জলবায়ু বিপন্নতা বাড়ছে, বাড়ছে বাকবিতণ্ডাও

জয়ন্ত বসু

 

আরেকটি বাৎসরিক জলবায়ু সম্মেলন শেষ হয়ে গেল জার্মানির বন শহরে। প্রবল ঠাণ্ডার মধ্যে বিশ্বজুড়ে উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের ভবিষ্যৎ নিয়ে দু সপ্তাহ ধরে আলাপ আলোচনা চালালেন প্রায় দুশোটি দেশের প্রতিনিধিরা। একদিকে যখন বিজ্ঞানীরা একের পর এক রিপোর্টে আগামীদিনের জলবায়ু বিপন্নতার কথা বিশদে জানাচ্ছেন; তখন অন্যদিকে বিভিন্ন দেশের, বা বলা ভালো দেশগোষ্ঠীর, মধ্যে কার কতটা দায়িত্ব, কে বা কতটুকু করবে আগামীতে জলবায়ু পরিবর্তন কমাতে, তা নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত রইল। বিপন্নতার কথা দিয়েই শুরু করা যাক। বন সম্মেলন শুরু হওয়ার কয়েকদিন আগেই আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রপুঞ্জের পরিবেশ প্রকল্প এক রিপোর্টে জানায় প্যারিস শহরে হওয়া ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক চুক্তিতে পৃথিবীজুড়ে বিভিন্ন দেশ কার্বন নিঃসরণ কমানোর জন্য যে পরিমাণ অঙ্গীকার করেছিল তা পৃথিবীজুড়ে গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে ২ ডিগ্রির মধ্যে আটকে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ কমানোর মাত্র এক তৃতীয়াংশ। তাও আবার আমেরিকাকে ধরে যারা এ বিষয়ে কিছুই করবে না জানিয়ে দিয়েছে। সোজা কথা, বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশ একযোগে কার্বন উদ্গীরণ আরও অনেকখানি কমাতে না পারলে প্রাক শিল্পায়ন সময়ের তুলনায় ২ ডিগ্রি তাপমান বাড়া শুধু সময়ের অপেক্ষা। মনে রাখা প্রয়োজন যবে থেকে শিল্পায়ন শুরু হয়েছে তবে থেকে মানুষ জলবায়ুতে কার্বন ডাই অক্সাইড বা অন্যান্য উষ্ণতা সৃষ্টিকারী গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ করে চলেছে; যার ফলে ক্রমেই এ পৃথিবী উষ্ণ হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা আগেই সাবধানবাণী জানিয়েছিলেন যে ২ ডিগ্রি তো বটেই, এমনকি দেড় ডিগ্রি গড় তাপমাত্রা বাড়লেই পৃথিবীর সমুদ্র নিকটবর্তী বহু অঞ্চল জলে ডুববে; ঘরছাড়া হবে কোটি কোটি মানুষ, জীবনহানিও হবে প্রচুর। যেটা আরও আশঙ্কার কথা যে, আরেকটি গবেষণা বন মিটিং চলাকালীনই জানিয়েছে যে পৃথিবীর আবহাওয়ায় কার্বনের পরিমাণ তিন বছর কমবেশি স্থিতি থাকার পর এ বছর থেকে আবার বাড়তে চলেছে।

এটা যদি আগামীদিনের ভবিষ্যৎ সঙ্কেত হয় তবে ইতিমধ্যেই যে বিপদ ঘটে গেছে, তার পরিমাণও বিশেষ কম নয়। জলবায়ু সম্মেলনের প্রথম সপ্তাহতেই প্রকাশিত হয় ‘ক্লাইমেট ভালনারিবিলিটি ইনডেক্স’ অর্থাৎ ‘জলবায়ু বিপন্নতার মাপকাঠি’। এই রিপোর্ট জানাচ্ছে যে গত কুড়ি বছরে প্রায় ১১০০০ বড় প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ফলে, যারা মূলত জলবায়ু পরিবর্তনের ফলেই তৈরি হয়েছে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন, পৃথিবীজুড়ে পাঁচ লক্ষ কুড়ি হাজার মানুষ মারা গেছেন। আরও ভয়ের কথা এর সাত ভাগের এক ভাগ ভারতবর্ষে। এমনকি গত বছরের বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ধাক্কায় যে পরিমাণ মানুষ মারা গেছেন, সেই তালিকায় সবচেয়ে উপরের নাম ভারতবর্ষের; মোট ২১১৯টি মৃত্যুর কারণে। সব মিলিয়ে, বিপন্নতার হিটলিস্টে ভারতের অবস্থান ছ নম্বরে; হাইতি, জিম্বাবোয়ে, ফিজি, শ্রীলঙ্কা ও ভিয়েতনামের পর। আরেকটি রিপোর্ট জানাচ্ছে যে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে পৃথিবীতে যে দেশগুলিতে সবচেয়ে অধিক সংখ্যায় মানুষকে ঘর ছাড়তে হয়, সেখানেও ভারত প্রথম সারিতে।

