তারান্তিনো — পাঁচ

প্রিয়ক মিত্র

 

গত সংখ্যার পর

“তোমায় কৈফিয়ৎ দিতেই হবে আদিনাথদা”, অঞ্জনের ঠান্ডা গলার স্বর গমগম করে উঠল মানিকতলার বাড়ির স্যাঁতস্যাঁতে ঘরের মধ্যে।

“এভাবে আমরা আদিনাথদার থেকে কৈফিয়ৎ তলব করতে পারি না”, তপন রাগে বিরক্তিতে অস্থির হয়ে বলে উঠল।

“আমাদের কমরেডের থেকে তো পারি”, রঞ্জন বসে ছিল মাথা নীচু করে, এবার একটা ক্রূর হাসি এবং সরু চাহনিসমেত মুখ তুলে তাকাল তপনের দিকে।

“তপন, তোর নিশ্চয় ভুলে যাওয়ার কথা নয় যে নেশা করা বা নেশাখোরদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার বিষয়ে আমাদের ওপর কড়া নিষেধোজ্ঞা ছিল। পার্টি সুভাষকে এক্সপেল করে ও হিপিপাড়ায় গিয়ে ড্রাগ নিত বলে। আর আদিনাথদা হিপিপাড়ায় রেগুলার যাতায়াত করেছে, রোহিতাশ্বর মতন একটা ওয়ার্থলেস এলিমেন্টকে সেখান থেকে তুলে এনে পার্টিতে ঢুকিয়েছে। আমাদের অপারেশনে একজন ইললিগাল চোলাইবিক্রেতাকে সামিল করেছে, আমরা…”

“ইললিগাল!” অঞ্জনের একটানা কথার মাঝেই হো হো করে হেসে উঠল আদিনাথ, “ল অ্যান্ড অর্ডারের ওপর এরকম অগাধ আস্থা নিয়ে সংগঠন করতে এসেছিলি তুই, রঞ্জন?”

“কথা ঘুরিও না আদিনাথদা, আমায় কথা শেষ করতে দাও। এরা লুম্পেন এলিমেন্ট। এদেরকে আমরা কোনওভাবেই স্পেয়ার করতে পারি না। তুমি কী করে…”

“ননসেন্স!” রোহিতাশ্ব চিৎকার করে উঠল।

অঞ্জন এবার খানিক ব্যঙ্গসূচক শব্দসমেত হেসে উঠল। “এই তো! ম্যান ফ্রাইডে! তোমার তো ননসেন্স মনে হবেই বাওয়া!”

রোহিতাশ্ব কিছু বলতে যাচ্ছিল আরও। আদিনাথ ওকে থামাল।

“হুম, আমি সকলেরই সমস্ত অ্যালিগেশনস শুনতে রাজি। কিন্তু আগে আমার কিছু প্র্যাকটিকাল কথা বলার আছে। সবাই নিশ্চয় সিচুয়েশনটার গুরুত্ব বুঝছে। সত্যেনকে অ্যারেস্ট করা হয়েছে। সত্যেন শত টর্চারেও হয়তো মুখ খুলল না, কিন্তু…”

“কী গ্যারান্টি আছে?” অঞ্জন প্রশ্ন করল।

তপন সামান্য ইতস্তত করে বলল, “আমারও কিন্তু এটা মনে হচ্ছে আদিনাথদা। সত্যেন কে? তাকে আমরা চিনিও না। সে আমাদের পার্টির মেম্বারও নয়। কী করে তার ওপর বিশ্বাস রাখা যায়?”

“রাখা যায়। সত্যেন রিলায়েবল না হলে ওকে আমাদের অপারেশনে ইনভলভ করাতাম না। সত্যেনকে আমি বহুকাল ধরে চিনি।”

“আমাদের আরও প্রশ্ন আছে”, রুক্ষস্বরে বলে উঠল রঞ্জন, “কীসের বিনিময়ে কাজ করছে সত্যেন? টাকা? এত টাকা আসছে কোত্থেকে? আমাদের মানিটারি সোর্স কী?”

