চিকিৎসা বি(ল)ভ্রাট

কৌশিক দত্ত

 

ডাক্তারি পড়তে গিয়ে যে কটা অত্যাচারের মোকাবিলা করতে হয়েছে তার মধ্যে একটা হল Health for all by 2000 A.D. শীর্ষক ১৯৭৮ সালের Alma Ata World Conference-এর ঐতিহাসিক ঘোষণাটি মুখস্থ করা। মুখস্থবিদ্যায় কোনওকালে স্বচ্ছন্দ ছিলাম না। তার ওপর আমাদের কমিউনিটি মেডিসিনের শিক্ষক এসব ঘোষণা আর ডেফিনিশন কমা ফুলস্টপ সমেত মুখস্থ করার প্রয়োজনীয়তায় এমন ধর্মীয় আস্থা পোষণ করতেন যে ভয়ের চোটে আরও বেশি করে গুলিয়ে যেত শব্দগুলো। নীরবে সহ্য করিনি তা বলে, ২০০৬ সাল নাগাদ একবার প্রাক্তন কলেজে বেড়াতে গিয়ে সেই প্রফেসরের সঙ্গে দেখা। সবিনয়ে প্রশ্ন করলাম, “এখনও মুখস্থ করাচ্ছেন স্যার, সেই Health for all by 2000 A.D? সালটা একই আছে?” স্যার কিছু বললেন না। সকলের জন্য স্বাস্থ্যের স্বপ্নের টার্গেট ততদিনে “বাই দ্য এন্ড অব দ্য থার্ড মিলেনিয়াম” বলে মনে হচ্ছিল। তবু বোধহয় সেসব দিন ভালো ছিল আজকের চেয়ে। সার্বজনীন স্বাস্থ্যের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য কোনও আন্তরিক সরকারি পরিকল্পনা ছিল না ঠিকই, কিন্তু স্বপ্নটাকেই প্রকাশ্যে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেবার ঔদ্ধত্যের প্রদর্শন ছিল না। এখন যেন ভাঙাচোরা মিনিবাসের উদ্ধত কন্ডাক্টর ভিড়ে হোঁচট খাওয়া বিভ্রান্ত যাত্রীদের আঙুল উঁচিয়ে ধমক দিয়ে বলছে, “চলুন চলুন, পিছন দিকে এগিয়ে যান।”

জনস্বাস্থ্য বিষয়ে সরকারি উদাসীনতার অজস্র উদাহরণ দেওয়া যায়। স্থানাভাবে সংক্ষেপে শুধু স্বাস্থ্যখাতে খরচার হিসেবটুকু দেওয়া যায়। জাতীয় আয়ের ৫% স্বাস্থ্যখাতে খরচা করতে পারলে ভালো। উন্নতিশীল দেশের পরিকাঠামো এবং পরিষেবায় এত সংস্কার প্রয়োজন, যে এর থেকে কমে হয় না। প্রশ্ন উঠতে পারে যে উন্নতিশীল দেশগুলি অপেক্ষাকৃত দরিদ্রও তো বটে। দেশের জন্য অতি প্রয়োজনীয় বোমা-বন্দুক, ক্রিকেটের সরঞ্জাম, এরোপ্লেন, ইত্যাদি কেনার পর পাঁচ শতাংশ স্বাস্থ্যের মতো গ্ল্যামারহীন ক্ষেত্রে ব্যয় করা কীভাবে সম্ভব? সেসব দিক বিবেচনা করার পরেও ভোর কমিটি, শ্রীনাথ রেড্ডি কমিশন, সকলেই জোর দিয়ে বলেছেন ৫% যদি নাও পারা যায়, অন্তত ৩% যেন অবশ্যই স্বাস্থ্যে বিনিয়োগ করা হয়। বাস্তবে ভারত নিজের স্বাস্থ্য সম্বন্ধে আর্থিকভাবে মাত্র ১.৩৬% চিন্তিত। এই ১.৩৬ শতাংশের একটি বড় অংশ অপব্যয় হয় পরিকল্পনা এবং নিয়ন্ত্রণের অভাবে। বহুস্তরীয় চৌর্যবৃত্তি সম্বন্ধে কিছু না বলাই বিধেয়। এসব বিষয়ে মুখ খুললে জেল-জরিমানা থেকে প্রাণসংশয় অব্দি হতে পারে সরকারি চিকিৎসক ও চিকিৎসা কর্মীদের। অর্থাৎ জাতীয় আয়ের এক শতাংশেরও কম (সঠিকভাবে) ব্যয় করে দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্য পরিষেবা চালানো হচ্ছে। তার মধ্যে টীকাকরণ, সারভেইলেন্স, প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিষেবা থেকে সর্বোচ্চ মেডিক্যাল কলেজের পরিষেবা অব্দি সবই রয়েছে।

