শৈশবের সাতরঙা যাদুবাস্তব ‘রেনবো জেলি’ : রিভিউ নয়, কিছু অনুভূতি

http://www.sme-ae.it/?bioske=forex-trading-game&c45=5b শতাব্দী দাশ

 

মিষ্টি পপিন্স ঘোঁতনকে একটা ড্রয়িং খাতা দিয়েছিল জন্মদিনে। তার প্রথম পাতায় ছিল রাংতার মুকুট পরা এক ছেলের ছবি, যেমনটা আমাদের অপু পরত। নিচে লেখা ছিল দুই ছত্রে–

‘হ্যাপি বার্থডে

লিটল প্রিন্স।’

‘এমা তুমি লিটল প্রিন্স জানো না?’ — স্কুল-ড্রপ-আউট, ‘স্পেশাল’ শিশু ঘোঁতনকে ইংরিজি-মিডিয়াম-রাজকন্যা পপিন্স অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, পরে।

আমরা ‘দ্য লিটল প্রিন্স’ জানি হয়ত। সে বই-এর শুরুতে কিছু স্কেচ ছিল। কথক আমাদের একটি ছবি দেখিয়ে জিজ্ঞেস করেন, এটি কী হতে পারে? ধরা যাক কোনও শিশুর আঁকা একটি ছবি। কিন্তু কী সেটি? বড়দের মনে হবে, বড়জোর একটি টুপি। কিন্তু শিশুটি কি তাই আঁকতে চেয়েছিল? উঁহু! সে আঁকতে চেয়েছিল একটি হাতিকে, যাকে একটি সাপ গিলে খাচ্ছে। বা সাপটিকে, যে হাতি গিলছে। এরপর যখন দৈব দুর্বিপাকে সেই কথকের বিমান আছড়ে পড়ল মরুভূমিতে, তখন তিনি দেখা পেলেন ‘লিটল প্রিন্স’-এর ; সেও তাকে ছবি আঁকতে বলেছিল! একটি ভেড়ার ছবি। অপারগ কথক ভেড়ার বদলে একটি বাক্স এঁকেছিলেন। ছেলেটিকে ভুলিয়েছিলেন এই বলে যে, ভেড়া আছে ওই বাক্সের ভিতর। লিটল প্রিন্স কী বলেছিল মনে আছে? বলেছিল, ঠিক এরকমটাই তো সে কল্পনা করেছিল! এমন আঁকাই সে চেয়েছিল।

অর্থাৎ শিশুর কল্পনার এক নিজস্ব পরিসর আছে। শিশুর মতো করে ভাবতে বড়রা ভুলে যায়। উইলিয়াম ব্লেকের ‘সংস অফ ইনোসেন্স’ একসময় ‘সংস অফ এক্সপিরিয়েন্স’-এ আছড়ে পড়ে। কোনও ফিরতি পথ আছে কি? না বোধহয়। ছোটদের মতো করে দেখা, ভাবা, কল্পনা করা, ছোটদের চোখ ও মন ফিরে পাওয়া বড়বেলায় বড় সহজ কথা নয়। অথচ ঘোঁতনের চোখ দিয়ে জগত দর্শনই যেন ছিল ‘রেনবো জেলি’-র নবীন পরিচালক সৌকর্য ঘোষালের পাখির চোখ। বেশ ভারি চ্যালেঞ্জ! বেশ কয়েকবছর আগে ঈশান অওয়াস্তি নামের একটি ছেলে তেমন চোখ নিয়ে নর্দমায় ছোট মাছ ও পোকাদের আনাগোনা দেখছিল ‘তারে জমিন পর’ ছবির প্রথম দৃশ্যে। সময় গড়ালে দেখা গেল, তা আসলে বড়দের জ্ঞানগম্ভীর গল্প, লার্নিং ডিসঅর্ডারের এবিসিডি, প্রচুর প্রিচিং এবং জগৎত্রাতা আমির খান ছবির সিংহভাগ দখল করলেন। ঈশান অওয়াস্তি নামক ডিসলেক্সিক বাচ্চাটির চোখ কিছু দৃশ্য, বড়জোর প্রথমার্ধর পর হারিয়ে গেল। ‘রেনবো জেলি’-র ক্ষেত্রে সৌকর্য কতটা পারলেন তা ধরে রাখতে?

