বৃষ্টি, ঈশ্বর ও ইলিশ মাছ

সৌনক দাশগুপ্ত

 

#১

গতকাল রাত থেকেই শুরু হয়েছে বৃষ্টিটা। একটা লম্বা ছুটি কাটানোর পরে ধুমসো কালো মেঘগুলো এখন মন দিয়ে ডিউটি করছে আপাতত। আচার্যিপাড়ার সব থেকে উঁচু জায়গা, দুর্গা দালানের তিন নম্বর সিঁড়িটাও প্রায় জল ডুব ডুব। এবারে কেসটা একটু ঘেঁটে গেছে। প্রতিবার পুরোদমে নাকানিচোবানি খাওয়ানোর আগে আগে একটা দুটো ওয়ার্ম আপ ম্যাচ খেলে বর্ষা। মোটামুটি পাড়ার শাসক এবং বিরোধী দল যথাক্রমে বুঝে যায় বর্ষামঙ্গল কর্মসূচি বাস্তবায়িত করার সময় এসে গেছে। নিচে সেই যৌথ কর্মসূচির বর্ণনা রইল পাঠকের বিরক্তি বাড়ানোর জন্য–

ধাপ ১: পাড়ার মোড়ে রতনদার চায়ের দোকানে শাসক ও বিরোধী পক্ষ নির্বিশেষে জড়ো হওয়া। এবং অনিবার্য কারণবশত বিগত ৪১-৪২ বছর ধরে বিরোধী পক্ষ আগে বলার সুযোগ পায় ও শাসক দলের মুণ্ডপাত শুরু করে। এই যেমন রাস্তাটা গঙ্গা/পদ্মার (যেহেতু এপার ওপার সবাই আছেন) চেহারা নিয়েছে। বিল্টুকে আর ঠাকুমার জন্যে বাবুঘাট যেতে হবে না! অথবা পাড়ার সব‍্ব প্ৰথম ইঞ্জিনিয়ার শ্রীমান শুভময় কিভাবে অফিস ক্যাব ড্রাইভারের কাছে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে এই নরকে গাড়ি ঢোকানো সম্ভব নয় বলে!! বা খেলার মাঠের জমা জলে কিভাবে মশারা তুমুল সেক্স করে বংশবৃদ্ধির জিডিপি পার করে গেছে!! এই সব আলোচনাতে অবধারিত এবং প্রয়োজনীয় তথ্য যোগান দেয় রতনদা। বাবা-ছেলে-নাতি নির্বিশেষে রতনদা। এলাকার প্রাচীন বটবৃক্ষদের মধ্যে যে কজন আছে, রতনদা একজন। পুলিশ তাড়া করেছিল শোভন ঘোষালকে, মাঝে পড়ে গিয়েছিল রতনদা। কালীঘাট ক্লাবে সেন্টার ফরওয়ার্ড খেলা রতনদা। শোভনের বোন প্রতিমাকে আগলে রাখা রতনদা। গুলিটা শোভন ঘোষাল এর বদলে রতন সেনের বাঁ পা ফুঁড়ে দিয়েছিল। তারপর থেকে মোহনবাগান গ্যালারিই ভরসা ছিল রতনদার, সবুজ ঘাস তখন বাদামি হয়ে গেছে।

সে যাই হোক, বাঙালির জীবনে এরম অনেক রতন শাহজাদা আছে। আমরা বরং প্রসঙ্গে ফিরে আসি। আমাদের দ্বিতীয় ধাপ।

