প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার অর্থ একটা জাগরণ : সন্দীপ দত্ত

সুস্নাত চৌধুরী

 

কলকাতা লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি ও গবেষণাকেন্দ্রের কর্ণধার শ্রী সন্দীপ দত্তকে, সকলের প্রিয় সন্দীপদাকে বাদ দিয়ে বাংলা ভাষার লিটল ম্যাগাজিন নিয়ে কোনও আলোচনা শেষ হতে পারে না। চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম-এর তরফ থেকে সন্দীপ দত্ত-এর সঙ্গে কথা বললেন বোধশব্দ পত্রিকার সম্পাদক বন্ধু সুস্নাত চৌধুরী।

সন্দীপদা, প্রথমেই আপনাকে ধন্যবাদ জানাই যে শারীরিক সমস্যা সত্ত্বেও আপনি এই সাক্ষাৎকারের জন্য আমাদের সময় দিয়েছেন।

প্রথমেই যেটা বলার যে আপনার নিজের দেখার জায়গা থেকে, আপনার মতে বা অভিজ্ঞতায় লিটল ম্যাগাজিনের সঙ্গে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার সম্পর্কটা ঠিক কী?

আসলে লিটল ম্যাগাজিন তার মতো করে কাজ করে, প্রকাশ পায় — তার উচ্চারণে, তার সক্ষমতায়, বা নিজস্ব জগতকে কেন্দ্র করে। সেখানে সে সতত স্বাধীন। তথাকথিত প্রতিষ্ঠান ব্যাপারটা এসেছে কিন্তু অনেক পরে। বিশেষ করে সাতের দশকে প্রাতিষ্ঠানিকতা এল এই জন্যে যে তখন একটি নির্দিষ্ট বাজারি কাগজ দাপট দেখাতে আরম্ভ করল। যেমন — আমরা যাদের লেখক বলব, তারাই লেখক। এর বাইরে লিটল ম্যাগাজিনের যে সৃজনশীল ধারা, স্বতঃস্ফূর্ত ধারা, সেটা যে ঐ গা-জোয়ারিতে খুব একটা প্রভাবিত হয়েছে তা নয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের এই দালালিটা, এই যে সোচ্চারে কণ্ঠস্বরটা তোলা, তার বিরুদ্ধে একটা উচ্চারণ করার জায়গা তৈরি করতে পেরেছে। আমি বলছি না যে লিটল ম্যাগাজিনকে ঘোষণা বা উচ্চারণের মাধ্যমে বলতে হবে যে আমি প্রতিষ্ঠানবিরোধী, তার কাজের মধ্যে দিয়েই সে তার প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা প্রকাশ করবে। অর্থাৎ তার কাজগুলিই হবে এমনই। তার মধ্যে তো প্রতিষ্ঠানবিরোধী সত্তা ছিলই, এই অর্থে যে যদি আমরা ধরে নিই প্রতিষ্ঠান মানে একটা কাগজ, প্রাতিষ্ঠানিক কোনও একটা অবয়ব, একটা বিশ্ববিদ্যালয়, বা এই স্তরের কোনও কিছু, বা