বাংলা মায়ের বীরকন্যারা

see url রুখসানা কাজল 

 

ফেরদৌসি প্রিয়ভাষিণী বলেছিলেন,

“যুদ্ধের শিকার হয়েছে যে নারী তার তো নিজের কোনও লজ্জা নেই।” অসমসাহসী এই নারীই প্রথম বীরাঙ্গনা যিনি পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর নির্মম নির্যাতন সম্পর্কে মুখ খোলেন। যদিও মনে বড় আশা পুষেছিলেন, তার দেখাদেখি অনেকেই হয়তো বা মুখ খুলবেন। কিন্তু তিনি তেমন কাউকে পাশে পাননি। তাই বীরাঙ্গনাদের মুক্তিযোদ্ধার খেতাব অর্জনের লড়াইয়ে তিনি ছিলেন একা লড়াকু।

মঙ্গলবার, ৬ মার্চ, ইহলীলা সাঙ্গ করে চলে গেলেন একাত্তরের বীরাঙ্গনা, খড়কুটোর ভাস্কর এই মা,  ফেরদৌসি প্রিয়ভাষিণী। বয়স হয়েছিল সত্তর বছর। জন্মেছিলেন দেশভাগ মাথায় নিয়ে, ১৯৪৭ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি খুলনা শহরে। বেড়ে উঠেছিলেন ঢাকায়। নানা অ্যাডভোকেট আব্দুল হাকিম ছিলেন কংগ্রেসি। ১৯৫৪ সালে, যুক্তফ্রন্টের শাসনামলে তার নানা ছিলেন স্পিকার। অর্থাৎ পারিবারিকভাবে একটি উন্মুক্ত মানসিকতার এবং প্রগতিশীল উন্নত পরিবেশ পেয়েছিলেন ফেরদৌসি প্রিয়ভাষিণী। ভাই ছিল মুক্তিযোদ্ধা। মা ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সরাসরি সাহায্যকারী।

ফেরদৌসি ফিরে গিয়েছিলেন খুলনা। বিয়েও করেছিলেন। সে বিয়ে চুকে গেছিল ওই একাত্তরেই। তিনি তখন একটি চাকরি নিয়েছিলেন। দ্বিতীয় বিয়ে করেন ১৯৭২ সালে। স্বামী আহসান উল্লাহ আহমদ ছিলেন প্রথম শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তা। তিন পুত্র ও তিন কন্যার জননী ছিলেন তিনি।

বঙ্গবন্ধু একাত্তরের ধর্ষিতা নারীদের নাম দিয়েছিলেন, দোয়েল। আট থেকে সত্তর বছর বয়সের প্রায় তিন লক্ষ বাঙালি নারীকে নির্যাতন করেছে পাকিস্তানী বাহিনী। যুদ্ধের পর সমাজ সংসার, আত্মীয় স্বজনের দ্বারা ব্রাত্য অধিকাংশ ধর্ষিতা নারীদের নাম তালিকাভুক্তির সময় বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ওরা এই বাংলার দোয়েল। ওদের পিতার নামের স্থানে লিখে দাও আমার নাম আর ঠিকানা দাও বত্রিশ নম্বর, ধানমন্ডি।

যদিও সামাজিক অসম্মানের শিকার হতে পারে ভেবে এই তালিকা নষ্ট করে ফেলা হয়েছিল।

তেইশ বছরের প্রিয়ভাষিণীকে খুলনার দৌলতপুরে একজন শান্তি কমিটির সদস্য হত্যায় অংশ আছে বলে গ্রেফতার করা হয়। অস্থায়ী ক্যাম্পে আনার পথে তাকে একাধিক পাকিস্তানী সৈন্য ধর্ষণ করে। তারপরের দিনগুলো কেবল নির্যাতনের কালিতে ছাওয়া। তিনি জানান, “ওই সময়ের কথা আমি ভাবতেও পারি না। গভীরভাবে যখন আমি উপলব্ধি করতে যাই, তখন আমার সকল স্নায়ু শিথিল হয়ে যায়। আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি। আবার সুস্থ হয়ে উঠতে আমার অনেক সময় লেগে যায়।”