ধাপ ২: এবার শাসক পক্ষের ড্রিবল, ঠিক যেন মারাদোনার বাঁ পা। ছোট দাদা, স্মরণ করিয়ে দেয় যত্রতত্র প্লাস্টিক, ময়লা না ফেলতে বাড়ির সক্কলকে শিক্ষিত করা উচিত, এতে নিকাশি ব্যবস্থার শিরা ধমনী সচল থাকে!! এর পরে নীতিপাঠ পড়াতে মাঝ মাঠে নামে মেজ দাদা; ডজ করতে করতে বলে চলেন, পাড়ার মাঠ ঘাট প্রতিটা ইঞ্চি সব্বার। সেখান জল জমুক বা ঝোল, সেটা সব্বাই মিলে সাফ করতে হবে (বোঝা যাচ্ছে না এটা পৌরসভার সাফাই কর্মী ছাঁটাইয়ের সংকেত কিনা!!)। এই যেমন মাঠে ময়দানে একসাথে ফুচকা খাওয়া, মেয়ে দেখা এরমই সবাই মিলে স্বচ্ছতা মিশন থুড়ি অভিযান। এবং সর্বোপরি শেষ পেরেক ঠুকতে নিখুঁত ফ্রিকিক নেন বড়দা (ডাকটা অবিনশ্বর, নশ্বর কেবল আত্মা)। বয়ানটা খানিক এরম, এতই যখন বোঝে সবাই তখন সময় থাকতে ব্যবস্থা কেন নেয় না!! বিরোধীরাও সমান দায়িত্বশীল হলে এই দিন দেখতে হত না!

রতনদা বুদ্ধিমান মানুষ, দিব্বি বুঝতে পারেন এই কথার পরে ‘তর্ক হবে, চড়বে গলা’। তাই নিখুঁত ব্যবসায়ী বুদ্ধিতে আর এক রাউন্ড চায়ের সাথে লড়াইটাকে ঠেলে দেন পরবর্তী রাউন্ডের দিকে!

ধাপ ৩: এই পর্বের নাম ভারতবর্ষ। বৈচিত্রের (পড়ুন বিভেদের) মধ্যে মিলন (পড়ুন সিলেক্টিভ কমন এজেন্ডা) মহান। বৌদিবর্গের তরফ থেকে একটি একটি করে ফোন আসা শুরু হতেই (পড়ুন পেপটক) দাদারা কমন ইন্টারেস্টে ফিরে আসেন। কানাই, বেচু, বদনা প্রমুখ সাফাই কর্মীদের মনেও সন্ধেবেলায় মুরগীর ছাঁট সহযোগে বাংলার আমেজটুকু বেঁচে থাকে।

পাঠক পুরো গপ্পটাকে রাজনৈতিক সমাপতন ভাবার আগেই মূল পর্বে ফিরে আসি। তো ব্যাপার হল এই যে, জলমগ্ন আচার্যিপাড়া। ছোটনের সাইকেল গ্যারেজ থেকে শুরু করে ঘোঁতনের দিশি মুরগি অব্দি যে বাজার বসে, সেটাও বিশ বাও জলের তলায়। তাই জ্যান্ত চারাপোনার বদলে ল্যাদ খেয়েই কাটুক। অথবা নিরামিষ ভোজনের হাহাকার বুকে নিয়ে। এবং এই বর্ষাপাতে ইলিশ না পাবার সমস্ত সম্ভাব্য কার্য কারণ বিশ্লেষণ করে। এই যেমন অভিজিৎ ওরফে টুকাই। খাসি এবং মুরগির তুলনাতেও ইলিশের গন্ধ খুঁজে বেড়ায়! গতকাল রাসেল স্ট্রিটের অফিস থেকে বেরিয়ে যখন রফিকের দোকানে চা খেতে গেল তখনই কানে এসেছিল কথোপকথনটা। জনৈক ব্যক্তি ফোনে তার স্ত্রীকে খিচুড়ি ইলিশভাজা করার জন্য ভালোবাসা মিশ্রিত নির্দেশ দিচ্ছেন (এখানে ভালোবাসাটা ইলিশ না বৌয়ের প্রতি সে গভীর গবেষণার বিষয়)। এবং সংক্রামক রোগের মতোই এই কথাগুলো অভিজিতের মগজের নর্থ পোল টু সাউথ পোল খাবি খেতে লাগল। আগামী অল্প খানিক সময়ের মধ্যেই ইলিশের ভাপা, ইলিশের ঘাটা, ইলিশের সর্ষে ইত্যাদি রেসিপি পরমেশ্বর গুগল-এর দয়ায় অভিজিৎ-এর সাথে তাল মিলিয়ে ময়দান মেট্রোর দিকে হাঁটা লাগাল। ও হ্যাঁ, কচুর শাকটাও ছিল, ইলিশের মাথাটা রয়ে গেছে যে!!

