‘নানারকম সংস্কারগুলোকে অ্যালিয়েনেট করে বাঁচতে গেলে জীবনের কোনও সৌন্দর্য থাকে না’ : প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাক্ষাৎকার

সার্থক রায়চৌধুরী

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

 

প্রশ্ন: আনন্দ ভিখিরির পাঠ অভিজ্ঞতা থেকে অনেকের মনে হয়েছে যে আনন্দ ভিখিরি আর সন্দীপন বাবুর ‘এখন আমার কোনও অসুখ নেই’-এর মধ্যে কি কোনও সম্পর্ক টানা চলে?

উত্তর: আসলে কবিতা আর গদ্যের মধ্যে তুলনা করা খুবই মুশকিল ব্যাপার।

প্রশ্ন: আমি নামের প্রতি ইঙ্গিত করছি।

উত্তর: আমি বলব না যে অসুখ আমার নেই, কেননা এই ভিখিরিপনাটা তো রয়েই গেছে। ‘বালি ও তরমুজ’ থেকেই এই ভিখিরিপনাটার কথা কিন্তু ক্রমাগত চলছে। ‘উন্মেষ গোধূলি’-তেও একই আছে যে ‘কিসের উন্মেষ চাও? উদ্ঘাটন?’ তো সেইটা হয়ত চিহ্নিত হয়েছে যে, খোঁজটা হল আনন্দের, কিন্তু ভিখিরিপনাটা তো রয়েই গেছে। এইটাকে আমি এইজন্য বলব যে, এই বইটি উল্লেখযোগ্য আমার নিজের লেখার জীবনে, কারণ আমি স্পষ্ট করে বলতে পেরেছি খোঁজটা আসলে আনন্দের।

প্রশ্ন: ‘আনন্দ ভিখিরি’ কাব্যগ্রন্থের প্রবেশিকাটি বা মূলগ্রন্থ শুরু হওয়ার আগের রচনাটি সমস্ত গ্রন্থের বাকি লেখাগুলোকে কি দিকনির্দেশ করে? নাকি এর কোনও অন্য তাৎপর্য আছে?

উত্তর: হ্যাঁ, দিকনির্দেশ করা তো নিশ্চয়ই। পাঠককে একটু তৈরি থাকতে বলা আর কি! সতর্ক করে দেওয়া যে, ‘বাড়িতে লেগেছে মিস্তিরি’। কনস্ট্রাকশন সাইটে ‘কশান’ বোর্ড টাঙানো হয় না! তেমনই এই কাব্যগ্রন্থের রচয়িতার একটা ভাঙাগড়া চলছে। সাবধানে এগোন! আবার খুব শান্ত হয়ে এগোন। গ্রন্থ শুরুর আগেই তিনটি লাইনে বলা। ‘চন্দ্রনাড়ী সূর্যনাড়ী, মন্দ্রনাড়ী তূর্যনাড়ী, সাম্যময়ী নমঃ।’ আসলে আমরা যখন খুব শান্ত হয়ে যাই তখন ইড়া ও পিঙ্গলা, মানে নামান্তরে চন্দ্র ও সূর্যনাড়ির একটা সাম্য হয়ে মধ্যনাড়ি ক্রিয়াশীল হয়, শরীরের মূলধার থেকে উষ্ণীষ পর্যন্ত, আলম্ব। ওই মধ্যক্রিয় শান্তিই শক্তির স্বরূপ। তাই প্রথমেই তাঁকে সাম্যময়ী বলে প্রণাম জানিয়েছি। আবার দেখো, যে জার্নিটা আমার প্রথমাবধি চলছে, ‘ক্রমপলায়নচিহ্ন’, ‘উন্মেষ গোধূলি’ নাম-কবিতা ইত্যাদি ফুটপ্রিন্ট পাবে, যেটা ‘উত্তর কলকাতার কবিতা’-র প্রথম কবিতাটায় স্পষ্টতর হয়েছে, ‘সাঁতারই না জানলুম আমি পড়লুম নেমে জল। বাঁচাবেন হে গুরুমুর্শিদ হাজির অকুস্থল, অকুস্থলে ক্রিয়া করেন সূর্য্যি এবং চাঁদ, দুইজন মিলে যুক্তি করলে আশ্চর্য আহ্লাদ’ — আনন্দ ভিখিরির উৎসর্গ কবিতাটি তারই একটি চলমানতা। অকুস্থলে যেন সূর্য্যি এবং চাঁদ মিলে যুক্তি করে ক্রিয়া করেন। এই ক্রিয়াতেই শান্তভাব। যেন শান্ত হই! যেন শান্ত করি সকলকে! এই প্রার্থনা। এই প্রার্থনা করেই প্রণাম জানিয়েছি। গ্রন্থের প্রাক্কালে, আনন্দভিখিরি আমরা।

প্রশ্ন: প্রেমের বসতি কি মানুষের নাগালের বাইরে? প্লাবনের বাইরে শান্ত ডাঙাটিতেও তাকে পাওয়া যাচ্ছে না কেন? (‘আনন্দ ভিখিরি’ কাব্যগ্রন্থের ‘প্রেমের বসতি’ প্রসঙ্গে)

