অনন্তের সন্ধানে

অরুণাভ সেনগুপ্ত

 

পর্ব এক – প্রাণসম্ভব

“Animals that respire are true combustible bodies that burn and consume themselves.”

–Antoine Lavoisier

 

যাত্রামঙ্গল : দ্য ভয়েজ অফ দ্য বীগল..

১৮৩১ সালের ২৭শে ডিসেম্বর এইচ এম এস বীগল-এ উঠছিল এক বিনা মাইনের চাকুরে.. দু বছরের এই সামুদ্রিক চাকরিতে যোগ দেবার আগে অবধি ছোকরার ধারণা ছিল না এই দু বছর ঠেকবে গিয়ে পাঁচে, আগামী বছরগুলোতে, শতকগুলোতে তার এই ঘুরে বেড়ানোর প্যাশন পরিচিতি পাবে ইতিহাসের আশ্চর্যতম ভ্রমণের।

প্লাইমাউথে অপেক্ষারত ওই যুবকের জানা সম্ভবও ছিল না…. কেমব্রিজের বছরগুলোতে ক্রিশ্চিয়ান কলেজের ক্লাসরুমের ছায়াও মাড়ায়নি… সময় কেটেছে আপটাউনের ক্লাবগুলোতে, তাস আর মদ্যপানে– অনন্ত অস্থিরতার মধ্যে… এর মধ্যে বটানিস্ট জন স্টিভেন হেনস্লোর সাথে আলাপটা তাকে এগিয়ে দিয়েছিল অজানা পথে। ঈশ্বর সাতদিনে তৈরি করেছেন মহাবিশ্ব– চিরকালের বোকা বোকা এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর কোনও পরিকল্পনা তখনও ছিল না চার্লস ডারউইন নামের ওই ফাঁকিবাজ ছেলেটার। শুধু ঘোরার নেশায় হেন্সলোকে দিয়ে ক্যাপ্টেন রবার্ট ফিটজরয়কে পটিয়ে একটা নিখরচায় দেশ ঘোরার ধান্দা করা ছাড়া আর কোনও প্ল্যান ডারউইনের মাথাতেও আসেনি।

জাহাজে উঠে বোঝা গেল কি সাংঘাতিক কেলো করে বসে আছে সে, সি সিকনেস সম্পর্কে আগের অভিজ্ঞতা ছিল না, থাকার কথাও নয়… চারপাশের সফেন সমুদ্র অকারণ বিভীষিকা হয়ে ওঠার আগেই, একটা কাজ পেয়ে গেল চার্লস… যে কাজে চাকরিটা সে পেয়েছিল, সেটাইতেই ক্রমশঃ উৎসাহ বাড়তে লাগল। সমুদ্রের বিরাটে ইতিউতি ছড়ানো ছোট ছোট ভূখণ্ড কী অদ্ভুত জীববৈচিত্রের আলোকমালা সাজিয়ে বসে আছে, ডারউইনের আগে এত নরম ভালোবাসা আর পবিত্রতম কৌতূহল নিয়ে দেখেনি কেউ… নেশা হয়ে গেল ভদ্রলোকের… ছেলে থেকে ভদ্রলোকের এই পরিণতিটাও সমুদ্রের ধারের আর্চিপালাগোগুলোতেই হয়েছিল।

মাসের পর মাস, জাহাজে সি সিকনেসে পড়ে থাকা, আর থামলেই খাতা বগলে ডাঙায় ছোটা… এই রুটিনে ক্লান্ত হচ্ছিলেন না যেন… এর মধ্যেই চোখের সামনে চলে এল জীববিজ্ঞানের তীর্থক্ষেত্র, গালাপাগোস আর্চিপালাগো। ছোট্ট একরত্তি মাটির তাল চিরকালের জন্য ঘুরিয়ে দিল বিজ্ঞানসাধনার মোড়… গালাপাগোসে পা দেবার সময় ডারউইন নিজেও জানতে পারেননি, শুধু বিবর্তনবাদ নয়, সমগ্র আর্থসামাজিক পরিকাঠামোর সমস্ত প্রিকনসিভড ধ্যানধারণার মূলে কুঠারাঘাত করার ব্রাহ্মমুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি।

প্রোফেসর হেন্সলো একটা কাজ করেছিলেন, জাহাজে ওঠার আগে ভূতত্ত্ববিদ চার্লস লায়েলের লেখা প্রিন্সিপলস অফ জিওলজি বইয়ের একটা কপি তুলে দেন। হেন্সলো নিজে লায়েলের ধর্মবহির্ভূত তত্ত্বের খুব একটা মারকাটারি সমর্থক ছিলেন না, ডারউইনকে ওই বই দিয়েছিলেন টাইমপাস হিসেবেই… তিনি তখন আন্দাজও করেননি ওই ধর্মবিরোধী কাফের তত্ত্বের প্রেমে পড়ে গিয়ে ডারউইন চার্চের কী সর্বনাশ করতে চলেছেন… জানলে আদৌ দিতেন কিনা সন্দেহ। ডারউইনের বিবর্তন তত্ত্বের পিছনে লায়েলের ভূমিকা এতটাই যে, তাকে ছাড়া এই গল্পই অসম্পূর্ণ।

দক্ষিণ আমেরিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে অভিযান চালিয়ে এত বৈচিত্রের প্রাণীর সমাহার, তাদের মধ্যকার বিভিন্ন সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য তাকে বিস্মিত করে তোলে। এরমধ্যেই গালাপাগোসের অদ্ভুত ঘটনা তাঁর চিন্তাপ্রবাহকে কয়েক মাইল এগিয়ে দেয়।

গালাপাগোসের দ্বীপে ডারউইন ১৩ প্রজাতির ফিঞ্চ খুঁজে বার করেন। এই ভদ্রলোক আর ভদ্রমহিলারা আকারে আকৃতিতে সাম্যবাদী হলেও ঠোঁটের আকৃতিতে ঝগড়া লাগিয়ে বসে আছেন। কারও ঠোঁট বীজ খুঁটে খাওয়ার উপযুক্ত, কেউ বা পোকামাকড় খেতে পছন্দ করেন, একটু অভিজাতরা আবার ফুল খুব ভালোবাসেন, খেতে।  ডারউইন এদের দেখে সিদ্ধান্ত নেন যে স্রেফ খাবারের সংঘাত এড়ানোর জন্য এরা সম্পূর্ণ আলাদা আলাদা রূপ ধারণ করেছে।

বিভিন্ন জীবের মধ্যে এলাকা এবং সময় বিশেষে এই নিবিড় সম্পর্কের কারণ উত্তরাধিকার ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না, অর্থাৎ এই কাছাকাছি ধরনের প্রজাতিরা সাধারণত খুব কাছাকাছি এলাকায় বাস করে কারণ তারা একসময় একই পূর্বপুরুষ থেকে পরিবর্তিত হতে হতে বিভিন্ন প্রজাতিতে পরিণত হয়েছে।

অর্থাৎ, পারিপার্শ্বিক পরিবেশের সাথে বেঁচে থাকার একটা অনন্ত দ্বন্দ্ব আছে, সেই সংঘাতের সমাধান হিসেবে নিজেকে বদলানো প্রয়োজন… এই বদল যখন পরিবেশ দ্বারা সমর্থিত হয়… তখন এক্কেবারে আলাদা নতুন প্রজাতি জন্মলাভ করে।

