নভেম্বরের নারী

প্রতিভা সরকার

 

“যীশুখ্রিস্ট যা করবার কথা বলে গেছেন সোভিয়েত ইউনিয়ন তাইই করেছে।”

— হিউলেট জনসন, ক্যান্টারবেরি আর্চবিশপ।

নারীমুক্তি নিয়ে যিশুর কোনও বক্তব্য আছে কি? প্রতীকী, সূক্ষ্ম, চোরাগোপ্তা কোনও গসপেল, যা চালিয়ে দেওয়া যায় আদতে নারী স্বাধীনতার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে? মেরী ম্যাগডালেন নামে পূর্বাশ্রমে এক গণিকার লাস্ট সাপারে বিতর্কিত ছদ্মবেশী উপস্থিতি বিশেষ কিছু প্রমাণ করে না। তিনি প্রেমিকা হয়ে থাকলেই বা এমন কী এল গেল!

অথবা সেই অতি রজঃস্বলা মেয়েটির কথা ধরা যাক, যার রক্তক্ষরণ হয়েই চলেছিল বারো বছর ধরে। ভিড়ের সুযোগে আলগোছ ছুঁয়ে দিল যিশুর জোব্বা, আর থেমে গেল আচমকা সেই ভয়াবহ রক্ত প্রস্রবণ, ভবনদী পেরোবার মন্ত্রগুপ্তি অনায়াসে করায়ত্ত হল।

এই দুটো একটি কেস ছাড়া, ভবনদীর এপারে থাকা অজস্র আতুর, নিঃশেষিত নারীকুলের মুক্তির পথ নিয়ে প্রভু নীরব, চার্চের কৃত্যাদিতেও তাদের জন্য কোনও স্থান নির্দিষ্ট করা নেই। এই নীরবতাই যদি সত্য হয়, তাহলে হিউলেট জনসনকে তার বক্তব্য শুধরোতে বলা যেতেই পারে। কারণ, স্বয়ং যিশু যা পারেননি, নভেম্বর বিপ্লবের অর্জনের তালিকায় তাও আছে।

পূর্বকথা

যুদ্ধ নয়, শান্তিই চাই, কিন্তু আদ্যন্ত একটি নারীবাদী উপমা দিয়ে বলা যায়, বিশ্বযুদ্ধের জটিল রক্তাক্ত জঠরই ১৯১৭-র বিপ্লবের জন্মদাত্রী। যেন একটা সংকেত, তর্জনী আর বুড়ো আঙুলের মাঝখানের একটা টুসকির জন্য থেমে ছিল উদ্বেল জনতা, যেন এক হ্যাঁচকায় পুঁজিবাদ পালটে যাবে সমাজতন্ত্রে, নিষ্ঠুর যুদ্ধবাজদের অর্থহীন বর্বরতাকে পালটে দেবে শ্রমজীবী মানুষের স্বপ্নে।

এই সংকেত নভেম্বর বিপ্লব পাঠিয়েছিল গোটা বিশ্বে। শিখিয়েছিল যদি বিশ্বাস করে মাতৃভূমির ভার দেওয়া যায় সর্বহারা শ্রমিকশ্রেণীকে, তাহলে রুখে দেওয়া যেতে পারে সবচেয়ে শক্তিশালী আগ্রাসনকেও।

