যুদ্ধ-আক্রান্ত সিরিয়া: না-বলা কিছু সত্য

টিম অ্যান্ডারসন

 

ড. টিম অ্যান্ডারসন সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক অর্থনীতির বরিষ্ঠ অধ্যাপক। লাতিন আমেরিকা, এশিয়া-প্যাসিফিক ও মধ্যপ্রাচ্যের উন্নয়ন, অধিকার ও আত্মনির্ধারণ-সংক্রান্ত বিষয়ে নিয়মিত গবেষণা করেন ও লেখেন। বহু বইয়ের প্রণেতা। তাঁর লেখা নিবন্ধ দেশ-বিদেশের অসংখ্য পত্রপত্রিকায় স্থান পেয়েছে। এই নিবন্ধটি ড. অ্যান্ডারসনের সাম্প্রতিকতম বই ‘The Dirty War on Syria’-র থেকে সংক্ষেপিত অংশ। ড. অ্যান্ডারসন আমাদের অনুরোধে এই লেখাটি পাঠিয়ে আমাদের কৃতজ্ঞতায় জড়িয়েছেন। বইটি সংগ্রহ করতে এই লিঙ্ক দেখুন - https://store.globalresearch.ca/store/new-the-dirty-war-on-syria-washington-regime-change-and-resistance-print-copy/

 

মিথ্যাভাষণ ও প্রবঞ্চনা ছাড়া যুদ্ধ হয় না, এ কথা ঠিক। তবে এর সঙ্গে সিরিয়ার যুদ্ধে যা যোগ হয়েছে, তাকে বলা চলে গণ-অনবহিতকরণ বা মাস ডিসিনফর্মেশন। এই কাজটা করা হয়েছে অভূতপূর্ব উপায়ে। ফিলিপ নাইটলি, একজন বৃটিশ-অস্ট্রেলিয় সাংবাদিক, বলেছিলেন – যুদ্ধ প্রচারণার ক্ষেত্রে একটা নকশা লক্ষ্য করা যায়, দুঃখজনক হলেও যা প্রায় অবশ্যম্ভাবী। প্রথমে শত্রুপক্ষের নেতাকে দানব বানাও, তারপর তার লোকজনকে ঘিরে সত্যি-মিথ্যের মিশেলে নানান নৃশংসতার কাহিনি তৈরি করো (নাইটলি ২০০১)। এভাবেই একজন মৃদুস্বভাব চোখের ডাক্তারকে – যাঁর নাম বাশার আল আসাদ – দেওয়া হল এক নতুন শয়তানের রূপ। পশ্চিমী সংবাদমাধ্যমে নিরন্তর বলা হতে থাকল, বাশারের মত বিপদ সারা দুনিয়ার কাছে আর দ্বিতীয়টি নেই, এবং তাঁর নেতৃত্বে গত চার বছরে সিরিয়ার সেনা ক্রমাগত নিজেদের দেশের মানুষজনকে খুন করে চলেছে। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে অনেকেই মনে করেন, যে সিরিয়ার যুদ্ধ একটা গৃহযুদ্ধ, বা গণ-অভ্যুত্থান, বা ওই দেশের কিছু গোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের প্রকাশ। পৃথিবীর একটা বড় অংশের মানুষের মনে এই ভাবনাটা চারিয়ে দিতে পারাটাই সেইসব বৃহৎ শক্তিদের একটা বড় কৃতিত্ব, যারা বিগত পনেরো বছর ধরে মিথ্যে কারণের ওপর ভর করে মধ্যপ্রাচ্যের একের পর এক দেশে শাসনক্ষমতায় বদল ঘটিয়ে চলেছে।

সিরিয়াতে নিজেদের প্রকাশ্যে না-এনে এরা ‘প্রক্সি আর্মি’-র মাধ্যমে নিজেদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। সিরিয়ার সরকার আর সেনাদলকে নৃশংসতার অপবাদ দিচ্ছে, তারপর সিরিয়ার মানুষকে সিরিয়ার সরকারের থেকেই ‘রক্ষা’ করতে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। ইরাক আক্রমণকে পশ্চিমের যত মানুষ নিন্দা করেছিল, সিরিয়ার ক্ষেত্রে তাদের সংখ্যা অনেক কম, কারণ যুদ্ধের আসল কারণ সম্বন্ধে আগাগোড়া তাদের ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছে।

