গেরস্তালি খাদ আর ঐতিহ্যগত অন্ধকার – গৃহহিংসা ও হিন্দু নারী

শতাব্দী দাশ

 

আমাদের গেরস্তালি দুর্গার ‘পিত্রালয়ে’ আসার সময় হল। দেবীর আগমন এবার সেই বঙ্গভূমে, যে গৃহহিংসায় দেশে প্রথম হয়েছে ন্যাশনাল ক্রাইম রিপোর্টস ব্যুরোর বিগত এক বছরের (২০১৬) তথ্য অনুসারে। এই তবে তাঁর সাধের ‘আপন ঘর’, এখানেই তাঁর ‘হোমকামিং’।

যেদিন লিখছি, তার দুদিন আগেই বৈবাহিক ধর্ষণ তথা মেয়েদের যৌনতায় সম্মতির বয়স নিয়ে একটি জনস্বার্থ মামলা শুরু হয়েছে সুপ্রিম কোর্টে। আইনিভাবে এ’দেশে মেয়ের বিয়ের বয়স আঠারো। অথচ পনেরো থেকে আঠারোর মধ্যেই বালিকাবধূর যৌন অভিজ্ঞতা হচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রেই যা বলপূর্বক। একদিকে ‘বৈবাহিক ধর্ষণ’-এর ধারণা এ’দেশে অস্বীকৃত। অন্যদিকে শিশুর যৌন সুরক্ষার আইন POCSO অনুসারে নাবালিকার সাথে যৌন সম্পর্ক অমার্জনীয় অপরাধ। আবার, শারীরিক, মানসিক, যৌন সকল নির্যাতনকেই গার্হস্থ্য হিংসা সংক্রান্ত সিভিল অ্যাক্টের আওতায় আনা গেছে ২০০৫ সালে (Protection from Domestic Violence Act,2005)। অর্থাৎ, নারীর উপর বৈবাহিক যৌন অত্যাচার যে হয়, তা স্বীকারই করে নেওয়া হয়েছে পক্ষান্তরে। শুধু তাকে ‘ধর্ষণ’ বলতে ও ধর্ষকের যথাযোগ্য শাস্তিপ্রদানে আপত্তি।

শুধু নাবালিকা নয়, যে কোনও মহিলাই পারিবারিক পরিসরে যৌন অত্যাচারের শিকার হতে পারেন। শুধু যৌন নয়, অত্যাচার হতে পারে শারীরিক বা মানসিক। স্মরণে থাকুক শিশু ও নারী কল্যাণ বিভাগের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মানেকা গান্ধীর কিছুদিন আগের মন্তব্যও। তিনি বৈবাহিক ধর্ষণ প্রমুখ নাকচ করতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘ভারতীয় প্রেক্ষিতে’ (Indian Context) এ’সব হয় না।

এই ‘ভারতীয় প্রেক্ষিত’-টি কী তবে? গার্হস্থ্যে নারীর অবস্থান আমাদের সংস্কৃতিতে কেমনতরো?

মনুসংহিতা স্পষ্টতই বলেছে–

“পিতা রক্ষতি কৌমারে ভর্ত্তা রক্ষতি যৌবনে/রক্ষন্তি স্থবিরে পুত্রা ন স্ত্রী স্বাতন্ত্র্যমর্হতি।”

