হারানো ট্রেনযাত্রা

বিশ্বজিৎ রায়

 

কত শব্দ যে একে একে হারিয়ে গেল।

কয়লার ইঞ্জিনের ঘষঘষে শব্দ, স্টেশনের ঘণ্টার শব্দ। পুরুলিয়া হাওড়া যাতায়াতের তখন একটাই ট্রেন — হাওড়া চক্রধরপুর প্যাসেঞ্জার। পুরুলিয়া থেকে ছাড়ত সন্ধেবেলা, হাওড়া পৌঁছত পরদিন সকালে। পুরুলিয়া ছাড়বার পর ছোট ছোট সব স্টেশন — ছররা, আনারা, বাগালিয়া, কুস্তাউর। একটারও সিমেন্টের প্ল্যাটফর্ম নয়। লাল মাটি। ট্রেন থামলে লাফ দিয়ে নামতে হত। গোরু ছাগল সেখান দিয়ে যায় আসে। ঝুপঝুপে সন্ধেবেলায় কুপি জ্বলে, একটা-দুটো। সেগুলো থেকে ধোঁয়া ওঠে। ঝুড়ি মাথায় কখনও কখনও সেখানে বসে থাকে চিনে-বাদামওয়ালা। তারপর একসময় বাজে ঘণ্টা। প্রথমে একটা পড়ল, তারপর দুটো পড়ল, তারপর পড়ল তিনটে। যেই তিনটে ঘণ্টা বাজল অমনি ট্রেন আস্তে আস্তে চলতে শুরু করে। যে লোকটা নাবাল প্ল্যাটফর্মে ঘণ্টা বাজায়, সে কেমন করে আনমনে ট্রেনের দিকে চেয়ে থাকে। তারপর ঘণ্টাটা হাতে নিয়ে একলা ঘরে ঢুকে যায়। ঘণ্টা দেওয়ার সেই লোহারদণ্ডটির অধিকার একমাত্র তার। সেই দণ্ডের শব্দে ট্রেন স্টেশন ছাড়ার অনুমতি পায়। ট্রেনের আছে গতি, ঘণ্টাওয়ালার গতি নেই তবে ট্রেনকে ছুটি দেওয়ার ক্ষমতা আছে। লোকটা আর স্টেশনটা পেছনে পড়ে থাকে, ট্রেন খালি সামনে সামনে চলে চলে যায়।

কলকাতা ফিরতি পুরুলিয়া। সাত সকালে আদ্রা স্টেশনে ট্রেন থামত। অমনি দেখি একদল উঠে পড়ল। খুব বড় নয় তারা, বাচ্চা বাচ্চা ছেলে। হাফপ্যান্ট পরা। ‘এই দাঁতন, এই দাঁতন’ বলতে বলতে ডাক দিত। তাদের বাবারা অন্য কিছু বিক্রি করত। তারা বাচ্চা ছেলে, অন্য কিছু বিক্রি করতে পারবে কেন? তাই নির্ভেজাল, নিরাপদ দাঁতন দিয়েই তাদের বিক্রির হাতেখড়ি হত। দাঁতন মানে নিমের ডাল। তার দাম ছিল পাঁচ-দশ পয়সা। বাবা চারটে দাঁতন কিনত। বাবার, মায়ের, আমার আর দাদার। আমরা দাঁতন চিবোতাম। চিবোতে খুব ভালো লাগত। তেতো রস মুখে লেগে থাকত অনেকক্ষণ। ট্রেনটা আদ্রা স্টেশনে একঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকত। তার মধ্যে ইঞ্জিন বদল হত। দাঁতন নেমে যাওয়ার পর উঠত চা-ওয়ালা। ‘এই চায়ে এই চায়ে’ বলে ডাক। বাবা চা খেত। তখন চায়ের সঙ্গে আরেকটু চা ফাউ দিত। সেই ফাউ চায়ের ব্যাপার সবাই জানত না, বাবা জানত। ভাঁড়ে চা-দেওয়ার পর চা-ওয়ালা দাঁড়িয়ে থাকত। বাবা তাকে ইশারায় দাঁড়াতে বলত। তারপর বাবা চায়ে একটা চুমুক দিত। সশব্দ চুমুক। মা চুমুকের শব্দে বিরক্ত হত। সেই চুমুকে যতটুকু খালি হবে ততটুকু চা-ওয়ালা আবার ভরে দেবে। ওটাই ফাউ। ওটাই ফাউ-এর নিয়ম। সে বেশ মজার খেলা ছিল। গরম চা। বাবা একচুমুকে আর কতটাই বা খাবে! চা-ওয়ালা ফাউ চা দিয়ে চলে  যেত। বাবা চা-কে বলত গরম জল, গুড় দেওয়া। আমরা ভাবতুম তাই যদি হবে তাহলে খাওয়া কেন বাপু! গুড় দেওয়া গরম জলও বলা চাই, আবার খাওয়াও চাই।

