হে নদী, দেখা পাই যদি

আনসারউদ্দিন

 

 

নদীকেন্দ্রিক সভ্যতা আমাদের। শুধু আমাদের কেন, পৃথিবীর যাবতীয় প্রাচীন সভ্যতাই নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। নদী ছাড়া জীবন হয় না। সৌভাগ্যবান তারাই, যারা নদীকূলের মানুষ। জীবনের বহমানতা নদীর মতোই। আবার এটাও ঠিক যে, নদীকূলের মানুষকে বিশেষ বিশেষ সময়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হয়। বান-বন্যার মতো বিপর্যয়ে তাদের ঘর সংসার ভেসে যায়। এতে করে নদীতীরবর্তী মানুষের দুর্ভোগের অন্ত থাকে না। বন্যা যে সব বছরে হয় তা তো নয়, কখনও কখনও হয়। আবার হয়ও না অনেক সময়। দুইপাড়ের মধ্যবর্তী অংশে নদীখাত। এটাই তার চলার রাস্তা। চলা মানেই জীবন। জীবন থাকলে যন্ত্রণা তো থাকবেই। এই যন্ত্রণার কারণেই নদী হয়তো কখনও কখনও অসম্ভব রকমের কুঁকড়ে যায়। তৈরি হয় নদীর বাঁক। কেউ কেউ ভাবে অভিমান। অভিমানে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে নদী।

নদী নিয়ে সাত কথা আর সাতশো পাঁচালি এখনই লিখে ফেলা যেতে পারে। কারণ নদীকে আমি চিনি। আমাদের গ্রামে কোনও নদী ছিল না। গ্রাম বলতে শালিগ্রাম। কৃষিপ্রধান রুখুশুখু এলাকা। এই গ্রামের অনেকখানি পুব দিয়ে বয়ে গেছে জলঙ্গি নদী। উত্তরদিকে সুখসাগর গ্রামের কানচোয়াল ঘেঁষে প্রবাহিত হতে হতে ওইরকমভাবে অসম্ভব যন্ত্রণায় কুঁকড়ে না গেলে জলঙ্গি নদীকে আমার গ্রাম শালিগ্রাম হাতের নাগালে পেয়ে যেত।

কেন যে জলঙ্গি নদী আমাদের গ্রাম থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল! এ নিয়ে কত কথা, কত কথকতা। শোনা যায় কোনও এক বর্ষায় জলঙ্গি নদী এদিকেই এগিয়ে আসছিল। তাই দেখে তামাম গ্রামের মানুষ আঁতকে উঠেছিল। বাড়ি বাড়ি মানুষ আর মেয়েমানুষের কান্নার রোল। অনেকেই প্রাণ বাঁচাতে গাছের মগডালে আশ্রয় নিয়েছিল। শেষমেশ গাঁয়ের মোড়ল মাতব্বরদের মজলিস বসল। তাতে সিদ্ধান্ত হল — দাও নদীর মুখে হুড়ি জ্বালিয়ে। এমন নির্দেশ কার্যকর করতে গাছের শুকনো ডাল লতাপাতা দিয়ে বানানো হল হুড়ি। তাতে অগ্নিসংযোগ করে জলঙ্গির দিকে ছুঁড়ে মারতেই জলঙ্গির তাবৎ জলরাশি অগ্নিশিখায় পরিণত হল। সেই অগ্নিশিখার স্পর্শে আকাশের জলভরা মেঘ শুকিয়ে গেল। সেবার আষাঢ়ের আকাশ থেকে এক ফোঁটাও বৃষ্টি ঝরেনি। পরের বছর যে বৃষ্টি ঝরেছিল তাতে জলঙ্গির আবার গতি সঞ্চার হল। আমাদের শালিগ্রাম থেকে তার অভিমুখের পরিবর্তন হয়ে হুদি পীতাম্বরপুরের দিকে ঘুরে গেল।

জলঙ্গিকে হাতের নাগালে পেয়েও না পাওয়ার জন্য পূর্বপুরুষের প্রতি রাগ হয় আমার। এই নদীর পাড় ধরে ছোটবেলায় হাঁটতে হাঁটতে মামার বাড়ি গেছি। দেখেছি কত বাঁক। প্রতিটি বাঁকের মুখে গড়ে উঠেছে নানান গ্রামগঞ্জ। তার একপাশে সোনালি শস্যখেত। পটল, তরমুজ, উচ্ছে-ঝিঙে নদীকূলবর্তী পলিময় উর্বর মাটিতে জন্মাত। তার নরম কচি ডগাগুলো হামা টানতে টানতে পাড় ডিঙিয়ে জলের দিকে নেমে আসত। আবার উচ্ছে ঝিঙে পটল প্রভৃতির পাশাপাশি গজিয়ে উঠত আখখেতের জঙ্গল। সেই জঙ্গলের মধ্যে থেকে কখনও সখনও দেখা যেত শেয়ালের চকচকে চোখ। এইসব শেয়ালেরা সন্ধে নামতে না নামতেই সমস্বরে ডেকে উঠত। অন্যান্য পশুর চেয়ে শেয়ালের কান্নাকে আমার ভীষণ সংবেদী মনে হয়। মনে হয় তাদের সর্বস্ব খোয়ানোর আর্তি কান্নার সুরে আকাশে বাতাসে ভাসিয়ে দিচ্ছে। জলঙ্গিপাড়ের শেয়ালের কান্না মানুষের অন্তরাত্মাকে প্রবলভাবে নাড়িয়ে দেয়। আবার পাশাপাশি অঘ্রান মাসের শীতের নরম বিকালে ওই আখবনের পাশাপাশি সর্ষেখেত দেখে অভিভূত হয়ে গেছি। ওই সময়ে সর্ষেখেতে ফুলের সমাহার। এত ফুলের বাহার যে তামাম সর্ষেখেতকে মনে হত বেহেস্তের বাগান। কিংবা মনে হত এক আশ্চর্য দাবানল। সর্ষেফুলের এই আশ্চর্য সৌন্দর্য জলঙ্গির স্বচ্ছ জলে প্রতিফলিত হত। দৃষ্টিনন্দন এই ফুলের সমারোহ কেবল নদীতীরবর্তী গ্রামবাংলাতেই দেখা সম্ভব। যে গ্রামের কোল কাঁখাল দিয়ে নদী বয়ে যায়নি সে গ্রাম তো রুখুশুখু। আমার জন্মভূমি শালিগ্রামও তাই। কথায় বলে —

