মার্কিন দেশে বিপ্লব?

মোহাম্মদ ইরফান

 

শতবর্ষী বলশেভিক বিপ্লবের সিনেমাটিক বর্ণনা দেওয়া সাংবাদিক জন রীড যে মার্কিন দেশের লোক ছিলেন সেকথা কখনই আমাদের আলোচনায় আসেনি। আমার অন্ততঃ মনে পড়ে না। আমাদের বলতে আমি এখানে আশির দশকের শেষভাগে আমার সমসাময়িকদের কথা বলছি। তুষার, শোভন, বকুল, লিটুসহ আমরা অনেকেই তখন ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয়। পাঠকক্ষ ছেড়ে রাজপথে বেরিয়ে পড়ছি যখন তখন, অবৈধ সামরিক সরকার উৎখাতের লক্ষে। সংগঠনের চূড়ান্ত লক্ষ্য যেহেতু বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র, আর সমাজতন্ত্রীরা যেহেতু সচেতনভাবেই আন্তর্জাতিকতাবাদী, বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তের নিপীড়িত মানুষের সংগ্রামের সক্রিয় সমব্যথী ছিলাম আমরাও। সান্দিনিস্তা থেকে ফিলিস্তিনী অনেকের সাথেই সংহতি প্রকাশ করেছি আমরা ঢাকার রাজপথে। বিশ্বশক্তির দ্বি-বিভাজন স্পষ্ট তখনও। স্নায়ুযুদ্ধের চূড়ান্ত অবসান হয়নি তখনও। প্রগতি প্রকাশনের বাংলা অনুবাদেদুনিয়া কাঁপানো দশ দিনছাড়াও, গোর্কি, অস্ত্রভস্কি এমনকি মাকারেঙ্কো পড়তেও পিছপা হচ্ছি না আমরা। মতিঝিলের মার্কিন তথ্যকেন্দ্রের ঠাণ্ডা ঘর আর শীতল জল আমাদের চোখে কেবলই সাম্রাজ্যবাদী প্রলোভন। এই সাম্রাজ্যবাদই দায়ী সারা বিশ্বের নানান অনিয়ম আর নিজদেশের স্বৈরাচারের জন্য এই ধারণায় আমাদের কণ্ঠসৈনিক তুষারের শ্লোগানের দোহার হতাম সবাই— ধ্বংস হোক, নিপাত যাক, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ।।

অথচ মার্কিন জনগণের অনেকেই কিন্তু চায় না তাদের দেশটি বিশ্বের নানান প্রান্তে নিত্যনতুন যুদ্ধবিগ্রহে জড়িয়ে পড়ুক। দেশের সরকারি অবস্থানকে অগ্রাহ্য করে দেশবিদেশের মুক্তির আন্দোলনে উল্লেখ করার মতো ভূমিকা রাখতে দেখা গেছে এদেশের সচেতন জনগণকে বিভিন্ন সময়ে নিক্সনকিসিঞ্জার চক্র একাত্তরে গণহন্তারক পশ্চিম পাকিস্তানী জান্তাকে সমর্থন জানালেও মার্কিন জনগণের উদারপ্রগতিশীল অংশ সক্রিয় সমর্থন দিয়েছে বাংলাদেশের জাতীয়অর্থনৈতিক মুক্তির আন্দোলনে। স্নায়ুযুদ্ধের শুরুতে সিনেটর ম্যাকার্থির মতো কমিউনিস্টজুজু বিরোধীদের তাড়া খেয়েও ওয়ারেন বিটির মতো পরিচালকেরা পিছপা হন না জন রীডের জীবন নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণে, সেই চলচ্চিত্রকে সেরা দশ মহান চলচ্চিত্রের অন্যতম হিসেবেও বেছে নেন মার্কিন সমালোচকদর্শকেরা, রুশ বিপ্লবের এত বছর পরেও। ঊনিশশ সতেরোর সেই সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব, কিংবা আরো ব্যাপকভাবে বলতে গেল সমাজতন্ত্রের উপযোগিতা সম্পর্কে মার্কিন জনগণের ভাবনাচিন্তা বেশ আলোচিত হচ্ছে আজকাল। সমাজতন্ত্রের প্রতি এই নূতন সহানুভূতি পুঁজিবাদের সাম্প্রতিকতম সংকটের প্রেক্ষিতে তরুণ মনের ক্ষণস্থায়ী আবেগের লোকরঞ্জক অপব্যবহার হিসেবে কেউ কেউ একে উড়িয়ে দিতে চাইছেন। তবে ইতিহাসের নিরিখে মার্কিন সমাজবাদী আন্দোলন কিন্তু রুশ বিপ্লবের মতোই দীর্ঘ ঐতিহ্যের অধিকারী।

