শ্রবণকথা, পর্ব — এক

অতীন্দ্রিয় চক্রবর্তী

 

ষষ্ঠ উপকথা এখানে

 

গোণ্ড আদিবাসী কিংবদন্তী অনুসারে মহাকাব্যের বিকল্পপাঠ; মূল হিন্দি পাঠ -- বেদনসিং ধুর্বে, ‘কোয়া পুনেম গোণ্ডিয়ন গাথা’ (২০১৪)-এর ছায়া অবলম্বনে

যে সময়কার কথা, তখনও ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তরখণ্ড ‘আর্যাবর্ত’ পরিচয় ধারণ করেনি। লৌহাস্ত্র হাতে বৈদিক অনুপ্রবেশকারীরা পাকাপাকিভাবে এখানে মৌরসিপাট্টা বিছিয়ে উপনিবেশ বিস্তার করেনি তখনও, যদিও তার তোড়জোড় ভালোমতোই শুরু হয়ে গিয়েছিল। তখনও অনার্যকাল। ব্রোঞ্জযুগের সূর্য্য পশ্চিমে টাল খেলেও, অস্তমিত হয়নি। উত্তর-পশ্চিমে ভূমধ্যসাগরের তীর থেকে দক্ষিণ-পুবে ভারত উপদ্বীপ অবধি সেদিন অসুর রাজাদের রাজ্যপাট। জ্বলজ্বল করছে ব্রোঞ্জসভ্যতার শিখরে পৌঁছোনো সেই সব রাজ্যপাটে প্রতিষ্ঠা পাওয়া শহরেরা — অসুর, নিনেভ, মহেঞ্জোদরো, হরপ্পা, রূপার, লোথাল, কালিবঙ্গানেরা। আর তাদের ধূলিসাৎ করতে করতে ক্রমশ গঙ্গা-যমুনা-সরস্বতী নদীদের ধুয়ে যাওয়া বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এসে প্রবেশ করছে পুরন্দর-বাহিনী। সেই সময়ের কথা।

এই গল্পে যে সব স্থান ও পাত্রদের কথা শুনব আমরা, তাদের আসল নাম কী ছিল, তা, এত হাজার বছরের মুছে ফেলা ইতিহাস, লিপিমালাদের সাথে সাথেই, তলিয়ে গিয়েছে বিস্মৃতির গহনে। বিজেতা আর্য তার সাংস্কৃত সম্ভারে বিজিত অনার্যের প্রাকৃত নামচিহ্নদের ঠাঁই দেয়নি। তাই অনন্যোপায় আমরা এখানে তাদের দেখে নেব, চিনে-জেনে-বুঝে নেব, তাদের আর্যদত্ত নামধামসাকিনদের হিসেব ধরেই।

সেকালের জাঁকালো শহরদের মধ্যে এক — দেবনগরী। সে রাজ্যের রাজারাণী দেবসন্তান-জ্ঞানবতী। দু’জনেই জন্মান্ধ। তাঁদের এক পুত্র — শ্রবণ। শ্রবণ একটু একটু করে বড় হতে থাকে। বয়ঃকালে বাবামার নিরন্তর সেবায় নিষ্ঠ ও নিবিষ্ট হয় সে। পড়াশুনাতেও খুব মন তার। দর্শনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে সেকালেও নানান দেশে নানান তর্ক-বিতর্ক-আলোচনা-বিচার-বিশ্লেষণের সভা বসত। সে সবে ছিল তার নিত্য যাতায়াত, যোগদান।

ক্রমে শ্রবণ প্রাপ্তবয়স্ক হল। তার বিয়ে ঠিক হল সে যুগের প্রাগার্য্য, প্রাগ-যাদব দ্বারকানৃপতি জ্ঞানশা’র কন্যা বিন্দিয়ার সাথে। শ্বশুরালয়ে এসে বিন্দিয়াও দেবনগরীর অন্ধ রাজারাণীর নিরন্তর সেবায় কায়মনোবাক হল। এদিকে আর্য গুপ্তচরেরা উপায় খুঁজতে লাগল বিন্দিয়া-শ্রবণের পরিণয়বন্ধনে সৃষ্ট দ্বারকা-দেবনগরী সন্ধিতে বিচ্ছেদ ঘটানোর। প্রতিপক্ষ-সংহতি অকাম্য।

