কুয়াশার বাগানে যত প্রজাপতি

অনিন্দিতা গুপ্ত-রায়

অনিন্দিতা গুপ্ত রায়ের লেখালেখি শুরু নয়ের দশকে। মূলত কবিতা। পাশাপাশি প্রবন্ধ, আলোচনা, গদ্য, ছোটগল্প ইত্যাদি। লিখেছেন দেশ, কৃত্তিবাস, অনুষ্টুপ, ভাষাবন্ধন-সহ অসংখ্য পত্রপত্রিকায় ও ওয়েব-ম্যাগাজিনে। এ-যাবৎ প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ আটটি, অনুবাদ-কবিতার সঙ্কলন একটি। পেয়েছেন ‘ভাষানগর মল্লিকা সেনগুপ্ত পুরস্কার’-সহ একাধিক সম্মান। পেশায় ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষিকা। কর্মসূত্রে গত পনেরো বছর জলপাইগুড়ির বাসিন্দা।

 

 

প্রাক-পুজো সেই বিকেলটা। হেঁটে আসছিল একটা ছোট্টখাট্টো সামান্য টলমল ঈষৎ পা টেনে চলা এলোমেলো চুলদাড়ির মানুষটা। মনে হচ্ছিল এখুনি পড়ে যাবে বুঝি। যেন একটা পালক উড়ে উড়ে আসছে। একটা ছেঁড়া ঘুড়ি যেন লাট খেতে খেতে নামছে। দৌড়ে কাছে গিয়ে হাত বাড়াতে পরম নির্ভরতায় দুহাত দিয়ে আঁকড়ে ধরেছিল হাতের পাতা। বড় বড় শ্বাস নিচ্ছিল ক্লান্তি আর দুর্বলতায় ভাঙচুর শরীরটা। — কী হয়েছে তোমার রঘুদা? — কিচ্ছু না রে বোন। একটু দুর্বল। একটু!! তুমি তো পড়ে যাচ্ছ প্রায়! কেন এলে তুমি এভাবে? — কিছু হবে না। হাতটা ধরো একটু, হেঁটে হেঁটে যেতে পারব আমি। হালকা প্রায় বালকের মতো হয়ে যাওয়া শরীরটা কষ্ট করে টেনে যখন সেদিন বিকেলের ঘরোয়া কবিতার আড্ডায় বসেছিলে তুমি, জানতাম না এই তোমার শেষ হেঁটে আসা এভাবে। জানা ছিল না — এরপর এদিন রাতেই তুমি সেই যে সাদা বিছানার গভীর ঠাণ্ডায় নাম লেখাবে আর প্রায় দেড়মাসের লড়াইয়ে থেমে যাবে সেই হেঁটে যাওয়া। হাত ধরে হেঁটে আসা। ছোট্ট একটা গাছের ছায়া এত দীর্ঘও হতে পারে! সেইই আঠেরো বছর বয়স থেকে শুনে আসা “বোন আমার” ডাক’টা শুনতে পাচ্ছি যে এখনও রঘুদা! পঁচিশ / ছাব্বিশ বছরের অভ্যেস তো! সারাজীবন শুনতে পাব। তোমার মৃদুস্বরে পাঠ করা স্মিত উচ্চারণ —“অবনত জীবন আমাকে উড়িয়ে নিয়ে যাও / পাতাহীন বৃক্ষের কোটরে, / আগুনের মধ্যে, অন্ধকার গর্তে / ছাইগন্ধ আমার বিছানা / জলের জাজিমে বসি নৌকো নয় সোনার ভেলায় / আমি জন্মান্তরে রুপোর কলস ভেসে যাচ্ছি/ ……… দিবস পুলকিত, সন্ধ্যা পুলকের পাখি, / আমি তো ঘুম চাই কোথায় দেহটাকে রাখি! / বুঝি তা ক্ষণকাল, মেলে দিই পিতলের চোখ / এবার উঠি তবে, রাত্রি হাতে হাত রাখো”। ঘুমোও রঘুডাকাত।