এতক্ষণ আদিনাথ স্বাভাবিক ছিল। ঠান্ডা মাথায় সবার কথা শুনছিল। রঞ্জনের শেষ কথাটা আদিনাথকে খানিক থমকে দিল। আদিনাথের চোখের কোণে যেন একটা রক্তাভ আভা দেখা দিয়েই মিলিয়ে গেল। এই প্রশ্নটা যে একদিন না একদিন তার কাছে আসতে পারে, তা জানত আদিনাথ। কিছু মিথ্যে কথা প্রস্তুত ছিল এর উত্তর হিসেবে। সেসব আগেই বলে দেওয়া হয়ে গেছে। যেমন পৈতৃক সম্পত্তির যে ভাগ আদিনাথের কপালে জোটে তা আদিনাথ ব্যয় করছে এক্ষেত্রে, আদিনাথ গবেষণা, অধ্যাপনা ইত্যাদি সূত্রে যাবতীয় যা যা অর্থ সঞ্চয় করেছে তার থেকে এই গোপন গেরিলাযুদ্ধের অর্থের জোগান দিচ্ছে সে ইত্যাদি নানান মিথ্যে দিয়ে এই চারজনকে সে ভুলিয়ে রেখেছে‌। সেসব মিথ্যে কথার পুনরাবৃত্তি করা ছাড়া আদিনাথের সামনে অন্য কোনও উপায় নেই।

এহেন অবস্থায় আদিনাথের রক্ষাকর্তা হল তপন। কিন্তু তপন যে প্রসঙ্গটার অবতারণা করল, তাতে ঘটনা অন্যদিকে মোড় নিল।

“তার চেয়েও জরুরি যেটা জানা”, তপন সামনের দিকে এগিয়ে এসে টেবিলে দুহাত রেখে ঝুঁকল, “পুলিশকে খবরটা দিল কে!”

এত অবধি বলেই ঠিক পাশে বসা রোহিতাশ্বর দিকে তার আগুনচোখ ফেরাল তপন।

রোহিতাশ্ব তার চোখ সোজাসুজি রাখল তপনের চোখে।

“যা ইন্ডিকেট করছ সেটার ফরে কোনও প্রুফ দিতে পারবে?”

“একদম ন্যাকা সেজো না চাঁদু। শেষ অপারেশনটায় আদিনাথদার সঙ্গে তুমিই ছিলে।”

“তপন তুই যা বলছিস তা বেসলেস! ও স্পাই হলে অপারেশনটা সাকসেসফুল হল কী করে? আমরা তো আরও আগেই ধরা পড়তাম।” আদিনাথ খানিক বিরক্ত বোধ করল এবার।

রোহিতাশ্ব বড় বাড়ির ছেলে। নীল রক্ত এখন আর তাকে খুব একটা নিয়ন্ত্রণ করে না ঠিকই, তবে তার অভিজাত আত্মাভিমান সে ফেলে আসতে পারেনি।

চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল রোহিতাশ্ব।

“না আদিনাথদা! লেট হিম টক! কী প্রমাণ আছে ওর কাছে সেটা ওকে বলতে হবে! এসব রাবিশ অভিযোগ ও তুলতে পারে না একজন কমরেডের এগেনস্টে।”

হো হো করে বিশ্রীভাবে হেসে উঠল তপন। “কমরেড!” বিকৃত স্বরে বলল তপন, “কে কার কমরেড!”

“তপন, তুই ফালতু ফালতু রোহিতাশ্বকে অ্যাকিউজ করছিস” মুখ খুলল অঞ্জন, “পুলিশের কাছে খবর অনেকভাবেই যেতে পারে। তবে আদিনাথদার কাছে এর উত্তর থাকলেও থাকতে পারে!”

“অর্থাৎ আমিই খোচর”, আদিনাথের ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি!