ট্রেনের সিটগুলো কাঠের, তার মধ্যে আবার অনেকটা করে ফাঁক। আমাদের ট্রেনযাত্রায় সবসময় সঙ্গে একটা পুঁটুলি থাকত। মা সেটা খুব যত্ন করে বাঁধত। স্টেশনে এলে সবসময় বসার বেঞ্চ খালি পাওয়া যেত না। তখন পুঁটুলির ওপর আমার বসতে খুব ভালো লাগত। আমি বসতাম — পুঁটুলি ঢেঁকির মতো দে-দোল দে-দোল খেত। পুঁটুলির মধ্যে থাকত চাদর, বালিশ আর কুটকুটে কম্বল। শীতকাল, আমরা  কলকাতা থেকে পুরুলিয়া ফিরছি। রিজার্ভ করা হয়েছে বটে তবে সিটগুলো তো ফাঁক-ফাঁক। চাদর না বিছোলে শোয়ার উপায় নেই। হাওয়া বালিশের চল তখন ছিল না, তাই ছোট-ছোট তুলোর বালিশ নেওয়া হত দুটো। বাবা মাথায় বালিশ দিত না। খাওয়া-দাওয়ার পর বাবা লুঙ্গি পরত। লুঙ্গির তলা দিয়ে সাবধানে প্যান্ট বের করে ভাঁজ করে সিটে রাখত। প্যান্টের পকেটে বাবার রুমাল আর টাকার থলে থাকত। ভাঁজ করা প্যান্টই ছিল বাবার বালিশ। সেই বালিশে মাথা দিয়ে বাবা ঘুমিয়ে পড়ত। আর নেওয়া হত কুটকুটে কম্বল। কুটকুটে কম্বল গায়ে ঢাকা দিয়ে আমরা ঘুমিয়ে পড়তাম। অধিকাংশ কম্পার্টমেন্টেই আলো জ্বলত টিমটিমে। ট্রেনের মধ্যে বেশ বড় বড় আরশোলা থাকত। আমরা ঘুমিয়ে পড়লে তারা বাইরে আসত, ছুটোছুটি করত। অনেকে স্টেশন থেকে কিনে খেত, মা আমাদের বাইরের খাবার খেতেই দিত না। লুচি আলুর দম আর সন্দেশ ছিল আমাদের রাতের খাবার। সেই খাবারের টুকরো-টাকরাই বড় আরশোলাদের পরমান্ন। পরমান্নের জন্য তাদের ছুটোছুটি।

