কবি, একা মেঘরাস্তা ধরে

কৌশিক বাজারী

 

কোনও কোনও মানুষ পথ চলতে চলতে হাওয়া দিলে গায়ের জামা খুলে ফেলেন। শরীরে, দেহত্বকে সেই বহতা হাওয়া ধারণ করে বুঝে নেন তা কত বছরের পুরনো। হাওয়া বয়ছে সুন্দরবন থেকে নাকি জাভাদ্বীপ থেকে। বুঝে নেন হাওয়া বেহুলার মান্দাস কতদূর পৌঁছে দিয়ে এল। তারপর মনে মনে গুঞ্জরিত হন। এর নাম পথ চলা। সাধারণ মানুষ, সাধারণত পথ চলেন কোথাও পৌঁছনোর জন্য। তাদের থাকে একটা ভাল-মন্দ-কাজ-অকাজের গন্তব্য। আর এরকম, যারা ঠিক সাধারণ নন, অল্প ভুতে পাওয়া, তাদের সাধারণত কোনও গন্তব্য থাকে না। পথের শেষ নয়, পথের দু’পাশেই মূলত তাদের উদ্দেশ্য ছড়িয়ে রয়েছে। ভূগোল ও ইতিহাস-অনির্দিষ্ট সেই বহুতলীয় পথ, যা কখনও ফুরিয়ে যায় না। মূলত সেই কারণেই তাদের পথের কোনও শেষ থাকে না। আজীবন অবিরাম পথ। তাই একটা অবিরাম চলা তাদের ভেতর থেকে উঠে আসে। তাঁকে আমরা বলি কবি। কবি পথকে নিজের জীবনের মধ্যে ধারণ করে বাঁচেন।

বিংশ শতাব্দীর সপ্তম দশক থেকে একবিংশের দ্বিতীয় দশক পর্যন্ত সময়কাল, খুব বেশি না হলেও, চলার হিসেবে, মানব জীবনে খুব কমও নয়। কবি ফল্গু বসু এমন একজন নিভৃতচারী মানুষ। আমি তাঁকে টেলিফোনে চিনি। কণ্ঠস্বরে তাঁর আন্তরিকতা বুঝেছি বহুদূর। তাঁর ছড়ানো ছিটানো লেখা-পত্তর ও সাক্ষাৎকার থেকে যেটুকু বুঝেছি, তিনি সত্তরের সেই অশান্ত ঐতিহাসিক দিনগুলোতে জড়িয়ে পড়েছিলেন নকশালবাড়ি আন্দোলনের সঙ্গে। পরবর্তী সময়ে তাঁর লেখা অনেক কবিতায় সেই সময়ের প্রতিধ্বনি, ব্যর্থতা ও আশা-হতাশার কথা শোনা গেছে সেখানে। ১৯৮৭-৮৮তে লেখা ‘শামুক’ নামক কবিতায় দেখি তিনি বলছেন—

গোপনে বিপ্লব করে ঘুষির সিনেমা দেখে দেখে

দু-দুটো প্রজন্ম হেজে গেল। আমি গ্রামে গ্রামে ঘুরি

থানার দেয়ালটাকে একবার পাক মেরে দেখি

ফাটলের চারাগাছ কেউ উপড়ে ফেলেছে কি না

চারাগাছ ভাল আছে দেখে থানার দেয়াল থেকে

ইচ্ছে করে পড়ে গিয়ে আরো বেশি শক্ত হতে চাই।

অত্যন্ত স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা। আরও পরিষ্কার করে বললে— রাজনৈতিক আশার কথা দিয়ে তিনি আরম্ভ করলেন, এবং এই কবিতাটিরই শেষে সম্পূর্ণ অন্যরকম এক রাজনৈতিক হতাশা।–- ‘দু-দুটো প্রজন্ম গেল, তবু নেতৃত্ব অংশত শেষ’ থেকে

‘সব ঘাট চষে ফেলি

শেওলা ডিঙিয়ে যাই, শুঁড় বার করে দেখি, তবু

 

প্রাক্তন নক্সাল বলে কেউ আর সমীহ করে না।’

একটি ন্যায় ও সৎ-আবেগজাত প্রকৃত তারুণ্যের আন্দোলন, কিছুকালের মধ্যেই কিছু উজবুক নেতার ভ্রান্তি এবং প্রতিপক্ষের অন্যায় ষড়যন্ত্রের মাঝে পড়ে দুরমুশ হয়ে যাওয়ার অব্যবহিত পরেই একটি স্বাভাবিক সমাজ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের প্রকাশ সম্ভবত ফল্গুদার এই কবিতাটি।

