খণ্ডচিত্রে মধ্যভারতের গোণ্ড আদিবাসীদের রাজকাহিনী— তিন

অতীন্দ্রিয় চক্রবর্তী

 

(…রাজকাহিনী— দুই-এর পর)

 

৮) মধ্যযুগের রাজারাণীরা-–

মধ্যযুগ, মানে মোটমাট বৌদ্ধধর্মের অপসারণোত্তর কাল থেকে শ্বেতাঙ্গ বণিকের মানদণ্ড হাতে পেনিনসুলার সমুদ্রতটগুলোতে হানা দেওয়ার আগে অবধি চার প্রধান গোণ্ডবংশের সন্ধান মেলে।

১) ‘গড় মণ্ডলা’র রাজবংশ; ২) ‘দেওগড়’-এর রাজবংশ; ৩) ‘খরেলা’-র রাজবংশ; ৪) ‘চন্দ্রপুর’-র রাজবংশ।

৮.১ ‘চন্দ্রবংশ’ তথা গড় কাটেঙ্গা তথা গড় মণ্ডলার রাজবংশ-– মধ্যযুগের এই চার রাজবংশের মধ্যে ‘গড় মণ্ডলা’-র রাজাদের শাসন ছিল বর্তমান মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে। এই বংশকে বৃহত্তর নাগবংশের তিন ধারার এক ধারা ধরা হয়। সম্রাট অশোকের সমসাময়িক ‘উইকে’ বংশের গোণ্ড আদিবাসী রাজা সুহনাল সিংকে খ্রিস্টপূর্ব ২৩০ নাগাদ নাগবংশের প্রতিষ্ঠা করতে দেখা যায়। ‘উইকে’ টোটেমখচিত বংশতালিকায় এই সুহনাল সিং-এর বংশের সতেরো নম্বর রাজা সুলোপ সিং উইকেকে ১৫৭ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ বিস্তার করতে দেখা যায় এই প্রাচীন গোণ্ড রাজপাট। ৩৫০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ ত্রিখণ্ডিত হয় নাগবংশের রাজপাট। একটা খণ্ড হয় কবর্ধা জেলার ‘ভৈরমদেওগড়’ অঞ্চলে ভুরদেব উইকের প্রতিষ্ঠিত রাজঘরানা, দ্বিতীয় খণ্ড তার ভাই ধুরদেব উইকের রাজ্যপাট হয়ে যায় বর্তমান মধ্যপ্রদেশের পাঁচমাঢ়ি এলাকায়, আর, সেই একই সময় এই ধুরদেব-ভুরদেবদের ভাই নাগদেবের জামাতা যদুরায় মাণ্ডাভি প্রতিষ্ঠা করেন বর্তমান মহারাষ্ট্র-মধ্যপ্রদেশ সীমাঞ্চল ‘মাণ্ডলা’র গড়-মণ্ডলা রাজবংশ।

গড় মণ্ডলা বংশের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে মাঁড়াভি বা মাণ্ডাভি গোত্রের যদুরায় ছাড়াও তাঁর তিন ‘পুত্র’ মাধোসিং, জগন্নাথ ও রঘুনাথের নাম চিহ্নিত হয়, প্রতিষ্ঠার সময়কাল চিহ্নিত হয়ে ইঙ্গাব্দ খ্রিস্টোত্তর চতুর্থ শতক। বিগত সহস্রাব্দের চতুর্থ শতক থেকে অষ্টাদশ শতাব্দের অন্তকাল অবধি মোট তেষট্টিজন রাজার হদিশ পাওয়া যায় এই রাজবংশে। ১৪টা শতাব্দী ধরে শাসন করা এই রাজবংশের শেষ রাজা সুমের শাহর সময়কাল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ১৭৯০ খ্রিস্টাব্দকে। রাজাদের ফিরিস্তি দিয়ে লেখার আয়তন ও পাঠকের বিরক্তিবর্ধন অনভিপ্রেত। শোনা যাক গড় মণ্ডলায় ১৪০০ বছরের রাজত্বকালে যদুরায় ছাড়াও এই গোণ্ড রাজবংশের অপর প্রধান রাজা ‘সংগ্রাম শাহ’ (শাসনকাল-– ইঙ্গাব্দ ১৪৭৯-১৫৪৭)-র কথা।

