তিন প্রহরের বিল ও বরুণার প্রতিগল্প

বল্লরী সেন

 

আসলে নিজে বৈ আর-অন্য কিছুর হদিশ দেয় এই মেলা। কিন্তু ভারচুয়াল মিডিয়াতে নিজের বই-এর এলাহি বিজ্ঞাপন এখন দু’বেলা চলছে। তার বাইরে ইনবক্সেও চলছে পই পই করে কিনবার তাগাদা, ঠেলা খেয়ে বন্ধু-বান্ধব-অবান্ধব সবাই তিতিবিরক্ত। কিন্তু মাঠের বইমেলা আজও রোমাঞ্চকর একটি প্যাকেজবিশেষ। বছরে একবার বৈ দু’বার নয়, কিন্তু এরই অবলম্বনে অজস্র বই-এর কাছে পৌঁছতে কেউ এসে পাশে দাঁড়ালেই — একটু চোখের চাহনি বিনিময়, কত তুফান তোলে বজ্রবিদ্যুৎভর্তি সেই খাতা। মাঠের ওপর ছায়ায় বসে মনের প্রাণের গল্প, বাবা বলছেন — না, হবে না। এ বিয়েতে একটুও মত নেই। সেই ঐতিহ্য সমানে চলছে। আর যাদের মাঠে একটু ফাঁকায় বসার সুযোগও নেই, তাদের আছে জৈন শিল্পমন্দিরের হরেক মাল ৩৭ টাকায়। আদা, মরিচ, হজমিগুলি, আমচুর, আমাশয় চূর্ণ থেকে আরও বিভিন্ন প্রকার মশলা ও সরঞ্জাম। বইস্পৃষ্ট বাঙালির পৈটিক ব্যামো এখন আরও বেশি, প্রদাহ ও চাপ আরও বেশি। মেয়ে বা ছেলের পাশে সঙ্গীটি যে প্রথম দিনের সঙ্গে শেষদিনের কোনও মিল হয় না। মধ্যে আরও কেউ। মাইক্রোচিপের মধ্যে ব্যক্তিমনের তির্যক পরিবর্তনের তাঁত কী অদ্ভুতভাবে কখনও ডাইজিন আবার কখনও মিউকেন জেল দিয়ে পরিপাকযন্ত্রের প্রতিক্রিয়ায় খাপে খাপ পঞ্চার বাপ হয়ে যান। সবেতেই নিয়মনিগড়ে বাঁধা দুর্বার প্রেমের ধারাবিবরণী। বইমেলা সেই গার্গী বা শ্রেয়সীকে পাশে নিয়ে কনুই ছুঁই-ছুঁই অপরাহ্ণকে একটিবারের জন্য কড়াচোখে চ্যালেঞ্জ জানানো। বান্ধবী রফা না করলে একবেলা বিনা কারণে বই-এ মুখ গুঁজে মেসেঞ্জার সার্চ দিয়ে মেপে নেওয়া, তারপর দিন থেকে বন্ধুদের টেবিলে লিটল ম্যাগাজিন প্যাভিলিয়নে এসে দাঁড়ালেই ক্রিসমাস মনে হয়। যেন মৌমাছিরা দলে দলে চাক থেকে ফুলে আর ফুল থেকে চাকে হেরাফিরি করছে। তবু তাদের মধ্যে জ্বর নিয়ে রোদের দিকে মুখ ফিরিয়ে তুমি বসো, তোমার সামনে অঢেল কাজ, নিজের এক চিলতে স্টল, নতুন বইয়ের পাট-ভাঙা কাপড়ের মতো গন্ধ ম’ম করছে, যেন মা গ্রীষ্মকালের সন্ধ্যায় ইস্তিরি ভেঙে গা ধুয়ে শাড়ি পড়লেন। নতুন ছাঁদের বই, প্রতিটি পাতার সংখ্যাগুলো যেন প্রসবের পর নাড়ীকাটা। তুমি আদরে ওদের বুড়ি ছুঁয়ে বিষন্নতাকে তরুণ দু আঙুলে ভেঙচি কেটে থাকো — এখন ‘হাম কিসি সে কম নেহি’।

সুদূর আগরপাড়া থেকে মিলনমেলার চেয়ে এ বেশ ভালো। তবু মনের কোণ থেকে কখনও পিছলে যায় সেই নামটা। বইয়ের সঙ্গে তাকেও না হয় নামিয়ে দু’মিনিট জিরোও। বেনফিশে একটা গরমাগরম ফ্রাই খেতে খেতে নতুন কাউকে নিয়ে দু চুমুক কফি চলুক। আর একটা মিষ্টি রঙ সেলফি, দেখে চোখ বুজে ফেলো না যেন!

About Char Number Platform 179 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*