বস্তারে মাইনিং — এক

অতীন্দ্রিয় চক্রবর্তী

 

শেষ উপকথার পর

 

অনেক বস্তারিয়া কৌমপ্রাকৃতের গল্প হল। রূপকথার পরতে পরতে ইতিহাসকে ধরার চেষ্টা হল। সে চেষ্টায় আবার ফিরে আসা যাবে। আসুন, চোখ রাখি বর্তমানে। বর্তমান বস্তারের ফৌজি অগ্রাসন ও তজ্জনিত বিভীষিকার খবর আপনাদের অনেকে পড়েছেন। ফৌজিদের উপর নকশালদের হামলার খবর তো আপনাদের অবধি পৌঁছে দিতে কোনও কসুর করেনি মূলধারার মিডিয়া। কিন্তু, এই সমস্ত প্রবল রক্তক্ষয়ের মূলে যে কারণ — তা নিয়ে সবাই নিশ্চুপ। বস্তার সম্ভাগে ভূতলনিহিত ভারত রাষ্ট্রের সামগ্রিক আকরিক লৌহসম্পদের এক পঞ্চমাংশ। লৌহযুগ লোহা চায় সভ্যতার জিগির তুলে। তাই, আপনার-আমার জাপানি কোম্পানির বানানো গাড়ি চড়া সুনিশ্চিত করতে ৪০০ টাকার মজুরিতে দান্তেওয়াড়া জেলার বৈলাডিলা খনির মজুরেরা এক টন করে লোহা এনে দেয় ওপেন কাস্ট খনিমুখ থেকে কনভেয়র বেল্ট অবধি (২০১৪-১৫র হিসেব)।

তাই, বস্তারকে চিনতে, বস্তারের বর্তমান পরিস্থিতি জানতে আমাদের চোখ রাখতে হবে কীভাবে মাইনিং চলছে বস্তারে। এর মাধ্যমে আমরা জানব কী উপায়ে সিকিউরিটি ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স — ফৌজ-সুরক্ষিত শিল্পায়ন — গড়ে তুলছে ভারতরাষ্ট্র বস্তারের মতো এলাকায়।

বৈলাডিলা

সবার প্রথমে আসি বৈলাডিলা মাইনসের কথায়। বস্তারের প্রসিদ্ধতম লোহার খনি। যৌথ মালিক — ন্যাশনাল মিনারেল ডেভেলপমেণ্ট কর্পোরেশন ও ভিলাই স্টিল প্ল্যান্ট। বৈলাডিলা শব্দের অর্থ সহজ — ‘বৈল’ বা মোষের ‘ডিলা’ বা কুঁজ। ‘দেশ’ ‘স্বাধীন’ হওয়ার পরে জাপানের সাথে চুক্তি করলেন নেহরু — জাপানকে বস্তার থেকে খনিজ লোহা সরবরাহ করবে ভারত, বদলে, সরবরাহ ব্যবস্থা মসৃণ করতে বিশাখাপত্তনমে বন্দর বানাতে সহায় হবে জাপান। গর্জে উঠলেন প্রিন্সলি স্টেট অফ বস্তারের শেষ ‘রাজা’ প্রবীরচন্দ্র ভঞ্জদেও। আদিবাসীদের নিয়ে প্রতিরোধ গড়লেন তিনি। তাই, অসংখ্য প্রতিবাদী আদিবাসীর সাথে সাথে তাকেও মরে যেতে হল ইন্ডিয়ান আর্মির গুলিতে। জগদলপুর প্রাসাদের ভিতরেই। ১৯৬২ সালের ঘটনা। তার আগের বছরখানেক এই ইশ্যু নিয়ে বস্তারের রাজা প্রবীরচন্দ্র ভঞ্জদেওকে নানানভাবে গৃহবন্দি ও জেলবন্দিও করা হয়েছিল। নারায়ণ সান্যালের ‘দণ্ডক শবরী’ থেকে এ-ও জানা যায় যে কীভাবে রাজাকে বাঁচাতে গিয়ে লোহাণ্ডিগুড়া থানায় গুলি খেয়ে মরে গিয়েছিল জনা সতেরো-আঠারো আদিবাসী সেই ১৯৬২ সালেই। এখনও বস্তার-মালকানগিরি সহ সমগ্র দণ্ডকারণ্যে ঘরে ঘরে পুজোর উপকরণের মধ্যে থেকে উঁকি মারে প্রবীরচন্দ্র ভঞ্জদেওর সিঁদুরচর্চিত ফোটোগ্রাফ। কোনওটা বিবর্ণ। কোনওটা বাঁধাই করা।

