চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম। মেল ট্রেন। সপ্তম যাত্রা। ১লা নভেম্বর, ২০১৭।

স্টেশন মাস্টার

 

রুশিয়া-প্রবাসী এক প্রৌঢ়র মুখে গল্পটা শোনা। আট এবং নয়ের দশকে গর্বাচভ-এর সোভিয়েতে তখন গ্লাসনস্ত-পেরেস্ত্রোইকা-র খোলা হাওয়া প্রায় ঝড়ের চেহারা নিয়েছে। বাঙালি ভদ্রলোকটি কাজ করতেন মস্কোয়, এক সোভিয়েত প্রকাশনা সংস্থার বাংলা সম্পাদকীয় বিভাগে। ক্রেমলিন-এর সরকারি ঘোষণায় যেদিন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে দেওয়া হল, সেদিন কোনও কারণে তিনি অফিসে যাননি। সাংবাদিক মানুষ, তাই রেডিও-য় খবরটা শোনার পরই বেরিয়ে পড়েছিলেন রাস্তায়। সারাদিন ঘুরে বেড়িয়েছিলেন রাজধানীর আনাচে-কানাচে। আক্ষরিক অর্থেই, যাকে বলে একেবারে করমর্দনের দূরত্বে দাঁড়িয়ে, তিনি দেখেছিলেন গত শতকের সবচেয়ে আলোচিত সেই রাজনৈতিক পালাবদলের প্রতিটি মুহূর্তের ঘটনাপ্রবাহ। দেখেছিলেন ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দোকানে পাউরুটি অমিল হয়ে যেতে। আগের দিন পর্যন্তও যাঁরা সামান্য কয়েক কোপেক খরচ করে সারা পরিবারের জন্য পাউরুটি কিনতে পারতেন স্বচ্ছন্দে, সেদিন হাজার মাথা খুঁড়ে কালোবাজারে ২০ রুব্‌ল কবুল করেও পাননি। রাতারাতি মস্কোর সব গ্যাস-স্টেশনে জ্বালানি অমিল, পরের দিন বেশ কয়েক ঘণ্টার জন্য শহরের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে লোডশেডিং, সুপার মার্কেট বন্ধ, সরকারি গণ-পরিবহন ব্যবস্থা চৌপাট…। এরপর বেশিদিন আর প্রবাসে থাকতে পারেননি ভদ্রলোক। চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে বাধ্য হয়েছিলেন দেশে ফিরে আসতে।

এর একটা উলটো গল্পও ওঁরই মুখে শোনা। স্তালিন-পরবর্তী জমানায় রুশ সাহিত্যের চেহারা কী দাঁড়িয়েছে তা নিয়ে কথাপ্রসঙ্গে তিনি একবার বলেছিলেন, ও-দেশে এখন প্রেমের গল্প মানে কী জানো? সন্ধেবেলা খামার থেকে ফিরে এক তরুণ তার প্রেমিকাকে জড়িয়ে ধরে বলছে, “জানো, আমরা আজ ক্ষেত থেকে ১০ পুদ গম এনে গোলায় ভরেছি।” প্রেমিকের এহেন বীরত্বের কাহিনি শুনে মেয়েটি আবেশে চোখ বুজে ফেলে বলছে, “ওগো, আমরা কাল ১৫ পুদ গম তোলার চেষ্টা করব।”

দু’টো গল্পই সত্যি। গড়ে ওঠার ঠিক পর, এবং ভেঙে যাওয়ার ঠিক আগে সোভিয়েত কেমন ছিল, তার সাক্ষ্য হিসেবে এমন আরও অনেক গল্প শোনা যায়, যার মধ্যে, অবধারিত অতিরঞ্জন সত্ত্বেও লুকিয়ে থাকে সত্যের অসংখ্য দানাও। দু-দু’টো যুদ্ধের ধাক্কায় পর্যুদস্ত বিশ্ব-অর্থনীতি অবাক ঈর্ষায় দেখছে, সকলের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জীবিকা সুনিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটা সদ্যোজাত দেশের আত্মবিশ্বাসী পদক্ষেপ। ভেঙে যাচ্ছে পুঁজির ধারণা, ভাঙছে পুঁজিবাদী মূল্যবোধের অবক্ষয়িত চেহারা, সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির অগ্রগমনের ইতিহাস রচিত হচ্ছে, আমি থেকে আমরায় উত্তরণের নয়া দলিল লেখা হচ্ছে স্বপ্নের কালি আর প্রত্যয়ের কলমে – বস্তুতই সে এক অলৌকিক জন্মের কাহিনি।