কিন্তু ঈশ্বর (যিনি অসময়ে না ডাকতেই এসে হাজির হন) বোধকরি ওই সময়টায় পাওয়ার ন্যাপ নিচ্ছিল। তাঁর ঘুম ভাঙল মোটামুটি রাত্তির ১১টার পরে। ভোর ৪.৪৭ নাগাদ তলপেটের তাগাদায় যখন ঘুম ভাঙল অভিজিতের, ততক্ষণে ঐশ্বরিক চক্রান্তে শনিবারের বারবেলার খিচুড়ি ইলিশ সহ ফেসবুক হ্যাশট্যাগ বাড়ির উঠোনে জমা জলের তলায় হাবুডুবু খাচ্ছে। অভিজিৎ একবার ভাবল যে ফেবুতে একটা হ্যাশট্যাগ বিপ্লবের ডাক দেবে; কিন্তু তার জন্যে চাই মাকড়সার জালের মতো নিখুঁত যুক্তিজাল! কাঠি দিয়ে ইয়ে মানে কাঠি করে কিন্তু সে জাল ভাঙলে চলবে না। অতএব যুক্তি, তক্কো এবং গপ্প থুড়ি বিচার চাই।

#২

ছাই চকচকে রঙের স্যুট পরে লোকটা টানটান হয়ে বসে আছে অভিজিতের সামনের চেয়ারটায়। হাতে একটা কাগজ আর পেন। হিসহিসে সর্পিল একটা চাউনি দিয়ে চিরে ফেলছে অভিজিতের আপাদমস্তক। যাকে বলে একেবারে ক্ষুরধার দৃষ্টি। ঠোঁটের কোণে ঝুলছে একটা আলতো হাসি, বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলের মতোই দুর্বোধ্য। লোকটার চুলগুলো বেশ ভালো রকমের লম্বা, ঢেউ মাখানো, ঘন কুচকুচে কালো; কিন্তু পোশাকের সাথে মানানসইভাবে বিনুনি গোছের করে পিঠের উপর গুছিয়ে রেখেছে। জাপানী যোদ্ধা সামুরাইদের মতো কায়দা করে। প্রতিটি চুল যেন এক একটি যুগের হিসেব রেখেছে। ঋজু গঠন, লম্বায় ছ’ ফিটের বেশিই হবে। গলার আওয়াজে ব্যক্তিত্বময় গাম্ভীর্য; ছেলেবেলায় রামায়ণ পড়ার সময় রাবণের কণ্ঠস্বর যেমনটি কল্পনা করত অভিজিৎ হুবহু সেরমটি। মোটামুটি বর্ণনাটা নিঁখুত দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হল; কারণ লোকটা দাবি করেছে সে ঈশ্বর!