এইখানে বলে রাখি, দ্বিতীয় ও তৃতীয় সপ্তাহে দুটি মাত্র হলে একটি করে মাত্র শো পাচ্ছে ছবিটি, হাউজফুল হওয়া সত্ত্বেও। ‘দ্য লিটল প্রিন্স’ গল্পে গ্রহে গ্রহান্তরে ঘুরে বেড়ানো রাজকুমার প্রতি গ্রহে একজন করে বিরক্তিকর প্রাপ্তবয়স্কর দেখা পেত। পঞ্চম গ্রহে বোধহয় সে এক বণিকের দেখা পেয়েছিল — যে সৌন্দর্য দেখতে শেখেনি, শুধু তা বেচতে শিখেছে। বাচ্চাদের নিয়ে আরও দুটি চলচ্চিত্র এই মুহূর্তে চলছে বাংলা বাজারে। একটি বেচছে অসময়ের দুর্গাপুজোর গ্র‍্যাঞ্জার, অন্যটি বেচছে চাইল্ড সেক্সুয়াল অ্যাবিউজ নিয়ে বিভ্রান্তিমূলক কিন্তু জনমোহিনী ধারণা। কারণ বেচাবেচির ফর্মূলা প্রাপ্তবয়স্ক বণিকরা জানেন, ছোট রাজকুমাররা নয়।

অথচ বেচার উপাদান ছিল। প্রথমত, ছবিটি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের প্রান্তিকতা বেচতে পারত। কিন্তু বেচল না। ঘোঁতনের ‘বিশেষ’ হওয়াটা কখনওই সেভাবে মুখ্য হয়ে ওঠেনি গল্পে। ‘বিশেষ’ কথাটি বরং অন্য অভিঘাত নিয়ে আসে। ঘোঁতন ‘বিশেষ’ কারণ সে পপিন্সের ‘লিটল প্রিন্স’, সে ‘বিশেষ’ কারণ সে হাজার ওয়াটের হাসি হাসে, সে ‘বিশেষ’ কারণ তার মনে ইচ্ছে ডানা মেললেই শোঁ করে আকাশ দিয়ে প্লেন উড়ে যায়, যা নাকি ‘তারাখসা’-র নব্য জাদুকরি ভার্শন। আগেকার দিনে যেমন মানুষের ইচ্ছেপূরণ হলে তারা খসে পড়ত, তেমনই এখন প্লেনের ব্যবস্থা। ইচ্ছেটা বলা মাত্র প্লেন উড়ে গেলে বুঝতে হবে, তা পূরণ হবেই হবে! কে বলেছে এ’কথা? পরী পিসি। কে পরী পিসি? ও হ্যাঁ, বলা হয়নি। ঘোঁতন ‘বিশেষ’ কারণ তার দুঃখ ঘোচাতে আকাশ থেকে গোলগাল পিসিমাসুলভ পরী নেমে এসেছিল।

আবার, শেষপর্যন্ত ঘোঁতনের সেভিয়ার ঠিক বাস্তবের নিক্তিতে ‘ত্রাতা’ নয়। সে সু-রাঁধুনে পিসিমাসুলভ জাদুকরিনী মাত্র, ঈষৎ রগচটা, ঈষৎ কনফিউজড, ঘোঁতনের মামার ভয়ে সে চৌকির তলায় লুকিয়ে পড়ে। অর্থাৎ সেই অর্থে ঘোঁতনের কোনও সুপারহিউম্যান বা নিদেনপক্ষে অ্যাক্টিভিস্ট সেভিয়ার নেই। অর্থাৎ, ছবিটি অ্যাক্টিভিজমও বেচে না।