যুদ্ধে জঘন্যতা কিছু নতুন বিষয় নয়। ক্যুবার জাতীয় নায়ক হোসে মার্তি তাঁর এক বন্ধুকে বলেছিলেন, স্পেনের সঙ্গে ক্যুবার স্বাধীনতার যুদ্ধে আমেরিকা তাদের নাক গলাবার চেষ্টা করবেই। ১৮৮৯ সালে তিনি চিঠিতে লিখছেন –‘ওরা চায় যুদ্ধ বাধিয়ে দিতে, যাতে নিজেরা তার মধ্যে ঢুকে পড়ে মধ্যস্থতাকারী বনে গিয়ে দেশটাকে কব্জা করে নিতে পারে। মনুষ্যত্বের ইতিহাসে এর থেকে বেশী কাপুরুষোচিত কাজ যেমন হয় না, তেমন এদের মত ঠান্ডা মাথার শয়তানও হয়নি কোনোদিন’ (মার্তি ১৯৭৫ : ৫৩)। ন বছর পর, ক্যুবার স্বাধীনতার যুদ্ধ চলাকালীন হাভানা পোতাশ্রয়ে এক বিস্ফোরণে ধ্বংস হয়ে যায় ইউ.এস.এস মেইন। মৃত্যু হয় ২৫৮ জন অ্যামেরিকান নাবিকের। আর ক্যুবা আক্রমণের ছুতো পেয়ে যায় অ্যামেরিকা।

পরবর্তী শতকে আমেরিকা লাতিন আমেরিকাতে ডজন ডজন এই ধরণের হস্তক্ষেপের ঘটনা ঘটায়। সি.আই.এ-র মদতপুষ্ট ভাড়াটে ‘স্বাধীনতা সংগ্রামী’ যোদ্ধারা অন্দুরাসে বসে আশির দশকে নিকারাগুয়ার সান্দিনিস্তা সরকার আর অধিবাসীদের ওপর আক্রমণ নামিয়ে আনে। সেই যুদ্ধের পদ্ধতি সিরিয়ার থেকে খুব কিছু পৃথক ছিল না। ত্রিশ হাজারেরও বেশী মানুষ মারা যায় নিকারাগুয়ায়। আন্তর্জাতিক ন্যায়ালয় (১৯৮৬ সালে) এই ঘটনায় আমেরিকাকে দোষী সাব্যস্ত করে, এবং বিধান দেয় – এর জন্য আমেরিকার উচিৎ নিকারাগুয়াকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া। সে-কথা কানেও তোলে না ওয়াশিংটন।

২০১১ সালের ‘আরব বসন্তে’ বৃহৎ শক্তিরা ওই অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে, স্বাধীন দেশগুলোকে আক্রমণ করে প্রকৃতপক্ষে শুরু করে দেয় একটি ‘ইসলামী শীত’ চাপিয়ে দেওয়ার কাজ। দ্রুত দেখতে পাওয়া গেল গোটা আফ্রিকাইয় সর্বোন্নত জীবনযাত্রার মান ছিল যে লিবিয়ায়, তার সম্পূর্ণ ধ্বংস। সেই দেশের আল কায়েদাকে সুবিধা করে দিল ন্যাটোর বোমাবর্ষণ, আর স্পেশাল ফোর্সের অভিযান। ন্যাটোর হস্তক্ষেপের কারণ হিসাবে ছড়ানো হল প্রেসিডেন্ট মুয়াম্মর গদ্দাফিরগণহত্যার পরিকল্পনার মিথ্যে গল্প। এই গল্পের, আর দাবির ভিত্তিতে রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের মিটিঙে ‘সাধারণ মানুষকে বাঁচাতে’ লিবিয়ার আকাশকে ‘নো ফ্লাই জোন’ হিসাবে ঘোষণা করা হল। আমরা জানি কীভাবে সেই ঘোষণাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে লিবিয়ার সরকারকে উৎখাত করল ন্যাটো জোট (ম্যাকিনে ২০১২)।

