বিধুর চন্দ্রাস্ত : শশী কাপুর

সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়

 

আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগেও হিন্দি সিনেমা অত বলিউডের ছিল না। তখনও মুম্বাই ম্যাক্সিমাম সিটি হয়নি। লোকে বম্বে যেত; সূর্য ডুবলে সমুদ্রের পার থেকে আলোকমালায় সুসজ্জিত ‘রাণীর কন্ঠহার’ দেখত। আমরা বম্বে বলতে বুঝতাম ভিক্টোরিয়া টার্মিনাস বা ইন্ডিয়া গেট। এ শহরে তখনও ইংরেজিয়ানা ছিল স্থাপত্যে ও চত্বরে। শশী কাপুর সেই সময়ের নায়ক। আমরা অবাক হয়ে ভাবতাম, ‘দর্পণের শরতশশী’। এক রাজপুত্র গভীর অরণ্যে পথ হারালে যেমন বিষণ্ণ হন, বিরহের গানে ঠোঁট মেলানোর সময় শশী কাপুরকে তেমনি বিধুর ও মেঘলা লাগত। তখনও, পুরুষ বা নারীর মুখ আলাদাভাবেই দর্শনীয় ছিল; পেশীর দম্ভে আচ্ছন্ন থাকাই দর্শকের একমাত্র কাজ ছিল না। ফলে, শশী কাপুরের আবেগ আলাদা করেই চেনা যেত। তাঁর কমনীয় মুখ নিয়ে শশী কাপুর যখন পর্দা আলোকিত করে ফেলতেন ,পথভোলা সেই পথিককে দেখে সকালবেলার মালতী ও সন্ধেবেলার মল্লিকা উৎফুল্ল হয়ে উঠত। একুশ শতকের বলিউড আজ এত কোলাহলময় যে আলাদা করে চন্দ্রাস্ত খেয়াল করার সময় তার নেই। শশী কাপুরকে বলিউড ‘স্বর্ণমুদ্রা’ ভাবে হয়তো কিন্তু মোহর তো আজকের ‘কারেন্সি’ না।

তাহলে শশী কাপুরকে কীভাবে আমরা সিনেমার মানচিত্রে স্থাপন করব? ‘সত্যম শিবম সুন্দরম’ (১৯৭৮) ছবিতে তাঁর গানে ছলনামিশ্রিত প্রশ্ন ছিল — ‘যশমতী মাইয়াসে পুঁছে নন্দলালা/রাধা কিঁউ গোরি ম্যায় কিঁউ কালা?’ কিন্তু কার্যত শশী কাপুরের পদধ্বনি শুনেই আমরা বুঝেছিলাম — ‘আজি কে গো মুরলী বাজায়? এ তো কভু নয় শ্যামরায়।’ সেদিক থেকে দেখলে আমাদের সামন্ততান্ত্রিক আভিজাত্যের শেষ প্রতিনিধি শশী কাপুর। যেমন জীবনে তেমনি পর্দায়।

যখন সুভাষচন্দ্র বসু কংগ্রেস সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নিচ্ছেন, তখনই শশী কাপুর জন্মালেন কলকাতায়। বাবা পৃথ্বীরাজ কাপুর একই সাথে মুম্বই ও কলকাতার অভিনয় জগতের এক শ্রদ্ধেয় চরিত্র। শশীর শেক্সপিয়ার ভজনার সূত্রপাত সেই বাবার হাত ধরেই। দাদা রাজ কাপুর ও শাম্মী কাপুর সর্বজনবিদিত নাম। স্ত্রী জেনিফার কিন্ডাল সুখ্যাত অভিনেত্রী। যে সামান্য কয়েকজন নট ভারতে দ্বিভাষিক অর্থাৎ হিন্দি ও ইংরাজিতে সব্যসাচী, শশী তাদের অন্যতম। ক্যামেরার পিছনে দাঁড়িয়ে পরিচালকরা একথা বুঝতে ভুল করেননি যে শশী কাপুর একটি মতাদর্শ এবং মোটেই প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা নির্দেশিত পথ থেকে ‘চ্যুত’ নন, যা অন্তত তাঁর অন্যতম অগ্রজ শাম্মী কাপুর। শর্মিলা ঠাকুর, জিনাত আমান প্রমুখ অভিনেত্রীর বিপরীতে তিনি যখন অবতীর্ণ হন, তাঁর ভূমিকালিপি উচ্চবর্গীয় অলংকারশাস্ত্র অনুসারী নিয়মতান্ত্রিক। প্রেমিক হিসেবে তাঁর রূপ ও বাচনভঙ্গি প্রেমিকাকে মুগ্ধ করে, যখন প্রেমিক হিসেবে তিনি আশাহত হন, তাঁর বেদনাও শাস্ত্রানুমোদিত। অভিশাপ অন্তে যখন তাঁদের পুনর্মিলন ঘটে তখন পুরষতন্ত্রের অমোঘ নিয়মেই তাঁর অনুতাপ দীর্ঘস্থায়ী হয় না।