টুসকি মানে তো আর সত্যিই টুসকি নয়, কত বাধাই তো লাফিয়ে পার হতে হয়েছে– মেনশেভিক বিরোধিতা, পালটি খাওয়া প্লেখানভ, কাউটস্কির মতো নেতা ও তাত্ত্বিকরা, জার-অনুগতদের লাগাতার চোরাগোপ্তা আক্রমণ, এমনকি বামপন্থী হঠকারিতাও, যেমন অটজোভিস্টদের সংসদীয় কাজকম্ম বর্জনের চেনা ডাক, শেষে রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ। গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো ট্রটস্কির দীর্ঘ বিরোধিতা, আর জিনোভিয়েভ, কামেনেভের জোড়া বিশ্বাসঘাতকতা। প্রথম মহাযুদ্ধে বিধ্বস্ত বিশৃঙ্খলাময় একটা বিশাল দেশ, অসংগঠিত জমিদখল অভিযানে উপোসী চাষা, বেঘোরে মরতে-না-চাওয়া ক্রুদ্ধ সৈনিক, শীতের সন্ধে অব্দি বাচ্চার দুধ আর রুটির জন্য যেন পৃথিবীর দীর্ঘতম লাইনে দাঁড়ানো রুশ মেয়েরা– এরাই ছিল বলশেভিকদের শক্তির উৎস। রুটি আর শান্তির জন্য চাহিদা, এই হতশ্রী মানুষগুলোর প্রেরণা আর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে গড়ে উঠল সোভিয়েত বা পঞ্চায়েত, নেতৃত্ব দিলেন লেনিন আর তাঁর প্রধান সহযোদ্ধারা। সোভিয়েতের হাতে সমস্ত ক্ষমতা চাই, এই দাবীতে নাছোড় বলশেভিকরা অবশেষে ক্ষমতা দখল করল। বিস্তর প্রতিকূলতা জয় করে মুক্তির স্বপ্নকে সাকার করতে পেরেছিল বলেই বিংশ শতকের সবচেয়ে গুরুত্ববহ ঘটনা এই নভেম্বর বিপ্লব, যেমন আঠারো শতকের ফরাসী বিপ্লব। এই ঘটনাগুলো যেন এক একটি শতাব্দীর মাইলস্টোন, অভিমুখ ঠিক করে দেওয়া দিশারী নক্ষত্র, যুগের পর যুগ যা পথ দেখাবার কাজটি করেই চলবে নিরবিচ্ছিন্নভাবে। নভেম্বর বিপ্লবের দেখানো দিশাগুলোর মধ্যে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি হল নারীমুক্তি, যার অভিঘাত আজও বিস্তৃত হয়ে চলেছে ঢিল-ছোঁড়া জলবৃত্তের মতো– তৃতীয়, চতুর্থ, আগামীতে আরও কত!

পূর্বজারা আর তাদের ঘোমটা

কী ছিল নভেম্বর বিপ্লবের আগে রুশ মেয়েদের অবস্থা? কেন, উস্তিনার মতো, যে দাসীবৃত্তি করতে বাধ্য হয়েছিল আট বছর বয়স থেকে, আর পরিষ্কার ন্যাকড়ার অভাবে শীতে জন্মানো রক্ত আর গর্ভজলমাখা নবজাতককে মুড়ে রাখতে বাধ্য হত কাগজের টোপলায়। অথবা মধ্য এশিয়ার ‘পারাঞ্জা’ পরা মেয়েদের মতো, যাদের ছবি এঁকেছেন স্বয়ং আনা লুই স্ট্রং। এমনিতেই মেয়েদের তুলনা চলত আসবাবের সঙ্গে, তারপর বিয়ের পর ঐ পারাঞ্জা, ঘোড়ার চুল দিয়ে তৈরি কালো, শক্ত ঘোমটা। নিশ্বাস নেওয়া বা দেখতে পাওয়া কষ্টকর হয়ে উঠত, কিন্তু ওই-ই ছিল বিবাহিতার অভিজ্ঞান। ওটা খুলে ফেললে স্বামীর হাতে খুন হয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক ও আইনসম্মত ছিল।

এমনিতেই  বিপ্লবপূর্ব রাশিয়া ছিল চাষাভুষোর দেশ, জমির কদর করা গ্রাম্য চাষি আর তার টনটনে সম্পত্তিবোধ; বৌ তার কাছে একফালি ব্যক্তিগত সম্পত্তি ছাড়া আর কি! ভয়াবহ পিতৃতান্ত্রিকতার পেছনে জারের উস্কানি কিছু কম ছিল না। আইনের চোখে মেয়েরা সেবাদাসী মাত্র, তাকে পিটুনি দিয়ে মেরে ফেলাও ছিল আইনসিদ্ধ। চার্চ এতে ইন্ধন যোগাত পরম্পরার নামে। ১৮৯৭ সালে তাই সাক্ষর নারী কেবল ১৩.১%। পুঁজিবাদ নারীকে ঘরের বাইরে এনেছিল ঠিকই, তাকে শ্রমিকের মর্যাদাও দিয়েছিল, কিন্তু তার মাথার বোঝাকে করে তুলেছিল দুগুণ বেশি ভারী। স্কুলছুট মেয়েরা, বাড়ির বৌ ঝিরা যেমন হাক্লান্ত খাটত কারখানায়, তেমনি বাড়িতে। আর শ্রমিকের কাজ মানে নাগাড়ে আঠারো ঘন্টা, তাও নামমাত্র পারিশ্রমিকে। বিপ্লবের অনেক আগে, সেই দ্বিতীয় ইন্টারন্যাশনালের সময় থেকেই সোশ্যাল ডেমোক্রেটদের চিন্তাভাবনার উত্তরাধিকারী বলশেভিকরা এই বৈষম্য নিয়ে সচেতন ছিলেন। লেনিনের কাছে এটি এতই গুরুত্ববহ ছিল যে আত্মগোপন কালেও বেআইনি প্রেস থেকে তাঁর যেসব লেখা ছেপে বেরোয় তার মধ্যে গুরুত্বের দিক থেকে প্রথমসারির ছিল “উইমেন এন্ড দ্য ওয়ার্কস কজ”। ফলে দ্রুত চিহ্নিত হল শোষণের দুটি মূল জায়গা– গৃহশ্রমের শেকল আর উৎপাদন ক্ষেত্র। নারীকে বিচ্ছিন্ন করে রাখবার ষড়যন্ত্র এবং একান্তই না রাখতে পারলে সেখানে চূড়ান্ত শোষণ।