জন রীড আর রীডের সহকর্মী, সহধর্মিণী লুইস ব্রায়াণ্টের সরেজমিন বর্ণনার আরও অনেক আগেই কিন্তু সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার ধারণার সাথে পরিচিতি ঘটেছিল আমেরিকার মানুষদের। লেনিনের মতো মধ্যবিত্ত বুর্জোয়া পরিবার নয়, একেবারেই শ্রমিক শ্রেণী থেকে উঠে আসা ইউনিয়ন নেতা ইউজিন ডেবস রেলশ্রমিকদের ধর্মঘটে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে জেলে যান। জেলে বসে মার্ক্সের লেখার সাথে পরিচিত হন। ডেবস অন্যান্যেরা ডেমোক্রেটিক দল থেকে সরে এসে প্রথমে সোশাল ডেমোক্রেটিক এবং আরও পরে সোশালিস্ট পার্টি করে ফেলেন বিংশ শতাব্দী শুরু হওয়ার আগেই। ডেবস ওই পার্টি থেকে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হন বেশ ক’বার। এবং ১৯০০ থেকে ১৯১২ সালের মধ্যে দলের ভোটসংখ্যা নব্বই হাজার থেকে প্রায় ন’শো হাজারে উন্নীত হয় ডেবসের মতো ঘোষিতসর্বহারার বিপ্লবী এই ছয় শতাংশাধিক ভোট সাম্প্রতিক কালের সবচেয়ে সফল প্রগতিশীল ধারার তৃতীয় প্রার্থী র‍্যালফ নাদেরের শতাংশ ভোটের হিসেবের দ্বিগুণের চেয়েও বেশী (মোট ভোটের শতাংশের হিসেবে) দেখা যাচ্ছে, রুশ বিপ্লবের সমসাময়িক সময়টি মার্কিন সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসেরও স্বর্ণযুগ, বাঙালি জাতীয় আন্দোলনে যেমনটি ছিল ছেষট্টি থেকে একাত্তর।

যুগের হিসেবে আমেরিকার বাম রাজনীতিকে মোটামুটিভাবে তিনভাগে ভাগ করেছেন নিউইয়র্কের নিউ স্কুলের ইতিহাসের অধ্যাপক ইলাই জারেটস্কি। জারেটস্কির মতে কালো মানুষের পূর্ণ অধিকারের দাবীদার অ্যাবোলিশনিস্টরাই আমেরিকার আদি বাম। সাদাদের মধ্যে অগ্রসর (যেমন, শান্তিবাদী কোয়েকার) কেউ কেউ এবং র‍্যাডিকাল কালোদের (যেমন, ফ্রি নিগ্রো মুভমেন্ট) অনেকেই রিপাবলিকানদের মতো দাস ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক উচ্ছেদই শুধু নয় কালো মানুষের জন্য পূর্ণ সাম্য দাবী করেছিলেন এমন একটি সময়ে যখন এমনকি ভোটের অধিকারও সীমাবদ্ধ ছিল কেবল ভূস্বামী কিংবা অভিজাতের মধ্যে। চেতনাগতভাবে ফরাসী বিপ্লব, কিংবা লক প্রমুখের সার্বজনীনতা কিংবা উদার মানবতাবাদের সমর্থক ছিলেন এই অ্যাবোলিশনিস্টরা।

সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের লক্ষ্যে সংগঠিত বামেদের আবির্ভাব ঘটে আরও পরে, মার্ক্সের ক্যাপিটাল (১৮৬৭) প্রকাশিত ব্যাপক আলোচিত হওয়ার পর। জিন ডেবস ডেমোক্রেটদের নেতা ছিলেন, মার্ক্সে মতি হয়েছে তাঁর জেলখানায় বসে সেকথা আগেই বলেছি ডেবস থেকে শুরু করে মোটামুটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকাল পর্যন্ত সময়টাকে মার্কিনী বামের দ্বিতীয় অধ্যায় হিসেবে চিহ্ণিত করেছেন জারেটস্কি। এই সময়ে বামরা ব্যাপক শক্তি সঞ্চয় করে, ফলস্বরূপ জেলজুলুমও বাড়ে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বিরোধিতার কারণে অনেকেই জেলে যায়। রাশিয়ার বিপ্লবের সমর্থন দেওয়া সহ আরও কিছু প্রশ্নে পার্টি ভাঙে। এতকিছুর পরও নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের সবচেয়ে কাছাকাছি যায় বামেরা এই সময়টিতেই। ডেবসের মতো নর্মান থমাসও ১৯৩২এর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে এক মিলিয়ন ভোট পেয়ে তৃতীয় হন, ব্যক্তি ভোটের হিসেবে। ঔপন্যাসিক উপটন সিনক্লেয়ার উনিশশো তিরিশের ক্যালিফোর্নিয়া গভর্নর নির্বাচনে ভোট পান প্রায় পঞ্চাশ হাজার। ত্রিশের দশকের গ্রেট ডিপ্রেশন পুঁজিবাদের সীমাবদ্ধতার প্রমাণ হিসেবে বামেদের সমর্থন বাড়ায়। বত্রিশের নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ী ডেমোক্রেটিক প্রেসিডেণ্ট রুজভেল্ট নিউ ডিলের মতো দারিদ্র বিমোচন কর্মসূচী প্রণয়ন করে জনসমর্থনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেন। জনপ্রিয়, জনমুখী সোশ্যাল সিকিউরিটিজ অ্যাক্টও প্রণীত হয় ঊনিশশ পঁয়ত্রিশে।

