চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম

EPSON scanner image

সোমেন বসু

 

লোক চারটে পাশাপাশি বসে আছে। অনেকক্ষণ। এখানে ক্ষণের হিসেব কষতে গেলে ঘড়ি বা ক্যালেন্ডার নয়, ইতিহাস বই লাগবে। সেই যে শেষ দিকের পাতাটা, সালপঞ্জি বলত। বা গাছ হলেও চলবে, কালবৃক্ষ ধরনের, যার গায়ে অগুনতি বর্ষবলয়। লোক চারটে বসে আছে, চিত্রার্পিতের মতো। তবে চিত্রার্পিত বলতে একরকম বিমূঢ়তা বোঝায়। এদের ঠিক তা বলা যাবে না। সামনে পড়ে থাকা বড়ভাই একনম্বর, বা যমজ দুইতিনের ব্যস্ততা বেড়েছে, গতিময়তা রূপ পাল্টেছে, লোকাল ট্রেনগুলোর সাজ বেড়েছে, ল্যাজের দিকে লম্বা হয়েছে, নয়ের বদলে বারো, সবই এরা দেখেছে বসে বসে। যেমন দেখে পাহাড়ের প্রাচীন ওক গাছ। চিত্রার্পিত, কিন্তু বিমূঢ় নয়। নীরবে একটা একটা করে বর্ষবলয় অঙ্কিত হয়েছে, চুল পেকেছে, খসেছে, দাঁত পড়েছে। শুধু ট্রেনের বাহারই তো নয়, একনম্বরের হকার্স ইউনিয়নের অফিসের ঝাণ্ডার রংটা বদলে গেল, তখনও এরা বসেই ছিল। এদের মাথার ওপর টিনের ছাদ বড় হল, তখনও। পেছনেও ঢেউখেলানো টিনের পর্দা লাগল, সেই পর্দায় গুপ্তরোগ লাগল, সহজে মদ ছাড়ানো লাগল, এমনকি যখন এদের বসার কাঠের বেঞ্চিটাও সরিয়ে নেওয়া হল, তখনও বসেই ছিল লোকগুলো, এইভাবেই। কর্তৃপক্ষের চোখ দুর্বল হয় সাধারণত। এদের সারা শরীর দিয়ে নেমে আসা ঝুরিগুলো দেখতে যে তারা পায়নি, তাতে তাই কেউ অবাক হয়নি। কর্তৃপক্ষ তখন এদের এই অবস্থায় থাকতে দেখে বোধহয় দয়াপরবশ হয়েই সিমেন্টের বেঞ্চি করে দিয়েছিল পাছার তলায়। এবং আরও বেশ ক’টা। তখনও এরা এমনই ছিল, চিত্রার্পিতের মতো। খুশি হল কিনা বোঝেনি কেউ। অদ্ভুতভাবে এই একভাবে দীর্ঘ বৈঠকী এদের চেহারাও একরকম করে দিয়েছে যেন। অভিযোজন? এই যে এখন, বিকেল, বেলা পড়ন্ত। ওরা বসে আছে পশ্চিমমুখো হয়ে। একনম্বরের লম্বা শেডের পেছনে ডুবে যাওয়ার আগে সূর্যের শেষ হলুদ কমলা আলো ওদের গালের গহ্বর, কপালের বলিরেখা, পাতলা সাদাকালো চুল ছুঁয়ে পিছলে গিয়ে ধাক্কা খাচ্ছে পেছনের ঢেউখেলানো টিনে। ওখানে একটা মুখ। হঠাত পড়া আলোয় চকচক করে লোলুপ দেখাচ্ছে। ডিকেলোধ না যোগী আদিত্যনাথ বোঝা যাচ্ছে না। ওর তলাতেই টিনটা শেষ হয়ে শুরু হয়েছে রেলের চিরাচরিত চ্যাপ্টা বল্লমের মতো লোহার পাতের রেলিং। রেলিংয়ের পেছনে দুটো বাচ্চা। আদুর গা, গায়ে ধুলো, মাথার চুলে জট, মুখে হাসি, খেলছে। এই হাসিগুলো দেখলে দার্জিলিং থেকে ভোরে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার বোধ তৈরি হয় মস্তিষ্কে। বাচ্চা দুটো ছেলে না মেয়ে এতদূর থেকে ঠাহর করা যাচ্ছে না। অবান্তরও। বাচ্চা বাচ্চাই হয়। এই বেঞ্চিটার বাঁ পাশে একটু ফাঁকেই একটা চায়ের দোকান। আগে একটা অল্পবয়েসি ছেলে চা বানাত। এখন এক প্রৌঢ় বানায়। দু’জনেরই নাম সুবল। চায়ের দোকানদারদের নামও কেমন হরি, সুবল, দুলাল, কাকা, এই জাতীয়ই হয়। সুবলের দোকানের একটু পরেই মাথার টিনের চালটা শেষ হয়েছে। আর তার একটু পরেই শুরু হয়েছে প্ল্যাটফর্মটার সামনের দিকের ঢাল। ওদের ডানদিকটা বরং অনেকটা লম্বা। একটু পাশে একটা কোলাহল এবং মনোযোগপূর্ণ ভাঁজ করা সিন্থেটিক ত্রিপল পাতা। তার ওপর চার তাসুড়ের সাথে তিনজন পরামর্শদাতা কাম দর্শকও আছে। তারপরে একটু ফাঁকে ফাঁকে আরও দুটো বেঞ্চি। প্রথমটায় কয়েকটা ছেলে, একটা মেয়েও আছে, আঠারো-উনিশ-কুড়ি। পাশে লোহার খুঁটিটার গায়ে একটা সাইকেল ঠেস দিয়ে রাখা। এই বেঞ্চিটাও বেশ সরব। পাশের ঐ ত্রিপলটার মতোই। প্রায় পাশাপাশি হওয়ায় এবং দূরশ্রুততার জন্য মাঝেমাঝেই অদ্ভুত কিছু সংলাপের কোলাজ ভেসে আসছে…

–হাতে নয় ফোঁটা লয়্যা ওয়ান ক্লাব ওপেন করো তুমি? এতদিন ধরে ব্রিজ খ্যালতাসো হালায়, আর অহন তোমায় কল করা শেখোন লাগবো?

