দাবিদারদের অন্দরমহলে

অরিন্দম মুখার্জী

 

হাতে আর একদম সময় নেই, বিশ্বকাপ একদম দরজায় এসে কড়া নেড়ে দিয়েছে। আর মাত্র ছদিন পরে স্ট্যালিনের দেশে শুরু হয়ে যাবে গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ। পৃথিবীর সেরা বত্রিশটি দেশ নিজেদেরকে উজাড় করে দেবে ঐ সোনালী আভায় নিজেদের রাঙিয়ে তোলার জন্য। আবেগের বিস্ফোরণ হবে, ছুটবে শক্তির বিজয়রথ, আবার কোনও কোনওদিন ঘটবে রূপকথা, সবুজ গালিচার বুকে লেখা হবে কবিতাও। তবে, আজ আমরা সমস্ত দেশ নিয়ে আলোচনা করব না। আজ আমরা বেছে নেব সেই সমস্ত দেশগুলিকে যারা ২০১৮ বিশ্বকাপ জেতার সবথেকে থেকে বেশি দাবিদার, আর ঢুকব তাদের অন্দরমহলে, জেনে নেব তাদের শক্তির রসদ, খুঁজে দেখব তাদের দুর্বলতার জায়গা…

১৯৩০ সাল থেকে চলে আসা পৃথিবীর এই শ্রেষ্ঠ অনুষ্ঠানে আজ পর্যন্ত বিজয়ী হওয়ার স্বাদ পেয়েছে মাত্র আটটি দেশ। তারা যথাক্রমে উরুগুয়ে, ইটালি, ব্রাজিল, জার্মানি, স্পেন, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স আর আর্জেন্টিনা। সুতরাং বলাই যায় এরা এই বিশ্বকাপেরও দাবিদার হওয়ার জন্য এগিয়ে থাকবে। তবে সবাই নয়, কারণ চারবারের বিজয়ী ইটালি এবার যোগ্যতা অর্জন করতে ব্যর্থ। উরুগুয়ের সেই টিম নেই যারা শেষ অবধি লড়াই চালাতে পারে। তবে এদের মধ্যেও উঠে এসেছে কিছু নতুন শক্তি যারা বেগ দিতে পারে এই সমস্ত বিজয়ী দলকে। তবে আসুন ঢোকা যাক এক এক করে দাবিদারদের অন্দরমহলে…

(১) জার্মানি:

আগের বারের চ্যাম্পিয়ন দলটা এবার অনেকটাই ভেঙে গেছে। ফিলিপ লাম, গতবারের অধিনায়ক, খেলা থেকে অবসর নিয়েছেন। চোটের জন্য ছিটকে গেছেন মেসুট ওজিলও। গোলকিপার এবং এবারের অধিনায়ক ম্যানুয়াল ন্যুয়ার এখনও সেরে ওঠেননি ভালোভাবে। এসব ছাড়াও ইউরোতে হার বিশ্বজয়ীদের কাছে একটা ধাক্কা ছিল যা তারা কিছুটা কাটিয়ে উঠেছে কনফেডারেশন কাপের মুকুট ঘরে তুলে। তারপর যোগ্যতা অর্জন পর্বে ১০টির মধ্যে ১০টি ম্যাচেই জয় তাদের মনোবল আরও কিছুটা বাড়িয়েছে। তাদের গোল করার জন্য মূল কারিগর হলেন থমাস মুলার। এর মধ্যে দশটি গোল করে ফেলেছেন বিশ্বকাপে তিনি। আর ছটি গোল করলেই টপকে যাবেন স্বদেশি মিরোস্লাভ ক্লোজেকে। এরপর স্ট্রাইকিং-এ তাদের ভরসা টিমো ওয়ার্নার। বাচ্চা ছেলেটি কনফেডারেশন কাপে অসাধারণ খেলে নজরে পড়ে গেছে জার্মান কোচ জোয়াকিম লোয়ের। এছাড়া ন্যুয়ারের অনুপস্থিতিতে গোলরক্ষার দায়িত্ব সামলানোর জন্য রয়েছেন বার্সিলোনার প্রাণভোমরা স্টার স্টেগেন। মাঝমাঠের দায়িত্বে থাকবেন স্বপ্নের ফর্মে থাকা টনি ক্রুস। তিনি সহায়ক হিসাবে পাশে পাবেন মার্কো রয়েস, সামি খাদেইরাকে। তবে জার্মান টিমের ডিফেন্সে সমস্যা রয়েছে। ম্যাটস হুমেলস বাদে আর কেউ ভালো ফর্মে নেই। বোয়েতাংকে অনেক খুচরো ভুল করতে দেখা গেছে ইদানিংকালে। তবে বিশ্বকাপজয়ী কোচ জোয়াকিম লো-র উপর ভরসা আছে জার্মান ম্যানেজমেন্টের। তারা জানেন তাদের স্বপ্ন সত্যির কারিগর সবটা ঠিকভাবেই সামলে নেবেন…

