নির্ধারিত দেড় মাস

পীযূষ ভট্টাচার্য

 

আগামীকাল থেকেই শুরু হতে চলেছে সেই নির্দিষ্ট পনেরো দিন। সেজন্যই অফিস থেকে ছুটি নেওয়া এবং তা স্যাংশান করবার সময় জানিয়ে দেওয়া হয় এ ছুটি কিন্তু উইদাউট পে, এর জন্য অবশ্য ইনক্রিমেন্টও পিছবে। আবার নিজের অসুস্থতা দেখিয়ে ছুটি নিলে সবকিছুই অন্যরকম। শুধু একজন ডাক্তারকে বলতে হবে আমি অসুস্থ, অসুখের একটা নাম এবং পনেরো দিনের বিশ্রামের পরামর্শ। ব্যাপারটা এত সহজ যে তা না করতে পারার কোনও কারণই খুঁজে না পেয়ে সকলেই হতাশ কেন না অনেকেই বিয়ে থেকে শুরু করে হনিমুন পর্যন্ত করে থাকে এই পদ্ধতিতে।

এসব জানা সত্ত্বেও আগামী পনেরো দিন ছুটি নিই এবং এর মধ্যে কোনওরকম মিথ্যের আশ্রয় থাকুক তা না চাওয়ার কারণই হচ্ছে সুতপার সঙ্গে থাকতে চাই এমন এক পরিবেশ পরিস্থিতিতে যেখানে কোনও প্রকারের জীবন যাপনের ক্লেদ না থাকে। অবশ্য যে ছুটিগুলি অর্জন করেছিলাম তা বেশিরভাগই নিঃশেষ হয়েছে সুতপার অসুখে। এসব জানা সত্ত্বেও ছুটির শূন্য ভাঁড়ার বাজিয়ে একবার দেখে সেখানে যে শব্দ উঠে আসছে তা কোনওরকম লয়ে না পড়ে একেবারে সমে এসে স্থির। যেন কেউ শব্দভেদী বাণ ছুঁড়ে নিঃশব্দ করে দিয়েছে। সবার অলক্ষ্যে।

অথচ সেদিনই ঘটে গেল জীবনের আশ্চর্য ঘটনাটি। ভিড় বাসে উঠতেই সামনে বসে থাকা একজন উঠে দাঁড়ালে বসার জায়গা পেয়ে যাই তাও আবার জানালার ধারে। বাসকে কোনও ক্রসিং-এ লাল বাতির খপ্পরে পড়তে হয়নি বলেই সোজা বাড়ি পৌঁছে গিয়েছি তাড়াতাড়ি। অবশ্য নির্দিষ্ট স্টপেজে লোক নামা-ওঠার হিসেব এখানে নেই। নার্স ড্রেস পরা অবস্থায় ফ্ল্যাটের দরজা খুলে দিল, অন্যদিনও সেই খোলে কিন্তু বাড়ি ফিরে যাওয়ার ড্রেসে। সকাল আটটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত ডিউটি, আমি ঢোকামাত্রই সে চলে যায়। যদি কিছু জরুরি কথা থাকে তবেই বলে, গতানুগতিক হলে যাওয়ার সময় কোনও কথাই হয় না। রাতের জন্য কোনও নার্স রাখা হয়নি। যে সেবা সংস্থা থেকে নার্স পাঠানো হয়েছে তারা অবশ্য বারবার বলেছিল রাতের জন্যও রাখতে, আমার পক্ষে এই রোগীর দেখভাল করা সম্ভব নয়। ওদের কথা যে ঠিক সে কথা মেনে নিয়ে জানিয়েছিলাম ‘নিজের উপরই বিশ্বাস নেই যে!’

কথার উত্তর তারা দেয়নি, কিন্তু নির্বাক হয়ে হয়তো ভাবছিল সামনে যে বসে আছে সে রাত আটটা পর্যন্ত নিজের উপর আস্থা রাখতে পারছে বলেই দায়িত্ব নিচ্ছে কিন্তু তার পরের রাত্রির দায়িত্ব নিচ্ছে না। রাত্রি যত গভীর হয় ততই যেন অন্ধকার পূঞ্জীভূত হয়ে মনে করিয়ে দেয় আদিতে সর্বদিকে সর্বক্ষণ বিরাজমান ছিল ঘন অন্ধকার। এর পরেই এক ঘন আকারের অন্ধকার জমে থেকে ছড়িয়ে যায়। এ-প্রসঙ্গ দ্বিতীয়বারের জন্য ফিরে আসেনি কেন না অন্ধকারের ভিতর যে পাশবিক শর্ত থাকে তা মানতে উভয়পক্ষই যেন বাধ্য।

এখন যেন সেই পৌরাণিক মুহূর্ত। দিনের শেষও নয়, আবার রাতের শুরুও নয়। সূর্যাস্তের সময় বোধহয় পঞ্জিকামতে ছ’টা তেইশ মিনিটে। এরপর এক মিনিট করে কমতে শুরু করবে। ছ’টা বাইশে থমকে থাকবে টানা দশদিন, একটানা এক মিনিট করে কমলে দিনের অস্তিত্ব নিয়ে টান পড়ে যাবে যে! এর পর ছ’টা একুশ হবে এভাবে পৌঁছে যাবে শেষ সীমায় চারটে তেপ্পান্নতে। আজ বোধহয় ছ’টা তেইশেই সূর্যাস্ত হয়েছে, কেননা ব্যালকনিতে এখনও রঙের ছটা। রং বদলের খেলা চলেছে বনসাই বটগাছে। ব্যালকনিতে ওই একটামাত্র গাছই বেঁচে আছে অযত্নের মধ্যে। ছায়াবিস্তারের কোনও দায়িত্ব নেই বলেই কি এভাবে বেঁচে থাকে অনেকদিন?

সুতপা এসবকিছু দেখছে কি না বোঝা যাচ্ছে না, যদিও তার মুখ ওদিকেই ঘোরানো, পাশ ফিরিয়ে দেওয়ার ফলে। নার্স একভাবে বেশিক্ষণ রাখে না বেডসোর হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনায়। রাতে যে এসব আমার পক্ষে করা সম্ভব নয়, তা সে জানে বলেই ডিউটির বারোঘণ্টায় বার বার এপাশ-ওপাশ করে দেয়। সুতপার এখনকার হালকা দেহকে পাশ ফেরাতে অসুবিধে হওয়ার কথা নয় তবুও নার্স দেহটিকে নিজের সর্বশক্তি দিয়ে এ কাজটি কেন করে তার কোনও সