ক্যাপ্টেন দুপুরে ভাত খেতে গেছে আর নাবিকেরা দখল নিয়েছে জাহাজের — তৃতীয় পর্ব

চার্লস বুকাওস্কি

বাংলায়ন : শুভঙ্কর দাশ

(দ্বিতীয় পর্বের পর)

 

৯-১২-৯১

রাত ১১-১৯

আজ আর ঘোড়া নয়। অদ্ভুতভাবে নিজেকে আজ স্বাভাবিক মনে হচ্ছে। আমি জানি কেন হেমিংওয়ের দরকার হত ষাঁড়ের লড়াই দেখার, ছবিগুলোকে ফ্রেম বন্দী করতে সাহায্য করত, এটা মনে করাত ওটা কোথায় এবং ওটা কী। মাঝে মাঝে আমরা ভুলে যাই, গ্যাসের বিল দিতে, তেল পাল্টাতে ইত্যাদি। বেশিরভাগ মানুষই মৃত্যুর জন্য তৈরি নয়, তাদের বা অন্য কারও। এটা তাদের প্রচণ্ড মানসিক ধাক্কা দেয়, ভয়ার্ত করে তোলে। এটা যেন একটা আশ্চর্য ঘটনা। এরকম নয় ব্যাপারটা। আমি মৃত্যুকে আমার বাঁ পকেটে নিয়ে ঘুরে বেড়াই। মাঝে মাঝে বার করে কথা বলি ওর সাথে, ‘কী সোনা কেমন আছ? আমার জন্য কবে আসবে? আমি তৈরি থাকব।’

মৃত্যুর জন্য শোক করার কিছু নেই। যেভাবে একটা ফুলের বেড়ে ওঠার জন্যও শোক করার কিছু থাকে না। যেটা ভয়ঙ্কর সেটা মৃত্যু নয় বরং তা মানুষের জীবন যা তারা বাঁচে বা যেভাবে বাঁচা উচিৎ তারা বাঁচে না তাদের মৃত্যু অবধি। নিজের জীবনকেই তারা সম্মান দেয় না, তারা নিজের জীবনের উপরেই মোতে ছরছর করে। তারা হেগে বার করে দেয় সবকিছু। বোকাচোদাগুলো। তারা খুব বেশি করে মন দেয় শোয়ায়, সিনেমায়, টাকাপয়সায়, সংসারে, চোদাচুদিতে। ওদের মাথা ভর্তি তুলোয়। তারা না ভেবেই গিলে নেয় ভগবানকে, তারা না ভেবেই গিলে নেয় দেশ। তারপর তারা ভাবতে ভুলে যায়, তারা ছেড়ে দেয় অন্যদের কাছে যারা তাদের জন্য ভেবে দেবে। তাদের বুদ্ধিসুদ্ধি তুলো দিয়ে ভর্তি। তারা দেখতে কুৎসিত, কুৎসিত কথা বলে, হাঁটে কুৎসিতভাবে। তাদের শোনান শতাব্দী পুরোন সেইসব মহান মিউজিক, দেখবেন তারা শুনতে পাবে না। বেশিরভাগ মানুষের মৃত্যুই একটা ধোঁকা। কিছুই বাকি নেই আর মরার।

আসলে দেখুন আমার ঘোড়া দরকার। আমি আমার রসবোধ হারিয়ে ফেলি। একটা জিনিস মৃত্যু সহ্য করতে পারে না, যখন আপনি তাকে নিয়ে হাসাহাসি করবেন। আসল হাসি তাদের গাঁড়ে ভরে দেয় সমস্ত লম্বা লম্বা অস্বাভাবিকতা। গত ৩ বা ৪ সপ্তাহ আমি হাসিনি। কিছু একটা কুরে খাচ্ছে আমাকে। আমি নিজের গা চুলকোই, এদিক ওদিক নড়িচড়ি, তাকাই, চেষ্টা করি ব্যাপারটা খুঁজে বার করতে। শিকারি খুব চালাক। আপনি দেখতে পাবেন না পুরুষটিকে বা নারীটিকে।

কম্পিউটারটাকে দোকানে পাঠাতে হবে। সেটার খুঁটিনাটি দিয়ে আর আপনাদের আশীর্বাদ করতে চাইছি না। কোনও একদিন কম্পিউটার সম্পর্কে আমি অনেক বেশি জানব যতটা না কম্পিউটারগুলো তাদের নিজের সম্পর্কে জানে। কিন্তু এখন এই মেশিনটা আমার বিচি চেপে ধরে আছে।