(২) ব্রাজিল:

সম্ভবত বিশ্বকাপের সবথেকে ব্যালেন্সড দল এবার সেলেকাওরা। নতুন ম্যানেজার তিতে এসে অসাধারণভাবে সাজিয়েছেন ব্রাজিল দলটাকে। দক্ষিণ আমেরিকান যোগ্যতা পর্বের খেলায় প্রতিটা টিমকেই প্রায় উড়িয়েই দিয়েছে ব্রাজিল। আগের বারের মতো এবারেও তাদের দলের মূল ভরসা নেইমার। গ্যাব্রিয়েল জেসাসও তিতের হাতে পড়ে অসাধারণ হয়ে উঠেছেন। তবে আমার মতে খেলার নিয়ন্ত্রণের ভার অনেকটাই নির্ভর করবে কুটিনহোর পারফরমেন্সের উপর। মার্সেলো স্বপ্নের ফর্মে রয়েছেন, থিয়াগো সিলভার অভিজ্ঞতা ডিফেন্সে নির্ভরতা দেবে আশা করাই যায়। তবে ড্যানি আলভেজের না থাকাটা অল্প হলেও ভাবাবে তিতেকে। তবে তিনি সামলে নেবেন বলেই আমার বিশ্বাস। গতবারের লজ্জার ৭-১ হারের পরে এসে দায়িত্ব নিয়ে যেভাবে তিনি টিমটাকে মোটিভেট করে তাদের খেলার রূপ পালটে দিয়েছেন তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে। ফুটবলে কোচ শব্দটার মাহাত্ম্য আবার বুঝিয়ে দিয়েছেন তিনি চোখে আঙুল দিয়ে…

(৩) ফ্রান্স:

আমার কাছে এবারের বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম যোগ্য দাবিদার হল ফ্রান্স। ১৯৯৮-এর বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক দিদিয়ের দেশঁর কোচিংয়ে যে দলটি এবার বিশ্বকাপে নামতে চলেছে তাতে রয়েছে প্রতিভার ছড়াছড়ি। এমনি অবস্থা হয়েছিল যে, বিশ্বকাপের তেইশ জনের দল ঘোষণা করতেই হিমশিম খাচ্ছিলেন ফরাসি কোচ। প্রচুর চাপে পড়েও তাকে বাদ দিতে হয়েছে লাকাজেট, র‍্যাবিও, লাপোর্তের মতো খেলোয়াড়দের, যা তার পক্ষে খবু সোজা ছিল না। তবে  যারা দলে সুযোগ পেয়েছেন তারা না থাকলে অবশ্য আরও বেশি সমালোচনা হত। অ্যাটাকে গ্রিজম্যান পাশে এম্বাপে আর জিরোউড। মাঝমাঠে পোগবার সাথে থাকবেন মাতুইদি, কান্তে। আর গোলে রয়েছেন অভিজ্ঞ গোলকিপার হুগো লরিস। সব মিলিয়ে বলতে গেলে বিশ্বকাপের সেরা দল ফ্রান্স। সমস্যা একটাই — দলটা খুবই তরুণ এবং অভিজ্ঞতার অভাব রয়েছে দলে…

(৪) স্পেন:

