মহাকর্ষীয় তরঙ্গ ও নোবেল প্রাইজ

ড.কৃষ্ণপদ সরকার

 

লেখক বিশিষ্ট শিক্ষক ও পদার্থবিদ। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের একাধিক অগ্রগণ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদ ও দায়িত্ব সামলেছেন। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান পত্রপত্রিকায় পজিট্রন ফিজিক্সের ওপর লেখা লেখকের পাঁচটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। একাধিক পাঠ্যবই লিখেছেন, রুশ থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন, শিক্ষাক্ষেত্রে বিভিন্ন জাতীয়স্তরের প্রকল্পে নেতৃত্ব দিয়েছেন। বর্তমানে নেতাজী সুভাষ মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে পরামর্শদাতা হিসেবে যুক্ত আছেন। বাংলাভাষার দ্বিমাসিক বিজ্ঞানপত্রিকা ‘স্বাস্থ্য ও পরিবেশ’-এর সহ-সম্পাদক। ইন্ডিয়ান সোসাইটি অফ অ্যাটমিক অ্যান্ড মলিকিউলার ফিজিক্স ও ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসের সদস্য।

 

এবছর (২০১৭) পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন তিন মার্কিন পদার্থবিদ। এঁরা হলেন রেইনার উইস, কিপ থর্ন ও ব্যারি ব্যারিশ। পুরস্কার মূল্য সমানভাবে বিভাজিত হবে না। তবে সেটা খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার নয়। প্রায় একশো বছর আগে ১৯১৬ সালে মহামতি অ্যালবার্ট আইনষ্টাইন তাঁর আপেক্ষিকতাবাদের সাধারণ তত্ত্বে যে তরঙ্গের কথা বলেছিলেন, ২০১৬ সালে তাকে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে। এর গুরুত্ব এত বেশি যে, নোবেল কমিটি এই পরীক্ষণকুশল বিজ্ঞানীদের সম্মানিত করতে কালক্ষেপ করেনি। বিষয়টি কী এবং তার গুরুত্ব কোথায় — সহজ কথায় বুঝতে চেষ্টা করা যাক।

দৈনন্দিন জীবনে আপেক্ষিক শব্দের অর্থ আর আপেক্ষিকতাবাদ — কোনও কাছাকাছি দু’টি শব্দ নয়। গাণিতিক ব্যাখ্যা তো দূরের কথা, তাত্ত্বিক আলোচনাও ঘুম-পাড়ানিয়া নয়। সত্যি বলতে কী, বোঝার চেয়ে শক্ত হচ্ছে মেনে নেওয়া, বিশ্বাস করা।

আমাদের পৃথিবী ও তার সমস্ত বস্তুপুঞ্জের মাত্রা তিন — দৈর্ঘ্য, প্রস্থ আর উচ্চতা। এর চেয়ে বেশি মাত্রা আমরা বুঝতে পারি না। অবশ্য কমমাত্রার বস্তু বুঝতে পারি। আইনষ্টাইন অংক কষে দেখালেন, বিশ্বপ্রপঞ্চ চারমাত্রার। দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতার সঙ্গে জুড়েছে সময়। দেশ এবং কালকে আলাদা করা যাবে না — সব মিলিয়ে একটাই। দেশকালসন্ততি। ফলে মহাজাগতিক সূত্র কেপলার, গ্যালিলিও, নিউটন যেসব বলে গিয়েছেন, তা পার্থিব ক্ষেত্রে সত্যি মনে হলেও, মহাজাগতিক অর্থে তা সত্য নয়।

বিশ্বপ্রপঞ্চের মূল স্বরূপ, তার ছন্দটা আইনষ্টাইন ধরেছিলেন তিনটি পর্যায়ে — ১) আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব (১৯০৫), ২) সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ (১৯১৬), আর একীকৃত ক্ষেত্রতত্ত্ব (১৯৪৯)। আগেই বললাম, স্থান আর কাল পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয় — এদের কোনও নিরপেক্ষ সংজ্ঞাও নেই; স্থান ও কালকে সংযুক্তভাবে ব্যবহার করতে পারি কতকগুলি মহাজাগতিক ঘটনাপরম্পরা মাপতে — এরা শুধু মাপকাঠি।

