আরবে বামপন্থী আন্দোলন ও সম্ভাবনা

প্রতীপ নাগ

 

আরব রাষ্ট্রগুলিতে বামপন্থার বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যত সামনে এসেছে বিশেষত ২০১১ সালের ‘আরব বসন্ত’-এর সময় থেকেই। সেখানকার বামপন্থীদের অবস্থা বুঝতে গেলে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বোঝা অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে প্রয়োজন বিভিন্ন আরব রাষ্ট্রগুলির সাধারণ ও ভিন্ন বৈশিষ্ট্যগুলির উপর আলোকপাত করা। একই বন্ধনীর মধ্যে পুরো আরব দুনিয়ার রাজনীতির আলোচনা প্রায় অসম্ভব। তেমনই গোটা আরব দুনিয়ায় বামপন্থা ও বামপন্থীদের আলোচনাও একই প্রবন্ধে করা অসম্ভব। আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখব প্রধান আরব প্রজাতন্ত্রগুলি, যেমন — ইরাক, সিরিয়া, মিশর, টিউনিশিয়া, আলজেরিয়ার উপর। আলোচনা থেকে বাদ রাখব আরব রাজতন্ত্রগুলিকে যথা — উপসাগরীয় ও আরব উপদ্বীপের রাষ্ট্রগুলিকে। বাদ রাখার তালিকায় যুক্ত হবে জর্ডন ও মরক্কো বা ইয়েমেন এবং লিবিয়া। আরব বিশ্বের কাছাকাছি যেমন — সুদান, মরিতানিয়ার মতো দেশগুলিকে বাদ রাখা হয়েছে, যদিও এই দেশগুলি অংশত আরবভাষী বা আরব লিগের সদস্য। প্রবন্ধটিতে লেবাননকে তার বিচিত্র রাজনীতির কারণে অন্তর্ভুক্ত করা যায়নি। তুরস্ক আরব রাষ্ট্রগুলির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত না হলেও, আরব প্রজাতন্ত্রগুলির বহু বৈশিষ্ট্য তুরস্কের মধ্যে লক্ষ করা যাবে। সেই কারণে ওই দেশের বামপন্থী আন্দোলনের কথা এখানে এসেছে।

আরবে বামপন্থার জন্ম ও বিকাশ হয়েছে নানারকম দোদ্যুলমানতার মধ্যে দিয়ে। কোনও কোনও সময়ে তা অনতিক্রম্য বলেও মনে হয়েছে। ১৯৬৭-১৯৮৪, এর মধ্যে এই অঞ্চলের কমিউনিস্ট পার্টিগুলির ওপর সোভিয়েত আধিপত্য, প্যালেস্তাইন প্রশ্ন, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আরব সমস্যা নিয়ে কঠিন অবস্থার মধ্যে দিয়ে আরব কমিউনিস্ট পার্টিগুলি ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছিল। একদিকে মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী তত্ত্ব (যা পরিচালিত হত সোভিয়েত ইউনিয়নের নিজ স্বার্থে) আর অন্যদিকে আরব দুনিয়ার বাস্তবতা, এই দুয়ের জাঁতাকলে আটকে পড়েছিল আরবের কমিউনিস্ট পার্টিগুলি।