নারীর স্বাধীনতা, অতএব, কোনও অবস্থাতেই, স্রেফ নেই।

শাস্ত্রমাত্রেই রচনা করা হয়েছে পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। বিশেষত ব্রাহ্মণ্যধর্ম প্রবলভাবে পিতৃতান্ত্রিক। শাস্ত্রসম্মত যেকোনও বিধিতেই তার প্রকাশ। যেমন, বিবাহ। ‘বিবাহ’ শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থ ‘বিশেষ ভাবে বহন করা’। (বি-পূর্বক বহ্ ধাতু ঘঞ্। বি উপসর্গের অর্থ ‘বিশেষ’ আর বহ্ ধাতুর অর্থ ‘বহন করা’।) ‘বধূ’ শব্দটিরও অর্থ– যাকে বহন করে আনা হয়েছে। ‘ভার্যা’-র সাথে ‘ভৃত্য’-এর তফাত মাত্র একটি প্রত্যয়ে। অর্থাৎ, পুরুষের বিবাহ করা মানে নারীকে বিশেষ রূপে বহন করার বা ভরণপোষণের দায়বদ্ধতা স্বীকার করা। ‘সম্প্রদান’, যার অর্থ স্বত্বত্যাগপূর্বক দান, তার স্বীকৃত মন্ত্র— ‘তুয়ভ্যমহং সম্প্রদদে’। অর্থাৎ, ‘তোমায় আমি আমার সালংকারা কন্যাকে দিলাম।’ আরও বলা হয়– ‘দূর্বাপুষ্পং ফলঞ্চৈব বস্ত্রং তাম্বুলমেবচ এভি কন্যা ময়া দত্তা রক্ষণং পোষণং কুরু।’ অর্থাৎ দূর্বা, ফল, ফুল, বস্ত্র এবং তাম্বুল সহ এই কন্যাকে দান করা হল। এবার তাকে রক্ষণাবেক্ষণ ও পোষণ করার দায়িত্ব স্বামীর। তর্জমা করলে এ’সব শোনায় Transfer of property-র চুক্তিপত্রের মতো। এদিকে, ঋণী ব্যক্তিকে যেহেতু দান করা যায় না শাস্ত্রমতে, তাই কন্যা পিতা মাতার ‘ঋণ’ শোধ করে যায় ‘কনকাঞ্জলি’ প্রথায়। ‘সপ্তপদী’-তে প্রতিবার আবর্তনকালে ‘স্বামী’ স্ত্রীকে তাঁর অনুবর্তিনী হওয়ার নির্দেশ দেন।

অথচ বৈদিক যুগে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা এবং নারীদের নিজেদের জীবনসঙ্গী নির্বাচন করার অধিকার ছিল বলেই মনে হয়। ঋগ্বেদে ‘শমন’ নামক একটি উৎসবের কথা বলা আছে, যেখানে পুরুষ ও নারী নিজেরা নিজেদের সঙ্গী বা সঙ্গিনী বেছে নেওয়ার সুযোগ পেত। মনুর বিধানে এই প্রথা কোনও এক সময়ে বন্ধ হয়ে যায়। আমাদের এখনকার বিবাহ সংস্কৃতির বয়স অনেক পুরোনো নাও হতে পারে। বিবাহ বিধির কিছুটা শাস্ত্রীয় আর কিছুটা স্ত্রী-আচার– কিন্তু উভয়ই মোটের উপর পিতৃতান্ত্রিক। যে আট প্রকারের বিবাহের কথা শাস্ত্রে মেলে, সেগুলি হল-– ব্রাহ্ম, দৈব, আর্য, প্রজাপত্য, আসুর, গান্ধর্ব, রাক্ষস ও পৈশাচ। প্রথম চার প্রকারে নিয়মকানুন কম বেশি একই। ‘প্রজাপত্য’ মতেই বর্তমান বিবাহগুলি সম্পন্ন হয় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। এই চারপ্রকারে পাত্রীর অভিভাবকের সম্মতি তথা যৌতুকের স্পষ্ট উল্লেখ আছে। কন্যাপণ, সুতরাং, আমাদের চিরায়ত ‘ঐতিহ্য’।

গান্ধর্ব বিবাহে অবশ্য পাত্রপাত্রী উভয়ের মত প্রয়োজন। কিন্তু বিষয় আসুর, পৈশাচ বা রাক্ষস বিবাহের দিকে গড়ালে বলপূর্বক বিবাহ, হরণ করে বিবাহ বা আগে ধর্ষণ করে পরে বিবাহ– সবই জায়েজ হয়ে যায়। বৈবাহিক যৌনতায় বলপ্রয়োগ তাহলে আমাদের সংস্কৃতিতে (মানেকা গান্ধীর কথায় ‘Indian Context’-এ) নতুন নয়।

