আমরা কী কী বলতে পারি : একটি বই ও কয়েকটি কথোপকথন

সমতা বিশ্বাস

 

জাগরনট বুকস বিশাল নামী পুস্তক প্রকাশন সংস্থা না হলেও তাদের উপস্থিতি নিতান্ত নগণ্য নয়। তবে বইয়ের শেষ দশ পাতা জুড়ে তাদের নিজেদের বিজ্ঞাপন, সংগ্রহবস্তু হিসেবে এই বইয়ের আকর্ষণ কিছুটা হলেও জোলো করে দেয়। কিন্তু শেষ দশ পাতার ব্যর্থতা কেউ যদি ভুলে যেতে চান, তাকে খুব বেশি কষ্ট করতে হবে না, কারণ গ্রন্থের আলোচনায় ঢোকার আগে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করবেই গাঢ় কালো রঙের প্রচ্ছদ, যেখানে বইয়ের নামের থেকে লেখকদের নামের আকার বড় — ঘন কালো থেকে ধূসর, ধূসর থেকে সাদা পৃষ্ঠা বিন্যাস, উঁচুমানের একাধিক সাদা কালো ছবি, ও প্রতি পাতার ডানদিকে এক ইঞ্চি-রও বেশি চওড়া মার্জিন। মাঝে মাঝে পাতা জুড়ে আছে উদ্ধৃতি, যা লেখকদের কথোপকথনের অংশবিশেষ বা অন্য কোনও বড় উদ্ধৃতি থেকে তুলে আনা। Font-এর আকার বিভিন্ন, প্রত্যেকটি রচনার প্রথম পাতার Font Size পরের পাতাগুলির দ্বিগুণ। পড়তে পড়তে মনে হল এমন সৃজনশীল গ্রন্থবিন্যাস যথাযথ ও প্রাসঙ্গিক।

‘থিংগস দ্যাট ক্যান অ্যান্ড ক্যান নট বি সেড’
লেখক — অরুন্ধতী রায়, জন কিউস্যাক
প্রকাশক — জাগরনট
প্রথম প্রকাশ — ২০১৬
পৃষ্ঠা সংখ্যা — ১১৯
মূল্য — ২৫০ টাকা

প্রাসঙ্গিক, কারণ বইয়ের প্রাথমিক বক্তব্য হচ্ছে রাষ্ট্র নামক metanarrative-এর উদ্দেশ্যে প্রতিরোধ গড়ে তোলা, তাকে প্রশ্নের সম্মুখীন করা, তার প্রতি অত্যন্ত জরুরি সন্দেহকে বার বার প্রকাশ করা। ‘Whistle blower’ হিসেবে ড্যানিয়েল এলসবার্গ ও এডওয়ার্ড স্নোডেন তা করেছেন, অরুন্ধতী রায় ও জন কিউস্যাক তা করেছেন তাঁদের সমাজ সচেতন আন্দোলনের মাধ্যমে। এরকম একটি বই যদি প্রথাগত বইয়ের মতো নিজের artifice-কে ঢেকে রাখত, তাহলে কি তার প্রাসঙ্গিকতা একটু কমে যেত না?

অবশ্য আমার নিন্দুক সত্তা মনে করেছে, যে সাক্ষাৎকারের বেশিরভাগটাই Internet-এই পাওয়া যায়, তাকে আবার কাগজের বই হিসেবে ছাপানোর কী প্রয়োজন? তবে বইটির নেপথ্যে যদিও রায়, কিউস্যাক, ও স্নোডেনের কথোপকথন, বইয়ের মধ্যে আছে পাঁচটি আলাদা আলাদা প্রবন্ধ (প্রবন্ধ শব্দটা অবশ্য অন্য কোনও শব্দের অনুপস্থিতিতে ব্যবহৃত), যা তথ্য, ইতিহাস, তত্ত্ব ও তাদের ঘিরে চলতে থাকা আলোচনার এক উত্তেজক সংমিশ্রণ।

