আ গলে লগ যা

চৈতালী চট্টোপাধ্যায়

 

শশী কাপুরকে নিয়ে লিখব? তথ্য ছড়ানো ছেটানো আছে। শুধু ‘গুগল, একবার এসো তো বাছা!’ বলে হাঁক পাড়লেই সুড়সুড় করে এসে পড়বে পাতে, থুড়ি, লেখার পাতায়। কিন্তু অমন ধারালো যুক্তিপূর্ণ ঝকঝকে লেখা লিখুন চিত্র-সমালোচক ও বোদ্ধারা। আমি শুধু চেয়ে থাকব ওঁর বয়স বাড়ার খবরে। আমার মনে গুনগুন করে উঠবে গান। মরি হায়! বসন্তের দিন চলে যায়!

হ্যাঁ, আমার বসন্তে সবে গজিয়ে-ওঠা পরাগরেণুতে আলতো ফুঁ দিয়েছিলেন অন্য কোনও ম্যাচো অভিনেতা নন, স্বয়ং শশী কাপুর। আর তাঁর সিনেমাগুলো রিলিজ করছে যখন, অর্থাৎ জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠছে তারা, তখন আমি স্কুলজীবনের সাদা সাদা শান্ত দিনগুলোতে আছি, কিংবা সে-সব রিবন-বাঁধা দিন থেকে লাফ দিয়ে কলেজ লাইফের বিপথগামী নৌকোয় উঠছি।

‘আ গলে লগ যা’ মুক্তি পেল যখন, তখন আমি যেমন-ইচ্ছে বা যখন-খুশি সিনেমা না-দেখার শাসনাধীন। কিন্তু পরে, নুন শো সদ্য-সদ্য সিনেমা হলে বসেছে, সেরকম একটা শো-তে, অধুনাবিলুপ্ত, উত্তর কোলকাতার একটি লড়ঝড়ে-মার্কা হলে, কলেজ বাংক করে কান-গরম-করা দুপুরবেলায় তাঁকে দেখতে পেয়েছিলাম। দু’চোখে মুগ্ধতার বিস্ফোরণ ছিল, প্রেম নামক এক ক্যাসানোভা ছেলেটির ভূমিকায় অভিনেতা শশী কাপুরকে দেখে। এখন ভাবলে হাসি পায়। আবার পায় নাও বটে। সেইসব দিওয়ানা, লাভারবয়, নাচাগানা ভরা নায়কের চোখে কি তখনই দেখে ফেলিনি অন্য কোনও চিন্তনের বিচ্ছুরণ? সেরিব্রাল অতলতা?

ঠিক যেভাবে দেখেছি জুনুন, ত্রিশূল, দিওয়ার, শান অথবা কভি কভি। উল্লাস নিয়ে। বিস্ময় নিয়ে। এন্টারটেইনমেন্ট, এন্টারটেইনমেন্ট, এন্টারটেইনমেন্ট নিয়ে। আমার গুরুতর-রকমের গোঁড়া ঠাকুরদা একটা শব্দ ব্যবহার করতেন চ্যাংড়া ছেলেপুলে প্রসঙ্গে, তা হল গিয়ে, ‘লাফাংগা’। তো এইসব লাফাংগা চরিত্র ছাপিয়ে শশী কাপুরের অন্য রূপও তো ততদিনে দেখে ফেলেছি আমি। ঝাঁ-চকচকে, ও একইসঙ্গে মেধাবী অভিনয়ের বুনন বা বিবাহ, যা-ই বলা যাক না কেন তাকে! প্রতিভা-দেখানো অভিনয় আর অর্থ-উপার্জনকারী অভিনয়, এ-দুইয়ের, সমান্তরাল চলা সেখানে। এবং, একইসঙ্গে আমার মনে হয়েছে শশী অনন্য, একক। চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া অনেক তারকাসমাবেশ পাশাপাশি থাকলেও, আমার চোখে লেগেছিলেন শুধু শশী কাপুর।

এরপর আমার চেতনা একটু আধটু পাকছে। সিনেমাকে বিনোদন পার করে শিল্প ভাবতেও আরম্ভ করেছি, ভাবছি সিনেমা কীভাবে আক্রান্ত করে একজন দর্শককে। তখনও শশী কাপুর নিরাশ করেননি আমাকে। আমি দেখলাম সিদ্ধার্থ, উৎসব, নিউ দিল্লী টাইমস, কলযুগ, শেক্সপীয়ারওয়ালা। অন্যস্বাদের জাত অভিনয়।

আরেকটা ব্যাপার, আমাকে উল্লেখ করতেই হবে, শশী কাপুরকে নিয়ে কথা বলছি যখন। কোলকাতায় শশী কাপুরের সঙ্গে জেনিফার কেণ্ডেলের দেখা হল। ৩৬ চৌরঙ্গী লেন দেখার পর আমার মনে হয়েছিল, এই অসাধারণ মাপের অভিনেত্রীর সঙ্গে শশী কাপুর ছাড়া আর কারই-বা জীবন যুক্ত হতে পারে। ঠিক এভাবে, এ লেখায়, পৃথ্বী থিয়েটারের উল্লেখও আসবে। যা শশী কাপুরের উদ্যোগে হয়ে উঠেছিল, জমজমাট।

আজ এ-লেখা লিখতে বসে আমি দেখতে পাচ্ছি ওঁর চোখদু’টো। যে-চোখে, ঠিকরে পড়া আলো, সেলুলয়েডের মায়াবি ঘূর্ণন ছাপিয়ে মহাভারতের কর্ণের সেই নির্জনতা ও অভিমান। শশী কাপুর আমার জীবনের একটি অধ্যায়। একইসঙ্গে বসন্ত ও হেমন্তকাল নামিয়ে আনা জ্যোৎস্নাটি।

About Char Number Platform 844 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*