না পাওয়াই থাক

অনির্বাণ ভট্টাচার্য

 

নব্বই। সন্ধিক্ষণ বুঝতাম না। জানতাম, ঘর বলতে একটা উঠোন, তার ঈশান কোণে একটা বেল গাছ, অশীতিপর বৃদ্ধা, শুকনো ডালের বড়ি আর ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট টিভি। বিশ্বকাপ। ভাবলেই কালো চাদর ঢেকে দেয় সবকিছু। কেন ঢাকবে না? খেলা তো রাতের দিকে হত? রাত। টিভি। ওই কালো বিশ্বকাপ, নিশুতি বিশ্বকাপ আমায় পায়চারি শেখাত। কমল মিত্র শেখাত। আমাদের তো কোনও টেনশন ছিল না। টাকাপয়সার চিন্তা নেই। অন্তঃকলহ কানে এলেও বিশ্বাস করতাম না। বাড়িতে ভাঙা ছাদের টুকরো, দেয়ালে ক্র্যাক তখনও জন্মায়নি। আমি জন্মেছিলাম। এমন একটা সময় যখন বুঝতে পারিনি হ্যান্ড অফ গড কী? বুঝতে পারিনি পিটার শিল্টনকে কাটানোর আগে লোকটার মনের ভেতর কী চলছে। আমি তখন তিন। আমি তখন ছোট্ট ছোট্ট পায়ে…।