দাড়িওয়ালা ডারউইনের এই সংঘাত ও সৃষ্টির তত্ত্ব যে আর এক দাড়িওয়ালাকে উত্তেজিত করে পুরো পৃথিবীটাকেই পালটে দিতে চাইবে, তা বোধহয় অরিজিন অব স্পিসিসের ভবিষ্যৎ লেখক তখন ভাবতেও পারেননি।

দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ : মার্ক্স সংক্রান্ত কচকচি ও দেবীপ্রসাদ

ডারউইন যে সময়প্রবাহে পৃথিবী তোলপাড় করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তার সমান্তরালে আর এক দাড়িবুড়ো যুগপুরুষ হেগেলের দ্বন্দ্বমূলক ভাববাদ থেকে শুধু দ্বান্দ্বিকতাটুকুকে মুক্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছেন, প্রসঙ্গত তখনও লোকটার ঘন দাড়ি হয়নি।

মার্ক্স চুড়ান্ত ভাববাদী ও মহাজিনিয়াস দার্শনিক হেগেলের ভাবশিষ্য… প্রকৃত ভাবশিষ্যরাই গুরুকেও প্রশ্ন করার ক্ষমতা রাখেন… এ লোকের ভেতরেও দম ছিল… হেগেলের অরিজিনাল বা অ্যাবসলিউট আইডিয়াকেই চ্যালেঞ্জ করে বসলেন… বলতে নেই ডারউইনের তত্ত্ব তাঁকে বেশ কিছুটা সাহস যুগিয়েছিল নিশ্চয়ই… তাই ইভোলিউশন বিষয়ে কোনও আলোচনাই মার্ক্সকে বাইরে রেখে করা সম্ভব নয়।

মার্ক্সের দর্শনের প্রধানত দুটি দিক, একটি বস্তুবাদ আর অন্যটি এই দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি বা ডায়ালেকটিক্স। এই ডায়ালেক্টিক্স বা দ্বান্দ্বিকতার জায়গা থেকে জীববিবর্তনকে কানেক্ট করা যেতে পারে… ডারউইনীয় অ্যাকসিডেন্ট বা আকস্মিকতাই হোক আর আধুনিক মতবাদ অনুযায়ী জিন ফ্রিকোয়েন্সির পরিবর্তনই হোক, পারিপার্শ্বিকের সাথে নিত্যনৈমিত্তিক দ্বন্দ্ব না থাকলে বিবর্তনের দরকারটাই পড়ত না।

বাই দ্য ওয়ে, এই যে হিব্রু আওড়ে যাচ্ছি এতক্ষণ ধরে, কী এই দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ, খায় না মাথায় দেয়, না টয়লেটের টিস্যু হিসেবে ব্যবহার করে??

প্রথমে দ্বান্দ্বিকতা বোঝা যাক একটু, যে কোনও দর্শন বা আইডিয়ার একটা বিরুদ্ধ দার্শনিক পটভূমিকা থাকে, এই দুইয়ের মধ্যে ব্যালান্সটাই নির্মাণ, কিন্তু এই নির্মিত সিস্টেম কখনওই অনন্তকাল স্থায়ী হতে পারে না… আইডিয়া আর তার বিরুদ্ধ আইডিয়ার সংঘাতে নতুন আইডিয়া আর নতুন সিস্টেম জন্ম নেয়, পুরনো নির্মাণ ধূলিসাৎ হয়ে নতুন নির্মাণ গড়ে ওঠে… এই সংঘাতের মাধ্যমে নতুন আইডিয়ার জন্মটাই ডায়ালেকটিক্স… প্রাথমিক আইডিয়াটি দর্শনের ভাষায় থিসিস, বিরুদ্ধ আইডিয়াটি অ্যান্টিথিসিস আর নবনির্মাণটি সিন্থেসিস… এই দ্বান্দ্বিকতার নদী সর্বত প্রবহমান, অর্থাৎ নতুন সিসটেমটি অর্থাৎ সিন্থেসিসটিও আবার থিসিস হয়ে উঠতে পারে ও তার বিরুদ্ধেই আবার একটি অ্যান্টিথিসিস গড়ে নেওয়া যেতে পারে। প্রবহমানতাই একে বায়োলজির এত কাছের করেছে।

বিবর্তনে পরিবেশ ও জীবের বা জিনের সংঘাত আর মার্ক্সিজমে পুঁজি আর শ্রমের সংঘাত দুটিকেই এই ছাঁচে ফেলে দেওয়া যায়।

এবার আসা যাক বস্তুবাদে, এর মূল কথা, বস্তুই সব। পৃথিবীর সবকিছুই বস্তু দ্বারা গঠিত এবং তা সর্বদা গতিশীল ও পরিবর্তনশীল। বস্তুবাদী দর্শনে মন বা আত্মার কোনও আলাদা অস্তিত্ত্ব নেই, ঈশ্বর নিছকই উর্বর বা বর্বর মস্তিষ্কের কল্পনামাত্র। অর্থাৎ এই অনন্ত মহাবিশ্ব ও তার মধ্যে নিতান্ত তুচ্ছ একটি গ্রহ এই পৃথিবী, এর পিছনে কোন ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন নেই, পুরোটাই কিছু ট্রায়াল অ্যান্ড এররে ঘটিত রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলাফল।

বস্তুবাদের প্রবর্তক কিন্তু মার্ক্স নন… মার্ক্সের বহু সময় আগে (বেদবাদীরা নাচুন) চার্বাক নামধারী দার্শনিকগোষ্ঠী বস্তুবাদের জন্ম দেন, এই দার্শনিক মতবাদকে লোকায়ত মতবাদ নামেও ডাকা হয়… অধ্যাপক দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের বিস্তারিত কাজ এই অন্ধকারে থাকা রেবেল দার্শনিকদের খ্যাতির আলোয়, কিংবা বলা ভালো কুখ্যাতির লাইমলাইটে নিয়ে আসে।

এ বিষয়ে বেশি বললে লেখাটা মাল্টিলেয়ারড হয়ে যাবে, আমি নিজেকে টারান্টিনো টাইপ প্রতিভাশালী তো ভাবি না, তাই লিনিয়ার স্টোরিলাইন রাখতে মণিভদ্রের একটা টীকা দিয়ে চার্বাকদের ভুলে যাব।

“এবম অমী অপি ধর্মচ্ছদ্মধৃতা: পরবঞ্চনপ্রবাণা: যৎকিঞ্চিৎ অনুমানাদিদার্ঢ্যম আদর্শ্যব্যর্থং মুগ্ধজনান স্বর্গাদিপ্রাপ্তিলভ্য ভোগাভোগ প্রলোভনয়া ভক্ষ্যাভক্ষ্যগম্যাগম্যহেয়ো পাদেয়াদি সংকটে পতিয়ন্তি, মুগ্ধধার্মিককান্ধ্যম চ উৎপাদয়স্তি।।”

অর্থাৎ লোকায়ত মতে প্রত্যক্ষপরায়ণতা ধর্ম নামক প্রবঞ্চনার প্রতিষেধক, কেননা অনুমান প্রভৃতির নজির দেখিয়ে পরবঞ্চনাপ্রবণ ধর্মব্যবসায়ীরা মানুষের মনে স্বর্গাদিপ্রাপ্তি সংক্রান্ত অন্ধ মোহের সঞ্চার করে, এই কারণেই প্রত্যক্ষ ছাড়া অন্য প্রমাণ স্বীকার করা মানুষের পক্ষে নিরাপদ নয়।