–হা হা হা হা! পুরো খোরাক তো! এইভাবে গেছে ফেসবুকে মেয়ে পটাতে…

বা…

–শুভঙ্করদাটা এজিস্ট তো বটেই… ছুপাচাড্ডিও… মওকা মতো পাই একবার মালটাকে…

–ডায়মন্ড লিডটা দারুণ হইসে। ওই লিডটা না হইলেই লাইটটা হয় না…

…পাশের বেঞ্চে একটা প্রাচীন পাগল বসে আনমনে নিজের জট পড়া চুলে আঙুল চালাচ্ছে। ছেঁড়া একটা হাফহাতা জামা, একটা আস্ত পরিষ্কার লুঙ্গি পরা। এরও অগুনতি ঝুরি আছে আর আছে পরিষ্কার করার বাতিক। জামাকাপড় বা নিজেকে নয়, প্ল্যাটফর্মটাকে। এই বেঞ্চিটায় এ এইমাত্রই এসে বসল। তার আগে একদম শেষ মাথায় একটা কুকুরকে তাড়া করে গেছিল। সে বেচারি এদিকওদিক ঘুরে সবে এসে ওইখানে লোহার রেলিংয়ের তলায় গজিয়ে ওঠা ঘাসগুলো একটু শুঁকেটুকে রেলিংয়ের দিকে পেছনের একটা পা তুলে দাঁড়িয়েছে যেই ওমনি রে রে করে ধাওয়া। ওইভাবে কী আর হাগুমুতুর মতো দরকারি কাজকর্ম করা যায়! বেচারি লেজ গুটিয়ে পা নামিয়ে দে দৌড়। পাগলের তাতেও শান্তি হয়নি। সে ঐ ঘাস অব্ধি গেছে, নিচু হয়ে দেখেছে একফোঁটা-দুফোঁটাও পড়েছে কিনা, তারপর আবার ফিরে এসে বসেছে। এই বেঞ্চিতেই ওর রাজপাট। কতদিন, সে জানতে গেলে আবার পাহাড়ে যেতে হবে ওক গাছের কাছে। সে পরে হবে, আপাতত একটা শিমুলগাছ। ওই বেঞ্চিটার পরেই শেষ হয়েছে মাথার ওপরের টিনের চাল। আর তারপরই দাঁড়িয়ে আছে এই গাছটা। নিস্পত্র, ফুলবান, রক্তিম। শিমুলফুলের মোটা মোটা লাল পাপড়িগুলোর এতটাই ভার যে গাছ সে সময় সব পাতা ফেলে দেয়। গাছটার তলাটাও লাল হয়ে আছে পড়ে যাওয়া ফুলে। অদ্ভুত ব্যাপারটা হল, এই যে শুচিবায়ুগ্রস্ত পাগল, যে কিনা আকাশ দিয়ে যাওয়ার সময়ে যদি কোনও কাকপাখীতে একফোঁটা গু এই প্ল্যাটফর্মে ফেলে দিয়ে যায়, তাতেও গালাগাল দিতে দিতে মগ টগ জোগাড় করে জল ঢালতে শুরু করে, মাঝেমাঝেই প্ল্যাটফর্মের বিভিন্ন জায়গায় অবান্তর ঝাঁট দিয়ে আসে, সেও শিমুলগাছের এই অপকর্ম দেখে বিলকুল উদাসীন। ফুলগুলোকেও ঝাঁটায় না। পাগল হলে হবে কী! এরপরে খালি একটা কদমগাছ, আর কিছু নেই। প্ল্যাটফর্ম ঢালু হয়ে মিশে গেছে ঘাসমাটির মধ্যে। বাঁদিকে রেললাইন, ডানদিকে একটু পর থেকে নয়ানজুলি। নয়ানজুলির জলে কচুরিপানা।

চারনম্বর প্ল্যাটফর্মের এই চিরন্তন আবহের মধ্যেই ঐ চারটে চিরন্তন মানুষ বসে আছে। চিত্রার্পিত, কিন্তু বিমূঢ় নয়। আপাত নির্লিপ্ত, কিন্ত অবোধ নয়। চারটে লোক, যাদের এখান থেকে মনে হচ্ছে একইরকম দেখতে প্রায়, পাশাপাশি বসেছে, আড্ডা দেওয়া উচিত, কিন্তু কেউই কথা বলছে না, শুধু চরম ঔদাসীন্যে সব নজর করে চলেছে যেন খোদ এই চারনম্বর প্ল্যাটফর্মটার মতোই! সন্তান দল যেমন দেওয়ালে দেওয়ালে তাদের অদ্ভুত হরফে লিখত, বালক ব্রহ্মচারী সব ওয়াচ রাখছে, আপাতভাবে সেরকম যেন। কিন্তু দূরত্ব ভার্চুয়াল দুনিয়ার মতো, বিভ্রান্তিকর প্রায়শই। কাছে যাওয়া যাক।

ঠিকই তাই। দূর থেকে যাদের একইরকম দেখতে বলে মনে হচ্ছিল, প্রচুর মিল থাকলেও তারা একরকম নয়। নির্বাকও নয় ঠিক। মাঝের দুজনের মধ্যে একটা বাক্যালাপ চলছে। খুব তরতরানো সংলাপ নয়। যেমনটা চলছে ওই কিশোরকিশোরীদের বেঞ্চটায়। বরং বলা যায় একক আলাপের ঢঙে দ্বিপাক্ষিক সংলাপ। মানুষ নিজের কোনও অনুত্তেজক ঘটনার স্মৃতিচারণ যেভাবে করে, থেমে থেমে, শান্ত স্বরে, খেই না হারিয়ে, সেইভাবেই এরা দুজনে কথা বলে চলেছে। মিল বলতে গেলে সবার প্রথমেই যেটা নজরে আসবে, সেটা হল ওদের চোখগুলো। চেহারা ভেঙেচুরে গেছে, বয়স আর জীবনযুদ্ধ নিজের নিজের মতো করে ট্যাক্স আদায় করেছে, কিন্তু চোখদুটোকে কিছু করতে পারেনি। প্রত্যেকের চোখগুলোই মাঝসমুদ্রের মতো শান্ত কিন্তু গভীর, সজীব। সবার বাঁদিকে যে বসে আছে, মুখটা খানিক লম্বাটে, চুল পাতলা কাঁচাপাকা, কপাল সহ গোটা মুখেই অজস্র রেখা, চোখদুটো ঈষৎ কোটরগ্রস্ত, কিন্তু ওই— শান্ত, বাঙ্ময়। শক্ত হাতের চেটো দুটোয় মূল তিনটে রেখা ছাড়া আর কোনও রেখা নেই। ভাগ্যদেবীর মহা জ্বালা এইসব রোলিং মিলের শ্রমিকদের নিয়ে। এ প্রাক্তন, মিলও বন্ধ, কিন্তু তাতে কী! লোকটা আলগোছে তাকিয়ে আছে সামনের দিকে। চোখে পশ্চিমী সূর্যের বিদায়ী কমলা আলো। ফলে ভুরু জোড়া একটু কুঁচকানো। একনম্বরে হকার্স ইউনিয়নের অফিসটার সামনে ভিড়ভাট্টা। আজ স্টেশনের বাইরেটায় পথসভা আছে, অনেকক্ষণ ধরেই মাইকে তার প্রচার চলছে, তারই প্রস্তুতি এখানেও। লম্বামুখো দেখল ওই ভিড়ভাট্টার মধ্যে মধ্যমণি হয়ে বসে আছে ছোটন মিত্তির। সাঙ্গপাঙ্গদের সাথে টুকটাক মশকরা করছে, কখনও কাউকে কিছু অর্ডার দিচ্ছে, এই অর্ডারের পরিধিটা সাঙ্গপাঙ্গ থেকে প্ল্যাটফর্ম বা স্টেশনের যে কোনও দোকানদার অব্ধি বিস্তৃত। আপাতত হাতে একটা থামস আপের বোতল, যে বোতলের কাঁচের সাথে হাতের মোটা বালাটার ঠোকাঠুকিতে মাঝেমাঝেই যে একটা টুংটাং শব্দ হচ্ছে এত দূর থেকে না শুনতে পেলেও লম্বামুখো দিব্যি বুঝতে পারছে। সাদা পাঞ্জাবি পাজামা পরে রয়েছে ছোটন, পার্টির কোনও প্রোগ্রাম থাকলে এটাই পরে। ওর কাকাও তাই পরত। এই অঞ্চলের একসময়ের দাপুটে নেতা বীরেন মিত্তির। আজকের ছোটনকে তার ক্ষুদ্র সংস্করণ বলা যায়। দুজনে দুই পার্টির অবশ্য। সে আর কী করা যাবে। ঝাণ্ডার রংটা পালটে গেছে তো! কিন্তু তাতে বেশিরভাগ জিনিসের মতোই অঞ্চলের, বিশেষত স্টেশনের অবিসংবাদী নেতার পোশাকের রং পাল্টায়নি। ছোটনের শুধু পোশাকই নয়, হাবভাব, এমনকি চেহারাছবিও অনেকটাই কাকার মতো। সে নিয়ে আড়ালে আবডালে লোকে ফিসফাসও করে। কিন্তু ওই, আড়ালে আবডালেই। তাতে ছোটন মিত্তিরের উত্থান আপাতত আটকাচ্ছে না। এই অঞ্চল যে আবার একটা বীরেন মিত্তির পেতে চলেছে, সে বিশ্বাস অনেকেই রাখে।

