধ লেগে থাকে। সেই আড্ডাই গড়িয়ে গড়িয়ে বর্ষায় যায় মাটির সোঁদা গন্ধ নিয়ে। তারপর বর্ষা পেরিয়ে শরতে ঢুকলেই আড্ডার গায়ে ধূপ-ধুনো আসন্ন পুজোর গন্ধ। তারপর শীত আসে। নেসক্যাফে আর কমলালেবুর মিশ্রণ নিয়ে। এই যাবতীয় আড্ডা সুবাসিত হয় কিন্তু পথে-বিপথে, অলিতে-গলিতে। দামী সোফাসেট সমৃদ্ধ এসি ঘরে ঢুকলেই এইসব অর্গ্যানিক গন্ধের দফারফা হয়ে যায়। কৃত্রিম রুম ফ্রেশনার সব মাটি করে।

একসময় এ শহরে জাহাঁবাজ সব আড্ডাবাজরা ছিলেন। তাঁদের আড্ডা একটু চেখে দেখার জন্য অনেকেই লালায়িত ছিলেন। যেমন– বুদ্ধদেব বসু, কমলকুমার মমজুমদার, প্রেমেন্দ্র মিত্র, রাধাপ্রসাদ গুপ্ত, সত্যজিৎ রায়, কবিতা সিংহ প্রমুখেরা। সেইসব আড্ডার আকর্ষণ সেইসময়কার শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত, ইন্টেলেকচুয়ালদের কাছে যে কোনও মধুচক্রের থেকে ঢের বেশি নেশাময় ছিল। শুনেছি ১৯৪৫-৪৬ সালে চৌরঙ্গীর কফিহাউসে নিত্য আড্ডার ঠেক ছিল সত্যজিৎ রায়, কমলকুমার মজুমদার ও রাধাপ্রসাদ গুপ্তদের। সেই আড্ডা থেকেই সত্যজিতের পথের পাঁচালির ভাবনা। রাধাপ্রসাদ গুপ্তর লেখা থেকে জানতে পারি সেইসময় চৌরঙ্গীর কফিহাউসে সত্যজিৎ, বংশী চন্দ্রগুপ্ত, চিদানন্দ দাশগুপ্তরা ইওরোপিয়ান চলচ্চিত্র নিয়ে যে কী বিদগ্ধ আলোচনা করতেন ভাবা যায় না। সেই আড্ডার ফাঁকেফাঁকেই সত্যজিৎ রায়ের নেশা ছিল ক্রসওয়ার্ড পাজল। অতি দ্রুততার সঙ্গে তিনি ওই কাজটি করতে পারতেন। সেই আড্ডায় নাকি ফরাসি চলচ্চিত্রকার জ্যাঁ রেনোয়াও দু-একবার এসেছিলেন। তখন তিনি এই শহরে তাঁর “দ্য রিভার” ছবির শুটিং করছিলেন। এই আড্ডা থেকে পরে কেউ কেউ কলেজ স্ট্রীটের কফি হাউসের আড্ডায় চলে যান। এবং ক্রমশ সেই আড্ডার মধ্যমণি হয়ে ওঠেন কমলকুমার মজুমদার।

