ইতিহাস পুরাণের গোণ্ডবীর জটবা খণ্ডাৎ, শেষ পর্ব

অতীন্দ্রিয় চক্রবর্তী

 

পঞ্চম উপকথা, পর্ব — দুই এখানে

 

সেই শুনে দাওয়ায় বেরিয়ে এল ভুনিয়া। সে’দিনের উচ্ছ্বল কিশোরী রাজকন্যা ভুনিয়া, বিজয়ী বহিরাগত রাজশক্তির বারাঙ্গনা যুবতী মনোমোহিনী আজ লোলচর্মা শনের নুড়িচুলো বুড়িটা — প্রশান্ত তার চাহনি। জটবাজননীকে দেখে কাঠুরিয়ারা চিনতে পারেনি তাকে তাদের সেই হারিয়ে যাওয়া রাজকন্যা বলে। আর পারবেই বা কী করে? গোণ্ডদের সবাই তো তখনও তাদের গাঁ-ঘরে ফিসফিস করে বলে

–‘বড় ভালো ছিল ভুনিয়াটা। তার সাথে কী অত্যাচারটাই না করত গাঔলিগুলো! কী জানি সত্যিই সে নিজে নিজেই কোথাও চলে গেছে নাকি ভোগ মিটিয়ে একেবারেই মেরে গুম করে দিল ওরা!’

সে’দিনের মা-ছেলের কুটিরের দাওয়ায় ভুনিয়া যখন তাই ওদের জন্য ঠাণ্ডা জল নিয়ে এল, তখন গোণ্ড কাঠুরিয়ার সেই দল ভেবেছিল বুঝি কোনও বন-মা এসেছে তাদের সামনে। তাদের চোখেমুখে সেই অবাক বিস্ময়মিশ্রিত ভক্তিভাব দেখে তার চিরাচরিত স্বভাবে খিলখিল করে হেসে উঠল ভুনিয়া। চমকে উঠে জানা-অজানা ভয়ে শিউড়ে উঠল কাঠুরিয়ারা। এই হাসির স্বর যে তাদের বহুচেনা!

আর ঠিক তখনই জটবা পরিচয় করিয়ে দিল—

–‘আমার মা, ভুনিয়া!’

এইবার ভয়ে থরথর করে কেঁপে উঠল কাঠুরিয়ারা। গভীর জঙ্গলে এভাবেই বুঝি ভূত-প্রেত-হাঁকিনী-ডাকিনীদের ইন্দ্রজালে পড়ে যায় মানুষ! ভয়ে ওদের গলা শুকিয়ে কাঠ, জিভ নড়ছে না, চিৎকার করতে গেলে আওয়াজ বেরোচ্ছে না।

তখন পরিস্থিতি সামাল দিল ভুনিয়া। তার সেই ভয়ভাঙানো, জ্বালাজুড়োনো কণ্ঠস্বর যা এত বছর পরেও গোণ্ড প্রজারা ভোলেনি, সেই স্বরেই সে বলল–

–‘ভয় পেও না। আমি ভূতপ্রেত নই। আমাকে ওরা মারতে পারেনি, মরে গেছি ভেবে ঐ জঙ্গলটাতেই ফেলে চলে গিয়েছিল। আর এইটা আমার ছেলে বুধন।’

ভয় ভাঙল গোণ্ড কাঠুরিয়াদের। সেদিন ভুনিয়া-বুধনের কুটিরের দাওয়ায় বসে ক্ষুৎপিপাসা মিটিয়ে মা-ছেলের সাথে আশ মিটিয়ে গল্পসল্প করে প্রাণমন ভরে গেল ওদের। এর পর থেকে প্রতিনিয়তই সেই আদিবাসী কাঠুরিয়ারা তাদের স্বজাতীয় সমাজের বন্ধু-পরিজন-কুটুম্বদের নিয়ে ঘনঘন হাজির হতে লাগল মা-ছেলের দুয়োরে। নতুন বন্ধুদের পেয়ে বুধনও মহাখুশ। সে ওদের সাথে গোপনভাবে দেওগঢ়ের গোণ্ড আদিবাসী গ্রামগুলোতে যাওয়া আরম্ভ করল, প্রত্যক্ষ করতে লাগল পরাধীন স্বজাতির দৈনন্দিন দুঃখ-কষ্ট-অপমানগুলো। এসব সে যত দেখে, যত বোঝে, তত তার মনে মুক্তিচেতনার স্পৃহা আগুন ছড়াতে থাকে। কিশোর বুধন তিলতিল করে পরিণত হতে থাকল মহাযোদ্ধা জটবা খণ্ডাৎ-এ।