বিশ্বযুদ্ধের শুরুতে হিটলারের সাথে সমঝোতায় গেলেও শেষ পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়ন মিত্রশক্তির সাথে মিলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ করাতেও কমিউনিস্ট পার্টির সমর্থন বাড়ে কিছুটা। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে সোভিয়েত রাশিয়ার সাথে আমেরিকার যে রেষারেষি শুরু হয় তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় আমেরিকার বাম দলগুলো। কমিউনিস্ট, সোশালিস্ট পার্টির সদস্যরা ম্যাকার্থিজমের আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয় শুরুতে। কৌশল পরিবর্তন করে পার্টিতে সংগঠিত না হয়ে নানান সামাজিক আন্দোলনের মধ্যে সংগঠিত হবার চেষ্টা করে বামেরা। বিশ্বজুড়ে, বিশেষ করে উন্নত দেশগুলোতে, বুদ্ধিজীবিদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা নয়া-বাম (নিউ লেফট) ধারা্র প্রভাব পড়ে আমেরিকাতেও। বর্ণবাদের বিরূদ্ধে গড়ে ওঠে শক্তিশালী সিভিল রাইটস মুভমেণ্ট। ছাত্র-তরুণ-সাংস্কৃতিক কর্মীরা গড়ে তোলে যুদ্ধবিরোধী তুমুল আন্দোলন। নারী অধিকার, সমকামীদের অধিকার ইত্যাকার বিষয়ে গড়ে ওঠে নাগরিক আন্দোলন।  জারেটস্কির গ্রন্থের পর্ব-বিচারে এটি আমেরিকান বামদের তৃতীয় পর্ব।

ষাটের দশকের ব্যাপক আলোচিত এই কাউণ্টার কালচার আন্দোলনগুলোর সাফল্য নির্বাচনী জয়ে নয়, দাবী আদায়ে। কৃষ্ণাঙ্গদের নিজস্ব অহিংস আন্দোলনের ব্যাপকতায় সিভিল লিবার্টিজ অ্যাক্ট প্রণীত হয় বর্ণবাদের চূড়ান্ত অবসানের লক্ষ্যে। অধিকাংশ শ্বেতকায় তরুণ হিপিদের আন্দোলনের মুখে পূর্ব-এশিয়া থেকে সেনা  ফিরিয়ে আনে আমেরিকা। সাম্যের অধিকার আদায়ের ডাকে জনগণ সাড়া দিচ্ছে বুঝতে পেরে রুজভেল্টের নিউ ডিলের মতো করে গ্রেট সোসাইটি কর্মসূচী চালু করেন কেনেডির উত্তরসূরী রাষ্ট্রপতি লিন্ডন জনসন। সংগ্রামে-সংগঠনে বামেদের ভূমিকা উজ্জ্বল ছিল এসময়টিতেও। খেলোয়াড়-গায়ক পল রোবসন, কিংবা সশস্ত্র বিপ্লবের দায়ে অভিযুক্ত অধ্যাপিকা অ্যাঞ্জেলা ডেভিসেররা ছিলেন মার্টিন লুথার কিং আর তাঁর অহিংস সহযোগীদের পাশেই। শ্বেতকায় নেতৃত্বের আধিক্যপূর্ণ নিখিল আমেরিকা শ্রমিক ইউনিয়ন, ,এফ,এল-সি,আই,ও কালোদের মার্চ অন ওয়াশিংটনে শামিল হয়ে ন্যায়বিচারের অধিকারের সাথে সাথে চাকুরীর অধিকারের দাবীও তোলে।