যাত্রা হল শুরু

নারীমুক্তির সদ্যোত্থিত অঙ্কুরকে জল সার দেবার কাজ শুরু হয়েছিল বেশ কিছুদিন আগে থেকেই। ১৮৯৫ সালে মেয়েদের আলাদা সংগঠনগুলি জুড়ে তৈরি হয়েছিল ইউনিয়ন অব স্ট্রাগল। প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের মধ্যে চারজন নারী, অন্যতমা ক্রুপস্কায়া। নারী বস্ত্রশ্রমিকদের অগ্রণী ভূমিকায় নারীকে হীন দেখাবার পিতৃতান্ত্রিক পরম্পরার ভিত আলগা হতে শুরু করল। মস্কো ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন থেকে শ্রমিকশ্রেণীর লিঙ্গনিরপেক্ষ ঐক্য গঠন ও তা বজায় রাখবার আবেদন জানানো হল। নারী ও পুরুষ শ্রমিকের চূড়ান্ত লক্ষ্য এক, ফলে পাশাপাশি হাতে হাত রেখেই মুক্তির লড়াইতে নামবে তারা।

লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিক পার্টি লিঙ্গসাম্যের দাবীতে অনড় থেকেছে, সযত্নে এড়িয়ে চলেছে আত্মপ্রতারণার ফাঁদ। বিপ্লবের একদশক আগেই স্টুটগার্টের আন্তর্জাতিক কংগ্রেসে অস্ট্রিয়ার সোশ্যাল ডেমোক্রেটদের তুমুল নিন্দা করা হয়, কারণ ভোটাধিকারের ক্ষেত্রে তারা কেবল পুরুষের অধিকারকে সমর্থন করে মেয়েদের দাবীকে নস্যাৎ করে দিয়েছিল পরে দেখা যাবে এই বলে।

এইখানে ফাঁক পেয়ে আরও একটু তথ্য রাখা যাক। নভেম্বর বিপ্লব সমাধা হবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই রাশিয়াতে নারী তার ভোটাধিকার লাভ করে। গোটা দুনিয়ায় পঞ্চম দেশ, কারণ অস্ট্রেলিয়া এবং কানাডায় ভোটাধিকার দীর্ঘকাল ছিল বাছাই করা নারী পুরুষের জন্য। ভূমিপুত্র ও আদিবাসী নারী পুরুষের সে অধিকার পেতে পেতে অস্ট্রেলিয়ায় হয় ১৯৬২, কানাডায় ১৯৬০। যে আমূল পিতৃতান্ত্রিক দেশে কখনও গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠিত হয়নি, সেখানে প্রথম সোভিয়েতে নির্বাচিত ১৫১ জন প্রতিনিধির মধ্যে ২৫ জনই নারী।