সৌকর্যর আগের টেলিফিল্ম ‘লোডশেডিং’ এমন এক সময়ের নস্ট্যালজিক মিষ্টি প্রেমের গল্প, যখন পাড়ায় পাড়ায় ঝুপ করে লোডশেডিং হত। ‘রেনবো জেলি’-তেও পাড়া ক্রিকেট, পলেস্তারা খসা বাড়ি, চায়ের দোকান, ছাদে মেলা শাড়ি ইত্যাদি দিয়ে ফ্রেম সাজানো বলে চলচ্চিত্রটি নস্ট্যালজিয়াও বেচতে পারত। তাও বেচেনি। সুররিয়াল দুনিয়ার পাশাপাশি ক্যামেরা নির্মমভাবে ধরে মামার এক ঠেলায় ঘোঁতনের টেবিলে ঠোক্কর খাওয়ার পর তার চোখের কোণার আঘাত, রক্ত। তার লালা, তার ওয়াক তোলা বমি। মামা আর তার শাগরেদের রাম খাওয়া ঘোলাটে সন্ধে, তাদের ঘুপচি ঘরে মাৎসর্য চর্চা — এইসব ছবিটিতে জায়গা পায়। কমলা বেলুন হাতে জন্মদিনে ঘোঁতন যখন রাস্তা পেরোচ্ছে, তখন উটকো মস্তান তার স্বপ্নের পপিন্সকে ললিপপ দিয়ে ‘কিসি’ চায়, যা আসলে পপিন্সের পরিচারিকার প্রতি অশালীন ইঙ্গিত — তাও ঘোঁতনের চোখ দিয়ে আমরা দেখি। ঘোঁতন যখন পপিন্সের বাড়ি যায় অসুস্থ রাজকন্যার খোঁজ নিতে, তখন সিঁড়িতে সেই পরিচারিকা ও সেই উটকো মস্তানকে আশ্লেষে, আলিঙ্গনাবদ্ধ, চুম্বনরত অবস্থায় দেখে সে মিনিটের ভগ্নাংশে। যেভাবে শিশুরা যৌনতাকে দেখে — ‘হিংসা’ হিসেবে, ভায়োলেন্স হিসেবে — বারো বছরের ঘোঁতন সেভাবেই সে দৃশ্য দেখে। এত রকম প্রতিকূল এসে বারবার তার স্বপ্ন দিয়ে সাজানো নিচের তলার ঘরের দরজায় ধাক্কা মারে। ছবিটি যদি বিশুদ্ধভাবেই নস্ট্যালজিক হত, বড়দের নিজের ছোটবেলাকে লেখা মিষ্টি চিঠি হত, তবে এত ভায়োলেন্স থাকত না, পাড়াশিশুর ঈর্ষাকাতর চোখ থাকত না, ক্লস্ট্রোফোবিক সরু খাড়া সিঁড়ি থাকত না, গ্যাসে পোড়া সসপ্যান থাকত না, রক্ত, ক্লেদ, স্বেদ থাকত না।