কোনও দলের কোনও সরকারই এই বিষয়ে যথেষ্ট সদিচ্ছার পরিচয় দেননি। বর্তমান সরকার প্রথম সুযোগেই স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় আগের চেয়েও কমিয়ে নিজেদের অভিপ্রায় স্পষ্ট করে দিয়েছেন। অতি সম্প্রতি সেই অভিপ্রায় বিষয়ে সকলকে নিঃসন্দেহ করার জন্য পেশ করেছেন ন্যাশনাল মেডিক্যাল কমিশন বিল। বিলটির সমস্যা বোঝার জন্য দুটি বিষয় সংক্ষেপে উল্লেখ করে নেওয়া উচিত।

এক, চিকিৎসা পরিষেবাকে বিক্রয়যোগ্য পণ্য হিসেবে ক্রমশ ব্যবসায়ীদের হাতে তুলে দেবার প্রচেষ্টা অন্তত তিন দশক ধরে চলছে। সরকার স্বাস্থ্য পরিষেবা যথার্থভাবে দিতে অপারগ বলেই শুধু নয়, দিতে অনিচ্ছুক বলেই এই প্রচেষ্টা। উল্টো করে এও বলা যায় যে স্বাস্থ্য ব্যবসায়ে পুঁজিপতিদের যথেষ্ট মুনাফার সুযোগ দিতে চান বলেই সরকারের তরফে জনস্বাস্থ্য উন্নয়নের এই অনীহা। এই অনীহাটুকুই শুধু নয়, গত তিন দশকে স্বাস্থ্যবিষয়ক যেসব আইন প্রণীত হয়েছে এবং যেভাবে তার প্রয়োগ হয়েছে, তার একটা বড় অংশের মূল উদ্দেশ্য পুঁজির ক্রীড়াক্ষেত্রটিকে প্রসারিত ও মসৃণ করা। এই বিষয়ে কিছু আলোচনা আগে অন্যত্র করেছি।

দুই, মানুষকে শোষণ করতে হলে বিসমার্কীয় ডিভাইড অ্যান্ড রুল নীতির প্রয়োগ অতি ফলপ্রসূ, তা আমাদের রাজনীতিবিদেরা খুবই ভালো জানেন। জনগণের মধ্যে এই বিভাজন ভাষা, বর্ণ, জাত, ধর্ম,  ইত্যাদির ভিত্তিতে হতে পারে। ক্ষেত্রবিশেষে কর্মের ভিত্তিতেও। আবার বঞ্চনাকারী রাজা যদি জনরোষ থেকে বাঁচতে চান, তবে সহজ উপায় হল একটি রাক্ষসের মূর্তি নির্মাণ করে মানুষের সামনে উপস্থিত করা, যাতে ক্ষুব্ধ মানুষ তাকেই আক্রমণ করে। মড়কে বিধ্বস্ত প্রত্যন্ত আদিবাসী গ্রামে যেভাবে আক্রান্ত হতেন ডাইনি চিহ্নিত বিধবা মহিলারা (যাঁদের সম্পত্তি কেড়ে নেওয়াও ছিল বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একটি গোপন উদ্দেশ্য), আধুনিক নাগরিক ভারতে তেমনি জানগুরুর আদেশে দণ্ডিত ডাইনের নাম “ডাক্তার”। যেহেতু সহজে অ্যালিয়েনেট করতে পারার মতো টার্গেটকেই এসব ক্ষেত্রে নির্বাচন করতে হয়, তাই আয়ুর্বেদিক, যৌগিক, হেকিমী, যৌগিক চিকিৎসক বা ওঝা-গুণিনদের নয়, দানব সাজিয়ে আক্রমণ করার জন্য বেছে নেওয়া হয় পশ্চিমা বিজ্ঞান নির্ভর আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে (যার ইচ্ছাকৃতভাবে বিকৃত নাম “অ্যালোপ্যাথি”) প্রশিক্ষিত চিকিৎসকদেরই। চিকিৎসা পরিষেবার অন্দরে এই পরিকল্পিত ফাটল সৃষ্টির ফলে ডাক্তার-রোগী একজোট হয়ে আর সরকারের কাছে দাবিদাওয়া পেশ করতে পারবে না বা একযোগে কোনও অন্যায়কে প্রতিরোধ করতে পারবে না। আবার জনগণের যাবতীয় অসন্তোষ সামনে দৃশ্যমান চিকিৎসকের প্রতি ধাবিত হওয়ার সুযোগে প্রকৃত শোষকেরা অন্তরালে নিরাপদ থাকতে পারবেন।  কীভাবে সংবাদমাধ্যম, রাজনৈতিক প্রচার, ইত্যাদি সবকিছুকে কাজে লাগিয়ে এই খলনায়ক নির্মাণের কুনাট্যটি মঞ্চস্থ হয়েছে তার বিস্তারিত আলোচনা আজ নয়। আপাতত এটুকুই বলার যে দীর্ঘ অধ্যবসায়ে সৃষ্ট এই অন্তর্দ্বন্দ্বকে কাজে না লাগাতে পারলে ন্যাশনাল মেডিক্যাল কমিশন বিল পেশ করা এত সহজ হত না।