অঞ্জন এবং রঞ্জন এবার একটু থমকেছে। ওদের হাতে যে ব্রহ্মাস্ত্রটা রয়েছে সেটা এখনই নিক্ষেপ করবে?

দুজনের চোখচাওয়াচাওয়ি। ইতস্তত। ওরা নিজেরাও যে গোপনে নজরদারি চালিয়েছে সে কথা ফাঁস করা যাবে? তাতে পরিণতি কী হবে?

সাহস করে বলেই ফেলল অঞ্জন।

“আদিনাথদা, অপারেশনের সময় ছাড়াও সত্যেনের সঙ্গে তুমি গোপনে দেখা করেছ বহুবার। এবং এও জানি সত্যেন আমাদের কমরেড নয়, ওর কাছে নিশ্চয় এমন কোনও জিনিস রয়েছে যা তোমাদের ফ্যামিলির সঙ্গে জড়িয়ে… ও তোমার কাছে লায়াবল… অন্তত তোমার সঙ্গে ওর কথাবার্তা আমরা যেটুকু শুনেছি তাতে তাই বোঝা যায়। মানে গোপনে যতটুকু শুনেছি…”

যে ঘটনাটা এই ঘরে আদিনাথ নিজে ছাড়া বাকি চারজন কক্ষনও ঘটতে দেখেনি, সেটাই ঘটল এবার। আদিনাথ সুপ্ত আগ্নেয়গিরির মতন জ্বলে উঠল ধক করে।

একটা বদ্ধ ঘরের মধ্যে ক্রোধ, ঈর্ষা, সন্দেহ, হতাশার নানান দোলাচল চলছিল। উত্তর, প্রত্যুত্তর। এ বলল, তারপর ও বলল– একঘেয়ে ক্রিয়াপদের ব্যবহার হয়েই চলছিল। এতক্ষণে একটা সঠিক নাটকীয় মুহূর্ত তৈরি হয়েছে।

রোহিতাশ্ব এবং তপনও খানিক বিহ্বল। তবু অস্বস্তি ঢাকতে দুজনেই পরপর কথা বলে উঠল।

“মানেটা কী! তোরা স্পাইং করছিস!”

“আর তাছাড়া এর সঙ্গে আমাদের অপারেশনের কী সম্পর্ক! এটা তো আদিনাথদার ব্যক্তিগত…”

তপনকে মাঝপথে থেমে যেতে হল। রোহিতাশ্বরও সমস্ত তেজ নিভে গেছে। যা কোনওদিন ভাবা যায়নি সেটা ঘটতে দেখছে তারা!

আদিনাথের হাতে ওর কোমরে গোঁজা পিস্তল, যেটার ঠান্ডা নল তাক করা অঞ্জন ও রঞ্জনের দিকে।

অঞ্জন স্থির হয়ে গেল। রঞ্জন উত্তেজিত হয়ে উঠে দাঁড়াতে গিয়ে বাধা পেল অঞ্জনের থেকে।

“কমরেড!” অঞ্জনের চোখমুখে হিংস্র ঠান্ডা হাসি, “তাহলে ডিক্টেটরশিপ নিয়ে বড় বড় কথাগুলোর কী হল কমরেড?”

“বিশ্বাসঘাতকের শাস্তি মৃত্যু!” আদিনাথের ফ্যাঁসফ্যাঁসে গলা বেজে উঠল কোনও তার ছিঁড়ে যাওয়া সেতারের মতন, গম্ভীর অথচ বিচ্যুত!

“তাই না কি কমরেড! তাহলে নিজের মাথায় বন্দুকটা ঠেকাও!”

“কী বিশ্বাসঘাতকতা করেছি আমি?” গলা কেঁপে যাচ্ছে আদিনাথের। তার চোখ খুনে, হিমশীতল, এবং স্থির! সে শুধু ভেবে চলেছে ক্ষমতার উৎস শব্দবন্ধটাকে নিয়ে। তার হাতে ধরা বন্দুকটার নল কোন ক্ষমতার উৎস? কার দিকে সে তাক করে রয়েছে ক্ষমতাকে? রাষ্ট্র? রাষ্ট্রদ্রোহী? গুপ্তচর? কমরেড? সে কে? তার ক্ষমতা কার প্রতিনিধিত্ব করছে? রাষ্ট্র না রাষ্ট্রদ্রোহ?

