নেকলেস

খালিদা খানুম

 

আয়নার সামনে অনেকক্ষন দাঁড়িয়ে আছে রাহা। নেকলেসটা হাতে, হীরের নেকলেস, পিওর ডায়মন্ড। একবার পড়ল গলায়। আহা, কত দিনের শখ এই নেকলেসটা গলায় পরবে। বৌভাতের দিন শাশুড়ি পড়তে দিয়েছিল একবার, তার পর আর চোখে দেখেনি। নেকলেসটা শাশুড়ি পেয়েছে তার শাশুড়ির কাছে। বাড়ির নিয়ম অনুসারে নেকলেসটা যাবে বড় বৌ মম্পির কাছে। মম্পির আশি কিলোর পঞ্চান্ন বছরের শরীরে এই নেকলেস মানায় না। সুতরাং এই জিনিসটি তারই জন্য। ছাপা শাড়িতে এত ভালো নেকলেসটা মানানসই হচ্ছে না… আয়নাতে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছে রাহা। মেরুন জামদানিটা হলে ভালো হত।

 

‘অনেক বছর বয়স পেল তোমার শাশুড়ি, আর কেঁদো না মা, তুমি যা সেবা করেছ এই জগতে হয় না, আর কেঁদো না…’ মাটিতে লুটিয়ে পড়া রাহাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে প্রতিবেশী মেয়েরা।

‘মাগো, আমার মা কোথায় গেলে আমাকে ছেড়ে…’ হেঁচকি তুলে তুলে কাঁদে রাহা।

 

চারবেলা চার গণ্ডা ওষুধ চলছে, নব্বই কবে পার করেছে! এক বছর ধরে বিছানায়, তবু মরে না, গজ গজ করে রাহা। গত পরশু থেকে শ্বাসকষ্ট, বাড়িতেই অক্সিজেন চলছে।

ঘুমাচ্ছে বুড়ি, আয়া মাসি পাশের ঘরে, সব ব্যবস্থা রাহার করা। মাস্কটা খুলে দিল। কোমরের কাছ থেকে চাবিটা নিল, কড়া, লোহার সিন্দুকটা খুলতে বেশি সময় নিল না।

 

অতঃপর :

শ্রাদ্ধশান্তির পর পাঁচ ভাই বসল সম্পত্তি ভাগাভাগি করতে। জমি আগেই ভাগাভাগি হয়েছে। ভিটেমাটি আর সিন্দুকের জিনিস ভাগ হবে। সবই ভাগ হল শুধু নেকলেসটা পাওয়া গেল না। হীরের নেকলেস, পিওর ডায়মন্ড। অনেক বিবাদ, তর্ক হল, এ ওকে, ও তাকে চোর বলল। বড় বৌ মম্পি শোকে কাতর হয়ে পড়ল, শাশুড়ি মারা যাবার পর সেই নেকলেসটার দাবিদার, সে পা ছড়িয়ে কাঁদতে বসল। পুলিশে ডাইরী হলো,  পুলিশ সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করলো,তল্লাশি করলো কিন্তু নেকলেস পাওয়া গেল না। সবাই ধরেই নিল, ওটা আগেই কোনও কাজে লেগে গেছে।

 

ঘুমাতে যাবার আগে আরও একবার দরজার শেকলগুলো দেখে এল রাহা। সুমন ঘুমিয়ে গেছে, আলমারিটা খুলে একবার দেখল নেকলেসটা, হীরের দ্যুতিটা আরও বেড়েছে কি! কিন্তু আলমারিটা এইটার জন্য কি সেফ! যদি সুমন দেখে নেয়।

 

তোমার হয়েছে কী? সুমন বলল, তুমি রান্নাঘরেও তালা লাগিয়েছ?

চুপ করে বসে থাকে রাহা। সুমন না থাকলে বারবার দেখে নেকলেসটা। নতুন নতুন জায়গায় জিনিসটা রাখে। কোনও জায়গাই সুরক্ষিত মনে হয় না। দিনে অন্তত তিন বার বিভিন্ন জায়গায় রাখে রাহা। রাতে ঘুম হয় না। সুমন ঘুমিয়ে পড়লে চুপিসারে দেখে, ঠিক আছে তো জিনিসটা।

খুব সন্তর্পণে সদর দরজার চাবি খোলে। আলতো লাগিয়ে দৌড়ে এগিয়ে যায়। বেশ খানিকটা দৌড়ে পেছন ফিরে দেখে, কেউ আসছে কি! নাহ, কেউ নেই। ব্লাউজের মধ্যে আছে নেকলেসটা। রাহা দৌড়তে থাকে, যে করেই হোক নেকলেসটার জন্য সুরক্ষিত জায়গা খুঁজে বের করতে হবে।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 899 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*