একটা রাষ্ট্রযন্ত্র, পুলিশ… যেকোনওভাবে প্রতিষ্ঠানকে যদি আমরা একটা প্রতীক রূপে ধরি, তাহলে তার বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে লিটল ম্যাগাজিন তার নিজস্ব স্বাধীন সত্তায় থেকে কাজ করে। সে কখনও নতজানু নয়। আমি বলতে চাইছি যে, প্রতিষ্ঠানবিরোধী সত্তা মানেই সবসময় প্রাতিষ্ঠানিকতার দিকে চেয়ে থাকা নয়, বরং এই যে সে তার মতো করে অনেক লেখাকে প্রশ্রয় দিল, যে লেখাগুলো ঐ তথাকথিত বড় কাগজ, বাণিজ্যিক কাগজ কোনওদিনই ছাপতে সাহস করত না। আমি অন্তত সাতের দশকের কথা বলতে পারি, আটের দশকের কথাও বলতে পারি। তারা কতকগুলি লেখক, সেই হাউসের লেখক, তারা তো টাকা ঢেলে লেখা ছাপত, কিন্তু তার বাইরে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার জায়গা থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয়েছে। যেমন ছয়ের দশকে হাংরি জেনারেশন, বা শাস্ত্রবিরোধী, বা ধ্বংসকালীন, বা ধরো অটো রাইটিংস… এরা নিজেদের মতো করে বলতে চাইল যে এতদিন প্রতিষ্ঠান যা বলছে, তা আর নয়। আমরা প্রাতিষ্ঠানিকতা মানি না। আমরা ছুৎমার্গতা মানি না। আমরা নিজের মতো করে চলি। আমরা বরং তার বিরোধিতা করি। হাংরি জেনারেশন বা এই ধরনের যে আন্দোলনগুলো, সেটা লিটল ম্যাগাজিনের মধ্যে দিয়ে হয়ে গেছে। লিটল ম্যাগাজিন তার মতো কাজ করে, প্রতিষ্ঠান তার মতো কাজ করে। প্রতিষ্ঠান হচ্ছে একটা বাণিজ্যিক নিজস্ব ধারা, লিটল ম্যাগাজিন একেবারে উলটো দিকে থাকা বিপরীত ধারা, যারা সাহিত্যের জায়গা থেকে নিজস্বতা নিয়ে কাজ করছে। সেখানে কোনও বাণিজ্যিকতার প্রলোভন নেই, সেখানে কোনও প্রাতিষ্ঠানিক যশোপ্রার্থী হওয়ার প্রলোভন নেই, বরঞ্চ সেখানে তার দায় হচ্ছে নতুনভাবে পাঠককে দীক্ষিত করা। ঐভাবে ভাড়াটে লেখক দিয়ে বানানো লেখাকে প্রচারিত করার যে জায়গা, লিটল ম্যাগাজিন তাতে কোনওদিন ছিল না। সেই অর্থে আমি বলতে পারি, লিটল ম্যাগাজিন এবং প্রতিষ্ঠানের যে লেখালেখি — দুই সম্পূর্ণ আলাদা… প্যারালাল… এটা আলাদা জায়গা। বিরোধিতা শুধু ঐ অর্থে নয়, বিরোধিতার এক অর্থ যে পৃথক সত্তার মধ্যে দিয়েই লিটল ম্যাগ তার কাজ করে চলেছে।