কিন্তু তার মাত্র অর্ধ-শতাব্দীর মধ্যেই সে কাহিনির জলুষ ম্লান হয়ে আসতেও তো দেখছে পৃথিবী। নভেম্বর বিপ্লবের বজ্রনির্ঘোষ বিলীয়মান প্রায় – তার প্রাসঙ্গিকতা নিয়েও বক্রোক্তি ধেয়ে আসছে দুই গোলার্ধের বিভিন্ন শিবির থেকে। সোভিয়েত ভেঙে যাওয়ার খবরে উল্লসিত মার্কিন মিডিয়া হেডলাইন করছে “উলটে দেখুন পালটে গেছে” – এহেন উলটপুরাণের মহান রচয়িতার জন্য রাতারাতি বরাদ্দ হচ্ছে শান্তির সর্বোচ্চ সম্মান। কেউ কৌতুকমিশ্রিত কটাক্ষে বলছেন, “এমনই তো হওয়ার ছিল…” কেউ বা ব্যথিত বিস্ময়ে প্রশ্ন করছেন, “এমনই কি হওয়ার ছিল?”

এমন পরস্পরস্পর্ধী অবলোকনমালার অলাতচক্রে দাঁড়িয়ে, অতএব কী করণীয় ইতিহাসের নিষ্ঠ ছাত্রটির, সময় ও সময়ের অন্তর্নিহিত বীক্ষার সামনে যে নতজানু দাঁড়াতে চায়? কীভাবে সে বুঝতে চাইবে নভেম্বর বিপ্লবের উত্তরাধিকার, কোন আলোয় সে পড়তে চাইবে গত একশো বছরে তার উদ্‌বর্তনের চিহ্নগুলি?

নভেম্বর বিপ্লবের শততম বছরে পৌঁছে সেই ছাত্রটিরই দিকে তাকাতে চেয়েছি আমরা। খুঁজতে চেয়েছি তার খোঁজটাকেই। সেখান থেকেই উঠে এসেছে আমাদের এই সংখ্যার মূল বিষয়-ভাবনা।

মূল ভাবনার সূত্রপাত হল বিপ্লবের কারিগর লেনিনের লেখা পুনঃপ্রকাশ করে। এছাড়া লিখলেন রংগন চক্রবর্তী, অর্ক, মোহাম্মদ ইরফান, কণিষ্ক ভট্টাচার্য ও প্রতিভা সরকার।

এই সংখ্যায় স্মরণ করলাম সদ্য আমাদের ছেড়ে চলে যাওয়া তেভাগা আন্দোলনের কর্মী বেলা দত্ত, গায়িকা গিরিজা দেবী, অভিনেতা দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায় এবং কবি পুণ্যশ্লোক দাশগুপ্তকে। এঁদের স্মরণে কলম ধরলেন স্ব-স্ব ক্ষেত্রে অধিকারীরা।

এর বাইরে নতুন যে কথাটা বলার, তা হল – এই সংখ্যা থেকে দুটো নতুন বিভাগ জুড়ল আমাদের মেল ট্রেনে – বই আলোচনার জন্য হুইলার্স স্টল, আর অণুগল্পের হল্ট, অবশ্যই অনুগল্পের জন্য।

এ ছাড়া যা থাকে – গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ আর ধারাবাহিক, সেসব তো আছেই।

বিপ্লব, এবং জ্ঞানপিপাসা, দীর্ঘজীবী হোক!

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*