এদিকে দক্ষিণে বসুশ্রী সিনেমাহলের পাশে স্যাঙ্গুভ্যালিতে কবি-প্রাবন্ধিকদের একটা জমাটি আড্ডার ঠেক ছিল। চৌরঙ্গী কফি হাউসের আগে রাধাপ্রসাদ গুপ্ত, কবি দিনেশ দাশ, সুনীল গুহ, সন্তোষ বোস প্রমুখেরা নিয়মিত যেতেন। সকলেই পড়ুয়া ছিলেন। এঁদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পড়ুয়া ছিলেন সন্তোষ বোস। ফ্রি স্কুল স্ট্রীটে পুরনো বিদেশী পত্রিকার খোঁজে প্রায়শই তিনি ওই পাড়ায় ঢুঁ মারতেন। এক বৃদ্ধ মুসলিম বইওয়ালা সন্তোষ বোসকে আড়ালে নাকি ‘বইয়ের ঘুণ’ বলে ডাকতেন। বলা বাহুল্য সেইসময় এই পড়ুয়া মানুষগুলো মন ও মেজাজে মার্কসিস্ট ছিলেন। রাধাপ্রসাদ গুপ্ত মজা করে বলতেন সকলেরই খানিকটা চায়ের কাপে ইনকিলাব করার ঝোঁক ছিল। তাঁর কথা থেকেই জানতে পারি স্যাঙ্গুভ্যালির আড্ডায় সুধাময় দাশগুপ্ত বলে আর একজন রসিক মানুষ ছিলেন। সন্তোষ বোসের মতো বিবিধ বিষয়ে তাঁর পড়াশুনো না থাকলেও তাঁর মারাত্মক  প্যাশন ছিল গোয়েন্দা উপন্যাসে। আর তাঁর ঝোঁক ছিল সব ঘটনার মূলে গিয়ে তার বিচার করার। তাই রাধাপ্রসাদ গুপ্ত তাঁকে ঠাট্টা করে ডাকতেন “ফান্ডামেন্টাল-ক্যাংলা”। এই সুধাময়ই নাকি তাঁদের প্রথম বুঝিয়েছিলেন ডিটেকটিভ নভেলে খুনের প্রধান সমস্যা ডিসপোজ্যাল অফ দি ডেড বডি।

সুধাময়ের মতো এরকম বিচিত্র মানুষরাই আসলে হন যেকোনও আড্ডার প্রাণ। এক-একজনের এক-একরকম চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। তাতেই এক-একটি আড্ডায় রামধনু ছড়িয়ে পড়ত।