সকাল সকাল ফেসবুকে জোড়া ইলিশ সহ কৃশানুর পোস্ট দেখে অভিজিতের মেজাজ আরও বিগড়ে গেছিল। নিজের ভাগ্যকে পৃথিবীর নিকৃষ্টতম ঠাওরে নিয়ে শনিবারের বারবেলার দিকে ক্রমাগত পায়চারি করছিল অভিজিৎ।এবং নির্মমভাবে ভগবানের মুণ্ডপাত (অবশ্যই যথাযথ শব্দ নিবন্ধ সমেত)!! একটা দুটো নীরব খাদ্য আন্দোলনও করে ফেলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, এমন সময় দরজা ধাক্কা। অভিজিৎ ধরেই নিয়েছিল সৌরভ এসেছে, চা সিগারেটের আমন্ত্রণ সমেত। লোকের যেমন মুদ্রাদোষ, নিদ্রাদোষ, স্বপ্নদোষ, সবজির দোষ (বিশেষ সবজিটির নাম করে ভাত-ডাল-আলুমাখা বাঙালির ভাবাবেগে আঘাত করতে চাই না) ইত্যাদি থাকে, সৌরভের তেমনি চা-সিগ্রেট দোষ! চাঁদিপুর যাবার সময় ট্রেন মিস হয়ে যাক, তবুও বাবুর চা-সিগ্রেট চাই; অথবা দুর্গাপুজোয় ঠাকুর দেখে সব মোটামুটি চিৎ কেলিয়ে গেছে তখনও রাত ২টোর সময় উনি ম্যাডক্স স্কোয়ারে বসলেন চা নিয়ে; এবং অদ্ভুত রকমভাবে গালুডিতে ওই ভরপেট মদ গিলে কি করে যে আবার নদীর ধারে বহেনজির দোকানে চা-সিগ্রেট খেতে গেল সে ওই ঈশ্বরই জানেন!

হ্যাঁ, তো ঘটনা যেখানে ছিল; অভিজিৎ ভেবেই নিয়েছিল সৌরভ হলে পত্রপাঠ বিদায় করবে আজ। আজ ইলিশ ছাড়া সব কিছুই অপার্থিব মনে হচ্ছে! মনের মধ্যে চূড়ান্ত ঘোঁতঘোঁতানি নিয়ে দরজাটা খুলতে গেল অভিজিৎ। দরজা খুলতেই শুরু হল এই গল্পের সবথেকে দুর্ভাগ্যজনক অধ্যায়। ছ’ ফিটের উপর সুঠাম চেহারাটা প্রায় গোটা দরজা জুড়ে দাঁড়িয়ে। লোকটার ধোপদুরস্ত জামাকাপড় দেখে বোঝার উপায় নেই আজকের দিনের জন্য বৃষ্টিঠাকুরের অভিধান থেকে দাঁড়ি, কমা ইত্যাদি লোপ পেয়েছে! বাড়ির উঠোনে পাশের শুভঙ্করদের পুকুর থেকে মা ল্যাটা তার কাচ্চা বাচ্ছা সমেত দিব্বি উঠে এসে জল বদল করছে (আমাদের ঋতুমাফিক হাওয়া বদলের মতোই আরকি); অথচ লোকটার প্যান্ট জুতো রহস্যজনকভাবে শুকনো! জল তো দূর অস্ত খানিক চন্দনমাফিক কাদাও লোকটার জুতোয় লেগে নেই! সরাৎ করে নিখুঁত সাহেবী কেতায় ডান হাতটা বাড়িয়ে দিল অভিজিতের দিকে, “হাই, আমি ঈশ্বর। ভিতরে আসতে পারি?”

অভিজিৎ-এর মনে হল কেউ বুঝি সম্মোহন করে তার থেকে সম্মতি আদায় করে নিল।

“হ্যাঁ, কিন্তু মানে আপনি আসছেন কোথা থেকে? আপনাকে তো ঠিক চিনলাম…”

“সেকি এতক্ষণ তো আমার সাথেই কথা হচ্ছিল তোমার!! আমার নামে এত্তো সব ন্যক্কারজনক কথা বলছিলে, যাতে শেষ অব্দি আত্মপক্ষ সমর্থনে আসতেই হল!! ডিরেক্ট ফ্রম ঊর্ধ্বলোক।” অভিজিৎ-এর কথা মাঝপথেই থামিয়ে দিয়ে বলল লোকটা।

“চ্যাংরামো হচ্ছে নাকি আমার সাথে? কি সব আল বাল বকছেন আপনি? বেরোন এক্ষুণি এখান থেকে!! নয়তো একটা ক্যালও বাইরে পড়বে না!!” ইলিশহারা খিঁচখিঁচে মেজাজটা আবার অভিজিৎকে শাসন করা শুরু করে।

“ছিঃ ছিঃ কী ভাষা তোমার ছোকরা!! বলছি সব বলছি; বসো আগে দেখি আমার সামনে শান্ত হয়ে। বসো বলছি!”