অথচ পরবর্তীতে এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া গেল না, যে গদ্দাফি কোনোরকম গণহত্যা ঘটিয়েছিলেন বা ঘটানোর পরিকল্পনা করেছিলেন (ফোর্টে ২০১২)। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল (ফ্রান্স)-এর জেনেভিয়েভ গারিগো স্বীকার করতে বাধ্য হন যে তাঁর সংস্থার পূর্ববর্তী দাবির – অর্থাৎ গণহত্যার জন্য গদ্দাফি ‘ব্ল্যাক মারসিনারি’দের ব্যবহার করছেন – স্বপক্ষে কোনো তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়নি (ফোর্টে ২০১২ : এডওয়ার্ডস ২০১৩)।

লিবিয়াতে ন্যাটো বোমা ফেলার দু’দিন আগে সিরিয়ার দক্ষিণতম শহর দারা-তে একটা ইসলামি বিদ্রোহ হয়। যদিও এই বিদ্রোহ খাতায়-কলমে ছিল রাজনৈতিক সংস্কারের দাবিতে, এর স্বরূপ ছিল ভিন্ন। অনেকেই লক্ষ করেননি যে যারা এদের অস্ত্রের জোগান দিয়েছিল – অর্থাৎ কাতার আর সৌদি আরব – তারাই তাদের সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে যাচ্ছিল মিথ্যে খবর। এই আজগুবি গল্পগুলো যে লোকে বিশ্বাস করেছে, তার পিছনেও কারণ ছিল। পশ্চিমী দুনিয়ার অনেক মানুষই – কী উদারবাদী, কী বামপন্থী বা গোঁড়া রক্ষণশীল – মনে মনে বিদেশীদের রক্ষাকর্তা হয়ে ওঠার ইচ্ছে পোষণ করেছিল। এমন একটা দেশের সম্বন্ধে তারা তাদের বদ্ধমূল ধারণা তৈরি করেছিল, যার সম্বন্ধে তাদের ধারণা অত্যন্ত স্বল্প।  তারা ভেবেছিল এই যুদ্ধ দরকারি। এই যুদ্ধ একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে। নিজেদের চওড়া ছাতির মোহে তারা সম্ভবত ভুলে গেছিল আগের যুদ্ধগুলোর কথা, তাদের ঔপনিবেশিক ইতিহাসের কথা।

একধাপ এগিয়ে আমি আরও বলতে চাই, সিরিয়ার এই জঘন্য যুদ্ধের সময় পশ্চিমী দুনিয়া ত্যাগ করেছিল তাদের যা কিছু ভালো– তাদের যুক্তিবোধ, নীতিবোধ আর সংঘর্ষের কারণ-সংক্রান্ত তথ্য যাচাই করে নেবার প্রয়োজনীয়তার কথা। এর বদলে তারা গ্রহণ করেছিল তাদের যা কিছু মন্দ – অর্থাৎ হস্তক্ষেপের জন্য তাদের ‘রাজকীয় বিশেষাধিকার’, যার মূলে ছিল তাদের ইতিহাসবিস্মৃতি আর গভীর জাতি-পক্ষপাত। এই দুর্বলতার পূর্ণ সুযোগ নিয়েছিল ভয়ঙ্কর যুদ্ধ প্রপাগান্ডা। বাশার আল আসাদকে দানব বানিয়ে একরকমের তথ্য-অবরোধ তৈরি করা হল, যাতে যুদ্ধকালীন হিংস্রতার কাহিনি ঠিকঠাক তাদের কাছে না পৌঁছয়। সিরিয়ার যুদ্ধ নিয়ে পশ্চিমী দুনিয়ায় যেটুকু সচেতনতা তৈরি হল, তার সবটাই ২০১১-র পর, কারণ তার আগে সমালোচকদের কণ্ঠ একরকম রোধ করে দেওয়া হয়েছিল বলা চলে।