দৃশ্যমান যুদ্ধ এক সময় থেমে যায় ঠিকই কিন্তু নির্যাতিতদের হৃদয়ে তার ক্ষত থেকে যায় আজীবন।

প্রিয়ভাষিণী যখন নির্যাতনের এই ইতিহাস তুলে ধরলেন, তখন অনেকেই রুষ্ট, বিরক্ত, কী দরকার ছিল গোছের হেয় দেখালেও রাষ্ট্র, সমাজ আর স্বাধীন বাংলাদেশের নব প্রজন্ম আমরা বিনীত হয়েছিলাম, শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায়, আদরে। উনি হয়ে উঠেছিলেন শত শত সন্তানের মা।

এক সাক্ষাতকারে প্রিয়ভাষিণী বলেছিলেন, “অপরিণত বয়সে বিষয়টি আমি সবার কাছ থেকে লুকাতে চেয়েছিলাম; ভাবতাম আমার ছোঁয়া লাগলে সব কিছু অপবিত্র হয়ে যাবে। এই সমাজ আমাকে আঙুল তুলে কথা বলছে আর আমি সেই অপমানগুলো সহ্য করেছি। আমার মনে হয় আমার সেইদিনের অপমানই আমাকে অনুপ্রেরণা দিয়েছে।”

আর পরিবার?

তার মা একজন বান্ধবীকে নিয়ে যশোর রেল রোডের এক বাড়ির চিলেকোঠায় মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার সরবরাহ করতেন। ভাই শিবলী ছিল মুক্তিযোদ্ধা। তারাও বিব্রত হয়ে গেছিল পরিবারে তাকে গ্রহণ করা যাবে না বলে।

সবচেয়ে খারাপ দিকটি ছিল এই, তিনি নিজের কাছে নিজে ছোট হয়ে থাকতেন। বলেছিলেন, “খুব অবাধে বাড়িতে যেতে পারিনি। আমার মধ্যেও সংকোচ ছিল যে; আসলে আমি বিশাল কলঙ্কের বোঝা নিয়ে কারও সামনে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারতাম না। যদিও আমার মা কোনও কালেই এসব নিয়ে কোনও প্রশ্ন করেননি।”

সেই কলঙ্কের বোঝা তার মাথার মুকুট হয়ে গেছিল বাংলাদেশের মানুষের ভালোবাসায়। জীবনের পরিণত সময়ে তিনি শাহবাগের উন্মুক্ত চত্বরে হাজার হাজার ছাত্র জনতার সাথে একাত্ম হয়ে রাজাকারদের বিচারের দাবিতে আন্দোলন করেছেন। দিন নেই রাত নেই তিনি জেগে থেকেছেন, ফাঁসি ফাঁসি ফাঁসি চাই, রাজাকারের ফাঁসি চাই বলে।

সাক্ষ্যে বলেছিলেন, কীভাবে নির্যাতিত করা হয়েছে তাকে। কীভাবে বন্দিশিবিরে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ধরে আনা নারীদের ধর্ষণ এবং শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে। কিভাবে তারা স্তন কেটে নিয়েছে, পাছাড় মাংস কেটে কুকুর শকুনদের খেতে দিয়েছে, সিলিংয়ে চুল বেঁধে ঝুলিয়ে রেখেছে, ঝুলন্ত নারীদের যোনিতে বেয়নেট ঢুকিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করেছে। বাঙালি নারীদের গর্ভে সাচ্চা মুসলিমের সন্তান দেওয়ার মিশনে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তের নারীদের লাগাতার ধর্ষণ করে চলেছে। কমিশনের সামনে ফেরদৌসি প্রিয়ভাষিণী একাই প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ ধর্ষিত নারীর কথা বলেছেন অকলঙ্কিত মুখে। অকপট শুদ্ধতায়।

About Char Number Platform 523 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*