অভিজিৎ সচরাচর চেয়ারে বসে না; খাটে কিংবা সোফায় বিষ্ণু পোজে বসাটাই অতি প্রিয়। কিন্তু ওই যে সম্মোহন, আদেশমূলক সম্মোহন। অতঃপর অভিজিৎ অতি সুবোধ বালকের ন্যায় ঠাকুরদা আমলের ঐতিহাসিক চেয়ারের কোলে অসহায় আত্মসমর্পণ করল। ঈশ্বরের ইচ্ছেয়।

#৩

“এই বস্তুবাদ একটা গোটা জাতিকে গ্রাস করল। চাহিদার আগ্রাসনে এতদিনেও লাগাম পড়াতে শিখল না।”

লোকটার পকেটে কি ছুরি-চাকু কিছু আছে? চেহারা দেখে তো মনে হচ্ছে শারীরিক কসরত ভালোই করেন। লোকটার টিপ যদি অব্যর্থ হয়… তাহলে তো!! উহু এরম করে ঘাবড়ালে চলবে না। যেখানে বসে আছে অভিজিৎ সেখান থেকে রান্নাঘর ঠিক বারো পা। বাসনপত্রগুলো দিয়ে সাময়িক ঠেকনা দেওয়া যাবে। ক্লাবের গ্রুপটায় একটা হোয়াটস আপ করে রাখবে এই কথায় কথায়। হ্যাঁ মানে গ্রুপবাজি তো এখন আর অফিস, ক্লাব, ইউনিয়নে সীমাবদ্ধ নেই। এখন গ্রুপবাজির সবথেকে বড় ঠেক হল হোয়াটস আপ। অভিজিৎদের ক্লাব বলতে ওদেরই সব বন্ধুবান্ধব মিলে, ছেলেবেলা থেকে একসাথে বড় হওয়া। সৌরভ, সাহেব, শুভময়, কৃশানু, সুমন, রাজা ইত্যাদি। এরা দুটো জায়গায় গণতান্ত্রিক অধিকার জাহির করায় বিশ্বাসী, এক এই হোয়াটস আপ গ্রুপে, আরেক ভোট বাক্সে। তবে এই জবজবে ভেজা আবহাওয়াতে ল্যাদধর্মের স্বাভাবিক বিক্রিয়ায় এরা কতটা যে সক্রিয় আছে সে বিষয়ে অবশ্যই তর্ক হতে পারে। তবুও ওরা আসতে আসতে সামাল দিতে হবে। কিন্তু লোকটার কাছে যদি পিস্তল থাকে!

ইলিশের গরম ভাজা তেলটা হরিবোল, হরিবোল হট্টগোল করে অভিজিতের কানের পাশ দিয়ে নেমে গেল।

“নাও, এক এক করে বলো দেখি তোমার কি বলার আছে আমায়?”

শুধু প্রশ্নটা নয়, প্রশ্নর সমান্তরাল চাউনিটা অভিজিতের যাবতীয় রক্ষণ পরিকল্পনাকে মোটামুটি এদিকে না ঘেঁষার পরামর্শ দিয়ে গেল।

“না মানে আমার কী বলার আছে! আপনি কেন এসেছেন সেটা আপনিই বলুন।”

“বলার নেই মানে? এই যে এতক্ষণ ধরে আমার মুণ্ডপাত করছিলে… আত্মপক্ষ সমর্থনে আমায় তো আসতেই হত।”

“দেখুন আমার এমনিতেই মন মেজাজ ভালো নেই। আপনার কী বলার আছে আপনি বলে আসতে পারেন।”

“তুমি আগে বলো তো তুমি সব কিছুতেই আমার দোষ ধরো কেন? তোমার কী মনে হয় তোমার কোনও ভুল নেই?”