‘কামসূত্রে’ বাৎসায়ন যদিও সঙ্গমকারী নারীর বয়স পুরুষের চেয়ে অন্তত তিন বছর কম হওয়ার সপক্ষে যুক্তি দিয়েছেন, কিন্তু মনুর মতে, পাত্রের সঙ্গে পাত্রীর বয়সের ব্যবধান বিশ, চোদ্দো অথবা ষোলো হওয়া বাঞ্ছনীয়। রামায়ণ অনুসারে বিবাহকালে সীতার বয়স ছিল ছয়।

প্রাচীন বর্ণাশ্রম ব্যবস্থা নানা বিবর্তনের পথ বেয়ে বাংলায় বল্লাল সেন এবং লক্ষণ সেনের আমলে কৌলীন্য প্রথায় এসে ঠেকেছিল। এর ফলে কুলীনদের বহুবিবাহ, অনূঢ়ার কুলীনকন্যার বিবাহ সমস্যা, বৃদ্ধ কুলীনদের হাতে নাবালিকা বধূ সমর্পণ, সমাজে বিধবার সংখ্যা বৃদ্ধি ইত্যদি নানা জটিলতা সৃষ্টি হয়েছিল, যার রেশ উনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত চলেছিল।

সুকুমারী ভট্টাচার্যের মতে, প্রাথমিকভাবে রামায়ণ-মহাভারত ততটা নারীবিদ্বেষী ছিল না। কিন্তু যেহেতু মহাকাব্য দুটি অস্থিমজ্জা সংগ্রহ করেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী জুড়ে, যেহেতু তাদের কলেবর বৃদ্ধি পাওয়ার কালেই কৌটিল্যের ‘অর্থশাস্ত্র’, বাৎসায়নের ‘কামসূত্র’, ‘শ্রীমদ্ভাগবতগীতা’ বা ‘মনুসংহিতা’-র মতো ‘ঘটনা’-গুলি ঘটছে, তাই পরবর্তী সংযোজিত অংশগুলিতে পুরাণে প্রতিফলিত সামাজিক মূল্যবোধ ও শাস্ত্রীয় অনুশাসনের সমাবেশ ঘটেছে, যাকে তিনি ‘অভিপৌরাণিক’ অংশসমূহ বলে চিহ্নিত করেছেন। তাই একদিকে ‘রামায়ণ’-এ কৈকেয়ী নিজের অধিকার বুঝে নিতে তৎপর। দশরথের মৃত্যুর পর সহমৃতা হন না রাণীরা। শবরী একাকী আশ্রমে বাস করে। ঊর্মিলা বনগামিনী হন না লক্ষণের সাথে আর তাঁকে বাধ্যও করা হয় না। সুকুমারী ভট্টাচার্যের মতে পতিব্রতা বলে নয়, বরং বিরহযন্ত্রণা এড়াতেই সীতা রামের সাথে সানন্দে বনে যান। কিন্তু অন্যদিকে, অহল্যার সামান্যতম অনিচ্ছাকৃত স্খলন ক্ষমার অযোগ্য। রামচন্দ্র সীতাকে স্পষ্ট বলেন– ‘যুদ্ধজয়, সে তোমার জন্য নয়, নিজবংশের কলঙ্কমোচনের জন্য।’ (৬/১১/১৫-১৬)। সীতার জবানিতে বারবার ধ্বনিত হয়– পতিই নারীর একমাত্র গতি। পতির স্ত্রীকে সন্দেহ করার অধিকার, সন্দেহ করে ত্যাগ করার অধিকার, জনসাধারণের কাঠগড়ায় নারীর চরিত্রের বিচার, তাকে দণ্ড দেবার সমষ্টিগত অধিকার– এসবই অভিপৌরাণিক যুগের মূল্যবোধ-প্রসূত বলে সুকুমারী ভট্টাচার্যের ধারণা।