১৯৫০ সাল থেকে আরব দুনিয়ায় বামপন্থীরা

ইরাক, সিরিয়া, মিশর, টিউনিসিয়া ও আলজেরিয়ার মতো মুখ্য আরব প্রজাতন্ত্রগুলি বহু বিষয়ে একই ইতিহাসের ধারক। ১৯৫০ বা ৬০-এর দশকে অধিকাংশ প্রজাতন্ত্রগুলোতে বিপ্লব হয়েছিল। রাষ্ট্রবাদী একক  রাজনৈতিক দল ঐ প্রজাতন্ত্রগুলির ক্ষমতায় আসীন হয়েছিল, যা টিকেছিল একবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত। সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে বহু ক্ষেত্রেই এই শাসন ক্ষমতা অর্জিত হয়েছিল। যেমন — আলজেরিয়ায় জাতীয় মুক্তি ফ্রন্ট (Front de Liberation) ফরাসী উপনিবেশবাদী শক্তির বিরুদ্ধে, মিশরে ব্রিটিশ আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে ফ্রি অফিসার্স গোষ্ঠী। শুরুতে তাদের মধ্যে যথেষ্ট পরিমাণে জনকল্যাণকামী ও প্রগতিশীল ভূমিকা লক্ষ করা যায়। বিভিন্ন মাত্রায় হলেও তারা তৃতীয় বিশ্ববাদ, ঠান্ডা যুদ্ধের সময় নির্জোট আন্দোলন ও আরব ঐক্যের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ ছিল। তারা স্থানীয় স্তরের ‘সমাজতন্ত্র’-এর কথা বলত সোভিয়েত-এর উদাহরণ টেনে। শিক্ষার জাতীয়করণ, ভূমি সংস্কার, সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা সহ উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই শাসন ক্ষমতা বহু ক্ষেত্রে বারেবারে মৌলিক ও প্রগতিশীল পরিবর্তন ঘটিয়েছিল। তারা সেই সময়ে অন্য আরব রাষ্ট্রগুলোর মতো জিওনবাদ বিরোধী ছিল। অন্যদিকে, একই সাথে এই রাষ্ট্রগুলো একক রাজনৈতিক দল বা সামরিক শাসক দ্বারা শাসিত ছিল, যারা রাজনৈতিক বহুত্ববাদকে অস্বীকার করত। দমনকারী গোপন পুলিশ ও সুরক্ষা বাহিনীর এক ব্যাপক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিল তারা।

ফলত বামপন্থী ও শ্রমিক সংগঠনগুলি হয় রাষ্ট্রযন্ত্রের অংশ হয়, নতুবা (আরও র‍্যাডিক্যাল সংগঠনগুলোর ক্ষেত্রে) তারা বে-আইনি ঘোষিত হয় ও তাদের উপর দমন-পীড়ন চালানো হয়। সাধারণভাবে, যেহেতু শ্রমিক আন্দোলনগুলি সবসময় ছিল জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের অংশ ও তার অধীনস্থ সেহেতু তাদের রাষ্ট্রযন্ত্রের অংশ করে ফেলতে অসুবিধা হয়নি। উদাহরণ হিসেবে আলজেরিয়ার প্রধান ট্রেড ইউনিয়নের কথা বলা যায়। UGTA (Union Generale de Travailleurs Algeriens — আলজেরিয় শ্রমিকদের সাধারণ ইউনিয়ন) তৈরি হয়েছিল ফরাসী শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামের অংশ হিসেবে। ১৯৬২ সালে আলজেরিয়া স্বাধীন হওয়ার পরে UGTA কার্যকরীভাবে সেখানকার শাসক দল FLN এর অধীনস্থ থেকে যায় — FLN  আলজেরিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রামে পুরোধা ভূমিকায় ছিল।

সমঝোতা ও দমন-পীড়নের মধ্যে সীমারেখা সবসময় স্পষ্ট ছিল না। কিছু সংগঠনের ক্ষেত্রে দুই রকমের ঘটনাই ঘটে। যেমন — আলজেরিয়ার শাসক ব্যুমেদিয়েনকে সেই দেশের কমিউনিস্টরা সমর্থন করেছিলেন, তাদের জেল হওয়া সত্ত্বেও। ১৯৫০-এর দশকে মিশরে নাসের কমিউনিস্টদের উপর দমন-পীড়ন চালান, কিন্তু ১৯৬০-এর দশকের মধ্যভাগে নাসের কমিউনিস্টদের সমর্থন পেয়েছিলেন। স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে মিশরের কমিউনিস্ট পার্টিকে তুলে দেওয়া হয়। কমিউনিস্ট পার্টির বহু সদস্য রাষ্ট্রীয় দল আরব সোশ্যালিস্ট ইউনিয়নে  যোগদান করেন। ইরাকেও একই ধরণের মিশ্র অভিজ্ঞতা লক্ষ করা যায়। ১৯৫৮ সালে ইরাকে সামরিক শাসক আবদ আল-করিমকে কমিউনিস্টরা ক্ষমতায় আসতে সাহায্য করে। কমিউনিস্ট পার্টির উপর দমন-পীড়ন চালানো সত্ত্বেও ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত তারা তাকে সমর্থন করেছিলেন। ১৯৬৩ সালে আবদ আল-করিমকে ক্ষমতাচ্যুত করে বাথ পার্টি ইরাকে ক্ষমতায় আসে। বাথ পার্টিরও কমিউনিস্টদের সঙ্গে কখনও সমঝোতা, কখনও দমন-পীড়ন এই নীতি চালাতে থাকে।