“তুমি আমাদের জানাওনি সত্যেন কে? তার সঙ্গে তোমার কী অ্যাসোসিয়েশন!” অঞ্জন ঠান্ডা এবং পরিমিত।

“তোরা স্পাইং করেছিস, নজর রেখেছিস আমার ওপর! কী উদ্দেশ্যে?” আদিনাথের গলা ধরা‌।

“ন্যাকামি কোরো না আদিনাথদা! তুমি খুব ভালো করেই জানো তুমি আমাদের সন্দেহের ঊর্ধ্বে নও। তোমার হোয়্যারাবাউটস নিয়ে পার্টির ভেতরেও প্রশ্ন উঠেছিল। তুমি বহুকাল পার্টিকে না জানিয়ে আন্ডারগ্রাউন্ডে থেকেছ। চিরকালই নিজেকে একটা মিস্টিরিয়াস ক্যারেক্টার হিসেবে রিপ্রেজেন্ট করে গেছ। আমাদের কজনের বাইরেও পার্টির কিছু লিডারের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ রয়েছে। তাদেরকে সত্যিটা জানানো প্রয়োজন!”

আদিনাথের মাথায় জ্বলা ধিকিধিকি আগুনের তীব্রতা বাড়ছে। ওর আঙুল ট্রিগারে শক্ত হচ্ছে। এত অবিশ্বাস, এত সন্দেহ নিয়ে তারা কোন সমাজ বদলানোর স্বপ্ন দেখবে?

অঞ্জন বলে চলেছে।

“যে মিশনে আমরা সামিল হয়েছি তার সঙ্গে পার্টিলাইনের কোনও যোগাযোগ নেই। তুমি রেনিগেড হয়ে কী করার চেষ্টা করছ একজ্যাক্টলি তা এখনও পরিষ্কার নয় আমাদের কাছে।”

“তোরা এত বড় ট্রেটর” মুখ খুলল রোহিতাশ্ব।

“ট্রেটর! কে ট্রেটর! পার্টি ছাড়া আমরা আর কারু কাছে দায়বদ্ধ নই।”

তপনের ভেতরে নানান সংশয়ের দোলাচল চলছে। তাও সে কোনওমতে বলল, “আদিনাথদা পার্টির এগেনস্টে যাচ্ছে এটা ভাবার কারণ কী! আমরা তো আমাদের মতন করে পার্টির অ্যাজেন্ডাই…”

কথা শেষ হল না তপনের। আদিনাথ পিস্তল নামিয়ে ধপ করে বসে পড়ল চেয়ারে।

অঞ্জন আর রঞ্জন একে অপরের মুখের দিকে চাইল।

আদিনাথ পিস্তলটা প্রথমে টেবিলের ওপরে রাখল। তারপর ধীরে ঠেলে দিল অঞ্জন আর রঞ্জনের দিকে।

“নে! শুট মি!”

এই মুহূর্তে টপ শটে এই ঘরটার দিকে তাকালে, পাখির চোখে দেখলে দেখা যাবে ঘরময় অটুট নিস্তব্ধতা। ঝুলন্ত ঘেরা বাল্বের ঘনহলুদ আলো, পাঁচটা দ্বিধান্বিত, হিংস্র, অস্থির মাথা। টেবিলের ওপর একটা কালো কোল্ট পিস্তল, যে পিস্তলের নলে বারুদের টাটকা গন্ধ পাওয়া গেলে আদিনাথের শরীর শিহরিত হয়। সেই পিস্তলের নল এখন নিজের দিকে তাক করতে চায় আদিনাথ।

কাকে সে আদেশ দিল কেউ জানে না। কিন্তু পিস্তলটা যখন অঞ্জন রঞ্জনের কাছাকাছি, টেবিলের ওপর দুটো অদৃশ্য পেনাল্টিবক্সের মধ্যে যখন অঞ্জন এবং রঞ্জনেরই বক্সে এসে হাজির হয়েছে বল, তখন…

অঞ্জন মুখ খুলল, “এটা কি নতুন কোনও তামাশা!”