পশ্চিমা গপ্পের মূল ভাবনাটাই হল রাজকীয় বিশেষাধিকার বা ইম্পিরিয়াল প্রিভিলেজের। অন্য কোনো দেশের মানুষের সমস্যার সমাধানে আমাদের ‘কী করিতে হইবে’ – এমন একটা ধারণা, আন্তর্জাতিক আইন বা মানবাধিকারের ক্ষেত্রে যার কোনো বৈধতা নেই। এর পরের পদক্ষেপ – যুদ্ধের নানান ঘটনা, চরিত্র, আর অজুহাত সম্বন্ধে নানান মিথ্যে গালগল্প তৈরি করা। সিরিয়ার ক্ষেত্রে প্রথম অজুহাত ছিল – ধর্মনিরপেক্ষ আর গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ন্যাটো দেশসমূহ আর উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলোর সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া। এই গল্পটা যখন আর বিশ্বাসযোগ্য থাকল না, তখন বলা হল – সিরিয়ার আলাভী (শিয়া মুসলমানদের গোষ্ঠীবিশেষ) শাসকদের পীড়নের হাত থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠ সুন্নি মুসলমানদের রক্ষা করতেই সিরিয়ার ওপর এই আক্রমণ। এরপর যখন দেখা গেল যে সরকার-বিরোধী বাহিনীঘটিত সাম্প্রদায়িক নৃশংসতা খুব বেশী মনোযোগ আকর্ষণ করছে, তখন বলা হল – এটা আসলে একটা ছায়াযুদ্ধ, আর লড়াইটা ‘নরমপন্থী বিপ্লবী’দের সঙ্গে চরমপন্থী আতঙ্কীদের।

পশ্চিমী হস্তক্ষেপ, সুতরাং, প্রয়োজন হয়ে পড়ল এই ‘নরমপন্থী বিপ্লবী’দের হাত শক্ত করতে, আর সেইসব চরমপন্থী শক্তির সঙ্গে লড়াই করতে, কিছুদিন পূর্বে যাদের কোনো চিহ্নই ছিল না, আর অল্পদিনের মধ্যেই যারা বিশ্বের কাছে হয়ে উঠল এক বড়ো বিপদ।

আমেরিকার স্থানীয় বন্ধুদের(প্রধানত সৌদি আরব, কাতার আর তুরস্ক) দ্বারা পুষ্ট ইসলামবাদীদের ভাড়াটে সৈন্য অতঃপর সিঁদ কেটে ঢুকে পড়ল সেই আন্দোলনে, যা ছিল নিতান্তই রাজনৈতিক সংস্কারের আন্দোলন, এবং চোরাগোপ্তা আক্রমণ চালাতে লাগল পুলিশ আর সাধারণ মানুষের ওপর। দোষটা অবশ্য দেওয়া হল সরকারকেই। বিদ্রোহকে ইন্ধন দিয়ে দাবি উঠল আসাদ ধর্মনিরপেক্ষ বহুত্ববাদী সরকারের অপসারণের। এইসবের পর এল আমেরিকার সেই ঘোষণা – তৈরি করতে হবে ‘নতুন মধ্যপ্রাচ্য’, নিশ্চিতভাবে ওই অঞ্চলের সব দেশকে নিজের অধীনে এনে – কখনও সংস্কারের মাধ্যমে, কখনও একতরফা নিরস্ত্রীকরণের মাধ্যমে, কখনও বা সেই দেশের সরকারকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে। আফঘানিস্তান, ইরাক আর লিবিয়ার পরে লাইনে ছিল সিরিয়া। সিরিয়াতে ভাড়াটে সৈন্যেরা এসেছে মুসলিম ব্রাদারহুড আর সৌদি আরবের ধর্মোন্মত্ত ওয়াহাবিদের থেকে। এদের এবং এদের যোগানদারদের ভাবাদর্শ একই – সালাফিয়, যারা ধর্মনিরপেক্ষ বা জাতীয়তাবাদী শাসনের অনেক ওপরে স্থান দেয় ধর্মবাদী দেশকে।