ক্রমে ক্রমে সে শুরু করল রাতের অন্ধকারে বিভিন্ন গ্রামে গোপন ডেরায় গোণ্ড সমাজের প্রবীণ প্রাজ্ঞ মুখিয়া-সিয়ানদের সাথে জমায়েত হয়ে চাপাস্বরে শলাপরামর্শ করা। নৈশ-মিটিংগুলোর থেকেই বিদ্রোহের সলতে পাকানো শুরু। সমস্ত কিছুই হতে থাকল সন্তর্পণ সঙ্গোপনে। বিজয়মদে, আমোদপ্রমোদে লিপ্ত গাঔলি রাজতন্ত্র এর হুঁশ পেল না।

অচিরে, অনুরূপ গোপনীয়তার সাথেই, সেই সাতপুরার পুবদিকের আঁচল-ধোয়া কনহন নদীর দুইধারের ঘন জঙ্গলের ভিতরে, জটবার তত্ত্বাবধানে, শুরু হয়ে গেল যুদ্ধের প্রস্তুতি। দেওগঢ়ের গোণ্ডগ্রামের ঘর ঘর থেকে টাঙিয়া, ফরসা (পরশু/কুঠার), তীর, ধনুক, তলোয়ার, বল্লম, ছুরি নিয়ে স্বাধীনতাকামী গোণ্ড যুবকেরা অস্ত্রপ্রশিক্ষণ নিতে থাকল সেইখানেই। তখনও গাঔলিরাজার হুঁশ নেই। ক্রমে সেই চরম দিন ঘনিয়ে এল। তখনও হাটে-মাঠে-ঘাটে-বাঁটে চলমান, খেতিতে-খামারে কর্মরত গোণ্ডদের মুখচোখের কঠিন অথচ ভাবলেশহীন অভিব্যক্তি দেখে গাঔলি রাজপুরুষেরা বুঝতে পারেনি কীভাবে একটা ইতিহাসের পালাবদলের দিন ঘনিয়ে আসছে।

তামাম দুনিয়ার মূলবাসী, অর্থাৎ ‘indigenous’ মানুষদের বসতিগুলোর মতোই, দেওগঢ়ের বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলেও সেকালে অনেক মেলা হত। সেরকমই দেওগঢ়ের সেই কেল্লার ময়দানেও একটা মেলা বসত। নানান দ্রব্য ও বস্তুর বিকিকিনির ঢলে বয়ে যেত শোষকের অর্থে কেনা শোষিতের শ্রমের মূল্য ও উদ্বৃত্ত মূল্য। আবার, তামাম দুনিয়ার তামাম মেলা-মোচ্ছবের মতোই, এই মেলাতেও আয়োজন হত নানান তামাশার — মোরগ-লড়াই, মানুষ-মোষের লড়াই।

এই তামাশাগুলো আজও ছাপ রেখে যাচ্ছে দুনিয়াভর। তাই-ই তো দক্ষিণ আমেরিকার মোরগ-লড়াই-পাগল কর্নেলকে কেউ চিঠি লেখে না, স্পেন-পর্তুগালের আমজনতা আমোদ পায় matador-ক্রীড়ায়, ভিয়েতনামের গভীর জঙ্গলে কর্নেল কার্টস-কে আর একটা প্রবল মহিষকে খাড়ার কোপে কোপে টুকরো হতে হয়, নিয়মগিরি পাহাড়ের নিয়মরাজার মেলায় ছুরি-চাকু-দা-কাটারি হাতে ধেয়ে যায় কৈতর ছুটতে থাকা খ্যাপা মোষের পিছু!

সেদিনের গোণ্ডওয়ানায় মানুষ-মোষের লড়াইগুলোও হত তীব্র ও রক্তক্ষয়ী। যতক্ষণ না মানুষ অথবা মোষ, কোনও এক পক্ষ ঘায়েল হয়ে লুটিয়ে পড়ছে, ততক্ষণ লড়াই চলতেই থাকবে — এই ছিল সেই ‘খেলা’র নিয়ম। এইরকমই এক খেলা লেগেছে কেল্লার ময়দানে। উঁচুতে বর্ণাঢ্য মঞ্চ সাজিয়ে তামাশা দেখতে এসেছেন স্বয়ং গাঔলি-নরেশ।

সেবার মেলায় পেল্লাই একটা মোষ বেরিয়েছিল। যেমন তার পেশীর পাহাড়, তেমনি তার তেজ আর রাগ! মেলার সব যুবকেরা, যারা সেই বিপুলকায় মহিষকে দেখার আগে ভেবেছিল কেল্লার ময়দানে মোষের লড়াইতে দু’এক হাত তলোয়ার দাগিয়ে দেখবে, তারা তাকেই দেখেই এদিক ওদিক প্রাণভয়ে ছুট মারছিল। এমন সময় তার পথ রুধে দাঁড়াল জটবা খণ্ডাৎ। হাতে উদ্যত সেই দেবীদত্ত কাঠের তলোয়ার! প্রকাণ্ড সেই মোষ শিং বাগিয়ে তেড়ে এল জটবার দিকে। জটবা এক লহমা বুকে দম ধরে বুঢ়া-দেও, বুঢ়ি-দাঈ-র স্মরণ নিয়ে নিল।