উপায় মিলেও গেল। বিন্দিয়ার এক ভাই ছিল, অরুণ। সে একদিন তড়িঘড়ি হাজির হল দেবনগরীতে। সে এসে তার দিদি যুবমহিষীকে বলতে লাগল,

‘দিদি রে, শিগগির ঘরে চ’, মাবাবা এই যায় কি সেই যায়!’

তাই শুনে আর ভায়ের উশকোখুশকো চুলদাড়ি, অবিন্যস্ত বেশভুষা দেখে উদ্বেগে, দুশ্চিন্তায় আকুল হয়ে বিন্দিয়া বাপের বাড়ি যাওয়ার তোড়জোড় করতে লাগল। যারপরনাই চিন্তিত শ্রবণও তার বৌ আর শালার সাথে দ্বারকায় যাওয়ার উপক্রম করলে বিন্দিয়া বলে উঠল,

‘তুমি থেকে যাও। তুমিও না থাকলে, আমাদের দু’জনের কারুর সেবাই না পেলে, এখানেও রাজন-রাজমাতা অসহায় বোধ করবেন।’

সেই শুনে শ্রবণ থেকে গেল দেবনগরীতে, জ্ঞানবতী-দেবসন্তানকে প্রণাম করে বিন্দিয়া আর অরুণ দুই ভাইবোনে মিলে রওনা দিল দ্বারকার দিকে। দ্বারকায় গিয়ে যখন ওরা রাজমহলে প্রবেশ করল, তখন ভাই বোনকে ডেকে বলল,

‘দিদিরে, আমার একটু কাজ আছে, সেরে আসি, তুই ততক্ষণ ওদের কাছে থাক, আমি একটু পরেই আসছি তোদের কাছে…’

এই বলে ঝট করে রাজ-মহলের বাইরের ব্যস্ত নগরপথে মিলিয়ে গেল সে। বিন্দিয়ার মন তখন আচ্ছন্ন অসুস্থ বাবামাকে দেখার উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা-উদ্বেলতায়। তাই ভাইয়ের এই অদ্ভুত আচরণে মনে সামান্য খটকা লাগলেও, সে তখন হনহন করে ঢুকে পড়ছে অন্দরমহলের রাজকক্ষে। আচমকা মেয়েকে দেখতে পেয়ে অবাক হয়ে গেল দ্বারকার রাজারাণী। ওরা ঘুণাক্ষরেও আঁচ পায়নি কীভাবে আর্য-প্ররোচনায় অরুণ হয়ে উঠেছে যথার্থ কুলাঙ্গার। এদিকে এতদিন পর ওঁদের দেখে, ওঁদের কী বা কোন ধরণের অসুস্থতা গ্রাস করেছে তার কুলকিনারা করতে না পেরে আকুল-বিহ্বল হয়ে বিন্দিয়া শুধিয়ে উঠল,

‘তোমাদের কী হয়েছে?’

প্রশ্ন শুনে তো অবাক দ্বারকার রাণী-রাজা।

‘কই, আমাদের তো কিছু হয়নি! তুই কেমন আছিস? সব ঠিকঠাক আছে তো?’

এবার বিন্দিয়ার চমকে ওঠার পালা,

‘সেকি! তবে অরুণ যে বলল?’

‘অরুণ! কোথায় সেই মিথ্যাবাদী! বুলাও তাকে!’