মার্ক্সের হাই ভোল্টেজ স্পার্ক– পুন:কচকচি

মার্ক্সের পি এইচ ডির বিষয় ছিল “দ্য ডিফারেন্স বিটুইন ডেমোক্রিটিয়ান অ্যান্ড এপিকিউরিয়ান ফিলোসফি অফ নেচার”। এই সময়টাতেই হেগেল আর ফুয়েরবাখের লেখার সংস্পর্শে আসেন মার্ক্স। ডারউইন যেমন পরবর্তীতে ম্যালথাস দ্বারা প্রভাবিত হবেন, তেমন মার্ক্সও হবেন বটে, কিন্তু তিনি বেড়ে উঠবেন ফুয়েরবাখের হাত ধরে, হেগেলের বিরোধিতা করে। এই অদ্ভুত চিত্রনাট্যের তখনও অনেক বাকি ছিল।

হেগেল ভাববাদী, ডায়ালেক্টিক্স-এর অনুসারী অবশ্যই, কিন্তু ভাববাদী.. তাঁর ধারণায় এই বিশ্ব প্রপঞ্চময়, অনেকটা শংকরের শূন্যবাদের মতই… এক ও অবিনশ্বর অ্যাবসলিউট আইডিয়ার অন্তর্দ্বন্দ্বের প্রকাশ এই মহাবিশ্ব… বাস্তবজগৎ এই অরিজিনাল আইডিয়ার ভিতরকার দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ… রিয়ালিটি বলে কোনও সংস্থার কোনও অস্তিত্বই নেই।

স্বাভাবিকভাবেই, মার্ক্সের এই ভেগ আইডিওলজি হজম হল না, হেগেলের ডায়ালেক্টিক্সটা তিনি নিলেন, কিন্তু ভাববাদটা নিলেন না… দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের জন্ম হয়ে গেল… পৃথিবী বদলানোর হাজার কারিগরকে স্বপ্ন দেখানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেল।

দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের তিনটি রুল বা আইন আছে–

১. ইউনিটি অফ দ্য অপোসিট– যেমন পুঁজি ও শ্রমের বুনিয়াদী সহাবস্থান, অথবা পারিপার্শ্বিক পরিবেশের সাথে জীবের খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা, অথবা… প্রিবায়োটিক পৃথিবীতে জৈব অণুর প্রথম সহাবস্থান…

২ নেগেশন অফ দ্য নেগেশন…  অর্থাৎ এই সহাবস্থানে ফাটল, কারণ একই সিসটেমে চিরকালীন সহাবস্থান সম্ভব নয়, স্রেফ সম্ভব নয়… যেমন ট্রায়াল অ্যান্ড এরর পদ্ধতিতে মনোমারিক (এক অণুক) জৈব অণু থেকে জটিল পলিমারের সৃষ্টি, বা পুঁজিবাদের সাথে শ্রমের বিরোধে নতুন পরিবর্তন।

৩. কোয়ান্টিটেটিভ চেঞ্জ টু কোয়ালিটেটিভ চেঞ্জ… নতুন সোস্যাল অর্ডারের উৎপত্তি, বা নতুন প্রজাতিরও…

উদাহরণগুলো থেকেই প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে, কেন মার্ক্সের দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ না পড়ে ইভোলিউশন পড়ার মানে হয় না কোনও। এখন প্রশ্ন হল, দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ যদি বিবর্তন ও প্রাণের উৎপত্তির ক্ষেত্রে ঠিকও হয়, তবে তাঁর প্রেডিকশন অনুযায়ী সোস্যাল অর্ডারের চেঞ্জ এল না কেন? কেন প্রকৃত প্রোলেতারিয়েত শাসন প্রতিষ্ঠিত হল না? তার কারণ, দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের ধারণায় ভুল না থাকলেও মূল মার্ক্সবাদের প্রেডিকশনেই কিছু ভুল ছিল।

মার্ক্সের সমালোচনা আমার উদ্দেশ্য নয়, ধৃষ্টতাও নেই, তবু দু এক কথা বলছি কারণ এই জায়গাটা পরিষ্কার না করে পরের সিঁড়িটাতে পা দিতে পারছি না।

আমি নিজে মার্ক্সবাদী, কিন্তু এটুকু আমার স্থির বিশ্বাস, মার্ক্সবাদ বিজ্ঞান নয়, জাক দেরিদা মার্ক্সিজমের মরাল কোডের প্রশংসা করেছেন, আমরাও যদি সেভাবেই নিই তবে দোষ আছে কি কিছু? মার্ক্সের মতবাদ সে যুগে ঠিকই ছিল, কিন্তু ভবিষ্যতের কথা ভেবে মার্ক্স মেধাশ্রমকে তাঁর সমাজ পরিকল্পনার মধ্যে আনেননি, মেন্টাল লেবার একটা লেবার এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণই বটে, একথা পরবর্তী মার্ক্সিস্টদের চিন্তা করা উচিৎ ছিল, তা তাঁরা করেননি, বরং মার্ক্সিজমটাকে মৌলবাদ করে দিয়েছেন, স্তালিনের সময়কার পার্টিজান সাহিত্য সংস্কৃতি নিয়ন্ত্রণ ও জেনেটিক্সের বর্জন সে গল্পই তো শোনায়। কোনও তত্ত্বে ফ্লেক্সিবিলিটি না থাকলে তা গ্রহণযোগ্যতা হারায়, এটা তাঁরা ভুলেছিলেন।

এখানে একটা প্রশ্ন আসে, ইভোলিউশন নিয়ে লিখতে গিয়ে আমি মার্ক্সের ত্রুটির পিছনে পড়েছি কেন… এইটুকু বলতে চাই, মার্ক্সবাদ যে অসাধারণ হয়েও বৈজ্ঞানিক নয়, এবং দ্বন্দ্বের নিয়মেই এরও সতত পরিবর্তন দরকার, এই কথাটা প্রতিষ্ঠা না হলে বিবর্তনের আধুনিকতম ধারণাকে হজম করা যাবে না।

টেরি ঈগলটন তাঁর মার্ক্স অ্যান্ড লিটারারি ক্রিটিসিজম-এ বলছেন… “Marxism has indeed, in our time, suffered the greatest defeat in it’s turbulent history. But why? Because the system it opposes has eased up, changed beyond recognition,… That the political left has proved unable to break through.”

ডঃ রামকৃষ্ণ মুখার্জী এই সেদিনও এই মেন্টাল লেবারের পক্ষে সওয়াল করেছেন। আরও একটা কথা, দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদে দ্বন্দ্বের বিষয় কি শুধুমাত্র শ্রেণী? সংস্কৃতি, লিঙ্গ, সাহিত্য এগুলি কি দ্বন্দ্বের বিষয় হতে পারে না?