টাটাবাবুরা মতলব এঁটেছিলেন — বৈলাডিলায় মাইন বানাবেন তাঁরাও, আর সেই মাইনের লোহায় পুষ্ট হবে লোহাণ্ডিগুড়ায় তাঁদের কারখানা। সেই প্রকল্পে বারুদরূপী জল ঢালে মাওবাদীরা। বৈলাডিলার মাইন নির্মাণকালে ধ্বংস হয়। লোহাণ্ডিগুড়াতে কারখানার নাম করে কেড়ে জমি ছেড়ে পাততাড়ি গোটান টাটাকোম্পানি। বহুবার নকশাল দমনের নামে আদিবাসীদের দিকে পুলিশি গুলি ছুটেছে উক্ত লোহাণ্ডিগুড়ায়।

লোহাণ্ডিগুড়া ছাড়িয়ে, জগদলপুর জেলা অতিক্রম করে অধুনা বস্তার সম্ভাগের দান্তেওয়াড়া জেলার সাথে বীজাপুর জেলা যেইখানে জুড়েছে, সেইখানে, ১৯৬৫ সাল থেকে বৈলাডিলা আয়রন ওর মাইন চালু হয়েই গিয়েছে।

অধুনা দান্তেওয়াড়া জেলার বাচেলি আর কিরণ্ডৌল নামের দুটো গ্রামের মাইন-লিজের নাম করে চারটে টুকরো করে ফেলে তুলে দেওয়া হল ন্যাশনাল মিনারেল ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনকে। ২৫৫৮.৪২৪ হেক্টর জমির উপর সেই থেকে চালু হল গোটা দেশে যত আকরিক লোহা রয়েছে তার পাঁচ ভাগের এক ভাগ যে বস্তারের মাটির নীচে, বিকাশ ও প্রগতির নামে সেই বস্তারের লুণ্ঠন; সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে। বারবার এক্সটেনশন পেয়ে বৈলাডিলা খনিতে ওরা অনবরত মাটি খুঁড়িয়ে চলেছে যেইসব মানুষদের দিয়ে, তাঁদের বিভিন্ন মেশিন ও দেওয়ালের ফাঁকফোকর দিয়ে দেখা পাওয়ার অবকাশ নেই, কারণ সেই ’৬৫ সাল থেকেই এই অঞ্চলে তুলে দেওয়া দেওয়াল ও গেটসমূহ ঘিরে ভারতরাষ্ট্রের অতন্দ্র ফৌজি প্রহরা। প্রতি বছর গড়ে ২৯ মিলিয়ন টন করে আকরিক লোহা তুলে চলা হচ্ছে মোষের কুঁজের তলা থেকে। তবুও যেন প্রগতি-বীভৎসার খাঁই মেটে না। এখন চালু হয়েছে ‘ক্যাপাসিটি এনহ্যান্সমেন্ট’-এর তোড়জোড়। এই ক্যাপাসিটি এনহ্যান্সমেন্ট প্রোজেক্টের ড্রাফট এনভায়রনমেন্টাল ইম্প্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্ট থেকে মালুম, ২০২০ সালের মধ্যে নাকি ১০০ মিলিয়ন টন লোহা তোলার টার্গেট রাখা হয়েছে। মোষ-কুঁজ পাহাড়ের উপর থেকে নেমে আসা এই বিষম লৌহাপদে ধৌত নদীগুলোর অবস্থা হয়েছে সঙ্গীন। দান্তেওয়াড়া দিয়ে বয়ে চলা শঙ্খিনী ও ডঙ্কিনী নদীর জল বিষ ঢেলে চলেছে আঞ্চলিক কৌমপ্রাকৃতে। আর সেই যে মোষ-কুঁজ পাহাড়, তার কোল ঘেঁষে আরও একটা নদী বয়ে চলত। পাঁচ দশক ধরে সেইখান দিয়ে মাইন থেকে উজানস্রোতে বয়ে আনা কাঁচা লোহার আকরে আকরে সেই নদীর জল আজ ভীষণ লাল। নদীটার আসল নাম আর জানা যায় না। লোকমুখে তার নাম হয়ে গেছে লাল-নদী। তার আগে কী নাম ছিল তা সেই পাহাড়ি গ্রামগুলোর যে মানুষগুলো জানত তারা হয় নদীতে বয়ে আনা বিষের প্রকোপে ভিটেমাটি ছেড়েছে, নয় ছেড়েছে নকশাল-দমনের নামে ফৌজি উৎপীড়নে।