একটা অদেখা আলোর মতো ছড়িয়ে পড়ছিল লিঙ্গসাম্যের ধারণা। পুরোধা ছিলেন কলনতাই, ক্রুপস্কায়া, নিকোলায়েভারা। একবছরের মাথায় ক্রেমলিন হল অব ইউনিয়নসে বিপুল জমায়েত এক হাজারের বেশি শ্রমিক কৃষক নারীর, সবাই নিজের নিজের উজ্জ্বল প্রাদেশিক পোশাকে সজ্জিত, উৎকর্ণ লেনিনের কথা শুনতে। লেনিন বলে গেলেন সারকথা– সমস্ত মুক্তিযুদ্ধের সাফল্য নির্ধারিত হয় নারীর অংশগ্রহণ কতটা নিবিড় তাই দিয়ে।

পঞ্চাশ থেকে সত্তর হাজার নারী যোদ্ধা রেড আর্মিতে যোগ দিলেন ১৯২০ সালের মধ্যে। তৈরি হল দ্য রেড সিস্টার্স।

নারীশিক্ষার কার্যকারিতা বুঝে নিরক্ষরতার বিরুদ্ধে শুরু হল বিপুল যুদ্ধ। শ্রমজীবী মানুষের সংকল্পের অভাবনীয় শক্তিতে অসম্ভব সম্ভব হল। নাহলে কেবল ক্ষমতা হস্তান্তরের কারণে এত বড় অর্জন অসম্ভব। আর তা হল এত দ্রুত এবং এত দক্ষতার সঙ্গে যে তুলনায় আসতে পারে কেবল বিপ্লবোত্তর কিউবা। দুক্ষেত্রেই নারী কমরেডরা বিপুল স্বেচ্ছাশ্রম দিয়েছেন মেয়েদের লেখাপড়া শেখানোর কাজে। ফলে কিছু সময়ের মধ্যেই অর্জিত হল সর্বসাক্ষরতা। পৃথিবী প্রথম দেখল কেবল মেয়েদের জন্য প্রকাশিত পত্রিকা– রোবোৎনিৎসা। ১৯১৪ সালে সাতটি সংখ্যা বার করে উঠে গেলেও পরে এটি বিপ্লবোত্তর রাশিয়ার বলশেভিক প্রকাশনার অন্যতম প্রধান ধারা হয়ে দাঁড়ায়। এডিটোরিয়াল বোর্ডে ছিলেন কলনতাই, ক্রুপস্কায়া, আরমাঁদ, এলিয়াজারোভা, স্যামোইলোভা। প্রত্যেক কারখানা থেকে নারীসদস্য নির্বাচিত হতেন এডিটোরিয়াল বোর্ডে। নিজ নিজ এলাকার রিপোর্ট খুঁটিয়ে দেখা ছিল তাদের কাজ।

আজকের পৃথিবীতে শুধু  মেয়েদের সমস্যা আর মুক্তির উপায় খোঁজার জন্য রাষ্ট্রের পূর্ণ পোষণায় কোনও পত্রিকা রয়েছে কিনা জানা নেই। এখন ও দেশেও নেই, তবু দেশি ফেমিনা, মনোরমা আর নানা লাইফস্টাইল পত্রিকার ভিড়ে ছবি লেগে থাকে চোখে– কাজ শেষে মা স্নান খাওয়ার পর খোলাচুলে হাতে নিয়ে বসেছেন সোভিয়েত নারী। অবুঝ শিশুমন তখন উজবেকিস্তান বা আজারবাইজানের উজ্জ্বল পোশাক আর অন্যরকম কেশচর্চার ছবি দেখেই মুগ্ধ। হাতে রঙিন রুমাল, স্কার্ট পরা নৃত্যরত রুশি মেয়ে, এমন স্বতঃস্ফূর্ততা সেই মফস্বলের ঘেরাটোপে বড়ই অপ্রাপ্য। 

নিজের শরীরের ওপর অধিকার আজও নেই এই উপমহাদেশের লক্ষ লক্ষ নারীর। বিপ্লবের পরেই সোভিয়েত রাশিয়ায় আইনি করা হল একগুচ্ছ নারীপক্ষায়িত সংস্কারকে। এক কাজ এক মজুরি প্রতিষ্ঠা তো হলই, সঙ্গে এল বিবাহ বিচ্ছেদ, গর্ভপাত, বিবাহ বন্ধনের বাইরেও নারীপুরুষের একত্র বাস ও সমকামিতার অধিকার। দম্পতির দুজনেরই সম্পত্তি এবং আয়ের ওপর সমানাধিকার প্রতিষ্ঠা হল। বিবাহকে আইনের বলে ধর্ম থেকে পুরোপুরি বিচ্যুত করা হল। লাভ জিহাদের কালে বসে মনে হবে রূপকথা, কিন্তু একশো বছর আগে দুজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীপুরুষ ভিন্নধর্মী হলেও কোনও ধর্মের অনুমোদন ছাড়াই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে পারত। তথাকথিত অবৈধ সন্তানেরও সম্পত্তির অধিকার ছিল বিবাহবন্ধনজাত বৈধ সন্তানের মতোই। নারীকে গৃহাশ্রম থেকে মুক্তি দিল কম্যুনের রান্নাঘর, যৌথ খামার, প্রসবকালীন সুবিধা আর শিশুপালনের রাষ্ট্রিক দায়িত্ব এবং অবশ্যই শ্রমের সমানাধিকার।