“The history of all hitherto existing socially is the history of class struggle” এ কথা অতি সরলীকরণ ছাড়া আর কিছু নয়।

অমর্ত্য সেন যথার্থই বলেছেন “শ্রেণী ছাড়াও আসলে অসাম্যের অনেক উৎস আছে, অসুবিধা আর বৈষম্যের সমস্ত কিছু কেবলমাত্র শ্রেণী দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হবে– এই ধারণা ত্যাগ করতে হবে।”

যাক গে, জেনগেনকে বোর করা আমার উদ্দেশ্য নয়, মোদ্দা কথাটা হল, মার্ক্সবাদের সাথে ইভোলিউশনের তুলনায় যারা আপত্তি জানান, তাদের উদ্দেশ্যে আমার এইটুকুই বলার… দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ যা কিনা মার্ক্সীয় দর্শনের বুনিয়াদী সংগঠন, তার সাথে বিবর্তন পদ্ধতির বিরোধ নেই, মার্ক্সের কিছু কিছু প্রেডিকশন নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, ইভোলিউশনে দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের প্রবেশ অস্বীকার করার নয়।

ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন: সৃষ্টিতত্ত্বের ভাঁওতা ও ভণ্ডামি

ডারউইন যে জায়গাগুলোকে আকস্মিক ও অ্যাকসিডেন্ট বলে এড়িয়ে গেছেন, মানে প্রাণ কী করে এল এই নিষ্প্রাণ পাথরখণ্ডের বুকে, তা আজ অনেকটাই প্রকাশিত, আবার বলা যায় তত্ত্বের ভিড়ে এখনও অনেকটাই কনফিউসিং। তবু, প্রাণের সৃষ্টিটা যে কেউ করে দেয়নি, এই ডিজাইন যে পারফেক্ট নয় এবং ক্রমশ পারফেকশনের দিকেই চলেছে এমন বলাটাও ঠিক নয় এটুকু সিদ্ধান্তে আমরা আসতেই পেরেছি। অদ্ভুতভাবে এখনও অজস্র লোকের অস্তিত্ব আছে যাঁরা বিবর্তন, তা রাসায়নিক হোক বা জৈব, এই কঠিন বৈজ্ঞানিক সত্যের মধ্যেও ঈশ্বরকে খোঁজার চেষ্টা চালিয়ে যান। এই লোকগুলোকে ভদ্রলোক বলতে পারছি না। চালাক হয়ে গেছে এরা, সাতদিনে পৃথিবী সৃষ্টির কথা আর বলে না, অন্যান্য ভণ্ডদেরই মতো পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নিজেকে মোল্ড করে নিয়েছে। তাদের এখন দাবী, যে যে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় প্রাণ এসেছিল মহীমণ্ডলে, তা নাকি র‍্যান্ডম নয়, কোনও মহান অস্তিত্ত্বের ডিজাইন। আর সেই প্রাথমিক কোষ থেকে আজকের মানুষ অবধি, ঈশ্বর সব করেছেন নিজ হাতে, পারোফেকোতু।

ভাইটুগণ, বলুন তো আমায়, কুড়ি বিলিয়ন বছর আগে যদি বিগ ব্যাং হয়, আর সাড়ে চার বিলিয়ন বছর আগে পৃথিবী, তবে আপনাদের ঈশ্বর এত সময় নিলেন কেন? গাড়ু নিয়ে কোনও ঐশ্বরিক ঝোপের পিছনে গিয়েছিলেন কি? আর এতগুলো গ্রহ আশেপাশে থাকতে শুধু এ তুচ্ছ ধরাধাম কেন? প্লুটো নয় কেন? গ্রহ তো কম পড়ে নাই…

পারবেন না কাকা, সাইড হয়ে যান। সৃষ্টিতত্ত্বে ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন নেহাত ফালতু।

প্রাণের আগমন: সূচনা

তাহলে এলাম আমি কোথা থেকে? এই যে আমি এবং আপনি, যারা এই আলোচনার অংশীদার, আমরা কী দিয়ে তৈরি? এর উত্তরে জানাই, আপনার পাশের কাঠের টেবিলটা, মেটালিক অবজেক্টগুলো, এমনকি আপনার মেশিনের কলকব্জাগুলো যা দিয়ে তৈরী!! আজ্ঞে হ্যাঁ, সেম টু সেম… এক্কেরে ইয়ান্না রাস্কেলা। তাহলে টেবিলটা প্রেমে পড়ছে না কেন, আমি কেন পড়ছি?

তার কারণ বিশেষভাবে তৈরি কিছু ম্যাক্রোমলিকিউল, সেই বিশেষের মধ্যে আবার একজন আছেন, যিনি কিনা বংশগতির ধারক ও বাহক… নিউক্লিক অ্যাসিডস, DNA & RNA এবং সমস্ত গুরুত্ববহ উৎসেচকের সারবস্তু, প্রোটিন।

কারা এই ডি এন এ, আর এন এ আর প্রোটিন? কীভাবে ডি এন এ-তে সাংকেতিক ভাষায় ইতিহাস লেখেন প্রকৃতি? অতীত যাত্রার মাঝে বর্তমান প্রশ্ন তুলছে আমাদের কাছে। বর্তমানের গ্রন্থাগার বহু তথ্যের ভাণ্ডার নিয়ে অপেক্ষা করছে, অতীতে আবার পাড়ি দেবার আগে সেখানে একবার চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক।

কোষ এক লাইব্রেরি, লাইব্রেরিয়ান অত্যন্ত হিংসুটে, বই সে নিয়ে আসতে দেয় না কখনও, দরকার থাকলে নকল করে নাও, বলে সে।

এই বিশাল লাইব্রেরির এক একটা বই ডি এন এ, পুরো বই নিয়ে তো বেরোনো যাবে না, করে নিলাম ফোটো কপি, শুধু যেটুকু আমার দরকার, আর এন এ। এইবার? দেখা গেল হয়ে গেছে ব্লান্ডার, এই ভাষা অজানা… তাহলে? ডাকা হল অনুবাদক কে… এয়ারটেলের অনুবাদক নয়, এ লোক অনেক এফিসিয়েন্ট… নাম রাইবোজোম… সে আর এন এ-কে ট্রানস্লেট করল… ট্রানস্লেটই করল… তৈরি করল নতুন ভাষা, প্রোটিন… নিউক্লিক অ্যাসিডের অক্ষর থেকে অক্ষর পরিবর্তিত হল অ্যামাইনো অ্যাসিডে… যা কিনা প্রোটিনের বিল্ডিং ব্লক।

প্রথম পদ্ধতিটি ট্রান্সক্রিপশন, দ্বিতীয়টি ট্রানস্লেশন, নিজগুণেই… আবার ওই বিশাল বইটিও নিজে নিজের সম্পূর্ণ নকলে সক্ষম, এই পদ্ধতিটি আবার রেপ্লিকেশন।

নিউক্লিক আসিড আবার চাররকম ক্ষারের সংমিশ্রণে গঠিত। অ্যাডেনিন, গুয়ানিন, সাইটোসিন, থাইমিন আর RNA-র ক্ষেত্রে থাইমিনের জায়গায় ইউরাসিল। DNA-র সমস্ত বক্তব্যের বর্ণমালা হল এই A T G C, The Language Of God. এই ঈশ্বরীয় ভাষা অনুদিত হয় মানব ভাষায়, আরও বলা ভালো কোষীয় ভাষায়, যার বর্ণমালায় রয়েছে কুড়িটি অ্যামিনো আসিডের নাম।
তাহলে পুরো গল্পের যদি একটা ছবি আঁকা যায় তবে সেটা দাঁড়াবে অনেকটা এইরকম… যাকে আমরা বলব কেন্দ্রীয় তত্ত্ব বা সেনট্রাল ডগমা।