ষাটের দশকের আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন আসে মার্কিন মননেও। সামাজিক ন্যায়বিচারের দাবী জোরালো হয়। ন্যায়বিচারের সাধারণ তত্ত্ব সন্ধানে ব্যাপৃত হন জন রলসের মতো তাত্ত্বিকেরা। আমেরিকার বামেরা অবশ্য জাতীয় রাজনীতির মঞ্চে উল্লেখযোগ্য বিকল্প হিসেবে নিজেদের হাজির করতে পারেননি এসময়ে। এর পেছনে কারণ অনুসন্ধান করেছেন অনেকেই। বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক নয়া-বাম নেতৃত্ব পুঁজিবাদী শোষণের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী শ্রমিকের কাছ থেকে দূরে সরে গিয়েছিল সচেতন কিংবা অসচেতনভাবে। ষাটের আন্দোলনের অ্যানার্কিস্ট অংশ পুঁজিবাদী কাঠামোর বিরূদ্ধে কথা বলা বন্ধ রেখে উপরের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বিরূদ্ধেই সমস্ত শক্তি ব্যয় করে। শ্রমিকের আন্দোলনে ট্রেড ইউনিয়নিস্টদের প্রভাব অর্থনৈতিক কাঠামো পরিবর্তনের দাবীকে পেছনে ফেলে দেয়। মালিক পক্ষের সুযোগ আসে এমপ্লয়ার স্পনসরড স্বাস্থ্যবীমা সহ নানান ধরনের নূতন কৌশলের আশ্রয় নেওয়ার। এছাড়া মধ্য-সত্তরের তীব্র জ্বালানী সংকটের পরে আমেরিকা (সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মতই) রাস্ট্রের আনুকুল্যে যে বিশাল উদ্ভাবনী ব্যবস্থা গড়ে তোলে তার ফলশ্রুতিতে নূতন নূতন প্রযুক্তির আবির্ভাব ঘটলে, একদিকে মার্কিন পুঁজিবাদ যেমন সমৃদ্ধ হয়, অপরদিকে প্রচলিত ধারার কারখানাভিত্তিক উৎপাদন থেকে সেবাভিত্তিক উৎপাদনে সরে আসার কারণে শ্রমিকদের সংগঠিত করার কাজটিও কঠিন হয়ে যায়। বিশ্বায়নের সুযোগে বিশ্ববাজার আর সস্তাশ্রম হাতের মুঠোয় চলে আসে এদেশের পুঁজিমালিকের। দর-কষাকষি করার সুযোগ কমে যায় শ্রমিকের। শাসনতান্ত্রিক দুর্বলতায় সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে টুকরা টুকরা হয়ে গেলে সমৃদ্ধির একক কেন্দ্র হিসেবে সারা বিশ্বে কদর বাড়ে আমেরিকার। বাজার ব্যবস্থায় আশ্বস্ত কেইনসীয় অর্থনীতিবিদেরা পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার ত্রুটি-বিচ্যুতির কথা স্বীকার করে নিলেও নব্য-উদারপন্থী নব্য-ধ্রুপদীরা পুঁজিবাদের সমালোচনা কিংবা সংকটের মূল কারণ মালিক কর্তৃক উদ্বৃত্ত মূল্য আহরণের ব্যাপারটিকে পাঠ্যবই থেকে দূরে রাখতে সক্ষম হয়। ইতিমধ্যে ছোটখাট কিছু সংকটের উদয় হলেও সেগুলোকে পুঁজিবাদের কাঠামোগত কোনও সংকট হিসেবে স্বীকার করেনি কেউ। অন্ততঃ ২০০৭/২০০৮ সালের মন্দার (গ্রেট রিসেশন) আগ পর্যন্ত তো নয়ই।

দুহাজার সাত/আট সালের ফাইনান্সিয়াল ক্রাইসিসের পর পুঁজিবাদী ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো নিয়ে নূতন করে আলোচনা বিশ্লেষণ শুরু হয়। আপাত সমৃদ্ধির আড়ালে বেড়ে ওঠা অর্থনৈতিক অসাম্যের নূতন নূতন প্রমাণ দাখিল করেন পণ্ডিতেরা। মার্ক্সীয় ব্যাখ্যা ফিরে আসে নূতন মোড়কে। “ক্যাপিটাল ইন দ্য টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরী” নামের সুদীর্ঘ পুস্তকে টমাস পিকেটি দীর্ঘকালের উপাত্ত ব্যবহার করে মজুরী আর সুদের হারের অসামঞ্জস্য কি করে অসাম্য তৈরী করে সেটি দেখিয়ে দেন খুব সহজ কথায়। এই মহামন্দা রাজনৈতিক অঙ্গনেও নূতন চিন্তার আবির্ভাব ঘটায়। নয়া-বাম জমানায় অসমাদৃত ধারণা, অর্থাৎ ক্ষমতা দখলের সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে রাজনীতি করার ব্যাপারটি সামনে চলে আসে আবার। এই ধারায় ব্যাপক আলোচিত ২০১১-র “অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট” আন্দোলন অবশ্য কোনও রাজনৈতিক দল শুরু করেনি। কিছুটা বরঞ্চ প্রতিষ্ঠানবিরোধী প্রযুক্তিদক্ষ প্রাগ্রসর একদল তরুণ রাস্তায় নেমে এসেছিল পুঁজিবাদের প্রতীকি কেন্দ্রের দখল নেওয়ার বাসনা প্রকাশ করে। বলশেভিকদের পিস, ব্রেড, ল্যান্ডের  মতই জনপ্রিয় করে তোলে তারা ৯৯ ভাগ বনাম এক ভাগের শ্লোগানটিকে। অর্থনৈতিক অসাম্যের বিষয়কে আবারও রাজনীতির মূলে নিয়ে আসা এবং অসাম্যের মূল কারণ হিসেবে পুঁজি বিশেষ করে ফিনান্স পুঁজির ভূমিকাকে দায়ী করার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করলেও অকুপাই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত কোনও একক সংগঠিত শক্তিতে পরিণত হয়নি।