–তোদেরও ধর্ম নিয়ে একটু বাড়াবাড়ি আছে… বলে তো লাভ নেই…

–হুঁ… বাড়াবাড়ি… যাদের পেটের চিন্তা করতে হয়, তাদের ওসব ধর্মফর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করার সময় থাকে না রে… কতজন মুসলিমকে পাঁচ ওয়ক্ত নামাজ পড়তে দেখেছিস নিয়ম করে?…

বেঞ্চির মাঝখান থেকে কথাগুলো হঠাত করে জন্মাল, মাঝের স্থির বাতাসে একটু দাঁড়াল, তারপর মিলিয়ে গেল। যাওয়ার আগে আশেপাশের কারও কান ছুঁল কি ছুঁল না, নিজেরাও তার তোয়াক্কা করল না।

মানুষের ফাঁকা মাথা অনেকটা পানকৌড়ির মতো। এই গলা তুলে ফাঁকা ভাসতে ভাসতে হঠাত ডুব মারে কোনও অতলে। মাথা তোলে কিছুক্ষণ পর, অন্য কোথাও। লম্বামুখোও বীরেন-ছোটন থেকে চলে গেল পথসভায়। সেও আজকের ঘটিতব্য পথসভায় নয়, আজ থেকে অনেক বছর আগের এক পথসভা, হয়েছিল এই চারনম্বরেই। একটা শীতের বিকেল ছিল, শেডটাও এতটা ছিল না, সুবলও তখনও এত বুড়িয়ে যায়নি, বেশ চটপট চা দিত। কয়েকটা বাচ্চা বাচ্চা ছেলে আসল, হাতে করেই একটা হ্যান্ডমাইক আর একটা ছোট বক্স নিয়ে, সাথে দুজন মধ্যবয়সী লোকও ছিল, আর ছিল একটা ব্যানার। লাল শালুর ওপর সাদায় লেখা ‘বিপ্লবী সংস্কৃতি মঞ্চ’, এখনও মনে আছে লম্বামুখোর। শুরুতেই দুটো গণসঙ্গীত গাইল পর পর। ‘আমরা করব জয়’ আর ‘আমরা শয্যা পেতেছি ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ উত্তাল অকূল সাগরে’। দ্বিতীয় গানটা সেদিনই প্রথম শুনেছিল লম্বামুখো, আর এই গানটাতেই ওদের পরিচয়টা বোঝা গেছিল। রাতে অনেকক্ষণ এই নিয়েই আলোচনা করেছিল ওরা, এই চারজন…

–নকশালরা ওপেন হল তাহলে?

–আজ কেন? বিহারে তো ভোটেও দাঁড়ায়…

–আরে এদের অনেক ভাগ…

–এরা কারা? সেকেন্ড সিসি নাকি?

–কে জানে! পার্টির নাম তো দেখলাম না। কী বিপ্লবী সংস্কৃতি নাকি…

–মঞ্চ।

–কিসের?

–উফফ… বিপ্লবী সংস্কৃতি মঞ্চ! এত আবোইদ্যা ক্যান?

–এবার ভোটেও দাঁড়াবে তাহলে…

–কৌশলও হতে পারে হয়তো…

…ইত্যাদি ইত্যাদি। গল্পটা চলছিলই যতক্ষণ না পঞ্চা এসেছিল। পঞ্চা ছিল বীরেন মিত্তিরের খাস লোক। এই আজ ছোটনের যেমন কাজল। পঞ্চা হঠাত ওদের সামনে আসতেই…

–ন্যান… চা ধরেন…

সুবল এসেছে। একটা স্টিলের মগে গরম চা আর এক হাতে চারটে ভাঁড়। অবশ্য ওর চা’টাকে চা না বলে গরম আদাচিনির রস বললে ভালো। অভ্যেস হয়ে গেছে ওদের। প্রথম প্রথম বলত, একটু আলাদা করে ভালো চাপাতি কিনতে পারিস তো আমরা যারা রেগুলার বসি তাদের জন্য! সুবল বলত, এটা চারনম্বর। এখানে ফ্লাইং খদ্দের হয় কই? সবই রেগুলার। ঠিকই। ওরাও মাঝেমাঝে ঘোড়ার মুত ইত্যাদি বলে সুবলকে খচায়, যদিও বাজে চায়ের ক্ষেত্রে এই ঘোড়ার মুতের উপমাটা কোদ্দিয়ে এল লম্বামুখো জানে না, আবার খায়ও! ওদের বসে থাকার মধ্যে তিনবার। এটাই দিনের কোটা। যদি না কোনও অতিরিক্ত চাঞ্চল্যের আমদানি হয়। যেমন সেদিন এসেছিল… সাত ভাঁড় করে চা খাওয়া হয়ে গেছিল…