লড়াই হল প্রবল। সাঁইসাঁই সেই ‘খণ্ডাৎ’-‘খণ্ডা-মুখিয়া’ বীরের কাঠের তলোয়ার চমকে চমকে উঠতে লাগল বিদ্যুজ্ঝলকে। মোষের ধর আর মুণ্ড বিচ্ছিন্ন হয়ে লুটিয়ে পড়ল মেলার ধুলোয়। মেলার লোকজন কাণ্ড দেখে হতবাক! কিছুক্ষণ বিস্ময়ে স্তব্ধ থেকে তারপর হর্ষধ্বনিতে ভরে উঠল মেলাপ্রাঙ্গন। সেই মঞ্চ থেকে তো এই তামাশা দেখে মহাখুশ গাঔলিরাজা। তলব পড়ল জটবার। রাজা মোতির মালা পরিয়ে দিল জটবার গলায়। মধুমাখা শব্দে ভূয়সী প্রশংসা জুড়ল জটবার।

স্বাধীনচেতা আদিবাসী যুবক আর কাঁহাতক তার সবকিছু কেড়ে নেওয়া বহিরাগত বিজাতীয় রাজার ভ্যাটোরভ্যাটোর সহ্য করবে? সহসা সে এক হ্যাঁচকায় সেই মোতির হার ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে খাপ থেকে বের করে আনল সেই কাঠের তলোয়ার। মঞ্চে তলোয়ার ঠুকে হুঙ্কার করে উঠল জটবা খণ্ডাৎ!

–‘তবে রে পাপী! আমার রাজত্ব কেড়ে আবার আমার গলাতেই মোতির মালা পরিয়ে তামাশা করা হচ্ছে!’

বেগতিক দেখে স্ব-স্ব অসি কোষমুক্ত করে ছুটে আসল রাজপ্রহরীর দল। ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে। তলোয়ারের এক কোপে লুটিয়ে পড়েছে গাঔলিরাজ। আর সিগন্যাল পেয়েই রে রে করে ঢাল তরোয়াল টাঙিয়া বল্লম বাগিয়ে ছুটে এসেছে মেলার ভিড়ে মিশে থাকা গোণ্ড গেরিলাবাহিনী। কিছুক্ষণ চারিদিকে মারমার কাটকাট শব্দ, অস্ত্রে অস্ত্রে ধাতব ঠোকাঠুকির আওয়াজ, আর ত্রস্ত দিশেহারা মেলায় আশা জনতার বিক্ষিপ্ত ছোটাছুটি, ভয়ার্ত চিৎকার। চোখের পলক পরতে না পরতেই যেন পুরো ব্যপারটা ঘটে গেল। মেলায় ভীতচকিত জনতা সহসা দেখল, লড়াই শেষ হয়েছে, সেই যে মঞ্চটায় সিংহাসনের উপর একটু আগেই বসে ছিল গাঔলি-নৃপতি, সেইখানে বসে আছে সেই অদ্ভুত গোণ্ড যুবক যে কিনা একটু আগেই একটা কাঠের তলোয়ার দিয়ে এক কোপে একটা পেল্লাই সাইজের মোষের গর্দান নামাচ্ছিল। কাণ্ডকারখানা দেখে হতবাক জনতার ভীতি অচিরেই পরিণত হল তুমুল আনন্দরোলে।

ততক্ষণে রাজমাতা ভুনিয়াকে একরকম কাঁধে চাপিয়েই সেই কনহান নদীতীরের পর্ণকুটির থেকে নিয়ে আসা হয়েছে সেই কেল্লার মাঠে। যুদ্ধজয়ের যে নিয়মে আজও ভারত উপমহাদেশের বিস্তীর্ণ আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলে মোরগ-লড়াই অবসানে বিজয়ী মোরগকে পরমোৎসাহে খাওয়ানো হয় বিজিত মোরগের কলজে, সেই নিয়ম মেনেই ভুনিয়া রক্তস্নাত শত্রুদেহ তর্জনী দিয়ে স্পর্শ করে স্বীয় কপালে ধারণ করল রুধিরতিলক। ততক্ষণে জয়জয়কার মঙ্গলধ্বনি দেওগঢ়-কেল্লায় আকাশ বাতাস ছাপিয়ে প্রতিধ্বনি তুলেছে সাতপুরা পাহাড়ের পুবদিকের পাথুরে, বুনো দেওয়ালে।

 

এরপর ষষ্ঠ উপকথা

1 Trackback / Pingback

  1. বস্তারের উপকথা — দশ – ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*