আমি দুজন সম্পাদককে চিনি যারা কম্পিউটার সহ্য করতে পারে না। আমার কাছে সে দুটো চিঠি আছে যেখানে কম্পিউটারের বিরুদ্ধে কথাবার্তা রয়েছে। আমি অবাক হয়ে গেছিলাম চিঠি দুটোয় ঘেন্নার বহর দেখে। আর ছেলেমানুষি দেখে। আমি এটা ভালোই জানি যে কম্পিউটার আমার হয়ে লিখে দেবে না। আর যদি তা পারতও আমি তা হোক চাইতাম না। ওরা দুজনে চালিয়ে গেল অনেকটা। মোদ্দা কথা ছিল কম্পিউটার আত্মার জন্য ভালো নয়। হ্যাঁ, হয়ত কিছুটা তাই কিন্তু আমি হাত তুলব সুবিধার জন্য। আমি যদি যা লিখি তার দুগুণ লিখতে পারি আর তার গুণ এক থাকে তাহলে আমি কম্পিউটারই চাইব। লেখা হচ্ছে তাই যখন আমি উড়ি, লেখা হচ্ছে তাই যখন আমি আগুন জ্বালাই। লেখা হচ্ছে তাই যখন আমি মৃত্যুকে বাঁ পকেট থেকে বার করি, দেওয়ালে ছুঁড়ে মারি আর দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে তা যখন ফিরে আসে আমি লুফে নিই তাকে।

এই লোকগুলো ভাবে আপনাকে সারাক্ষণ রক্তাক্ত হতে হবে ক্রুশে যাতে আপনার আত্মা টিকে থাকে। তারা আপনাকে চায় অর্ধ উন্মাদ, জামার সামনেটা ভিজে গেছে ফোঁটায় ফোঁটায়। অনেক ক্রুশে কাটিয়েছি আমি, ওইসব অভিজ্ঞতায় এ জীবন ভরে আছে আমার। ওই ক্রুশ এড়িয়েও যদি থাকি আমি তাহলেও অনেকটা চলা বাকি থেকে গেছে। অনেকটাই। ওরা গিয়ে ক্রুশে উঠুক গে, আমি শুভেচ্ছা জানাব। যন্ত্রণা লেখার সৃষ্টি করে না, লেখার সৃষ্টি করে একজন লেখক।

যাইহোক ফের দোকানে ফিরে যাই এটা নিয়ে আর যখন এই দুই সম্পাদক দেখবে আমার লেখা ফের টাইপ করা ওরা ভাববে বুকাওস্কি তার আত্মা ফিরে পেয়েছে। এই লেখাগুলো পড়তে অনেক ভালো লাগছে।

আহ, বেশ আমরা আমাদের সম্পাদকদের ছাড়া কীইবা করতাম? বা আরও ভালো হয় এভাবে বললে যে আমাদের ছাড়া ওরাই বা কী করত?

৯-১৩-৯১

বিকেল ৫-২৮

রেসের মাঠ বন্ধ হয়ে গেছে। কোনও বাজি ধরাও যাবে না পোমোনাতে। এই গরমে গাড়ি চালিয়ে যাবেই বা কে? আমি বরং লস অ্যালামিটস-এর রাতের ঘোড়দৌড়ে যাব। কম্পিউটারটা দোকান থেকে ফিরে এসেছে আবার কিন্তু এখন ওটা আর আমার বানান ভুল শোধরায় না। মেশিনটাকে অনেক খোঁচাখুঁচি করলাম ঠিক করার জন্য। মনে হয় দোকানে আবার ফোন করতে হবে, লোকটাকে জিজ্ঞাসা করতে হবে, ‘এবার কী করব আমি?’ হয়ত সে বলবে, ‘ওটা আপনাকে আপনার মেন ডিস্ক থেকে হার্ড ডিস্কে ট্রান্সফার করতে হবে।’ হয়ত শেষমেশ আমি সব কিছু উড়িয়ে বসে থাকব। টাইপরাইটারটা আমার পেছনে বসে বলছে, ‘দেখো আমি কিন্তু এখনও এখানে আছি।’