রাশিয়া ২০১৮ আমার সেইসব বড় হয়ে ওঠার কোল্যাটেরাল ড্যামেজ। সেই দিনগুলো না থাকলে এসব হত না। প্রায় কিছুই নেই এমন একটা দলের সেরা গোলরক্ষক চোট পেয়ে বেরিয়ে যেত না। ঈশ্বরের ওপর আশাহীন আশ্বাসকে নিয়ে তৈরি হওয়া একটা টিমের সবচেয়ে প্রমিসিং মিডফিল্ডার দুদিন আগেই চোট পেয়ে চলে যেত না। এ সমস্তই ড্যামেজ। কোল্যাটেরাল। আমার ভাঙা যৌথতার দেয়াল, জানলা, কড়ি, বরগা। কেমন দাঁড়াবে কাভানি-সুয়ারেজ? উরুগুয়ে…। নেহেরু কাপ। বিরাশি কি? সে সমস্ত ফ্রিকিক। দাদু নামগুলো বলত। আমি তখনও বিশ্বকাপ দেখিনি। নেহেরু কাপ দেখেছিলাম। নিজের চোখে না। কথায়, গল্পে। ফ্রান্সিসকোলি। আমার গল্পকথার নায়ক। পরে ইউটিউবে যাকে গড়েপিঠে নিয়েছিলাম। বার্সার সুয়ারেজ। এডিনসন কাভানি। আর তারও আগে প্রায় একার কাঁধে সোনার বল বাঁধা ফরলান। হালকা নীল। ১৯৫০। কুইজে জেনেছিলাম তারও আগে ১৯৩০। হেক্টর কাস্ত্রো। আমার কাছের উরুগুয়ে, কাছের লাতিন আমেরিকা। জার্মানি। ৪-০। তখন এইটবি থেকে বাসে বন্ধুর বাড়িয়ে যাচ্ছি। ফোনে সহযাত্রীর কথা। শক। চার গোলে পিছিয়ে। আমার যে দুজন ঈশ্বরের কাপ ধরে কান্না ভাগ করে নেওয়ার কথা ছিল। হল না। চার বছর। ঘুমের মধ্যে চলে যাওয়া। স্বপ্নের চৌকাঠ। গোতজে। সেই জার্মানি। ম্যাথিউজ। লোথার ম্যাথিউজ। আমরা যারা বেকেনবাওয়ার দেখিনি, অথচ চোখ বন্ধ করে সেরা এগারোয় রাখতাম বাবা কাকারা রাখত বলে, তাদের বেকেনবাওয়ার। আমার বাবার, ব্রাজিলের জন্য রাত জাগা বাবার জার্মান হিরো। তারপর ক্লিন্সম্যান। সোনালী চুল। ক্রোয়েশিয়ার ধাক্কা। তবু, জার্মানরা হারতে জানে না। ফিলিপ লাম থাকুক না থাকুক। মুলার আছে না? আর ছটা গোল। শুধু মাথা না, পা, স্পিড, জ্বলজ্বলে চোখ, এই সেদিনের বাচ্চা ছেলে টমাস মুলার। পারবে না? সবাই সব পারুক। আমার সেসমস্ত মেমরেব্লিয়া দিয়ে সবার সবার সমস্ত না-পারাগুলোকে মিটিয়ে নিক এবারে। ব্রাজিল। ছবির পর ছবি। আটানব্বই। ফাইনালের আগের দিন মেন্টাল শক। সেইজার না কি যেন। বমি। ০-৩। বাবার চোখে অবিশ্বাস। তারও আগে সেই নব্বই। কারেকা। মুলার। সেই কারেকা। নাপোলির কারেকা। পারল না। চুরানব্বই। কোনওদিন অফিস থেকে একবেলার জন্য ছুটি না নেওয়া আমার বাবা কী যেন একটা অসুখে প্রায় একমাস ঘরে। তখন যৌথ ঘর। ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট টিভি। মাঠের মধ্যে ডোরা কাটা দাগ। গান। বেবেতোর গোল সেলিব্রেশন। জামা খুলে সাইকোটিক সেলিব্রেশন না। বুকের কাছে হাত দুলিয়ে মায়াবী এক ভঙ্গি। বাৎসল্য। রোমারিও। যোদ্ধা। মুখটা কেমন একটা। ঘরের ছেলে মনে হত। টাইব্রেকারে পেলের ছুটে যাওয়া। আমাদের বাড়িরও। পাড়ারও। আমি বুঝতে পারি না মারাদোনা ছাড়া অন্য কারও খুশিতে এত ছোটার কী আছে? হাসির কী আছে? স্বপ্নের কী আছে? সেই ব্রাজিল। দিব্যেন্দু পালিতের ছোটগল্পের মতো ডক্টর সক্রেটিসের স্বপ্নভঙ্গের ব্রাজিল। জিকোর যন্ত্রণার ব্রাজিল। রোনাল্ডো, গাউচোদের সব পেয়েছির ব্রাজিল। স্মৃতির ব্রাজিল। চার বছর আগের বীভৎস এক যন্ত্রণার ব্রাজিল। ট্যাকল না, প্রায় হত্যার মুহূর্ত থেকে ফিরে আসা নায়কের একার হাতে ম্যাচ ঘুরিয়ে দেওয়ার স্বপ্নে বিভোর ব্রাজিল। সঙ্গে কুটিনহো। মারসেলো, থিয়েগো। ওঠা, নামা। ছক না, বড় নাম না। জাস্ট প্রাণ দিয়ে খেলার ব্রাজিল। টিটে, পারবেন না? ফ্রান্স। আমার যৌথতার ঘাঁটি। চন্দননগর। ফরাসী ক্যাম্প। আমার যাবতীয় স্মৃতির ক্যাম্প। সেই ছিয়াশি। আমি যখন তিন। প্লাতিনি, তিগানা। শুনেছি, দেখিনি। পরে ইউটিউবে…। তবে ক্ষোভ মিটিয়ে দিল জিজু। না, আটানব্বইয়ের ওই ফাইনালে না। সেবছর তো ওরতেগা ছিল। বাতিগোল ছিল। প্যারাগুয়ের চিলেভারট ছিল। এক্সট্রা টাইমে খুব করে চাইছিলাম গোল না হোক। চিলেভারটের সেভ দেখব। হল না। জিদান। ভালবসার জিদানকে চিনলাম রিয়েলে। ক্লাব ফুটবল। সেই শুরু। তখন বার্সা বুঝিনি। বুঝেছি একটা দলে এতগুলো