রাওঘাট

আগের এক কিস্তিতে, যেখানে বস্তারের দেবদেবীদের চিনছিলাম, সেইখানে চিনেছি রাজা রাওকে। ‘ভরমার রাইফেল’ (যা না থাকলে ইংরেজরা প্রথম মহাযুদ্ধে বেকায়দায় পরে যেত) হাতে, মারাঠাভূমের দিক থেকে আসা কোন যুগের যোদ্ধা হয়ে গিয়েছে দেবতা। মানুষ এইখানে সহজে দেবতা হয়। উত্তরপথে জাতীয় সড়ক ধরে কেশকাল পাহাড়ের টঙে ভাঙারাম গ্রামের থানে পৌঁছে গেলে দেখতে পাবেন, সেইখানে উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে অন্ধ্র থেকে আসা কোনও অ্যালোপ্যাথি ডাক্তার ডঃ খাঁ মহামারী সারিয়ে ভগবান হয়ে গেছেন — খান-দেও-এর থানে রাখা আছে তার ছড়ি। সেইভাবেই ভগবান হয়েছিল, আরও আগের কোনও ধূসর অতীতে, আদিবাসী যোদ্ধা রাজা রাও।

নিয়মগিরির বেদান্ত-বিরোধী আন্দোলনের কথা শুনেছি। সেইখানে কৈতুর বা কুই (কোয়া অর্থাৎ গোণ্ড আদিবাসীদের মধ্যে যারা ঐ অঞ্চলের দুর্গমতম পাহাড়ে নিবাস নিয়েছেন, ভাষাসূত্রে, তাঁরা) আদিবাসীরা যেরকম পুজো করে নিয়মগিরি পাহাড়ের নিয়মরাজাকে, রাওঘাটের সেরকম রাজা রাও, যার থান রয়েছে রাও-দেবীর মন্দিরে। ফি বছর মোচ্ছব লাগে। অগুনতি বছরকাল ধরে লেগেই চলেছে। আশেপাশের প্রায় ৩০০টা গ্রাম থেকে মানুষ ঢলে পড়ে। যাত্রা হয় ঘোর। রয়েছে ঘাট-মাড়িয়া, শীতলা, মৌলিমাতাদের থান। সমগ্র গোণ্ডওয়ানা জুড়ে রয়েছে এই জঙ্গলের দেবী মৌলির থান। রায়পুর, বিলাসপুরের মতো শহর হতে থাকা অঞ্চলগুলোতে থান ক্রমে পরিণত হয় মন্দিরে। মনে করিয়ে দেয়, পাশাপাশিই, হিন্দুত্বের প্রকোপে টোটেমরা কীভাবে পরিণত হচ্ছে গোত্রে। রাওঘাট পাহাড়ের টঙে যে গুহায় রাত্রে ঠাঁই নেয় রাজা রাও সহ সমস্ত দেবদেবীরা, সেইখানে আজ যাওয়া যায় না কারণ বি-এস-এফ ও অন্যান্য ফৌজি-বাহিনীর তত্ত্বাবধানে ভিলাই স্টিল প্ল্যান্ট রাওঘাট আয়রন ওর মাইনের নির্মাণকাজ সম্পন্ন করে চলেছে বছর তিন যাবৎ। রাওঘাটে ভিলাই স্টিল প্ল্যান্টের আয়রন ওর মাইনটা তৈরি হয়ে গেলে রাওঘাট মেলা শেষ হয়ে যাবে। রাওদেবীর থান সহ পাহাড়ের যে ঢাল ধরে মেলে বসে সেই এলাকা, সমস্তই পড়েছে রাওঘাট খাদানের লিজ-এলাকার মধ্যে।

