খণ্ডচিত্রে মধ্যভারতের গোণ্ড আদিবাসীদের রাজকাহিনী – ছয়

অতীন্দ্রিয় চক্রবর্তী

(…রাজকাহিনী – পাঁচ-এর পর)

সব মিলিয়ে, সিন্ধুসভ্যতার সময় থেকে এই সেদিন অবধি গোণ্ডদের সমাজে যে কত রাজা এসেছে-গেছে তার ইয়ত্তা নেই। অথচ আজ বহিরাগতদের সিস্টেমের রাজ্যপাটে প্রজা হয় থাকতে হচ্ছে এঁদের, যার ফলে এঁদের জীবনযাপনের আপন ধারা বজায় রাখতে যারপরনাই ক্লেশসাধন করতে হচ্ছে। গোণ্ডদের এত রাজা ছিল, যে প্রায় সমস্ত টোটেমধারী গোণ্ডই নিজেদের কোনও না কোনও রাজবংশের সাথে চিহ্নিত করে এসেছে। ফলে, এমনকি বিভূতিভূষণের ‘আরণ্যক’ লেখার অভিজ্ঞতাকাল ১৯২৮-২৯ পর্যন্তও এঁদেরকে সচরাচর রাজগোণ্ড অভিধায় অভিহিত করা হত। এখন রাজতন্ত্র বিলীন, স্বশাসন অবলুপ্ত; ফলতঃ উক্ত প্রচলন লুপ্তপ্রায়।

আরও একটা উপায়ে গোণ্ডদের অনেক জায়গার রাজাদের নাম পাওয়া যাবে। ৭৫০টা গোত্র বা টোটেমের প্রতিটার সঙ্গে জড়িত-বিজড়িত যে বিশ্বাস-ধারণা-গল্প-মিথদের শিকড়বাকড় ডালপালার বিস্তার হয়েছে সে সকল স্বীয় বংশলতা ধরে শ্রুতিপথে, স্মৃতিপথে ধরে, সেই সকল টোটেমধারী রাজাদের নাম ও রাজ্যপাটের স্থান নিজেদের মধ্যে ধরে রাখে সেই সেই টোটেম তথা গোত্রের মানুষরা। তবে সেই সব রাজত্বের সময়কাল ধরা যাবে না এই উপায়ে -– প্রাকৃতচেতনার ‘সময়’ আমাদের নাগরিকচেতনার ‘সময়’-এর সাথে খাপ খাবে না যে! তাই অশোকের সমসাময়িক সুরজগড়ের গোণ্ডরাজা সুহনলালকে যেমন মনে রেখেছে ‘উইকে’ টোটেমধারীরা, তেমনই তারা মনে রেখেছে চৌকিগড়ের জগৎ সিংকে, রামগড়ের রাজা মানসায়কে, পাঁচালগঢ় বা পেঙ্ক মেড়হি বা পাঁচমাঢ়হির ধূরদেও আর কবুধূরাগড় বা কবর্ধা (যে অঞ্চলের নব্যহিন্দুদত্ত নাম কবীরধাম) অঞ্চলের ভূরদেওকে। তেমনই আবার মাঁড়াভিরা মনে রেখেছে তাঁদের গড়মণ্ডলা/গড়কাটেঙ্গা অঞ্চলের রাজা সংগ্রামসিংহ, হৃদয় শাহ তথা দুর্গাবতীকে, মনে রেখেছে চৌরাগড়ের দলপত শাহকে। আবার ‘ধুরায়াম’ টোটেমযাপীদের মনে আছে চাঁদগড়ের সেই মিথমণ্ডিত রাজা ‘ভীমবল্লাল সিং’কে; ‘নরোতী’ পদবী তথা টোটেমধারীরা মনে রেখেছে সূর্যগড়ের সেই আদি নাগবংশের পোল সিংকে। ‘ভবেদী’ গোত্র যেমন একদিকে মনে রাখছে সেই মাণিকগড়ের মাণকা সিংকে, তেমনই ‘শেড়মাকে’রা মনে রাখছে ভাণকাগড়ের ভানকা সিংকে। ‘অত্রাম’ গোত্রজরা স্মরণ করছে মাহুরগড়ের মাসুর টিরকা, বল্লারপুরগড়ের  জয়কাসুর আর সিরপুরিগড়ের রাজা নারুসিংকে। আবার একদিকে খণ্ডাতারা মানছে সেই মিথিক বীর হরিয়াগড়ের জাটবা খণ্ডাৎকে, ‘টেকাম’ পদবীওয়ালা গোণ্ডরা টোটেমরাজা পালীগড়ের গোবিন্দরায়কে তাদের বীর রাজা ধার্য করছে। আবার ‘কোরাম’ ঘরের সবাই তাদের রাজা মানছে তপেশ্বর ক্রম সিংকে, ‘ধুরুয়া’দের রয়েছে দেওগড়ের বীরনী সিং, ‘কাঙালী’ কুলের গোণ্ডদের রয়েছে রাজা কাঙ্গীগড়ের লমুখ রায়, আবার নিয়মগিরি পাহাড়ের লাঞ্ঝিগড়ের ‘ওচি’-গোণ্ডদের বীর রাজা ছিল দেব যমরাজ, ‘কুমরা’ পদবী গোণ্ডদের তেমন আবার গাওয়ীলগড়ের নরসিংহ রায়। এরম করে সমস্ত টোটেমকেন্দ্রিক সংস্কৃতি, থুড়ি, প্রাকৃতিক উজান বয়ে পৌঁছে যাওয়া যায় সেই সব টোটেম-বংশের একাধিক রাজারাজড়ার কাছে। পাতা ভরানো উদ্দেশ্য নয়, তাই দু’জন প্রাযুজ্য টোটেমরাজার নাম জেনে নিই — ‘কোয়া’ বংশীয় গোণ্ড আদিবাসী টোটেমযাপীরা মনে রাখছে বস্তারগড়ের রাজা অন্নামদেওকে, দান্তেশ্বরী-উপাসক ‘জগৎ’ আদিবাসীরা মনে রাখছে দান্তেওয়াড়ার সৌমচন্দকে।