এমন অনেক রাত আছে যখন শুধু এই ঘরেই আমি থাকতে চাই। তবুও যখন ঘুম থেকে উঠি নিজেকে একটা শূন্য ফলের খোসা মনে হয়। আমি জানি এই স্ক্রিনে আমি ঝড় তুলে দিতে পারি আর নেচে উঠতে পারে শব্দরা যদি একটু মাতাল হওয়া যেত, কিন্তু লিন্ডার বোনকে এয়ারপোর্ট থেকে আনতে যেতে হবে আগামীকাল দুপুরে। সে দেখা করতে আসছে। সে তার নাম পাল্টে রবিন থেকে ঝাররা হয়েছে। মেয়েদের যত বয়স বাড়ে তারা তত নাম পাল্টায়। মানে আমি বলতে চাইছি, অনেকেই করে আর কী। আচ্ছা যদি একটা পুরুষ এটা করত? আপনি কি ভাবতে পারেন আমি ফোনে কাউকে বলছি,

‘কী মাইক, আমি টিউলিপ।’

‘কে?’

‘টিউলিপ। আগে ছিলাম চার্লস কিন্তু এখন টিউলিপ। আমি আর চার্লস বললে সাড়া দেব না।’

‘গোল্লায় যাও, টিউলিপ।’

মাইক ফোন রেখে দেয়…

বুড়ো হওয়াটা বড় অদ্ভুত। আসল ব্যাপারটা হল সারাক্ষণ নিজেকে এটা বলতে হয়, আমি বুড়ো, আমি বুড়ো। এস্কেলেটারে নিচে নামতে নামতে আপনি আয়নায় দেখেন নিজেকে কিন্তু সরাসরি আয়নার দিকে তাকান না, একটু তেরছা করে মেপে নেন নিজেকে, একটা সতর্ক হাসি। নিজেকে অতটাও খারাপ লাগছে না আপনার, আপনাকে একটা ধুলোময় মোমবাতির মতো লাগছে। খুব খারাপ, গাঁড় মারো ভগবানের, গাঁড় মারো এসব খেলার। ৩৫ বছর আগেই আপনার মারা যাওয়া উচিৎ ছিল। এটা একটু এক্সট্রা দৃশ্য, হরার শোতে আরও কিছু উঁকিঝুঁকি।

একটা লেখক যত বুড়ো হবে তার তত ভালো লেখা উচিৎ, সে অনেক দেখেছে, অনেক সহ্য করেছে, অনেক হারিয়েছে, সে তো মৃত্যুর কাছাকাছি। শেষটা হচ্ছে সবথেকে সুবিধাজনক। আর সারাক্ষণই আছে একটা নতুন পাতা, ওই সাদা পাতাটা, সাড়ে আট বাই এগারো। জুয়া খেলা বাকি রয়ে গেছে। তারপর আপনার মনে পড়ে একটা দুটো কথা যা বলেছে অন্যান্য ছেলেরা। যেমন জেফার্স, ‘সূর্য নিয়ে রাগ কোরো’। বড্ড বেশি ভালো। বা সার্ত্রে, ‘অন্যান্যরাই আসলে নরক’। একদম ঠিক আর একেবারে টার্গেটের ভেতর দিয়ে গেছে। আমি কখনওই একা নই। একা থাকাই ভালো সব থেকে কিন্তু ঠিক একাও নয় আবার।

আমার ডানদিকে রেডিওটা পরিশ্রম করে চলেছে খুব, আমার জন্য নিয়ে আসছে আরও মহান সব ক্লাসিক্যাল মিউজিক। প্রতি রাতে আমি শুনি ৩ বা ৪ ঘণ্টা অন্য কাজ করতে করতে বা কিছুই না করতে করতে। এটাই আমার ওষুধ, যা ধুয়ে দেয় সারাদিনের সমস্ত ময়লা। ক্লাসিক্যাল কম্পোজাররা এটা পারে করতে আমার জন্য। কবি, ঔপন্যাসিক, ছোট গল্পকারেরা পারে না। একদল জালিয়াত। লেখালিখিতে একটা কিছু আছে যা এই জালিয়াতদের টেনে আনে। কী সেটা? লেখকদের সহ্য করা সব থেকে কঠিন, তা কাগজেই হোক বা তার সরাসরি উপস্থিতি। আর তাদের উপস্থিতি তাদের কাগজের উপস্থিতির থেকেও খারাপ, আর সেটা খুবই বাজে ব্যাপার। আমরা কেন বলি ‘বাজে ব্যাপার’? কেন ‘কুৎসিত ব্যাপার’ নয়? যাইহোক, লেখকেরা খুবই বাজে আর খুবই কুৎসিত। আর আমরা ভালবাসি একে অপরকে কাঠি করতে। আমার দিকে দেখুন।