অকুপাই” আন্দোলনের সূচনা পরিণতির সাথে দুহাজার তেরোয় একাত্তরের গণহত্যাকারীদের ফাঁসির দাবীতে ঢাকার রাজপথ কাঁপানো গণজাগরণ মঞ্চের ঘটনা অনেকটাই মেলে। তবে বাংলাদেশে যে কাজটি এখনও শুরু হয়ে ওঠেনি সেই কাজে উঠে পড়ে লেগেছে আমেরিকার বামেরা, অকুপাই পরবর্তী সময়ে। এই সাম্প্রতিক ধারাটিকে জারেটস্কিয়ান বিশ্লেষণের ধারাবাহিকতায় মার্কিন বাম রাজনীতির চতুর্থ পর্ব বলতে চেয়েছেন কেউ কেউ। মহামন্দা (গ্রেট রিসেশন) পরবর্তী এই নয়া বামেরা মহা সংকট (গ্রেট ডিপ্রেশন) কালের ডেবসীয় বামদের অতিক্রম করেছেন ইতিমধ্যে শক্তিতে সামর্থ্যে সমর্থনে। বিল ডিব্লাজিও বা বার্নি স্যান্ডার্স, সহিংস এন্টিফা কিংবা অসহিংস ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার, দ্য নেশন কিংবা জ্যাকোবিন ম্যাগাজিন নেতা, সংগঠন, কৌশল, মুখপাত্রের সাম্প্রতিক এই বহুমুখী উত্থান মনোলিথিক কোনও ব্যাপার কিনা সেটি নিয়ে বিতর্ক হতেই পারে। তবে এদের চিন্তায় যোগসূত্র লক্ষণীয়। মার্কসের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ, মার্কসএঙ্গেলসলেনিনের সাংগঠনিক উপদেশমালা গুরুত্বের সাথে বিবেচিত হতে শুরু করেছে আবারও। অর্থনৈতিক (বা উল্লম্ব) অসাম্যের ব্যাপারটি সামাজিক (বা আনুভূমিক) অসাম্যের মতো সমান বা অধিকতর গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা, অসাম্যের মূল কারণ হিসেবে প্রচলিত পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে চিহ্নিত করা, এই ব্যবস্থাকে ভাঙার জন্য বিপ্লবী দল করার প্রয়োজনীয়তাএসব বিষয় এখন আর আমেরিকার রাজনীতিতে প্রান্তিক বিষয় নয়। আরও একটি উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হচ্ছে এই বহুমুখী ধারাগুলোর ভেতরের সংহতি প্রচেষ্টা। ডান-বিচ্যুতি আর বাম-বিচ্যুতির চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে নিজেদের ভেতরে অপ্রয়োজনীয় বিভক্তি তৈরীতে বিশ্বাসী নয় এই নূতন বাম। “স্যান্ডার্স সোশালিস্ট”দের কথিত “রাজনৈতিক বিপ্লবের” তুমুল সমালোচনা করেও বার্নির নির্বাচনী সংগ্রামে সমর্থন জানাতে দ্বিধাবোধ করে না তথাকথিত কড়া-বাম। সাম্প্রতিক এই বাম প্রবণতার সবচেয়ে আশাবাদী দিক নেতৃত্বের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, কর্মী সমর্থকের তারুণ্য আর তৃণমূলে কাজ শুধু আমেরিকাতেই নয়, সারা বিশ্বেই। ভারুফাকিস বা ইগ্লেশিয়াসের মতো নেতারা তত্ত্বের পাশাপাশি চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন প্রয়োগের। বার্নি স্যান্ডার্স একেবারে মেয়র ইলেকশন থেকে শুরু করে সিনেটর পর্যন্ত পর্যায়ে উঠে আসা দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত সৈনিক। বাম দলের ভেতরে আন্তঃপার্টি লড়াই করেছেন দীর্ঘদিন জেরেমি করবিন। সামাজিক ইস্যুতে প্রগতিশীল কিন্তু পুঁজিবাদী অর্থনীতির সমর্থক দলের গণতান্ত্রিক কাঠামোর পূর্ণ সদ্ব্যবহার করে উঠে এসেছেন করবিন, স্যান্ডার্স।