এই সমস্ত শাসকদের প্রতি বামপন্থীদের দোদ্যুলমানতা বাস্তবসম্মত। এই শাসন ক্ষমতা বহু ক্ষেত্রে প্রগতিশীল এবং এদের প্রতি জনগণের বিপুল সমর্থন ছিল। অন্যদিকে স্বাধীনভাবে শ্রমিক শ্রেণির দাবি তোলা সহ স্বাধীন রাজনৈতিক সংগঠনগুলির প্রতি তারা অসহিষ্ণু ছিল। ফলে, আপোষ ও বিরোধিতা নিয়ে বামপন্থীদের মধ্যে সিদ্ধান্তহীনতার কারণ সহজেই বোঝা যায়। আপোষের অনিবার্য ফল আত্মসমর্পণ বা অনৈতিকতা নয়। বাস্তব রাজনীতিতে প্রান্তিক শক্তি হওয়ার চাইতে, যথেষ্ট পরিমাণে প্রগতিশীল প্রতিষ্ঠিত শক্তিগুলির মধ্যে কাজ করে তাদের নীতি পরিবর্তনের চেষ্টা করাটা অনেক ক্ষেত্রে কমিউনিস্টরা যুক্তিসঙ্গত মনে করে। আরবের এই শাসন ক্ষমতাগুলোর কাছে রীতিসিদ্ধ গণতান্ত্রিকতা, নাগরিক অধিকার, উদারনৈতিক ধারণা বোধহয় কম গুরুত্বপূর্ণ  মনে হয়েছিল। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সমতা তাদের কাছে অনেক বেশি গুরুত্ব পেয়েছিল। তার একটা কারণ ছিল সেই সময়ের “সমাজতান্ত্রিক” দেশগুলোর চরিত্র (সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন বা তৃতীয় বিশ্বের সমাজতান্ত্রিক দেশগুলির কেউই গণতন্ত্র বা নাগরিক অধিকারকে অগ্রাধিকার দেয়নি)। অন্যদিকে আরব দেশগুলোতে চূড়ান্ত দারিদ্র্য ও অসমতা ছিল। ফলে, এটাকে একধরণের যুক্তিসঙ্গত সমঝোতাও বলা যেতে পারে। শুধুমাত্র প্রতারিত হওয়া নয়, বহুক্ষেত্রেই, বামপন্থীরা সম্ভবত এই শাসন ক্ষমতায় অংশগ্রহণ করে সমাজতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলোকে জোরদার করেছে। আলজেরিয়ায়, ব্যুমেদিয়েনের রাষ্ট্রীয়-সমাজতান্ত্রিক শাসনে ১৯৬০-৭০-এর দশকে PAGS (Socialist Vanguard Party) শুধুমাত্র ইউনিয়ন নয়, এমনকি রাষ্ট্র ও শাসক দলের মধ্যে তাদের প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিল। PAGS সেদেশের সরকারের সঙ্গে একধরণের অরীতিসিদ্ধ কোয়ালিশান করে কাজ করত।