কবি নিজে ‘প্রহর’ পত্রিকায় দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে এই কবিতাটি সম্পর্কে বলেছেন—

–“দেখো, আমি মনে করি কবির দায় বহন করার আইনত বাধ্যবাধকতা নেই। তবে প্রকাশ করার স্বাধীনতা আছে। এখান থেকেই ব্যাপারটা এসেছে। কবিতায় যেটা দেখছ সেটা তো মিথ্যে নয়। ওই মতাদর্শের (নকশালবাড়ির আন্দোলন) প্রতি একটা চাপা টান তো ছিলই। পরবর্তীতে তাদের জায়গা থেকে বিচ্যুত হতে দেখে ভিতরে ভিতরে একটা কষ্ট দানা বাঁধে। ‘অবাধ্যের পুঁথি’তে ‘শামুক’ কবিতাটা দেবদাসদা সংকলন থেকে বাদ দিতে বলেছিলেন, কিন্তু আমি দিতে পারিনি।”

অর্থাৎ কোনও আকস্মিকতা তো নয়ই, বরং কবিমনের এক দৃঢ়তাই এখানে প্রতিষ্ঠিত। যাকে কবি কখনওই বর্জন করতে পারেন না। হয়তো এখনও তিনি অপেক্ষা করেন।–- ‘এখনও অপেক্ষা করি দাঁড়াই নদীর শুকিয়ে যাওয়া পাশে…. যেখান থেকে জলের একটি রেখা আসে….’

যদিও এইসকল বিষয় এই আলোচনার কেন্দ্রমূল নয়। তবু মূলে যাবার আগে এই ভূমিকার প্রয়োজন আছে। কবির প্রকৃত পথের হদিশ পেতে হলে পিছনের ফেলে আসা পথগুলিও ফিরে দেখা দরকার একটু…। কারণ—

সবার মনের মধ্যে চলে বিচিত্র ঘড়িটি

যে খুব যত্নের সঙ্গে ধারাপাত মুখস্থ করেছে

 

দহনের আগে স্বপ্নের সময় বিবেচনা

করেই ফেরত দিচ্ছে প্রত্যেকের ডুবে যাওয়া গ্রাম।–

২০১১-র কলিকাতা বইমেলায় সংগ্রহ করি একটি কাব্যগ্রন্থ-– ‘করতলে ভাগ্যরেখা নেই’। কাব্যগ্রন্থের নাম তাৎক্ষণিক হিসেবে খুব পছন্দ হয়নি তখন আমার। তারপর পড়তে পড়তে পরে একটা অন্য আবেদন তৈরি হয়। তথাপি নিজের মুদ্রাদোষেই এই গ্রন্থটির অন্য অন্য নামকরণ করেছি আমি বিভিন্ন সময়ে। যেমন— ‘আনন্দ ব্যাকুল রোদ’, ‘পাখি শূন্য মনের গহন’, ‘একা মেঘ রাস্তা ধরে’— এটা আমার প্রিয় কবিতা পাঠের একটা ব্যক্তিগত খেলা ছাড়া আর কিছু না। কোনও বই পড়তে গিয়ে, এক-একটা কবিতা, অথবা কোনও চরণ, কোনও দৃশ্যকল্পনা, কখনও কখনও মাথার ভেতরে রয়ে যায় দীর্ঘস্থায়ী হয়ে। কাজের মধ্যে, পথ চলার মধ্যে, স্নানের মধ্যে তারা আসা যাওয়া করে।

এই বইয়ের কবিতাগুলি তো আসলে ভ্রমণকাহিনী। কবির আত্মজৈবনিক ভ্রমণ। এর যে কোনও একটা কবিতা ধরেই পাঠক শুরু করতে পারেন তাঁর ভ্রমণ। ধরা যাক অতি সাধারণ এক পাঠক। এই আমার মতো ছা-পোষা লোক, যদি এই কবিতাগুলির কোনও বাস্তব গ্রামে গিয়ে উপস্থিত হই কখনও, হয়ত দেখব এসব কিছুই কিছু নয়। হয়ত কবিতায় কথিত ‘মাটিয়ারি’ গ্রামে গিয়ে দেখা যাবে পেতলের বাসন-কোসন, চাষবাস— আর কিছুই নেই। তবু আছে কোথাও হয়ত, হুবহু এইসব। সেখানে পৌঁছুতে হলে আপাতত অন্যভাবে পৌঁছতে হয়। কারণ কবিতাগুলি সময়-যানের মধ্য দিয়ে, অতীত ও বর্তমানের ভেতর দিয়ে অতিবাস্তব ও কল্পলোকের ভেতর দিয়ে যাওয়া-আসা করছে অনবরত। কারণ মাটিয়ারি গ্রামে ‘রামনবমী মেলায় আগে পুতুল নাচ হত, আজকাল উঠে গেছে’।

