চাঁদের জমাট রক্ত : কাশ্মীরের অন্তর্ঘাতময় সংলাপ

দেবব্রত শ্যামরায়

 

কাশ্মীরের প্রেক্ষাপটে নির্মিত পরিচালক বিশাল ভরদ্বাজ-এর ‘হায়দর’ (২০১৪) ছবিতে বেশ মজার একটি দৃশ্য আছে। মজার দৃশ্য যা একইসঙ্গে করুণ। এক প্রৌঢ় মুসলিম গৃহস্থ (কিছুক্ষণে বোঝা যায় ইনি কিঞ্চিৎ মানসিক ভারসাম্যহীন) মহল্লায় নিজের বাড়িতে ঢুকতে গিয়ে চৌকাঠের সামনে হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পড়েন। দাঁড়িয়েই থাকেন। তাঁকে দেখতে পেয়ে বাড়ির ভেতর থেকে কেউ বেরিয়ে আসেন, প্রৌঢ়ের শরীর, পরিচয়পত্র, জামাকাপড় নেড়েচেড়ে তল্লাশির ভান করেন। তল্লাশি নির্বিঘ্নে শেষ হয়েছে — আশ্বস্ত হওয়ার পরই ভদ্রলোক নিজের বাড়ির ভেতরে পা রাখেন। দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ কাশ্মীরি মুসলিমদের ওপর ঘটে চলা বাছবিচারহীন নিদারুণ সামরিক নির্যাতনের প্রতিভূ হয়ে আছে সিনেমার এই ডিলিউশনাল চরিত্রটি।

ছবিটিতে এই প্রৌঢ় মুসলিমের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন লেখক-সাংবাদিক বাশরাত পীর (যিনি ‘হায়দর’-এর সহ-চিত্রনাট্যকারও বটে) যাঁর লেখা ‘কারফিউড নাইট’ বইটি বহুচর্চিত ও কাশ্মীরিদের ওপর ভারত রাষ্ট্রের কয়েক দশকব্যাপী অত্যাচারের এক জ্বলন্ত দলিল। পাশাপাশি ‘কারফিউড নাইট’-এর ওপর একপেশে ইতিহাস তুলে ধরার অভিযোগ এনেছেন উদ্বাস্তু কাশ্মীরি পণ্ডিতেরা। গত শতাব্দীর আশির দশকের শেষের দিকে উপত্যকার কয়েক হাজার বছরের বাসিন্দা কাশ্মীরি পণ্ডিতদের ওপর অভূতপূর্ব আক্রমণ নামিয়ে আনেন কাশ্মীরি মুসলিমদের একাংশ, ফলস্বরূপ পিতৃপুরুষের ভিটেমাটি ত্যাগ করে পণ্ডিতদের নেমে আসতে হয় শ্রীনগরে, হিন্দু-অধ্যুষিত জম্মুতে, ছড়িয়ে যেতে হয় দিল্লির উদ্বাস্তু শিবিরে অথবা দেশ বা পৃথিবীর অন্য কোনও প্রান্তে। সঙ্গে থেকে যায় আবার কোনও একদিন নিজভূমে ফিরে যেতে পারার স্বপ্ন ও স্মৃতির অসহনীয় ভার।