বামপন্থীদের সাথে এই সামরিক বা রাষ্ট্রবাদী শাসনক্ষমতার জোট ততক্ষণ চলেছিল যতক্ষণ এই শাসনক্ষমতা ‘প্রগতিশীল’ ছিল। এই শাসন ক্ষমতার ব্যর্থতা পরিলক্ষিত হয় ১৯৭০-এর শেষদিক থেকে। পূর্বের রাষ্ট্রীয়- সমাজবাদের মডেলকে তাদেরকে ছাড়তে বাধ্য করা হয়, খোলা বাজার অর্থনীতির চাপে, তারা তাদের দেশের অর্থনীতিকে খুলে দিতে বাধ্য হয়। একই সাথে আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর হয় ও বৃদ্ধি পায় দমন পীড়ন। আরব দুনিয়ায় এই পদ্ধতি বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে। মিশরের অর্থনীতিতে ‘খোলা দরজা’ নীতি গ্রহণ করা হয় ১৯৭০ থেকেই আনোয়ার সাদাতের শাসনকালে। ২০০০ সালে বাশার-আল আসাদ ক্ষমতায় আসার পর সিরিয়ায় অর্থনৈতিক উদারিকরণ শুরু হয়। এই নীতি গ্রহণ করার ফলে অসম্ভব হয়ে পড়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রগুলোকে চালানো আর গরিবদের জন্য মৌলিক অত্যাবশকীয় পণ্য বা পরিষেবায় ভর্তুকি দেওয়া। নয়া-উদারবাদী অর্থনীতির দিকে যাত্রার সাথে সাথে আমরা লক্ষ করব আরব রাষ্ট্রগুলোর সাম্রাজ্যবাদ ও জিয়নবাদ বিরোধিতায় তাদের অঙ্গীকার বা দায়বদ্ধতা হ্রাস পেয়েছে। এই বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হল সাদাতের শাসনকালে ১৯৭৭ সালে মিশরের সাথে ইজরায়েলের শান্তি চুক্তি। সোভিয়েত ব্লকের ক্ষয় ও পতন  আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক মেরুকরণ ঘটায় ও বিকল্প অর্থনৈতিক মডেলের অবসান ঘটে।

দেশগুলোর অর্থনীতিকে আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদের কাছে খুলে দেওয়ার ফলে এবং পূর্বের রাষ্ট্রীয়-সমাজবাদ থেকে সরে আসার ফলে, তাদেরকে বামপন্থীদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। এই বামপন্থীদের অনেকে পূর্বে সরকারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। উদাহরণ হিসেবে আলজেরিয়ার কথা যেতে পারে। ১৯৭৯ সালে বেনজাদিদ সে দেশের রাষ্ট্রপতি হয়ে অর্থনৈতিক উদারিকরণ ও সামাজিক সুরক্ষায় কাঁটছাট শুরু করেছিলেন। তিনি বামপন্থী ‘PAGS’-দের সরকারি পদ থেকে অপসারিত করেন। ১৯৮০-তে তুরস্কে (আরব দেশ না হলেও বহু বিষয়ে আরব দুনিয়ার সঙ্গে মিল আছে) সামরিক ক্যু হয়। বামপন্থীদের উপর দমন পীড়ন নামিয়ে আনা হয়। মিশরে  আনোয়ার সাদাত ১৯৭০-এ রাষ্ট্রীয় বামপন্থী সংগঠন আরব সোশ্যালিস্ট ইউনিয়নকে তুলে দেন। বামপন্থীদের বিরোধিতা থেকে আত্মরক্ষার্থে সাদাত মুসলিম ব্রাদার্সকে সমর্থন করেছিলেন। এই সব প্রগতিশীল শক্তিগুলো উত্তরোত্তর শাসন ক্ষমতা থেকে সরে যায়। এমনকি, সরকারি মদতপুষ্ট সংগঠনগুলো প্রতিরোধের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। ১৯৭৬ সালে সাদাতের আশীর্বাদপুষ্ট Tagammu দল তৈরি হয়, এই দল সাদাতের বাধ্য ও বিশ্বস্ত বিরোধী দল ছিল। ঐ দশকের শেষ থেকেই দলটিতে মার্ক্সবাদী ও নাসেরবাদীদের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। দলটি সাদাতের কঠোর সমালোচক হয়ে ওঠে। ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকের পুরাতন নাসেরবাদীরা যারা অনেক বেশি সমাজবাদী ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতায় বিশ্বস্ত ছিলেন, তারা সাদাত বিরোধীদের সঙ্গে যুক্ত হলেন, সাদাত আরও দক্ষিণদিকে সরে যাওয়াতে।