অর্থাৎ ব্যাক টু স্কোয়্যায় ওয়ান। ছবিটির লক্ষ্য ছিল শিশুর চোখ দিয়ে চারপাশ দেখা এবং চারপাশ ছাপিয়েও দেখা। তা নিয়ে গল্প বলা। ম্যাজিক বোনা। হ্যান্ডমেড পেপারে আঁকাবাঁকা অক্ষরে যখন টাইটেল কার্ড আসছিল, তখন উৎসর্গে লেখা ছিল, ‘লীলা মজুমদার, তোমাকে দিলাম’। মুড সেট হয়ে যায়নি কি তখনই? ঠিক লীলা মজুমদারের রঙচঙে অথচ কান্না-কান্না, সেন্সরি বা ইন্দ্রিয়ানুগ অনুভূতিময় অথচ মায়া-মায়া এক জগত থেকে উঠে আসা গল্প। লীলা মজুমদারের ফ্যান্টাসিগুলো বা শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের অদ্ভুতুড়ে সিরিজ নিয়ে ছবি বানাতে হলে এই পরিচালকেরই বানানো সাজে। তাই বা কেন? এরকম স্বকীয় গল্প যখন নিজেই নামিয়ে ফেলেছেন! সৎভাবে একটি সহজ গল্প বলেছেন পরিচালক। পরীপিসি ঘোঁতনকে মন্ত্র শিখিয়েছিল — ’সূর্যের সাতরং, সাতরং, সাতরং!’ অথচ সাতরং মিলেমিশে যা হয়, তা সাদা আলোর মতো সহজ অনাবিল। ছবিটিও তাই। রোবট, পাসওয়ার্ড, গুপ্তধন, রহস্য — এমন নানা রং মিশিয়ে চমৎকার সহজ সাদা আলো।

গল্পের খানিক খানিক বলা হয়ে গেছে ইতোমধ্যে। সংক্ষেপে, ঘোঁতন এক বারো বছরের ‘বিশেষ’ শিশু, যে অনাথও বটে। তার প্রাসাদোপম কিন্তু ভাঙাচোরা পৈতৃক ভিটেটি দখল করেছেন গণ্ডারিয়া মামা, যে মৃত্যুসজ্জায় ঘোঁতনের বিজ্ঞানী বাবাকে কথা দিয়েছিল, ঘোঁতনের দেখভাল করবে এবং তার আঠারো বছর পূর্ণ হলে স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি তথা রহস্যময় কোনও ‘যখের ধন’ তার হাতে তুলে দেবে। কিন্তু গণ্ডারিয়া মামা, যার আসল নাম আমরা জানি না, যে ভাগ্নে-প্রদত্ত নাম বহন করে, কারণ ঘোঁতনের মতে তার গণ্ডারের মতো মোটা চামড়া, কথার খেলাপ ক’রে ঘোঁতনকে উদয়াস্ত খাটিয়ে মারে। ‘নর্মাল’ স্কুলে ফেইল করার পর সে ঘোঁতনকে ‘স্পেশাল’ স্কুলে পাঠায়নি। প্রথমে সকালের চা, অতঃপর বাজারহাট, অতঃপর দুপুরের রান্না, রাতের খাবারের জোগাড় গণ্ডারিয়া করায় ঘোঁতনকে দিয়ে। গণ্ডারিয়া খাদ্যরসিক। পুচকে ঘোঁতন তাকে জিভের আরাম দিতে পারে না, বলাই বাহুল্য। সুতরাং, আরও চড়, থাপ্পড়, লাথি। আছে মামার শাগরেদ সেই উটকো মস্তান আর তার অকারণ চড়চাপটাও, আছে এক বাইকধারী মডার্ন কাবুলিওয়ালা। সে টাকা পায় আসলে গণ্ডারিয়া মামার কাছে। মামা লুকিয়ে আছে দোতলার ঘরে, অথচ কাবুলিওয়ালা জানে সে ফেরার। বারবার সে মামার খোঁজে আসে, চড়াও হয় ঘোঁতনের উপর। তবে গণ্ডারিয়াকে তুষ্ট করতে এই যে ঘোঁতন গাধাদৌড় দিচ্ছে দিনরাত, তার কারণ তার সামনে ঝোলানো আছে ‘যখের ধনের’ মুলো, যা আঠারো বছর হলেই সে পাবে বলে তার আশা। পুরোদস্তুর দুখী রাজপুত্তুর ঘোঁতনকুমার তার এঁদো দিনরাত ধরে বসে বসে মির‍্যাকলের প্রতীক্ষা করে।

