বয়স ১২ কি ১৩

অলোকপর্ণা

 

বড় পিসো মারা গেছে, — খবরটা জানাতে একটা ফোন এসেছিল একটু আগে।

কিছু কিছু মৃত্যুসংবাদ বুদবুদের মতো হয়, খুব ক্ষীণ তার স্পর্শ, অভিঘাত, স্থায়িত্ব। বড় পিসোরটাও হয়তো তেমনই। শুধু একটা “ও…” বলে ফোনটা রেখে দিলাম। এর থেকে বেশি কিছু বলার দাবি রাখতে পারে কি এই মৃত্যুসংবাদ? তার ওপর একটা মানুষ বা একটা প্রাণীর না থাকাটা আমার কাছে এখনও তেমন স্পষ্ট নয় যখন, তখন ঐ “ও”টুকু ছাড়া আর কীই বা বলতে পারি।

বিকেলে ছোড়দির ফোন এলে আবার মনে পড়ে গেল, আজ বড় পিসো মারা গেছে।

“কি রে টাকা পাঠাবি হবিষ্যির জন্য? না জামাকাপড়?”

“পাঠাতে হবে?”

“হ্যাঁ, নাহলে খারাপ দেখাতে পারে…”

“আচ্ছা”

“কী পাঠাই বলতো, টাকা পাঠাতে ঠিক মন চাইছে না, ওদের তো সবই আছে, বিগ বাস্কেটে কিছু ফল অর্ডার করে দেবো ভাবছি”

“আচ্ছা, তাই দাও”

“তুই কী করবি?”

“দেখি, ভাবিনি এখনও”

“তুই ঠিক আছিস তো?”

“হ্যাঁ”

“আচ্ছা, বেশি চাপ নিস না, ফল বা চাল-ডাল কিছু পাঠিয়ে দে”

ছোড়দি ফোন রেখে দিল। কী পাঠালে ব্যাপারটা দৃষ্টিকটু এবং মাত্রাতিরিক্ত হবে না ভাবতে ভাবতে আরও কিছু সময় কেটে গেল। তারপর একসময় আবার ভুলে গেলাম আজ বড় পিসো মারা গেছে।

আরও অনেক কিছুর মতো আমি মৃত্যু বুঝি না। যে বিড়ালটাকে পুষতাম, ২০১৫ সালের ৯ই মার্চ সে মারা গিয়েছে। বাড়ির উল্টোদিকের লাইটপোস্টের নিচে মাটি খুঁড়ে তাকে নুন মাখিয়ে কবর দেওয়া হয়েছে। তার সাথে কথা বলার প্রয়োজন হলে আমি বারান্দায় চলে আসি একটু রাতের দিকে, কারণ বারান্দা থেকে লাইটপোস্টের নিচটা স্পষ্ট দেখা যায়। কই অভাববোধ তো হয় না কোনও। মতি বলে আমি অগভীর, আমি পাথর। মতির কথা মন দিয়ে শুনি। বিশেষ কিছু মনে হয় না শুনে।

বড় পিসোর কাজে যাচ্ছি শুনে সবাই অবাক হল, মতি বলল, — “হঠাৎ!”

ফল আর মিষ্টি নিয়ে বড় পিসির হাতে ধরিয়ে দিতে পিসিও কেমন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকল আমার দিকে। অস্বস্তি হল অল্প। তাড়াতাড়ি করে বড়দা এসে হলের একটা জায়গায় বসিয়ে দিয়ে নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে চলে গেল কোথায়।

চারদিক অদ্ভুত ফ্যাকাশে শাদা। হলের মাঝামাঝি একটা জায়গায় একটা টেবিলে শাদা চাদর পাতা। তার চার কোণায় শাদা জরির কাজ। টেবিলের পাশে রাখা বিরাট পেডেস্টাল ফ্যানের তেজে সেই চাদরের কোণা থেকে থেকে উড়ে উঠছে। চাদরের উপর উপচে পড়ছে শাদা ফুল, মিষ্টির প্যাকেট আর ধূপের স্তূপ। সেই ফুল, মিষ্টি আর ধূপের ফাঁক দিয়ে বড় পিসোর ক্ষীণ মুখ, ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট ফটোর ভিতর থেকে জেগে আছে।

হঠাৎ ফোনে একটা নোটিফিকেশন আসল, দেখলাম ফুলদি লিখছে, “I cannot believe you went there!”

উত্তরে লিখলাম, “হুম”

“spineless asshole!”