১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামিক বিপ্লব এক ঐতিহাসিক ঘটনা। এই সময়তেই রাজনৈতিক ইসলামের উত্থান ঘটে। পূর্বতন জাতীয়তাবাদী শাসকরা ইসলামের সাথে সাথে আরব জাতীয়তাবাদ ও সমাজতন্ত্রের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। কিন্তু, ইসলামিক শক্তির ক্ষমতা বৃদ্ধি পেলে তারা ঐ শাসক গোষ্ঠীর থেকে দূরত্ব বাড়াতে থাকেন। এক পার্টি শাসিত অনেক দেশে তারা প্রধান বিরোধী শক্তি হয়ে ওঠে। যেমন — মিশরের ও সিরিয়ার মুসলিম ব্রাদারহুড এবং আলজেরিয়ায় FIS, যারা ১৯৯১ থেকে ২০০৪ অবধি রক্তাক্ত গৃহযুদ্ধ চালিয়েছিল। বামপন্থীরা ইসলামপন্থী শক্তিগুলির লক্ষ্যবস্তু হয়ে দাড়িয়েছিল। আলজেরিয়ায় বামপন্থীদের খুন করে FIS। ১৯৭০-এর দশক থেকে ইসলামপন্থী আন্দোলন শক্তিশালী হয়ে উঠলে তার গুরুত্ব বাড়ে। বহু আরব রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র থাকা সত্ত্বেও তারা ঐ ইসলামপন্থী শক্তিগুলির কাছে পৌঁছবার চেষ্টা করে। অংশত বামপন্থীদের বিরুদ্ধে নিজেদের আত্মরক্ষার্থে। যেমন — মিশরে সাদাত ইসলামপন্থী সংগঠনদের সমর্থন করেছিল। আরব প্রজাতন্ত্রের অনেক দেশের রাজনীতিতে ইসলামপন্থী ও রাষ্ট্রবাদী ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির মধ্যে মেরুকরণ ঘটে। বামপন্থীরা হয় প্রান্তিক শক্তিতে পরিণত হয় নতুবা রাষ্ট্রবাদী শক্তির পক্ষভুক্ত হয়। তারা তাদের স্বাধীন অস্তিত্ব জাহিরে অসমর্থ হয়েছিল। প্যালেস্তাইন আন্দোলনের মধ্যে বামেরা স্বাধীন ও তাৎপর্যপূর্ণ শক্তি ছিল। যেমন জর্জ হাবাসের Popular Front for the Liberation of Palestine। ১৯৯০-এ অসলো চুক্তির পরে তারা প্রান্তিক হয়ে পড়ে। ২০০০-এর মধ্যভাগ থেকে ফাতাহ-হামাসের উত্থান ঘটে।

সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আরব কমিউনিজম

সাম্রাজ্যবাদের যুগে জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের প্রতি আরবের কমিউনিস্ট দলগুলির মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী দৃষ্টিভঙ্গি তাদেরকে অনেক সুবিধাজনক অবস্থান দিয়েছিল অন্য রাজনৈতিক শক্তিদের থেকে। এবং অবশ্যই, তারা আধুনিক আরব রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বিপুল অবদান রেখেছে। যদিও তারা উপযুক্ত গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করতে পারেনি তাদের চরিত্রগত কারণে। মার্ক্সবাদের কিছু বিষয়ের সঙ্গে ধর্ম ও জাতীয়তাবাদ সংঘাতপূর্ণ। সোভিয়েত ইউনিয়ন তার বিশেষ সুবিধার জন্য আরবের কমিউনিস্ট পার্টিগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করত। উপর থেকে হঠাৎ হঠাৎ রাজনৈতিক দিক পরিবর্তন হত এবং দলগুলো ছিল আমলাতন্ত্রের ভারে জর্জরিত। যার ফলে কমিউনিস্ট পার্টিগুলো আরব দুনিয়ার অবস্থা ও বাস্তবতাকে অস্বীকার করে। আরবের কমিউনিস্ট দলগুলো বারেবারে অ-জনপ্রিয় অবস্থান গ্রহণ করেছিল। তারা ১৯৪৭-৪৮-এ প্যালেস্তাইন বিভাজনকে অনুমোদন করে। ১৯৫৮ সালে মিশর-সিরিয়া একীকরণের বিরোধিতা এবং নাসেরের তীব্র সমালোচনা করে। আলজেরিয়ায় সশস্ত্র জাতীয় মুক্তি আন্দোলন থেকে তারা নিজেদের সরিয়ে রাখে। সুতরাং কমিউনিস্ট দলগুলো তাদের সুবিধাজনক অবস্থানে থেকেও কোনও ফায়দা তুলতে পারেনি। পরবর্তী দশকগুলিতে সোভিয়েত ইউনিয়ন আরবের স্বপক্ষে অবস্থান নিলে ও তার নিয়ন্ত্রণ শিথিল হলে, পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি ঘটে। এই অবস্থার অবসান ঘটে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটলে। এর ফলাফলে, একদিকে আরবের কমিউনিস্ট দলগুলো পুরোপুরি স্বাধীন হয়, অন্যদিকে সোভিয়েতের সমর্থনও নেই। এই পরিস্থিতিতে, আরবের কমিউনিস্টদের মধ্য জাতীয়তাবাদী ও উদারনৈতিক প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। দেখতে হবে নতুন পরিস্থিতি তাদের কোনও লাভ দিতে পারে কিনা।