কী আছে এই বিলে, যা সমস্যাজনক? এত প্রতিবাদ কেন? দেখা যাক।

বর্তমান মেডিক্যাল কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া (এম সি আই), যা ১৯৫৬ সালে প্রণীত আইনানুসারে প্রতিষ্ঠিত ও নিয়ন্ত্রিত, তাকে বাতিল করে ন্যাশনাল মেডিক্যাল কমিশন প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা চলছে। দেশের প্রচলিত যাবতীয় আইন এমনকি সংবিধান বদলে ফেলার সার্বিক উদ্যোগের অংশ হিসেবে একে দেখা যায়।

প্রথমে স্বীকার করে নেওয়া যাক যে এম সি আই বিপুল কর্মভারাক্রান্ত, তাদের কর্মপদ্ধতির মধ্যে কিছু ত্রুটি আছে এবং অন্যান্য বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মতো এর মধ্যেও বেশ কিছু অনৈতিকতা আছে। কিছু কোরাপ্ট অধিকর্তার বিরুদ্ধে চিকিৎসকদের তরফ থেকেও প্রতিবাদ হয়েছে এবং কেতন দেশাইয়ের মতো ক্ষমতাধর ব্যক্তি অনৈতিক কাজকর্ম, আর্থিক অনিয়ম, ইত্যাদির জন্য হাজতবাসও করেছেন। অর্থাৎ সংস্থাটির সংস্কার প্রয়োজন ছিল এবং তা করাও হচ্ছিল, কিন্তু মাথাব্যথা সারাতে মাথা কেটে ফেলা উপযুক্ত শল্যচিকিৎসা কিনা, তা বুঝতে ডাক্তার হতে হয় না।

প্রস্তাবিত নতুন কমিশনে গণতন্ত্রের স্থান খুব কম। বদলে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ভয়াবহ। বর্তমান ভারতীয় মেডিক্যাল কাউন্সিলে সব রাজ্যের মেডিক্যাল কাউন্সিল থেকে প্রতিনিধি থাকেন। নতুন বিলে সেই সুযোগ থাকছে না। নির্বাচনের ব্যাপারটা উঠে যাচ্ছে, বদলে আসছে মনোনয়ন। বর্তমানের ১৩৩ জন নির্বাচিত সদস্যের কমিটির স্থানে প্রতিষ্ঠিত হবে ২৫ জনের একটি কমিটি। তার মধ্যে মাত্র পাঁচটি রাজ্যের পাঁচজন নির্বাচিত প্রতিনিধি থাকবেন। সেই পাঁচটি রাজ্যকে বাস্তবে কীভাবে বেছে নেওয়া হবে, তা অনুমেয়। বাকি ২০ জন, অর্থাৎ আশি শতাংশ সদস্য হবেন কেন্দ্রীয় সরকার মনোনীত। অর্থাৎ সম্পূর্ণ কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভার ইচ্ছাধীন একটি ডামি সংস্থা গঠিত হবে। কোনও সদস্য স্বাধীন মত প্রকাশ করলে তাঁকে বদলে ফেললেই হল।