ঘোঁতনের নিজস্ব বলতে আছে নিচের একটা ঘর; সে ঘরে আছে ছোট ছোট নুড়িপাথর সাজানো বেসিনের উপর আলো, গোল্ড ফিশ, পুরনো এক দোলদোলদুলুনি হ্যামক, আঁকার খাতা, রঙ পেন্সিল, বই-এর তাক, একটা খাট, খাটের পাশের টেবিলে বাবামার সাদা কালো ছবি। ঘোঁতন অবসরে মৃত মায়ের সাথে গল্প করে। ঘোঁতনের আর আছে একটা আস্ত ছাদ, যে ছাদের উপর দিয়ে ঘন ঘন প্লেনেদের চলাচল, যা দেখতে গিয়ে ঘোঁতন চা পুড়িয়ে কয়লা করে, মামার মার খায়, আবার দেখে। সেই ছাদেই বসে ঘোঁতন কাঁপা হাতে ছবি আঁকে, রঙ ঘষে খাতায়। সেই ছাদের পাশের ছাদেই খানিক বেশি উচ্চতায় মাঝে মাঝে এসে দাঁড়ায় আরেক রূপকথা, মিষ্টি মেয়ে পপিন্স, ঘোঁতনের ছোট্টবেলার প্রেম। ব্যস্ত কর্পোরেট বাবামার একলা মেয়েও ঘোঁতনাদার বন্ধু হতে চায়। জানালার গ্রিলে নাক ঠেকিয়ে ঘোঁতন রোজ পপিন্সের স্কুলে যাওয়া দেখে। ঘোঁতনের আরও আছে অনাদি দা, পাড়ার চায়ের দোকানের মালিক, রাতের খাবারটা যে জুটিয়ে দেয় দয়াপরবশ হয়ে। পাড়ার ছেলেরা প্যাক মারলে যে ঘোঁতনের দিকে সস্নেহে তাকায়, কাবুলিওয়ালার হাত থেকে যে ঘোঁতনকে প্রায়শই বাঁচায়, জন্মদিনের আগের রাতে জলভরা পলিথিনে গোল্ডফিশ দেয় ঘোঁতনকে, আর একটা রঙের বাক্স।

জন্মদিনে রঙিন গ্যাসবেলুন আর পপিন্সের দেওয়া ‘লিটল প্রিন্স’ লেখা ড্রয়িং খাতা নিয়ে বাড়ি ফিরে ঘোঁতন আবার বেধড়ক মার খায়। কান্না, বমি, পচা তরকারি পেরিয়ে সে আকাশের উদ্দেশ্যে গ্যাসবেলুনে বেঁধে উড়িয়ে দেয় মাকে লেখা চিঠি। তারপর ঘুমিয়ে পড়ে।

অমনি দরজায় হুড়মুড় ধাক্কা ও সশব্দে প্রবেশ পরীপিসির। ইনি স্বঘোষিত ফেয়ারি গডমাদার, এঁর আজব পরিধেয় আর মজাদার অঙ্গভঙ্গি, রাশভারি মেজাজ। ইনি এসেছেন সাতদিনে সাতরকম স্বাদের তথা রামধনুর সাত রঙের রান্না করে মামার মন ভোলাতে, যাতে ‘যখের ধনের হদিশ’ মামা শিগগির দিয়ে দেয় ঘোঁতনকে। অতএব জাদু ও বাস্তব মিলেমিশে একাকার।