…ওরা নিজেদের মধ্যে সেদিন এতটাই মশগুল ছিল পঞ্চা একদম সামনে চলে আসার পরেই টের পেয়েছিল, আর একটু চমকেও গেছিল। তারপরে অনিবার্যভাবেই মাটিতে লম্বা চলন্ত পিঁপড়ের সারি দেখলে আগেকার মানুষজন যেমন আকাশের দিকে তাকাত, ওদের চার জোড়া চোখও তেমন চলে গেছিল একনম্বরে ইউনিয়ন অফিসের পাশের বেঞ্চিটায় ঠিক এখন যেখানে ছোটন বসে আছে। সেদিন ছিল বীরেন, আকাশের অনিবার্য কালোমেঘের মতোই। আর মেঘ যেমন কখনওই মাটিতে নেমে আসে না, তেমনই বীরেন মিত্তিরও এই চার নম্বরে আসত না। পঞ্চাদের মতো বৃষ্টি পাঠিয়ে দিত। পঞ্চা অবশ্য বলেনি এমন কিছু। একটু খোঁজখবর করছিল খালি। সেও লম্বামুখোকে এড়িয়ে, অন্যদের কাছে। এই এড়ানোটা গুরুর কাছ থেকে সংক্রামিত। সে অন্য কথা। ওরা আর বলবে কী করে! ওরা নিজেরাও তো দেখেনি কোনওদিন ছেলেগুলোকে বা ওই মধ্যবয়সী দু’জনকে। এই এলাকার নয় ওরা। কিন্তু বীরেন মিত্তির এসেছিল এই চারনম্বরে তারপর, দু’বার, বোধহয় জীবনে ওই দু’বারই, একবার মারতে… একবার মরতে। ওই পথসভার কিছুদিন পরেই ছেলেগুলো আবার এসেছিল। পোস্টার মারতে। কিন্তু তখন বীরেন দলবল নিয়ে বসে আছে একনম্বরে। দৌড়ে আসে। দলবল লাইন টপকে, আর বীরেন তার ভারী শরীরটা নিয়ে ওভারব্রিজ দিয়ে। আটকানো, দু’একটা চড়থাবড়, জেরা। চারজনে চার এলাকার বলেছিল ওরা। সবচেয়ে কাছের জন এখান থেকে চার স্টেশন দূরের। বীরেন শাসিয়ে ছেড়ে দেয়, এরপরেও এখানে দেখলে আর বাড়ি ফিরতে পারবে না! ওই প্রথমবার। দ্বিতীয়বার এসেছিল কীভাবে জানা যায়নি, ভোরবেলা দেখা গেছিল চারনম্বরে থইথই রক্তের মধ্যে শুয়ে আছে। গলাটা বিচ্ছিরিভাবে হাঁ হওয়া। আর পাশে ছড়ানো কিছু পোস্টার। ‘খতম অভিযান চলছে চলবে’ ইত্যাদি। ডানদিকের দূরের বেঞ্চিটার দিকে ঘাড় ঘোরায় লম্বামুখো। পাগলাটার সেদিন বড্ড খাটুনি গেছিল। বালতি বালতি জল ঢেলেছিল রক্তের দাগ ধুতে। কিন্তু অদ্ভুতভাবে খিস্তি করেনি কোনও….

–বাঙালী মুসলমান আর উর্দুভাষী মুসলমানদের মধ্যে বোধহয় তফাত আছে, না? পার্কসার্কাস… রাজাবাজার…

–জানি না ভাই… তবে ওই যে বললাম… পেট… উর্দু বললে তো আর খিদে কম পায় না…

আবার সেই কথাগুলো। কেমন ধূসর রঙের। গায়ে পুরনো কম্বলের মতো একটু বিষণ্ণতা, একটু দীর্ঘশ্বাস, একটু বিড়ির ধোঁয়া জড়ানো।

উঠল লম্বামুখো। ফাঁকা চারটে চায়ের ভাঁড় হাতে নিয়ে। চারনম্বরের অনেক কিছু পাল্টেছে, কিন্তু এই ময়লা ফেলার যে বড় ড্রামটা ওরাই উদ্যোগ নিয়ে বসিয়েছিল সেই কতকাল আগে কোণের দিকটায়, সেটা রয়ে গেছে। ওই পাগলটা যে বেঞ্চিটাতে বসে আছে, তার পাশে রেলিং ঘেঁষে। ভাঁড় ফেলার একটা ড্রাম সুবলের দোকানেও রাখা আছে অবশ্য, সেটা কাছেও হত, কিন্তু পাগলের কাছে আসতেও হত এই সময়টায়। ওর হকের বিড়িটা দিতে। এটাও রীতি। সেই প্রথম থেকেই চলে আসছে। প্রথম প্রথম ও গিয়ে চাইত ওদের কাছে। তখন টুকটাক কথাও বলত। এখনকার মতো একদম চুপ করে যায়নি। তারপর থেকে ওরাই খানিক সময় অন্তর অন্তর ডেকে দিত। এখন তো পর্বতই আসে মহম্মদের কাছে। এই যেমন এখন। মহম্মদবাবু অন্যদিকে তাকিয়েই হাত বাড়িয়ে নিল বিড়িটা। একটু ম্যাসেজ, সামনের দিকটা ঝুপো নোংরা গোঁফদাড়ির আড়ালে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া ঠোঁটে চেপে দুটো জোরে জোরে ফুঁ, তারপর অন্যদিকে তাকিয়েই আবার হাত পেতে দেওয়া। সে হাতে লাইটারটা পড়তে বিড়িটা জ্বালানো এবং চরম অবজ্ঞা ভরে দুই আঙুলের ফাঁকে লাইটারটা ধরে আবার ফেরত দিয়ে দেওয়া। ঠোঁটে একটা আলগা হাসি ঝুলিয়ে গোটা প্রক্রিয়াটা মন দিয়ে দেখল লম্বামুখো। পাশের বেঞ্চির ছেলেমেয়েগুলোও। লাইটারটা দিয়ে দেওয়ার পর যারা জোরে হেসে উঠল। বিরক্তি নিয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিল পাগলা। গলগল করে ধোঁয়া ছেড়ে দিল খানিক। ঈশারায় ছেলেমেয়েগুলোকে জোরে হাসতে না করে পাগলার দৃষ্টি অনুসরণ করে লম্বামুখো দেখল পেছনের বস্তির বাচ্চাদুটো শিমুলগাছের তলায় বসে ফুলের পাপড়ি ছাড়াচ্ছে একমনে। পেছনের বস্তিটায় থাকে ওরা। চ্যাপ্টা লোহার পাতের রেলিং-এর মাঝে এক জায়গায় একটা পাত নেই এবং সেটাই ওদের জন্য যথেষ্ট। নিজেদের বেঞ্চিটার দিকে তাকাল ও। দেখল সবার ডানদিকে যে বসে আছে, তারও চোখদুটো এদিকেই, দেখলে বোঝা যায়, অনেকক্ষণ ধরে। ও তার দিকে তাকিয়ে কিছু একটা বলতে যাওয়ার সময়েই…

“দেখ… সব কটায় জল… সব কটায়….” ছপ… ঠ্যান ন ন ন… “দাঁড়াও… এর পর আর কোনওদিন দেখি…. তোমায় বিন লাদেনের মতো জলে দফনাবো দেখো….”