এই ঘুমই চেয়েছিলে বুঝি? ঘুমোও, ঘুমোক আমাদের দেখা শেষ কবি ও কাঙাল। অর্থ প্রতিপত্তি খ্যাতির নয়, স্রেফ ভালোবাসা, ভালো বন্ধু, ভালো কবিতার কাঙাল পুণ্যশ্লোক দাশগুপ্ত। সারাজীবনের সব ব্যর্থতা, বিষন্নতা, অভিমান, নিঃসঙ্গতা, উদাসীনতা, ভবঘুরেপনা ওই ঝোলার মধ্যে পুরে কেমন ঋজু হেঁটে যাচ্ছে এখন লোকটা। হৃদয় ভর্তি আগুন আর বৃষ্টিপাত এক পাত্রে নিয়ে, জল আর অঙ্গারে মাখামাখি বলছে, নম্র শান্ত স্পষ্ট ওই কণ্ঠস্বরে যেমন আজীবন আমৃত্যু বলে এসেছে — “আগুন নেভে না তো, আগুন নেভে না / ভিতরে ছাই মাখে সখের বিছানা। / গোপন কন্দরে নতুন ট্রেঞ্চ / দরজা আটকানো করার কিছু নেই”। বারবার পুণ্যশ্লোকের কবিতায় এসেছে মৃত্যুচেতনা। তাঁকে  সদাসর্বদা আগলিয়ে রাখা পূর্ণিমাবৌদি যখন অকালে প্রয়াত হলেন, সেই থেকেই মানুষটি যেন আরো বেশি অসহায়, মৃতুভয়তাড়িত, বিপন্ন হয়ে পড়েছিলেন। দারিদ্রের সঙ্গে আজীবন লড়াই করা পুণ্যশ্লোক তো সার্থকনামা ছিলেন। তাঁর নামের মতোই অভিজাত, রহস্যময়, গভীর ছিল তাঁর কবিতা। আশ্চর্য এক কুয়াশা শরীর সেসব লেখা। যেন স্বপ্নে পাওয়া, যেন ভূতগ্রস্তের মতো ঘোরের মধ্যে ডুবে থেকে লেখা। এক আপাত জটিল কাব্যভাষা, অভিনব ইমেজারির ব্যবহার, অবলীলায় বিভিন্ন ভাষার শব্দের সহাবস্থান, নাগরিক প্রযুক্তি থেকে কৃষিভিত্তিক সমাজ বা অরণ্যের দিনরাত্রির শব্দ-কুহক—কী অনায়াস দক্ষতায় পুণ্যশ্লোক ভেঙেচুরে নিজের মতো করে বসিয়েছেন কবিতাশরীরে। দুর্বোধ্যতার অভিযোগ উঠলে মৃদু হেসে বলেছেন—“আমাকে নিয়ে বিভ্রান্তির শেষ নেই,  আমাকে বোঝার কৌশল হয়তো কারও জানা নেই। আসলে আমি একজন দুর্বোধ্য মানুষ। মাঝে মাঝে মনে হয় আমি নষ্ট হয়ে গেছি” (আমার ভুবন, আমার কবিতা লেখার গল্পঃ চিকরাশি)।