আমেরিকার ডেমোক্রেটিক দলেরলিবারেলঅবকাঠামোর ভেতরেসোশালিজমেরএকটি  শক্তিশালী ধারা বজায় রাখা আমেরিকান বামদের অনেক পুরোনো কৌশল। লিবারেলরাও দলের বামেদের প্রতি ততক্ষণ পর্যন্ত সহনশীলতা বজায় রাখে যতক্ষণ না বামেরা রাজনৈতিকসামাজিক ইস্যুর পাশাপাশি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও সাম্য এবং গণতন্ত্রের জোরালো দাবী সামনে নিয়ে আসে। মূলধারার পার্টিতে সরাসরি যোগ না দিয়েও নির্বাচনী সাফল্য পেতে শুরু করেছে বামেরা। সিয়াটলের  সাওয়ান্ত জিতেছে সোশালিস্ট অল্টারনেটিভ নামের ট্রটস্কিপন্থী দলের ব্যানারে। নিউইয়র্কের মতো বড় শহরের মেয়র হিসেবে উঠে এসেছে ডিব্লাজিও ১৯৯৮ সালে লেবার ইউনিয়ন, তৃণমূল সংগঠকদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা বাম দল ওয়ার্কিং ফ্যামিলিজ পার্টির কর্মীদের অক্লান্ত পরিশ্রমে। শিকাগো, অকল্যান্ডের মতো তুলনামূলকভাবে সুবিধাবঞ্চিত শহরের পাশাপাশি সিয়াটল কিংবা লং আইল্যান্ডের মতো চূড়ান্ত রক্ষণশীল অঞ্চলেও নির্বাচনী সাফল্যের প্রতিশ্রুতি দেখাচ্ছে পেশাজীবি আর ইউনিয়ন নেতৃত্ব থেকে উঠে আসা প্রগতিশীল নেতৃবৃন্দ।

আমেরিকান জনমতের এই বামে মোড়ের পেছনে প্রজন্মগত পরিবর্তনেরও হয়তো ভূমিকা আছে কিছুটা। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, পঁয়ত্রিশের নীচে বয়স এমন আমেরিকানদের অধিকাংশ (শতকরা ৫৩ ভাগ) বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় অসন্তুষ্ট এবং সমাজতন্ত্রে বর্তমান অবস্থার চেয়ে ভাল হতে পারে বলে মনে করে। এই জনশাস্ত্রীয় (ডেমোগ্রাফিক) প্রবণতাটি (ট্রেন্ড) বাংলাদেশের একটি প্রবণতার সাথে তুলনীয়। বাংলাদেশের স্থপতি শেখ মুজিবকে হত্যা করার পরের দেড় দশক ধরে মুজিবের দীর্ঘ সংগ্রামী ভূমিকাকে উহ্য রেখে তাঁর দু-তিন বছরের শাসনকালীন ব্যর্থতা বিষয়ে যে প্রচারণা চলে সেটি বন্ধ হয় নব্বইয়ে সামরিক শাসকদের উচ্ছেদেরও পর। আর তাই, নব্বই দশক কিংবা তার পর বয়োপ্রাপ্ত তরুণদের কাছে মুজিব এবং স্বাধীনতার চেতনা অনেক বেশী প্রশ্নাতীত। এই তরুণরাই তাই অনেক বেশী সরব হয়েছিল স্বাধীনতা বিরোধী খুনীচক্রের ফাঁসির দাবীতে। আমেরিকাতেও তরুণ, যারা স্নায়ুযুদ্ধের সময়কার যুক্তরাষ্ট্র বনাম সোভিয়েত ইউনিয়নের তিক্ত বিরোধিতা এবং নানান ধরনের সতাঅসত্য সমাজতন্ত্র বিরোধী প্রচারণা দেখতে দেখতে বড় হয়নি, তাদের চোখে সমাজতন্ত্র সোভিয়েত বিপ্লব অজানা কোনও জুজু নয় বরঞ্চ অপরীক্ষিত একটি বিকল্প।