DNA———————->RNA——————->PROTEIN
   |    transcription              translation
   |
   | replication
   |
DNA

প্রাণের আগমন বুঝতে হলে, শুধু ডি এন এ, আর এন এ আর প্রোটিনের সম্পর্ক জানলেই হবে না, আমরা আর একটু এগিয়ে যাই বরং, আর এন এ কেন জীবসভ্যতার আদিমতম পায়ের ছাপ, সেটা জানার জন্য আর একটু হেঁটে যাবার প্রয়োজন আছে আমাদের।

বারবার বলে চলেছি, আমি লোকটা কেমন তা কোনও বিধাতাপুরুষ ঠিক করে দেন না, বা বলা ভালো বিধাতা কোনও অলৌকিক সারবস্তু নয়, অসাড় কিছু রাসায়নিক বিল্ডিং ব্লক– প্রোটিন। কিন্তু কীভাবে? কখন প্রোটিনের উপর এতটা গুরুত্ব আরোপিত হল? ঠিক যখন থেকে সে জৈব অনুঘটকের কাজ করতে শুরু করল।

অনুঘটক ছাড়াও বিক্রিয়া হতে পারে, এটুকু আমরা সব্বাই জানি, তাহলে জৈব অনুঘটক, মানে উৎসেচককে এতটা সম্মান দেওয়ার মানে কী? মানেটা হল, জলীয় মাধ্যমে রাসায়নিক পদার্থগুলো খুব মুডি হয়ে যায়, নিজের ইচ্ছায় বিক্রয়ায় অংশ নিতে চায় না, তাদের ঘাড় ধরে কাছাকাছি এনে বিক্রিয়া করানোর দরকার পরে। সেই কাজটা খুব দায়িত্ববান ভদ্রলোকের মতো বা এক্সপেরিয়েন্সড লাভ গুরুর মতো, উৎসেচকগুলো অক্লান্ত করে চলে। আর কে না জানে, কোষের ৭০ শতাংশ জল?

কোষের সমস্ত রাসায়নিক বিক্রিয়া, বিপাক– তা মস্তিষ্কজাত “কেমিক্যাল লোচা” হোক বা বয়ঃসন্ধির অভিমানাহত হরমোন সংশ্লেষ, সমস্ত উৎসেচক নিয়ন্ত্রিত বিক্রিয়ায় সম্পাদিত হয়।

উৎসেচককে চরিত্রগঠনের দায়িত্ব দিয়ে তাই আমরা ভুল করছি না মোটেই।

এখন প্রশ্ন হল, কী কী রইল পড়ে হাতে, চোখ বুলিয়ে নিই—

ডি এন এ, আর এন এ আর প্রোটিনের এই প্রবহমানতা জিইয়ে রেখেছে লাইফ ফোর্সকে, ডি এন এ ও আর এন এর একক নিউক্লিক অ্যাসিড, প্রোটিনের অ্যামাইনো অ্যাসিড।
এই তিন জন, অর্থাৎ কোষীয় ট্রিনিটি, কেউ কাউকে ছাড়া তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারে না, উৎসেচকের নাক গলানো ছাড়া কেন্দ্রীয় তত্ত্বের বিক্রিয়াগুলি অসম্ভব, আবার প্রোটিন নিজেকে নকল করতে অপারগ।

তাই বিজ্ঞানীদের প্রথম প্রশ্ন ছিল, কে প্রথম? না সব্বাই একসাথে আবির্ভূত হয়েছিল একসাথে?

এই বিষয়ে আলোচনার আগে আমরা ওপারিন হ্যালডেন আর সিডনি ফক্সের সাথে পরিচয় করে নেব।

প্রাণের সূচনা : ওপারিন হ্যালডেন সংবাদ

সাড়ে চার বিলিয়ন বছর আগের সেই প্রিবায়োটিক আর্থে মানে আদিম ভূপৃষ্ঠ ও বায়ুমণ্ডলে হাইড্রোজেন, জল, অ্যামোনিয়া, মিথেন আর কার্বন ডাই অক্সাইড ছাড়া ছিল না কিছু, আজ্ঞে হ্যাঁ অক্সিজেনও না, তাহলে এইসব জটিল ম্যাক্রোমলিকিউল এল কোত্থেকে..? কিছু ট্রায়াল অ্যান্ড এরর রিয়াকশন আর তার সাপেক্ষে প্রাকৃতিক নির্বাচন থেকে। এই ঘটনাই কেমোজেনি… আর কেমোজেনি বুঝতে গেলে ওপারিন, হ্যালডেন, সিডনি ফক্স, ওয়াটসন এইসব মহাভাগ বৈজ্ঞানিকদের সাথে পরিচিত হতে হবে আমাদের।

এককালে যে বিশ্বাস ছিল ঈশ্বর ছয়দিনে পৃথিবী তৈরী করেছেন তা আগেই আলোচনা করেছি, মুশকিলটা হল বহু লোক, বলা যায় বেশিরভাগ লোক এখনও এই বক্তব্য আঁকড়ে পড়ে আছেন। এর বিরুদ্ধে কারণ প্রতিষ্ঠা অপ্রয়োজনীয় তাই এড়িয়ে গেলাম, এই মতে বিশ্বাসী লোকের এই নাস্তিকের লেখা না পড়াই ভালো বটেক।

১৭০০ শতাব্দী পর্যন্তও অ্যাবায়োজেনেসিস মতবাদ বেশ প্রচলিত ছিল, এবং বহু বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব পরিষ্কারভাবে এই মত সমর্থন করতেন। পচা বর্জ্য পদার্থ থেকে নতুন প্রাণের উদ্ভব হয়, এই অদ্ভুতুড়ে তত্ত্ব তখনকার পটভূমিকায় যুক্তিযুক্তই ছিল। প্রথমে ফ্রানসিস্কো রেডাই আর পরে লুই পাস্তুর (১৮৪২) এই তত্ত্ব খারিজ করে দেন তাদের এক্সপেরিমেন্টেশনের মাধ্যমে।

এরপরে আবার প্যানজেনেসিস বেশ জনপ্রিয় হয়, প্যানজেনেসিসের পক্ষে সওয়াল করার মতো লোক এখনও কম নেই। প্যানজেনেসিস মতে স্পেস থেকে আগত কোনও বীজ প্রথম প্রাণের জন্ম দেয়। এই কসমোজেনিক ক্রিয়েশনকেও মেইনস্ট্রিম সাইন্টিফিক ফ্র্যাটারনিটি কোনওদিনই তেমন পাত্তা দেয়নি।

প্রাণের সৃষ্টিতে প্রথম ঠিকঠাক ব্রেক থ্রু দিয়েছিলেন একই সাথে দুই প্রান্তের দুই বৈজ্ঞানিক। রাশিয়ার ওপারিন আর ব্রিটিশ জে বি এস হ্যালডেন। তাঁদের মডেল বোঝানোর জন্য একটা ডায়াগ্রামের আশ্রয় নিতে হচ্ছে।

ওপারিনের মতে অক্সিজেনহীন প্রিবায়োটিক অ্যাটমসফিয়ারে প্রথম তৈরি হয় বেশ কিছু মনোমার অর্থাৎ একঅণুক পদার্থ, মূলত অ্যামিনো অ্যাসিড, কিছু ফ্যাটি অ্যাসিড ও গ্লিসারল, আর কিছু প্রাথমিক নাইট্রোজেন যুক্ত ক্ষার।