ওদিকে কালিঘাট ট্রামডিপোর উল্টোদিকে একটা ছোট্ট চায়ের দোকানে নিয়মিত আড্ডা মারতেন সাগরময় ঘোষ, বিমল মিত্র, অচিন্ত্য কুমার সেনগুপ্তরা। সে আড্ডা রোজ না হলেও রবিবার সকাল ন’টার মধ্যে সবাই সেখানে হাজির হতেন। চলত দুপুর একটা পর্যন্ত। একবার বিমল মিত্র নাকি আড্ডায় বেজার মুখ করে বসে আছেন। ‘দেশ’ পত্রিকায় বিমল মিত্রর তখন “কড়ি দিয়ে কিনলাম” ধারাবাহিক আকারে ছাপা হচ্ছে। সেই সপ্তাহেই শেষ কিস্তি ছাপার কথা। প্রেমেন্দ্র মিত্র ‘পদ্মশ্রী’ পেয়েছেন। তাঁকে অভিনন্দন জানাতে বিমল মিত্র আরও দুজনকে সঙ্গে নিয়ে তাঁর বাড়ি গেছেন। চা-পর্বর পর প্রেমেন্দ্র মিত্র হঠাৎ বিমল মিত্রকে বলেন, “বিমল, দেশ পত্রিকায় বিজ্ঞাপন বেরিয়েছে দেখলাম, তোমার “কড়ি দিয়ে কিনলাম” উপন্যাসটার প্রথম খণ্ড বই আকারে বেরোচ্ছে। তা, তুমি ভাল করে এডিট করে দিয়েছ তো?” শুনে বিমলবাবু ঘাবড়ে গেলেন। ভাবলেন প্রেমেনদার মতো দীক্ষিত পাঠক মন দিয়ে তাঁর উপন্যাসটি পড়েছেন। পড়ে কতই না ভুল-ত্রুটি খুঁজে পেয়েছেন। লজ্জায় বিমল মিত্র স্তব্ধ। কিছুক্ষণ পর আমতা আমতা করে বললেন, “না তো, আমি কিছুই এডিট করিনি। পত্রিকায় যা বেরিয়েছে সেভাবেই ছাপতে গেছে।” তাঁর এই উত্তর শুনে প্রেমেন্দ্র মিত্র নাকে এক ডিবে নস্যি নিয়ে নাকি বলেন, “ভুল করেছ বিমল, বইটা এডিট করে বার করলে ভাল করতে।” বিমল মিত্র খুব দুঃখ পেলেন। কিন্তু তাঁর মতো লেখক, তিনিই বা এত সহজে হার স্বীকার করবেন কেন? তবুও প্রকৃত শিক্ষার্থীর মতো বললেন, “কোন কোন জায়গায় এডিট করা উচিত ছিল আপনি যদি বলে দেন তাহলে বিষয়টা ভেবে দেখতে পারি।” এবার ধরা পড়ে গেলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র। অত বড় উপন্যাস সপ্তাহে সপ্তাহে পড়ার সময় তাঁর ছিল না। উপন্যাসের কলেবর দেখেই তিনি এই মন্তব্য করেছিলেন। তখন স্বভাবতই বেকায়দায় পড়ে প্রেমেন্দ্র মিত্র বলেন, “দেখো, বিমল তোমার উপন্যাস আমি এক লাইনও পড়িনি। তোমারই এক অন্ধ পাঠক আমাকে বলেছিল উপন্যাসটা নাকি ভালোই লিখেছো তবে এডিট করলে আরও ভাল হত।” বিমল মিত্র শুনে বললেন, “এটা যখন আপনার কথা নয় আমি মানতে রাজী নই। বইয়ের দ্বিতীয় খণ্ডও প্রেসে চলে গেছে। আমি এক লাইনও বাদ দেব না।” এই গল্পটি বললাম কারণ নিখাদ আড্ডায় এই একে অপরের পেছনে লাগা লেগেই থাকে। নাহলে আড্ডার মৌতাত হয় না। আবার বাঙালির আড্ডায় রাজনীতি থাকবে না এমনটাও হওয়ার নয়। কারণ বাঙালির মতো রাজনৈতিক বোদ্ধা কমই আছেন। কাজেই আড্ডায় রাজনীতি যেমন একটি পরম এবং গরম বিষয় সেরকম কেউ কেউ অযথা রাজনীতি করে অনেক আড্ডার কবর খুঁড়ে দিয়েছেন। যেমন প্রতিটি আড্ডায় একজন নেতাস্থানীয় মানুষ থাকেন। এবং তারা সাধারণত বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হন। যেমন– কেউ কেউ আছেন হেন অসুখ নেই তিনি জানেন না। অসুখের সিম্পটম, কোন অসুখের কী ওষুধ, কোন ডাক্তার ধন্বন্তরি সবই তাদের নখদর্পণে। কেউ আবার আয়ুর্বেদ বা হোমিওপ্যাথে বিশ্বাসী। যে কোনও মারণরোগের ওষুধ তারা বাতলে দিতে পারেন নিমেষে। কেউ হন খাদ্যরসিক। কোলকাতায় কোন গলিতে, কোন দোকানের তেলেভাজা ভালো তাদের মতো আর কেউ জানেন না। এই এক্সপার্টস কমেন্টস ছাড়া মানুষগুলো বেশিরভাগই জানেন না কোথায় থামতে হয়। কোথায় থামলে আড্ডার আর এক শরিকও দুটো কথা বলার সুযোগ পান। কেউ কেউ সচেতনভাবে কথা চালিয়ে যান যাতে আর কেউ মুখ খুলতে না পারেন। এরাই আসলে আড্ডাধারী রাজনীতিক। এই চারিত্রিক গুণ বাঙালি উত্তরাধিকার সূত্রে পায়। এক- একটি জমাটি আড্ডাকে রসাতলে পাঠানোর জন্য এরকম এক-দু পিস হলেই যথেষ্ট। এক্ষেত্রে নিখাদ, নির্দোষ আড্ডাকে বাঁচানোর একমাত্র উপায় আড্ডার মধ্যমণিকে শক্ত হাতে সব নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কাউকে না চটিয়ে সবাইকে কথা বলার সুযোগ করে দিতে হবে। তবেই আড্ডা বাঁচবে।

যে আড্ডায় যত বহুবর্ণ মানুষ সেই আড্ডা তত আকর্ষক। মানে বিভিন্ন জীবিকার মানুষ এক আড্ডায় সামিল হলে বিচিত্র অভিজ্ঞতার সঞ্চয় হয়। কিন্তু বাস্তবে তা খুব একটা বেশি হয় না। পাড়ার ক্লাবের আড্ডা ছাড়া। সাধারণত আড্ডায় সমরুচির মানুষেরাই একত্র হন। যে কারণে এ শহরে কবিদের আড্ডা, শিল্পীদের আড্ডা, সিনেমা করিয়েদের আড্ডা, বিজ্ঞাপনের মানুষদের আড্ডা, ডাক্তারদের আড্ডা নানারকম আড্ডা আছে। এইসব আড্ডার একটিই সাধারণ এজেন্ডা, সেটি হল যে কোনও একটি বিষয়ে সকলেই অল্পবিস্তর জানেন। গত শতকে এরকম বিভিন্ন রুচির আড্ডা শহর জুড়ে ছিল। টেলিভিশন,  সোশ্যাল সাইট এবং বাজার অর্থনীতি সেইসব সোনার খনির আড্ডাকে ডুবিয়ে ছেড়েছে।