বড় নাম খেলে কী করে? ২০০২। সেনেগাল। ক্রোনিয়ের প্লেন। শক। সেখান থেকে বেরিয়ে এসে আবার। হাজি দিওফ। পাপা দিওফ। পরে ডেনমার্কের কাছ ০-২। ২০০৬ ছিল। নীল সাদা না পারলে তিনি। একা এক একটা ম্যাচ। টার্ন। ফ্রিকিক। ইউরোয় ওই শেষ দুমিনিটের দুটো ম্যাজিক। তারপর সেই ফাইনাল। লাল কার্ড। কেন রাগলেন? ঈশ্বরকে রাগতে আছে? এখন গ্রিজম্যান, পোগবা, ভারানে শুনে কিছু বোধ তৈরি হয় না সেভাবে। জিদানের আরেকটা কাপ হলে …। তবু, জিজুর জন্যই ওরা পাক। দৌড়ক। দৌড়। দল। নায়ক। না, কোনও প্লেয়ার না। কোচ। আরাগোনেস। লুই আরাগোনেস। ২০০৮। মার্কোস সেনা, পুওল, আন্দ্রেজ, জেভি, ফ্যাব্রেগাস, সিলভা, ভিয়া, ক্যাসিয়াস। টিম। দৌড়। স্বপ্ন। সেই মার্কোস সেনা। ২০১০-এ দেল বস্ক নিলেন না। কষ্ট। তবু, খেলা সেই এক। পরপর দুটো ম্যাচ ৪-১, ৪-০ করা জার্মানরা বল দেখতে পাচ্ছিল না। সেমিফাইনাল। ফাইনালে অপোনেন্টের ঘাতক ফুটবল। তারপর ফ্যাব্রেগাসের পাস, তিনকাঠির সামনে আন্দ্রেজ। আমার আন্দ্রেজ। নীল সাদার পর একমাত্র সলতে জ্বালিয়ে রাখা আমার স্পেন। রাউল, মরিয়েন্তেসের স্পেন না। ভিয়া, সিলভা, জাভি, আন্দ্রেজদের স্পেন। এবছর জানি না অত। ইস্কো, আসোন্সিওদের সামান্যই দেখেছি। শুধু জানি, আমার ফ্যাব্রেগাসকে রাখেননি কোচ। জাভি নেই। তবু দেখব, আন্দ্রেজ ইনিয়েস্তার জন্য। নীল সাদা না পারলে চাইছি অন্তত আরেকবার ইনিয়েস্তা …। লুই ফিগো। কপালের ভাঁজ মনে আছে। ড্রিবল, স্পিড আর ইচ্ছেশক্তি। স্কোলারির সঙ্গে মতে মিলছিল না, তবু বাদ দেবেন সাধ্যি কি? গোল করার পর সতীর্থদের আলিঙ্গনে একা গর্বিত নায়ক। তোদের কোচকে বলে দিস, আমার নাম লুই ফিগো। নাহ, লুই ফিগো পারেননি। ইউরোতেও না। ইউসেবিওকে পুরনো ক্লিপগুলোতে দেখেছি। শুনেছি উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে মিথ হয়ে যাওয়া সেই ০-৩ থেকে ফিরে এসে ৪-৩ করার স্বপ্নদিন। সি আর সেভেন। কে বড়? কোন রোনাল্ডো? এসবে নেই, ছিলাম না কোনওদিনই। ব্যালনডিওরের লড়াইয়ে এগিয়ে গেলে আঁতে লাগে। তবু, ওই স্পিড, ওই হার না মানা লড়াই, ওই উইশ ফুলফিলমেন্টের নায়ক, ওই ইউরোর ফাইনালে নিজে না থাকার কান্না এসবেরও এক নিজস্ব যন্ত্রণা আছে। যন্ত্রণা। নীল যন্ত্রণা। বাঁদিক থেকে ৪৬ মিনিটে ওই শট। বারপোস্টে চুমু খেয়ে চলে যায়। পালাসিও একটা চিপ করলেই গোল। হিগুয়েন জাস্ট গোললাইনে রাখলেই …। হয় না, হল না। লিওনেল মেসি বুঝতে পারছেন উত্তরটা তাঁর কাছে নেই। আর আমরা… অত প্লুরালিটিতে যাচ্ছি না, আমি বা আমার মতো যারা জাত লুজার, তাঁদের ঈশ্বর সব পেয়েছির শিখরে পা রাখবেন তা কখনও হয় নাকি? আমাদের কান্নাটা ডেস্টিনি ঈশ্বর। হয় না, জাস্ট হল না কিছুই… এই বোধটা ডেস্টিনি। মেনে নিন। চেষ্টাটা থাকুক। আন্তোনেল্লার ঠোঁটের জন্য, থিয়েগো ম্যাটেও সিরো ছোট ছোট আঙুলগুলোর জন্য চেষ্টাটা থাকুক। পাশে দাঁড়ানো জর্জের ভরসা, রোজারিওর রাস্তা, লা মাসিয়া, গোটা পৃথিবী, সাদা নীল পৃথিবী, হলুদ সবুজ পৃথিবী যারা অন্তত আপনার জন্য হৃদয়কে দুভাগ করে বাঁচবে আগামী মাসটা তাদের সবার চেষ্টাটা থাকুক। থাকবে। বাকি অলৌকিক মিথকথা অনেক তো লিখলাম। কমন পড়ে যায় পেপারে। না থাকাগুলো, কান্নাগুলো কমন পড়ে যায়। বুফো, অ্যাজুরি, বাজ্জিওর কান্না — আমাদের সেই যৌথ বাড়িটার খসে পড়া পলেস্তারার মতো এক এক করে পড়তে থাকে। রিনোভেট হয় না। ওরা কাতানেচিও থেকে বেরিয়ে এসেছিল অনেকদিন। প্রাণবন্ত খেলছিল। পিরলো, পিরলো, পিরলো…। তাহলে কেন এই ক্ষতি? কেন আর সেভাবে কেউ উঠে এল না? কেন রেনাশ মিশেলের কমলা রঙের বাড়ির জানলা থেকে হঠাৎ করে একটা বিকেল নিভে গেল। কেন পালাসিও হিগুয়েন এবং ৪৬ মিনিটে ঈশ্বরের মাপজোকে ভুল হয়ে যায় ইঞ্চিখানেক? কেন কাপ এল না? কেন কাপ আসে না? কেন? কেন?

About Char Number Platform 601 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*