এই তিন দলের পরে ফেভারিট হিসাবে আমার পছন্দ স্পেন।  যোগ্যতা অর্জন পর্বে অসাধারণ ফুটবল উপহার দিয়েছে লা রোজা-রা। দশটির মধ্যে নটি ম্যাচে জিতেছে তারা। ড্র করেছে একটিতে। গত বিশ্বকাপের বিশ্রীভাবে হারের বদলা নিশ্চয় এবার নিতে চাইবে স্প্যানিশরা। তাছাড়া এটি হতে চলেছে আন্দ্রেজ ইনিয়েস্তার শেষ বিশ্বকাপ, তিনি নিজেকে উজাড় করে দেবেনই সেকথা বলার অপেক্ষা রাখে না। এছাড়া র‍্যামোস, পিকে, আলবারা সবাই এমন মনোভাব নিয়েই মাঠে নামবেন একথা আশা করাই যায়। তাছাড়া দলে আছেন তরুণ ইস্কো,  মার্কো অ্যাসেনসিও-র মতো ফুটবলাররা যারা এই বিশ্বকাপের রঙ বদলে দিতে পারেন। তবে সমস্যা একটাই, স্প্যানিশ এই দলের গড় বয়স অনেকটা বেশি। যা তাদের সমস্যায় ফেলতে পারে…

ডার্ক হর্স: বেলজিয়াম

প্রতিবারের মতো এবারেও বেলজিয়াম অসাধারণ টিম। প্রত্যেকটি পজিশনে রয়েছে বিশ্বমানের খেলোয়াড়রা। গোলে কুর্তোয়া আছেন। কোম্পানির নেতৃত্বে ডিফেন্সও অত্যন্ত জমাট। মাঝমাঠ তো যেন সোনায় বাঁধানো এই দলের। ডি ব্রুইন, হ্যাজার্ড, ডেম্বেলে, মারটেন্স — এই মাঝমাঠ যে কোনও দলের ডিফেন্সের ঘুম কেড়ে নিতে পারে। স্ট্রাইকারে খেলবেন ম্যান ইউয়ের লুকাকু। আপাত দৃষ্টিতে বেলজিয়ামের কোনও দুর্বলতা চোখে না পড়লেও এই দলের তারকারাই এই দলের দুর্বলতা। কেউই খুব ধারাবাহিক নয়, দল হিসাবে খেলতে সমস্যা হতে পারে তাদের। তবে ছন্দে এসে গেলে এই দল অনেক চ্যাম্পিয়নদের নাস্তানাবুদ করে দেবে একথা হলফ করে বলা যায়। তবে বোঝাপড়ায় ব্যাঘাত ঘটলে এই দল আবার গ্রুপ স্টেজ থেকেই বিদায় নিতে পারে…

আমার মতে এই পাঁচ দলই সব থেকে বড় দাবিদার এবারের বিশ্বকাপ জেতার। তবে এবার আসি এমন একটি দলের কথায় যারা ধারে ভারে এই দলগুলোর থেকে অনেকটা পিছিয়ে থেকেও বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন দেখছে। বিশ্বকাপ থেকে বেরিয়ে যেতে থাকা একটা দেশকে একা হাতে মূল পর্বে তুলে স্বপ্ন দেখাচ্ছেন সেই পাঁচ ফুট সাত ইঞ্চির মানুষটাই, যাকে তুলে নিলে এই দল হয়ে যায় অতিরিক্ত নিম্নমানের। তার থাকা অবস্থায় তারা যোগ্যতা অর্জন পর্বে ৭টির মধ্যে ৬টিতে অপরাজেয় থাকে আর তার অনুপস্থিতিতে ৭টির মধ্যে ৬টিতেই পরাজয় বরণ করে। তবুও মানুষ স্বপ্ন দেখে ঐ লোকটাকে ঘিরে, যার বাঁ পা ফুটবলকে উজাড় করে দিয়েছে আজীবন, তাকে ফুটবল তার জীবনের শ্রেষ্ঠ মুহূর্ত উপহারে ফিরিয়ে দেয় কি না সেটাই দেখার।

 

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*