এমন প্রেক্ষিতে বন সম্মেলনে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে উন্নত বনাম উন্নতিশীল ও অনুন্নত দেশগুলি তর্ক করে গেল উন্নত দেশগুলির ২০১২ সালে করা কার্বন নিঃসরণের অঙ্গীকার কেমনভাবে রাখা হবে তা নিয়ে। ২০১২ সালে দোহাতে বড় দেশগুলি অঙ্গীকার করেছিল যে তারা ২০২০ সালের মধ্যে বেশ খানিকটা কার্বন নিঃসরণ কমাবে, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। বিস্তর চাপান উতোরের পর উন্নত দেশগুলি দায় মানল বটে কিন্তু ততক্ষণে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি পিছনে পড়ে গেছে। ফলে শেষমেশ একটা সর্বসম্মত চুক্তিপত্র বেরোল বটে কিন্তু তাকে বোধহয় সমঝোতাপত্রই বলা ভালো। ২০২০ সাল থেকে উন্নত দেশগুলির বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার অঙ্গীকার নিয়ে কোনও সিদ্ধান্ত হল না, সিদ্ধান্ত হল না ইতিমধ্যেই জলবায়ু বিপর্যয়ের সম্মুখীন হওয়া মানুষ ও অঞ্চলগুলি নিয়ে।

আর এই রাজনৈতিক চাপান উতোরে সবচেয়ে জটিলতা তৈরি হল আমেরিকাকে নিয়ে। আমেরিকা এমন একটি দেশ যারা এই মুহূর্তে চীনের পর সর্বোচ্চ কার্বন নিঃসরণ করে, আর ঐতিহাসিক দায়িত্বের কথা ধরলে তালিকায় সবচেয়ে ওপরে। এমন একটি দেশ যদি বিশ্বজুড়ে আবহাওয়া পরিবর্তনের দায়িত্ব থেকে স্রেফ হাত ধুয়ে ফেলে, তাহলে গোটা পৃথিবীই যে বিপন্ন হয় তা বুঝতে বিশেষজ্ঞ হতে হয় না। বলাই বাহুল্য ট্রাম্প সাহেব রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর থেকে এটাই আমেরিকার ‘সরকারি’ নীতি। বনের বৈঠকে এই নীতিই নরমে গরমে বজায় রাখল আমেরিকা, বস্তুত চেষ্টা করে গেল গোটা প্রক্রিয়াটাকেই পেছন থেকে টেনে ধরার। চমক হল এই সরকারি প্রতিনিধিদলের পাশাপাশি বন জলবায়ু বৈঠকে এসে উপস্থিত হয়েছিল আমেরিকার এক অসরকারি প্রতিনিধিদল, যেখানে ছিলেন বহু মেয়র, অন্যান্য রাজনীতিবিদ, বাণিজ্যিক প্রতিনিধি ও অন্যরা। তারা জোরগলায় প্রচার করলেন আমেরিকান সরকার প্যারিস চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসলেও, তারা এই চুক্তিকে যথাবিহিত মান্যতা দেবেন। কিন্তু সরকারি অবস্থানের বাইরে থেকে দাবি করা আর মাঠে নেমে করার মধ্যে অনেক তফাৎ আছে। এই রাজনৈতিক ডামাডোলে ভারত খানিকটা মধ্যপন্থা অবলম্বন করে নিজের ঢাক পেটানোর কাজেই ব্যস্ত রইল। ওপর মহলের (পড়ুন প্রধানমন্ত্রীর অফিস) নির্দেশে ট্রাম্প সাহেবের আমেরিকার বিরুদ্ধেও মুখ খুলল না; আবার জোরালো গলায় অন্যান্য উন্নত দেশগুলির সমালোচনাও করল না। ফলে সৌরশক্তি বাড়ানোর ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা নেওয়া ভারত গুরুত্বের বিচারে বেশ খানিকটা পিছনেই পড়ে গেল বনে; যেখানে পৃথিবীর সর্বোচ্চ নিঃসরণকারী চীন অগ্রণীর তকমা নিয়ে চলে গেল।

এই রাজনৈতিক ডামাডোল আর ক্ষুদ্র স্বার্থসিদ্ধির বাজারে আশার কথা একটাই যে দরদাম চললেও পৃথবীর প্রায় সব দেশই আজ বুঝতে পেরেছে যে জলবায়ু পরিবর্তনকে অস্বীকার করার দিন শেষ। ফলে ২০১৫ সালে প্যারিসে বিশ্বকে ভবিষ্যৎ জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা থেকে বাঁচানোর যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল; তাতে সামিল রয়েছে প্রায় সবাই। ২০১৭ জুড়ে সারা বিশ্বজুড়ে, এমনকি আমেরিকা সমেত, যে বিপুল জলবায়ুর পরিবর্তন হেতু ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা আজ ছোট, মাঝারি, বড় দেশকে এক জায়গায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এই জলবায়ু সাম্যবাদই আগামী দিনের রুপোলি রেখা।

About Char Number Platform 840 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*