ঠগীদমনে প্রথিতযশা কর্নেল স্লীম্যান তাঁর গড় মণ্ডলার গোণ্ড রাজাদের ইতিহাসে লিখেছেন সংগ্রাম শাহর কথা। রামনগরের শিলালিপি থেকেও পাওয়া যায় এই রাজার কথা। গোণ্ড চেতনে গড় মানে কেল্লা নয়, গিরিমালা-গিরিখাতময় অঞ্চল। সেইরকম ৫২টা গড় অঞ্চলের উপর প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল গোণ্ডওয়ানার সার্বভৌম নৃপতি সংগ্রাম শাহর শাসন। মধ্যপ্রদেশের ভোপাল, হোশাঙ্গাবাদ, রাইসেন, সাগর, নরসিংহপুর, জবলপুর, মাণ্ডলা বালাঘাট জেলাগুলো হয়ে সংগ্রামশাহর শাসনাধীন বাহান্ন পর্বতমালা দক্ষিণ-পূর্ব দিশায় ছড়িয়ে গিয়েছিল ছত্তিসগড়ের বিলাসপুর, দুর্গ হয়ে দক্ষিণ পশ্চিম দেশের নাগপুর অঞ্চল অবধি। দণ্ডকবনের উত্তরের এই বাহান্নপাহাড়ি গোণ্ড রাজ্যপাটের ফলে বাহান্ন পাহাড়ের নাম বিধৃত থাকে গোণ্ড আদিবাসীদের স্মৃতি ও শ্রুতিতে। যেইরকম থেকে গিয়েছে এই ভোপাল অঞ্চলের আরেক গড়-মণ্ডলার রাণীর উপাধিনাম।

১৫৪২ সালে মণ্ডলার মাণ্ডাভি-টোটেমধারী রাজবংশের এই রাজা সংগ্রাম শাহের পুত্র দলপত শাহর বিবাহ সংঘটিত হয় বুন্দেলখণ্ডের গুর্জর-প্রতিহর সম্প্রদায়ের রাজবংশ চান্দেলাবংশের মেয়ে রাণী দুর্গাবতীর সাথে। রাজপুত বর্ণজ চান্দেলা রাজাদের প্রভাব প্রতিপত্তি ততদিনে অপসৃত। তবু, এই বিবাহবন্ধনের মাধ্যমে মোগল শাসকের সাথে পুরনো বৈরিতায় গোণ্ডবংশের সাথে জোট বাঁধার মনোভাব সেইদিন বজায় রাখতে চাইলেন চান্দেলা নৃপতি কিরাত রায়, আদিবাসী ঘরে কন্যাদানকালে।

১৫৪৫ ইঙ্গাব্দে জন্মগ্রহণ করে তাঁর প্রথম পুত্র বীরনারায়ণ। দলপতের অকালমৃত্যুর কারণে তিন বছর বয়সে রীতিপ্রথা মেনে গড় মণ্ডলার সিংহসনে আসীন হলেন, আর তার একবছরের মধ্যেও সেই রয়্যাল ওয়ার্ডের গার্জেন তথা শিক্ষক-মেন্টর-উপদেষ্টা হিসেবে শাসনের লাগাম হাতে নিলেন সেই শিশুর এক খুড়ো চন্দ্র শাহ। কিন্তু রাজপাটের লাগাম রইল দুর্গাবতীর হাতে।

সেই একই সময় জুড়ে আর্যাবর্ত হয়ে দক্ষিণাত্যের দিকে বিস্তৃত হওয়ার তোড়জোড় শুরু করেছে মোগল সাম্রাজ্য। সাম্রাজ্যে সাম্রাজ্যে ঠোকাঠুকি লাগলে, ষোড়শ শতাব্দীর ষাটের দশক থেকেই মোগল-গোণ্ড বৈরিতার পারদ চড়তে থাকে। ১৫৬৪ সালের ২৫শে জুন আকবরের এক জেনারেল আসফ খানের বাহিনীর সাথে যুদ্ধে প্রাণ হারান দুর্গাবতী।