উত্তর: না, না, নাগালের মধ্যেই তো। তিন জলভাগে প্রেমেরই তো উথালপাতাল! তিন জলভাগ — জগৎ, জীব, সর্বকারণ। এ পর্যন্ত তো প্রেমেরই খেলা! চতুর্থ তুরীয় পাদে, যাকে ভাবলাম ডাঙা, প্রেমজলধির শেষ, ভাবলাম যেখানে চৈতন্য অদ্বৈত, নির্বিশেষ, সেখানে ঠাঁই নিয়েও যে দেখি নিস্তার নেই। ওরে বাবা! সেখানেও তো দ্বৈত! সেখানেও প্রেমের আকুতি। এটা একধারার ভক্তিপথিকের অনুভব ও উচ্চারণ। তাঁর প্রেম কিছুতেই ঘোচে না, দ্বৈত ঘোচে না, বিশেষ ঘোচে না। পার্থিব থেকে শুরু করে পরমেও ব্যাপ্ত হয়ে আছে প্রেম। বা পরমপ্রেমই সর্বত্র ব্যাপ্ত হয়ে আছে — এইটা দেখা। আমি উপলব্ধি করেছি। ‘আনন্দ ভিখিরি’-তে এরকম বহু ধারাকে সরাসরি উপলব্ধি করে দেখা — গৌড়ীয়, বৌদ্ধ, সহজিয়া, বেদন্তী, সাংখ্য, শাক্ত, সুফি, খ্রিস্টীয়-মিস্টিক, যোগীয়, আধুনিক, উত্তর-আধুনিক — ভিখিরি ব্যাটা left stone unturned। এরকমই হয়। তারপর সবের শেষের সেই-ই আনন্দ। তবে হ্যাঁ, কেউ এভাবেও করে, কেউ আবার একটিভাবেই কম্মো শেষ করে। যাঁর যেমন! কি মজা!

প্রশ্ন: উত্তর কলকাতা থেকে মানুষ ক্রমশ আরও উত্তরের দিকে সরে যায়… প্রশ্নে আর কখনও ফেরে না — এটি অনুধাবন না অভিজ্ঞতা? (আনন্দ ভিখিরি, — ‘উত্তর কোলকাতাত্তর’ কবিতা)।

উত্তর: উত্তর কলকাতার কবিতায় আমার যে উদ্ভাস হয়েছিল তা ক্রমশ সব সংশয় থেকে উত্তরণ ঘটায়। প্রশ্ন মানে সংশয়। উত্তর মানে শুধু ভৌগোলিক নর্থ নয়, উত্তরণও বটে। ‘প্রশ্নে আর কখনও ফেরে না’ মানে ‘ভিদ্যতে হৃদয়গ্রন্থিশ্ছিদন্তে সর্বসংশয়াঃ’। একবার উদ্ভাস হলে ক্রমে উত্তরণের পথে যাওয়াটাই স্বাভাবিক, সংশয়ের মধ্যে আর না পড়াটাই স্বাভাবিক — এটাই বলতে চেয়েছি, যা আমার অভিজ্ঞতা। তবে আমি ঠিকঠাক যেতে পেরেছি কিনা আলাদা প্রশ্ন।

প্রশ্ন: ‘আনন্দ ভিখিরি হয়ে যাব একদিন’ — এই উচ্চারণ কি নিছক প্রেমের? আবেগের? মুক্তির?

উত্তর: আবেগের উচ্চারণ। প্রেম আর মুক্তি তো একই কথা। এটা সেই প্রেম ও মুক্তিতে গত আবেগের উচ্চারণ।

প্রশ্ন: ‘হে গভীর প্রাণচিহ্ন… লোকে অলোকে’ — এই উচ্চারণের বিস্তার কি শুধু প্রাণীজগতে সীমাবদ্ধ নাকি সে অন্য আরও কিছুকে নির্দেশ করে? (আনন্দ ভিখিরি ‘শ্রাবণ ছাড়া’)

উত্তর: না, যখন ‘অলোকে’ বলা হচ্ছে তখন তো প্রাণচিহ্ন যে কোথাও সীমাবদ্ধ নয় সেটাই বলা হচ্ছে। চৈতন্য সর্বত্র অনুস্যূত। এই বলা হয়। চৈতন্য নিজে নিজেতে অ-লোক। আর যাতে অনুস্যূত, তা লোক। আমাতে তার অনুভব আমার মনে হয়েছে, বেদনা যেন। যেন বা শ্রাবণ দিন। তাই আমাকে ঘিরে থাকা আত্মবৎ প্রিয়দের আমি দুঃখ, বেদনা, শ্রাবণ ছাড়া কিছু দিতে পারব না। আবার এই বেদনা আনন্দও বটে। ‘এ বারতা’ তাই ‘ছন্দে নাচে’। নইলে বেদনাকথা তো এমন উচ্ছল ছন্দে লেখা যেত না।

প্রশ্ন: যে নৈঃশব্দ্যকে দাঁড়ি কমা সমেত পাঠ করতে চান তা কি শুধু মানুষের হুল্লোড়ের পর জেগে ওঠে? (আনন্দ ভিখিরি — বিষাদে সম্বিতে ফিরি)।