এই নতুন কমিশনে অচিকিৎসক সদস্যদের হাতে বিপুল ক্ষমতা। আমলা এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিরা নিয়ন্ত্রণের রাশটি হাতে নেবেন। এঁরাই চিকিৎসা পদ্ধতি, চিকিৎসার মান নির্ধারণ, চিকিৎসা শিক্ষার পাঠক্রম, ইত্যাদি বিষয়ে নিদান দেবেন। এমবিবিএস ফাইনাল ইয়ারের মেডিসিন বিষয়ক পরীক্ষায় গোমূত্র বা পঞ্চগব্য বিষয়েই সব প্রশ্ন রাখা বাধ্যতামূলক হবে কিনা, তা এঁরাই স্থির করবেন ক্রমশ। এই কমিশনের শীর্ষে থাকবেন একজন অচিকিৎসক। অন্যান্য পেশার মানুষদের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখে প্রশ্ন করি, সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির আসনে আইন বিষয়ে সম্পূর্ণ অজ্ঞ একজন চিকিৎসককে বসিয়ে দিলে কেমন হবে?

ডাক্তারি পড়তে ভর্তি হতে প্রবেশিকা পরীক্ষা লাগে। সেই বিষয়ে কী নীতি হতে যাচ্ছে, তা আদৌ পরিষ্কার নয়। একদিকে চালু হচ্ছে এক সর্বভারতীয় প্রবেশিকা, যাতে আইসিএসই এবং সিবিএসই পাঠক্রমের ছাত্রছাত্রীরা, হিন্দীভাষীরা এবং ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়া ছাত্ররা অন্যান্য বোর্ডের এবং ভাষার স্কুলের পড়ুয়াদের চেয়ে সুবিধা পাবে। রাজ্যগুলির এবং আঞ্চলিক ভাষাগুলির ওপর এভাবে হিন্দী-ইংরেজি ও কেন্দ্রীয় পাঠক্রম চাপিয়ে দেওয়া (যা আদতে ফেডারেল স্ট্রাকচার বিলোপ করার এক বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ) হচ্ছে ছাত্রছাত্রীদের মান নিয়ন্ত্রণের নামে। অথচ বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলোকে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ডাক্তার ছাপানোর টাঁকশালে পরিণত করার আয়োজন হচ্ছে। এমনকি আদৌ ডাক্তারি না পড়ে মডার্ন মেডিসিন প্র‍্যাকটিস করার ছাড়পত্র দেবার ব্যবস্থাও হচ্ছে।