শালিগাঁয়ের খালি পেট
ভুখা মানুষের মাথা হেঁট।

এই রুখুশুখু গ্রাম ছেড়ে শৈশবে মামার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছি। খিদেয় কোমর ভেঙে মাথা হেঁট হয়ে যাওয়া শালিগ্রাম আমার ভোখ মেটাতে পারেনি। যে কারণে মামার বাড়ি। মানুষ যেভাবে বনের মধ্যে বেড়ালের বাচ্চা ফেলে আসে, ঠিক তেমনি আমিও জলঙ্গি তীরবর্তী মামার বাড়িতে নিক্ষিপ্ত হয়েছিলাম। এখানে এসেই আমার জলঙ্গির প্রেমে পড়া। ডাঙালির ছেলে আমি তারিয়ে জলঙ্গির সৌন্দর্য উপভোগ করেছি। জলঙ্গির আকাশে ভাসমান মেঘের ছায়া স্বচ্ছ জলে প্রতিফলিত হতে দেখেছি। আকাশের চাঁদ সূর্য আর অমাবস্যার রাতে অজস্র তারকারাজিকে পারিজাত ফুলের মতো ফুটে উঠতে দেখেছি। কতদিন ঘুমভাঙা রাতে চুপিসারে একা একা জলঙ্গির জলের কিনারে বসে থেকেছি। নদীর হরেকরকম মাছ আর মৎস্যশিকারী পাখিদের গতিবিধি করায়ত্ত ছিল আমার। আর দেখেছি ভরা জলঙ্গির বুকে সাদা পালতোলা মহাজনি নৌকার মিছিল। মনে হত ঐসব পালতোলা নৌকাগুলো আকাশপথে ভাসতে ভাসতে উড়ে যাচ্ছে কোথাও।

আবার বর্ষাশেষে পুজোর গন্ধ মুছে যেতে না যেতেই ঐ নদীতেই হত নৌকা বাইচ। ছাব্বিশ বৈঠা, আঠারো বৈঠা, বারো বৈঠার নৌকাগুলো অনেক দূরান্ত থেকে পাল্লাদারি করতে ভিড় জমাত। একবার এসেছিল ছত্রিশ বৈঠার নৌকো। সেইসব নৌকার মাঝিমাল্লা আর বৈঠাধারীদের খানাপিনার জন্য নদীপাড়ে অস্থায়ী উনুন জ্বলে উঠত। তার ধোঁয়ার কুন্ডুলি নদীর আকাশে ভেসে বেড়াত। নৌকা বাইচের সঙ্গে সন্তরণ প্রতিযোগিতাও হত। সেসব দেখতে ভিন গ্রাম থেকে আত্মীয় স্বজনেরাও ভিড় জমাত। কত নারীপুরুষের ভিড় হত দুই পাড়ে তা বলবার নয়। কিশোরকিশোরী, যুবকযুবতী থেকে কচিকাঁচা — কত যে মানুষের আগমন হত। এই জলঙ্গিতে আমার সাঁতার শেখা। সারাদিন জলঙ্গিতে ভেসে বেড়াতে ক্লান্তি ছিল না। জলঙ্গির সাথে আমার আত্মা জড়িয়ে আছে। আমি জলঙ্গির ভাষা বুঝি। জলঙ্গিতে লালিত আমি।

এখন সেই নদী থেকে আবার ফিরে এসেছি শালিগ্রামের রুখুশুখু গাঁয়ে। জানি, জলঙ্গির এখন বড় দুঃসময়। নদীপাড়ের মাটি কে বা কারা কেটে নিয়ে বেআব্রু করে ফেলেছে। দিনে দিনে গতি হারাচ্ছে একদিনের এই প্রবল স্রোতস্বিনী। এখন আর নৌকা বাইচ বা সন্তরণ প্রতিযোগিতা হয় না। নদীর আকাশে পালতোলা নৌকা ওড়ে না। এসব কথা মনে হলেই নিশুতি রাতে ঘুম ভেঙে যায়। মনে হয় চুপিসারে জলঙ্গির কিনারে বসে ব্যথা আর বেদনার বিনিময় করি। আমার দু’ চোখের ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরে পড়া অশ্রুকণায় জলঙ্গি আবার প্রবল স্রোতস্বিনী হবে। তাতে মৃতপ্রায় নদী আমাতে ভাসে, আমি ভাসি নদীর কল্লোলে।

About Char Number Platform 470 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

  1. ছুঁয়ে গেল লিখা। যদিও জলঙ্গিনী, তবুও প্রাসঙ্গিকভাবে তিতাস। আমার নদী। ব্যক্তিগত অনুভবের জায়গা। মনে পড়লো তাকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*