উত্তর: খুব সুন্দর প্রশ্ন করেছ তো! বেশ আত্মশ্লাঘা বোধ করছি এইটা দেখে যে, যদি কিছু বলতে চাওয়া হয়ে থাকে আনন্দ ভিখিরি-তে, ধীরে ধীরে পৌঁছেছে। বইটা যখন বেরিয়েছিল খুব কম লোকই ভালো-মন্দ দু’কথা খরচ করেছিল। আমার সম্বন্ধে সবার চোখই যেন ‘উত্তর কলকাতার কবিতা’-তে আচ্ছন্ন হয়ে আছে। স্বাভাবিক হয়ত। সময় লাগে, উ. কো. ক পার হতে, আনন্দ ভিখিরি-কে আ্যকসেস দিতে। তা যাক, তোমার দারুণ জিজ্ঞাসাটির উত্তরে বলি: দেখো, এখানে যে নৈঃশব্দ্য উল্লেখিত হয়েছে, তা বোঝাই যাচ্ছে যে পঠিতব্য বস্তু। দাঁড়ি, কমা সমেত তাকে পাঠ করার কথা বলা হচ্ছে। তো, শব্দ মানে এখানে আওয়াজ মাত্র নয়। বরং বাচ্য-বাচক সম্বন্ধযুক্ত ভাষিক শব্দের কথাই বলা হচ্ছে। নৈঃশব্দ্য এখানে নির্ভাষসত্তা নয়, ‘অশব্দম’। ফলে হুল্লোড় মানে শুধু নয়েজ নয়, অহংসর্বস্ব মনোবাক। কবিতাটাতে আছে, ‘উচ্চকিত মদের আসর’। মদ মানে দম্ভ, গর্বোন্মত্ততা। ছয় রিপুর এক। উচ্চকিত মদের আসর মানে গর্বিত মনোবাক্যের কাল। হ্যাঁ, এটা নিশ্চিতভাবেই মানুষী ব্যাপার। আর কোনও প্রাণীর নয়, নিসর্গেরও নয়। এদের ধ্বনিও তো বস্তুত পঠিতব্যই বটে! উচ্চকিত মদের আসর শেষ না হলে আমি নিসর্গ থেকে ‘অশব্দম’ পর্যন্ত সে পূর্ণসত্তাকে উপলব্ধি করব কিভাবে! আর কবিতায় যে ‘বিষাদ’ শব্দটি ব্যবহার হয়েছে তা ওই গর্বিত মনোবাক্যের কালটির প্রতি বৈরাগ্য।

প্রশ্ন: প্রেমের বসতি, প্রেমময়, বা রে মনুয়া কবিতার ভাষা কি প্রেমের কারণেই অন্যদের থেকে পৃথক?

উত্তর: হ্যাঁ, যেমন যেমন অনুভব… অনুভবের যে ভাষা-আধারিত বীজরূপটা… কবিতায় সেই ভাষা-আবহটারই বিস্তার হয়ে চলতে থাকে।

প্রশ্ন: ‘শূন্যতাবোধের গর্ভে গল্প হয়ে শূন্য জন্মালেন… তারপর কেবলই গল্পের জন্ম কেবলই গল্পের মৃত্যু কেবলই গল্পের…’ জীবন কি ক্রমান্বয়ে গল্পযাপন? মৃত্যু কি পুনর্বার শূন্যতায় ফেরা? (শূন্য)

উত্তর: হ্যাঁ, জীবন ক্রমান্বয়ে গল্পযাপন। মৃত্যুও তার মধ্যেই পড়ে। মৃত্যুও একটা গল্প। মৃত্যু শূন্যতায় ফেরা নয়। শূন্যতা গল্পের নির্বাণ। শূন্য ও করুণার এক ও অবিনাভাব সত্তায় অবস্থানই নির্বাণ।

প্রশ্ন: ‘আনন্দ ভিখিরি’ কাব্যগ্রন্থে একটা সাংসারিকতার প্রতি, এই পাওয়া-সর্বস্ব জীবনের প্রতি (ধরে নিচ্ছি) শ্লেষ, সন্দেহ, ঘৃণা চোখে পড়ে। একটা মুক্তির চেষ্টা, বেরিয়ে পড়া, জটিল জীবন থেকে নামরূপের বাইরে সহজতর হৃদয়বৃত্তির দিকে — আমি কি ঠিক বলছি?

উত্তর: একদমই ঠিক বলছ। কী করে বললে! আমার আনন্দ হচ্ছে। বোধিত হওয়ার, যুক্ত হওয়ার আনন্দ। এটা একটা বিরাট জিনিস।

প্রশ্ন: ‘চোঙ্গা ও নিশান’ ১, ২ থেকে ‘বিপ্লব’, ‘ফেকলু অভিনেতা’ হয়ে ‘সাম্যবাদ’ লেখাটিতে এসে পৌঁছলে কবিরও যে একটা রাজনৈতিক বা সামাজিক মতামত আছে এটা তো স্পষ্ট হয় — এই লেখাগুলির ক্ষেত্রে আ্যনালিটিক্যাল ক্রিটিসিজম ছাড়াও আপনার নিজস্ব রাজনীতির প্রভাব রয়েছে কি?

উত্তর: এটা আবার একটা কঠিন প্রশ্ন করলে। কী বলি বলো তো! না, ‘ফেকলু অভিনেতা’ বা ‘সাম্যবাদ’ অন্য অনুভবের লেখা। তবে ‘চোঙ্গা ও নিশান’ ১, ২ ও ‘বিপ্লব’ অবশ্যই তোমার প্রশ্নের লক্ষ্যমুখ। রাজনীতির কোর-এর মধ্যে একটা দ্বিচারিতার ব্যাপার আছে। তার গভীর অন্তঃস্থলে। যে বোধ তার গভীরে নেমে সেটাকে ছুঁতে পারে, সেই বোধ থেকেই এই লেখাগুলো লেখা। এখন এই বোধটাকেই আবার যদি রাজনৈতিক বোধই বলা হয়, নিজস্বই হোক বা পরস্ব, সেটা, মানে এই বলাটা কী করে দাঁড়ায় আমি জানি না। বরং আমি এই রকম বলতে চাইব যে, এই বোধটা রাজনীতি-অনুশীলনের ভেতর থেকেই তৈরি হওয়া একটা মেটা-রাজনৈতিক বোধ।

প্রশ্ন: চিলেকোঠা, সংবাদপত্রের ছায়া (২য় কিস্তি), কল্পনা ফ্যাক্টরি এই কবিতাগুলিকে যদি পর পর রাখি তাহলে এই সময়কার কবিতা সম্পর্কে কি আপনার হতাশা ধরা পড়ছে এই সময়কার সার্বিক চিন্তাভাবনা সম্বন্ধে?