২০১১ থেকে পরিস্থিতি

ঐতিহাসিকভাবে আরবের শ্রমিক আন্দোলন দমন-পীড়নকারী রাষ্ট্রবাদী শাসন ক্ষমতার সঙ্গে সমঝোতাপূর্ণ সম্পর্ক রেখেছে। পূর্ববর্তী সমাজবাদী নীতি থেকে সরে যাওয়ার পরেও আরবের বামেরা রাষ্ট্রবাদী ধর্মনিরপেক্ষ শাসকদের সমর্থন দিয়েছে। যেমন — আলজেরিয়ায় ইসলামপন্থী (FIS) ও সামরিক শাসকদের সঙ্গে গৃহযুদ্ধের সময়ে বেশিরভাগ বামশক্তি ও মুখ্য ট্রেড ইউনিয়ন (UGTA) সামরিক বাহিনীর পক্ষ নিয়েছিল।

২০১১ সালে আরব বসন্তের পূর্বে এই ছিল পরিস্থিতি। আরবজোড়া এই আন্দোলন প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে অবাক করে দিয়েছিল। স্বল্প সময়ের জন্য মনে হয়েছিল, এই বিদ্রোহগুলো আরবে বামপন্থীদের অবস্থা বদল করবে ভালোভাবেই। রাস্তা দখল, অবরোধ ও প্রতিরোধের অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠিত বাম সংগঠনগুলো অন্য প্রতিষ্ঠিত সংগঠনগুলোর মতোই শাসন ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত থাকায় আন্দোলনকারীদের কাছে গভীরভাবে অবিশ্বস্ত ছিল। এক নতুন প্রজন্মের আন্দোলনকারী উঠে আসে যাদের শাসন ক্ষমতার প্রতি ছিল চূড়ান্ত বিরোধিতা ও অনাস্থা। কিন্তু এই অপেক্ষাকৃত যুব ‘স্ট্রিট র‍্যাডিক্যাল’দের সীমিত ধারণা ছিল সহনীয় ও ধারাবাহিক সংগঠন গড়ার ক্ষেত্রে। শুধু সীমিত ধারণই নয়, সংগঠনের বিষয়ে তাদের মনোভাব ছিল বিরূপ। রাস্তায় প্রতিবাদ, দখল ও পুলিশের সঙ্গে খণ্ডযুদ্ধকে সাংগঠনিক কাঠামোতে রূপান্তরিত করা কঠিন কাজ হয়ে দাঁড়ায়। ফলশ্রুতিতে, ‘বিপ্লবী’ পরিস্থিতিতে ভাঁটা পড়লে পুরনো শাসক গোষ্ঠী আবার নিজেদের পুনরুত্থান ঘটায়।

একটি কারণ অবশ্যই আমাদের বিবেচনার মধ্যে রাখতে হবে। ‘বিপ্লবী’ কার্যকলাপ (বীরত্ব, ঐক্য, যুব) এবং ‘রাজনীতি’ (নোংরা, দলবাজ, বুড়ো)-র মধ্যে এক কল্পিত বিভাজন আছে। এই আন্দোলন ও উত্থানগুলোর উদ্দেশ্য এবং অভিপ্রায় নিয়ে চূড়ান্ত বিভ্রান্তি ছিল। আন্দোলন ও উত্থানগুলো কি শুধুই পুরাতন একনায়কদের ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া নাকি এর অন্য কোনও রাজনৈতিক দিক আছে? জাতীয় অর্থনীতিকে বিশ্ব পুঁজিবাদের কাছে খুলে দেওয়া সহ রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন বহু মানুষের এই বিদ্রোহে যোগদান করার অন্যতম কারণ। আপাতদৃষ্টিতে এই বিদ্রোহগুলিকে নয়া-উদারবাদী নীতির অনুসিদ্ধান্ত হিসেবে যুক্তিসঙ্গত বলে মনে হয়।