হেসে ফেলল ও। হাসির রেশটা সুগন্ধী আতরের মতো ছড়িয়ে গেল গোটা প্ল্যাটফর্মে। তাসুড়েদের প্রবল মনোযোগেও ছেদ ফেলল বিন্দুর কথাটা। বিন্দু, পেছনের বস্তিটার প্ল্যাটফর্ম লাগোয়া একটা ছোট্ট খোপড়ায় থাকে, বুড়ি মা আর বাচ্চা মেয়েকে নিয়ে, যে মেয়েটা অনেকক্ষণ ধরে মন দিয়ে শিমুলের পাপড়ি ছাড়াচ্ছে। এবং বিন্দুর মাথায় ছিট আছে আর তার মা জলাতঙ্কে ভোগে। জলাতঙ্ক মানে এক্ষেত্রে প্রচলিত অর্থের বিপরীত। জলশূন্যতার আতঙ্ক বলা যায়। বিন্দুর মা’র সবসময়েই মনে হয় যেকোনও সময় জল শেষ হয়ে যাবে আর তখন সে, হ্যাঁ সব কিছু ছেড়ে, পায়খানা করবে কী করে! কাগজ, কচুপাতা ইত্যাদি জিনিস অবশ্য ব্যবহার করা যায়, কিন্তু তাতে কী আর শুচি আসে! বাড়িতে আবার ঠাকুর রয়েছে! আর অন্ধকারে হলে কচুপাতার বদলে যদি বিছুটিপাতা ঘসে দেয় তো আরেক চিত্তির! এসবই বিন্দুর মায়ের মনোগত আশঙ্কার কথা, কিন্তু যারা বেশি কথা বলে তাদের মনোগত কথা প্রায়শই সবার জানা থাকে। যেমন এই নিয়ে বিন্দুর আর ওর মা’র ঝামেলার কথাও সর্বজনবিদিত। যেটা জানা ছিল না, সেটাই ডানদিকের লোকটা বলল লম্বামুখোর দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে…

–বিন লাদেনও জানে দেখেছিস! আর সে কেমন করে মরেছে সেটাও…

–শুধু মরাই নয়, কোথায় তাকে গাড়া হয়েছে সেটাও…

–দফনাবো!… হাঃ হাঃ হাঃ….

আবার একদফা হাসি। মাঝের দুজন, যারা এতক্ষণ সেই গভীর, ছেদযুক্ত এবং ধূসর সংলাপটা চালাচ্ছিল, তারাও হেসে ফেলল। ওদের কথা মাঝেমাঝে কানে আসলেও ডানদিকের জন তাতে ঢোকেনি। এর মুখটা ঠিক লম্বা নয়, বরং একটু গোল, পুরো গোলও নয়, মাঝখানটা ফোলা, কিন্তু সেটা আবার গালও নয়। হনুর হাড়দুটোই একটু ঠেলে বেরিয়েছে যেন। সাধারণত এমন হলে মুখটা চৌকো দেখায়। কিন্তু এর তাও নয়। কিছু কিছু মুখ থাকে এরকম। অবর্ণনীয় টাইপ। কোনও বিশেষ চিহ্নও নেই মুখে যে আলাদা করে মনে রাখা যাবে। এসব মুখ মিছিলে হারায়।

সে এতক্ষণ এই বস্তিটার কথাই ভাবছিল। কোনও কারণ নেই। অর্থহীন অলস ভাবনা। এখন তো এছাড়া বিশেষ কাজও নেই। আগে কাজকর্ম ছিল, সবরকমই, পেটের দায়ে, মাথার দায়ে, প্ল্যাটফর্মে আসতও ওরা অনেক দেরি করে, সন্ধের পর। আসতে হতই। নইলে এই অলস দৈত্যটা যেখানে সেখানে তাড়া অরে বেড়াত। রাতে অম্বল হত, সিগারেট বিস্বাদ লাগত, বৌয়ের সাথে ঝগড়া হত। আর এখন তো সে ব্যাটা আস্তে আস্তে জীবনটাই দখল করে নিতে বসেছে…

–হাসলাম বটে বিন্দুর কথায়… কিন্তু আসলে তো আমরা এখন সবাই লাদেন…

–বিন্দু কথা বলে তোর সাথে?

–হুঁ… বলে তো!… কেন?

–কখনও মনে হয়েছে তোকে লাদেন ভাবছে?…

…সেই সময়েই এই বস্তিটা গড়ে উঠতে দেখেছিল নীলজামারা। হ্যাঁ, এই ডানদিকের লোকটা আজ একটা নীল রঙের জামা পরে আছে, তাই তাকে আমরা এই নামটা ধরেই ডাকব। কী করা যাবে! মুখের আকৃতি যখন নেইই কিছু! এই বিন্দু, রবীন, জহর, বুলার মা… এক একটা মানুষ, এক একটা উপন্যাস। সবাই বাংলাদেশ আগত, এ বাংলাতে বিভিন্ন জায়গায় ঠোক্কর খেতে খেতে আর ভোট দিতে দিতে অবশেষে এখানে এসে নাড়া বেঁধেছিল। জায়গাটা রেলেরই, ফাঁকা, কিছু গুল্মজাতীয় ঝোপঝাড়, সাপ, রাতে শেয়াল। সন্ধের পর ট্রেন থেকে নেমে লোকজন দল করে যেত এখান দিয়ে, দল যতক্ষণ না হত দাঁড়িয়ে থাকত। হাতে টর্চ থাকত সবারই। শুধু মনুষ্যেতর প্রাণীরাই তো নয়, মানুষ আবার পরলোকগতদেরও ভয় পায়। অথচ মনুষ্যেতররা মনুষ্যের থেকে ইতর হয়েও ভূতে ভয় পায় না, ভগবানের দ্বারস্থও হয় না! মহা মুশকিল! উন্নতি বোধহয় সবসময়ই কিছু অনিবার্য অবনতির চিহ্ন বুকে বয়ে বেড়ায়! যাই হোক, বস্তিটা হওয়ার পর মানুষদের সে যন্ত্রণা মিটলেও তারা খুব যে খুশি হতে পেরেছিল, অমন নয়। একে তো অবাঞ্ছিত, তার ওপর ভিনদেশী, এবং সর্বোপরি অর্থনৈতিকভাবে নিম্নশ্রেণীর। বস্তিটা গড়ে উঠেছিল অনুগ্রহে, টিকেও রইল অনুগ্রহের পাত্র হয়ে, যে অনুগ্রহও আদপে সেই ভূতের মতো, বাস্তবে কোনও অস্তিত্বই নেই, কিন্তু তবু আছে। অস্তিত্বের কথাই যখন উঠল, তখন ল্যাজে ল্যাজে অস্তিত্বসংকটও চলে আসে ফেউয়ের মতো। দু’বার সেই সংকটে পড়েছিল মানুষগুলো। প্রথমবার সেই যখন কতগুলো নকশাল ছেলে এসে মিটিং করল, আর তার পরে পরেই ঘটনা পরম্পরায় বাঘে গরুকে এক ঘাটে জল খাওয়ানো বীরেন মিত্তির ওর দশাসই চেহারাটা নিয়ে মুখ গলা সব হাঁ করে মরা মাছের মতো চোখ উলটে একদিন ভোরবেলায় পড়ে রইল ঠিক ওইখানে… এই চারনম্বরে… ওই শিমুলগাছটার তলায়… যেখানে এখন বাচ্চাদুটো শিমুলের লাল পাপড়িগুলো ছিঁড়ে ছিঁড়ে জমা করছে…

