ধর্ম – শেষ পর্ব

তথাগত দাশমজুমদার

 

(গত সংখ্যার পর থেকে)

(গত সংখ্যার লিংক  http://4numberplatform.com/?p=334)

 

ধর্ম নিয়ে সিরিজটা লেখার জন্য মানুষের বিবর্তনের সাথে সাথে রিচ্যুয়াল ও সংস্কৃতির উদ্ভব এবং তার বিবর্তনের ইতিহাস নিয়েও পড়াশোনা করতে হচ্ছে। সেটা করতে করতেই একটা আশ্চর্যজনক খবর জানলাম, মানুষের জ্ঞাতিদের মধ্যে নাকি রিচ্যুয়ালের হলেও হতে পারে প্রমাণ পাওয়া গেছে। জ্ঞাতি মানে শিম্পাঞ্জীদের কথা বলছি। তা এই জ্ঞাতিরা যে অস্ত্র ব্যবহার করেন, তার প্রমাণ গুডল মেমসাহেব ষাটের দশকেই দেন। যদিও সেই অস্ত্র ও আমাদের পূর্বপুরুষের অস্ত্রব্যবহারে কিছু পার্থক্য আছে। শিম্পাঞ্জীরা মূলত পাথর বা গাছের ডালকে যেভাবে পাওয়া যায় সেভাবেই ব্যবহার করে, কিন্তু মানুষের পূর্বপুরুষের অস্ত্রের বৈশিষ্ট্য হল প্রাকৃতিকভাবে প্রাপ্ত বস্তুকে (পাথর বা গাছের ডাল) পরিবর্তিত করে বা ভেঙে প্রয়োজন অনুযায়ী গড়ে নেওয়া।

যাই হোক সেটা আসল ব্যাপার না। যে রিচ্যুয়াল বা সংস্কৃতিকে মানুষের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে ধরা হয়ে থাকে, যে রিচ্যুয়াল নাকি মানুষকে অন্য প্রাণীদের থেকে পৃথক করে, সেই পার্থক্যটাই যে আর থাকবে বলে মনে হচ্ছে না। পশ্চিম আফ্রিকাতে আমাদের জ্ঞাতিদের দেখা যাচ্ছে গাছে পাথর ছুঁড়ে মারতে। এবং বারংবার এই কাণ্ডের ফলে গাছের নীচে জমা হচ্ছে পাথর। এমনকি গাছের ফোকরের মধ্যেও জমা হচ্ছে পাথর। এই পর্যন্ত পড়ে কেউ কেউ হয়ত ভাবছেন, বাঁদুরে বুদ্ধি, এ নিয়ে এত হইচইয়ের কী হল? হল, হল, যদি বলি যে মানুষের পূর্বপুরুষের ফসিল যেখানে পাওয়া গেছে, সেখানেও এরকম পাথরের স্তুপের সন্ধান মিলেছে। এই স্তুপ কিন্তু অস্ত্র নয়, সাধারণ পাথরের স্তুপ। মানুষের পূর্বপুরুষের জীবাশ্মের কাছেই পাওয়া এই স্তুপগুলোর সাথে শিম্পাঞ্জীদের গাছে পাথর ছুঁড়ে গাছের নীচে জমে ওঠা পাথরের স্তুপের সাদৃশ্য প্রায় চমকে দেওয়ার মতোই। আরও কয়েকটা জিনিসের সাথেও কিন্তু এর সাদৃশ্য আছে, বুড়োবটতলার সিঁদুর মাখানো পাথরগুলো বা পাথরের স্তুপের মাধ্যমে এলাকার সীমানা নির্ধারণের কথা ভেবে দেখুন, মিল পাচ্ছেন?

যাই হোক, এ ব্যাপারে দুটো ব্যাখ্যার কথা ভাবা যায় :-

এক) পুরুষ শিম্পাঞ্জীদের মেল অ্যাগ্রেশনের নমুনা হতে পারে এটা, গাছের গায়ে পাথর ছুঁড়ে মেরে শব্দসৃষ্টি করে নিজের ক্ষমতার পরিচয় দেওয়া। কিন্তু এই ব্যাখ্যাটায় একটা অসুবিধা আছে। পুরুষ শিম্পাঞ্জীদের পাশাপাশি স্ত্রী শিম্পাঞ্জী, এমনকি বাচ্চাদেরকেও এই কাজ করতে দেখা গেছে, তাই ক্ষমতার আস্ফালনের তত্ত্বটা তেমন দাঁড়াচ্ছে না।

দুই) এটা এলাকার সীমানা নির্ধারণ করা থেকে উদ্ভূত কোন রিচ্যুয়াল মাত্র। যা কিনা মানুষের পূর্বপুরুষদের মধ্যেও দেখা গেছিল (হোমো নালেদিদের মৃতদেহ সৎকারও আদি রিচ্যুয়ালের একটা প্রমাণ)। যে রিচ্যুয়াল থেকে ধর্ম ও স্পিরিচুয়ালিটির উদ্ভব। এটা নিয়ে গবেষণা চলছে। যদি আরও অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে ধর্মের উৎস নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।

জেন গুডল শিম্পাঞ্জীদের নিয়ে কাজ করার সময় দেখেছিলেন যে তারা বড় ঝরণা, বৃষ্টিপাত ও বজ্রপাতের সময় একটি বিশেষ নৃত্য করে যা বিস্ময়প্রকাশের ক্ষমতার দিকে ইঙ্গিত করে। আর শিম্পাঞ্জীদের আচরণ থেকে যেহেতু মানুষের পূর্বপুরুষদের আচরণকে মডেল করা হয়, তাই তাদেরও সেটা ছিল বলে অনুমাণ করা যায়, যার থেকে আদিম প্রকৃতিপূজা বা অ্যানিমিস্ট ধর্মের উদ্ভব, যেখানে অজানা আগুন, সূর্য, জল, গাছপালা সবই পূজনীয় কারণ তাদের ব্যাখ্যা জানা নেই। এই সংখ্যায় ব্যস্ততার কারণে এর বেশি লেখা গেল না, পরের সংখ্যায় একটা আশ্চর্য বিষয়ের কথা বলব।

 

(এর পর আগামী সংখ্যায়)

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*