বুঝলাম ফুলদি আমায় ব্লক করল।

মুখ তুলে বড় পিসোর ছবির দিকে তাকালাম। আরও ফুল এবং মিষ্টির প্যাকেটে ঢেকে গিয়ে বড় পিসোর মুখ দেখা যাচ্ছে না আর।

দুপুরে ঠিক করে খেতে পারলাম না। বড়দা ত্রুটি রাখেনি কোনও, ভালোই খরচা করেছে পার প্লেটে। সেরা কোয়ালিটির মাছ, মিষ্টি সবই মেনুতে রয়েছে। তবু খেতে পারলাম না মন ভরে। অথচ আমার মনে কোনও কষ্ট নেই কোথাও। হাত ধুয়ে একটু বিশ্রাম নিতে ছাদে উঠে এলাম। দেখলাম বড়দা ফোনে কথা বলছে কারও সাথে। ফিরে আসতে যাব, বড়দাই আটকাল। হাতের সিগরেটটা পাস করে দিল আমায়। সিগরেটে টান দিতে দিতে বুঝলাম বড়দা ফোনে এই মুহূর্তে বিট কয়েনে আরও ইনভেস্ট করা উচিৎ হবে কি না জানার জন্য কারও পরামর্শ নিচ্ছে। খানিকক্ষণ পরে ফোন রেখে বড়দা সিগরেটটা ফেরত চাইল।

“খেয়েছিস তো ঠিক করে?”

মাথা নাড়লাম।

“খুব চাপ যাচ্ছে! কালিকাপুরের ফ্ল্যাটটা গতমাসে হ্যান্ডওভার হওয়ার কথা ছিল, শুয়োরের বাচ্চাগুলো এখনও ফ্লোরিংই করে উঠতে পারেনি জানিস!”

আমার হাতে সিগরেট ফিরিয়ে দিল বড়দা।

মাথা নেড়ে সিগরেটটা ঠোঁটে ছোঁয়ালাম।

“তুই ঠিক আছিস তো বুবাই?”

দেখলাম বড়দা আমার দিকে তাকিয়ে আছে, সিগরেটটা ঠোঁট থেকে নামিয়ে রেখে বললাম, “হ্যাঁ। ঠিক আছি। তুমি?”

বড়দা হঠাৎ কথা নেই বার্তা নেই কোথা থেকে আমার হাত চেপে ধরে হাউ হাউ করে কেঁদে উঠল, কী করা উচিৎ বুঝতে না পেরে বড়দার কাঁধে হাত রাখলাম।

ফোঁপাতে ফোঁপাতে বড়দা বলল, “যতই হোক, বাবা তো! কিছু পারুক না পারুক, যাই করুক না করুক, একটা ছাদ ছিল। এখন বুবাই আর কেউ নেই রে!”

ছাদের উপর দাঁড়িয়ে মাথা নিচু করে বিগত এক ছাদের কথা বলছে বড়দা। আমি টের পেলাম বড়দার মাথার চুল বেশ পাতলা হয়ে এসেছে। মাথার মাঝখানে হালকা টাক বেশ বোঝা যাচ্ছে এই দুপুরবেলায়।

“সব ঠিক হয়ে যাবে”, সিগরেটটা দু-আঙুলের ফাঁকে চেপে ধরে রেখে যন্ত্রের স্বরে বললাম।

বড়দা পাঞ্জাবীর হাতায় চোখ মুছল, “তুই ছাড়া তো আর কেউ এল না, কাকেই বা বলব বল বুবাই,” কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বড়দা আবার বলে উঠল, “তুই যে আসবি আমরা তা ভাবতেও পারিনি!”

কিছু বললাম না।

এরপর কার ডাকে যেন বড়দা “হ্যাঁ আসি” বলে নিচে চলে গেল। ছাদের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে থাকলাম আমি। হাতে এমনি এমনি পুড়ে শেষ হয়ে গেল সিগারেটটা।

চলে আসার আগে একবার পিসির ঘরে এলাম। পুরোনো মানুষের ঘরের গন্ধ পুরোনো দিনের গন্ধের মতো হয়। যা কিছু বছর পনেরো আগে এই ঘরে ছিল, তার সবই প্রায় এখনও এই ঘরেই আছে। বিরাট সেগুন কাঠের পালঙ্কটার সামনে এসে দাঁড়ালাম। হঠাৎ মনে হল, আগে কখনও ভাবতে পেরেছি কি এই পালঙ্কের সামনে এসে দাঁড়াতে পারব কোনওদিন? এই পালঙ্কে ক্লাস সিক্সের গরমের ছুটির এক দুপুরে বড় পিসো আমার পিছন মেরেছিল। অথচ আজ সবকিছু কত সহজ লাগছে। প্লাস্টিকের প্যাকেটের আওয়াজে পিছন ফিরে দেখলাম বড় পিসি, ঘরে ঢুকতে গিয়ে আমায় দেখে থমকে গেছে।