আমরা ‘দিওয়ার’ (১৯৭৫) ছবিটির কথা ভাবি। ছবিতে আইনের বাইরে যে চলাচল করে সে বিজয় (অমিতাভ বচ্চন)। সে নব্য যুবাদলের প্রতিভূ, তার কাছে সম্পদ আছে, বাংলো আছে, গাড়ি আছে। আর যে সহোদর ভাই আইনের রক্ষক সে রবি (শশী কাপুর)। সে আসমুদ্র হিমাচলকে নন্দিত করে বলে ‘মেরে পাস মা হ্যায়!’ এই নবজাত সম্পদ প্রীতি ও সাবেকি মাতৃবন্দনায় যে ভাষ্য ও বাকভঙ্গির পার্থক্য তা-ই বলিউডের নবীন কান্তিতত্ত্বের পার্থক্য। ১৯৭২ সালে ‘শর্মিলী’ ছবিতে যে প্রেমিককে আমরা প্রত্যক্ষ করি, ‘খিলতে হ্যায় গুল ইঁহা’ গানে প্রায় সে দেবতা। ধরণীতে প্রায় তার পায়ের ছাপ নেই। সুন্দর হিসেবে শশী কাপুর-এর স্থান আদি রোমান্টিক স্বর্গে।
স্বাধীনতার পরে ধ্রূপদী যুগে নেহেরু ঘরানার একটি চিহ্নায়ণ শশী কাপুরের অগ্রজ রাজ কাপুর, গ্রাম থেকে শহরে আসার সেই রূপকথা — যেমন ‘আওয়ারা’ (১৯৫১), ‘শ্রী ৪২০’ ইত্যাদি। শশী কাপুরের ছবি তাঁর পূর্বসুরী তিন মান্য নায়ক দিলীপ কুমার, দেব আনন্দ ও রাজ কাপুরের সাথে যদি মিলিয়ে দেখি তবে আন্দাজ করা যাবে তিনি উত্তর-আধুনিক শাহরিকতার স্থিতাবস্থা। ছয়ের দশকের মধ্যভাগে নাগরিকতার তরঙ্গভঙ্গ একটি সাম্যাবস্থায় এসে যায়। তখন থেকেই শশী কাপুর সংস্থা-স্বীকৃত নাগরিকতার ছাড়পত্র হয়ে ওঠেন। ১৯৫৬ সালের কিছু আগে পরে সহোদর শাম্মী কাপুর ‘কাশ্মীর কি কলি’ বা ‘জংলি’-তে যে প্রেমের ছবি করছেন তাতে যুগচেতনা শিষ্টাচারের সীমা পার হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু শশী কাপুর যেন ‘কপিবুক ক্রিকেট’। নন্দার সাথে তাঁর প্রণয়োপাখ্যানগুলি – যেমন ‘যব যব ফুল খিঁলে’ বা ‘নিন্দ হামারি খোয়াব তুমহারি’ (১৯৪৬) যেন মিলনাত্মক ছবির মল্লিকাবন। শারীরিক সুষমায়, বাচনভঙ্গিতে, মিলন ও বিরহে শশী কাপুর এমন কিছু ভাবেন না ও করেন না — যা শহুরে মধ্যবিত্ত-বাসনার প্রতি অন্তর্ঘাত।

শশী কাপুর জনবন্দিত নায়ক হয়ে উঠেছিলেন তা একমাত্র এই কারণে নয় যে তিনি সুদর্শন। বরং এ জন্যেই যে তিনি মেট্রোপলিটন সুরুচির একটি সুনিয়ন্ত্রিত মাত্রা। শশী কাপুর জানতেন যে তাঁর অবসান আসন্ন, “তপন উদয়ে হবে মহিমার ক্ষয়/তবু প্রভাতের চাঁদ শান্ত মুখে কয়/অপেক্ষা করিয়া আছি আদি অস্ত সিন্ধুতীরে/প্রণাম করিয়া যাব উদিত রবিরে’’ — অমিতাভ থেকে সলমান খান পর্যন্ত প্রসারিত যুগে শশী কাপুরের দিকে আমরা কীভাবে তাকাব তার উত্তর দিতে ইতিহাস আরও কিছুটা সময় নেবে। বিদায় শশী কাপুর।

About Char Number Platform 289 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*