বড্ড অভিমান জমা ছিল রঘুদা? না হলে নিজেকে এভাবে নষ্ট বলা কোন যন্ত্রনা থেকে? নিজের প্রিয় জনপদ ছেড়ে, লোকগান আর বনজঙ্গলের রাজ্যপাট ছেড়ে শহরে নিঃসঙ্গ জীবন বেছে নেওয়া তুমি যে একলা থাকতে পারতে না, তা সকলে জানি। তরুণ থেকে তরুণতর কবিরা তোমার চিরকালীন আশ্রয় ও প্রশ্রয়ের নির্ভরস্থল। কী এক নিয়তিনির্ধারিত ট্রাজিক নায়কের মতো অনুষঙ্গে মানুষটা তীব্র প্রেমের কবিতা, চূড়ান্ত রোমান্টিক কবিতায় বেঁচে থাকতে চেয়েছিল তুমুল প্যাশন আর জলস্রোতের মতো অনর্গল কবিতাপ্রবাহে। অন্তর্নিহিত এক বিষাদ আর হতাশা সরিয়ে স্পষ্ট লিখতে চেয়েছিল আনন্দগান। কখনও মেদুর লিরিকাল — “তোমার জন্য অলকাপুরী তোমার জন্য রথ / কুটিল অভিসন্ধি তোমার কান ভাঙানো পথ / ছলাকলার পরম্পরায় আমার কী যায় আসে / রাধার কাছে যাব বলে পা রেখেছি ঘাসে”। কখনও সমসময়ের তারুণ্যের স্বর মিলেমিশে গিয়ে — “অচেনাপুরের এলোমেলো গান গিলে খেয়ে নেয় গুগল ফ্রগ / আমি উটি থেকে টিবেট চলেছি সংগে নিয়েছি কাচের মগ / মিষ্টি মিষ্টি কুয়াশা বিধুর যাও পাখি বলো অবশেসন / আমার দুপাশে নিষ্পাপ নদী সার্চ ইঞ্জিনে দিয়েছি মন”। সম্পূর্ণ নতুন ও অভিনব একটা কাব্যভাষায় লিখেছেন গত পাঁচ দশক যা অনুকরণ করা তো অনেক দূরের কথা, অনুসরণ করে কাছাকাছি ভাষা আয়ত্ত করাও ক্ষমতায় কুলোয়নি কারও। এই অনুমান করা অসম্ভবপ্রায় কবিতার গতিপথ — এই অনির্দেশ্য যাত্রাপথই একটা কৌতুহলী আবহ তৈরি করে দেয় তাঁর পাঠকের জন্য। তিনি নিজে বলতেন — “কথা-চাতুর্যের বাসনায় গাঁথি অনুপুঙ্খ কবিতা”। কিন্তু এ কথা তাঁর স্বভাবসিদ্ধ পরিহাস। নেহাত চাতুরী দিয়ে এ ভাষা আয়ত্ত করা যায় না যদি না ফর্ম ও কন্টেন্ট বিষয়ে প্রত্যয় থাকে। নিজে যেমন বলেছেন — “ভাঙো, পাথর ভাঙতে পারলে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ পাবে / আকাশ ভাঙতে পারলে বিদ্যুৎ / মাটিতে মাটিতে মিশে যাও / গাছ লতা প্রত্যহ বিকেল পাবে / জ্যোৎস্না পাবে মনে / কোলে শিশু পাবে, অখণ্ড বিকেল / চাইতে হবে, হাত পেতে রাখো —- / নইলে পাবে না”।

সামাজিক, পারিবারিক, মানসিক নানা আঘাতে জর্জরিত বলতে — “বেঁচে  থাকা মানে তো শুধু টিঁকে থাকা নয়”। তুমি তো বেঁচে রইলে রঘুদা। মৃত্যুর  সাধ্য কী তোমাকে মুছে দেয়? যতই তুমি অভিমান করে বলো না কেন—“ক্ষত-বিক্ষত এই কবিকে যান্ত্রিক শহরে একশো বছরের ঘুম দাও। মৃত্যুর পরে আমি আর কখনও কবিতা লিখব না” — আমি বিশ্বাস করি না তুমি কখনও কবিতা লেখা বন্ধ করতে পারো। না, পারো না। তুমিই না লিখেছিলে—“কত কথা চমৎকার ঘুমিয়ে রয়েছে, কে তাকে জাগাবে, আমি ছাড়া!” ভালো থেকো রঘুডাকাত। তোমার জোব্বার ভেতর থেকে ওই ওই প্রজাপতির মতো উড়ে আসছে অসংখ্য রঙীন প্রজাপতি। তোমার বর্ণময় জীবনের যাবতীয় লেখা, না-লেখা অক্ষরমালা যে তারা। “স্বর্গের খুব কাছে মৃদু অন্ধকার”, জেনেও সেখানে পা রাখবে তুমি? এই গ্রামীন জীবন, হাট, লোকগান, জঙ্গল ক্যাম্প, নদীর চরে রৌদ্রের খেলা, বন্য জন্তুর পায়ের চিহ্ন খুঁজে হারিয়ে যাওয়া পথ, দোতারা, চা-বাগান, ভাওয়াইয়া, আদিবাসীকন্যার সরল গেরস্থালি, কৃষিবউ, এই ডুয়ার্স, কমলাবাগান, এই বনবাংলোয় রাত্রিযাপনের নেশা—-এসব চেয়েই তো নাগরিক জীবনের সব প্রলোভন ত্যাগ করেছিলে তুমি। কোথায় পালাবে তুমি, আমাদের চারণ কবিটি? পথ যত দূরে যায় তুমি তো তারও দূরে চলে যেতে জানো। ফিরতে জানো না?

 

ছবিঋণ – কবির ফেসবুক ঠিকানা

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*