কিন্তু সিরিয়াতে ওয়াশিংটন-পুষ্ট এই ইসলামবাদীরা একটা সমস্যার সম্মুখীন হল। তাদের লড়তে হল একটা শৃঙ্খলাপরায়ণ সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে, যারা শত প্রলোভন বা প্ররোচনা সত্ত্বেও ধর্মের লাইন ধরতে রাজি হল না। ইরান ও রাশিয়ার সঙ্গে সিরিয়ার সখ্যও একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়াল। সিরিয়াকে দ্বিতীয় লিবিয়া বানানো সম্ভব হল না। পশ্চিম বলল, সিরিয়ার সেনারাই না কী নিজেদের মানুষের ওপর নামিয়ে আনছে হিংসা। অথচ সিরিয়ার মানুষ দেখল, কীভাবে প্রত্যহ আতঙ্কীরা – ন্যাটোর ‘স্বাধীনতা সংগ্রামী’রা – আক্রমণ করছে শহর আর গ্রাম, স্কুল আর হাসপাতাল, আর মারছে শত শত নিরস্ত্র সাধারণ মানুষকে। আর কীভাবেই বা সিরিয়ার সেনা সেই আক্রমণের হাত থেকে মানুষকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে।

এই আতঙ্কীদলকে সিরিয়ার বাইরের মানুষ যদিও ‘বিরোধী’, ‘জঙ্গী’ বা ‘সুন্নি গোষ্ঠী’ বলে ভাবল, এ-কথা বলে রাখা ভালো – আসাদের প্রকৃত রাজনৈতিক বিরোধীরা সেই ২০১১ সালেই ইসলামবাদীদের ত্যাজ্য করেছে। হিংসার কারণে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ বন্ধ হলেও মুসলিম ব্রাদারহুড আর সামান্য কিছু মুখোশের আড়ালে থাকা রাজনীতিবাদ ছাড়া সকলেই দেশের এই কঠিন অবস্থায় শাসনরত বা’থ পার্টিকে না হলেও শাসক এবং সেনাকেই সমর্থন জানালো। সিরিয়ার সেনা আতঙ্কীদের বিরুদ্ধে নৃশংস হলেও সাধারণ মানুষকে রক্ষা করার ব্রত নিয়েই লড়ছিল। কিন্তু ইসলামবাদীরা ছিল সকলের প্রতি নৃশংস। অনেকে দেশ ছেড়ে পালালেও সিরিয়ার লক্ষ লক্ষ ভিটে-হারানো মানুষ সরকার আর সেনাতেই আস্থা রেখেছিল।

শেষ খেলায় বড়ো শক্তিরা চেয়েছিল সিরিয়ার রাষ্ট্রব্যবস্থাটাকেই ছুঁড়ে ফেলে দিতে, নিদেনপক্ষে একটা বিকলাঙ্গ রাষ্ট্রের, বা একটা বহুধাবিভক্ত গোষ্ঠীদ্বন্দ্বদীর্ণ রাষ্ট্রের জন্ম দিতে, যাতে ওই অঞ্চলের স্বাধীন রাষ্ট্রগুলো নিয়ে তৈরি অক্ষটা ভেঙে দেওয়া যায়। এই অক্ষের একদিকে আছে দক্ষিণ লেবাননের হেজবোল্লাহ্‌ আর প্যালেস্তাইনীয় প্রতিরোধ, আর অন্যদিকে আছে সিরিয়া আর ইরান – অঞ্চলের দুই দেশ যেখানে আমেরিকার সামরিক উপস্থিতি নেই। সাম্প্রতিককালে পশ্চিমী আক্রমণ, গণহত্যা আর দখলদারিতে ধ্বস্ত ইরাকও এই অক্ষে আসার চেষ্টা করছে। এ-বিষয়ে রাশিয়ার ভূমিকা ভারসাম্য রক্ষার। সাম্প্রতিক ইতিহাসে দেখা যাবে, রাশিয়া বা ইরানের কেউই ওয়াশিংটন বা তার তাঁবেদারদের দখল করে নেবার কোনো সাম্রাজ্যবাদী ইচ্ছে দূর-দূরান্তরেও রাখে না, যদিও এদের অনেকেই – যেমন বৃটেন, ফ্রান্স আর তুরস্ক – এই অঞ্চলে নিজেদের সাম্রাজ্য বিস্তারের জন্য বহু যুদ্ধ লড়েছে। এই ‘প্রতিরোধী অক্ষের’ দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যেতে পারে, সিরিয়ার জঘন্য যুদ্ধের অবসান এই অঞ্চলের দেশগুলোকে নিয়ে বৃহৎ শক্তিদের ছেলেখেলার কাছে একটা বড়ো বাধা হয়ে উঠতে পারে। সিরিয়ার প্রতিরোধ সফল হলে সেটাই হবে ওয়াশিংটনের ‘নতুন মধ্যপ্রাচ্য’ মডেলের শেষের শুরু।