আদিনাথ চোখ বুজল। “শুট মি!” আদিনাথের গলা বরফের মতন ঠান্ডা এবং ধীর।

অঞ্জন পিস্তলটা হাতে তুলে নিল।

চমকে উঠল রঞ্জন। এই ঘটনাটা তারও হিসেবের বাইরে ছিল।

এতক্ষণ তপন এবং রোহিতাশ্ব বিহ্বল হয়েছিল। এবার প্রায় দুজনে একসঙ্গে আর্তনাদ করে উঠল।

“অঞ্জন!” প্রবল বিস্ময় রোহিতাশ্বর গলায়!

“মাথা টাথা খারাপ হল না কি তোদের!” তপন প্রায় এগিয়ে যাচ্ছিল অঞ্জনের দিকে।

“দাঁড়া তপন!” আদিনাথ। বিধ্বস্ত চোখটা খুলে সে ঘরের সবাইকে দেখল। “আমাকে সন্দেহ করার পূর্ণ অধিকার তোদের আছে। যদি মনে হয় আমি ট্রেটর তাহলে গুলি কর!”

রোহিতাশ্বর কানে যেন এসব কথা ঢুকল না।

“কাকে গানপয়েন্টে রাখছিস তোরা? আদিনাথদাকে!” বিস্ময় ঝরে পড়ছে রোহিতাশ্বর গলায়!

“যদি আদিনাথদা আমাদের গানপয়েন্টে রাখতে পারে তাহলে আমরাও পারি।”

আদিনাথ নিজের কপালের মাঝে একটা অদৃশ্য বিন্দু কল্পনা করে রেখেছে চিরকাল। পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে যেখানে গুলিটা এসে লাগবে। সেই গুলিটা কে করবে, রাষ্ট্র না সহযোদ্ধা তা সে নিজে জানত না। তারই বন্দুক থেকে যে গুলিটা বেরোবে তাও কি সে জানত!

রোহিতাশ্ব খানিক থমকে গেছে আদিনাথকে দেখে। আদিনাথ, যে প্রতিটি পদক্ষেপে অঙ্ক কষে চলে, যার আবেগ বলে কোনও কিছু আজ পর্যন্ত চোখে পড়েনি রোহিতাশ্বর, আজ আচমকা সে এই আশ্চর্য উদাসীন এবং ধ্বস্ত হাবভাব দেখাচ্ছে কেন? সত্যেনের সঙ্গে তার কী এমন গোপনীয় যোগাযোগ থাকতে পারে যা তাকে গোপন রাখতে হবে?

আর একটা অস্বস্তি হয়েই চলেছে রোহিতাশ্বর। একটা অদ্ভুত হিসহিসে শব্দ সে কখন থেকে যেন পেয়ে চলেছে একটানা! বাকিরা অমনোযোগী বলে খেয়াল করছে না? না কি তার একার কানেই আসছে এই শব্দ?

“আমরা জানতে চাই আদিনাথদার থেকে, সত্যেন আমাদের এই অপারেশনে হেল্প করছে কেন? হু ইজ সত্যেন? তার সঙ্গে তোমার যোগাযোগ কী?” অঞ্জন যেন রোহিতাশ্বর ভাবনা থেকে লুফে নিল প্রশ্নটা। তার হাতে আলগাভাবে ধরা আদিনাথের পিস্তল। আদিনাথের দিকে সোজাসুজি নল তাক করার ক্ষমতা তারও নেই। তার হাত কাঁপছে ঈষৎ। স্থাণু হয়ে গেছে রঞ্জন। আদিনাথের এই হঠাৎ থমথমে হয়ে যাওয়াতে যেন আরও বেশি করে ঝড়ের পূর্বাভাস পাচ্ছে সে।