আমি বলছি যে, মনে করুন, এখন তো আমরা সারা বিশ্বে বিভিন্ন ইন্ডিপেনডেন্ট ভেঞ্চার দেখতে পাই। আমাদের এখানেও কিছু কিছু দেখা যায়। সেটা চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই। এরকম আরও বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই ব্যাপারগুলো দেখতে পাওয়া যায়। তো আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আমাদের বাংলা লিটল ম্যাগাজিনের ক্ষেত্রে সেই প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার জায়গাটা কতটা রয়েছে মনে হয়? নাকি এই প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা শব্দবন্ধটা খুব ক্লিশে হয়ে যাওয়া…

আজকের দিনে এটা অনেক ক্লিশে হয়ে গেছে, কেননা আমরা একসময় দেখেছি কৃষ্ণনগরে, আটের দশকের শেষদিকে প্রতিজ্ঞা করে, ‘প্রতিষ্ঠানে লিখব না বলে’ একদল লেখক সংকল্প করেছিল, কিন্তু প্রতিজ্ঞা সেই অর্থে রাখতে পারেনি। আসলে প্রতিষ্ঠানও এমনই, প্রতিষ্ঠান দেখল যে লিটল ম্যাগাজিনের লেখক যারা…. আমরা দেখেছি শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় যখন ছিলেন… অমৃত পত্রিকায়, যা একটা বাণিজ্যিক পত্রিকা… তিনি কিন্তু লক্ষ রাখতেন কারা লিটল ম্যাগাজিনে লিখতেন, এবং তাদের দিয়ে লেখাতেন। এমনকি সন্তোষ ঘোষও খোঁজ রাখতেন কারা নতুন লিখতে এসেছে। অর্থাৎ এই সম্পাদকীয় যে দৃষ্টিকোণ, সেখান থেকে আমরা দেখলাম আজকে যারাই এই লিটল ম্যাগাজিনে নতুনভাবে লিখছে, প্রতিষ্ঠান তাদের ডেকে নিচ্ছে। সেখানে ঐ বাধাটা আর থাকছে না। আজ লিটল ম্যাগাজিনের লেখক, প্রতিষ্ঠানের লেখক বলে আলাদা কিছু নেই। যেমন — উদয়ন ঘোষ। একটা উদাহরণ হিসেবে দ্যাখাচ্ছি। উদয়ন ঘোষ, তিনি লিটিল ম্যাগাজিনের লেখক, আবার তিনি আজকাল, আনন্দবাজার বিভিন্ন পত্রিকাতেও লিখেছেন। কিন্তু একজন পাঠক হিসেবে আমি উদয়ন ঘোষকে খুঁজব যে তাঁর লেখকসত্তাটা কী? তিনি কি সেই বাণিজ্যিক পত্রিকায় বিকিয়ে দিয়েছেন তাঁর লেখা? নাকি তিনি তাঁর মতো করে লিখছেন? আর আজকের দিনে ঐভাবে প্রতিষ্ঠান ব্যাপারটা হয় না। আজকে লিটল ম্যাগাজিনের কাজটা অনেক অনেক গভীরে চলে গেছে। এবং সেই জায়গায় বাণিজ্যিক কাগজগুলো আজকে দেখো শব্দছক নিয়ে পড়ে আছে। একটা বাণিজ্যিক কাগজ যাকে দীর্ঘদিন সাহিত্যের পত্রিকা জানতাম, তারা প্রচ্ছদটা করছে রাজনীতি, কি বিশ্ব অর্থনীতি, আর সাহিত্যের জায়গাটা চলে গেছে পেছনে। আর সুদোকু বা শব্দজব্দ এগুলো চলে আসছে প্রায়োরিটিতে। পাশ্চাত্য যে হাউস জার্নালগুলো তার প্রভাবে হয়তো এমন হতে পারে…

বাজারের প্রভাবেও হতে পারে…

হ্যাঁ, বাজারের প্রভাবেও হতে পারে, কিন্তু আজ লিটল ম্যাগাজিন কিন্তু ঐ ছোঁয়ায় নিজের ধর্মকে বিকিয়ে দেয়নি। সে তার মতো কাজ করে চলেছে। লিটল ম্যাগাজিন তো অনেক বেরোচ্ছে, এটা তো একটা ব্যক্তিগত আর্জ থেকে করা হয়, এখানে কোনও সমষ্টিগতভাবে কাজ হয় না, একজন ব্যক্তি তার নিজস্ব জায়গা থেকে কাজ করে, যেমন ‘বোধশব্দ’ তার মতো কাজ করে, আবার ‘জারি বোবাযুদ্ধ’ বা ‘অঙ্গীকার’ তার মতো কাজ করে, ‘এবং মুশায়েরা’ ‘কবিতীর্থ’ তাদের মতো কাজ করে। কাজের যে বয়ানটা, সেটা সম্পাদকের ব্যক্তিগত রুচির ওপর নির্ভর করে চলছে। সেই কাজটা কী হচ্ছে না হচ্ছে তা পাঠকের কাছে বিচার্য। এখন পাঠক বাণিজ্যিক কাগজ উলটে দেখতে পারে, ফেলে দিতে পারে। সে লিটল ম্যাগাজিন উলটোতে পারে, রাখতে পারে, সিরিয়াস কাগজ হলে পাঠক হতে পারে, আবার সে বর্জনও করতে পারে। সেটা সম্পূর্ণভাবে পাঠকের গ্রহণের ওপর নির্ভর করে। এক্ষেত্রে আজকের লিটল ম্যাগাজিনে কিন্তু বৈচিত্রটা অনেক, বহুমাত্রিকতা…. বহু বিষয় এর মধ্যে ঢুকে গেছে। একসময় লিটল ম্যাগাজিন মানে বলা হত শুধুমাত্র সাহিত্য থাকবে, সাহিত্য ছাড়া আর কিছু থাকবে না, আজকে দেখো বিশ্বায়ন একটা বিষয়…

অবশ্যই..

