রোবসন কথা : শেষ ভাগ

দেবাশিস মৈত্র

(পঞ্চম ভাগ এখানে)

 

পল রোবসন # ১২

পুরো পাঁচের দশক জুড়ে House Un-American Activities বা HUAC গোটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হওয়ার কারণে, অথবা সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার অভিযোগে, এই কমিটি যাঁদের কাঠগড়ায় তুলেছিল তাঁদের নাম আগেই করেছি। কমিটির সদস্যরা তাদের অঙ্গুলি পরিমাণ জ্ঞান সম্বল করে বিচার করতে বসত এমন মানুষদের, যাঁদের জুতোর ফিতে বেঁধে দেওয়ার যোগ্যতাও তাদের ছিল না।

কিন্তু কমিটির ছিল অসীম রাজনৈতিক ক্ষমতা, আর তাদের বিশেষ নজর ছিল শো বিজনেসের দিকে। মার্কিন সরকার তখন সব কিছুর মধ্যেই কমিউনিজমের ভূত দেখছে (ঠাট্টা করে তখন বলা হত – red under the bed)। নাটক, সঙ্গীত বা ফিল্মের সঙ্গে যুক্ত যত মানুষকে একবার এই কমিটির সামনে হাজির হতে হয়েছে, অভিযোগ (অপরাধ নয়, আমি লিখছি – অভিযোগ) প্রমাণ হোক বা না-হোক, তাদের মধ্যে শতকরা ৯০ জনের কেরিয়ার স্রেফ ধ্বংস হয়ে গেছে। জ্বলন্ত উদাহরণ, পল রোবসন এবং চার্লি চ্যাপলিন। আরও কত নবীন-প্রবীণ শিল্পী যে হারিয়ে গেছেন, আমরা তার খবরও পাই না।

রোবসন এবং চ্যাপলিন ছিলেন কমিটির হিট-লিস্টের একেবারে উপরের দিকে। দু’জনেরই বিশ্বজোড়া জনপ্রিয়তা এবং দু’জনেই মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারে বিশ্বাস করেন। এঁরা যদি কমিউনিস্ট না-হবেন তো কমিউনিস্ট আর কে? রোবসন বাইরে কালো, অন্তরে লাল। আর চ্যাপলিন? লোকটা বিদেশি, এত বছর এদেশে রয়েছে অথচ এখানকার নাগরিকত্ব নেয়নি, উপরন্তু সরকারের কী করা উচিত বা উচিত নয়, তা নিয়ে হরবখত জ্ঞান দেয়। এদের ধ্বংস করতে না-পারলে তো দেশটাই উচ্ছন্নে যাবে!

রাষ্ট্রের দ্বারা শিল্পীর ধ্বংসসাধন – এর ভুরি ভুরি উদাহরণ আমরা দেখেছি টোটালিটেরিয়ান স্টেটগুলিতে, অর্থাৎ, সহজ ভাষায় বললে, ফ্যাশিস্ট রাজত্বে, এবং পরবর্তী যুগের কমিউনিস্ট বা সোশ্যালিস্ট দেশগুলিতে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তো টোটালিটেরিয়ান স্টেট নয়। তারা তো বরাবর দাবি করে এসেছে যে তারাই নাকি বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র!

১৯৫২ সালে চ্যাপলিন চিরকালের মতো দেশ ছেড়ে চলে গেলেন। ঠিক পাঁচ বছর পর, ১৯৫৭ সালে, তিনি তৈরি করলেন তাঁর প্রথম ব্রিটিশ ফিল্ম, A King in New York। আদ্যন্ত একটি রাজনৈতিক ছবি। ম্যাকার্থি জমানার ভয়ঙ্কর উন্মত্ততা এবং নাগরিকদের বিরুদ্ধে সর্বশক্তিমান রাষ্ট্রের একতরফা যুদ্ধ – এ-ই ছিল ছবিটির বিষয়বস্তু। অত্যন্ত সিরিয়াস কনটেন্ট, এবং ফর্ম যথারীতি চ্যাপলিনীয় কমেডির।