সমস্ত পাহাড়টাই ছিনিয়ে নিয়েছে ভিলাই স্টিল প্ল্যান্ট ও সেইল মিলে, এন-এম-ডি-সি তথা বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সহায়তায়, এবং বসে গেছে পঁয়ত্রিশাধিক ফৌজি ক্যাম্প। পিচরাস্তায় মোটরগাড়ি বা নারা’ণপুর-অন্তাগড়ের মধ্যে ছুটে চলা পাবলিক বাস থেকে স্থানীয় আদিবাসীদের দেখা যায় না বিশেষ। পুরো রাস্তা জুড়ে নাগাড়ে ‘গশ্ত’ বা সার্চ অপারেশন চলছে।

শিমুল-গাঁ, মানে গোণ্ডভাষায় যা হল ‘সেমারগাঁও’। সেইখানে যুগ-যুগান্ত ধরে প্রতিষ্ঠা পেয়ে, গোণ্ড আদিবাসীদের ভক্তির আদর পেয়ে, সেই টোটেম হয়ে উঠেছে সমস্ত গোণ্ড আদিবাসীদের আদি-পিতার চিহ্ন। নামে আক্ষরিকভাবেই প্রাচীন লিঙ্গোপাসনার ইঙ্গিত — পারিকুপার লিঙ্গো পেন, যাঁকে গোণ্ড আদিবাসীরা তাঁদের টোটেম-ব্যবস্থার প্রচলনকর্তা এক ঐতিহাসিক মানবগুরু হিসেবে পুজো করে। এই ঐশ্বরিক ‘পেন’ লিঙ্গোর জীবন সম্বন্ধে নানান অলীক রূপকথার গল্পকল্পলতা ছড়িয়েছে গোণ্ড ফোকলোরে। তাঁর জীবনকাহিনীর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত মনে করা হয় সেমারগাঁও গ্রামকে। উত্তর বস্তারের অন্তাগড় উপজেলার আমাবেরা অঞ্চলে সেই শান্ত গ্রাম আজও দাঁড়িয়ে আছে।

আজও সেমারগাঁয়ে ধুমধাম করে পুজো হয় এই থানের — রাখা হয় পূতপবিত্র আঙ্গা-পেন, মানে গোণ্ড দেবদেবী ‘পেন’-‘ইয়ায়া’-দের নিয়ে যাওয়ার জন্য ছোট্ট কাঠের পালকির মতো। কোনও গাছের চারটে ডাল বা কাণ্ড নিয়ে, দুটো দুটো করে একে অপরের উপরের রেখে বেঁধেছেঁধে বানানো হয় গোণ্ড আদিবাসীদের পুজোর উপকরণ। চার বছর পর পর মেলা লাগলে সমস্ত বস্তারের, অন্ধ্র, তেলেঙ্গানা, মহারাষ্ট্র, ওড়িশা, মধ্যপ্রদেশ থেকে দল বেঁধে অজস্র আদিবাসী মানুষ, পাহাড় রাঙিয়ে ওঠে, গানে, নাচে, রঙিন পোষাকে, বেতের চুপড়ি, বেতের বাঁশিতে, পাঁপড়ভাজা আর মহুয়ার ম ম মৌতাতে।

আজ শিমুলগাঁয়ের এই মেলা ক্রমে নিষ্প্রভ হয়ে আসছে এত এত ফৌজি মোতায়নের ফলে। ক্যাম্প থেকে ভারতরাষ্ট্র নিযুক্ত বন্দুকধারীরা এসে ঘেরবন্দি রাখে মেলাপ্রাঙ্গণ। মেলার ভিতর দিয়ে টহল দিতে দিতে চলে যায় ওরা। যেখানে এই গ্রাম, তার আশপাশ জুড়ে কিছু চলতি ও হবু বক্সাইট মাইন, আবার সেই জায়গাটাই আজ হুররা-পিঞ্জোরীর বি-এস-এফ-এর ক্যাম্প-আচ্ছন্ন ভয়জড় গ্রামাঞ্চল — বাকি বস্তারের মতোই, আশেপাশের অসংখ্য গ্রামে আজ ফৌজিরা ঢুকে ধর্ষণ-খুন-লুঠতরাজ-অগ্নিসংযোগ করে এসেছে, আসছে, সলওয়া জুড়ুমের সময়কাল থেকেই।