অ্যামাইনো অ্যাসিড যে প্রোটিন তৈরীর ইঁট কাঠ পাথর তা আমরা আগেই জেনেছি, লিপিড বা স্নেহ তৈরী হচ্ছে ফ্যাটি অ্যাসিড আর গ্লিসেরল নামক যৌগ থেকে, আর নাইট্রোজেনজাত ক্ষারগুলি নিউক্লিক অ্যাসিড মানে ডি এন এ ও আর এন এ সংশ্লেষের উপাদান।

মনে রাখতে হবে, সে সময়ে পৃথিবীর উষ্ণতা আজকের থেকে অনেক বেশী ছিল, সামুদ্রিক ঘনত্বও আজকের মতো ছিল না, সেই আদিম ওশেন ফ্লোরকে বৈজ্ঞানিকরা বললেন হট ডাইলুট স্যুপ। প্রাণের জন্ম ওই স্যুপেই হয়েছিল। এর সাথে ছিল নিত্যনৈমিত্তিক বিদ্যুৎচমক, ইলেকট্রিকাল ডিসচার্জ, আর বিভিন্ন আয়োনিক রেডিয়েশন। সব মিলিয়ে প্রাণ সৃষ্টির নাটকের মঞ্চসজ্জাটি ভালোমতোই হয়েছিল।

এই একঅণুক জৈব পদার্থগুলি প্রাথমিক পলিপেপটাইড শৃঙ্খলের (পলিপেপটাইড অর্থাৎ অনেক অ্যামাইনো অ্যাসিড সম্বলিত এক একটি চেইন, যা পরে আরও কিছু পথ পার হয়ে প্রোটিনে রূপান্তরিত হয়) জন্ম দিল। সাথে তৈরি হল কিছু প্রাথমিক লিপিড বা স্নেহ, গ্লিসেরল ও ফ্যাটি অ্যাসিডের সংযোজনে। এই প্রাথমিক পলিমারগুলি উষ্ণ জলপ্রবাহে আবদ্ধ হয়ে এক কোলয়ডিয় গোলকে (কোলয়েড যা কিনা দ্রবণ নয় কিন্তু প্রলম্বন, যেমন দুধ) রূপান্তরিত হল, ওপারিন যার নাম দিলেন কোয়াসারভেট। নিউক্লিক অ্যাসিডও অন্তর্ভূত হল এই কোয়াসারভেটে, ওপারিন ও হ্যালডেনের মতে যা এই পৃথিবীতে হট ডাইলুট স্যুপে প্রথম প্রোটো সেলের জন্ম দিল।

বিজ্ঞানের বিচারে ওপারিন ও হ্যালডেনের তত্ত্ব উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয় বটেই, যদিও প্রথম প্রাণের উৎপত্তির মুহূর্ত সম্পর্কে তাঁরা নীরব। প্রোটিন লিপিড ও নিউক্লিক অ্যাসিড, তিনটিই একত্রে সৃষ্টি হয়েছিল, সম্পূর্ণ সিংক্রোনাইজেশনের সাথে, এটা মেনে নেওয়াও কষ্টকর।

যাই হোক, কোয়াসারভেট ড্রপলেটগুলি, ওপারিনের মতে ফ্র্যাগমেন্টেশনের মাধ্যমে বিভাজিত হতেও সক্ষম ছিল। ছোট ছোট খণ্ডে বিভক্ত হয়ে তার থেকে নতুন কোয়াসারভেটের উৎপাদনই খণ্ডীভবন। তবু, ওপারিন কোয়াসারভেটকে জীব নামে অভিহিত করলেন না।

পরবর্তী এক্সপেরিমেন্টসে দেখা যায়, কোয়াসারভেট ড্রপলেটস বাইরের জলীয় মাধ্যম থেকে রাসায়নিক দ্রব্য গ্রহণ করার ক্ষমতা রাখে। গৃহীত পদার্থ উৎসেচক হলে কোয়াসারভেটের ভিতরে গিয়ে তারা অক্ষম হয়ে যায় না, তাদের ক্ষমতা অপরিবর্তিত থাকে। শুধু তাই নয়, বাইরে থেকে কোনও ধাপ বিক্রিয়ার প্রাথমিক উৎসেচক প্রবেশ করালে কোয়াসারভেট তার পরের বিক্রিয়াটিও সম্পন্ন করে, অর্থাৎ পরের উৎসেচকটি সম্ভবত তার মধ্যেই উৎপাদিত হয়। ওপারিন ও হ্যালডেন ভিন্ন ভিন্নভাবে এই কোয়াসারভেটের প্রাকৃতিক নির্বাচন সমর্থন করেন। অর্থাৎ বাকি প্রতিযোগীদের হারিয়ে দিয়ে কোয়াসারভেট প্রথম আদি কোষে পরিণত হবার পথে আরও খানিকটা এগিয়ে যায়।

সাধারণ প্রিবায়োটিক অণুগুলি থেকে প্রাথমিক মনোমারগুলি তৈরির এই পদ্ধতিটি যে সঠিক তা প্রমাণ করেন মিলার, আদিম গ্যাসগুলিকে একটি বিশেষভাবে প্রস্তুত অ্যাপারেটাসের মধ্যে প্রবাহিত করে তিনি তার মধ্যে ইলেকট্রিকাল ডিসচার্জ সৃষ্টি করেন। বিক্রিয়া শেষে বিক্রিয়া মাধ্যমে অ্যামাইনো অ্যাসিডের উপস্থিতি ওপারিনের প্রাথমিক তত্ত্বকে আরও প্রতিষ্ঠিত করে।

সিডনি ফক্স : হোয়াট অ্যান আইডিয়া সারজী

বিজ্ঞানী সিডনি ফক্স (১৯৬৯) ১৮ রকমের অ্যামাইনো অ্যাসিডকে ১৮০ থেকে ২০০ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড উষ্ণতায় গরম করে কিছু স্থিতিশীল প্রোটিনের মতোই ম্যাক্রোমলিকিউল পেলেন, এই ম্যাক্রোমলিকিউলগুলিকে ব্যাকটেরিয়ারা নিজেদের খাবার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। আর কোয়াসারভেটের মতোই এর মধ্যেও ফ্র্যাগমেন্টেশন আর উৎসেচক বৈশিষ্ট্য বর্তমান ছিল।

কোয়াসারভেট থেকে এই পার্টিকলগুলির গুরুত্ব বেশি ছিল কারণ মনোমার থেকে অনেক সহজে পরীক্ষাগারে একে তৈরি করা যেত। সিডনি ফক্স এর নাম দিলেন প্রোটিনয়েড মাইক্রোস্ফিয়ার। এই মাইক্রোস্ফিয়ারের আকৃতি ছিল আণুবীক্ষণিক আর আকার ছিল সম্পূর্ণ গোলক, যা তাপগতিবিদ্যা অনুসারে কোয়াসারভেট ড্রপলেট থেকে অনেক স্থিতিশীল।

এত কিছুর পরেও, মূল একটা প্রশ্নে এসে বিজ্ঞানীরা ঠেকে গেলেন। সমস্ত ম্যাক্রোমলিকিউলের সৃষ্টি কি একত্রে হয়েছিল? না আলাদা আলাদা, আলাদাভাবে হলে কে এনেছিল প্রথম প্রাণের পরশ?