২০১১ সালের ঘটনাবলির ফলাফল মিশ্র। দমন-পীড়নকারী রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ হ্রাস পেতে শুরু করে। এক নতুন সম্ভাবনার দিক তৈরি হয়। প্রথমদিকের ‘বিপ্লবী’ পরিস্থিতির শেষে, পুরাতন শাসকবর্গ আবার নিজেদের উত্থান ঘটায়। যেমন — মিশরে ২০১১ সালের পূর্বে সংখ্যাগরিষ্ঠ ট্রেড ইউনিয়ন রাষ্ট্র ও সরকারি মিশরীয় ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের অনুগত ও অধীনস্থ ছিল। সংসদীয় ক্ষেত্রে এর পরিপূরক ছিল ‘বামপন্থী’ Tagammu গ্রুপ, যারা কমবেশি মোবারকের অনুগত বিরোধীপক্ষ ছিল। কমিউনিস্ট পার্টি ও অন্য বাম সংগঠনগুলো গোপনে কাজকর্ম চালাত। এই উত্থানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রামের বিষয় ছিল সরকারি সাহায্য ব্যতীত স্বাধীন ট্রেড ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠা। এক্ষেত্রে অনেকখানি অগ্রগতি ঘটেছিল। সংসদীয় ক্ষেত্রে সামরিক শাসক ও ইসলামপন্থীদের পাশাপাশি বামপন্থী-উদারনৈতিকদের ‘তৃতীয় শক্তি’ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু স্বাধীন ট্রেড ইউনিয়নগুলির পাশাপাশি বামপন্থী ও উদারনৈতিকরা তামারোদ (Tamarod) প্রচারকে সমর্থন করেছিল, যার ফলশ্রুতিতে সামরিক বাহিনী জেনারেল সিসির নেতৃত্বে ক্ষমতা দখল করে। ১৯৯০-এর আলজেরিয়ার মতো এখানেও সংকটের সময়ে বামপন্থী ও শ্রমিক আন্দোলনের প্রবণতা ধর্মনিরপেক্ষ-রাষ্ট্রবাদী এবং অবশ্যই সামরিক বাহিনীর পক্ষভুক্ত হওয়া। যে সব বামপন্থীরা মুসলিম ব্রাদারহুড ও সিসির সামরিক শাসনকে একই চোখে দেখে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। অন্য বামপন্থীদের ও শ্রমিক শ্রেণিকে তারা তাদের পক্ষভুক্ত করতে পারেনি। এই ঘটনাকে সাম্প্রতিক সময়ে তুরস্কের ঘটনার সঙ্গে তুলনা করা যায়। তুরস্কের গেজি পার্কের প্রতিবাদী আন্দোলনের সামনে বিপদ হল এই আন্দোলনকে ধর্মনিরপেক্ষ-রাষ্ট্রবাদী (কামালপন্থীরা) গ্রাস করে নিতে পারে, যারা সেখানকার ইসলামী মৌলবাদী Freedom and Justice Party-র সরকারের বিরোধিতা করছে।

২০১১-র পূর্বে বামপন্থীদের ও শ্রমিক আন্দোলনের রাষ্ট্রযন্ত্রে অঙ্গীভূত হওয়ার মাত্রা পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। টিউনিশিয়াতে, শ্রমিক আন্দোলন ঐক্যবদ্ধ হয় Union Generale Tunisienne du Travail (UGTT)-এর মাধ্যমে। এরা শ্রমিক আন্দোলনকে রাষ্ট্রযন্ত্রে অঙ্গীভূত হওয়ার ক্ষেত্রে বাধা দেয় এবং তাতে অনেকটা সাফল্য পায়। ২০১১ সালের পূর্বে তারা বিরোধীপক্ষের ভূমিকা পালন করে। UGTT এই উত্থানকে সংঘটিত করে, এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী। তারা স্বাধীন রাজনৈতিক শক্তি, ধর্মনিরপেক্ষ-রাষ্ট্রবাদীদের অংশ নয়। সম্প্রতি এরা মৌলবাদী ইসলামিক এনহাদা (Ennhada) সরকার ও ধর্মনিরপেক্ষ বিরোধীদের মধ্যে সন্ধির জন্য আলাপ আলোচনায় উভয় পক্ষকে বসিয়েছে।