একজন শিল্পীর প্রতিশোধ (বিশেষত তিনি যদি হন চ্যাপলিনের মাপের শিল্পী) যে কী ভয়ঙ্কর হতে পারে, A King in New York তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এই ছবির একটি দৃশ্যে আমরা দেখি, HUAC-এর সমস্ত মাননীয় সদস্যকে, গোটা কমিটিটাকেই, হোস পাইপের জলের তোড়ে স্রেফ উড়িয়ে দিচ্ছেন চ্যাপলিন। তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করছে এই কাণ্ডটি থামাতে, কিন্তু অবাধ্য জলের স্রোত তাঁর কথা শুনছে না। যতবার দৃশ্যটি দেখি, হাসতে হাসতে দম বন্ধ হয়ে আসে আমার, আর তারই মধ্যে আমি অনুভব করতে পারি — শুধু তাঁর নিজের অপমানের কারণে নয়, বিনা দোষে রাষ্ট্রের হাতে শেষ হয়ে-যাওয়া সমস্ত শিল্পী-সাহিত্যিক-গায়ক-অভিনেতাদের পক্ষ থেকে কী গভীর আক্রোশে কী ভয়ঙ্কর প্রতিশোধ নিচ্ছেন চ্যাপলিন।

বলা প্রায় বাহুল্য যে, A King in New York-কে আমেরিকায় নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। সেদেশে ছবিটির মুক্তি পেতে সময় লেগেছিল দীর্ঘ ১৬ বছর।

১৯৪৫ থেকে ১৯৫৩ পর্যন্ত রাজত্ব চালানোর পর শেষ পর্যন্ত বিদায় নিতে হল প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যানকে। ম্যাকার্থি সাহেব তার পরেও তাঁর কমিউনিস্ট-নিধন যজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু অত্যধিক পরিমাণে অসাংবিধানিক ক্ষমতা ভোগ করতে করতে হয়তো তাঁর মাত্রাজ্ঞান লোপ পেয়ে থাকবে! সমাজের বাকি সব অংশের নাড়ি-নক্ষত্র যাচাই করার পর অবশেষে তিনি হাত বাড়ালেন সেনাবাহিনীর দিকে। আর্মি, নেভি বা এয়ারউইংসের ভিতরে গা-ঢাকা দিয়ে রয়েছে যেসব কমিউনিস্ট, তাদের খুঁজে বার করতে হবে। সে-ই হল তাঁর পতনের শুরু। অল্পদিনের মধ্যেই সেনাবাহিনীর ওপরওয়ালারা ম্যাকার্থির জোড়া ডানা ছেঁটে তাঁকে আকাশ থেকে আছড়ে ফেলল সটান মাটিতে। ট্রুম্যান তখন নিশ্চিন্তে নিজের খামারবাড়িতে বসে আত্মজীবনী লিখছেন।

কী অদ্ভুত পরিহাস – নিয়তির নয়, রাষ্ট্রের পরিহাস – যাঁর ছত্রছায়ায় HUAC-এর এত বাড়বাড়ন্ত, সেই হ্যারি ট্রুম্যানই ১৯৫৯ সালে ঘোষণা করলেন যে, HUAC নাকি হল “the most un-American thing in the country today.”

প্রজাদের রক্তপানের নেশায় রাজার একদিন বিতৃষ্ণা আসতেই পারে। কত প্রজা যে তার আগে প্রাণ দিল, সে-খবর কে রাখে আর?

A King in New York ছবিতে চার্লি চ্যাপলিন ও তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র মাইকেল চ্যাপলিন

 

পল রোবসন # ১৩ (শেষ পর্ব)

 

১৯৯৬ সালে কলকাতার নজরুল মঞ্চে তাঁর গানের অনুষ্ঠানে পিট সিগার বলেছিলেন, ‘Martin Luther King, Jr, with his non-violent tactics, has changed the face of America.’