গোণ্ডদের এত রাজারাজড়া, অথচ প্রায় প্রতিটা রাজবংশের শাসনই দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে, বহুপুরুষ ধরে চলেছে, এবং যতটুকু যা ঐতিহাসিক তথ্য জোগাড় হয়েছে, স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে যে যখন স্বশাসন ছিল তখন অপেক্ষাকৃত শান্তিপূর্ণই ছিল সমগ্র গোণ্ডওয়ানা। দু’একটা যুদ্ধ ছাড়া, নিজেদের মধ্যে রাজায় রাজায় ঠোকাঠুকি লাগেনি মধ্যযুগের অন্তে স্বশাসনসমূহের অবসানলগ্নে এসেও। এই সামাজিক সংহতিতে অটুট থেকে, খামোখা সাম্রাজ্যবিস্তারের ডালপালা না ছড়িয়ে সেই সময় অবধি অরণ্যময় ডেকান প্লেট জুড়ে ‘স্বাধীন’ ছিল গোণ্ডরা, বলা যায় কি? আসলে ‘রাজা’ বলতে আমরা যা বুঝি, গোণ্ড প্রেক্ষণে ধারণা অননুরূপ। এইখানে ‘রাজা’র সমরসাত্মক ইংরেজি শব্দ ‘কিং’ নয়, হবে ‘লীডার’। নিজের ক্ল্যান বা কমিউনিটির অনেক মানুষকে একসাথে আনা, বিভিন্ন বিষয়ে নেতৃত্ব দেওয়া ইত্যাদি কার্যকলাপে সিদ্ধ অনেকেই তাই এই বিরাট অঞ্চলের এক-একটা প্রান্তর, জঙ্গল, পাহাড়ঘাটি, পর্বতমালার রাজা হতে পারতেন। এই যে এত রাজা থাকা সত্ত্বেও এক একটা রাজবংশ নিরুপদ্রবে এক-দেড় হাজার বছর অথবা অন্তত বিশ-ত্রিশ-চল্লিশ পুরুষ ধরে রাজপাট করতে পেরেছে, এর পিছনে ল্যাণ্ড-ডিস্ট্রিবিউশানের এক অদ্ভুত প্রথাও কাজ করেছে। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের আগে অবধি মধ্যভারতের বিস্তীর্ণ এলাকায়, এমনকি বিলাসপুর সংলগ্ন রতনপুর-খুঁটাঘাটের জমিদারবংশের মতো হিন্দু রাজবংশগুলোতেই এই প্রথার প্রচলন দেখা যেত। সেই প্রথায় এক একটা পরিবার নির্দিষ্ট এক একটি খণ্ডের জমির মালিক থাকতে পারতেন অল্প কিছু বছর, তারপর রোটেশান বেসিস-এ সেই জমি চলে যেত গ্রামের অন্য কোনও পরিবারের হাতে, আর সেই প্রথম পরিবারের মালিকানায় আসত নতুন আরেকখণ্ড জমি। ক’বছর পর পর এইভাবে মালিকানা বদল হত, আর তা নির্ভর করত আলাদা আলাদা জমিদারী বা রাজশাহীর নিয়ম অনুযায়ী। এইভাবে জমির মালিকানা-বদলের প্রথা আর্যসভ্যতা দেখেনি কখনও। এই প্রথার ফলে সমাজে অপেক্ষাকৃতভাবে সম্পদগত সমতা বজায় রাখা গিয়েছিল, যার ফলে যুদ্ধ-দাঙ্গা হয়েছে খুবই কম, দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে অধিকাংশ রাজবংশের রাজপাট। কালচুরি রাজবংশ আর তারপর হাইহাইয়া রাজবংশের শাসনের উপরোক্ত জমিদারী প্রায় হাজার বছর টিকেছিল। তারপর ইংরেজরা চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চাপিয়ে দিয়ে এই জমির হাত-বদলানোর প্রথা বন্ধ করে দিতে হুড়মুড় করে মধ্যভারতের সমাজব্যবস্থার কাঠামো ভেঙে পড়েছিল, সতনামীদের মতো আরও বিভিন্ন দলিতবর্ণের মানুষের সেই যে সর্বনাশের শুরু হল, তা আজও চলেছে, আর সেই সময় থেকেই সেই ভাঙনকে কাজে লাগিয়ে আদিবাসী সমাজের কলিজায় গভীর থেকে গভীরতর কামড় বসিয়ে চলেছে মহারাষ্ট্রের বর্ণহিন্দু ব্রাহ্মণবাদী ক্ষমতাসাধন।