উত্তর: ওই আর কি! একটা হালকা রিফ্লেকশন। চিলেকোঠা, কল্পনা ফ্যাক্টরি লেখা দুটোর অন্য মাত্রাও আছে মনে হয়। সংবাদপত্র লেখাটায় আক্ষেপটা স্পষ্টতর, যেন তার ছায়ায়, তার অস্থিরতায়, তার নৈতিক প্যাঁচপয়জারে আমাদের লেখালেখি হয়ে চলেছে। আবার সেটা থেকে বাঁচতে গিয়ে ব্যাপারগুলো এত আ্যবস্ট্রাক্টেড হয়ে যাচ্ছে, তারও হদ্দমুদ্দ পাওয়া যায় না। আসলে পুরনো কালের সরল অনেক কবিতার জোর বহু সময়ে খুব টান মারে। ওরকম না লিখতে পারার জন্য একটা আক্ষেপ হয়। অবশ্য এটা আধুনিকতারই সমস্যা।

প্রশ্ন: যেমন একটা কবিতা আমার স্পষ্টতই মনে পড়ছে, খুব অদ্ভুত লেগেছিল, ‘নোংরায় প্রকাশ’। মানে সুন্দর ও অসুন্দরের ওই সন্ধানটা, ‘কোথা থেকে কাকে খেদাচ্ছ আর কোথা তুমি ভেসে উঠবে বুঝতে পারছ না।’ এবার আর একটা জিনিস একটু জিজ্ঞেস করি; একদম শেষ যে বইটা, ‘গুপ্ত দাম্পত্য কথা’, আমার পড়তে গিয়ে মনে হয়েছে, এটা একটা উপন্যাস নয় কেন? এ তো দারুণ উপন্যাস হতে পারত; আবার মনে হয়েছে, উপন্যাসই বা হবে কেন? কবিতা হবে নাই বা কেন? এই দোলাচলটা রয়েছে। তারপর মনে হচ্ছে; এটা কি তাহলে কবি প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ultimate submission to the inner world? সেই সন্ধানটা কি এবার ঢুকে পড়ল সংসারের মধ্যে; সংসারের ছোটখাটো, ডান বা বাঁ পা ফেলার মধ্যে যে একটা বড় জায়গা লুকিয়ে আছে, বড় রহস্য লুকিয়ে আছে, সেটাতে কি প্রসূনদা ঢুকে পড়লেন এর মধ্যে? এটা কি প্রসূনদার স্বপ্ন জগৎ?

উত্তর: না,এটাও বাস্তব জগৎ। এটা তুমি ঠিকই বলেছ যে সংসারের মধ্যে এমনকি আরও বেশি focus করে বলতে গেলে বলতে হয়, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মধ্যেও একটা universe রয়েছে। যদি আমরা ‘শোন ভাইপো’ কবিতাটিকে ধরে এগোই তাহলে প্রত্যেক ব্যক্তির মধ্যেও একটা universe রয়েছে এবং ওই একজনের মধ্যেই আমরা বলি যে দু’রকম sexual expression-ই আছে। এই ‘গুপ্ত দাম্পত্য কথা’ সব সময় দ্ব‍্যর্থক, এর অনেক ভেতরের কথা, চর্যাপদের মতো সান্ধ্যভাষায় লেখা আর কি! মূল কথা যা বলা হচ্ছে শুধু তাই বলা হচ্ছে না! নিজের মধ্যেও নিজের সঙ্গে একটা পুরুষ প্রকৃতির সম্পর্ক কোথাও আছে।

প্রশ্ন: আমাদের যে সহজিয়া বা folk tradition যেমন বাউল, আলকাপ এঁদের কথায় কিন্তু বারবার এই কথাটা ফিরে এসেছে যে, it’s a binary।

উত্তর: তাঁরা তো গলার শির ছিঁড়ে জানিয়েছেন যে ভাণ্ডই ব্রহ্মাণ্ড। আমি যদি তার উৎস খুঁজি তাহলে বলা যেতে পারে সেই উপনিষদ থেকেই বয়ে আসছে যে, ভাণ্ডই ব্রহ্মাণ্ড। ‘গুপ্ত দাম্পত্য কথা’-তেও এরকম একটা tradition-এর কথা বলা হয়েছে।

প্রশ্ন: কিন্তু এটাকে explore করতে গেলে একজন পাঠক হিসাবে আমার মনে হয়েছে, আপনার ব্যক্তিজীবনে আপনার যিনি সর্বক্ষণের সাথী, আপনার স্ত্রী, তাঁর সাথে একটা গভীর ভালোবাসা না থাকলে আপনি বোধহয় এই উচ্চারণ করতে চাইতেন না।