সেই রাওঘাট সংলগ্ন বেশ কিছু গ্রাম — পাল্লাকসা, অঞ্জরেল গ্রাম ফাঁকা হয়ে গেছে ফৌজি তাণ্ডবে ২০১২-১৩ সাল থেকেই। খাঁ খাঁ করছে সেই দুই পরিত্যক্ত ‘ভিরান-গাঁও’। অজস্র খুনের ধর্ষণের রক্তকথা সন্তর্পণে, ফিসফিসিয়ে ছড়ায় বনের পাতায় পাতায়। এই দেশে পুলিশ-মিলিটারিরা প্রায় সমস্ত অন্যায়ের ছাড় পেয়ে যান। জওয়ানদের বিরুদ্ধে আদিবাসীরা অভিযোগ করবেন কার কাছে? রাজ্যপুলিশের থানায় না কেন্দ্রপুলিশের ক্যাম্পে? তাই, ঐ গল্পেরা আদিবাসী পরিবারে, গ্রামে, গ্রামছাড়াদের ঢলে লতায় পাতায় জুড়ে যেতে থাকে।

বস্তার সম্ভাগের কাঁকের আর নারায়ণপুর জেলা। সেইখানেই বহুযুগ ঠায় দাঁড়িয়ে এই রাওঘাট পাহাড়। ছত্তিশগড়, মহারাষ্ট্র, ওড়িশা আর মধ্যপ্রদেশ জুড়ে গোণ্ড আদিবাসীদের কাছে এই পাহাড় পবিত্র। আর এই রাওঘাটের পাথরের তলে তলে থাক থাক লৌহাকর। গন্ধে গন্ধে এসে গেছে মুনাফাকামীরা, উন্নয়নের জিগির তুলে।

ভিলাই স্টিল প্ল্যান্ট ভারত সরকারের প্রিয়তম প্ল্যান্ট। নবরত্নের এক। অথচ ১৯৫১ সালে তৈরি এই কারখানার কলকব্জা পুরনো হয়ে আসছে। আউটপুট কমে আসছে। অতএব, আউটপুট বৃদ্ধি করতে হলে, চাই বিপুল পরিমাণে ইনপুট। লোহার কারখানার মূল খনিজ ইনপুট আকরিক লোহা। তাই দান্তেওয়াড়ার বৈলাডিলা খনির ‘ক্যাপ্যাসিটি এনহ্যান্সমেন্ট’-এর পাশাপাশি, এই রাওঘাট থেকে প্রবল উদ্যমে লোহার আকর তোলার তোড়জোড় আরম্ভ। রাওঘাট খনির মালিক স্টিল অথরিটি অব ইন্ডিয়া লিমিটেড (সেইল), এবং নকশাল-জুজুর ভয়ে কাজ চলেছে ফৌজি-প্রহরায়। শিল্পায়নের ঐতিহাসিক ধারা অনুসারে, মাইনের পাশাপাশি গ্রাম উড়িয়ে পাহাড় গুঁড়িয়ে বনাঞ্চল সাফ করে গড়ে উঠছে রেলপথ।

সমস্ত অঞ্চলটাই আদিবাসী অধ্যুষিত। ২০১১-র আদমসুমারী থেকে মাইনিঙের ফলে প্রকটতম-প্রভাবিত গ্রামগুলির আদিবাসী জনসংখ্যা মোটমাট ৯৫%।

এই গ্রামগুলি ছাড়াও, সমগ্র কাঁকের ও নারায়ণপুর জেলা জুড়ে কমবেশি ৩০০ খানা গ্রাম এই রাওঘাট মাইন ও তদসংলগ্ন রেলপথের কবলে পড়ে অস্তিত্ব-সংকটে পড়েছে।  এদের মধ্যে রয়েছে মাড়িয়া, মুড়িয়া, অবুজমাড়িয়া, নুরুটি সহ অজস্র গোণ্ড উপসম্প্রদায় (টোটেমিক সেপ্ট)। এঁরা সকলেই অরণ্যনির্ভর। মধ্যপ্রদেশ গেজেটিয়ার, বস্তার ডিস্ট্রিক্ট, ২০০০ জানাচ্ছে — “The whole tribal economy almost solely depends on agriculture and forest… the tribals could be said to form the bulk of agriculturists population and the numerically important of them consisted of Muria, Gond, Maria, Bhattra, Halba, Dhurwa and Dorla…”