গোণ্ড আদিবাসীরা যে আক্ষরিক অর্থেই হাজার হাজার বছর ধরে নিজেদের বিভিন্ন টোটেম-বংশজ রাজারাজড়াদের শাসনে অপেক্ষাকৃত সুখ ও প্রাচুর্যে কালপাত করত, তার আন্দাজ হয় এই দীর্ঘস্থায়ী সাম্রাজ্যগুলির দিকে তাকিয়ে। এই তাকানোটুকুই সম্পদ, এর থেকেই আঁচ পাওয়া যায় যে আজ নাগরিক সভ্যতা যে পল্লীযাপী গোণ্ড আদিবাসী সভ্যতাকে ‘বুনো’, ‘জংলি’, ‘স্যাভেজ’, ‘অশিক্ষিত’, ‘আদিম মানব’ ইত্যাদি হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত, তা সেই কোন সুদূর অতীত থেকে সিন্ধু সভ্যতার কুলচিহ্ন বহন করে এনে, চরম আর্য সভ্যতার নাগরিক অভিঘাত সইতে সইতেও কত বিস্তীর্ণ রাজ্যপাটের ঐতিহাসিক স্মৃতি টোটেমে টোটেমে ধরে রেখেছে ‘স্বাধীন’ সেই অতীতের প্রতি সশ্রদ্ধ, ভক্তিজ, লিপিহীন আর্তিতে। সেই আর্তিদের ধরে রাখার অপটু চেষ্টাতেই গোণ্ডদের রাজকাহিনী বিষয়ক এই সুদীর্ঘ প্যাঁচাল পাড়া হল।

2 Comments

  1. খুবই ভাল লাগল পড়ে, গবেষণামুলক সন্দর্ভ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*