আরব বসন্ত কোন পথে?

সুশোভন ধর

 

এক তুনিশিয় হকার বা পথ বিক্রেতা ৮ বছর আগে এক রবিবারে গায়ে আগুন দিয়ে আত্মহত্যা করেন। সাধারণত খবর হিসাবে এই ধরনের ঘটনা খুব একটা নজর কাড়ে না। কিন্তু মোহাম্মেদ বুয়াজিজির গায়ের আগুন দাবানলের মতো চারিদিকে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। ২৩ বছর ধরে চলা সেদেশের স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে দিকে দিকে ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে। সাধারণ মানুষের আন্দোলনের চাপে এক মাসের মধ্যে দুই দশকের দাপুটে শাসক বেন আলি বাধ্য হন পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে।

সূচনা হয় আরব বসন্তের। আরব দুনিয়ার দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়ে জনগণের বিপ্লবী অভ্যুত্থান। তুনিশিয়ার পরে মিশর, লিবিয়া, ইয়েমেন, প্রভৃতি দেশে স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটে। এমন কি বাহরিন, সৌদি আরবের কট্টরপন্থী শাসকগোষ্ঠীর কপালে ভাঁজ ফেলে এই বিপ্লবী আন্দোলন।

পরবর্তীতে…

২০১০ সালের ১৮ই ডিসেম্বর থেকে ঘটমান এই আন্দোলন সারা বিশ্বে প্রভূত আশা জাগিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে এই আন্দোলনের রেশ ক্রমশ স্তিমিত হয়ে পড়ে, বিভিন্ন ধরণের হট্টগোল গণ্ডগোলের মধ্যে দিয়ে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয় এবং ইসলামি মৌলবাদী শক্তিসমূহ বহু জায়গায় ক্ষমতা দখল করতে সমর্থ হয়।

বিপ্লবী অভ্যুথানগুলোর সাত বছর পরে ওই অঞ্চলের রাজনৈতিক অবস্থা খুবই খারাপ। পুরনো স্বৈরাচারী শাসকবর্গ ও ইসলামী মৌলবাদীরা নিজেদের মধ্যে মারামারি করছে ক্ষমতা দখলের জন্য। মিশরের অবস্থা তো আরব বসন্তের আগের থেকেও খারাপ। সামরিক স্বৈরাচার সেখানে গেঁড়ে বসেছে। সিরিয়া, লিবিয়া এবং ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা গেছেন ও তার কয়েকগুণ বেশি দেশ ছেড়ে শরনার্থী হয়ে পালিয়েছেন।

আরব বসন্তের এই পরিণামে প্রগতিশীল শ্রেণির মানুষজন বেশ হতবাক। যে প্রত্যাশার আগুনে আমরা বুক বেঁধেছিলাম তা শুধু নিভে গেছে তাই নয়, সেখানে বিরাজ করছে ঘন অন্ধকার। কীভাবে দেখব এই বিবর্তনগুলোকে? কী এর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য? এই রাজনৈতিক পালাবদল কী কী সম্ভাবনা হাজির করছে আমাদের সামনে? এই সমস্ত প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে আমাদের ফিরে যেতে হবে আরব বসন্তের মুহূর্তে ও তার প্রাক্কালে।

বিদ্রোহের প্রেক্ষাপট

প্রথম থেকেই এক বড় অংশের ধারণা ছিল যে আরব দুনিয়ায় গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের যুগ এসে গেছে যার ফলে কয়েক সপ্তাহ বা মাসের ভেতরেই শান্তিপূর্ণভাবে সমগ্র অঞ্চলেই সংসদীয় গণতন্ত্র বা নির্বাচনী গণতন্ত্রের বাতাবরণ তৈরি হবে। এই মতের শরিকরা মনে করেছিলেন যে তুনিশিয়ায় বেন আলির পতন ও মিশরে হোসনি মুবারকের পতনের মধ্যে দিয়ে এই যুগের পত্তন ঘটেছে। এবং, সেখান থেকে আরও অনেক আরব দেশেই এই পরিবর্তন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়বে। এই কারণেই এই ঘটনাপুঞ্জকে “আরব বসন্ত” বলে ব্যাখ্যা করা হয় এবং ধরে নেওয়া হয় যে এই বসন্ত খুব দ্রুত আরব রাজনীতিতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবে।

