পুণ্যশ্লোক পুণ্যশ্লোক : আমাদের নদীজলবাতাসের গান

সুবীর সরকার

 

 

সুবীর সরকার কবি ও ভাষাকর্মী। বাস কোচবিহারে। পেশা শিক্ষকতা। লোকসংস্কৃতি ও নিম্নবর্গের ইতিহাসে আগ্রহী।লিখে থাকেন ভিন্নস্বাদের গদ্যও। লেখাপড়া ছাড়াও ভালোবাসেন ঘুরে বেড়াতে।

 

 

কবি পুণ্যশ্লোক দাশগুপ্ত। আয়ুস্কাল ১৯৪৯-২০১৭। উত্তরাঞ্চলের ধুপগুড়িতে বসে সারা জীবন কাজ করে গেলেন বাংলা কবিতা নিয়ে। নুতন লিখতে আসা তরুণ কবিদের তিনি ছিলেন পরম আশ্রয়। প্রশ্রয়। স্বজন। আদ্যন্ত মায়াময় মানুষ। সবসময় দেখেছি তার মুখে লেগে থাকা আলতো হাসির রহস্যরেখা। সারাজীবন দারিদ্র তাড়া করেছে তাকে। কিন্তু কবিতা আর কবিসঙ্গেই মজে থেকেছেন। নিজেকে উজার করেই দিয়েছেন সবসময়। ছিলেন চরম বোহেমিয়ান। বাউণ্ডুলে। তুমুল ঘুরে বেড়াতেন জনপদের পর জনপদ। তরাই ডুয়ার্সের জলজঙ্গলের আবহমান চারণভূমির ভিতর। কী এক খোঁজ, জীবনজিজ্ঞাসা তাকে অস্থির করে তুলত! আর পিঠে কবিতার ঝোলা নিয়ে তিনি ঢুকে পড়তেন সুপুরিবাগানের ভিতর। উত্তরের মেঘদল, কৃষিবউ, আঞ্চলিক নদীর জলে একা একা মুখ দেখতে থাকা পুণ্যশ্লোক আমাদেরকে তাঁর কবিতার যাদুতে পাকে পাকে জড়িয়ে ধরেন। আমরা ভাটফুল থেকে সরে যেতে থাকি কুয়াশার বাগানে; যেখানে ‘এ লিটল মিস্ট্রি’ হাডুডু খেলার মাঠের মতো শূন্যতা সাজিয়ে রাখে। আমি আমার ১৮ বছর বয়স থেকে পুণ্যশ্লোককে চিনি। তখন থেকে অদ্ভূত এক স্নেহের ঘেরে আমাকে বিঁধে ফেলেছিলেন তিনি। তারপর কত কত সঙ্গ,সান্নিধ্য। কবিতার পর কবিতা। কত মান অভিমানপর্ব। অনন্ত ঘুরে বেড়ানো রঘুদা, মানে পুণ্যশ্লোকের সাথে গঞ্জহাটের কোরাসে। কবিতায় কবিতায় কী এক মায়ামাদক ছড়াতেন তিনি! কবিতা বুঝি মজার জুয়েলারি। উড়ে যাওয়া মেঘের দিকে তাকিয়ে থাকা। পুণ্যশ্লোক দাশগুপ্ত মানেই অনিবার্যভাবে চলে আসবে পুর্ণিমাবৌদির কথা। যিনি আঁকড়ে ও আগলে রাখতেন পুণ্যশ্লোককে। যার জন্যই আমরা পেয়েছি পুণ্যশ্লোককে। আমাকে নিয়ে একটা দীর্ঘ সিরিজ লিখেছিলেন উনি, সুবীরবিতান নামে। যেখানে বলেছেন–

‘দোতলা বাসের নাম লেখা হল ‘টানা টানা চোখ’ চিলাপাতা যাব

সুবীর হেঁয়ালি এঁকে দিল পথে অ্যাসফল্ট গায়ে স্তব্ধ শহর’

এ তো জনমভরের প্রাপ্তি আমার। আমি দেখতে পাচ্ছি জাদুঝোলা নিয়ে কবি সটান হাজির বারান্দা বৈঠকে। আর চাঁদের প্রপাতে ফটোকপি মেশিন। পুণ্যশ্লোক রিলিফ খুঁজছেন ভুটিয়া পাড়ায়। বেশ মনে পড়ে, ‘কবিতা পাক্ষিক অরুণ মিত্র পুরস্কার’ যখন পান, আমাকে জানান– সুবীর, টিকিট কর; আমাকে তুই নিয়ে যাবি। কী খুশি তিনি। যাত্রাপথে দেখা কালাচাঁদ দরবেশের সাথে। আর গোটা যাত্রাপথ ভরে উঠেছিল গানে আর গানে।

কত কথা। কত মুহূর্ত। আজ সব অতীত। তবে এটুকুই বলি, পুণ্যশ্লোক মানেই রবিশস্যে ভরা খামারবাড়ি। হলুদ সরিষার খেত। শান্ত মুখের পাশে আপাতমন্থর এক শোকযাত্রা।

এবারের শীত একটু অন্যরকম হবে পুণ্যশ্লোক। কুয়াশায় একা একাই খুব ভিজতে থাকবে আপনার বাড়ি। ধুপগুড়ির রাস্তায় আর কোনওদিন আপনার সাথে হাঁটা হবে না আমাদের, এটা সত্যি! কিন্তু এটাও কিন্তু সত্যি যে কবির মৃত্যু হয় না। সে তার কবিতায় সদাজীবিত থাকেন।

প্রণাম রঘুদা, প্রণাম পুণ্যশ্লোক।

ছবিঋণ – কবির ফেসবুক ঠিকানা

About Char Number Platform 844 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*