আর লেখা নিয়ে বলতে গেলে বলব আজ থেকে ৫০ বছর আগেও আমি যেভাবে লিখতাম এখনও মোটামুটি সেভাবেই লিখি, হয়ত কিছুটা ভালো আগের থেকে কিন্তু খুব বেশি কিছু নয়। কেন আমাকে ৫১ বছর অবধি অপেক্ষা করতে হল যখন আমি লেখা থেকে কামানো পয়সা দিয়ে বাড়ির ভাড়া দিতে পারি? মানে আমি বলতে চাইছি যে আমি যদি ঠিক কথা বলে থাকি যে আমার লেখা খুব কিছু আলাদা হয়ে যায়নি তাহলে কেন এতটা সময় লাগল আমার? আমাকে কি অপেক্ষা করতে হল যতক্ষণ না পৃথিবী আমাকে বুঝতে পারে? আর এখন তা যদি পেরে থাকে, এখন আমি কী অবস্থায়? খুব খারাপ আছি, সেটাই হচ্ছে কথা। যেটুকু ভাগ্য আমার সহায় হয়েছে তাতে আ্মি মাথামোটা হয়ে গেছি বলে আমি মনে করি না। কোনও মাথামোটা এটা কি কখনও বুঝতে পারে যে সেই আসলে নির্বাচিত? কিন্তু আমি তো সন্তুষ্টির থেকে বহু দূরে। আমার মধ্যে কিছু একটা আছে যা আমি শাসন করতে পারি না। ব্রিজের উপর থেকে গাড়ি চালিয়ে কখনও যেতে পারি না আত্মহত্যার কথা না ভেবে। কখনও একটা লেকের দিকে বা একটা মহাসমুদ্রের দিকে তাকাতে পারি না আত্মহত্যার কথা না ভেবে। মানে আমি বলতে চাইছি যে আমি এর সবগুলোতেই দীর্ঘ সময় কাটাই না। কিন্তু হঠাৎ তা মাথায় বিদ্যুতের মতো চমকে উঠবে, আত্মহত্যা। যেন একটা আলো জ্বলে আছে। ঘোর অন্ধকারে। একটা বেরোবার রাস্তা আছে বলে তা থাকতে সাহায্য করে। বুঝলেন? তাছাড়া উন্মাদ হয়ে যাওয়া ছাড়া আর উপায় নেই। আর সেটা আদৌ মজার কিছু নয়, বন্ধু হে। আর যখন একটা ভালো কবিতা শেষ করে উঠি সেটাও আর একটা ক্রাচ বেঁচে থাকার। আমি অন্যদের ব্যাপারে বলতে পারব না, কিন্তু যখন সকালে নিচু হয়ে জুতো পরি, তখন ভাবি, হে ভগবান এবার কী? জীবন আমাকে চুদে দিয়েছে, আমাদের এতটুকুও বনে না। আমাকে অল্প অল্প ছিঁড়ে খেতে হয়, কখনওই পুরোটা নয়। এটা অনেকটা বালতি বালতি গু গেলার মতো। আমি অবাক হই না এটা জেনে যে পাগলা গারদগুলো আর জেলখানা সব ভর্তি আর রাস্তাঘাট ভর্তি সব। আমি আমার বেড়ালদের দেখতে ভালোবাসি, আমাকে ওরা ঠাণ্ডা রাখে। আমাকে ভালো থাকতে সাহায্য করে। আমাকে ঘর ভর্তি লোকের মাঝে রাখবেন না। কখনও না। ছুটির সময় তো নয়ই।  এটা কখনও করবেন না।

আমি শুনেছি ওরা নাকি আমার প্রথম বউকে ভারতে আবিষ্কার করেছিল মৃত, আর তার শরীর ফ্যামিলির কেঊ নিতে চায়নি। বেচারি মেয়েটা। ওর ঘাড়টা পঙ্গু ছিল, ঘুরত না। ওটা ছাড়া সে ছিল অসাধারণ। সে আমাকে ডিভোর্স দিয়েছিল আর সেটাই উচিৎ ছিল তার। তাকে বাঁচানোর জন্য পর্যাপ্ত স্নেহশীলতা আর বিশালতা আমার ছিল না।

(চতুর্থ পর্ব আগামী সংখ্যায়)

1 Trackback / Pingback

  1. ক্যাপ্টেন দুপুরে ভাত খেতে গেছে আর নাবিকেরা দখল নিয়েছে জাহাজের — চতুর্থ পর্ব – ৪ নম্বর প্ল্যাট

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*