সংঘ পরিবারের রাজনীতির বাহক মধ্যপ্রদেশের জনতা সরকার ও তারপর মঃপ্রঃ-ছঃগঃ-র ভাজপা তাদের হিন্দুত্ববাদী পলিসির সাথে মুসলমান শাসকের হাতে হিন্দু-আদিবাসী অ্যালায়েন্সের লড়াইতে রাজতন্ত্রের ক্ষত্রচরিত্রের যূপকাষ্ঠে কোল্যাটারাল ড্যামেজ এই রাণীকাহিনী তাদের সাজানো ইতিহাসের টেক্সটবুকে টেক্সটবুকে, অঞ্চলের নানান স্থানের নামে তাঁর নাম খচিত করে। রাজস্থানের হিন্দু-রাজাদের সঙ্গে মুসলমান রাজাদের লড়াইতে যেমন আত্মসম্মান রক্ষার্থে আত্মহনন– জহরকুণ্ড, অগ্নিকুণ্ড, রাণি পদ্মিনীর গল্পে পরাজিত হিন্দু রাজপরিবারের নারীদের বিভিন্নভাবে তৎকালীন সমাজব্যবস্থার ঠেলায় মাস সুইসাইডের ঘটনাসমূহকে সম্মান বাঁচানোর বীরাচারী রোম্যাণ্টিকতায় ঠেলে দিয়েছেন রাজপুত-হিন্দু ইতিহাসকারেরা, টডাদি ইংরেজ, বঙ্কিম, অবণঠাকুর, বিদ্যা-ভবন প্রকাশনার ইতিহাসকার পুরুষাকারিগণ। সেই একই ধাঁচায় ফেলে দুর্গাবতীর বিষয়েও পল্লবিত হয়েছে যুদ্ধক্ষেত্রে আহত রাণীর স্বেচ্ছামৃত্যুর কাহিনী। তাই এই নাম ছত্তিসগড়ে সুবিদিত, ভোপালনিবাসী অনেক পণ্ডিত মানুষ হয়তো এ’ও জানেন যে ভোপালের রাণী-তালাও এই রাণী দুর্গাবতীর রাজ্যপাটের সময়েই খনন করা হয়; যদিও দুর্গাবতীর গোণ্ড রাজবংশের সাথে বিবাহসূত্রে গ্রোথিত লিঙ্ক উপেক্ষিত হয় এই ইতিহাসের খাবলা ধরে সেন্সেশানালিস্ট আণ্ডারস্ট্যান্ডিং-এ। তাই পুরুষ ব্রাহ্মণবাদী ইতিহাসকার কদাচ বলবেন না যে দুর্গাবতী গোণ্ডবংশের হয়ে লড়াই করতে গিয়ে শহীদ হয়েছিলেন, তারা কেবলই বলবে যে আকবরের সাথে লড়াই করতে গিয়ে শহীদ হয়েছিলেন দুর্গাবতী। আবার আদিবাসী রাজবংশের প্রাইমোজেনিচার-বিধিত হিসাবে গড়-মণ্ডলার রাজাদের নাম পাওয়া যাবে, বলা হবে যে সংগ্রাম শাহর পর রাজা হল বালক বীরনারায়ণ, তারপর রাজভার সামলাল সেই বালকের খুড়ো চন্দ্র শাহ, আর তারপর রাজা হল বীরনারায়ণের ছেলে প্রেমনারায়ণ। অথচ, আদতে ১৫৪৯-৫০ নাগাদ স্বামী দলপতের মৃত্যুর পর থেকে পনেরো বছর চৌরাগড়ের রাজধানী থেকে রাজ্যপাট সামলেছিলেন দুর্গাবতী, ঠেকিয়ে রেখেছিলেন মোগল সাম্রাজ্যবিস্তারীদের এবং তাদের আসন্ন আগমনে প্রজাদের মধ্যে সামাজিক আর্থিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার অনিয়ম বেনিয়মে সেইসময়ে নিশ্চয় টালমাটাল হয়েছিল গোণ্ড সাম্রাজ্য।

দুর্গাবতীর মৃত্যুর পর আরও প্রায় আড়াইশো বছর টিঁকে থাকে যদুরায়ের মাণ্ডাভি বংশের রাজপাট। উত্তরদিক থেকে মোগল সাম্রাজ্য, দক্ষিণদিকে ডেকান মালভূমিতে ঘাঁটি বানাতে থাকা ডেকান কনকোয়েস্টোত্তর আওরংজেব ও নিজামেরা, পশ্চিমদিক থেকে মারাঠা হিন্দু ভূস্বামী ও রাজারা, পুবদিক থেকে উড়িষ্যা-বিহার-বাংলার রাজারাজরাদের ক্রমাগত বৈরীভাব সত্ত্বেও মণ্ডলার যদুরায়বংশ ইংরেজ আসার কাল অবধি টিঁকে থাকতে পেরেছিল।