পড়তে পড়তে বেশ কয়েকবার মনে হল, এ তো আমি জানি। তাও, এলসবার্গ, কিউসাক, ও রায়ের কথোপকথনের বেশ কিছু অংশ, বিশেষত রায়ের ‘এক বাক্যে প্রকাশ’ (যদি এটাই হয়, One Liner-এর বঙ্গানুবাদ) বারবার তাঁদের রাজনৈতিক চেতনার তীক্ষ্ণতা ও বারবার ব্যবহারে শক্তিশালী rhetoric-এর ফাঁপা খোলসকে চোখের সামনে নিয়ে আসছিল। কিছু উদাহরণ দেওয়া যাক:

AR: Nonviolence is radical political theater.
JC: Effective only when there is an audience… (p.53)

AR: I mean what’s a country? It’s just an administrative unit, a glorified municipality… I can’t bow down to a municipality. (p.77)

এই দ্বিতীয় বিষয়টাকেই এই বইয়ের মূল Paradox বলা যেতে পারে। অরুন্ধতী রায়ের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে তিনি রাষ্ট্র ও আনুষঙ্গিককে শোষণ ও নিপীড়নের যন্ত্র হিসাবেই দেখেন। আমেরিকা ষাটের দশকে ও নতুন শতাব্দীতে জাতীয়তাবাদের নামে যেভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে, তার বিরুদ্ধে নৈতিক প্রতিবাদ এলসবার্গ ও স্নোডেন-এর। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, এলসবার্গ ও স্নোডেন রাষ্ট্রে বিশ্বাস করেন না। কথোপকথনের শেষে, স্নোডেন চলে যাবার পর, আমেরিকার বর্তমান পরিস্থিতি এলসবার্গ-এর চোখে জল এনে দেয়। স্নোডেন মার্কিন পতাকা জড়িয়ে ধরে ছবি তোলেন, মার্কিন সরকার নয়, জনগণের জন্য কাজ করার কথা Twitter-এ বলেন।

তাহলে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের প্রতি কর্তব্যে অপারগ বলেই কি এলসবার্গ ও স্নোডেন-এর প্রতিবাদ? ষাটের দশক থেকে মানবাধিকার রক্ষায় এলসবার্গ এক প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব, সুযোগ পেলে স্নোডেনও নিশ্চয়ই বর্তমানের থেকেও বড় কাজ করবেন। কিন্তু রাষ্ট্রের প্রতি বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের সংযোগস্থলে দাঁড়িয়েও দু’রকমের মানুষই পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে, নাগরিক অধিকারের সমর্থনে সোচ্চার।

বইটার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান হল, সামান্য কয়েক শব্দে মানবাধিকার (human rights) ও ন্যায় (justice)-এর মধ্যে দরকারি পার্থক্যের কথা বলা। মানবাধিকারের আন্দোলন মানুষের ন্যূনতম প্রাপ্তির দিকটা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা করেন, কিউস্যাক-এর ভাষায় মানবাধিকার আন্দোলন ‘pacifier’-এর কাজ করে, ন্যায়ের জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক কল্পনার ফাঁকফোকর বোজানোই তার কাজ। কারণ ন্যায়ের দাবী আরও বড় এক দাবী, সে চায় বর্তমান সমাজব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন। ন্যায় নিশ্চিত করার জন্য যে আন্দোলনের, আন্দোলনগুলির প্রয়োজন, তার ক্রমশ সঙ্কুচিত জায়গায় বিচরণ করে এই বইটি।

বইটির ভাষা সুখপাঠ্য। লেখার প্রত্যেকটি পরিচিত ও অপরিচিত বিষয়ে বিশদে নোটস দেওয়া আছে (শুধুমাত্র এডওয়ার্ড স্নোডেন ঠিক কী করেছিলেন, তা একবারও ব্যাখ্যা করে বলা হয় না। হয়তো আশা, পাঠক জানেন যে, স্নোডেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সির অনেক তথ্য ফাঁস করে দিয়েছিলেন, যা বিশ্বব্যাপী নানারকমের নজরদারি ব্যবস্থাকে প্রকাশ্যে এনে দেয়।) অনেকগুলো সাদা কালো ছবি বইটিকে সমৃদ্ধ করেছে। বইটা কিনবেন কি কিনবেন না, পাঠকের সিদ্ধান্ত, কিন্তু বিদগ্ধ ও শিক্ষানবিশ, দু’রকমের পাঠকেরই এটি একবার পড়ে দেখা প্রয়োজন।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 899 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*