অল্প হাসার চেষ্টা করলাম পিসির মুখের দিকে তাকিয়ে। শোকগ্রস্ত মানুষকে সান্ত্বনা কী উপায়ে দিতে হয় তা আজও শিখলাম না।

পিসি ভাঙা গলায় জিজ্ঞাসা করল, “খেয়েছিস তো?”

“হ্যাঁ, তুমি?”

“হ্যাঁ”

“শরীর কেমন আছে তোমার?”

“এই বয়সে যেমন থাকে আর কি…”

“আচ্ছা, তোমার সাথে দেখা করতেই এই ঘরে এসেছিলাম”

বড় পিসি অবাক হয়ে তাকাল আমার দিকে, যেন কথাটা অবাক হওয়ার মতো কোনও কথা।

“এবার বেরোব, সন্ধ্যেবেলা আবৃত্তি ক্লাস আছে, বাচ্চাগুলো এসে বসে থাকবে”

“আচ্ছা…” কোনওরকমে বলল বড় পিসি।

“আসি তাহলে।”

হলঘরে এখন আর ভিড় নেই। পেডেস্টাল ফ্যানটা শুধু শুধু চলছে। ফ্যানের স্যুইচ অফ করতে এসে দেখলাম ফুল আর মিষ্টির প্যাকেটে চাপা পড়ে গেছে বড় পিসোর ছবিটা। কী মনে হতে কিছু ফুল আর মিষ্টি সরিয়ে ফটোটা দৃশ্যমান করে দিতে দেখলাম ছবির ভেতর আমার পেডোফিল বড় পিসোকে কেমন যেন ভীষণ পুরোনো, দূরের এক মানুষ মনে হচ্ছে। যার সাথে আমার যেন কখনও কোনও আলাপ ছিল না। সেদিন যদি পিসি ধরে না ফেলত, যদি আরও বেশি সময় ধরে বড় পিসো আমার পিছন মারতে পারত, তাহলে কি আজ আমি বড় পিসোকে একদম ভুলে যেতাম? এখন তো তবু মনে হচ্ছে মানুষটাকে চিনতাম কখনও। এরকম কথা মতিকে কখনও বললে, মতি আমায় জড়িয়ে ধরে বসে থাকে। কেন জানি না, কিন্তু খুব শক্ত করে ধরে থাকে। ছবিটা থেকে দূরে সরে আসব, দেখি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে বড় পিসি আর বড়দা, অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে।

দূর থেকে “আসি” বললাম। ওরা কিছু বলল না। পিসি নিঃশব্দে মাথা নাড়ল।

কলেজে পড়ার সময় আমি আর ফুলদি বেশ ঘনিষ্ঠ হয়েছিলাম কয়েক বছর। একসাথে ওঠা বসা নেশা ইত্যাদি সব করতাম। তখনই কথায় কথায় ফুলদিকে বড় পিসোর কথাটা জানিয়েছিলাম। ফুলদি একবাক্যে পিসির বাড়ি বয়কট করেছিল। ভাই বোনদের কাউকে কাউকে ঘটনাটা জানিয়েছিল। সবাই মিলে আমায় ফুসলেছিল পুলিশে ডায়রি করার জন্য। আমিই “অনেক দিন আগের ঘটনা”, “ছেলেদের আবার রেপ” এসব বলে আটকেছিলাম ওদের অনেক কষ্টে। আসলে সাহস ছিল না। বড় পিসোর সামনে দাঁড়ানোর। এখনও নেই। তাই তো চোরের মতো… ছবির সামনে… তাই তো আবৃত্তি ক্লাসের পর ক্লাস সিক্সের সৌম্যকে আরও আধ ঘণ্টা আটকে রেখে। তাই তো “ছিপখান/ তিন- দাঁড়” বলতে বলতে কোলে বসা সৌম্যকে কাছে টেনে রাখি। সৌম্যরও নিশ্চয়ই খারাপ লাগে না এসব। ক্লাস সিক্সে পড়তে, আমারও তো তেমন খারাপ লাগেনি?

আর বড় পিসো সেটা জানত।

About Char Number Platform 602 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*