২০১৬-র ৩রা জুন মহম্মদ আলি মারা গেলেন। পরের দিন কলকাতার প্রতিটি বাংলা দৈনিকের প্রথম পাতায় ওই একটিমাত্র খবর ছাড়া আর কোনও খবর নেই। এক প্রখ্যাত দৈনিকে একটি দীর্ঘ লেখায় যা বলা হল তার নির্যাস হচ্ছে, মহম্মদ আলির সাফল্যের দৌলতেই নাকি আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গ মানুষরা মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে শিখেছে।

কী আশ্চর্য! বাংলা কাগজের এই সব অর্ধশিক্ষিত সাংবাদিকরা রোবসন বা বেলাফন্টের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অবহিত না-থাকতে পারেন, কিন্তু মার্টিন লুথার কিং-এর কথাও কি তাঁদের জানা নেই?

কৃষ্ণাঙ্গ সমাজের এমন কোনও সমস্যা নেই, যা নিয়ে আন্দোলন করেননি পল রোবসন। এমনকী যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড়দের কেন আমেরিকার জাতীয় বেসবল টিমে নেওয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা থাকবে, তা নিয়েও তিনি রাস্তায় নেমে আন্দোলন করেছেন। আর আজ বেসবল, বাস্কেটবল, অথবা রাগবিতে সেদেশের জাতীয় দলের প্রায় প্রত্যেকটি সদস্যই কৃষ্ণাঙ্গ। শো বিজনেসে তো সেই মাইকেল জ্যাকসন থেকে শুরু করে আজকের বিয়ন্স পর্যন্ত, কৃষ্ণাঙ্গরা দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন।

আর, কোনও কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ আমেরিকার রাষ্ট্রপতি হবেন কোনওদিন, একথা তো কল্পনারও বাইরে ছিল।

একটি সাক্ষাৎকারে হ্যারি বেলাফন্টে খুব সংক্ষেপে বলেছিলেন, ‘পলের যন্ত্রণা, পলের আত্মত্যাগের সুফল ভোগ করছি আমরা, তার বন্ধুরা।’

HUAC-এর পশ্চাদপসরণের পর কু-ক্লুক্স-ক্ল্যানের গুণ্ডামিতে একটু ভাটার টান এসেছিল ঠিকই, কিন্তু একেবারে বন্ধ হয়নি। ১৯৬৪ সালে মিসিসিপিতে ক্ল্যানের গুণ্ডারা তিনজন নাগরিক অধিকার কর্মীকে খুন করে। তাদের মধ্যে দু’জন শ্বেতাঙ্গ, একজন কৃষ্ণাঙ্গ। এফ-বি-আই এই ঘটনার তদন্ত করতে এলে তারা গোটা মিসিসিপি কাউন্টি জুড়ে দাঙ্গা বাধায়। কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যুষিত বহু গ্রামে ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়, হাজার হাজার মানুষ গৃহহীন হয়, এমনকী কৃষ্ণাঙ্গদের গির্জাগুলিও ক্ল্যানের বর্বরতা থেকে রেহাই পায়নি। উৎসাহী পাঠকরা এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৈরি অ্যালান পার্কারের ‘Mississippi burning’ ফিল্মটি দেখতে পারেন, এবং ওই একই বিষয়কে কেন্দ্র করে হ্যারি বেলাফন্টের গাওয়া ‘Those three are on my mind’ গানটি শুনতে পারেন। ফিল্মটি অনবদ্য, আর গানটি সমস্ত বিশেষণের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।

কু-ক্লুক্স-ক্ল্যান আপাতত হাইবারনেশনে রয়েছে। মাঝে মাঝে ঘুম-ভাঙা বেড়ালের মতো অল্প আড়মোড়া ভেঙে আবার তারা ঘুমিয়ে পড়ে। পাঠকরা ইন্টারনেটে একটু খোঁজখবর করলেই ইদানীংকালে তাদের টুকটাক কুচকাওয়াজের ছবি দেখতে পাবেন। কবে যে তারা সত্যিই ঘুম ভেঙে জেগে উঠবে তা কেউ জানে না।

আমরাও কি কল্পনা করতে পেরেছি কোনওদিন যে, দেশীয় কু-ক্লুক্স-ক্ল্যান সারা বাংলা জুড়ে এইভাবে তাণ্ডব শুরু করবে?