–অনুগ্রহ করে শুনবেন… শিয়ালদা যাওয়ার গাড়ি ডাউন শান্তিপুর লোকাল দু’নম্বর প্ল্যাটফর্মে আসছে… কিপ ইয়োর অ্যাটেনশন প্লিজ…

ওরা যতক্ষণ ধরে বসে আছে ততক্ষণের মধ্যে ট্রেনের অ্যানাউন্স এই প্রথম নয়। এক-দুই-তিন দিয়ে অনেক ট্রেনই গেছে, যন্ত্রনারী সে সবই যথাযথ অবগতও করে গেছে, কিন্তু কেউ শোনেনি। বা শুনলেও পাত্তা দেয়নি। স্বাভাবিক। মানুষ স্বার্থপর। তার দরকারের জিনিস ছাড়া গুরুত্ব দেয় না। কিন্তু এটা যে সবাই শুনল, সে কী দরকারে কোনও? মানুষ স্বার্থপরের সাথে সাথে সমাজবদ্ধ জীবও বটে। সমাজের অন্যদের দরকারের প্রতিও একটা খেয়াল রেখে দেয় চেতন বা অবচেতনে। দরকারটা যার, তার মুখচোখ প্রথমে একটু চিকচিকিয়ে উঠল। সূর্যটা নেমে গেছে। এখন আছে খানিক বিদায়ী কমলা আভা। সেই আভাতেই পাগলটার মুখের এই চিকচিকানি বেশ ঠাহর হল। তারপর উঠে দাঁড়াল বেঞ্চি থেকে। ওদিকে তাসপার্টিও উঠে দাঁড়িয়েছে তখন। ভালো খাবারের মতো করে শেষ ডিলটার আলোচনার সাথে সাথে প্লাস্টিক ভাঁজ করা চলছে। অল্পবয়সী ছেলেমেয়েগুলোর অবশ্য সময় হতে আর খানিক দেরি আছে। পাগল নিজের জামাটাই খুলে নিয়ে বেঞ্চিটা এবার ঝাড়ল ভালো করে। ঝেড়ে আবার পরে নিল। তারপর এল দুলালের দোকানের সামনে। দুলাল দুটো কেক বাড়িয়ে দিল। পাসল সেটা নিল খপ করে। প্রায় ছিনিয়ে নেওয়ার মতো করে। খেল না। খাবেও না। প্ল্যাটফর্মের ধারে পায়চারি করবে দু’নম্বরের দিকে তাকিয়ে। যতক্ষণ না ট্রেনটা আসে এবং সেই ট্রেন থেকে এক অন্ধ দম্পতি নেমে এসে ওভারব্রিজের দিকে এগিয়ে যায়। ওরা হাত আর লাঠিকে চোখের মতো ব্যবহার করে একে অপরকে ধরে ধরে নিজেদের অভ্যস্ত কায়দায় সিঁড়ি ভেঙে এগিয়ে আসবে চারনম্বরের দিকে। পাগল তখন দৌড়ে চলে যাবে চারনম্বরের ওভার ব্রিজটার মুখে। প্রায় ছটপট করতে করতে ওদের ধীর গতিতে এগিয়ে আসা দেখবে। এতই ছটপটানি যখন চলেই যেতে পারে দু’নম্বরে, সেখান থেকেই নিয়ে আসতে পারে ওর বন্ধুদের। সে যাবে না। পাগল চারনম্বরের বাইরে বেরোয় না। বা চারনম্বর পাগলকে বাইরে বেরোতে দেয় না।

–পাগলেরও বন্ধু… হ্যাঁ? মানুষ ঠিক মানুষ খুঁজে নেয়…। এক তাসুড়ে বলল।

–আমরাও তো বন্ধু ওর… এই পেলাটফর্মটাও..। দুলাল মাঝেমাঝে বেশ দার্শনিক কথা বলে। চা বানাচ্ছে এখন। ওদের চারজনেরও এক রাউন্ড হবে। আর পাগলের বেঞ্চিতে যাবে তিনকাপ।

–বাঁশিটা কিন্তু চমৎকার বাজায় লোকটা…। লম্বামুখো বেঞ্চিতে ওর জায়গায় ফিরে এসেছে আবার…

এই কথাগুলি স্পষ্ট এবং উপরস্তরের। মেঘমুক্ত যে আকাশে রকেট যায়, সেখানে থাকে এরা। এগুলির সাথে সাথে নিচের ক্ষুদ্র গণ্ডির সেই ঘোলাটে কথাগুলিও এখনই কিছু জন্মাল…

–ভোটের বা অন্য সব কাজের ফতোয়া মোল্লারা কেন দেবে?

–যার যা কাজ সে তো করবেই… মাতব্বর কোথায় নেই?…

–সে শোনে কজনে?

–ইউপির ভোট দেখলি?