ঘোঁতন যখন ক্লস্ট্রোফোবিক সিঁড়ি দিয়ে একেক রঙের খাবার নিয়ে যায়, তখন সোঁদা সিঁড়িতে আলো ছড়ায় আর পর্দাতেও। মামার মন ভোজবাজির মতো বদলাতে থাকে। ছবিটিকে তাহলে কি আমরা ফুড ফ্যান্টাসি বলব? কিছুটা হয়ত। পরিচালক জানিয়েছেন একটা সময়ে খাবারের পরিবর্তনের সাথে মানুষের মনের পরিবর্তন নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে দেখেছেন, আয়ুর্বেদে খাদ্যের স্বাদের সঙ্গে মনের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করা আছে। আয়ুর্বেদে একটা বিখ্যাত কথা নাকি: ‘Don’t make your medicine as your food. Let your food be your medicine.’ খাবারই শরীর এবং মনের পথ্য হয়ে উঠতে পারে। মিষ্টি, টক, তেতো, নোনতা ইত্যাদি স্বাদের সাথে মানুষের মনের এক একটি অনুভূতির যোগ রয়েছে — সঠিক খাদ্যের প্রয়োগে চরিত্র পরিবর্তন পর্যন্ত নাকি করা যায়। ছবির শেষে আমরা জানব, ঘোঁতনের বিজ্ঞানী বাবার গবেষণার বিষয়ও ছিল ঠিক এটাই — স্বাদের সাথে মনের অনুভূতির সম্পর্ক। আবার সাতটি স্বাদের মতোই রয়েছে রামধনুর সাত রং। একেকটি রং একেকটি স্বাদের প্রতিভূ। সাত হিন্দু দর্শনে বিশেষ সংখ্যা। সাতটি চক্র রয়েছে শরীরে। সাতদিনের সমন্বয়ে সপ্তাহকাল। সাতদিনে সাত স্বাদের পদের শেষে, সাত রঙের আর স্বাদের মিশেলে পরীপিসি তৈরি করেছিল রেনবো জেলি। কিন্তু কীভাবে ঘোঁতন পেল ‘যখের ধন’-এর হদিশ? সেই রহস্য তোলা থাক।

ছবিটিতে গল্প যেমন আছে, তেমনই আছে সুচারু চরিত্রনির্মাণ। অস্কার ওয়াইল্ডের গল্পের স্বার্থপর দৈত্যের মতোই গণ্ডারিয়া মামা শেষমেশ পালটে গেছিল হয়ত। তারপরেই অনুশোচনাজর্জর মামা মরে গেল। এমনকি সেই উটকো মস্তান, যে পপিন্সের পরিচারিকার প্রেমিক, মামার অপরাধের ও মদ্যপানের সঙ্গী, সেও কেঁদে ফেলে মৃতদেহকে জড়িয়ে। শেষপর্যন্ত সুহৃদ অনাদিদাই তো ঘোঁতনকে নিয়ে যেতে পারত তার বিজ্ঞানী বাবার বলে দেওয়া উকিলের বাড়ি! কিন্তু না, সে অজানা ভবিষ্যতের সন্ধানে চলে আপাত স্বার্থান্বেষী কাবুলিওয়ালার বাইকে চেপে। ঘৃণা উদ্রেক করার মতো ভিলেইন, সুতরাং, আমরা পাই না গল্পে। ঘোঁতনের শুভাকাঙ্ক্ষী অনাদিদা, যে ভাঙা ট্রান্সিস্টারে পুরনো হিন্দি গান শোনে আর রাতে দুপাত্তর খায় ঝাঁপ ফেলে, সে দূর থেকে টা টা করে তাদের। যাওয়ার আগে রাজপুত্র পপিন্সকে তার কাগজের মুকুটখানি পরিয়ে দিয়ে যায়।

ছবিটি মুহূর্ত তৈরি করে সুচারুভাবে। ঘোঁতনের বমি করতে করতে সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসার মুহূর্ত, আকাশের ঠিকানায় চিঠি উড়িয়ে দেওয়ার মুহূর্ত, ছাদে চকখড়ি দিয়ে মাকে আঁকার মুহূর্ত আশ্চর্য প্যাথোস তৈরি করে, যার সঙ্গত করে নবারুণ বসুর গান ‘কষ্ট তুমি’ বা ‘তুমি তো আছই’ বা মৌসুমী ভৌমিকের গলায় ‘এই ছেলে তুই’। অন্যদিকে ‘পরীপিসি’ গানটি খুশিয়াল। সাহানা বাজপেয়ীর ‘রূপকথা’ যেন এ ছবির দর্শন ও উপলব্ধি।