সিরিয়া বেঁচে থাকবে সে-দেশের স্থিতি, রাজনৈতিক একতা আর তার শক্তিধর বন্ধুদের জন্য। ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এই যুদ্ধে রাশিয়ার বায়ুসেনার হস্তক্ষেপ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গুরুত্বপূর্ণ ছিল সিরিয়ার স্বাধীনতা রক্ষার লক্ষ্যে ইরান, ইরাক আর লেবাননের স্থলপথে যুদ্ধ।

প্রতিরোধী অক্ষের বিস্তার আর গভীরতর রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তির উত্থানে সিরিয়ার যুদ্ধ একটা অনুকূল অবস্থার দিকে যাবে বলেই আশা করা যাচ্ছে, যা ‘শাসনক্ষমতায় বদলের’ অছিলায় এই অঞ্চলে ওয়াশিংটনের দীর্ঘ পনেরো বছরের নির্বিচার হত্যালীলার সমাপ্তি ঘোষণা করতে পারে।

 

সূত্র:

Edwards, Dave (2013) ‘Limited But Persuasive’ Evidence – Syria, Sarin, Libya, Lies’, Media Lens, 13 June, online: http://www.medialens.org/index.php/alerts/alert-archive/alerts-2013/735-limited-but-persuasive-evidence-syria-sarin-libya-lies.html

Forte, Maximilian (2012) Slouching Towards Sirte: NATO’s War on Libya and Africa, Baraka Books, Quebec

ICJ (1986) Case concerning the military and paramilitary activities in and against Nicaragua (Nicaragua v. United States of America) Merits’, International Court of Justice, Judgement of 27 June 1986, online: http://www.icj-cij.org/docket/?sum=367&p1=3&p2=3&case=70&p3=5

Knightley, Phillip (2001) ‘The disinformation campaign’, The Guardian, 4 October, online: http://www.theguardian.com/education/2001/oct/04/socialsciences.highereducation

Kuperman, Alan J. (2015) Obama’s Libya Debacle’, Foreign Affairs, 16 April, online: https://www.foreignaffairs.com/articles/libya/2015-02-16/obamas-libya-debacle

Martí, Jose (1975) ObrasCompletas, Vol. 6, Editorial de CienciasSociales, La Habana

McKinney, Cynthia (Ed) (2012) The Illegal War on Libya, Clarity Press, Atlanta

Putin, Vladimir (2015) ‘Violence instead of democracy: Putin slams ‘policies of exceptionalism and impunity’ in UN speech’, RT, 28 September, online: https://www.rt.com/news/316804-putin-russia-unga-speech/

Richter, Larry (1998) ‘Havana Journal; Remember the Maine? Cubans See an American Plot Continuing to This Day’, New York Times, 14 February, online: http://www.nytimes.com/1998/02/14/world/havana-journal-remember-maine-cubans-see-american-plot-continuing-this-day.html

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*