আগেই বলেছি, এককভাবে প্রোটিন এবং নিউক্লিক অ্যাসিড উভয়েই অসম্পূর্ণ, প্রোটিনের প্রিবায়োটিক সিন্থেসিস সহজ কিন্তু প্রোটিন সেলফ রেপ্লিকেটিং নয়, অর্থাৎ নিজের প্রতিলিপি গঠনে অপারগ। আবার নিউক্লিক অ্যাসিড নিজে নিজের নকল করতে পারে কিন্তু কোনও প্রোটিনের সাহায্য ছাড়া কাজে অক্ষম।

তবে কে সেই আদিমতম অস্তিত্ব, যার প্রথম পদচিহ্ন আমাদের পৃথিবীতে আসার পথ প্রশস্ত করেছে!! তবে কি প্রোটিনই একসময় প্রতিলিপি গঠনে সক্ষম ছিল? এখন জাস্ট চরিত্রহনন করা হয়েছে তার??

দুটি তত্ত্ব নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক।

স্ফটিকজল স্ফটিকজল

ক্রিস্টাল অর্থাৎ কিছু খনিজ উৎস আমাদের আদিমতম জননী হতে পারেন, এই দাবী প্রথম প্রকাশ করেন Cairns Smith ১৯৭১ সালে।

কেয়ার্নস-স্মিথ, গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের জৈব রসায়নবিদ, ডিএনএ অণুগুলির গঠন এবং নির্দিষ্ট ধরণের খনিজ স্ফটিকের গঠনগুলির মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক দেখেন। তিনি বলেন যে, জটিল স্ট্রাকচারগুলির নিজেদেরকে পুনরাবৃত্ত করার পদ্ধতিটি অজৈব জগতের সাধারণ বৈশিষ্ট, কিন্তু এটি জৈব জগতের ক্ষেত্রে একটি অসাধারণ বিষয়– ডিএনএ এবং আরএনএ হল একমাত্র জৈব অণু যা দৃঢ়ভাবে এই বৈশিষ্টটি প্রদর্শন করে।

ক্ষয় পাওয়া মিনারেল সোর্স বা ক্রিস্টাল যা ক্লে হিসেবে আমাদের সামনে এখন বর্তমান, তার মধ্যে আদিম পলিমারের ছাঁচ রয়েছে বলে দেখা যায়। কেয়ার্নস স্মিথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে, প্রাথমিক জিনগুলি খনিজ পদার্থের অত্যন্ত সূক্ষ্ম ক্রিস্টাল আর প্রাথমিক প্রোটিন জাতীয় যৌগের পলিমার ছিল। মানে? মানেটা হল আদিম খনিজ পদার্থগুলিকে ছাঁচ হিসেবে ব্যবহার করে প্রথম জীব যৌগ সৃষ্টি হয়েছিল। এই খনিজ ছাঁচকে কেয়ার্নস স্মিথ ক্লে জিন নাম দেন।

এই ক্লে জিন ও তাদের মূলত প্রোটিন জাতীয় প্রোডাক্ট প্রথম জন্ম নিয়ে ওই খনিজের চারপাশে প্রথম কলোনি গড়ে তোলে, ধীরে ধীরে নিউক্লিক অ্যাসিডও ওই কলোনিতে সংযুক্ত হয়, প্রথমেই কিন্তু জেনেটিক নিয়ন্তা হিসেবে নয়, কোনও গঠনগত তন্তুময় অণু হিসেবে। পরে সে ক্রমে ক্রমে বংশবৃদ্ধির কাজে আপারহ্যান্ড নিয়ে নেয়। কেয়ার্নস স্মিথের এই তত্ত্বে কিন্তু প্রাথমিক উৎপন্ন পদার্থ প্রোটিনকেই ভাবা হয়েছে।

ক্লে জিন ——> আর এন এ জিন ———-> ডি এন এ জিন

কেয়ার্নস স্মিথ তত্ত্বে প্রমাণ এত কম, এবং এই তত্ত্ব এতটাই স্পেকুলেটিভ যে আদৌ এর গুরুত্ব কতটা সেটা বলা মুশকিল। তবে প্রচুর গবেষক ক্লে জিন হাইপোথিসিসে বিপুল গুরুত্ব দিয়ে বিভিন্ন প্রান্তে কাজ করছেন।

আর এন এ : মধ্যে রহেন সূত্রধর

উৎসেচক মানেই প্রোটিন, এই রূপকথার অবসান হওয়ার সাথে সাথে বিবর্তনের এক মহাপ্রশ্নের সমাধানসূত্র বের হয়ে এসেছিল। বহু রহস্যের সমাধানসূত্র অপেক্ষা করেছিল একটা তিন বর্ণের শব্দে— RNA।

কে প্রথম? নিউক্লিক অ্যাসিড না প্রোটিন, এই ধাঁধার পরিত্রাতা হয়ে এই রাইবোনিউক্লিওটাইড আবির্ভূত না হলে কনফিউশন বাড়ত বই কমত না। আর এন এ নিজেই একপ্রকার উৎসেচক, অর্থাৎ আর এন এ একমাত্র আণবিক দানব যে কিনা নিজের শুশ্রূষা নিজে করার ক্ষমতা রাখে, এই মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া আবিষ্কার হয়েছিল ধীরে ধীরে, কারিগর ছিলেন Woesel ১৯৬৭; Crick ১৯৬৮; Orgel ১৯৭৮; Watson et al ১৯৮৬।

প্রোটিন নামক কোনও সহকারী উৎসেচক ছাড়াই সামান্য আণবিক উপাদান থেকেই (monomeric precursors)  নিজেকে সম্পূর্ণভাবে গড়ে তোলার ম্যাজিক ভদ্রমহিলা করায়ত্ত করে ফেলেছিলেন। এই বিক্রিয়াটি তিনি নিজে নিজেই ঘটান, আর কারও সাহায্য প্রত্যাশা না করেই। প্রোটিন তো নয়ই।

এছাড়াও প্রোটিনের কোনও সাহায্য ছাড়াই, Template directed RNA synthesis আর site specific RNA cleavage-ও শুধু আর এন এ আর এন এ ইন্টার‍্যাকশনেই গবেষণাগারে প্রস্তুত করে ফেলা সম্ভব হল… বিক্রিয়া দুটির মানে কী? প্রথমটিতে একটি আর এন এ-র নিজেকে ছাঁচ হিসেবে নিয়ে অন্য একটি আর এন এ প্রতিলিপি সৃষ্টি করে ফেলা, বলা বাহুল্য প্রোটিনধর্মী উৎসেচকদের কোনও পাত্তা না দিয়ে। আর দ্বিতীয় বিক্রিয়াতে একটি আর এন এ অন্য একটি আর এন এ-র কোনও নির্দিষ্ট জায়গাকে ভেঙে দিতে পারে… আর অবশ্যই কার সাহায্য ছাড়া??…. সেটা এতক্ষণে বোঝাতে পেরেছি মনে হয়।

অর্থাৎ আর এন এ থেকে প্রোটিন তৈরি হয় এটা আগেই জানা ছিল, এখন জানা গেল বিশেষ অবস্থায় আর এন এ নিজেই নিজেকে গড়তে পারে আবার প্রতিলিপি গঠনও করতে পারে… সেভাবে প্রোটিনের সাহায্য না নিয়েই।