গর্জনে থরথর কেঁপে উঠল রাজার প্রাসাদ! সেই গর্জন অরুণের কানে পৌঁছেছিল। অথবা পৌঁছেছিল এমন কারুর কর্ণকুহরে যার মাধ্যমে তার রোষতপ্ত তলবের খবর অচিরে পেশ হয়েছিল অরুণের কাছে। সে আর ঘরে ফেরেনি।

ইতিমধ্যে স্ত্রীর অনুপস্থিতি একাকীত্বে গ্রাস করল শ্রবণকে। সে সিদ্ধান্ত নিল, তীর্থে যাবে। দশটি মোহর গুঁজে নিল পুঁটুলিতে। পুত্রের দশমুদ্রা-সংকল্প দেখে অজানা আশঙ্কায় একমুহূর্ত শিউড়ে উঠল জ্ঞানবতী-দেবসন্তান। প্রাকৃতোপাসনার অমোঘ বিধানগুলো তাঁদের অজানা নয়। তাই তাঁরা বলে উঠলেন,

‘সাধনসঙ্গিনী বিহনে সেই আবাহনে যেও না বাছা!’

শুনে শ্রবণ বলল,

‘বাপমার চেয়ে বড় ভগবান কৈ? একাকী যাব না। তোমাদেরও সঙ্গে নিয়ে যাব।’

যেমনি বলা তেমনি কাজ। একা একজন মানুষ বইতে পারে, এমন একটা দু’জনের বসার মতো ডুলি জোগাড় হল। সেই ডুলিতে অন্ধ রাজারাণীকে চাপিয়ে পিঠে তুলে নিল রাজপুত্র। রওনা হল তীর্থপথে।

অভীষ্ট তীর্থ পরাগরাজ্যে। সেইখানে, যেইখানে মাটির উপর দিয়ে গঙ্গানদী আর যমুনানদী এসে মিশেছে, আর মিশেছে, হয় ফল্গুনদীর মতোই মাটির তলে তলে অথবা আর পাঁচটা নদীর মতো মাটির উপর দিয়েই বয়ে এসে, সরস্বতী। সে এতকাল আগের কথা যে আজ আর ঠিকঠাক ঠাউর করা যায় না। দুনিয়ার আদিতম ঘরানাদের মেনেই সেই সঙ্গমে মেলা জমে, তিন নদীর জল গায়ে লাগিয়ে পুতঃস্নানে ডুব দেয় ভক্তজন।

প্রাকৃত প্রজ্ঞা আর্য আগমনের আগেই এই উপলব্ধি উপমহাদেশের মানুষদের মনে ছোঁয়া তুলেছিল যে সেই ত্রিবেণীসঙ্গমের জল ওষধিগুণসম্পন্ন। নানান চর্মরোগ নিরাময় হয় সেই জলস্পর্শে। এমনকি, হয়তো, কুষ্ঠও। এই ধরণের প্রাকৃতিক নদী নালা ঝোরা ঝিরা কুণ্ড উষ্ণপ্রস্রবনের কথা নানান জায়গায় শোনা যায়। কলিযুগের গোড়ার দিকে ভারতভূখণ্ডের উত্তরভাগের রাজনৈতিক শাসন আর্যরা পাকাপাকি কায়েম করবার শুরুর সেই দিনগুলোতে এমনই এক প্রাকৃত জলসম্পদে অবগাহন-ফলে কুষ্ঠরোগ নিরাময় হয়েছিল কৃষ্ণপুত্র শাম্বর। তার বহু বহু যুগ পরে দণ্ডকারণ্যের উত্তরপথের যে সীতানদীতে স্নান করে অসুখ সারালেন কুষ্ঠকলঙ্কে বহিষ্কৃত এক প্রাক্তন পুরী-নরেশ, সেই গহন বনাঞ্চল এই সেদিন পর্যন্তও শুধু শ্বাপদসঙ্কুলই ছিল না, সেইখানে ছিল তামাম দুনিয়ার আদিবাসী আদিকৌলের প্রজ্ঞাস্পর্শ –- বাঘেদের পাশে পাশেই ছিল বাঘবন্দির মন্তর জানা সেই আদিতম টোটেম-ক্রমগুলোর সাধক তান্ত্রিক শামান বা ম্যাজিক হিলারেরা — উপমহাদেশময় যখন ছিল অনার্য ইণ্ডিজিনাস মানুষদের স্বশাসন, তখন সেই গুণিন-ওঝাদের তন্ত্রাচারী সম্প্রদায়ের মানুষদের সমাজে শ্রদ্ধা ও সম্মান ছিল, নাম ছিল ‘বৈগা’।