আঠাশ পৃষ্ঠার এই বইটির সব কবিতাগুলির নামই গ্রাম-নাম। আপাতদৃষ্টিতে এমনটা মনে হলেও, এ হল কবির গমনপথ। এও আর্থ-সমাজ-রাজনৈতিক এক কাব্যিক রূপরেখা। শুধু কি তাই? তাহলে তো প্রবন্ধ হয়ে উঠত লেখাগুলি। আরও যা আছে— মৃত্তিকা ও মৃত্তিকার প্রাণ।

নদীটির জন্য ভেবে ভেবে গানপাগলা পরিতোষ

গ্রামে গ্রামে গান গেয়ে ঘুরে, ফিরে আসে বিরহীতে।

প্রাচীনের মুখে নবীন শুনেছে— কোনো এক কালে

এখানেও জমিদার ঘোড়া চড়ে ঘুরতেন রোজ

ক্ষমতা বা জেদের কারণে এখানেও বহুবার

যুদ্ধ হয়েছিল।…

…মজা খালটির পাশে জেগে ওঠে বাদল আকাশ

শোনা যায়, করুণানিধান কিছুকাল কাছাকাছি

খুব একাকী ছিলেন, জাতীয় সড়ক চলে যাচ্ছে

স্টেট বাসে। বিরহীর উন্নতিতে মদনগোপাল

নিজে অপার আনন্দ পান।

এই যে এখানে কবি এক গ্রামের কথা বলতে গিয়ে অতীত-বর্তমান গেঁথে দিয়ে একজন প্রায় মুছে যাওয়া ‘গ্রামীণ’ কবিকে খুঁজে দিলেন। করুণানিধান। সঙ্গে সঙ্গে গ্রামটি এবং সাথে সাথে কবিতাটিতেও অন্যরকম এক মেদুর আলো এসে পড়ল। করুণানিধান এখানে থাকতেন। এ সকল পার হয়ে কবিতার শেষে তিনি পৌঁছে গেলেন মদনগোপালের অপার আনন্দে।

পৌঁছে গেলেন– ‘বিরহীর উন্নতিতে মদনগোপাল নিজে অপার আনন্দ পান’— এই সহজ পঙক্তিটিতে। খুব কী সহজ? ‘উন্নতি’ মানে কি? উন্নয়ন? আর মদনগোপাল কে? মদনগোপাল আমাদের সহনাগরিক, এক সামাজিক নায়ক। তিনি মানুষের দুঃখে দুঃখী আর মানুষের সুখে সুখী হন। ঠাকুরমশাই রান্না চাপালে তার একবেলা আহার জোটে। আর তার অন্ন নিজ হাতে সাজান বলেই ঠাকুরমশাই ঐ হাতে কোনও পাপ করতে পারেন না কখনও। তার চাল ফুটো হয়ে জল পড়ে। জ্যোৎস্নালোক পড়ে।– এইসব গল্প আমাদের জানা। এখন বিরহীর উন্নতি মানে কী? তাও আন্দাজ করা যায়। কারণ উন্নয়ন আর মঙ্গল-কল্যাণ সমার্থক নয়, যদিও বর্তমানে পৃথিবীর সব গ্রাম মূলত বিরহী। উন্নয়নের সড়ক ধরে স্টেট বাস চলে যায় ধুলো উড়িয়ে। আর ‘অপার’ শব্দটির দ্যোতনা সূক্ষ্মভাবে লক্ষণীয়। ‘অপার’ আনন্দ লাভের পথ যে জাগতিক ভোগের প্রয়োজনে নির্মিত ‘উন্নয়ন’ নয় তা বলাই বাহুল্য। তাই এই ‘অপার আনন্দ’ মদনগোপালের আত্ম-শ্লেষই হয়তো বা।

সমগ্র বইটিতে এমন অসংখ্য ‘সহজ’ পঙক্তি ও কবিতা ছড়ানো রয়েছে ফল্গুদার গ্রাম ‘দর্শনে’র পথে পথে। এখানে আধটি কবিতা ভেঙে দেখতে গিয়ে এই হাল হল আমার।