যেমন আজকে পরিবেশ একটা বিষয়, বিজ্ঞান একটা বিষয়। একসময় আমি দেখেছি, ‘বহুরূপী’, একটা নাটকের পত্রিকা, সেখানে ধীরেন গঙ্গোপাধ্যায় লিখছেন মনস্তত্ত্ব নিয়ে। শুধুমাত্র সাহিত্যকেন্দ্রিক পত্রিকা নয়। আজকে লিটল ম্যাগাজিনের চেহারা বা চরিত্র অনেক পালটে গেছে। এখন তার মধ্যে কি আর অ-লিটল ম্যাগাজিন নেই? আছে। অনেকরকম অ-কাগজ আছে। এখন তার মধ্যে দিয়ে পাঠক খুঁজে নেবে, কোনটা কাগজ, কোনটা না-কাগজ!

দু’টো জায়গা ধরে আমি একটা প্রশ্ন করতে চাইছি, সেটা হচ্ছে যে… আপনি বললেন ঠিকই যেরকম প্রতিষ্ঠানের সংবাদপত্রের কথা বা কোনও সাহিত্যপত্রিকার কথা বললেন… একইভাবে আপনি বললেন রাষ্ট্রও প্রতিষ্ঠান হতে পারে… এরকম অনেক কিছুই প্রতিষ্ঠান হতে পারে। এবং আপনি আটের দশকের সেই শত জল ঝর্ণার ধ্বনি,  কৃষ্ণনগরের সেই আন্দোলনের কথা সেটাও বললেন। তো সেই আন্দোলনের ক্ষেত্রে বা সামগ্রিকভাবে বাংলা লিটল ম্যাগাজিনের প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার অভিমুখ যদি দেখি, সেটা আমার ধারণা, নব্বই-পঁচানব্বই শতাংশই আটকে যায় আনন্দবাজার পত্রিকা এবং দেশ-এ গিয়ে। মানে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা মানে আনন্দবাজার পত্রিকার বিরোধিতা করা বা দেশ পত্রিকার বিরোধিতা করা। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের তো আরও আদল রয়েছে। তাহলে এই প্রবণতাটা আমাদের মধ্যে তৈরি হল কেন?

আসলে প্রতিষ্ঠান কথাটি যখন বলব, তখন সবই প্রতিষ্ঠান। আমরা দেখব প্রতিষ্ঠানের কাজটা কী? একটি প্রতিষ্ঠান কতটা ব্যাপকভাবে সমাজকে ক্ষতি করছে? সে কতটা নিজে থেকে আগ বাড়িয়ে সমাজ ও সংস্কৃতির ওপর নিজের আধিপত্য বাড়াচ্ছে? সেখানে দাঁড়িয়ে বিবেচনা করতে গিয়ে এই কাগজগুলোর কথা এসে পড়ে। লিটল ম্যাগাজিনের প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার কথা বাদই দিলাম, আমি উল্টোদিকের কথা বলি। একটা সময় আনন্দবাজার দেশ শুতে বসতে সবসময় লিটল ম্যাগাজিনের মুণ্ডপাত করেছে। মশা, ল্যাংবোট ইত্যাদি নানারকম তুলনা, নানাভাবে এনে তাদের ব্যঙ্গ করেছে। নব্বইয়ের দশক, এমনকি দু’হাজার সালেও দেখেছি, বিশেষ বইমেলা সংখ্যায় আর্টিকেল ছাপানো হয়েছে যা পুরোপুরিভাবে একটা লিটল ম্যাগাজিন বিরোধী আর্টিকেল। এবং এটা যে প্রতিষ্ঠানের তরফ থেকে সম্পূর্ণ ইচ্ছাকৃত তা বোঝা যায়। কিন্তু লিটল ম্যাগাজিনের প্রতি এই রাগটা কেন?