টিউনিশিয়া ব্যতিক্রম হলেও, আরব দুনিয়ার বামপন্থী ও উদারনৈতিকদের প্রধান সমস্যা হল যে ধর্মনিরপেক্ষ-রাষ্ট্রবাদী ও ইসলামিক ধারা উভয়েই শক্তিশালী দ্বৈততায় বিভক্ত। কোন কোন দেশে অন্য দ্বৈততাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। যেমন, ইরাক, লেবানন ও সিরিয়ায় ক্রমবর্ধমান সম্প্রদায়গত বা জাতিগত দ্বৈততা। যদিও ধর্মনিরপেক্ষ-রাষ্ট্রবাদী / ইসলামিক ধারার দ্বৈততা সর্বত্র প্রচলিত। কোনও নতুন বা স্বাধীন রাজনৈতিক উদ্যোগ এই দুই পরস্পর বিচ্ছিন্ন ধারার দোলাচলে পড়বে এবং বাধ্য হবে দুই অপূর্ণাঙ্গ ধারার একটিকে বেছে নিতে। এই দুই দ্বৈততা বা দ্বি-মেরুর বাইরে যে সব বামপন্থীরা স্বাধীন অবস্থান নিচ্ছেন তারা বিচ্ছিন্ন হচ্ছেন এবং তাদেরকে আক্রমণ করা হচ্ছে এই বলে যে, তারা ইসলামপন্থীদের সঙ্গে সমঝোতা করছেন। এতদসত্ত্বেও, কিছু সংগঠন, যেমন — মিশরের বিপ্লবী সমাজতন্ত্রীরা যেখানে সম্ভব সেখানে ইসলামপন্থীদের সঙ্গে কাজ করছেন এবং তাদের মধ্যে প্রচার নিয়ে যাচ্ছেন। তুরস্কে প্রস্তাবিত নতুন বামপন্থী দল গঠনের ক্ষেত্রে সেখানকার বামপন্থীরা একই যুক্তি তুলছেন।

এই ধরণের প্রবণতার আর এক অগ্রগতি হল ইসলামের আবেদনের সাথে সমাজতন্ত্রকে মিশিয়ে এক তত্ত্বের খোঁজ। এর উদাহরণ আগেও আছে। ইরান বিপ্লবের গোড়ার দিকে ইরানের বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব আলি শারিয়াতি তাঁর তত্ত্বে ইসলাম ও মার্ক্সবাদের মিলন ঘটিয়েছিলেন। মিশরের সমাজতন্ত্রী তামের ওয়াগি বর্তমান সময়ে উপরে বর্ণিত দ্বৈততা ভাঙার ক্ষেত্রে ‘বাম-ইসলামিক পার্টি’ গঠনের উপর জোর দিয়েছেন। যদিও পরিষ্কার নয়, এই বিষয়টি কতটা তাঁর কাছে বাস্তবসম্মত। ইস্তানবুলে গেজি বিক্ষোভের সময়ে ‘পুঁজিবাদ বিরোধী মুসলিম’ সংগঠনের উপস্থিতি লক্ষ করা গিয়েছিল। আবার বলা যায় যে, এইসব প্রবণতাগুলোকে দেখা উচিত পরিচিত সত্তার রাজনৈতিক উত্থানের প্রেক্ষিতে বৃহত্তর বামেদের প্রত্যুত্তর হিসেবে, যদিও তারা এখনও সংখ্যালঘিষ্ঠ।

এই ধরনের আন্দোলনগুলো যদি একসাথে আসতে পারে যাতে নতুন প্রজন্ম অবদান রাখতে পারে এবং পুরনো বামেরা তাদের পুরনো হীন অভ্যেস ছাড়তে পারে তবে আরব রাজনীতিতে এক নতুন ঘটনা ঘটবে — যা অন্যত্রও সম্ভব।

 

About Char Number Platform 844 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*