আদিনাথ দাঁত দিয়ে ঠোঁট চাপল। তার শোনা গল্প সবটাই। একশো বছরেরও বেশি পুরনো ইতিহাস।

বংশমর্যাদা শব্দটাই তার কাছে অবাঞ্ছিত। নিজের পরিবারের ইতিহাসচেতনাকে সে ‘ফিউডাল’ বলে উল্লেখ করেছে কথায় কথায়। কিন্তু তার বংশলতিকার মধ্যে একটা বড় বিচ্যুতি আছে একথা সে জানতেই পারত না তার ছোটঠাকুরদা না থাকলে। এত অদ্ভুত কোনও ঘটনা সে তার ইহজন্মে শোনেনি। আর আদিনাথের ছোটঠাকুরদাও ছিলেন একজন বিচিত্র মানুষ। ছোটঠাকুরদার কাছেই তার যাবতীয় চেতনার হাতেখড়ি‌। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের ম্যাগাজিন, নানান দেশের স্ট্যাম্প, ডাকটিকিট, কয়েন এরকম নানান কিছু জমাতে ভালবাসতেন আদিনাথের ছোটঠাকুরদা। পড়াশোনা করতেন জাদু, ব্ল্যাকম্যাজিক আর জন্তুজানোয়ার নিয়ে। ব্রিটিশদের যারপরনাই শ্রদ্ধা করতেন। রোজ রাতে জিন খেতেন। গরু শুয়োর কিচ্ছু বাদ যেত না খাদ্যতালিকা থেকে। বাড়ির স্টাডিতে অজস্র বই আর পত্রপত্রিকার মাঝে খালি গায়ে একটা ধুতি পরে বসে বসে গড়গড়ায় তামাক টানতেন আর বই পড়তেন। অদ্ভুত বহুমাত্রিক একজন লোক। শিকার করতে ভালবাসতেন যৌবনে। উত্তর ভারতের কোনও এক জঙ্গলে একবার মাচায় বসে থাকাকালীন ঘাড়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল একটা কালো চিতাবাঘ। অল্পের জন্য প্রাণে বাঁচলেন। তারপর ভাবলেন শিকার মহাপাতকের কাজ, তাই রাধামাধব এই শাস্তি দিয়েছেন। সাহেবি চালচলনে অভ্যস্ত হয়েও রাধামাধবে ষোলোআনা বিশ্বাস ছিল ভদ্রলোকের। একটা গ্রামোফোন ছিল। সেখানে নানান রেকর্ডে অপেরা বাজত। রোজগারপাতি বলতে ছিল বিদেশের ম্যাগাজিনে নানাবিধ লেখাপত্তর লিখে উপার্জন। বংশের ব্ল্যাক শিপ বলত কেউ কেউ‌। কেউ যমের মতন ভয় পেত, আর আদিনাথের মতন কেউ কেউ ছিল ন্যাওটা। সত্যেনের বাবা লোচনকেও দিনরাত ছোটঠাকুরদার কাছে পড়ে থাকতে দেখেছে আদিনাথ। একদিন দুপুরবেলা ছোটঠাকুরদা আদিনাথকে শুনিয়েছিল লোচনদের পূর্বপুরুষ লোকেশ আর হ্যারিসন সাহেবের গল্প। ছোটঠাকুরদা যেদিন মারা গেল। সেদিনটাও মনে আছে আদিনাথের। সেদিনই আদিনাথের হাতে ছোটঠাকুরদা তুলে দিয়েছিল জিনিসটা… ছোটঠাকুরদাকে দেওয়া কথা রেখে সে কাউকে কক্ষনও জানায়নি কিচ্ছু, এমনকি সত্যেনও জানে না ওই বস্তুটার পেছনের ইতিহাস।

আবার আগামী সংখ্যায়

About Char Number Platform 470 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*