সেটার কারণ সম্ভবত লিটল ম্যাগাজিনের সাফল্য…

অবশ্যই লিটল ম্যাগাজিনের সাফল্য, এক অর্থে। আমি সেইটাই বলতে চাইছি, লিটল ম্যাগাজিন কিন্তু নিজের জায়গা থেকে নিজের মতো করে কাজ করে গেছে। প্রতিষ্ঠান কী বলল না বলল তাতে তার কিছু এসে যায় না। অবশ্য প্রতিষ্ঠানের প্রতি কিছু লিটল ম্যাগের কি হ্যাংলামি নেই? আছে।

হ্যাঁ, সেই জায়গাটাই বলতে চাইছি, যেমন এতকিছুর পরেও আমরা দেখি যে কিছু পত্রপত্রিকা, লিটল ম্যাগাজিন রয়েছে, তাদের সম্পাদকেরা খুবই প্রতিষ্ঠানবিরোধী, তারা পারলে সর্বক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মুণ্ডপাত করেন, কিন্তু পত্রিকাটি বেরোলে তারা রিভিউ করার জন্য ঐসব প্রাতিষ্ঠানিক পত্রিকার দফতরে পত্রিকাটি পৌঁছে দিয়ে আসতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেন না, বা দরকারে লোক ধরে তদ্বির করতেও দ্বিধা করেন না, এবং সেই রিভিউ প্রকাশিত হলে সকাল সকাল নিজের ফেসবুকে টাঙিয়ে আহ্লাদিত হতেও তারা দ্বিধা করেন না, এটা কি লিটল ম্যাগাজিনের ভণ্ডামি নয়?

এটা ভণ্ডামি তো বটেই। আমাদের লাইব্রেরির অভিজ্ঞতা থেকে আমি বলতে পারি, অনেক পত্রিকা আমাদের এখানে পৌঁছে দেওয়া হয় না, কিন্তু বাংলা অ্যাকাডেমি বা আনন্দবাজারের দফতরে পত্রিকা আগেই পৌঁছে যায়। এমনকি লিটল ম্যাগ লাইব্রেরিতে আসাটাকেও তারা খুব একটা ভালো চোখে দেখেন না। লিটল ম্যাগ করে, অথচ লিটল ম্যাগ লাইব্রেরিতে আসেন না। আমরা প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার কথা বলছি, কিন্তু এটা… আমাদের লাইব্রেরি… সদর্থে একটা প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানের নানা দিক আছে। কিন্তু আমরা একে বলি না-প্রতিষ্ঠান। কিন্তু লিটল ম্যাগাজিনের এই দ্বিচারিতার জায়গাগুলো মেনে নেওয়া যায় না। লিটল ম্যাগাজিনের যদি সত্তা বলে কিছু থাকে, যদি স্বরূপ বলে কিছু থাকে, সংজ্ঞা বলে কিছু থাকে, তবে তার যে ধর্ম অর্থাৎ প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা, সেটা যদি ঠিক থাকে, তবে প্রতিষ্ঠানের প্রতি তার এই হ্যাংলামি থাকা উচিত নয়। এই ভণ্ডামি থাকা উচিত নয়। বরং সে দৃষ্টিভঙ্গি অন্য হওয়া উচিত — ঠিক উলটোটা। প্রতিষ্ঠান যদি তিরষ্কার করে, তাহলে তা তার কাছে পুরস্কার হতে পারে। পুরস্কারকে আমরা বিরাট মান্যাতা দিই, কিন্তু পুরস্কার যে একটা বড় তিরষ্কার সেটাও তো ঠিক। প্রতিষ্ঠানের কাজ হচ্ছে পুরস্কৃত করা, প্রতিষ্ঠান পুরস্কৃত করে, লিটল ম্যাগাজিনও পুরস্কৃত করে, দুটোর তফাত আছে। লিটল ম্যাগাজিন পুরস্কৃত করে তার ছেলেপুলেদের, তার লেখালেখির জগতকে। কিন্তু প্রতিষ্ঠান দেখে নেয়, আমার প্রতিষ্ঠানের কোনও বই, যেটা আমাকে বিক্রি করতে হবে, সেই বিক্রির জায়গাটা মাথায় রেখে কাউকে পুরস্কৃত করতে হবে। তাতে হল কি, লেখককে সম্মান জানানোর পাশাপাশি আসল ধান্দা থাকে বাণিজ্যিক, সেটা যেন কোনওভাবে ঝুলে না যায়।

