চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম। মেল ট্রেন। নবম যাত্রা। ১লা জানুয়ারি, ২০১৮।

স্টেশন মাস্টার

 

বাঙালি বড্ড আদিখ্যেতাপ্রবণ জাত -– অপসৃয়মান যা কিছু, তাকে নিয়ে তার স্মৃতিকাতরতার সীমা নেই। সময় ফুরিয়েছে, এমন যাবতীয় জিনিসপত্তর নিয়ে অকারণে চোখের জলের অপচয় তার প্রিয় বিনোদন। রবিবাবু বোধ করি বাঙালির এই যেতে-নাহি-দিব সিনড্রোম দেখেই চেতাবনি দিয়েছিলেন, যা ফুরিয়ে গিয়েছে তাকে যেতে দেওয়াই বিধেয় – তাকে আগলে বসে থাকার মধ্যে অর্থহীন অতীতচারিতা ভিন্ন আর কিছু নেই…

কিন্তু তিনি বললেই বা শুনছে কে? গেল-বছরের হলদে-মেরে-যাওয়া খবরের কাগজ থেকে শুরু করে মাথার গন্ধতেলের তোবড়ানো খালি কৌটো, পালক-খসা ঝাড়ন থেকে শুরু করে সেলাই-ফেটে-যাওয়া ফুটবল – কোনওকিছুই আমরা প্রাণে ধরে বিসর্জন দিতে পারি না। এর একটিও আমাদের দৈনন্দিন প্রয়োজনে না-লাগলেও সব জড়ো হতে থাকে সিঁড়ির তলার একচিলতে অন্ধকারে। তারপর, কোনও এক সুদূর ভবিষ্যতের অলস দুপুরে শ্বশুরঘরে নবাগত বধূমাতাটিকে খোকার ছেলেবেলার গল্প শোনানোর প্রসঙ্গে প্রত্নসামগ্রীর মতো উঠে আসে ঘাড়ের প্লাস্টিক ছিঁড়ে নারকেল-ছোবড়া বেরিয়ে পড়া কাঠের ঘোড়াটি…

অতীত নিয়ে এই যে আমাদের মায়ার আঠায় আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকা, এর একটা কারণ, যা কিছু পুরনো, তার প্রতিটির সঙ্গেই আমরা একটি করে গল্প যোগ করি। এভাবেই আমাদের স্মৃতিকথার ভাণ্ডার ভরে ওঠে। সেই ভাণ্ডারে রংচটা কাঠের ঘোড়াটি  কেবল একটি বাতিল খেলনাই থাকে না আর… যেমন ঠাকুমার দাঁত-ভাঙা হাড়ের চিরুনিটিও হয়ে ওঠে নিছক একটি চিরুনির চেয়ে অনেক বেশি কিছু – একটা গোটা যুগের প্রতিনিধি…

সবে শেষ হয়ে যাওয়া একটা বছর নিয়ে আমরা যখন স্মৃতিচারণ করতে বসি, তখনও কি এই স্মৃতিমেদুরতাই কাজ করতে থাকে অলক্ষ্যে, নাকি ফেলে আসা সময়ের বস্তুনিষ্ঠ পুনরাবলোকনের মধ্যে দিয়ে আমরা আসলে ব্যাখ্যা করতে চাই সময়ের মধ্যে দিয়ে আমাদের হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াটিকেই? খুব কঠিন প্রশ্ন। কেউ-কেউ বলেন, পশ্চাদবলোকন আসলে অগ্রসরমানতারই প্রাক্‌-শর্ত – অতীতকে নির্মোহ ভাবে বুঝে নিতে না-পারলে সামনে এগনো অসম্ভব। কেউ বা আবার অতীতকে দেখতে চান তাকে তার প্রাপ্য মর্যাদা দেওয়ার জন্যই – তাঁদের কাছে সে হল ফেলে আসা আমিরই প্রতিরূপ।

এসব ভাবনার মধ্যে কোনটির সারবত্তা বেশি, কোনটি অধিকতর গ্রহণযোগ্য, সেসব চুলচেরা বিচারে না-ঢুকে আমরা তাই চারনম্বর প্ল্যাটফর্মের এই সংখ্যায় হাতে গোনা কয়েকটি ঘটনা বেছে নিয়ে সেগুলির মধ্যে দিয়ে পুরো বছরটিকে দেখতে চেষ্টা করেছি। সে দেখা নিশ্চিতভাবেই সমগ্রদর্শন নয়, এমনকী সামান্য এই পাঁচটি-ছ’টি বিষয়ই যে গত বছরের প্রতিনিধিত্ব করার পক্ষে সবচেয়ে জরুরি বা যোগ্য, তেমন স্পর্ধিত দাবিও আমরা করিনি কোথাও। আমাদের কেবল মনে হয়েছে, রিজার্ভ্‌ড বগির go hereসতেরোর সাত-সতেরো source url শীর্ষক বিভাগে এই যে ঘটনাগুলি আমরা ধরতে চেষ্টা করলাম, এদের মধ্যে কোথাও হয়তো সময়ের চিহ্ন লেগে আছে… সাগরতটের বালিতে যেমন জলের প্রায় অনির্দেশ্য দাগ লেগে থাকে… ঝিনুকের গায়ে যেমন লেগে থাকে সমুদ্রতলের অনন্ত ইশারা।

স্মৃতিচারণ অবশ্য শেষ হল না এখানেই। রিজার্ভ্‌ড বগি-র বাইরে, স্মরণ বিভাগে আমাদের আবার ফিরতে হল রবির কাছে -– আমাদের রবিশঙ্কর বল -– যে এই ছেঁড়াখোড়া সময়ের অবশিষ্ট সামান্য কয়েকটি আগুন কলমে ভরে প্রাণপণ লিখে চলেছিল, সেই আগুনেই পুড়ে যাওয়ার আগের মুহূর্ত পর্যন্ত। তার ঠিক পাশেই রইল আরও যে এক দিব্যোন্মাদ বিজ্ঞানীর প্রতি আমাদের স্মৃতিতর্পণ, তিনি জেবিএস হ্যালডেন। কী আশ্চর্য সমাপতন, রবিশঙ্কর ও জেবিএস -– দু’জন একেবারে দুই পৃথিবীর বাসিন্দা হয়েও নিজেদের লেখায় এবং যাপনে জীবনকেই তুমুল উদ্‌যাপন করে গিয়েছেন।

ফিদেল কাস্ত্রোর মৃত্যুর এক বছর হল। আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন শশী কাপুর এবং বাংলার জনবিজ্ঞান আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা শঙ্কর চক্রবর্তী। স্মরণ করা হল তাঁদেরও।

এর বাইরে আরও যা যা নিয়মিত বিভাগের জন্য আপনারা সারামাস অপেক্ষায় থাকেন, রইল গল্প-অণুগল্প-কবিতা-প্রবন্ধ-অন্যগদ্য-সহ সেই সমস্ত কিছুই। রইল বইপত্র আলোচনার হুইলার্স স্টল। যেখানে এবার প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাক্ষাৎকারটির শেষাংশ প্রকাশিত হল। থাকল কবি জয়দেব বসুর ডায়েরির নির্বাচিত অংশ। অরুন্ধতী রায় এবং জন কিউস্যাকের ‘থিংগস দ্যাট ক্যান অ্যান্ড ক্যান নট বি সেইড’ নিয়ে সমতা বিশ্বাসের আলোচনা

বাকিটুকু, আপনাদের হাতে…

২০১৮ ভালো কাটুক…

 

About Char Number Platform 523 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*