‘মহাভারত’-এও, গান্ধারী বারংবার ধৃতরাষ্ট্রকে তিরস্কার করেন। দ্রৌপদী স্বয়ং ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠিরের সাথে ন্যায়নীতি নিয়ে তর্ক করেন। পিতার অনুমতি ব্যতিরেকে বহু নারীই ঈপ্সিত পুরুষের সাথে মিলিত হন, যেমন– শকুন্তলা, সত্যবতী বা অম্বা। কিন্তু সংযোজনেই সম্ভবত, দ্রৌপদী সত্যভামাকে পত্নীর কর্তব্য সম্পর্কে সনাতনী জ্ঞানদান করেন। এমনকি, আমরা পাই এরকম শ্লোকও– ‘ন চন্দ্রসূর্যৌ ন তরুং পুন্নামো যা নিরীক্ষতে/ভর্তৃবর্জং বরারোহো সা ভবেদ্ধর্মচারিণী।।’ (১২/১৪৬/৮৮)। অর্থাৎ, যে নারী স্বামী ব্যতীত কোনও পুংলিঙ্গান্ত (নামের বস্তু), এমনকি চন্দ্র, সূর্য, বৃক্ষও দর্শন করে না, সে-ই ধর্মচারিণী। যুধিষ্ঠির নারীকে অমঙ্গলের মূল রূপে চিহ্নিত করেন (১২/৬)। ভীষ্ম বলেন, নারী দ্বারা বংশ কলঙ্কিত হয় (১২/৪-৮)। কৃষ্ণ বলেন, নারী কলঙ্কিতা হলে বর্ণসংকর হয় এবং তার থেকে নেমে আসে সর্বনাশ।

আমরা দেখি, বৃদ্ধা তাপসী স্বর্গের অধিকার পান না অবিবাহিতা হওয়ায়। এক রাতের জন্য বিবাহিত হয়ে, তারপর প্রাণত্যাগ করতে হয় তাঁকে। মাধবীকে তাঁর মহান দাতা পিতা দান করেন গালবকে, যাতে তাকে তিন রাজার কাছে বেচে গালব গুরু-ঋণ মুক্ত হতে পারেন। স্ত্রীকে অতিথির ‘সেবা’-য় বাধ্য করার প্রথাটি ছিল মান্য। গো, অশ্ব, হিরণের মত নারীকেও ‘দান’ করা যেত। নিয়োগ প্রথায়, সন্তান উৎপাদনের জন্য, তাকে ঠেলে দেওয়া যেত যেকোনও পুরুষের অঙ্কে, শ্বশুরগৃহের পূর্ণ সম্মতিক্রমে। আরও দেখি, যাজ্ঞবল্ক্য বিদূষী গার্গীকে তর্ক করতে নিষেধ করছেন, বলছেন অতিরিক্ত প্রশ্ন করলে মাথা খসে পড়বে তার। সুশিক্ষিত নারীর সামনে ব্রাহ্মণ্যধর্মের অস্বস্তি তাহলে বেশ প্রাচীন বৈকি!

সংস্কৃত সাহিত্যে নারীর সামাজিক মূল্য তার গৃহকর্মনিপুণতায়, প্রজনন ও প্রতিপালন ক্ষমতায়, তার বশংবদতায়। আর তার ব্যক্তিগত ও কাব্যিক মূল্য নিরূপিত হয় রূপ-যৌবন-সৌন্দর্যে। অন্যদিকে, যা ততটাও অভিপ্রেত বা বন্দিত নয়, তা হল তার বিদ্যা, বুদ্ধি, চিন্তাশক্তি। কালিদাসের ‘কুমারসম্ভব’ প্রেমের আরকে জারানো এক প্রলম্বিত কৃচ্ছ্রসাধনের কাহিনী। নারী সেখানে কাঙ্খিত পুরুষকে ‘স্বামী’ হিসেবে পেতে সাধনা করে, যা কাব্যবিচারে মূল্যবান হলেও চিরাচরিত সংস্কারের অনুগামী। ‘মালবিকাগ্নিমিত্র’-তে প্রৌঢ় অগ্নিমিত্র তরুণী মালবিকার প্রেমে উচাটন। সপত্নীরা প্রথমে আপত্তি করলেও পরে উদ্যোগ করেই বিয়ে দেন রাজার। বহুবিবাহ ছিল এতটাই স্বাভাবিক। ‘বিক্রমোর্বশীয়ে’-তে রাজা পুরুরবা ও ঊর্বশীর প্রেমের কথা জানতে পেরে স্বাভিমানী রাজমহিষী ঔশীনরী কী করলেন? অনাবশ্যক জটিলতা থেকে রাজাকে মুক্তি দিতে প্রতিজ্ঞা করলেন, সপত্নীর সাথে ‘প্রীতিবন্ধনে আবদ্ধ থাকব’!