“ইলিশ মাছ, হ্যাঁ আজ দুপুরে ভেবেছিলাম ইলিশ মাছের ভাপা আর তেল দিয়েই ভাতটা খাব। কয়েকদিন ধরেই দেখে আসছি ইলিশ সস্তা। সকাল সকাল বাজার যাব বলে সব ঠিক। এর মধ্যে দুম করে এরম বৃষ্টি! আমাদের পাড়ায় কোনওদিন এরম জল জমেনি! আমার সাথেই এরম হয়। যা ভাবি তা কিচ্ছুটি করতে পারি না। ঠিক পণ্ড হবেই হবে।”

“তামিলনাড়ুতে কতজন হা-ভাতের ব্যাটা মরেছে জানা আছে? দেশে কটা জায়গায় খরা হয়েছে জানা আছে? নাকি ফেসবুকে খালি কচি কচি পেটি দেখে বেড়ানো হয়?”

“খরা যেখানে হচ্ছে সেখানে হোক না বৃষ্টি, এখানে এই অতিবৃষ্টিতে কত অসুবিধা বলুন তো! এখানে এত বৃষ্টি না হলে কী সমস্যাটাই বা হত!”

“হ্যাঁ , সমস্যা কিছুই হত না। খালি দিল্লীর ওই ল্যাংটো মিছিলে এই ধরো বাঁকুড়া, পুরুলিয়া এসব জায়গারও কিছু মুখ দেখা যেত।”

“আচ্ছা ইলিশের মধ্যে খরা কী করে এল!”

“প্রসঙ্গ তো তুমিই তুললে তোমার পণ্ড কপালের কথা বলে! আমি শুধু আমার দিক থেকে বললাম…”

পণ্ড কপাল তো বটেই। এই যেমন গত মার্চের কথা। সংযুক্তা আর ও অনেক কসরত করে ফন্দি এঁটেছিল। অলিপাবের শয়তানি আলোয় বিফ আর বিয়ারের সংমিশ্রণে বা সহচর্যে মস্তিষ্কের ঘিলুগুলো একটু বেশিই সক্রিয় হয়ে উঠেছিল সংযুক্তার। দু’জনের ঘুরতে যাবার প্ল্যান। একদিনের জন্য। সংযুক্তার বাড়ির ‘ঈগলচক্ষু’ শাসনকে ফাঁকি দেবার মতো প্ল্যান। তারিখ, গাড়ি, হোটেল এমনকি সারপ্রাইজের কেকটা অব্দি যখন বুক করা হয়ে গেছে, সংযুক্তার আরেক প্রেমিক উদয় হল। সমকামীয় আনন্দে একটি স্ত্রী এডিস ভালোবাসার চিহ্ন রেখে গেল সংযুক্তার শরীরে। অভিজিতের কপালে ডেঙ্গির লেঙ্গি। তখন অবশ্য ডেঙ্গিটা ডেঙ্গিই ছিল, চাকরি বাঁচাতে ছদ্মনাম ধারণ করেনি।

“ডেঙ্গুটা কিন্তু ওদের পাড়ায় খুব বেশি হচ্ছিল। তুমি সাবধানও করেছিলে। কিন্তু মশারি তো আর বেনারসী শাড়ি নয় যে পাট করে গুছিয়ে তুলে রাখবে! অতএব…”

অভিজিৎ প্রাণপণ চেষ্টা করছিল মাথাটা পুরো খালি করে দেবার। ভাবনাচিন্তার গায়ে কি ফেরোমন থাকে? অথবা কোনও অতিজাগতিক রশ্মি। নয়তো লোকটা নাগাল কী করে পাচ্ছে!