ইয়োরিস ইভেন্স। রোবসন এবং ইভেন্স – দু’জনেই ছিলেন বিশ্বনাগরিক। দু’জনেই স্বদেশে ব্রাত্য, কিন্তু অবশিষ্ট পৃথিবীর কাছে সমাদৃত

এখানে একটি কথা না বললেই নয়। জীবনের অর্ধেকের বেশি সময় আমি যে বাড়িতে কাটিয়েছি, তার ঠিক পাশের বাড়িতে থাকতেন ভূপেন হাজারিকা। তাঁরই দৌলতে পল রোবসনের গানের সঙ্গে কলকাতার মানুষের প্রথম পরিচয়। প্রত্যেকটি অনুষ্ঠানে ভূপেন হাজারিকা বলতেন পল রোবসনের কথা, আর অনুষ্ঠান শেষ করতেন রোবসনেরই গান গেয়ে। এই প্রতিভাবান শিল্পীর রাজনৈতিক অবরোহণ আমাদের কাছে পীড়াদায়ক হতে পারে, Ol’ man river-এর ভাবানুবাদ হিসাবে ‘বিস্তীর্ণ দুপারে’ আমাদের পছন্দ না-হতে পারে, কিন্তু এই একটি কারণে তাঁর কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ।

‘ওরা আমাদের গান গাইতে দেয় না’ – নাজিম হিকমতের এই গানটি সাত ও আটের দশকে গাইত কলকাতা বা শহরতলির প্রত্যেকটি গণসঙ্গীতের দল। The Song of the Rivers-এর বাংলা অনুবাদ ‘ছয় নদীর গান’-ও পরিবেশন করত অনেক দল।

‘A voice of the century’ — পল রোবসনের কণ্ঠ সম্পর্কে এ কথা কে বলেছিলেন আমার জানা নেই। এরকম গভীর ব্যারিটোন কণ্ঠস্বর যে কোনও মানুষের হতে পারে, নিজের কানে গান শোনার পরেও তা বিশ্বাস হতে চায় না। দেবব্রত বিশ্বাস অথবা ওস্তাদ ফইয়াজ খাঁ-র কণ্ঠস্বরের বেস যদি পাঁচ গুণ বাড়িয়ে দেওয়া যায়, তবে হয়ত সেই আওয়াজ রোবসনের কণ্ঠস্বরের কাছাকাছি পৌঁছতে পারে। আর সেই গভীর ব্যারিটোনে রোবসন যখন কোনো নিগ্রো স্পিরিচুয়াল ধরেন – Sometimes I feel like a motherless child অথবা Swing low sweet chariot – তখন মনে হয় এই স্বর উঠে আসছে যুগ যুগ ধরে বংশপরম্পরায় জিনবাহিত হয়ে তাঁর শরীরের প্রতিটি রক্তকণিকায় সঞ্চিত আফ্রিকার ছিন্নমূল মানুষদের যৌথ বেদনার এক ভাণ্ডার থেকে।

পল রোবসন সম্পর্কে এই আলেখ্যটি যাঁরা ধৈর্য ধরে পড়লেন, তাঁদের সবাইকে ধন্যবাদ। যাঁরা এর আগে রোবসনের গান শোনেননি, তাঁরা যদি এই লেখা পড়ে শোনার আগ্রহ বোধ করেন, তাহলে আমার পরিশ্রম সার্থক হয়েছে বলে মনে করব। এই ইন্টারনেটের যুগে এসব গান তো কিছুটা সহজলভ্য; অপ্রয়োজনীয় বিবেচনায় তাই কোনও লিঙ্ক দিলাম না। রোবসন ছাড়াও শুনুন পিট সিগারের গান, শুনুন উডি গাথরি, হাডি লেডবেটার, হ্যারি বেলাফন্টে, মাহালিয়া জ্যাকসন, ওডেটা, মিরিয়াম মাকেবা, জোন বায়েজের গান।

শুধু মনে রাখবেন, যাঁদের নাম করলাম, তাঁরা প্রত্যেকেই জন্মসূত্রে খ্রিস্টান; অনেকেই আবার কালো চামড়ার মানুষ, অর্থাৎ ঘোর অনার্য। এঁদের গান শোনার নিদান ব্যাদে দেওয়া আছে কিনা তা আমার জানা নেই!