বলা হয়েছিল যে একধরনের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিব্যাপ্তির ফলেই এই “বসন্ত” এসেছে। এই পরিব্যাপ্তির জন্ম ঘটেছে এক নতুন প্রজন্মের হাত ধরে যারা তথ্যপ্রযুক্তির অভূতপূর্ব বিকাশের ফলে বৈশ্বিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছেন। এই নতুন প্রজন্মের গণতন্ত্রের আকাঙ্খাই নাকি সূচনা ঘটিয়েছিল আরব বসন্তের। এই মতের বিশ্লেষকরা মনে করেছিলেন যে এই অভ্যুথানের মূল কারণ মানুষের রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের আকুতি।

এই মতাবলম্বীরা সম্পূর্ণ ভুল কথা বলেছেন তা বলা ঠিক হবে না। লড়াইয়ের মধ্যে এই দিকগুলো অবশ্যই ছিল। কিন্তু আন্দোলন শুধুমাত্র এই দাবি ঘিরে গড়ে ওঠেনি। বরং সেই সাড়া ফেলে দেওয়া সংগ্রামে রাজনৈতিক দাবির থেকেও ওখানকার মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাহিদা অনেক বেশি কাজ করেছে। এক বিরাট সামাজিক বিস্ফোরণ ঘটেছিল যা অন্যান্য বড়সড় সামাজিক বিদ্রোহের মতো রাজনৈতিক আকারই ধারণ করে।

যে দুই দেশ থেকে এই আন্দোলন শুরু হয় সেই দুই দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে তাকালে বোঝা যায় ২০১০-এর কয়েক বছর আগে থেকেই তুনিশিয়া ও মিশরে তিলে তিলে সামাজিক আন্দোলন ও শ্রেণিসংগ্রাম গড়ে উঠছিল। ওই বিদ্রোহগুলোর মূল দাবিদাওয়া শুধুমাত্র রাজনীতিতে সীমিত ছিল না। তাঁরা কেবলই গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার কথা বলেননি। বরং একগুচ্ছ সামাজিক দাবি নিয়ে শুরু করেছিলেন এই আন্দোলন। এ আসলে আরব ভূমিতে গত তিন দশকের অর্থনৈতিক বন্ধ্যার বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা এক সামজিক বিপ্লব। এই অঞ্চলের অত্যন্ত নিচু অর্থনৈতিক বিকাশ বিশাল বেকারত্বের সৃষ্টি করেছে, যার ভুক্তভোগী বিশেষত তরুণ সমাজ। ফলত এই অনুন্নয়ন কোনও এক সময় এক বড় সামাজিক বিস্ফোরণ ঘটাতই।

অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট

আরবভাষী অঞ্চলের দিকে তাকালে পরিষ্কার বোঝা যায় যে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক বৃদ্ধি বা মাথাপিছু অর্থনৈতিক বৃদ্ধি এশিয়া বা আফ্রিকার অন্যান্য অংশের থেকে অনেক কম। এর প্রভাব পড়েছে কর্মসংস্থানের ওপর। জনসংখ্যা বৃদ্ধির অনুপাতে কর্মসংস্থান না বাড়ার কারণে ভয়াবহ বেকারত্বের সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে তরুণ সমাজ ও মহিলারা বিশেষ বঞ্চনার শিকার হয়েছেন। গত কয়েক দশক ধরেই এই অঞ্চলের বেকারত্বের হার গোটা বিশ্বে সর্বোচ্চ। এই ধারাবাহিক অর্থনৈতিক বন্ধ্যা এই সামাজিক বিস্ফোরণ ডেকে এনেছে। শুধুমাত্র বেকারত্ব নয়, এর সাথে স্থানীয় ও আঞ্চলিক বৈষম্য পাল্লা দিয়ে হুহু করে বেড়েছে। একদিকে জমকালো ধনকুবের আর অন্যদিকে চরম দারিদ্র্যের সহাবস্থান সমাজে বিশাল হতাশার সৃষ্টি করেছে। ১৯৭০ সাল থেকে তেলের প্রাচুর্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