সাতের দশকে সত্যজিৎ, মৃণাল সেনের পর এই শহর পেয়েছিল একগুচ্ছ প্রতিভাবান চলচ্চিত্র পরিচালককে। সেই সময় তাঁরা শয়নে, স্বপনে একটাই জিনিস ভাবতেন কী করে ভাল ছবি করা যায়। হ্যাঁ, গৌতম ঘোষ, রাজা মিত্র, উৎপলেন্দু, বুদ্ধদেব দাশগুপ্তদের কথা বলছি। সত্তরের সেই উত্তাল সময়ে বালিগঞ্জ ট্রাম গুমটির পাশে ফুটপাথে একটি চায়ের দোকানে এইসব উঠতি ছবি করিয়েদের আড্ডা ছিল। এই আড্ডার মধ্যমণি ছিলেন গৌতম ঘোষ। বিশ্ব সিনেমা নিয়ে তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বন্ধুদের সঙ্গে সিনেমা নিয়ে কথা বলে যেতেন। বন্ধুরা আড়ালে নাকি তাঁকে গোদার ঘোষ বলে ডাকতেন। প্রতিটি আড্ডায় এক-একজনের এমন একটি বিশেষ নাম থাকে। যা সেই আড্ডার আড্ডাধারীরা ছাড়া কেউ জানেন না। শুনেছি চৌরঙ্গীর কফিহাউসের আড্ডায় সত্যজিৎ রায়কে নাকি আড়ালে “ঢ্যাঙা বেম্ভো” বলে ডাকা হত। আমার যতদূর ধারণা কমলকুমার মজুমদার এই নামের জনক। কারণ তিনি সত্যজিৎ রায়কে আড়ালে ঢ্যাঙা বলতেন এ অনেকেই জানেন। এই সিনেমা নিয়েই আর একটি জমাটি আড্ডা ছিল রাসবিহারীর মোড়ে অমৃতায়ন বলে একটি রেস্তোরায়। সেই আড্ডার মধ্যমণি ছিলেন সিনেমা অন্ত প্রাণ রাণা সরকার। রাজা মিত্রর লেখা থেকে জানতে পারি এই রাণা ছিলেন প্রকৃত তাত্ত্বিক। ওই তরুণ বয়সেই তিনি আড্ডার ফলস্বরূপ “আন্তর্জাতিক আঙ্গিক” বলে একটি পত্রিকা বের করতেন।