 

 

পরিশিষ্ট

রোবসন সিরিজের লেখাগুলিতে স্থান সঙ্কুলান না-হওয়ায় অনেকের কথাই বাদ দিতে হয়েছে। কিন্তু অনবধানতাবশত মাহালিয়া জ্যাকসনের নাম বাদ পড়ে যাওয়া অমার্জনীয় অপরাধ। একটু শুধরে নেওয়ার চেষ্টা করছি।

ফেসবুকে পরপর কয়েকদিন ধরে এই লেখার কিস্তিগুলি পোস্ট করার সময় আমার এক বন্ধু জানতে চেয়েছিলেন, বাঙালির নিজস্ব এক বিশাল সঙ্গীতভাণ্ডার থাকা সত্ত্বেও এইসব বিদেশি গায়ক-গায়িকাদের কথা আমাদের জানতে হবে কেন? তাঁদের গানই বা শুনতে যাব কেন আমরা?

প্রশ্নটির উত্তর, আমার নিজের মতো করে, একটু দেওয়ার চেষ্টা করি।

আমি নিজে মনে-প্রাণে বাঙালি। ভেতো বাঙালিও বলতে পারেন, আপত্তি নেই। এতটাই বাঙালি যে, ক্রিকেট খেলা পছন্দ না করা সত্ত্বেও, কোনও বাঙালি ক্রিকেটার যখন ব্যাট অথবা বল হাতে মাঠে নামেন, তখন আমি টিভির সামনে থেকে নড়ি না। কেউ যদি আমার বিরুদ্ধে সঙ্কীর্ণতার অভিযোগ তোলেন, প্রাদেশিকতা-দোষে দুষ্ট বলেন আমাকে – আমি তর্ক না করে মেনে নেব। শুধু বলব, বাঙালি হয়ে জন্মেছি বলে আমি গর্বিত।

এমন বাঙালিয়ানা সত্ত্বেও তাহলে কেন বিদেশি গান?

কেউ আমাদের মাথার দিব্যি দেয়নি এইসব বিদেশি গান শুনতে – এটাই কারণ।

এইসব গান শোনা অথবা না শোনা আমাদের ইচ্ছাধীন – এটাই কারণ।

বাঙালি হিসাবে আমার স্বাজাত্যাভিমানের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংস্কৃতির খোলা হাওয়ায় ডালপালা মেলে দোল খাওয়ার কোনও বিরোধ নেই – এটাই কারণ।

কিন্তু বিরোধ শুরু হয়, এক ভয়াবহ বিরোধ আমার মনে দানা বেধে ওঠে, যখন দেখি যে, আমাদের দেশেরই অন্য অঞ্চলের এক অ-বাঙালি সংস্কৃতিকে জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে আমাদের ওপর। আমার মন তখন বিদ্রোহ করে, এবং ভবিষ্যতে যদি সেই বিদ্রোহের ফুলকি থেকে একটি ছোট্ট অগ্নিকুণ্ড জ্বালানোর প্রয়োজন হয়, এই ভেবে কাঠ-কুটো সংগ্রহ করতে বসি পল রোবসন আর তাঁর সঙ্গীসাথীদের লড়াইয়ের ইতিহাস থেকে।

আমি মনে-প্রাণে কামনা করি, বাঙালির ঘরে ঘরে আজ আওয়াজ উঠুক, গোবলয়ের সংস্কৃতির কাছে, বানিয়া সংস্কৃতির কাছে, বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতিকে বিকিয়ে যেতে দেব না।

Before we’d be slaves, we’ll be buried in our graves.

 

শেষ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*