উত্তর: ঠিকই, সেটা একটা পার্সোনাল ডিটেল বটে কিন্তু আমাদের মন ও আত্মার মধ্যে এরকমই একটা সম্পর্ক বিরাজমান। আত্মা বলতে এখানে আমি আমার সত্তাটাকে বোঝাচ্ছি। যেখানে বহু ক্ষেত্রে মনের সঙ্গে তার একটা ঠোকাঠুকি চলে, সবটা সে মেনে নিতে পারে না, মনের projectionsগুলোকে। আবার মন revolt করে নানান সময়ে। আমি এটাকে একদম সেই ফ্রয়েডিয়ান টার্মে ইগো, সুপার ইগো বলব না। আমি বলব যে এই নারীত্ব-পুরুষত্বের খেলাটা এখানে বরং সাংখ্য দর্শন দিয়ে বললে ভালো হবে; পুরুষ ও প্রকৃতির খেলা চলছে।

প্রশ্ন: এই একই জিনিস; ‘গুপ্ত দাম্পত্য কথা’, এখানে যেমন প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়ের চোখ দিয়ে আপনি দেখছেন, পুরুষের চোখ, এর উল্টোটাও তো হয়?

উত্তর: উল্টোটাও আমি লিখেছি। সেটা সম্প্রতি ‘আখর’ পত্রিকাতে ছাপা হয়েছিল; সেটি এই ‘গুপ্ত দাম্পত্য কথা’ নাম দিয়েই; সেটি ‘স্ত্রী পর্ব’ বলে আলাদা করে; সেখানে স্ত্রীর দিক থেকে কথাগুলো উচ্চারিত হয়েছে। এইটার মধ্যে যেমন নানান মজা রয়েছে, ফাজলামি রয়েছে… স্ত্রী পর্বটা কিন্তু অন্যরকম।

প্রশ্ন: কিন্তু মন তো পুরুষ! মানে সেই ‘শোনো ভাইপো’-র কথা। মন তো পুরুষ! তাহলে স্ত্রীর কথাটা যখন একজন পুরুষ বলছে তাঁর মধ্যেও কি সেই misoginy মিশে থাকবে না? মানে পুরুষের চোখ?

উত্তর: হ্যাঁ, হ্যাঁ অবশ্যই। পুরুষের চোখ মানে মনের একটা চোখ আছে। আবার দেহেরও আছে। এইখানে স্ত্রীর দিক থেকে পুরুষকে সংশোধন করার চেষ্টা চলছে। কোথাও এটা বুঝিয়ে দেওয়া যে, এটা একটা কঠিন খেলা, শুধু float away করে যাওয়া নয়! এইটা কোথাও ব্যক্ত হচ্ছে, সেটা স্ত্রী পর্বে আছে। যেমন ওই ‘শোনো ভাইপো’ কবিতাটাকেও যদি আমরা ধরি, তাহলে তিনিও ওই কারণেই মনকে বলেছেন, সেই পাগলিনী দার্শনিক মহিলা, যে মন ভেসে চলে আর শরীর, তাকে তো বাস্তবতার মধ্যে থাকতে হয়। তুমি ভেসে ভেসে গেলে হবে কী! তোমাকে তো এই জায়গাগুলো ভরাতে হবে। তোমার ভাগ-মোক্ষ, দু-এর জন্যই তো আমি খেলাটা খেলেছি!

প্রশ্ন: কিন্তু সংসার ব্রহ্মাণ্ডর এই যে, দেহ-মনের binary বা পুরুষের চোখ দিয়ে নারীকে, বা নারীর চোখ দিয়ে পুরুষকে এই permutation combinationগুলো আমরা করতে পারি কিন্তু আপনার কাছ থেকে নারী-পুরুষ কখনও কি সহযোদ্ধা নাকি? Comrade? লড়ছে একসঙ্গে? সেখানে এই ধরনের comradery থাকলে পরে কিন্তু কোনও কোনও সংসারে স্ত্রী-পুরুষ বিভেদই করা যায় না। কোনটা কার কাজ? কোনটা কে আগে করবে, কে পরে করবে, সেটাও কি প্রতিফলিত হচ্ছে?

উত্তর: অবশ্যই! অবশ্যই! আসলে ওই সহযোদ্ধাতত্ত্বে পৌঁছানোর জন্যই এত আয়োজন মূলতঃ! প্রকৃতি ও পুরুষ সহযোদ্ধা না হলে কে কাকে মুক্ত করবে? শেষ কবিতাটা যেখানে শেষ হচ্ছে, ‘গুপ্ত দাম্পত্য কথা’-র যে, ‘চলো একবার ফিরসে আজনবি বন জায়ে হাম দোনো’। একটা বিখ্যাত হিন্দি গানের প্রথম লাইন। এটা তো সহযোদ্ধারই প্রস্তাব।

প্রশ্ন: ‘তুমি তো জানো আমি কবি ফবি কিছু নই’। আরেকটা জিনিস, এবার কতগুলো ছোট ছোট প্রসঙ্গে আসি, আচ্ছা প্রসূনদা এই যে সাহিত্যে তো নোবেল হয়, কিন্তু শুধু কবিতা লিখে কে নোবেল পেয়েছে তা আমি জানি না! আপনার কখনও নোবেল পেতে ইচ্ছে করে না?