পরের তিন দশকে ঝিলমের বুক দিয়ে অনেক জল বয়ে গেছে। মুসলিম ও পণ্ডিতদের মধ্যে পারস্পরিক ঘৃণা ও অবিশ্বাসের বাতাবরণে এবং উভয়কে নিয়ে দুই রাষ্ট্রের রাজনৈতিক পাশা খেলার প্রেক্ষিতে কাশ্মীরের ভাগ্যবিড়ম্বনা বেড়েছে বই কমেনি। এমনই এক অস্থির সময়ে প্রকাশিত হল একটি অভিনব গল্পসংগ্রহ, যেখানে সম্ভবত প্রথমবার মুসলিম ও পণ্ডিতরা পাশাপাশি বসে নিজেদের কাশ্মীর যাপনের কথা বিবৃত করেছেন। সংকলনের নাম — কাশ্ : কাশ্মীরি পণ্ডিত ও কাশ্মীরি মুসলমানদের সাম্প্রতিকতম ছোটগল্পের অনুসৃজন। বইটির নামে ‘কাশ্’ শব্দটির ব্যবহার বহুস্তরীয়। কাশ যেন ‘কাশ্মীর’ শব্দ উচ্চারণেরই দ্যোতক। আবার অন্যদিকে এই ভূখণ্ড যা কিনা স্বপ্নের উপত্যকা হয়ে উঠতে পারত, তাকে ঘিরে স্বপ্নভঙ্গের যে বোধ, ‘কাশ্’-এর অর্থগত দিকটি (ইংরেজিতে If) পাঠককে সেই অসম্পূর্ণতার বোধে জারিত করে। জরুরি এই বইটি প্রকাশ করেছেন বৈভাষিক প্রকাশনী। বাংলা ভাষায় এই ধরনের উদ্যোগ তো প্রথম বটেই, সম্পাদকীয় থেকে আমরা জানতে পারছি — কাশ্মীরি পণ্ডিত ও মুসলমানদের ‘এই সহাবস্থান আশির দশকের শেষ দিকে কাশ্মীরি পণ্ডিতদের কাশ্মীর থেকে বিতাড়নের পরে প্রথমবার ঘটেছে ভারতবর্ষ তথা বিশ্বের কোনও গ্রন্থে।’ সহাবস্থানের দাবি ভুল নয়, সংকলনে বাইশটি ‘অগ্রন্থিত ও সাম্প্রতিকতম’ গল্পে কাশ্মীরের এই দুই সম্প্রদায়ের মানুষের লেখা (সমসংখ্যক না হলেও কাছাকাছি সংখ্যার) গল্পই রয়েছে।

site de rencontre oothentic কাশ্: কাশ্মীরি পণ্ডিত ও কাশ্মীরি মুসলমানদের সাম্প্রতিকতম ছোটগল্পের অনুসৃজন
সম্পাদনা: অদ্বয় চৌধুরী, অভিষেক ঝা
সম্পাদনা সহযোগিতা: সিদ্ধার্থ গিগু, মুহাম্মাদ তাহির
প্রকাশক: অবনীন্দ্র চৌধুরী ও অর্ক চট্টোপাধ্যায়, বৈভাষিক প্রকাশনী
প্রচ্ছদ: দেবদ্যুতি কয়াল
প্রথম প্রকাশ: জানুয়ারি ২০১৮
মূল্য: ২৫০ টাকা

সংকলনের প্রথম গল্পটির কথাই ধরা যাক। নাম — ‘বৃষ্টি’। লেখক — অরভিন্দ গিগু। গল্প বলার শৈলীটি অভিনব। শুধুমাত্র কয়েকজন মানুষের কথোপকথন তৈরি করেছে এই গল্পের শরীর। আভাসে ঈঙ্গিতে চিহ্নায়ণে উঠে আসে ১৯৯০-এ উপত্যকা ছেড়ে চলে এক ভাগ্যহীন পরিবারের কথালাপ; এমন এক পরিবার যারা জওহর টানেল তো অক্ষত শরীরে পেরিয়ে যেতে পেরেছে, কিন্তু নিজের নিজের দুঃসহ স্মৃতিগহ্বরে আজও ঘুরে মরছে। গল্পে কেউ একজন স্বগতোক্তি করেন — ‘বাইরে থেকে আসা লোকগুলোর স্লোগানে ভয় পাইনি আমি। ভয় পেয়েছিলাম পাশের বাড়ির নীরবতা দেখে…।’

সংকলনের পরবর্তী উল্লেখযোগ্য গল্প সিদ্ধার্থ গিগু-র — বিষ, অমৃত। উপত্যকা পেরিয়ে এল যাঁরা, সেইসব উদ্বাস্তুদের সরকারি শিবিরে দিনযাপনের মর্মান্তিক কাহিনী এই গল্প। একটি শতচ্ছিন্ন ত্রিপলের তাঁবুতে থাকা ললিত, ঘায়ে ভরা শরীর নিয়ে একমাত্র খাটে শয্যাশায়ী ললিতের বৃদ্ধ বাবা, বৃদ্ধের স্ত্রী ও অর্থাৎ ললিতের মা যিনি সারাদিন নীরবে স্বামীর ঘায়ে মলম লাগান অথবা তাঁবু সেলাই করেন, ললিতের স্ত্রী যে শ্বশুরের মৃত্যুর পর ঐ খাটে একটু আরামে শোওয়ার অপেক্ষা করে — গিগুর গল্পের এই চারটি মানুষের জীবনসংগ্রামের আখ্যান বিশ্বের যেকোনও প্রান্তের উদ্বাস্তুদের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে।