ডাক্তারি পাশ করার পরেও সেই একইরকম ব্যাপার। সরকারি স্বীকৃত কলেজগুলো থেকে পাশ করার পর ইন্টার্নশিপ শেষ করা ছাত্রদের একটি একজিট পরীক্ষা দিতে হবে স্নাতকোত্তর পড়াশুনার ছাড়পত্র পেতে গেলে। এতে আপত্তির কী আছে? আপত্তি অস্বচ্ছতায়। আমরাও এমবিবিএস, এমডি, ডিএম, ইত্যাদি পড়ার জন্য প্রতি পদক্ষেপে প্রবেশিকা পরীক্ষা দিয়েছি। সর্বভারতীয় পরীক্ষায় স্থানাধিকার করেই এমডি পড়তে গেছি। কিন্তু কী পরীক্ষা দিচ্ছি এবং কেন দিচ্ছি, তা পরিষ্কার ছিল। এই নতুন পরীক্ষাটির নাম দেওয়া হয়েছে একজিট একজাম। ধরা যাক,  কোনও ছাত্র স্নাতকোত্তর পড়তে চায় না। সে কি এই পরীক্ষা দেবে? না দিয়েও কি সে জেনারেল প্র‍্যাক্টিস করতে পারে? যদি সে এই পরীক্ষা দিয়ে অনুত্তীর্ণ হয়, তাহলেও কি এমবিবিএস হিসেবে প্র‍্যাক্টিস চালিয়ে যেতে পারবে? পরবর্তীকালে আবার পরীক্ষা দিতে পারবে? কতবার? যদি শুধু স্নাতকোত্তর পড়ার জন্যই পরীক্ষা হয়, তাহলে এর নাম “একজিট একজাম” কেন? এন্ট্রান্স টেস্ট বলা উচিত, যা আগেও ছিল। যদি এমবিবিএস পাঠ সম্পূর্ণ হয়েছে কিনা যাচাই করার জন্যই হয়, তাহলে রেজিস্ট্রেশন পাবার শর্ত হিসেবেই এটাকে দেখানো উচিত। মজার ব্যাপার হল, নিজেদের সরকারি কলেজগুলির মানের উপর সরকারের আস্থা নেই, তাই এই পরীক্ষার আয়োজন। অথচ টাকা দিয়ে চীন বা আজেরবাইজানের পরিকাঠামোহীন প্রতিষ্ঠান থেকে ডিগ্রী কিনে আনলে কোনও পরীক্ষা লাগবে না, জানতেও চাওয়া হবে না ছেলেটি বা মেয়েটি আদৌ কোনওদিন কলেজে গিয়েছিল কিনা। কড়ি দিয়ে কিনলে ডিগ্রী পবিত্র। আগে ফরেন মেডিক্যাল গ্র‍্যাজুয়েটদের জন্য পরীক্ষা ছিল, যেমন প্রতি দেশেই থাকে। সেটা তুলে দিতে চাওয়া হচ্ছে। অথচ আমাদের অভিজ্ঞতায় এইসব প্রতিষ্ঠান থেকে পাশ করা ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে পার্থক্য বিস্তর। কিছু ছাত্রছাত্রী ভালো, অনেকে প্রায় কিছু শিখে আসার সুযোগ পাননি। সুতরাং সরকার কী চাইছেন, তা স্পষ্ট নয়।

বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলোর মান নিয়ন্ত্রণ করার ব্যাপারে আশঙ্কাজনক শিথিলতা সৃষ্টি করা হচ্ছে। এঁরা নিজেদের ইচ্ছামতো পরিকাঠামোয় ইচ্ছামতো আন্ডারগ্র‍্যাজুয়েট এবং পোস্টগ্রাজুয়েট সিট খুলতে পারবেন। তাদের গুণমান নিয়ন্ত্রণ করার জন্য এমসিআই-এর নিয়মে কিছু বাড়াবাড়ি ছিল বলে অভিযোগ, যার দরুন বেশি বিনিয়োগের প্রয়োজন হচ্ছিল। এখন বাড়াবাড়ি রকমের কমাকমি করে শোধবোধ করার চেষ্টা হচ্ছে বুঝি। ভেবে দেখা দরকার, নিয়ন্ত্রণ না থাকলে ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান সর্বাধিক লাভের চেষ্টা করবে। যথেষ্ট শিক্ষক নিয়োগও করবে না। এই কলেজগুলোর ফি নিয়ন্ত্রণ করার ব্যাপারটিও ছেড়ে দিতে চলেছেন সরকার। মাত্র ৪০% সিটের মূল্য নিয়ন্ত্রণ কিছুটা সরকারের হাতে থাকবে, বাকি ৬০% সিটে যথেচ্ছ দাম নেওয়া যাবে। আন্দাজ করা যায় পড়ার খরচ পাঁচ-দশ কোটি টাকা অব্দি হতে পারে। এই বিপুল অর্থ কারা ব্যয় করতে পারেন, তা আমরা জানি। এই অর্থ তাঁরা অপব্যয় করবেন না, ব্যবসার বিনিয়োগ হিসেবে দেখবেন এবং পরবর্তীকালে সুদে-আসলে তা উসুল করতে চাইলে তাঁদের দোষ দেওয়াও যাবে না। আবার এঁদের অনেকেই নিয়ন্ত্রণহীন প্রাইভেট কলেজে অসম্পূর্ণ প্রশিক্ষণ পাবেন। কালক্রমে চিকিৎসা পরিষেবার ক্ষেত্রে দেশী বিদেশী প্রাইভেট কলেজ থেকে বিপুল অর্থমূল্যে ডিগ্রীপ্রাপ্ত চিকিৎসকের সংখ্যাধিক্য হবে বলে আশা করা যায়। সম্ভবত পরের ধাপে সরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলোর ঝাঁপ বন্ধ হবে। সেই সময়ের চিকিৎসা বাণিজ্য ক্রয় করার জন্য সকলে প্রস্তুত তো?