উত্তর: না গো সত্যি কথা আমার পুরস্কার পেতে ইচ্ছে করে না। কৃত্রিম লাগে। পুরস্কার বলতে আমি একবার বাধ্যত বীরেন্দ্র পুরস্কার গ্রহণ করেছিলাম। আমার কোনও পালানোর রাস্তা ছিল না বলে; কিন্তু সত্যি কথা বলছি; আমার না কোনও প্রতিষ্ঠান দ্বারা দেওয়া পুরস্কার…

প্রশ্ন: মানে ভারত সরকার, রাজ্য সরকার, মানে আপনার মাথাতেই আসে না আর কি… এই যে এক ধরনের সাহিত্যকর্ম ঘটে পুরস্কারকে সামনে রেখে, তার মধ্যে যে খারাপ-ভালো হয় না তাও নয়, সব মিলিয়েই হয়; কিন্তু পুরো স্রোতটা থেকে আপনার সরে আসা বা কখনই ইচ্ছে না করা, নিস্পৃহ থাকা বা কোথাও ঘৃণা জন্মানো, এটা কি রাজনীতির কারণে?

উত্তর: এটা বলা যেতে পারে আমার creative commitment। অর্থাৎ আমার সবসময় মনে হয়েছে যে; কোথাও পুরস্কার মাথার মধ্যে ঢুকে গেলে আমার শিল্পের উৎকর্ষের প্রতি আমার commitment ঘা খাবে; কোথাও অসততার ফাঁদে পড়ে যাব। তবুও পুরস্কার তো নিতেই হয়েছে। দণ্ডস্বরূপ আর কী!

প্রশ্ন: জনপ্রিয় হতে ইচ্ছে করে না? অনেক লোক তো আপনার কবিতা পড়ছে, প্রায় প্রতি মাসে পড়ছে, হাজার হাজার চিঠি লিখছে, আপনার সই নিচ্ছে…

উত্তর: যদি জনপ্রিয়তার মাপকাঠি শচীন তেন্ডুলকর হয় তাহলে ইচ্ছে করে না, কিন্তু একজন সার্থক রায়চৌধুরী এসে, আমার কবিতা এত গভীরভাবে অধ্যয়ন করে এত কথা জানতে চাইছে, এইটা আমার ভালো লাগে। এইটুকু যে প্রাপ্তি এইটুকুকেই আমি আমার সমস্ত পুরস্কার বলে মনে করি।

প্রশ্ন: আপনার তো প্রচুর লিরিকও আছে, সেটা অনেকের চোখের আড়ালে চলে যায়, কিন্তু একজন মাঝবয়সী পাঠক জানে কোথায় কোথায় একটা লিরিকের বিশ্রাম এল এবং সেটা কিন্তু তীব্র। যদি ধরুন কেউ এসে বলে আপনাকে একটা গান লিখে দিতে হবে, আপনি তাকে কী বলবেন?

উত্তর: আমি লিরিক লিখতে খুবই পছন্দ করি। আমার বহু লেখায় লিরিকের প্রাবল্য আছে বলা যেতে পারে, কিন্তু ঠিক গান লিখতে বললে বোধহয় পেরে উঠব না। আমি চেষ্টা করেছি দু’একবার, কিন্তু যখনই সুরের মধ্যে কথাকে বাঁধতে হয় তখনই মনে হয়, কোথাও একটা হচ্ছে না। এরকম হতে পারে যে আমি লিখেছি, কেউ একটা সুর দিয়েছে। কবিতা হিসেবেই লিখিত হয়েছে, কেউ সুর দিয়েছে। সেটা হলেও হতে পারে। তাতে আপত্তি করব না, যদি তাতে কিছু না বদল করে। কিন্তু সরাসরি গানের জন্য কথা লিখতে বোধহয় আমি পেরে উঠব না।

প্রশ্ন: গদ্য? গদ্য লিখতে কোনও পরিকল্পনা আছে? বড় গল্প? উপন্যাস? যেমন আপনার একটা প্রবন্ধের বই তো বেরিয়েই গেছে।

উত্তর: উপন্যাস আমার নাগালের বাইরে। অনেক উপন্যাস আমার কবিতার মধ্যে আছে। কিন্তু আমি উপন্যাসের যে বিশালতাটা, তার যে দাবিগুলো, যে সব কিছু মিলবে, সময় ও ঘটনাক্রম যে ঠিক থাকবে, সেভাবে আমি ভাবতে পারি না। ছোটগল্প, ওই যে আমি বললাম, ‘উত্তর কলকাতার কবিতা’-র অনেকগুলোই ছোটগল্প। একদম অণুগল্প করে লেখা, যেমন ওই মানুষটির গল্প, যে তাঁর মায়ের সঙ্গে তাঁর অকাল বৈধব্যের শুরুতে সম্পর্ক করেছিল, এখন ছেলের মোটরবাইক দেখে ভয় পায়, এটা একটা ছোটগল্প হতেই পারত। কিন্তু আমার কবিতা আকারে লিখতেই ভালো লাগে।

প্রশ্ন: বিভিন্ন সময়ে কবিদের লেখালেখির মধ্যে অজ্ঞাতেই পূর্বসূরিদের লেখার ছাপ বলব না, ছাপ তো থাকে না, কিন্তু কোথাও মিশে থাকেন তাঁরা। কলমের আত্মা, কাগজের ছায়া এসব মিশে যায়। আপনার লেখায় আপনি কি মনে করেন কারও এরকম ছায়া ছিল? আছে? নিছক ভালোবাসা থেকে, শ্রদ্ধা থেকে, প্রিয় জায়গা থেকে?