সুশিক্ষিত বিজ্ঞানমনস্ক মার্কিন জনগণ এই বিকল্পটিকে কেন ততটা গুরুত্ব দেয়নি মাঝের সময়টুকুতে সেটির দৃশ্যমান কিছু কারণ আলোচনা করা হয়েছে এর আগে। বাম-বিশ্লেষকরা এর বাইরেও কিছু অপ্রমেয় কারণের কথা বলে থাকেন। তাদের মতে, সমাজতন্ত্রের অর্থনৈতিক অসারতা প্রমাণের প্রধান হাতিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অর্থনীতি বিভাগ, যেখানে তথাকথিত “মুলধারা”বিরোধী গবেষণা প্রকল্পের খরচ নির্বাহের জন্য তহবিল পাওয়া দুষ্কর। এরা মনে করেন, সমাজতন্ত্র বিরোধী প্রচারণায় রক্ষণশীল তো বটেই, মার্কিন উদার-বুর্জোয়া গণমাধ্যমও পিছিয়ে ছিল না কখনওই, আজও নেই। বরঞ্চ ফক্স নিউজের মতো চিহ্নিত রক্ষণশীল মিডিয়া আউটলেটগুলো উদারনৈতিকদের বিপক্ষে উদ্ভট সব যুক্তি উপস্থাপনে এতটাই ব্যস্ত থাকে যে অন্য দিকে নজর দেওয়ার সময় তাদের কম। অপরদিকে, নিউইয়র্ক টাইমসের মতো স্বনামধন্য লিবারেল দৈনিক তাদের সামাজিক প্রগতিশীলতার আড়ালে থেকে সমাজতন্ত্রের বিপক্ষে জনসম্মতি  তৈরীর সূক্ষ্ম চেষ্টা চালায়, নোয়াম চমস্কি যেটিকে বলেছেন ম্যানুফ্যাকচারিং কনসেণ্ট। রুশ বিপ্লবের শতবার্ষিকী উপলক্ষে এই পত্রিকায় প্রকাশিতরেড সেঞ্চুরীসিরিজটি মনোযোগ দিয়ে দেখলেই এর নিদর্শন পাওয়া যাবে কিছুটা। এই সিরিজের বেশ কিছু লেখায় নানান রকম অনুমান বা কল্পিত যুক্তির ভিত্তিতে সমাজতান্ত্রিক সাফল্য (যেমনঃ সমাজতান্ত্রিক দেশে নারীর অবস্থান) বা সমর্থনকে (যেমনঃ জর্জ বার্নাড সমাজতন্ত্রের প্রতি অনুরাগ)  ছোট করার চেষ্টার পাশাপাশি যেসব প্রতিবেদনে বাস্তব তথ্যের ভিত্তিতে বা প্রত্যক্ষদর্শীর ভিত্তিতে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সাফল্য বা বিপ্লব কৌশল উঠে এসেছে সেসব প্রতিবেদনকে নানান ধরনের হালকা চালের শিরোনামযেমন, হোয়াই ওম্যান হ্যাড বেটার সেক্স আন্ডার সোশালিজম, বা হাউ জার্মান কনডোম ফান্ডেড রাশান রেভলিউশনদিয়ে তুচ্ছ করে দেওয়া হয়েছে। তবে বোদ্ধা পাঠককুলকে দুধের বোতলে পুরোটাই জল দিয়ে যে বাণিজ্য চলবে না সেটি পত্রিকাওয়ালারা ভালই বোঝে। আর তাই  নিউইয়র্ক টাইমসের সিরিজেই এমন দুএকটি তথ্য উপাত্ত ভিত্তিক প্রতিবেদনও রয়েছে (যেমন, লেনিন ইকো ওয়ারিয়র) যা খুঁটিয়ে পড়লে বোঝা যায় সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন শুধু অর্থনৈতিকসামাজিক সমতা নয় এমনকি পরিবেশের ব্যাপারেও কতটা সচেতন ছিল শুরুতেই।

প্রযুক্তির বিকাশ তত্ত্ব-তথ্য প্রকাশকে সুলভ করে দিয়েছে অনেকটাই। বামেরাও অবশ্য পুরোপুরি সদ্ব্যবহার করছে একটি জ্ঞানবান্ধব সামাজিক পরিবেশে থাকার সুবিধাগুলো। দ্য নেশনের মতো অর্থাভাবে মৃতপ্রায় পত্রিকা পুনরুজ্জীবিত হয়েছে অনলাইনে। নূতন নূতন ব্লগ, অনলাইন ম্যগাজিন  পডকাস্টের চোখা, প্রাসঙ্গিক প্রায়োগিক বিশ্লেষণ সাড়া জাগাচ্ছে তরুণদের মনে যারা প্রিণ্ট মিডিয়ার চেয়েও অনেক বেশী স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে ইলেকট্রনিক মিডিয়ায়। মজার ব্যাপার তরুণ মনের এই পরিবর্তনটি ধরা পড়েছে পূর্বোল্লিখিত যে জরিপটিতে সেটির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল রুশ বিপ্লবের শতবার্ষিকী উপলক্ষে। উদ্যোগটি নিয়েছে যে সংস্থাভিক্টিমস অব কমুনিজম মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশনসেই সংগঠনের মূল উদ্দেশ্য যদিও বিপ্লবের ত্রুটি অনুসন্ধান।