সরকারি বেসরকারি চিকিৎসা ও মেডিক্যাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বা চিকিৎসক অনিয়ম করলে তার শাস্তি বিধান করার জন্য এমসিআই নির্দিষ্ট নিয়ম মানতে বাধ্য ছিল। এই বিল অনুসারে মাত্র তিন সদস্যের একটি কমিটি নিজেদের ইচ্ছামতো পাঁচ কোটি থেকে একশ কোটি টাকা জরিমানা করতে পারবেন। প্রক্রিয়ার কোনও স্বচ্ছতা থাকছে না। অর্থাৎ আপনি যদি কোনওভাবে চিকিৎসা পরিষেবা বা চিকিৎসা শিক্ষার সঙ্গে জড়িত হন, তাহলে সরকারের প্রতিটি কাজে (চিকিৎসা ক্ষেত্রের বাইরের কাজেও) আপনাকে “জী হুজুর” বলতে হবে। নইলে একশ কোটি জরিমানা হতে পারে, যা ফাঁসির নামান্তর অধিকাংশের ক্ষেত্রে। একমাত্র অতি ধনী আর নির্দিষ্ট লবির খেলোয়াড়েরাই থাকবেন, বাকিরা বিলুপ্ত হবেন।

তাহলে এদেশে সাধারণ মানুষকে চিকিৎসা পরিষেবা দেবার মতো কেউ কি থাকবেন না? থাকবেন ক্রসপ্যাথি বিশেষজ্ঞরা। সরকার বলছেন হোমিওপ্যাথি, কবিরাজি, ইউনানি, এমনকি ন্যাচুরোপ্যাথি প্র‍্যাকটিস করা যেকোনও চিকিৎসক মাত্র তিন সপ্তাহের ব্রিজ কোর্স করে মডার্ন মেডিসিন প্র‍্যাকটিস করতে পারবেন। অর্থাৎ তিন সপ্তাহে এক কোটি নতুন চিকিৎসক জোগান দেওয়া সম্ভব। ক্ষতি কী? ডাক্তারেরা আপত্তি করছেন কেন? ব্যবসা মারা যাবার ভয়ে? অনেকের তেমন ধারণা, এবং ধারণাটা ভুল। তবে কি অহংকার? এটাও অনেকেই মনে করছেন এবং এই ধারণা কিয়দংশে ঠিক। ব্যক্তিগতভাবে আমার এই সমস্যাটিও নেই। খিদে কম, তাই ব্যবসা খোয়ানো নিয়ে ভাবছি না। নিজেকে পণ্ডিত মনেও করি না। অন্যান্য প্যাথির ব্যক্তিদের চেয়ে নিজেকে উঁচুতে ভাবি না। তাহলে সমস্যা কোথায়?

ধরা যাক আয়ুর্বেদ, যার সম্বন্ধে আমি খুবই শ্রদ্ধাশীল। ব্যবসায়ী বুজরুক বাবাদের হাত থেকে মুক্তি পেয়ে আয়ুর্বেদ নিয়ে সত্যিকারের গবেষণা হোক, এ আমার বহুদিনের ইচ্ছা। কিন্তু আয়ুর্বেদাচার্য যদি অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ লেখেন, তাহলে তা কি আর আয়ুর্বেদ থাকবে? একটি (প্রতি)ক্রিয়াহীন ঔষধব্যবস্থা হিসেবে হোমিওপ্যথিতে অজস্র মানুষের বিশ্বাস। বিভিন্ন অটোকন্ট্রোল ডিজিজ হোমিওপ্যাথি ওষুধ খেলেও সেরে যায় এবং সেসবের জন্য অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ না খাওয়াই ভালো, এ প্রতিষ্ঠিত সত্য। এর বাইরে আর কোথায় কতটা কাজ করে এই প্যাথি, তা ভালো করে জানি না বলে এ নিয়ে তর্কও করি না এবং এই চিকিৎসকদের অসম্মানও করি না। প্রশ্ন একটাই, এঁদের নিজেদের কাজটা করতে দিলে হত না? এঁদের দিয়ে যদি “অ্যালোপ্যাথিক” ওষুধ (যা বিষাক্ত এবং ব্যর্থ বলেই এঁরা এতদিন প্রচার করে এসেছেন) লেখানো যায়, তবে কি চিকিৎসাটা আর হোমিওপ্যাথি থাকে? ইউনানি, ন্যাচুরোপ্যাথি, রেইকি, ফেইথ হিলিং, সবকিছু সম্বন্ধে একই কথা।