ইতিমধ্যে রাজপুত্র অরুণ পিতৃ-মাতৃ-রোষ-অভিসম্পাত আশঙ্কা করে আর ফিরে যায়নি দ্বারকায়। সে তখন পথে। ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে সে ততদিনে তার আসল নাম লুকিয়ে নাম রেখেছে — ‘মদন’। কাটা-ঘুড়ির মতো নানান হাটে-মাঠে-ঘাটে-বাটে ঘুরে ঘুরে বেড়াতে লাগল সে। অচিরেই তাকে কুষ্ঠে ধরল। রোগ সারাতে সে রওয়ানা হল পরাগের সেই ত্রিবেণী-সঙ্গম অভিমুখে। পথে পথে ঘুরে, ক্ষিদে-তেষ্টা-রোগ-সন্তাপে তার রূপ-শরীর-বেশভূষার যা দশা, কারুর বোঝার যো নেই যে সে আসলে দ্বারকার রাজপুত্র। তাই দেশে দেশে ঘুরে ফিরে গেল রাজার হতোদ্যম গুপ্তচরের দল।

এদিকে একটা একটা করে দিন গেল আর দ্বারকার রাজারাণী উৎকণ্ঠায়, সন্তাপে, পুত্রশোকে জর্জর হতে হতে ক্রমে হয়ে পড়ল মুহ্যমান। বন্ধ হল খাওয়া, ঘুম, রাজকার্য। বাবামার সেই অবস্থা দেখে বিন্দিয়া ওদের সাথেই রয়ে গেল, নিরন্তর সেবা-শুশ্রূষা করে চলল। ভাইয়ের জন্য তারও প্রাণ অস্থির। তবু সে চেষ্টা করল ভিতরে ভিতরে যতটা সম্ভব শক্ত শান্ত থাকার। একের পর এক দ্বারকার সমস্ত গুপ্তচর বিফলমনোরথ হয়ে ফিরে এল। ইতিমধ্যে শ্বশুরবাড়ি থেকে পাঠানো রাণার-হরকরা খবর আনল, জ্ঞানবতী-দেবসন্তানকে ডুলিতে বসিয়ে বর রওয়ানা দিয়েছে পরাগতীর্থের পথে। তখন দ্বারকার রাজকন্যা তথা দেবনগরীর যুবরাণী সিদ্ধান্ত নিল, প্রবীণ মাতাপিতাকে সঙ্গে নিয়ে সেও সেই সঙ্গমের মেলায় যাবে। যেমনি ভাবা তেমনি কাজ। এইবার, অন্ধ বাপমাকে ডুলিতে চড়িয়ে চলতে থাকা শ্রবণ আর কুষ্ঠদীর্ণ, ক্ষুৎপিপাসায় আচ্ছন্ন ‘মদন’ ওরফে অরুণের মতোই, জীবন-ত্রিবেণীর তৃতীয় ধারা হয়েই যেন দ্বারকার রাজা-রাণীকে সঙ্গে করে সেই বাস্তব ভৌগোলিক ত্রিবেণী-সঙ্গমের পথে বিন্দিয়ার পাড়ি দেওয়ার পালা।

 

এরপর সপ্তম উপকথা, পর্ব — দুই

About Char Number Platform 840 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Trackback / Pingback

  1. বস্তারের উপকথা — সাত, পর্ব — দুই – ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*