যদিও মাঁসারাম কুমরে এই রাজবংশের প্রারম্ভণ দেখাচ্ছেন পুলস্থ্যবংশীয় যদুরায় (৩৫৮ ইঙ্গাব্দ) থেকে, এস বি সীডাম এই গড়-মণ্ডলা রাজবংশের যোগাযোগচিহ্ন ধরিয়ে দিচ্ছেন সম্রাট অশোকের সময়কাল থেকে-– যখন সিরোগড় বা সূরগড় বা সূরজগড়ে ‘নাগ’বংশের প্রতিষ্ঠা করেন ‘উইকা’ টোটেমধারী গোণ্ড রাজা সুহনাল। সম্পূর্ণ রাজ্যকে শাসনের সুবিধার্থে আঠারোটি অনুরাজ্যে ভাগ করেন তিনি। সূরজগড় থেকে ১৫৭ ইঙ্গাব্দে এই নাগবংশের রাজধানী নিয়ে যান গঢ়া কাটঙ্গা এলাকায় সেই বংশের সুলোপ উইকা। তারপর এই বংশের সপ্তম রাজা পোলসিং-এর তিন পুত্র নাগদেব-ভুরদেব-ধুরদেবের মধ্যে, সন ৩৪৫-৪৬ নাগাদ, রাজ্যের বাটোয়ারা নিয়ে বচসা ঘটে। তখন ক্রমে এই নাগদেবের জামাই পুলস্থ্য বংশের ‘যদুরায় মাণ্ডাভি’ গড় কাটঙ্গা তথা গড় মাণ্ডলার এই পুলস্থ্য আদিবাসী বংশের স্থাপন করেন। একই সময়ে, এই সুহনাল উইকার রাজবংশের আর দুই শরিক ভুরদেও ও ধুরদেও বর্তমান ছত্তিসগড় রাজ্যে কবর্ধা জেলার ভৈরমদেওগঢ় আর মধ্যপ্রদেশের পাঁচমাঢ়ি অঞ্চলে উইকে বংশের আর দুই ধারার রাজপাট স্থাপন করেন।

৮.২ ভৈরমদেওগড়ের রাজবংশ-– ভুরদেও উইকে আজকের ছত্তিসগড়ের কবর্ধা অঞ্চলের ভৈরমদেওগড় অঞ্চলে এই রাজবংশের স্থাপনা করেন খ্রিস্টজন্মের সাড়ে তিন-চার শতাব্দী পর। পঁয়ত্রিশ পুরুষ রাজপাট সামলে, ভৈরমদেওর মন্দিরাদি নির্মাণ করে, ১৪শ শতাব্দীতে, হয়তো বস্তার অঞ্চলে অন্নামদেও-দ্বিতীয় প্রতাপদেওর উত্তর-কাকাতিয়া বংশের সাথে লড়াই করে অথবা দিল্লি সালতানেতের আসন্ন অগ্রাসনে, অথবা অন্য কোনওভাবে বিলীন হয় এই নাগবংশের উইকে টোটেমধারী গোণ্ড রাজাদের সাম্রাজ্য।

৮.৩ নাগবংশের তৃতীয় খণ্ড হিসেবে পাচালগড় বা পাঁচমাঢ়হি অঞ্চলে বংশস্থাপন করেন ভুরদেওর ভাই ধুরদেও। সরগোড়া, জটাসুর, লোকাসুর, ভুজঙ্গরাজ, পুল্লীসুর, গবরাসুরের মতো গোণ্ডবংশের ‘অসুর’ রাজাদের আঠারো পুরুষ ধরে রাজ্যপাট চলে এই পাঁচমাঢ়হিতে। খ্রিস্টাব্দ দশম শতাব্দীতে এই উইকে-বংশের রাজা ঢোলপুয়ার পাচালগড়ের রাজ্যপাট খুইয়ে আবার রাজপাট গড়ে তোলেন ছিন্দওয়াড়া-হরিয়াগড় অঞ্চলে।

৮.৪ তেইশ পুরুষ ধরে, ষোড়শ শতক অবধি, ছিন্দওয়াড়া অঞ্চল শাসন করে ঢোলপুয়ার-উইকে প্রতিষ্ঠিত হরিয়াগড়-ছিন্দওয়াড়ার নাগবংশীয় উইকে রাজারা। তারপর সেই ছিন্দওয়াড়াতেই দেওগড় রাজবংশের স্থাপনা করেন গোণ্ড পুরাণপুরুষ জটবা খণ্ডাৎ। পাঁচমাঢ়হির ধুরদেব উইকের বংশের রাজাদের মতোই, সেই বংশেরই ঢোলপুয়ার কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হরিয়াগড়ের রাজারাও নামের পরে ‘অসুর’ ব্যবহার করতেন অনেকেই-– মঙ্গাসুর, কোলাসুর, জোগাসুর, জয়কাসুর, বানাসুরেরা সকলে এই বংশেরই রাজা।

(এরপর …রাজকাহিনী— চার)

 

1 Trackback / Pingback

  1. খণ্ডচিত্রে মধ্যভারতের গোণ্ড আদিবাসীদের রাজকাহিনী— চার – ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*