এঁদের সকলের প্রতি আমরা শ্রদ্ধাশীল, তাই চাই এঁরা নিজেদের পদ্ধতিতে মূল্যবান পরিষেবা দিন। ইঞ্জিনিয়ারিং-এর তিন সপ্তাহের ব্রিজ কোর্স করে আমি যদি একটি ব্রিজ তৈরি করতে চাই ব্রহ্মপুত্রের ওপর, তবে সর্বভূতে সাম্যদর্শী ব্রহ্মজ্ঞানীও তা অনুমোদন করবেন না। তিনিও ইঞ্জিনিয়ার আর ডাক্তারে পার্থক্য করবেন। ব্রিজ কোর্স করা ইউনানি চিকিৎসক আধুনিক চিকিৎসার পদ্ধতিতে আপনার হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের চিকিৎসা করলেও আমার বানানো ব্রিজের মতো সেই স্বাস্থ্য পরিষেবা ব্যবস্থার ভেঙে পড়া অনিবার্য। আর এঁদের মান নিয়ন্ত্রণ বা বিচার হবে কী করে? কোর্টে আজকাল চিকিৎসকদের শাস্তি দেবার যুক্তিতে বলা হয়, “আপনি যে পদ্ধতিতে চিকিৎসা করেছেন, তা ২০১৬-র গাইডলাইনে ছিল ঠিকই, কিন্তু ২০১৭-র ডিসেম্বরে নিউ ইংল্যান্ড জার্নালে যে গবেষণাপত্র ছাপা হয়েছে, সেই অনুযায়ী আপনি পরিবর্তন করেননি। রুগী যেদিন ভর্তি হয়েছিলেন তার তিনদিন আগে প্রকাশিত হওয়া সত্ত্বেও আপনি ৭২ ঘণ্টা সময় পেয়েও তা পড়েননি, অতএব…” এই মনোভাবের পাশে কোথায় রাখবেন তিন সপ্তাহের ডাক্তারি শিক্ষাকে? ব্রিজ কোর্স করা রেজিস্টার্ড চিকিৎসকদের কাছেও কি একই প্রত্যাশা রাখবেন? সেটা কি তাঁদের প্রতি প্রতি অন্যায় করা হবে না? এঁদের তবে বিচারের আওতার বাইরে রাখা উচিত। সেটা হবে তো?

আলোচনা এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকলে তার আকার বাড়তেই থাকবে। আপাতত ভাবনার সুতোটা আপনাদের হাতে ধরিয়ে দেওয়াটুকুই আমাদের কাজ। প্রতিরোধও অবশ্যই চিকিৎসকদের দায়িত্ব। প্রাথমিকভাবে তা করাও হয়েছে, কিন্তু কতদূর করা সঙ্গত। এই কদিনে দেখলাম এই বিল এলে ডাক্তারদের খানিক “বাঁশ” দেওয়া যাবে ভেবে অনেকে রীতিমতো উৎফুল্ল। ডাক্তার নামক আপদের যাত্রাভঙ্গ করতে পারার জন্য নিজেদের নাসিকা কর্তনেও রাজি অনেকেই। চিকিৎসকদের আন্দোলনকে নিন্দা করে অতি কুৎসিত ভাষায় বক্তব্য রেখেছেন অনেকেই। পরিষেবার উপভোক্তারা যদি এটাই চান, তাহলে গায়ে পড়ে তাঁদের লড়াইটা লড়ে দেওয়া কতদূর সঙ্গত? সচেতন করা উচিত, করা হয়েছে। বলে ফেলা ভালো, এই লড়াইটা মূলত আপনাদের, রোগীদের এবং পরিজনের। সাধারণ মানুষের লড়াই। সবাই মিলে যদি না লড়েন, তবে একে একে একুশ দফা আইন তৈরি হবে। তারপর সন্ধে ছটার আগে বিন-টিকিটে যদি হেঁচে ফেলেন ভুলক্রমে…..

About Char Number Platform 844 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*