আঞ্চলিক আদিবাসীদের মধ্যে অবুজমাড়িয়ারা, নৃতত্বের ভাষায় যাকে বলে ‘প্রি-এগ্রেরিয়ান’। এরা সম্পূর্ণ অরণ্যনির্ভর, শিফটিং ও জুম-চাষ করে পাহাড়ের ঢাল জুড়ে, নানান ফলমূল, টিউবার ও ভাতের উপর নির্ভর করে অবুজমাড়িয়াদের পুষ্টি-সুরক্ষা। জঙ্গল সরে গেলে, এদের আর বাঁচার কোনও পথ পড়ে থাকবে না।

মাইন হলে, পৃথিবী শুকিয়ে যাবে, শাল-তমাল-মহুয়ার মতো মহীরুহ-বনস্পতিদের সাথে সাথে, তাদের ছায়ায় লালিত এই সব শস্যগুলো, ফলমুলশাকপাতাগুলো, বনৌষধি — ফুরিয়ে যাবে। এমনিতেই, উন্নয়নের আক্রমণে বিপুল অরণ্যনাশের ফলে সমগ্র বস্তারে ফি বছর আগের বছরের চেয়ে কম বৃষ্টি পড়ে, বেশি গরম পড়ে, কম শীত পড়ে।

১৮৯৯ সালে লোহার অস্তিত্ব জানা যায় রাওঘাট পাহাড়ের নীচে। নজর তবে থেকেই ছিল। খাতায় কলমে ৮৮৩.২২ হেক্টর জঙ্গল গিলে নেওয়া এই রাওঘাট মাইন কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রক এবং ছত্তিশগড় সরকারের ছাড়পত্র পায় ২০০৯ সালে। তার আগে ঐ ডিপোজিট-এর প্রায় হাজার দুই হেক্টর বনাঞ্চলের উপর চোখ ছিল বি-এস-পি-র। এই ২০০০++ হেক্টর বা ৮৮৩ হেক্টর বনভূমি শুধু রাওঘাট পাহাড়ের ডিপোজিট ‘এফ’-এর মধ্যেই পরে। এছাড়া আরও ডিপোজিট অঞ্চল রয়েছে। হবু মাইন হবু ছাড়পত্রের আশায় দিন গুজরান করে ব্যক্তিসম্পদ ও পুঁজির মালিকের দল। রাওঘাট ডিপোজিট এফ-এর ছাড়পত্র নেওয়ার আগে, স্বভাবসিদ্ধ বেআইনি প্রথায়, আঞ্চলিক আদিবাসীদের এ বিষয়ে মতামত জানতে চাওয়ার কোনও চেষ্টা করেনি সরকারপক্ষের কেউ।

কাঙ্কের থেকে ভানুপ্রতাপপুর হয়ে, অবুজমাড় পাহাড়ের কোল ঘেঁষে রাস্তা চলে গিয়েছে রাওঘাটের দিকে। এই রাওঘাট গিরিবর্ত্ম ধরেই মারাঠা আক্রমণ হয়েছিল বস্তারে একদা। এখন, রাস্তার দুইদিকে চাইলে দেখা যায়, অজস্র বনস্পতির মৃতদেহ — কোনওটার কাণ্ড তাকিয়ে রয়েছে ঠাঠা রোদ্দুরে, কোনওটার গুঁড়ির দিকে তাকালে বোঝা যায় একদা এইখানে একটা বিশাল গাছ ছিল। পাশে পাশে বড় বড় জে-সি-বি ও অন্যান্য মেশিন। সব মিলিয়ে, রেলপথ বসানোর আয়োজন চলছে, ফৌজি তত্ত্বাবধানে।