শূদ্রকের ‘মৃচ্ছকটিক’-এও একইভাবে নেপথ্যচারিণী কুলবধূ ধৃতা অসহায়ভাবে গণিকা বসন্তসেনাকে মেনে নেন ‘স্বামী’ চারুদত্তের জীবনে।

‘অভিজ্ঞানশকুন্তলম’-এ বিদায়বেলায় শকুন্তলার প্রতি পালকপিতা কণ্বমুনির সেই উপদেশাবলি তো প্রখ্যাত ও বহুলব্যবহৃত–

‘গুরুজনের সেবা শুশ্রূষা কোরো, সপত্নীদের সাথে প্রিয়সখীর মতো আচরণ কোরো, স্বামী রেগে গেলেও তুমি রেগে যেও না। এই পথেই নারী সুগৃহিনী হয়। এর অন্যথা যারা করে তারা বংশের ব্যাধি।’ (৪/৮)।

অতঃপর, কণ্ব আরও বলেন, ‘কন্যা পরের ধন, তাকে স্বামীর কাছে পাঠিয়ে আজ মন শান্ত হল।’ (৪/২২)।

বোধহয় এই পরিসরে বেখাপ্পাভাবে ভবভূতি সৃষ্ট কিছু নারীচরিত্রই কিছু বেয়াড়া প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় পিতৃপুরুষের মুখের উপর মাঝে সাঝে। ‘উত্তররামচরিত’-এ ভবভূতির সীতা রামচন্দ্র তথা বাল্মীকির মূল্যবোধকে সরাসরি দোষারোপ করেন। ‘মালতীমাধব’ নাটকে রাজাকে সন্তুষ্ট করার জন্য পিতা মালতীকে অপাত্রে দান করতে উদ্যত হলে মালতী বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। বলে– ‘বাবার কাছে রাজার তুষ্টিই বড় হল, মালতী কিছু নয়?’ কিন্তু সংস্কৃত সাহিত্যের সুবিশাল ক্ষেত্রে এ’সব ব্যতিক্রম মাত্র। আরেকটি ব্যতিক্রম হল– ‘রঘুবংশ’-এ ইন্দুমতীর মৃত্যুর পর অজ-র বিলাপ। এই বহুল-উদ্ধৃত শ্লোকটিতে বধূর মানসিক সাহচর্যের কথা আছে, যা সংস্কৃত সাহিত্যে দুর্লভ– ‘গৃহিনী সচিব: সখী মিথ: প্রিয়শিষ্যা ললিতে কলাবিধৌ/করুণাবিমুখেন মৃত্যুনা হরতা ত্বাং কিং ন মে হৃতম।।’ (৮/৬৭)।

বহু বছর পরে তরুণ মজুমদারের ‘বালিকাবধূ’ চলচ্চিত্রে, বিবাহানুষ্ঠানে গৃহস্বামী সত্য বন্দ্যোপাধ্যায় যখন ‘গৃহিণী’ শব্দের তাৎপর্য ব্যখ্যা করেন অভ্যাগতদের সামনে, তখন কালিদাসের এই শ্লোকটিই উদ্ধৃত করেন। কিন্তু একে সামগ্রিক হিন্দু সংস্কৃতির উচ্চারণ ভাবাটা ভ্রান্তিমাত্র হবে। মজার বিষয় হল, গৃহিণীকে সখী, সচিব ইত্যাদি আখ্যায় ভূষিত করে শেষমেশ ছবিটি আদতে রোম্যান্টিসাইজ করে সেই বাল্যবিবাহকেই।