জারের আমলে রাজনীতিতে অংশগ্রহণের অধিকার ছিল না মেয়েদের। এবার তারা নবলব্ধ সুযোগের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করে নিজেদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দক্ষতার প্রমাণ দিতে থাকল।

ফলে যদি প্রশ্ন ওঠে নারীদের জন্য কী করেছে নভেম্বর বিপ্লব, তাহলে কলনতাইয়ের সুচিন্তিত মতামত স্মরণ করা ভালো– নারীর শিক্ষাগত যোগ্যতা ও স্বাস্থ্যসক্ষমতা বাড়িয়ে তাকে শ্রমদানের যোগ্য করে তুলেছে, বৃদ্ধি করেছে তার শ্রেণীসচেতনতা। রাজনীতি সচেতন সামাজিক ক্রিয়াকাণ্ডে অংশগ্রহণকারী নাগরিক নারী নভেম্বর বিপ্লবের জাতক। শুধু রাশিয়ায় নয়, সারা বিশ্বেই নারীর অবস্থার এই বিপুল পরিবর্তনের দিশারী নভেম্বর বিপ্লব।

লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিকরা নারীমুক্তিকে যথোপযুক্ত গুরুত্বের সঙ্গেই দেখেছিল, কিন্তু তাদের দেখার একটি নির্দিষ্ট ধরণ ছিল। নারীমুক্তিকে তারা দেখেছিল শ্রমজীবী মানুষের মুক্তিযুদ্ধের একটি অপরিহার্য ও শক্তিশালী অঙ্গরূপে। ভেদবুদ্ধিতে সেরা শাসকের হাতে লিঙ্গ, জাতীয়তা, ধর্মভিত্তিক বিভেদ হচ্ছে এক একটি অস্ত্র। তাই শ্রমিকশ্রেণীর ঐক্যই ছিল ইস্যু। আলাদা করে নারীস্বাধীনতা নয়। ফলে নারী শোষণের অনেক জটিল বাঁক, সামাজিক, ধর্মীয়, অর্থনৈতিক দুর্দশা সেসময় নজরের আড়ালে থাকবে এটাই স্বাভাবিক। আসলে সোভিয়েত রাশিয়ায় যখন সর্বহারার শাসন প্রতিষ্ঠা পেল তখন সে ঘেরাও হয়ে রয়েছে পুঁজিবাদী শক্তিগুলির দ্বারা। তাদের টক্কর নেবার একটি রাস্তাই খোলা ছিল সামনে– শ্রমশক্তির সমস্ত উৎসগুলিকে অবারিত করে দিয়ে উৎপাদনে জোয়ার আনা। নারীশক্তি গৃহবন্দি থাকলে রাষ্ট্রের ক্ষতি। এই কারণকে মুখ্য করে ডিম আগে না মুরগি আগের ধরণে ‘উপযোগিতাবাদে’র অবতারণা– রাষ্ট্রের প্রয়োজনে মুক্ত নারী, নাকি মুক্ত নারীর প্রয়োজনে রাষ্ট্র। পরবর্তীকালে লিঙ্গসাম্যের আইনগুলি পালটে যাওয়ায় এই বিতর্ক আরও জোরদার হয়েছে। তবে এটা তো ঐতিহাসিক সত্য যে বিপ্লবী রাষ্ট্র গঠনের অবস্থায় আসবার অনেক আগে থেকেই নারীমুক্তির প্রশ্ন নিয়ে প্রচণ্ড সক্রিয় ছিল বলশেভিকরা, যা উপযোগিতাবাদকে অপ্রমাণ করে।