মাইনের কবলে পড়বে বস্তার সম্ভাগের কাঁকের জেলার অন্তাগড় তহসিল এবং নারায়ণপুর জেলার নারায়ণপুর তহসিল। এর মধ্যে থেকে কুড়িটা গ্রাম ২০১৪ সালের অক্টোবর-নভেম্বর জুড়ে এফ আর এ আইন অনুসারে সামুহিক বন-অধিকার পাট্টার আবেদন জানিয়েছিল। আবেদনগুলি তহসিল আপিসে পড়ে আছে ১৭ মাস ধরে। বারবার সাক্ষাতে ও ডাকযোগে কেন্দ্রীয় বন ও পরিবেশমন্ত্রক, আদিবাসী মন্ত্রক সহ কেন্দ্রীয়, রাজ্যস্তরীয়, জেলাস্তরীয় ও ব্লকস্তরীয় বিভিন্ন সরকারি দরজায় কড়া নেড়েছে গ্রামবাসীরা। এ বিষয়ে কোনও প্রশাসনিক নড়নচড়ন দেখা যায়নি অদ্যাবধি। এই কুড়িটা গ্রামের নাম হল — ছোটে জৈনপুরী, তহসিল-ডাংরা, টোটীন-ডাংরা, কুমহারী, ভ্যাইসগাঁও, পোটেবেরা, কুরসের, গোণ্ডবিনাপাল, আনুরবেড়া, ফুলপাড়, বড়ে জৈনপুরী, তারলকাট্টা, চিপৌণ্ডি, চিংনার, সিরসাঙ্গী, জৈতনবাগাঁও। রাওঘাটের খনি এদেরকে গিলে নেওয়ার আয়োজন করেছে মহাসমারোহে।

সেই আয়োজনের অংশ হিসেবেই, ২০১৫-র নভেম্বর মাস থেকে অঞ্চলের গ্রাম পঞ্চায়েতের উপর কাঙ্কেরের কালেক্টর ও অন্তাগড়ের এস-ডি-এম আপিস থেকে  চাপ বাড়তে থাকে পুরনো পাট্টা-প্রক্রিয়া চলা সত্ত্বেও নতুন করে ফাঁকা পাট্টা ফর্মে সই ও ছাপ্পা লাগিয়ে পঞ্চায়েত-গ্রামসভার রেজিস্টারে সই মেরে লিখে দিতে যে পাট্টা-প্রদান প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হয়েছে। কারণ আইন বলে, এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ না হলে বনাঞ্চলের জমিকে বিকাশের হাঁড়িকাঠে চাপানো যাবে না। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে এস-ডি-এম বিভিন্ন গ্রামের মুখিয়া-সরপঞ্চ-সচিবদের ডেকে জানায়, ১৪ থেকে ২৪শে এপ্রিল গ্রামসভা হবে, তখন যেন গ্রামসভার রেজিস্টারে দেখানো হয় যে পাট্টা-প্রদান প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হয়েছে। ততদিন তাদের মাইনে দেওয়া হবে না। অথচ ২০১৪-র সেই পাট্টার আবেদনগুলো ১৮ মাস হয়ে গেল, এস-ডি-এম অফিসেই ধুলো খাচ্ছে। এদিকে ৮ই এপ্রিল জগদলপুরে একটি গুরুত্বপূর্ণ মিটিং হয়। মিটিঙের সভাপতিত্ব করেন বস্তার সম্ভাগের কমিশনার দিলীপ বাসনেকর, কাঁকের জিলার কালেক্টর শাম্মী আবিদী, উক্ত জেলার পুলিশ কমিশনার জিতেন্দ্র সিং মীনা, উক্ত জেলার সংযুক্ত কলেক্টরদ্বয় এস-পি মাঁঝী ও অরবিন্দ শর্মা, ভানুপ্রতাপপুরের এস-ডি-এম ইন্দ্রজিৎ সিংহ, ভিলাই স্টিল প্ল্যান্টের জেনারেল ম্যানেজার এ কে মিশ্র, সাউথ-ইস্ট-সেন্ট্রাল রেলওয়ের তরফে আই-এ খান, মহেশ কুমার আগরওয়াল, জিতেন্দ্র প্রসাদ, রাওঘাট মাইনের তরফ থেকে সি দয়ানন্দ প্রমূখ। সভাপতি শ্রী বসনেকর বলেন যে সম্পূর্ণ বস্তার সম্ভাগের উন্নয়নের খাতিরে যত শীঘ্র সম্ভব, মাইন ও রেলপথের কাজ শেষ করতে। এছাড়াও বলা হয়েছে যে অন্তাগড় টাউনে শিক্ষার বিস্তারের জন্য দয়ানন্দ আদর্শ বিদ্যামন্দির স্থাপন করা হবে। প্রসঙ্গত, কাঁকের টাউনে উক্ত আর্যসামাজিকেরা আঞ্চলিক অনার্যদের উত্থানের অভিপ্রায়ে বেশ কিছু দশক ধরেই ইস্কুল খুলে রেখেছে। এভাবেই, মাইনিং সুনিশ্চিৎ করতে খরকাগাঁও, তালবেড়া, সুলেঙ্গা, কর্লাপাল সহ বিভিন্ন গ্রামের সচিব-সরপঞ্চদের ভয়, প্রলোভন, মাইনে আটকে দেওয়া প্রভৃতি উপায়ে হাত করার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। নকশাল কেসের জুজু তো বস্তারে এমনিতেই সহজেই দেখানো যায়। ভুয়ো ‘নো-অবজেকশান-সার্টিফিকেট’, পাট্টা ইত্যাদিতে সই করতে বাধ্য হয়েছেন তারা। ছলে বলে কৌশলে সমস্ত আইনি প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে উঠে এইভাবেই অনলনিশ্বাসী রথে উন্নয়ন আসছে বস্তারে।