উত্তর: উৎপল কুমার বসুর কথা আমাকে বলতেই হবে যে, সচেতনভাবে একটা সময় এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করতে হয়েছে, এতটাই বেশি করে আমার ভিতর এসে পড়েছিলেন। তুষার চৌধুরীর এরকম একটা বিশাল পর্যায় গেছে। আমি তাঁর কবিতার ভীষণ ভক্ত। রণজিৎ দাশের কবিতার যে কারিগরি সেটা অবশ্য আমার কাছে শিক্ষাস্বরূপ হয়েছে অনেক সময়। তুষারদা, রণজিৎদা, আমার প্রায় একই দশকের, খুব অগ্রজ নন তাঁরা আমার থেকে, তাও আমি তাঁদের শিক্ষক বলে মনে করি। দেবদাস আচার্যকে আমি শিক্ষক বলে মনে করি। আর উৎপলদার ক্ষেত্রে আমি বলব যে, একসময় প্রভাবের ধাক্কা খেয়েছিলাম, জানি না সেটা ফুটে আছে কিনা আদৌ। এটা আমার ব্যক্তিগত স্বীকারোক্তি যে, আমি প্রভাবিত হয়েছিলাম।

প্রশ্ন: কোথাও সেভাবে ফুটে নেই কিন্তু টানা গদ্য যেগুলো, কিছু কিছু জায়গায় spiritটা মিলে যায়। একদম ভাষা আলাদা, দর্শন আলাদা। দুটো সম্পূর্ণ আলাদা কথাই বলছে, কিন্তু বলার যে ঝাঁঝ, ঝাঁঝটাও হয়তো আলাদা, আপনি বললেন বলে মনে হচ্ছে।

উত্তর: আমাকে সচেতন হতে হয়েছে কিছু কিছু ক্ষেত্রে।

প্রশ্ন: এই মুহূর্তের বিশ্ব কবিতা বা অবাঙালি কবি যে আপনার মনে দাগ কেটে গেছে বা প্রায়ই পড়েন?

উত্তর: ইদানিং কালের কবিতা আমি খুব বেশি পড়েছি বলে মনে হয় না। তবে T.S.Eliot ও এজরা পাউন্ড আমার ভীষণ প্রিয় কবি। আবার খুব অদ্ভুতভাবে, খুব কম কবিতা লিখছেন, Paul Celan, জার্মান কবি এবং একেবারে অন্যদিক থেকে রিলকে। এদের কবিতার বিভিন্ন পর্যায় আমার জীবনে গেছে। আর সাম্প্রতিক লেখার আমি খুব বেশি পাঠক নই, পড়িনি। জন অসবোর্ন, স্টিফেন স্পেন্ডারের নাটকের যে ভাষা ব্যবহার তাও অনেক সময় আমার কবিতা বলে মনে হয়েছে। এমনকি এই যে ‘উত্তর কলকাতার কবিতা’-য় ‘ভজনবাবু’ টাইপের কথোপকথনের মধ্যে দিয়ে একটা নাটক বেরিয়ে আসছে মনে হয়।

প্রশ্ন: বস্তুত অনেক সময় বিদেশি ছবির সাব-টাইটেল পড়ে মনে হয় কবিতা।

উত্তর: হ্যাঁ, হ্যাঁ, হ্যাঁ।

প্রশ্ন: ভীষণভাবে মনে হয়। সে তো হবেই। আমরা তো সবসময় সেগুলোর মধ্যেই বেঁচে আছি। আর একটা জিনিস জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে, আমি জানি আপনি খুব ফুটবল ভক্ত। আমরা কফি হাউসে একদিন বলেছিলাম যে, প্রসূনদা একজন ভালো commentator-ও হতে পারত। কবিতা তো মানুষ লিখে ফেলে অজান্তেই। কেন লিখেছে ভগবান জানে! আপনার বাড়িতে কি কেউ কবিতার চর্চা করতেন নাকি আপনি অজান্তেই লিখতে শুরু করলেন?

উত্তর: সেটা না। আমার প্রপিতামহ ছিলেন ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদ, যিনি শেষ উনবিংশ প্রথম বিংশ সময়কার একজন প্রথিতযশা নাট্যকার। ‘আলিবাবা’ নাটকটির রচয়িতা। খুবই জনপ্রিয়, এবং বলা যেতে পারে যে বাংলা মঞ্চে সর্বকালের অন্যতম জনপ্রিয় নাটক ‘আলিবাবা’। ইনি খুব অন্যরকম মানুষ ছিলেন। আমি যে বাড়িটিতে জন্মেছিলাম, সেই বাড়িটিতে যে বৈঠকখানাটি ছিল সেইটা আমার প্রপিতামহ মারা যাবার পর থেকে ওই বাড়ি আ্যভিন‍্যুকে পথ দিতে ভাঙা পড়া পর্যন্ত, আমার যখন ন’বছর বয়স মানে কুড়ি থেকে ষাটের মাঝামাঝি পর্যন্ত একইরকমের ছিল। একটা বড় ঘর, তার চারিদিকে বইয়ের আলমারি, তক্তাপোষ ছিল বসার জন্য। আমি আলমারিগুলোর ফাঁকফোঁকর দিয়ে ঘুরতে ঘুরতে প্রপিতামহের একটা উপস্থিতি যেন টের পেতাম। তাঁর বহু দিকে গতায়াত ছিল। অনেক কাব্য রচনাও করেছেন। একজন রসায়নবিদ ছিলেন। একজন আ্যলকেমিস্ট ও অকলতিস্তও ছিলেন। ওনার নাটক-গান-কবিতা সব মিলিয়ে মিশিয়ে একটা কোনও সাহিত্যপ্রভাব খুব ছোটবেলা থেকে আমার মধ্যে ছাপ ফেলেছে। আর ফুটবল খেলার কথা যেটা বললে, সেটা হচ্ছে যে; আমার বাবা ভয়ংকর ফুটবলপ্রেমী ছিলেন এবং বাবার কাছ থেকে বলা যায় যে আমি বংশগতভাবে ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা পেয়েছি। আমি খেলতামও বেশ ভালো। কলেজস্তর পর্যন্ত আমি খেলেছি। কলেজ দলে চান্সও পেয়েছিলাম, তবে পাড়াতে রাস্তায় রবারের বল খেলতে গিয়ে আমার পায়ে চোট লেগেছিল, যে কারণে আমি ফুটবলটা চালিয়ে যেতে পারিনি। এরকম হতে পারত যে আমি কলকাতা ফার্স্ট ডিভিশনে ছোটখাটো কোনও একটা ক্লাবে খেলেও ফেলতে পারতাম। ফুটবলকে আমার একটা performing creation মনে হয়। মানে একদম কিছু ঠিক করা নেই, কিন্তু একটা তাৎক্ষণিক সৃজনশীলতা আছে।