তবে একথা বলা যেতেই পারে সাম্যবাদী জমানায় লিঙ্গসাম্য যে মহিমায় প্রতিষ্ঠা পাবে বলে আশা করা হয়েছিল, বাস্তবে তা হয়নি। স্তালিনআমলে মাতৃত্বের ওপর অকুণ্ঠ জোর, বিবাহবিচ্ছেদের দুষ্প্রাপ্যতা রক্ষণশীলতার পুনরাবৃত্তি। তবুও মনে রাখতে হবে দুকোটি মানুষের মৃত্যুর পর ওই বিশাল জনবিরল দেশকে রক্ষা করবার এবং নতুনভাবে গড়ে তোলবার ভারও ছিল স্তালিনের কাঁধে।

আসলে বৈপ্লবিক শক্তির অভিষেকের সঙ্গে সঙ্গেই মানবচরিত্র এবং মানবসমাজের সমস্ত স্ববিরোধ উবে যায় না। ক্লারা জেটকিনকে লেনিন নিজেই বলেছিলেন, অনেক পার্টিসদস্যকে একটু নাড়া দিলেই তার হাঁ মুখের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসবে এক একটা ভয়ঙ্কর দানব। কিন্তু সোশালিস্ট বিপ্লবকে এগোতে হয় সমসাময়িকতার মধ্য দিয়েই। কবে সোশালিস্ট চেতনায় আলোকিত হবে মানবজাতি, বিপ্লব তার অপেক্ষায় বসে থাকতে পারে না। কারণ পুঁজিবাদ আর যাইই করুক মানুষকে সমাজতান্ত্রিক চৈতন্যে উদ্বুদ্ধ করে না। ফলে বিপ্লবী রাষ্ট্র আইনি ও পরিকাঠামোগত জরুরী কিছু পদক্ষেপ নিতে পারলেও, চূড়ান্ত পিতৃতান্ত্রিকতাকে নির্মূল করতে পারেনি। তবে আইনি ব্যবস্থাই যদি সব হত তাহলে ১৯৭৭ সালে অবলুপ্ত ব্যবস্থা ফিরিয়ে দেবার পরই নারীমুক্তির রথ চলত তরতরিয়ে। তাছাড়া শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রসবকালীন সুবিধা, শিশুর রাষ্ট্রিক দায়িত্ব, এর কোনওটাই স্তালিন রদ করেননি।

সর্ষের মধ্যে কোথায় ভুত ঘাপটি মেরে ছিল তা নিয়ে বহু চর্চা চলছে। শেইলা রোবোথামের মতো সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী নারীবাদীদের মতে বিপ্লবী পার্টির অতি কেন্দ্রীভূত চরিত্রও একটি অন্তরায়। বিপ্লব যতক্ষণ না হাত ধরছে গণতন্ত্রের, ততক্ষণ অব্দি সমাজ পাল্টাবার যোগ্য রাজনৈতিক চেতনা অর্জন করা নারী বা পুরুষ কারও পক্ষেই সম্ভব নয়।

পরবর্তীকালে মার্কসবাদীরা বিশ্বজোড়া নারী আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে কেন ব্যর্থ হলেন তাও এক প্রশ্ন। কারণ নভেম্বর বিপ্লব একশো বছর আগেই প্রমাণ রেখে গেছে বিপ্লবী রাষ্ট্রে নারীমুক্তিকে কোন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া যায়। সঙ্গে এটিও প্রমাণিত হয়ে গেছে যে বিপ্লবের সাফল্য বহুভাবে নির্ভর করে থাকে তাতে নতুন নারীর অংশগ্রহণের ওপর। মেয়েরা বিপ্লবের সেবাদাসী তো নয়ই, বরং জন্মদাত্রী এবং ধাত্রী।

 

গ্রন্থসূত্র

*দুনিয়া কাঁপানো দশ দিন : জন রীড, এন,বি,এ।

*স্তালিন যুগ : আনা লুইস স্ট্রং, র‍্যাডিক্যাল ইম্প্রেশন।

*The Age of Extremes : Eric Hobsbawm, Abacus.

*Selected Articles and Speeches : Alexandra Kollontai, Progress Publishers.

*Collected Works of Lenin, vol 29 : Progress Publishers.

*Women, Resistance and Revolution : Sheila Rowbotham, Verso.

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*