শেষ প্রশ্ন আপনাকে যেটা করার, যে কথা আমরা বলছিলাম, একটি সংস্থা যেমন একটি প্রতিষ্ঠান, তেমনই রাষ্ট্রও তো একটি প্রতিষ্ঠান…

নিঃসন্দেহে…

…তো সেখানে রাষ্ট্র যখন মেলার আয়োজন করে, সেই প্রতিষ্ঠান কর্তৃক আয়োজিত মেলায় প্রতিষ্ঠানবিরোধী লিটল ম্যাগাজিন অংশ নিচ্ছে বা এত বছর ধরে নিয়ে এসেছে কেন, বা প্রতিষ্ঠানবিরোধী কবি-লেখকরা মঞ্চে উঠে পুরস্কার নিয়েছেন, কবিতাপাঠ করেছেন সেটাই বা কেন? তাহলে এই প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা কতটা প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা?

দেখো, আজকের দিনে ব্যাপক অর্থে ধরলে খাঁটি প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা বলে কিছু নেই। আমি যেখানে বাস করি তা সমাজ নামক প্রতিষ্ঠান, আমাকে একটা চাকরি করতে হয় সেটা একটা প্রতিষ্ঠান, আমি অসুস্থ হলে একটা হাসপাতালে যেতে হয়, সেটা একটা প্রতিষ্ঠান, তাই আমরা এইভাবে প্রতিষ্ঠানের গন্ধ শুঁকলে মুশকিল।

কিন্তু রাষ্ট্র তো প্রতিষ্ঠান বটেই, সে তো ঐ একই কাজগুলো করতে চায়… নিদেনপক্ষে অন্তত গত কুড়ি বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গের যে রাষ্ট্রব্যবস্থা বা যারা শাসকদল তারা অন্তত যে এ ধরনের কাজকর্ম করতে চেয়েছে এটা তো নিশ্চিত।

এরা টুপি-টোপর পরায়… তারা কিছু বুদ্ধিজীবীদের বাছাই করে। এটা আমি বাংলা অ্যাকাডেমিতে বলেওছিলাম যে কোনও আনন্দবাজার, কোনও প্রতিষ্ঠান, কোনও বাংলা অ্যাকাডেমি, কোনও লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদককে টুপি-টোপর পরাতে পারে না। কিন্তু মুশকিলটা হচ্ছে যদি কেউ টোপর পরায়, টুপি পরায় তাতে তুমি-আমি কিছু করতে পারব না। সেই লিটল ম্যাগাজিনের লোকটি ব্যক্তিগত ভাবনা থেকে সেটা করছে। সেখানে ঐভাবে পা-টা দেখানোর জায়গা নেই। হ্যাঁ, আমি গ্রহণ করব না — তার একটা যুক্তি রেখে সে যদি চলে আসে….

না না, গ্রহণ করব না তো দূরস্থান, গত কয়েক বছর ধরে তো লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদকদের পত্রিকা জমা দিয়ে বাড়তি দু’কপি পত্রিকা জমা দিয়ে আবেদন করতে হচ্ছে যে আমার পত্রিকাকে সেরা বলে মনোনীত করা হোক। তার মানে তারা গিয়ে চাইছে তো সেই দাক্ষিণ্যটা।

এটা তো আমরা বহুবার প্রতিবাদ করেছি, এবং লিখিতভাবে বলেছি এটা আবার কী নিয়ম হল? হতে পারে, বাংলা অ্যাকাডেমি একটা নিয়ম করল…