মুহাম্মাদ তাহিরের ‘পরিযায়ী’ গল্পে উত্তরপ্রদেশ থেকে আগত শ্রমিক জামাল ও বদ্রুর চোখ দিয়ে দেখি কাশ্মীরের এক শহরের দৈনন্দিন বাস্তবতা, শুনি ধুলো উড়িয়ে আর্মি কনভয়ের ছুটে যাবার শব্দ, দূরে বোমা ফাটার আওয়াজ।

হরি কৃষেণ কউল-এর ‘আঙুল’ গল্পে কাশ্মীরে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে এক সময়ের সহপাঠী সুমন ধরের আহ্বানে আবদুল মজিদ তিনমাসের এক প্রোজেক্টে ইজিপ্টে কাজ করতে যায়। তিন মাসের এই সাহচর্য জুড়ে তাঁদের আপাত সখ্যতার আড়াল থেকে মাঝে মাঝে বেরিয়ে আসে চাপা ক্রোধ, করুণা, ব্যঙ্গ, অবিশ্বাস যা তাঁরা আঙুল দিয়ে স্পর্শ করতে পারে। বোঝা যায়, গত তিরিশ বছর ধরে তারা দুজনেই যে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি ও স্বজন হারানোর বেদনার ভেতর দিয়ে গেছে, তা তাদের চিরদিনের মতো বদলে দিয়েছে।

সংকলনের দীর্ঘ গল্পগুলোর মধ্যে একটি হিনা খানের ‘একজন জুতো-চোর আর তার বেকারি’। গল্পটি পড়া শুরু করলেই সদ্য তৈরি নরম রুটির দুরন্ত সুবাস পাঠককে আক্রমণ করে। বিধবা ইয়ানা তার এই পুরনো বেকারি ও মানসিক ভারসাম্যহীন পুত্র রাজাকে প্রাণ দিয়ে আগলে রাখতে চান। ইয়ানার অন্য ছেলে শেহবা ও তার স্ত্রী রানী চায় রাজার দায় থেকে নিষ্কৃতি পেতে, সেইসঙ্গে বেকারিটাও বেচে দিতে। চরিত্রগুলির মধ্যেকার স্বার্থের সংঘাত নিদারুণ এক পরিসমাপ্তির দিকে টেনে নিয়ে যায় গল্পটিকে, যেখানে আর ভাজা গোলরুটির গন্ধ নেই, মেওয়াল ফুলের গন্ধ নেই।

আখ্যানের সরলরৈখিক চলন ভেঙে ফেলেছেন অনেক লেখকই। পীরজাদা মুজামিলের ‘আজহার’ গল্পের কথকের কাজই হল মানুষকে অন্ধ করে দেওয়া। ‘আমি ভালোবাসি সেসব চোখ অন্ধ করতে যারা শরতে চিনার পাতা ঝরা দেখতে ভালোবাসে।’ মুহূর্তে আমাদের মনে পড়ে যায় বছর দু’য়েক আগে বিক্ষোভকারীদের ওপর ভারতীয় সেনাবাহিনীর পেলেট গান-এর অপর্যাপ্ত ব্যবহার যা কাশ্মীরে ‘মাস ব্লাইন্ডিং’ বা গণঅন্ধত্ব ডেকে এনেছে। বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতন্ত্রে গণতন্ত্র বজায় রাখতে হলে দুষ্টু নাগরিকদের এটুকু দাম তো দিতে হতেই পারে, তাই না?

সন্তোষ বাকায়া-র ‘নতুন গান’ গল্পে আমরা কাশ্মীরের সেই মুখ দেখি যেখানে ছুটির দিনে ঝিলমের ব্যস্ত সেতুকে সামনে রেখে ভূষণ কউল ও শাবির মাঝি, দুই ছোটবেলার বন্ধু, সকাল থেকে রাত অবধি দাবা খেলে চলে। শাবিরের স্ত্রী শাগুফতা নিজের ও ভূষণের বাচ্চাদের জন্য দই দিয়ে ইয়াখনি বানায়, ওদিকে ভূষণের স্ত্রী দুই দাবাড়ুর মধ্যাহ্নভোজের জন্য রোগন জোশ-এর ডেকচি চাপিয়েছে। দীপক বুডকি-র ‘ইনফর্মার’ গল্পে অশীতিপর দম্পতি নীলকান্ত ও অরূন্ধতী হাঁটুর ব্যথা, যৌবনের সুখসময়ের স্মৃতি, ও বহুদূরে থাকা ছেলেমেয়েদের কথা ভাবতে ভাবতে দিন কাটান আর একদিন গভীর রাতে চাদর গায়ে মাফলার পরা দুটো লোক তাদের ঘরে ঢুকে আসে। নীলকান্ত কানফাটা শব্দ আর আগুনের ঝলক দেখার ঠিক আগে অরুন্ধতীর গায়ের ওপর লেপটা ভালো করে টেনে দেন। পাঠকের মুখে রক্তের ছিঁটে এসে লাগে।