জনমনের প্রগতিমুখী পরিবর্তন যে রাতারাতি মার্কিন শাসকগোষ্ঠীর সাম্রাজ্যবাদী চরিত্র পাল্টে দেবে সেটি আশা করা বোকামি হবে। তবে এই পরিবর্তনের ধারা যদি অব্যাহত থাকে তবে বাম প্রগতিশীলরা গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতেই হয়তো ক্ষমতায় চলে আসতে পারে সরাসরি। ডেমোক্রেটিক পার্টির ভেতরে থেকে কিংবা স্বতন্ত্র বাম দল বা মোর্চা গঠন করে বামেদের এই ব্যালট সংগ্রাম বেগবান হচ্ছে দিন দিন। যে প্রশ্নগুলো এখন আগের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে সেগুলো হচ্ছে, আমেরিকার বর্তমান শাসনতান্ত্রিকঅর্থনৈতিক কাঠামো বজায় রেখে সামাজিক ন্যায়বিচারের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সমতা অর্থনৈতিক অঙ্গনের গণতন্ত্রায়ন নিশ্চিত করা সম্ভব কিনা? যদি সেটা না হয়, তবে সমাজের বিপ্লবী পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় তীব্রতার শ্রেণীদ্বন্দ্ব তৈরী করতে আমেরিকার মতো একটি সচ্ছল পুঁজিবাদী রাষ্ট্র আর কতটা সময় নেবে? সকল শ্রেণীর মার্কিন শ্রমিকের দক্ষতা বৃদ্ধি সত্ত্বেও অতিদক্ষ শ্রমিকের সাথে আধাদক্ষ শ্রমিকের মজুরীর ক্রমবর্ধমান ব্যবধান এই দ্বন্দ্বে কতটা গতির সঞ্চার করবে? আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা রোবোটিক্সের মতো পুঁজিঘন প্রযুক্তির অতি দ্রুত উন্নতির ফলস্বরূপ প্রান্তিক শ্রমিকের দরকষাকষির ক্ষমতা আরও কতটা কমবে? দ্বন্দ্ব যখন তীব্র হবে তখন বঞ্চিত শ্রেণী তাঁদের প্রতিনিধি হিসেবে বিদ্যমান মার্কিন বাম সংগঠনগুলোর মধ্যে কাদের বেছে নেবে? পরাক্রমশালী আমেরিকায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব হলে (কিংবা থেমে থাকলে) বিশ্বের অন্যান্য দেশে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব কতটা ত্বরান্বিত হবে (বা ভেস্তে যাবে)?

এইসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য রুশ বিপ্লবের শতবার্ষিকী উদযাপনের সাথে সাথে সত্তরোর্ধ বিপ্লবী রাষ্ট্র কেন এত দ্রুত বদলে গেল সেই প্রশ্নটিও করতে হবে। জানতে হবে, বিপ্লব পরবর্তী গৃহযুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ পরবর্তী আন্তঃপার্টি লড়াই পুরো একটা বিপ্লবী প্রজন্মকে কতটা বিধ্বস্ত আর বিপ্লব পরবর্তী প্রজন্মকে কতটা বিমুখ করেছিল। তৃণমূলে গণতন্ত্র নিয়ে যাওয়ার কথা যেই প্রতিষ্ঠানের সেই সোভিয়েতগুলো কেন ধীরে ধীরে কম্যুনিস্ট পার্টির সাথে একাকার হয়ে একটি মাথাভারী প্রশাসন গড়ে তুলেছিল। দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক পরিকল্পনার প্রয়োজনে চটজলদি পরিবর্তন আনতে কতটা ব্যর্থ হয়েছিল পার্টি আমলাতন্ত্র? রুশ বিপ্লবের আগে বা অব্যবহিত পরে জার্মানীর বিপ্লব সফল হলে রুশ বিপ্লবের টিকে থাকা আরও সহজ হত কিনা? স্থায়ী বিপ্লবের যে তত্ব মার্ক্সএঙ্গেলসট্রটস্কি দিয়েছেন সে অনুযায়ী পার্টিবৃত্তে আবদ্ধ জাতীয়তাবাদী স্বার্থে সীমাবদ্ধ না হয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপ্লবীরা নিজদেশে, নানান দেশে সর্বহারার সংগ্রাম আরও জোরদার করলে বিপ্লব আরও দীর্ঘস্থায়ী হত কিনা?

সঠিক বিশ্লেষণ আর সবল সংগ্রাম মার্কিন দেশে হয়ত এমন একটি বিপ্লবের সূচনা করবে যে বিপ্লব শতবর্ষ পূর্তির আগেই ভেস্তে যাবে না। টিকে থাকবে যুগের পর যুগ। মুক্তি এনে দেবে শুধু আমেরিকা নয় সারা বিশ্বের মেহনতী মানুষের জন্য।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*