ট্রেনে আমার মাঝে মাঝে খুব ভয় করত। বিশেষ করে রাত্তিরবেলা। কোনও স্টেশনে ট্রেন হয়তো অনেকক্ষণ থেমে আছে। থেমে থাকার নানা কারণ — লাইন ক্লিয়ার নেই, ইঞ্জিন বদল হবে, ইঞ্জিনে জল লাগবে। তখন সবাই জানত ট্রেন মাত্রই লেট করে — দু-ঘণ্টা, তিন ঘণ্টা বা তার বেশিও হতে পারে। ট্রেনের মোটা পিসবোর্ডের টিকিট। ঘটাং করে লেদমেশিনের শব্দ — সেই টিকিট আমার জমাতে খুব ভালো লাগত। আমার একটা বাক্স ছিল, তাতে টিকিট জমাতাম। টিকিটগুলো নিয়ে তাসের মতো খেলতাম। থেমে থাকা ট্রেনের ভেতরে মা-বাবা-দাদা সবাই ঘুমোত। আমার ঘুম ভেঙে যেত। কখনও কখনও ট্রেনের দরজা খুলে লোক উঠে পড়ত। তাদের পায়ের শব্দে আমার ভয় গভীর হত। আমার মনে হত তারা সব মস্ত ডাকাত, লুঠ করতে এসেছে — আমি ঘাপটি মেরে, নিঃশ্বাস বন্ধ করে শুয়ে থাকতাম। এদিকে ভয়, আবার মনে হচ্ছে যদি ডাকাতি করতে আসে তাহলে লাফিয়ে পড়ব তাদের ঘাড়ে। তারা কী ডাকাতি করবে? বাবার টাকার থলে। তারা অবশ্য কেউ ডাকাত নয়। অসহায় অসময়ের যাত্রী সব। তারা যাবে তাদের বাড়ি, কিম্বা যাবে তাদের কাজের জায়গায় তাই অনেকক্ষণ থেমে থাকা ট্রেনের কম্পার্টমেন্টে উঠে পড়ে জায়গা খুঁজছে তারা। যদি পাওয়া যায় একটু জায়গা — বসার, দাঁড়াবার। তাদের দাবি নেই, অধিকারও নেই, বরং বেশ দ্বিধা আর ভয় তাদের মনে খেলা করে। এই বুঝি ট্রেনের লোক তাদের নামিয়ে দেয় ট্রেন থেকে। আমি অতশত বুঝতাম না। ভয়ের গায়ে ভয় লেগে যেত — আমার ভয় আমার কাছে, তাদের ভয় তাদের কাছে। এই সব ভয়ের গল্প পেটে নিয়ে রাতের ট্রেন আবার পরের স্টেশনের জন্য দুলে উঠত। রাতের অন্ধকারে ট্রেন মাঝে মাঝে ডিঙিয়ে যেত নদীর ওপরের সেতু। সেতু ডিঙোনোর সময় অন্যরকম শব্দ উঠত তার চাকায়। সে শব্দ আমি চিনতাম, বাবা চিনিয়েছিল। সেও ছিল ভয়ের কারণ। যদি ট্রেন নদীতে খসে পড়ে।

খসে পড়া ট্রেনের ছবি কাগজে এক-দুবার দেখেছি। তবে আমাদের ট্রেন কোনওদিন কোথাও খসে পড়েনি। বড় স্টেশনে ট্রেন থামলে বাবা মাঝে মাঝে জল ভরতে প্ল্যাটফর্মে নামত। প্ল্যাটফর্মে জলের কল, জল ভরে উঠে পড়ত বাবা। অনেক সময় ট্রেন ছাড়ার ঘণ্টা পড়ার পরেও বাবার জল ভরা হত না। তবে শেষ ঘণ্টার আগে বাবা প্রতিবারই ট্রেনে উঠে পড়ত।

ট্রেনের জন্য আজকাল তেমন করে ঘণ্টা বাজে না আর, তবে এখনও কোথাও কোথাও বাজে। শুনেছি উত্তরবঙ্গের ছোট ছোট স্টেশনে সেই ঘণ্টার শব্দ। সে শব্দ শুনলেই কী যে হয় — কী আর বলি। কত শব্দই তো হারিয়ে গেল।

বাবা আমার স্মৃতির ট্রেনে আছে, তবে আর কোনওদিন ভারতীয় রেলে যাতায়াত করবে না। আমার সেই সব ছোটবেলার জমানো ট্রেনের টিকিট হারিয়ে গেছে। হারিয়ে যাওয়া মানে কোথাও একটা থাকা, আছে — শুধু আমিই দেখতে পাচ্ছি না। 

About Char Number Platform 386 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*