সংস্কৃতির বহতা ধারা বেয়ে, অতএব, আবারও ঘরে ফিরছেন আমাদের গেরস্তালি দুর্গা। ‘যাও যাও গিরি আনিতে গৌরী, উমা আমার বড় কাঁদিছে।’ কেমন করে কাঁদে উমা? লোকগানে যে মেয়ে, শ্বশুরালয়ে নির্বাসিতা, বলে– ‘এ’পারেতে লঙ্কা গাছটি রাঙা টুকটুক করে/গুণবতী ভাই আমার মন কেমন করে রে…’, তার মতো করে কাঁদে কি? বাপেরবাড়ি-শ্বশুরবাড়ির এই চিরায়ত আবর্তে দেবী দুর্গা বাঁধা পড়লেন কেন? কবে থেকে? শাক্ত মতে যিনি আদ্যাশক্তি মহামায়া, ‘দেবীভাগবত পুরাণে’ যিনি স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন: “আমিই প্রত্যক্ষ দৈবসত্তা, অপ্রত্যক্ষ দৈবসত্তা, এবং তুরীয় দৈবসত্তা। আমি ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিব; আবার আমিই সরস্বতী, লক্ষ্মী ও পার্বতী। আমি সূর্য, আমি নক্ষত্ররাজি, আবার আমিই চন্দ্র। আমিই সকল পশু ও পাখি। আবার আমি জাতিহীন, এমনকি তস্করও। আমি ভয়াল কর্মকারী হীন ব্যক্তি; আবার আমিই মহৎ কার্যকারী মহামানব। আমি নারী, আমি পুরুষ, আমিই জড়”– তাঁকে, সেই স্বঘোষিত সর্বব্যাপিনীকে সন্তানসন্ততি আর বাপেরবাড়ি-শ্বশুরবাড়ির গার্হস্থ্যে বেঁধে ফেলে কি খানিক শান্তি পেল সংস্কৃতি?

আর ‘ফেরেন’-ই বা কোথায় তিনি? সংবাদপত্রে পড়লাম, কোনও এক জমিদার গৃহে দশমীর দিন রীতি মেনে পান্তাভাত আর কাঁচালঙ্কা খাইয়ে ফেরত পাঠানো হয় ‘দুর্গতিনাশিনী’ দুর্গাকে। কারণ? সেদিন মেয়েটার শ্বশুরগৃহে ফেরার তাড়া যে! দেরি হলে গঞ্জনা সইতে হবে না?

প্রবাসী ঘরে ফেরে শারদোৎসবে, কিন্তু মেয়েরা ফেরে কোথায়? যে ঘরে ফেরে তারা, সে ঘর কি তার ছিল কখনও? সে-ই কি তার ‘room of one’s own’? সত্যি? নাকি ‘একান্ত ঘর’ বাপেরবাড়ি-শ্বশুরবাড়ি ছকের থেকে দূরেই থাকে?

যেদিন লিখছি, তার দুদিন আগে শুরু হয়েছে বালিকাবধূর ‘যৌনতায় সম্মতি’ নিয়ে জনস্বার্থ মামলাটি– আগেই বলেছি। আর যেদিন লিখছি, ঠিক সেদিনই বজবজের সুভাষনগরের শ্রাবন্তী, আমাদের বারুইপুরের নমিতা বা সোনারপুরের মিতা মণ্ডলের মতোই ‘ঘর’ পেয়েছে অন্য কোথাও শেষমেশ, অন্য কোনও ‘লোক’-এ। শ্রাবন্তী বাড়ির বউ হয়েও পিএইচডি করতে চেয়েছিল। যাজ্ঞবল্ক্যর মতোই শ্বশুরবাড়ির শাপে খসে গেছে তার অস্তিত্ব। বাপেরবাড়িতে ফিরে ফিরে আসত সে। উমার মতো। ‘ঘর’ যদি সত্যি পেত সে বাপের বাড়িতে, উপেক্ষা করতে পারত না কি অশনির ডাক? সে বলে গিয়েছিল শেষবার—‘আর বোধহয় সশরীরে ফিরব না।’ ফেরেনি। ঊমা ফিরছেন আবার। আর কতবার ফিরতে পারবেন?

 

ঋণ স্বীকার:

প্রাচীন ভারত: সমাজ ও সাহিত্য, সুকুমারী ভট্টাচার্য।

মহাভারতে অষ্টাদশী, নৃসিংপ্রসাদ ভাদুড়ি।

রামায়ণ চরিতমানস, বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী।

NCRB Reports.

বিভিন্ন সংবাদপত্র।

2 Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*