এবার লম্বামুখো এই আকাশে উঁকি দিল কিঞ্চিত…

–ইউপির ভোটটা কিন্তু একটা ঘটনা। সবাই মুসলমানরাও বিজেপিকে ভোট দিয়েছে বলেই প্রচারটা করছে, কিন্তু তাতে যে একটা বড় মিথ ভেঙে গেল, সেটা কেউ বলছে না। মুসলমানদের বিরুদ্ধে তো এটাই বলা হয় যে ওরা মোল্লাদের কথায় ওঠে বসে, আর মোল্লারা সবসময়েই পেছনে টানে। সে টানে, কিন্তু কথা হচ্ছে, এই যে মুসলিমরা বিজেপিকে ভোট দিল, তাহলে এক হতে পারে মোল্লারাই বলেছে সেটা। এবার ভাব, বিজেপি তিন তালাক তুলে দেবে, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি করবে, সেই প্রেক্ষিতে মোল্লারা যদি এমনটা বলে, তাহলে তো পেছনে টানার তত্ত্বটার পেছন ফাটল! যদিও বিজেপিকে ভোট দেওয়া কতটা সামনে এগোনো সে আমি জানি না! আর একটা হতে পারে, মোল্লারা উলটো ফতোয়া দিয়েছিল, সাধারণ মুসলিমরা সেটা মানেনি। সেটা হলে মোল্লাদের কথায় ওঠবোস করার তত্ত্বটা গেল। শাঁখের করাত পুরো। তাই ওটা আলোচনায় না আনাই ভালো…

একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল নীলজামার। লম্বামুখো একসময় তেড়ে ট্রেড ইউনিয়ন করত। ওর যুক্তিবুদ্ধি বেশ মান্যতা পায়, তার কারণও আছে। সেই বীরেন মিত্তিরের ঘটনাটার পর পুলিস যখন রাতবিরেতে বস্তি তছনছ করা শুরু করেছিল… কোনও পুরুষ নেই… রাতগুলোতে মহিলা আর শিশুদের চিৎকার আর কান্না প্ল্যাটফর্ম, স্টেশন তো বটেই, পুরো তল্লাটের বাতাসকে ভারী করে জমিয়ে দেয়… চারনম্বর প্ল্যাটফর্মটাও থেকে থেকে অপার্থিব কেঁপে ওঠে… পাগলটা গোটা প্ল্যাটফর্মে দৌড়ে বেড়ায় আর মাঝেমাঝেই ভয়ঙ্কর চিৎকার ছোঁড়ে… তখন মোটামুটি ঠিকই হয়ে গেছিল পুরুষদের পিছু পিছু মহিলা-শিশু-বুড়ো-বুড়ি-ঘর-দরমা-টালি সবাই গুটগুট করে আবার নিরুদ্দেশ যাত্রায় যাবে, জায়গা আবার ফাঁকা হবে, সাপ-শিয়াল-ভূতেরা ফিরবে, এলাকার মানুষ আবার চার ব্যাটারীর টর্চগুলোয় নতুন ব্যাটারী ভরবে। আসলে পুলিসের মনে সন্দেহ ঢুকেছিল ওই বস্তির দুএকটা ছেলে নকশাল। হতে পারে। তো তখন এই লম্বামুখোই উদ্যোগ নিয়ে এলাকার লোকেদের কাছে গিয়ে গিয়ে সই ফই নিয়ে অনেকে মিলে থানায় গিয়ে ডেপুটেশন দেয়, পুলিস আইন ভেঙ্গে অত্যাচার করছে, এসব বলে পথসভাটভাও করে। বস্তিটা বেঁচে যায়। কিন্তু লম্বামুখো না। বীরেন মিত্তির যে পার্টির ছিল, ট্রেড ইউনিয়নও তাদের, পুলিসও। ফলত লম্বামুখোর রাজনৈতিক জীবনের ওখানেই দাঁড়ি।

আর দ্বিতীয়বার বস্তিটা বিপদে পড়ে, যখন স্টেশনে ইউনিয়ন অফিসে ঝাণ্ডার রং পালটায়। নীলজামার একটু হাসি খেলল ঠোঁটে। হুঁ, শুধু তো হকার্স ইউনিয়ন, ট্রেড ইউনিয়ন বা পুলিসই নয়, বস্তির লোকগুলোও তো ওই পার্টিকেই ভোট দিত। আর সেটাই তাদের এবারের সংকটের কারণ হয়ে উঠেছিল। নতুন ঝাণ্ডা ঠিক করল, এরা ওদের, অতএব হটিয়ে দেওয়াই ভালো। সে জায়গায় একটা প্রোমোটিং মন্দ হয় না। আবার কিছু ধরাকরা, ধর্ণা, একদিন রেললাইনে বসে পড়া, তারপর শেষমেশ আনুষ্ঠানিক দলবদলে রেহাই। ভাসন্ত মানুষ ভোটের দোলায় ভাসতে থাকে।

গরম চা আর একটা নরম বাঁশির সুরে চটক ভাঙল নীলজামার। সন্ধে নেমেছে। প্ল্যাটফর্মের আলো জ্বলেছে। অন্ধ লোকটা পাগলের বেঞ্চিটায় বসে বাঁশিতে সুর তুলেছে। তার একপাশে তার অন্ধ সঙ্গিনী চোখ খুলে আর একপাশে পাগল চোখ বুজে বসে রয়েছে। দুজনের মাথাই দুলছে অল্প অল্প। তাসপার্টি চলে গেছে। অল্পবয়সী ছেলেমেয়েগুলোও উঠবে এবার। একনম্বরে মাঝেমাঝেই আপ ট্রেনগুলো এসে গলগল করে পেট থেকে মানুষ উগড়ে দিয়ে যাচ্ছে। একনম্বরের বাইরে মিটিং শুরু হয়েছে। কিন্তু সে মিটিং-এর মাইকের শব্দ এই চারনম্বরে ওই ওপরের লেভেলে, রকেট যেখানে যায়। তলার স্তরে যেখানে মানুষগুলোর কান, সেখানে বাঁশির সুর। বাচ্চাগুলো অনেক লাল পাপড়ি জমিয়েছে।

–আমাদের হয়েছে বিপদ… নীলজামার পাশের জন বলল। যে দুজন এতক্ষণ ওই ধূসর সংলাপটা চালাচ্ছিল, তাদের একজন। চোয়াল ভাঙা, চোখে চশমা, মুখের আকৃতি পঞ্চভুজের মতো। ‘আমাদের মোল্লারাও বিশ্বাস করে না, হিন্দুরাও না…’

–কী হয়েছে? মনোগত সিপিয়া ছেড়ে বাস্তব ধূসরতায় ঢুকল নীলজামা…

–সুবোধরা হুমকি দিচ্ছে… নানান ইস্যু করে খোঁচাচ্ছে… একটু প্ররোচনা হলেই হয়…। পঞ্চভুজ আর লম্বামুখোর মাঝের জন উত্তর দিল। একে আমরা হালকা টাক বা নেয়াপাতি বলে ডাকতে পারি। এই চারজনের মধ্যে একমাত্র এরই একটু নেয়াপাতি ভুড়ি আছে। অনেকদিন কেরানিগিরি করার চিহ্ন। রিটায়ারমেন্ট হয়ে গেছে। কেরানিগিরির সাথে সাথে একটা নাটকের দল আর এপিডিআর করত লোকটা। এপিডিআরটা অবশ্য এখনই অতীত গোত্রে ফেলা যাবে না। অফিসে যাতায়াতটা আছে। কিন্তু ওইটুকুই।

–সুবোধ মানে বীরেনের সাথে যার ওঠবোস ছিল? সুশীল ময়রার ছেলে?