এই আর এন এ থেকে প্রোটিন তৈরি করার একজন কারিগর আছে, আগেই তার নাম বলেছি, রাইবোজোম। রাইবোজম প্রকৃতপক্ষে আর এন এ আর প্রোটিন দিয়ে গঠিত একটি অঙ্গাণু, কিন্তু এর উৎসেচক হিসেবে কাজ করা অংশটি প্রোটিন নয়… ঠিকই ধরেছেন, আর এন এ। রাইবোজোমে উপস্থিত এই প্রকারের আর এন এ-র নাম আর আর এন এ (r RNA)। কোষীয় প্রকার নির্বিশেষে সমস্ত কোষে রাইবোজোম উপস্থিত। একটি ছোট আর একটি বড় দুইটি উপএকক নিয়ে এই অঙ্গাণু গঠিত।

বিভিন্ন প্রকৃতির রাইবোজোমাল আর এন এ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখা গেল.. ব্যাকটিরিয়া হোক বা ইউক্যারিওটিক কোষ, মাইটোকন্ড্রিয়া হোক বা প্লাস্টিড, যেখানেই রাইবোজোম আছে, তার টু সাবইউনিট বা দ্বি উপএকক গঠনটি সংরক্ষিত হচ্ছে, (প্রসঙ্গত মাইটোকন্ড্রিয়া ও প্লাস্টিডের মধ্যেও ডি এন এ, আর এন এ ও রাইবোজোম থাকে, এরা প্রকৃতপক্ষে প্রোক্যারিওটিক কোষ ছিল, বহু কোটি বছর আগে অন্তমিথোজীবীতায় ইউক্যারিওটিকে এসে ঢুকেছে, ভবিষ্যতে এই নিয়েও লেখার আশা থাকল) যে সংরক্ষণ প্রমাণ করে যে বিবর্তনীয় শাখায় এই আর আর এন এ গঠনের বিশেষ ভূমিকা আছে। দরকার না থাকলে মহাবিশ্বে উপস্থিত সমস্ত জীবে রাইবোজোমের গঠন মোটামুটিভাবে একই রকমের হত না।

প্রোটোজোয়া Tetrahymena-তে ৪১৩ নিউক্লিওটাইড নিয়ে গঠিত একটি আর এন এ খণ্ডাংশ (self splicing intron) পাওয়া গেল, যা উৎসেচক। অর্থাৎ আগের উদাহরণ অনুযায়ী এ নিজেই নিজেকে কেঁটেছেঁটে নিতে পারে। এই প্রমাণ আর এন এ ফার্স্ট তত্ত্বটিকে আরও বেশ কিছুটা এগিয়ে দিল।

এখানে বলে রাখা ভালো, ডি এন এ-র যে সংকেত প্রোটিনের উৎপত্তির আগামী ইতিহাস লেখে, তা তিনটি পাশাপাশি নিউক্লিওটাইড দিয়ে গঠিত একটি ট্রিপ্লেট কোডন। প্রতিটি কোডন এক একটি অ্যামাইনো অ্যাসিডের সংকেত বহন করে, যার পাঠোদ্ধার করতে পারে একমাত্র রাইবোজম, এটা আমরা আগেই জেনেছি। ডি এন এ-তে একাধিক পলিপেপটাইডকামী জিন ছাড়াও কিছু অপ্রয়োজনীয় (?) অংশ থাকে। ডি এন এ থেকে আর এন এ তৈরি হবার পর (আগের গল্প অনুযায়ী ফোটোকপি হবার পর) আর এন এ ঐ অংশগুলোকে নিজেই কেঁটে ছেঁটে বাদ দিয়ে দেয়। মনে করা যাক ফোটোকপি করার পর দেখতে পেলাম বইয়ের মধ্যের কিছু বিজ্ঞাপনও ছেপে গেছে, নিয়ে এলাম আঁঠা আর কাঁচি, বাকিটা আন্দাজ করতে অসুবিধা নেই নিশ্চয়ই?? এই পদ্ধতিই splicing। ওই অপ্রয়োজনীয় অংশগুলি অর্থাৎ নন কোডিং রিজিওনগুলিকে ইন্ট্রন বা জাঙ্ক ডি এন এ বলা হয়। এই জাঙ্ক বা ইন্ট্রন সিকোয়েন্সগুলি ইভোলিউশনের রহস্যের অসীম সমাধান নিয়ে বসে রয়েছে।

আমাদের পুরনো গল্পের আলোয়, আদিম পৃথিবীর গল্পটা তাহলে হতে পারে এইরকম…

RNA ————–> Protein

  |

RNA পৃথিবী

RNA + Protein = Ribonucleoprotein পৃথিবী

RNA ———— Reverse বা উলটো ফোটোকপি transcription ————-> DNA পৃথিবী

DNA এর জেনেটিক বস্তু হিসেবে আত্মপ্রকাশ।

৩.৫ বিলিয়ন বছর আগে প্রথম রাইবোনিউক্লিওটাইড প্রাকৃতিক নির্বাচনে স্বীকৃত হবার মুহূর্তটিকে তাই প্রাণের উদ্ভব বলে অভিহিত করা যায়। রাইবোনিউক্লিওটাইড প্রোটিনের জন্ম দেওয়ার পরে রাইবোনিউক্লিওপ্রোটিন বা আর এন পি-র যুগ শুরু হয়, এরপরের ঘটনা লিপিড তৈরি এবং প্লাজমা পর্দার আত্মপ্রকাশ।

এর পরের ঘটনা আর এন এ থেকে ডি এন এর উৎপত্তি। কীভাবে? আমাদের সেই গল্প মনে করুন… সেই যে মূল ডি এন এ থেকে আর এন এ-র নকল করেছিলাম লাইব্রেরি থেকে– তার উলটো ফোটোকপি করার পদ্ধতিতে, মানে এক্ষেত্রে আমি নকল থেকে আসল কপিটি সৃষ্টির কথা বলছি। প্রসঙ্গত, যখন এই ঘটনা ঘটছে, তখন আর এন এ ইতিমধ্যেই প্রোটিনের জন্ম দিয়ে ফেলেছে। তাই এই উলটো বা রিভার্স ট্রান্সক্রিপশন পদ্ধতিটি, প্রোটিন ব্যতীত হবার দরকারও ছিল না।

শেষ কথা

সাড়ে চার বিলিয়ন বছর আগেকার যে বিশাল ইতিহাস আমরা শুরু করেছিলাম, পরিবেশ ও পারিপার্শ্বের দ্বন্দ্বে তার সিন্থেসিসটি সম্পন্ন হল, ডি এন এ-র জেনেটিক বস্তু হিসেবে আবির্ভাবের মাধ্যমে পৃথিবীতে জীবের ও জিনের সভ্যতা স্থাপিত হল। আধুনিক ডি এন এ ঘটিত কোষেরা নতুন সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করল। প্রাণ সম্ভব হল বটে। কিন্তু এখানেই শেষ নয়… এক অনন্তের সন্ধান করতে গিয়ে আমরা আর এক অনন্তে এসে উপস্থিত হলাম… কেমন ছিল সেই আদিম কোষীয় সভ্যতা? আর আজকের বহুকোষীয় বুদ্ধিমান প্রাণীরাই বা কী করে এল? সেই প্রাণপ্রবাহ অদ্ভুত, সে আর এক গল্প।

1 Trackback / Pingback

  1. অনন্তের সন্ধানে – ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*