পৃথিবী জুড়ে পদার্থবিজ্ঞানীরা উল্লসিত — ২০১৬ -র ১১ ই ফেব্রুয়ারি বাস্তবিক অর্থে একটি রেড লেটার ডে। পুনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোনমি এন্ড অ্যাস্ট্রোফিজিক্স-এর মহানির্দেশক ঘোষণা করলেন, ১৩০০ কোটি আলোকবর্ষ দূরে দু’টি ব্ল্যাকহোল অর্থাৎ কৃষ্ণগহ্বর মিলে এক হয়ে গেছে। মহাকর্ষ তরঙ্গের মাধ্যমে এই এক হয়ে যাবার ঘটনা লাইগো যন্ত্রে (Laser Interferometer Gravitational Wave Observatory) ধরা পড়ল।

২০০৬ থেকে ওয়াশিংটন-এর হামফোর্ড আর লুইজিনিয়া-র লিভিংস্টোন — দুই মানমন্দিরে চার কিলোমিটার লম্বা L আকৃতির ভূগর্ভস্থ ফাঁপা বায়ুশূন্য নলে লেসার রশ্মির মাধ্যমে খোঁজ চলছিল মহাকর্ষ তরঙ্গের। বিজ্ঞানীরা দেখলেন, ঐ দৈর্ঘ্য আর ৪ কিলোমিটার ছিল না — ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র হলেও বেড়ে কমে গিয়েছিল — অর্থাৎ স্পেসের আয়তন বাড়ছিল, কমছিল।

কৃষ্ণগহ্বর দু’টি যুগ্ম — একটি অন্যটির চারপাশে আবর্তনশীল। একজনের ভর সূর্যের ভরের ২৭ গুণ, অন্যজনের ৩৬ গুণ। ব্যাস যথাক্রমে ১৫৬ কিমি আর ২৩৪ কিমি। সংঘর্ষের ফলে ০.২ সেকেন্ডে তৈরি হল একটিমাত্র গহ্বর। হারিয়ে যাওয়ার ভরে E=mC2 সূত্র অনুযায়ী আমাদের সূর্যের কোটি কোটি গুণ ঔজ্জ্বল্য তৈরি হল। এই বিপুল শক্তির বেশিরভাগ বিকিরিত হয়েছে মহাকর্ষীয় তরঙ্গরূপে।

গত বছরই সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের শতবর্ষ পালন করা হল। টান টান করে বাঁধা একটা চাদরের কোনও জায়গায় পাথর রাখলে একটা নীচু উপত্যকা তৈরি হয়। একটা ছোট্ট মার্বেল গুলিকে সেই চাদরের ওপর ছেড়ে দিলে তা ঐ নীচু অংশেই অবতরণ করবে — চাদরের বক্রতার জন্য, পাথরের আকর্ষণের জন্য নয়। চাদরের উচ্চাবচতার ফল মহাকর্ষের কারণ।

১৯৮০ সালে মহাকর্ষ তরঙ্গকে ধরার কৌশল বাতলেছিলেন দুই ভারতীয় বিজ্ঞানী। বি সত্যপ্রকাশ ও সঞ্জীব ধুরন্ধর। মহাকর্ষ তরঙ্গ সন্ধানে এখন প্রায় ১০০ জন ভারতীয় বিজ্ঞানী কাজ করছেন।

নিউটনের মতে সূর্য যদি উধাও হয়, পৃথিবী সঙ্গে সঙ্গে জানতে পেরে নিজের কক্ষপথ পালটে ফেলবে। আইনষ্টাইনের মতে, সে খবর আসবে মহাকর্ষীয় তরঙ্গের মাধ্যমে এবং সেটা আসতে কিছুটা সময় নেবে। আইনষ্টাইন আর নিউটনের তত্ত্বের কোনটি ঠিক, তা ঠিক করবে মহাকর্ষ তরঙ্গ অনুসন্ধান।

যে কোনও আলো, এক্স-রে, অতিবেগুনী রশ্মি বায়ুমণ্ডল, গ্যাস আর ধুলোর আস্তরণে শোষিত হয়ে যায়। ফলে, মহাবিশ্বের অধিকাংশ জায়গা আমাদের গোচরে আসে না। মহাকর্ষীয় তরঙ্গের সুবিধা হোল, এই তরঙ্গ খুব দুর্বল বলে শোষককুলের অগোচরে পথ পাড়ি দিতে পারে।

মহাকর্ষীয় তরঙ্গের অস্তিত্বের এই পরীক্ষামূলক প্রমাণ পদার্থবিদ্যা গবেষণায় অনন্ত সম্ভাবনার দরজা খুলে দিল।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*