আরব অঞ্চলে নয়া-উদারবাদ

এই অর্থনৈতিক পশ্চাদপদতার কারণ এই অঞ্চলের প্রেক্ষাপটে নয়া-উদারনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যেই পাওয়া যাবে। বিশ্বের বেশিরভাগ দেশের মতো ১৯৭০-এর দশকে আরব দেশগুলিতে নয়া-উদারবাদ পদার্পণ করে। এই দর্শন বলে যে রাষ্ট্রকে অর্থনৈতিক কাণ্ড থেকে ক্রমশ হাত গুটিয়ে নিতে হবে। তার ফলে উদ্ভূত সরকারি বিনিয়োগের শূন্যতা বেসরকারি ক্ষেত্র পুষিয়ে দেবে। এই মডেল সহায়ক পরিবেশের ফলে কোনও কোনও দেশে কাজ করেছে যেমন চিলি, তুরস্ক বা ভারতে। যদিও এর সামাজিক ফলাফল ভয়াবহ। কিন্তু আরব অঞ্চলে ওখানকার রাষ্ট্রগুলোর চরিত্রের কারণে এই মডেল কাজ করেনি। আরব অঞ্চলের বেশিরভাগ রাষ্ট্রেই দুটি বৈশিষ্ট্যের গুণফল লক্ষ করা যায়। এগুলো উপস্বত্বজীবি রাষ্ট্র, কারণ এদের রাজস্বের এক বড় অংশ আসে প্রাকৃতিক সম্পদ বিক্রি বা অন্যান্য কারণে পাওয়া খাজনা থেকে। দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রের পরিচালকরা দেশের সমস্ত সম্পদসহ গোটা দেশের মালিক। অন্যান্য “আধুনিক রাষ্ট্রের” সাথে এদের প্রধান পার্থক্য হল যে সেখানে ক্ষমতাসীন ব্যক্তিরা শুধুমাত্র বেতনভুক।

একে এই অঞ্চলে বিগত ৫০-৬০ বছর ধরে ধারাবাহিক রাজনৈতিক অস্থিরতা বিরাজ করেছে। এর সাথে এই অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলোর চরিত্রের কারণে বেসরকারি পুঁজির উন্নয়নের চালিকাশক্তি হয়ে ওঠার কোনও সম্ভাবনাই ছিল না, নয়া-উদারবাদী দর্শন যাই দাবি করুক না কেন। রাষ্ট্র হাত গুটিয়ে নেওয়ার ফলে বিনিয়োগ সীমিত থেকেছে, বেসরকারি বিনিয়োগ যেটুকু হয়েছে তা মূলত ফাটকাবাজিতে এবং দ্রুত মুনাফা তোলার লক্ষ্যে। বেসরকারি বিনিয়োগ রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের শূন্যস্থান পূরণ করতে পারেনি ও নয়া-উদারবাদী মডেল আরব অঞ্চলে নিদারুণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। এই সমস্ত বিষয় থেকে একটা কথা স্পষ্ট যে আরব অঞ্চলে অভ্যুত্থান ঘটেছিল কাঠামোগত সংকটের ফলে, আকস্মিক বা ঘুরে ফিরে আসা নয়।

উপরোক্ত বিবরণ থেকে একথাও পরিষ্কার যে এই অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক-সামজিক কাঠামোর আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। একমাত্র তাহলেই বন্ধ্যাত্ব দূর হবে। কোনও এক বেন আলি বা হোসনি মুবারকের অপসারণের মধ্যে দিয়ে সমস্ত সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। সেই কারণেই দীর্ঘকালীন লড়াই চালাতে হবে। কোনও এক-দুজন স্বৈরাচারী শাসকের পতনের মধ্যে দিয়ে ঝটিকা বিপ্লব অপ্রাসঙ্গিক।

আরব বসন্ত কোন পথে?