এই সত্তরের প্রথম দিকেই কবিদের তূরীয় আড্ডা চলছে কলেজ স্ট্রীট কফিহাউসে। সেইসময় প্রতিটি সন্ধেয় নাকি কবি, গদ্যকারদের জমায়েতে কফিহাউসে তিলধারণের জায়গা থাকত না। সেই সময় আগুনে কবিদের আড্ডার মধ্যমণি ছিলেন কবি পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলাল। তাঁর সতীর্থরা ছিলেন নিশীথ ভড়, সমরেন্দ্র দাস, অরণি বসু, অমিতাভ গুপ্ত, তুষার চৌধুরী, শম্ভু রক্ষিত প্রমুখেরা। কবি রণজিৎ দাশের লেখা থেকে জানতে পারি মাতৃপূজা থেকে মার্ক্সবাদ, মার্ক্সবাদ থেকে কাহ্নপাদ, কাহ্নপাদ থেকে কাফকা পার্থপ্রতিমের অগাধ পড়াশুনো ছিল। তাঁর কথা তাঁর বন্ধুরা তখন মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনতেন। ওদিকে গদ্যকারদের আড্ডার মধ্যমণি ছিলেন সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়। তাঁর বিষয় উপস্থাপন, কথা বলার ভঙ্গি সবকিছুর মধ্যেই একটা চৌম্বকীয় ব্যাপার ছিল। কদাচিৎ আসতেন শক্তি চাটুজ্যে প্রমত্ত অবস্থায়। শক্তি তখন কিংবদন্তি কবি। তাঁকে নিয়ে অসংখ্য মিথ। তখন পুরো আড্ডার মনোযোগটি ঘুরে যেত তাঁর দিকে। সুনীলও আসতেন মাঝেমধ্যে তাঁর কৃত্তিবাসীয় দল নিয়ে। সেই দলে থাকতেন কবিতা সিংহ। কবিতা সিংহ তখন আকাশবাণীর যুববাণী বিভাগের আধিকারিক এবং কৃত্তিবাস গোষ্ঠীর অন্যতম কবি। তাঁর কবিতায় বলিষ্ঠ নারীসত্তার এক ব্যতিক্রমী প্রকাশ। তাঁকে যারা দেখেছেন তারা জানেন ব্যক্তিত্ব কত ক্ষুরধার হলে একজন কবিতা সিংহ হন। আর সুনীল তখন যুবক কবি, শিল্পীদের কাছে স্টার। কৃত্তিবাসের নেতা, আনন্দবাজারের অন্যতম উঠতি লেখক, তার উপর তাঁর উপন্যাস নিয়ে সত্যজিৎ রায় সিনেমা করেছেন। কাজেই স্বভাবতই সুনীল কফিহাউসে পা রাখলেও টেবিলে, টেবিলে গুঞ্জন শুরু হত। সেইসময় এবং এখনও কবিদের কবি শঙ্খ ঘোষ ক্বচিৎ-কদাচিৎ কফিহাউসে আসতেন। তিনি এলেও কবি-গদ্যকারদের মধ্যে অদ্ভুত একটা চাঞ্চল্য সৃষ্টি হত। তখনই তিনি কিংবদন্তি। সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় তাঁকে বলতেন, “গরীবের রবীন্দ্রনাথ”। আর অলোক রঞ্জন দাশগুপ্ত আরও ধারালো কৌতুকে বলতেন, “বাংলা কবিতার পোপ”।

সেইসময় কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে বিদেশী সাহিত্য পড়ার রেওয়াজ ছিল। বেশ সস্তায় পাওয়াও যেত। কাজেই অনেকের হাতে হাতেই ঘুরত কামু-কাফকা-নেরুদা-লোরকা-স্তাঁদাল-জিঁদ-সার্ত্রদের রচনা। দাদাইজম থেকে সুররিয়ালিজম, সুররিয়ালিজম থেকে অ্যাবসার্ডিটি নিয়ে অন্তহীন আড্ডা চলত কফিহাউসের টেবিলে-টেবিলে। যেন এক সমবেত সৃজনপ্রক্রিয়া। সেইসব আড্ডারই ফসল ‘পরিচয়’, ‘শতভিষা’, ‘কৃত্তিবাস’-এর মতো অসাধারণ সব পত্রিকা।

সেইসব আড্ডা আজ কোথায়? হারিয়ে গেছে সময়ের গর্ভে। যেভাবে সবাই যায়। আড্ডা ছাড়া বুদ্ধির গোড়া শুকনো, হলুদ হয়ে যাওয়া মরা ঘাসের মতো। সেই মরা ঘাসে কেই বা জল দেবেন? সেই মানুষগুলোই তো আর নেই। তবে হ্যাঁ, বাঙালি আড্ডার উপকারিতা বুঝতে পারছে। ইতিমধ্যেই কোলকাতায় বেশ কয়েকটি ক্যাফে হয়েছে এবং সেখানে নিয়মিত আড্ডাও হয়। আসলে আড্ডা দেওয়ার মানুষগুলোকে স্থির বিন্দুর মতো অবিচল হতে হবে। তাদের বিয়েবাড়ি থাকবে না, অন্নপ্রাশন থাকবে না, শ্রাদ্ধ থাকবে না, পুরী-দীঘা থাকবে না। অবিচল প্রতি ঋতুতে প্রতিদিন আড্ডাখানায় হাজির হতে হবে নিঃশর্তে। ভালোবেসে।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*