–হুঁ… সেই… অবাক লাগছে?

না, অবাক লাগে না। চারনম্বর প্ল্যাটফর্মের আবাসিকদের অবাক হওয়ার মানা আছে। আসলে অবাক হতে গেলে কী নিয়ে অবাক হওয়া যায়, সেটা ভেবে ওঠাটাই বেশ অবাক করা একটা ব্যাপার! এই পাগল কুকুরকে গালাগাল দিতে দিতে ধাওয়া করছে, আবার এই তন্ময় হয়ে বাঁশিওয়ালার বাঁশি শুনছে। এই বাচ্চাদুটো মারামারি করছে, তো এই লাল শিউলির পাপড়ি জমাচ্ছে! আচ্ছা, ওরা না হয় পাগল বা বাচ্চা, ব্যাকরণ মানে না… কিন্তু এই এরা? এই যে চারজন অনন্তকে সাক্ষী রেখে সেই বসে আছে তো বসেই আছে, এমনই যে চারটে রেললাইন আর একটা জোড়া প্ল্যাটফর্মের ব্যবধান থেকে দেখলেই চারটে এক মানুষ বলে ভ্রম হয়, সেই চারজনেরই একজন বেখাপ্পা আলাদা। ওদের চেহারা ছবি মানুষের মতো হলে ওর কিনা হয় রাক্ষস বা কোনও পোকার হওয়া উচিত। ঘিনঘিনে বা বিষাক্ত কোনও পোকা। সেরকমটা যে লাগছে না সেটাই কী কম অবাক করার মতো! বা এই তিনজন ওর সঙ্গে গা ঘষাঘষি করে বসে আছে। দুলাল চা দিয়ে ফেরার সময় ওর কাছ থেকে একটু গুণ্ডি চেয়ে মুখে পুরে দিল। এই যে বস্তির লোকগুলোর সাথে এদের প্রায় পারিবারিক সম্পর্ক, সেও তো এই চারজনের সাথেই, ওই লোকটা তো বাদ পড়ে না। অবাকত্বের হদ্দমুদ্দ একেবারে! এর চাইতে ওসব অবাক চক্করে না পড়াই ভালো!

–মেয়েটা সেদিন হঠাত বলে, আব্বু, রেপ মানে কী?

বাঁশির আওয়াজে যে আবেশটা ওদের মাথার কোষগুলোতে আর প্ল্যাটফর্মের ইঁট-সিমেন্টের খাঁজে খাঁজে মিশে যাচ্ছিল, সেটাকে চুরমার করে মাথার টিনের শেডের কোণে লাগানো মাইকটা অসভ্যের মতো খ্যান খ্যান করে উঠল, ‘চারনম্বর প্ল্যাটফর্ম দিয়ে থ্রু ট্রেন যাবে। অনুগ্রহ করে লাইন ও প্ল্যাটফর্মের…’। দুলাল দোকানের সামনে উবু হয়ে বসে কাপ ধুচ্ছিল, একটু স্থির হয়ে গেল। ওদের বসার ভঙ্গিগুলো কেমন পালটে গেল, শিথিল থেকে টানটান। প্ল্যাটফর্মটাও আসন্ন ধাক্কা সামলানোর জন্য তৈরি হল। বাঁশি থেমে গেছিল, পাগল হঠাত বাচ্চাদুটোর দিকে তাকিয়ে একটা অপার্থিব চিৎকার দিল। বাচ্চাদুটো চমকে উঠল। পঞ্চভুজের মেয়েটা ওদেরই বয়সী।

–হুম… কিরে, কটা ছোট ছোট নাটক লেখ… বা স্ক্রিপ্ট কর… পথনাটক করি আবার…। নেয়াপাতি নীলজামার দিকে তাকিয়ে অস্বস্তিকর নীরবতাটা ভাঙল…

–তুই দল ছেড়েছিস না?

–হুঁ… তাতে কী? এই ওরা আছে তো…। একটু হেসে বস্তিটার দিকে তাকাল নেয়াপাতি…

–আমিও ওখান থেকেই শুরু করি…। লম্বামুখোর উজ্জ্বল চোখদুটো নেয়াপাতির দৃষ্টি অনুসরণ করল…

বাঁশি আবার শুরু হয়েছে। পাগলও আবার শান্ত হয়ে মৃদুমন্দ মাথা দোলাচ্ছে। ওদের কথাগুলো সেই বাঁশির সুরের পিঠে সওয়ার হয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে প্ল্যাটফর্ম জুড়ে, বস্তিটার দিকে। বাচ্চাদুটো হাতে শিউলির পাপড়িগুলো নিয়ে উঠে এসে দাঁড়িয়েছে প্ল্যাটফর্মের ধারের দিকে।

–বেশ… চল… লিখছি…, পঞ্চভুজের পিঠে একটা চাপড় মারল নীলজামা, –তুইও শুরু কর… মুড়িটুরি মাখ… আবার রাত জাগতে হবে তো…

–সেই বিরানব্বই না? শালা সময় ফিরে ফিরে আসে…! বিলাপোক্তি করলেও পঞ্চভুজের মুখে উদ্বেগের পরতটা যেন এক পোঁচ কমেছে মনে হল…

–আসুক না! বেঁচে আছি তো! আমরা… মানুষ…

চারনম্বর কাঁপিয়ে তীব্র একটানা হর্ন দিয়ে ধুলো উড়িয়ে বেরিয়ে গেল থ্রু ট্রেনটা। লম্বামুখোর শেষ কথাটা অন্ধের বাঁশির সুর ছেড়ে টুপ করে ওই তীব্র হর্নের পিঠে উঠে বসল, এবং চলে গেল অনেকটা দূর অব্ধি। বাচ্চাগুলো ট্রেনের হাওয়ার ঝাপটার মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছিল শিমুলের লাল পাপড়িগুলো। সেগুলোও হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে ছড়িয়ে গেল এদিকওদিক…

 

 

6 Comments

  1. “উর্দু বললে তো আর খিদে কম পায় না”..এই ভাবনার জন্য লেখককে সেলাম|

  2. লেখার হাতটি খাসা তোমার! তবে বিষয়বস্তুটি আমাকে খুব একটা টানল না!

  3. কিছু জায়গা খুব ভালো লাগলো কিন্তু সব মিলিয়ে একটু বেশিই জটিল হয়ে গেল

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*