২০১০ থেকে আরব অঞ্চলের ঘটনাসমূহ এমন এক দীর্ঘ বিপ্লবী প্রক্রিয়ার সূত্রপাত ঘটিয়েছে যার মীমাংসা কয়েক সপ্তাহ বা মাসে করা সম্ভব নয়। যেকোনও বিপ্লবের ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার মতো তা বছরের পর বছর বা দশকের পর দশক ধরেই চলবে। এই অভ্যুথানের ফলে এক দীর্ঘকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতার সূচনা হয়েছে যা অবশ্যই অনেকরকম উত্থান-পতন ঘটাবে। বিপ্লবী আন্দোলনও গড়ে উঠবে এবং তা প্রতিহতও হবে। কোনও পক্ষই খুব তাড়াতাড়ি এর পরিসমাপ্তি টানতে পারবে না এবং প্রচুর পরিমাণে হিংসাত্মক ঘটনা ঘটতে থাকবে।

বহু লোকেই ঘটনার আকস্মিকতায় অত্যুৎসাহী হয়ে অনেক কিছু ভেবে বসেছিলেন বা অন্যরকম স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু বাস্তব অনেক কর্কশ। এমন এক প্রক্রিয়ার সূচনা হয়েছে যা অত্যন্ত জটিল ও কঠিন। এই প্রক্রিয়া একটা পর্যায়ে উন্নত হতে অনেক সময় লাগবে এবং সবসময় শান্তিপূর্ণ থাকবে না। একটা বিষয় পরিষ্কারভাবে দেখা গেছে যে লিবিয়া বা সিরিয়ায়, বা এমনকি রাজতন্ত্রগুলোতেও তুনিশিয়া বা মিশরের মতো শান্তিপূর্ণভাবে শাসকদের উচ্ছেদ করা যায়নি। কিন্তু তার মানে এই নয় বিপ্লবী প্রক্রিয়া শেষ হয়ে গেছে। যদিও বহু দেশের অবস্থা ভয়াবহ এবং বিপজ্জনক। এর ওপর সিরিয়ায় এক ভয়ঙ্কর ট্র্যাজেডি ঘটে চলেছে। ইয়েমেন, লিবিয়া ও মিশরের পরিস্থিতি বেশ বিপজ্জনক এবং আরও খারাপের দিকে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। তথাপি সবকিছু শেষ হয়ে যায়নি। এই অঞ্চলে বৈপ্লবিক সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন ছাড়া চলমান অস্থিরতা কোনওভাবেই কাটতে পারে না। অবশ্য এই ধরনের পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী একথা হলপ করে বলা বোকামি হবে। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের ভিত্তিতে এই জটিলতা ও সংকটের বিশ্লেষণ করলে বলা যায় যে এখনও আশা আছে। এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে একটা কথা অবশ্যই নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে যতদিন না সামজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের জন্য বিষয়ীগত শক্তি গড়ে উঠবে, অর্থাৎ প্রগতিশীল পরিবর্তনের পক্ষে সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তি মাথা তুলে দাঁড়াবে ততদিন এই অঞ্চলে ভয়াবহ বিপর্যয় চলতেই থাকবে। বিশেষত সেইসব ধরনের ঘটনা যা আমরা বিগত ৪-৫ বছর ধরে দেখছি।

এই দীর্ঘকালীন বিপ্লবী প্রক্রিয়ার ফলাফল নিয়ে শেষ কথা বলতে গেলে কয়েক বছর কেন কয়েক দশকও লাগতে পারে। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে দেখলে আমরা এখনও এর প্রাথমিক পর্যায়ে আছি। এই অঞ্চলে আরও বেশি বেশি করে প্রগতিশীল আন্দোলন গড়ে ওঠা দরকার। অন্যথায় চরম বিপর্যয় ঘটতে পারে যার কিছু কিছু নিদর্শন এই অঞ্চলের বহু দেশেই দেখা যাচ্ছে। সিরিয়ার দিকে তাকালে এ কথা স্পষ্ট বোঝা যায়। সাধারণ মানুষ বিলুপ্ত হচ্ছেন একদিকে আসাদের স্বৈরাচার আর অন্যদিকে আইএস ও আল কায়েদার দড়ি টানাটানির মধ্যে পড়ে। আরব বসন্ত হয়ত হাড় কাঁপানো শীতে পরিণত হয়েছে কিন্তু আরও অনেক ঋতু আসবে।

About Char Number Platform 844 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*