না না, সেটা তো প্রতিষ্ঠানের নিয়ম। আমি যদি বলি, আপনি আচরি ধর্মের মতো আমি যদি ভাবি আমরা একই প্ল্যাটফর্ম-এর লোক, আমাদের উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে রয়েছে প্রতিষ্ঠান, সেক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান একটা খারাপ নিয়ম চালু করেছে, কিন্তু যারা লিটল ম্যাগাজিন করছে, তার সম্পাদক, তারাই তো ওখানে গিয়ে দাক্ষিণ্য চাইছে।

ঠিক কথা। আমি নেব কি নেব না আমার ব্যাপার। আমি দরকার হলে এটার বিরুদ্ধে লড়ব। একটা সৌভাগ্য আমার যে, কুড়ি বছরের ইতিহাসে একমাত্র আমিই এক ব্যক্তি, যে ওটার সঙ্গে প্রথম থেকে ছিলাম, আমি আজ পর্যন্ত ঐ পুরস্কার নিইনি, এবং আমাকে দেবার চেষ্টা করা হয়েছিল, আমি প্রত্যাখ্যান করেছি। এবং ওখানে অদ্ভুত সব নিয়মগুলো তৈরি করেছে, এটার বিরোধিতা হয়। আর এই যে নিয়মগুলো, মেলা দু’জায়গায় হবে, এটা তারা নিয়ম করছে, একটা রাষ্ট্র নিয়ম করছে, এবং সেটা লিটল ম্যাগাজিনের কেউ কেউ মেনে নিচ্ছে, কেউ কেউ মেনে নিচ্ছে না, সেটা অন্য কথা। কিন্তু এই যখন একটা ফোরাম তৈরি হয়, তার উলটো কণ্ঠস্বর… আমি তাদের বলেছি যে দেখো যে একটা ফোরাম তৈরি হল, কিন্তু ফোরামের কাজ কিন্তু শুধু মেলা করা নয়, মেলার বাইরে সারাবছর তুমি কী করবে। পালটা জায়গাটা তোমাকে সর্বক্ষণ চালিয়ে যেতে হবে। তুমি শুধু আরেকটা মেলা করার জন্য একটা ফোরাম করলে, এটা নয়। এটা কিন্তু সর্বক্ষণ চালিয়ে যেতে হবে, সেটা কোথায়? মেলা শেষ, আমার কণ্ঠস্বর শেষ। আবার মেলা আসবে, তখন আমরা আরেকবার আসব। এইটা কিন্তু না। প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা মানে জাগরণ। আমাদের লাইব্রেরি ন্যাশনাল লাইব্রেরি নামক একটা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে একটা লড়াই করে এগোচ্ছে। এবং এই লড়াইটা চালিয়ে গেছি ধারাবাহিকভাবে, এই লড়াইটা লক্ষ করো, চল্লিশ বছরে আমি কিন্তু রাষ্ট্রের কাছে মাথা নিচু করিনি। অনেক কষ্ট, স্পেস নেই, জায়গা নেই, আমরা তো রাষ্ট্রের কাছে ভিক্ষা চাইতে পারি না। আমরা বঞ্চিত হতে পারি, দরিদ্র থাকতে পারি, দুঃখ থাকতে পারে, কষ্ট থাকতে পারে, কিন্তু লড়াই আছে, ধারাবাহিকতা আছে। এই লড়াই করে আমরা দেখিয়ে দিয়েছি যে প্রতিষ্ঠান বিরোধী হয়েও একটা অন্য প্রতিষ্ঠান তৈরি করা যায়, এবং আন্তর্জাতিকভাবে সেই কাজটা করতে পেরেছি।

আপনাকে অনেক ধন্যবাদ সন্দীপদা আমাদের এতটা সময় দেওয়ার জন্য। তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে ওঠুন। শিগগির আপনাকে লাইব্রেরিতে দেখতে চাই। ভালো থাকুন।

তোমরাও।

(ছবি ফেসবুক থেকে)

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 899 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Trackback / Pingback

  1. চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম। মেল ট্রেন। ত্রয়োদশতম যাত্রা। ২রা মে, ২০১৮। – ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*