প্রশ্ন: ওই ঘাস চিরে বেরিয়ে যাওয়া…

উত্তর: ওই ঘাস চিরে বেরিয়ে যাওয়া, এইটা আমার কাছে খুব lyrical ব্যাপার। বলব যে কাব্যিক একটা ব্যাপার আছে ফুটবল খেলায়। সেটাই মূলতঃ আমাকে ফুটবলের প্রতি আকৃষ্ট করেছে, যে কারণে আমি ফুটবলের ঘাঁতঘোঁত নানারকম বোঝার চেষ্টা করেছি, প্রচুর খেলা দেখেছি ও এখনও দেখে যাই। ওটা আমার নেশার মতো। আমার একটা বিরাট বই আছে ফুটবলের ওপরে; ‘ফুটবল ঘরানা, বিবর্তন ও বিপ্লব’, এটা ছেপেছিল ‘প্রতিভাস’; কিন্তু বেশি লোকের হাতে পৌঁছায়নি। এখনকার যাঁরা ফুটবল সমালোচক, তারা যেহেতু বইটা পড়েছে সেহেতু এখনও আমাকে ফুটবল বিশেষজ্ঞ হিসেবে মনে করে, এবং টিভিতে বিভিন্ন সময়ে আমাকে ফুটবল বিশেষজ্ঞ হিসেবেও দেখা যায়। খেলা analysis করছি। এটা আমার শিষ্যদের অবদান বলা যেতে পারে।

প্রশ্ন: বইটা আরেকবার ছাপান, এটা আমাদের পক্ষ থেকে একটা অনুরোধ রইল।

উত্তর: আমার বইটা বেরিয়েছিল নব্বই সালে বিশ্বকাপের আগে। তারপর এই যে ২৩-২৪ বছর ধরে বিশ্ব ফুটবলে আরও যা যা নতুন সংযোজন হয়েছে, ও আরও যা যা পাল্টে গেছে, আমাকে আবার সেগুলো লিখতে হবে।

প্রশ্ন: সেটা করুন। সেটা খুব জরুরী। কারণ এর পরে আর কেউ লিখবে না। এখন ফুটবল খেলার দর্শকই কমে গেছে। আমরাই বোধহয় শেষ প্রজন্ম। এর পরের প্রজন্ম ফুটবল দেখে না, তারা টি-টোয়েন্টি দেখে।

উত্তর: তারা ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ দেখে।

প্রশ্ন: গাড়িতে লেখা থাকে চেলসির ভক্ত। কুমোরটুলি দেখলি না চেলসি! একটা জিনিস জিজ্ঞেস করি, কবি হবার যে কষ্ট! কবি না হলে অনেক কিছু থেকে মুক্তি পাওয়া যায়; যেমন — যে কবি নয়, যাঁর মাথার মধ্যে এই কবিতা ব্যাপারটা নেই; সে বোঝে investment কাকে বলে। সে বোঝে fixed deposit কী! সে বোঝে একটা ছোট ফ্ল্যাট কী! সে বোঝে আর একটু টাকা কী করে করা যায়! ভালো থাকা যায়! একেবারে ‘doing well’! একটা গাড়ি কেনা যায়। Restaurant-এ খাওয়া যায়। আপনার কোন জীবনটা মনে হয় শান্তির? এই কবিতা জর্জরিত জীবনটা? নাকি ওই জীবনটা?

উত্তর: দুটোই না, কারণ তুমি যে জীবনটার কথা বললে সেটা কোনও মুক্তি হল না এজন্যে যে সত্যিই সে কবিতার বদলে অন্য আরও কিছু বস্তুতে আবদ্ধ হয়ে আছে, এবং শেষ পর্যন্ত সে কিন্তু আবদ্ধই, সে কিছু fixed deposit, investment, ফ্ল্যাট, নতুন কী গাড়ি বেরোল তার মধ্যেই থাকুক না কেন! আবার একটা সময়, ইদানিং আমার মনে হয়েছে কবিতা লেখার ভারটাও বোধহয় একটা সময় কবি আর বহন করতে চান না। বেরিয়েও যেতে পারেন। আমার কবিতা লেখা কোনওদিন বেঁচে থাকতে থাকতেই শেষ হয়ে যেতে পারে। এই দুটোর বাইরেই আমি মুক্তি বলে কিছু একটা বুঝি। আর মুক্তি ছাড়া শান্তি নেই। কোনও কিছুতেই নেই।

(সমাপ্ত)

About Char Number Platform 106 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Trackback / Pingback

  1. চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম। মেল ট্রেন। নবম যাত্রা। ১লা জানুয়ারি, ২০১৮। – ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*