একটা বিষয় পরিষ্কার। ফৌজি-কৃত ভায়োলেন্স এবং মাইনিং-এর মধ্যে একটা আলবাৎ-কোরিলেশান রয়েছে। যে সব জায়গায় মাইনিং আরম্ভ হয়, সেই সব অঞ্চলে তার আগ-আগ দিয়ে বনবাদাড় সাফ করে গড়ে ওঠে আধাসামরিক ক্যাম্প। ক্যাম্প বলতে মূলত কাঁকের ও নারায়ণপুর জেলায় বর্ডার সিক্যুরিটি ফোর্স এবং সশস্ত্র সীমা বল এবং বস্তার, দান্তেওয়াড়া, সুকমা, বীজাপুর জুড়ে সি-আর-পি-এফ, মূলত তাদের ‘এলিট’ শার্প-শ্যুটার কোবরা ব্যাটেলিয়ন। বস্তার সম্ভাগ দেশের কোনও বর্ডারের ধারেকাছে নয়, তাই বি-এস-এফ বা সশস্ত্র সীমা বল এখানে কী করছে তা সহজেই মালুম।

২০১৬ সালে সি-পি-আই পার্টির তথ্যানুসন্ধান দলের রিপোর্টে প্রতিভ, সমগ্র বস্তারে গড় ৫ কিলোমিটার দূরে দূরে ফৌজি ক্যাম্প, এবং কাঁকের ও নারায়ণপুর জুড়ে সেই যে রাওঘাট পাহাড়, যেখানে অজস্র গ্রাম হটিয়ে, স্থানীয় মানুষদের প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও গড়ে উঠছে ভিলাই স্টিল প্ল্যান্টের লোহার খনি ও তদসংলগ্ন মালগাড়ি-র রেলপথ, সেইখানে ২ কিলোমিটার দূর দূর বি-এস-এফ অথবা এস-এস-বি-র ক্যাম্প। সমগ্র রাওঘাট জুড়ে তাই অসংখ্য ক্যাম্প, এবং সেই সব ক্যাম্পের আশেপাশের এক থেকে দেড় কিলোমিটার জঙ্গল সাফ করা। এর প্রভাবে, আঞ্চলিক গ্রামগুলো থেকে ভেসে আসছে একের পর এক ফৌজিকৃত যৌনহিংসার খতিয়ান। এ’বিষয়ে কথা বলতেও ভয় পাচ্ছেন এই সব গ্রামের মানুষেরা। জানাজানি হলে, অত্যাচার হবে প্রবল।

 

এরপর আগামী সপ্তাহে

About Char Number Platform 840 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*