কত যে গ্রাম এই বাংলায়। তাই তো গ্রামবাংলা শব্দটি রয়েছে এই বাংলা ভাষায়। সবুজ সুন্দর বলিষ্ঠ ছায়াসুনিবিড় বনেদি শস্যময় আর রুক্ষ রাঢ় ধূ-ধূ ধুলো ঢাকা খাঁ-খাঁ গ্রাম সকল। মাটিয়ারি, ঝামটপুর, বলাগড়, নিশিগঞ্জ, উষাগ্রাম, হাভেলি শহর আরও কত গ্রাম-নাম।

নানা গ্রাম ঘুরতে ঘুরতে একটা গ্রামের মুখে এসে থমকে দাঁড়াই। যেখানে আমি গিয়েছি আগে। গ্রাম অর্থাৎ কবিতা। গ্রামের নাম ‘সাব্রাকোণ’। কবিতার নাম ‘সাব্রাকোণ’। আসলে আমরা বাঁকুড়া বিষ্টুপুরের লোক যাকে বলি সাবড়াকোণ। বিষ্টুপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে বাস ছাড়ে— ‘বিষ্ণুপুর—সাবড়াকোন—পাঁচমুড়া’ লেখা থাকে। এই বাসে চড়ে আগে গিয়েছি। এই সাব্রাকোণের পাশেই আমার বাপ-ঠাকুদ্দার দেশগ্রাম। হাঁটাপথ। রুখা, শুখা, টাঁড়, ডিহিতে ভরা বাঁকুড়ার ল্যাটেরাইট অধ্যুষিত অঞ্চল। এখানে ‘দিঘি উল্টে জল চাটে পিপাসা কুকুর’। মানে— গ্রীষ্মের ধূ-ধূ রোদে মাটি ফেটে গেছে। এমন কি দিঘি উল্টে দিয়েও এক ফোঁটা জল পায় না বাঁকুড়ার কুকুর।

“…রামকৃষ্ণ মন্দির লাগোয়া দোলমঞ্চে

ঝঞ্ঝা অতীত শুধরে ফের উথলে ওঠে।

নদীকে অনিয়মিত দাবি করে বাঁকা প্রবাহিত

পুরন্দর, দুইপাশে বিকেল লুটোয়

কে তাকে সুদেষ্ণা ডাকে?

পাখি জানে, আর জানে বলেই সে

দেবালয় দূরবর্তী আকাশে ভাসার কথা ভাবে।

নচেৎ অজ্ঞান, রজনী আছাড় খায়

চৌচির ভূমিতে। এই মানবজন্ম সন্ধ্যাপ্রদীপ

উষ্ণ হাওয়া টের পায় ফুলবনে লেগেছে আগুন।…”

হায়! এ কোথায় এসে পড়লাম ফল্গুদার হাত ধরে! এ যে আমারই গ্রামে আমাকে ফিরিয়ে দিলেন তিনি। পুরন্দর! আহা পুরন্দর! খুব ছোটবেলা সেজপিসিমার গ্রামের বাড়িতে গিয়ে এই পুরন্দরেই তো স্নান করতাম আমি। লাল মোটাদানার বালি। সেই খালপাড়, দেবালয় দূরবর্তী আকাশে ভাসমান পাখির পিছনে সূর্যাস্ত। তাহলে পাল্টে যায়নি সমস্ত? কিছু থেকে যায় আমাদের প্রবাহিত জীবনের ভিতর? সুদেষ্ণা অথবা তন্দ্রা নামের কিশোরীটির সাথে ফের দেখা হয়ে যায় পথে… যখন, ফুলবনে লেগেছে আগুন।

এই লেখার শুরুতে একটা পথ চলার কথা বলা হয়েছিল। আর ‘শামুক’ নামে একটা কবিতার উল্লেখ ছিল। সেখানে কবির ব্যক্তিগত অপেক্ষা, আশা, হতাশার কথা ছিল। এখন আমরা যেখানে এসে পৌঁছলাম সেখানে হতাশার লেশ মাত্র নেই। বরং সেই অপেক্ষা-আকাঙ্খার পথে চলতে গিয়ে ফল্গুদার হাত ধরে আমরা এসে পড়েছি নিজস্ব গ্রামে।

 

ফল্গুদা আপাতত আমাদের সঙ্গ ছাড়লেন। এই তো এপ্রিলের তেইশে। গত বছরের অক্টোবর মাসে ফল্গুদার কবিতা নিয়ে একটা লেখা লিখি, যেটা একালের কবিকণ্ঠপত্রিকার বিশেষ ফল্গু বসু সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। কথাগুলো একই রাখলাম, ফল্গুদা। আপনার সঙ্গে শেষ কথারও তো অনেকদিন হল।

 

 

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*