“কিন্তু সংযুক্তাকে দেখতে গিয়ে ইলিশের গাদাটা তো দিব্বি সাঁটিয়েছিলে। কী যেন ভাবছিলে, ‘জবার ঘাম ডোবানো খাঁজের মতই চকচকে নাকি!’ ইলিশের কাঁটা গলায় ফেঁসে গেলে কি হয় জানো তো?”

আচ্ছা লোকটা তাহলে ব্ল্যাকমেল করতে এসেছে। একটু একটু করে খাপ খুলছে।

জবা। জবার বয়স উনিশ। তালদি থেকে কাজ করতে আসে ওদের বাড়ি। সোমত্থ মেয়ে। শনি-রবি করে বেশ সকাল সকাল কাজে আসে। অভিজিৎ অনেক সময় ঘুম থেকে ওঠার আগেই ওর ঘর-দোর মুছতে ঢুকে পড়ে জবা। উবুর হয়ে ঘর মুছতে মুছতে জবার বক্ষ বিভাজিকা প্রকট হয়ে ওঠে। কখনও মনে হয় পাহাড়ি উপত্যকার মতোই নির্জন অথচ সুন্দর, কিংবা সিমলিপালের জঙ্গল, গভীর, মায়াময়। কিন্তু কোনওদিন তো ও কোনও খারাপ ইঙ্গিত করেনি জবাকে, কোনও খারাপ প্রস্তাবও দেয়নি। কেতুরমাখা ঘুম চোখে বাসি স্বপ্নের মতোই দেখত জবাকে। জবা কোনওদিন টের পেয়েছে বলে তো মনে হয় না! তবে এই লোকটা কি করে…

“দেখুন আপনি অনধিকার চর্চা করছেন! ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করার কোনও অধিকার আপনার নেই!” অভিজিৎকে কিছু একটা জবাব দিতেই হত, কাঁটা গলায় ফোঁটার আগে।

“ব্যক্তিস্বাধীনতা!! মাংসটা গরুর খাব না পাঁঠার সেটা ঠিক করে দেওয়াটাই কী ব্যক্তিস্বাধীনতা? নাকি পিঠ, বুক, কোমর, পাছা সুতোয় জোর করে ঢেকে দেওয়াটা ব্যক্তিস্বাধীনতা?”

“দেখুন আপনি কিন্তু প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাচ্ছেন! আপনার পরিসরের সীমানা পার করে যাচ্ছেন আপনি!”

“পরিসর আর সীমানা, এই দুটোর তোয়াক্কা করতে কবে শিখল এই জাতি? ঔপনিবেশিক ব্যবস্থা যে জাতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে, তাঁদের মুখে ঠিক সীমানা ব্যাপারটা শোভা পায় না। দখলদারি তোমাদের অভ্যাস, এটা তো মানো?”

“দেখুন এসব ইতিহাসে আমি বিন্দুমাত্র আগ্রহী নই…”

“তা কেন হবে, তোমাদের ইতিহাস তো রাম আর বাবরেই সীমাবদ্ধ! তোমরা তো ইতিহাসের মূল্যায়ন করবে পারমাণবিক যোগ্যতায়, তাই না?”

“এসব পরমাণু-ফানু ভাবার জন্য অনেক বড় বড় নেতা-আমলা আছে বুঝলেন। সাধারণ মানুষের খেয়েদেয়ে কি কাজ নেই যে বসে বসে এসব ভাববে!”