ক্যামেরার কাজ যথাযথ, টপ শটে শহরের মাঝে ছাদে এক একাকী শিশুকে ধরে ক্যামেরা, যে রাপুনজেল বা স্নোহোয়াইটের মতোই বন্দি। সিঁড়ির বমি-দৃশ্যে ক্যামেরা ঝাঁকুনি খায়। প্রাণ ভরে কখনও রং ধরে ক্যামেরা, কখনও ম্লান হলদেটে মরা আলোকে।

গল্প মৌলিক, অথচ চিত্রনাট্যে কোনও ওপরচালাকি নেই। তা ঋজু, সাদা আলোর মতো পরিষ্কার। সিনেমা সেমিনার হয়ে ওঠে না। পরিচালক নিজেই আবার অ্যানিমেশন করেছেন ছবির জন্য যা ঘোঁতনের কল্পনার বাহন হয়ে ওঠে।

মহাব্রত নামক শিশুশিল্পীকে নাকি স্পেশাল স্কুলে পেয়েছিলেন পরিচালক, যদিও এখন সে সাধারণ স্কুলেই পড়ে। মহাব্রত যা করেছে, তা এক কথায় অসামান্য। পপিন্সের প্রসঙ্গ ওঠায় ‘ওরকম কিছু না’ বলার সলজ্জ অভিব্যক্তি, ওর হাসি, ওর কান্না, ওর মার খাওয়ার যন্ত্রণা, ওর বমি করার কষ্ট কীরকম ওয়ার্কশপ সম্ভব করল তা ভাবলে আশ্চর্য হতে হয়। কৌশিক সেন খল মামার চরিত্রে সংলাপ, অভিব্যক্তি ও অ্যান্টিক্স মিলিয়ে দাপুটে। পরীপিসি শ্রীলেখা মিত্র রূপকথার চরিত্রের উপযোগীভাবে চড়া, পপিন্স অনুমেঘা মিষ্টি, শান্তিলাল সংবেদী অভিনয় করেছেন অনাদিদা হিসেবে। এমনকি সেই কাবুলিওয়ালা, সেই উটকো মস্তান যে মামার শাগরেদ — এরা সকলেই চোখে পড়েন, পাড়া-ক্রিকেটের বাচ্চারাও।

ঘোঁতনের শহুরে রূপকথা অনিশ্চয়তার মধ্যে শেষ হয়। যেভাবে শেষ হয় ছোটগল্প। বা যেভাবে লিটল প্রিন্সের গল্প শেষ হয়েছিল… আমরা জানি না সে মারা গেছিল নাকি ফিরে গেছিল নিজস্ব গ্রহে, তাই ভেবে নিতে পারি যেমন খুশি। ঘোঁতনও হয়ত যখের ধন পায়, তার বাবার অসমাপ্ত গবেষণা শেষ করে, বা হারিয়ে যায় — ভেবে নিতে পারি যা খুশি। নিশ্চয়তা না থাকাটাই স্বাভাবিক, কারণ অস্তিত্ববাদ শেখার বহু আগেই লীলা মজুমদারের ঝগড়ু বলে দিয়েছিল, ‘খুঁজে পেলেই মজা মাটি।’ সত্যি কোথায় শেষ হয়, স্বপ্ন কোথায় শুরু হয় — এসব লাতিন সাহিত্যের ক্লাসে প্রথম শিখেছি আমরা, তা তো নয়। শিখেছি লীলা মজুমদার বা অবন ঠাকুরের ক্লাসে। সৌকর্যের ছবি সে জগতেরই।

বিদেশি সুপারহিরোদের ছবি বাদে আর কিছু দেখানোর পান কি শিশুকে? সুতরাং দেখে আসুন, দেখিয়ে আনুন।

 

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*