সংকলনটি সুসম্পাদিত। প্রচ্ছদ থেকে চোখ সরানো যায় না। মলাটে বিছিয়ে থাকা বরফের শুভ্র উপত্যকা যেন পূর্ণ চাঁদেরই এক পিঠ, যার এক পাশ দিয়ে এঁকেবেঁকে বয়ে যায় নীলবসনা ঝিলম, আর কাশ্ শব্দটির মাঝে এক ফোঁটা লাল রঙের ছোঁয়া যেন জমাট রক্তের মতো জেগে থাকে। বইয়ে মুদ্রণ প্রমাদের কথা চেষ্টা করেও মনে করতে পারছি না। প্রতিটি গল্পের শেষে, সেই গল্পে ব্যবহৃত কাশ্মীরি শব্দের অর্থ দেওয়া আছে। পরিশিষ্টে রয়েছে লেখক ও অনুবাদকদের যথাযথ পরিচিতিটুকু। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই গল্পগুলির অনুবাদকেরা ভালোবেসে কাজ করেছেন, অনুবাদগুলি যে নিতান্ত ফরমাইশের সন্তান নয় তা বোঝা যায়। অবশ্য সম্পাদকদ্বয় সচেতনভাবেই অনুবাদ শব্দটি ব্যবহার করেননি, ‘অনুসৃজন’ বলেছেন। অনুসৃজন প্রসঙ্গে একজায়গায় তাঁরা লিখেছেন — ‘..যথাসম্ভব সতর্কতা বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়েছে, যাতে রাজনৈতিক অস্থিরতায় ক্ষতবিক্ষত কাশ্মীরের গল্পের রূঢ় বাস্তবতার অভিঘাত গল্পগুলির সাহিত্যগুণ কোনওভাবেই বিনষ্ট না করে।’ সম্পাদকেরা এখানে ঠিক কী বলতে চেয়েছেন, পরিষ্কার হল না। ক্ষতবিক্ষত কাশ্মীরের গল্পের রূঢ় বাস্তবতার অভিঘাত থেকে সেই গল্পের সাহিত্যগুণকে আলাদা করার দরকারটাই বা কেন? কোনও শিল্পকর্মের শিল্পগুণ কখনও তার কনটেন্ট নিরপেক্ষ হতে পারে কি? আর তাছাড়া সাহিত্যের একটা জরুরি কাজ তো ডিস্টার্ব করাও। আশা করি, পরবর্তী সংস্করণের মুখবন্ধে সম্পাদকেরা এই ছোট্ট বিভ্রান্তিটুকু দূর করবেন।

বই পড়া শেষ হয়। কিন্তু কাশ্মীরি মুসলমান আর কাশ্মীরি পণ্ডিতদের গল্প, মাঝবরাবর একটা দাগ টেনে শিল্প-সাহিত্যকে এইভাবে ভাগ করে দেওয়া যায় কিনা, সেই আলোচনা এত সহজে শেষ হওয়ার নয়। তবে যেহেতু এই দুই সম্প্রদায়ের কাছে কাশ্মীর দু’টি সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরস্পরবিরোধী ভূরাজনৈতিক অভিজ্ঞতা তুলে ধরে, সেক্ষেত্রে সেই অভিজ্ঞতাগুলির সৎ প্রতিফলন, যেমন এই বইটি, একধরনের জরুরি হিউম্যান ডকুমেন্ট বই কী! একই জায়গায় দাঁড়িয়ে প্রশ্ন তোলা যায়, এই যুযুধান সম্প্রদায়চেতনার বাইরে গিয়ে এমন কোনও প্রস্থানবিন্দু কি আদৌ থাকা সম্ভব, যেখানে কাশ্মীর আলাদা করে পণ্ডিতদের নয় বা মুসলমানদেরও নয়, বরং এই দুই সম্প্রদায়-সম্পৃক্ত একটি অখণ্ড মানবিক সত্তা, যেখানে এঁদের মধ্যে যেকোনও এক পক্ষ খারাপ থাকলে কাশ্মীরেরও পক্ষেও ভালো থাকা সম্ভব নয়? গল্প সংকলনটি একবার হাতে নিলে পাঠক হয়তো এইসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করতে পারেন।


About Char Number Platform 339 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*