“প্রজা যা ভাববে, রাজাকে সেটাই ভাবতে হবে। রাজার ভাবনা প্রজার ঘরে ঢুকিয়ে দিলে টাকার লাইনে মর্গের দখলদারি বাড়বে।”

“দেখুন এই রাজা, প্রজা, রাজত্ব এসব আমরা এত ভাবি না। আমরা নিজেদের মতামতটা স্বাধীন, নিরপেক্ষভাবে যাপন করতে পারলেই খুশি।”

“তা তুমি বা তোমার মতো নব্য বিশ্বকর্মারা যে গোয়ালে গতরের চর্বি বাড়িয়ে ঘিলুর চচ্চড়ি কর, সেখানে যখন তোমাদের জবাই হয় তখন নিজের স্বাধীন ন্যাজটি নাড়াতে পারো তো? নাকি মধ্যবর্তী ব্যবস্থার হাত ধরে তুমিও কোনও এক আফগানিস্তান বা ইরাক হয়ে যাও?”

“কর্তৃপক্ষ কোনও ভুল করলে আমরা জোটবদ্ধভাবে তার প্রতিবাদ করি। অধিকারের প্রশ্নে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে আমরা আপস করি না।”

আদৌ কি তাই? অভিজিৎ কথাটা বলেই চুপ করে গেল। বেশিদিন হয়নি, মাস দুয়েক আগেই কলকাতা ব্রাঞ্চ থেকে সত্তর জন ছাঁটাই হল। সত্তরটা লোক একদিন সকালে অফিসে এসে মেল বক্স খুলে দেখে একটা জরুরি মেল এসেছে। তাতে সবথেকে জরুরি কথাটি লেখা আছে যে সেই মুহূর্ত থেকে সে বেকার। উন্নয়নের দিকে পা মিলিয়ে চলার ক্ষমতা নাকি তাঁরা হারিয়েছেন। তাই তাঁদের মূল্যায়ন কোম্পানির খাতার লজ্জা বাড়ায়নি। অতএব, নূন্যতম ক্ষতিপূরণের ললিপপ চুষিয়ে, আউট। উহুঁ এখানেই শেষ নয়, অভিজিৎ-এর উত্তরটার সমুচিত জবাবদিহি তখনও বাকি ছিল। ঈশ্বর দেবেন।

“প্রতিবাদ? তোমরা হেড-ঘুগনি খেয়ে, মোমবাতি নিয়ে রাস্তা-ঘাটে মোচ্ছব করলে সেটা প্রতিবাদ, অধিকারের লড়াই। আর কাশ্মীর করলেই সেটা জিহাদ!!”

আচ্ছা, ইলিশ প্রাপ্তির জন্যে তাঁর ভাবনাচিন্তাটাও কি জিহাদ? চাহিদার আঁতুরঘরেই কি জিহাদ জন্ম নেয়? নাকি জিহাদ রাষ্ট্রের ঔপনিবেশিক স্বার্থে তৈরি এক বস্তুতান্ত্রিক শব্দ? নাকি শাসনযন্ত্রের ক্রমাগত অপব্যবহারে জমতে থাকা প্রতিবাদের নাম জিহাদ?

না না এসব ফালতু কথা। সে সাধারণ মানুষ। দিব্বি ইলিশ জোগাড় করার মতলব আঁটছিল। কোত্থেকে এসব হাবিজাবি চলে এল মনে!

অভিজিৎ টের পেল কিরম একটা অস্বস্তি হচ্ছে। পায়ের তলাটা কিরম ঠাণ্ডা লাগছে, পিছলে যেতে লাগল। অভিজিৎ নিচে তাকানোর সাহস পেল না। সারা মেঝে তখন ইলিশে ভরে গেছে। কোরিয়া, চীন, জাপান, আমেরিকা, সিরিয়া, প্যালেস্টাইন, মায়ানমার, গঙ্গা, পদ্মা হয়ে সব ঝাঁকে ঝাঁকে আসছে। অভিজিৎ চমকে গেল। ঈশ্বরের চেয়ারটা ফাঁকা। শুধু একটা ইলিশের কাঁটা পড়ে।

About Char Number Platform 46 Articles

ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*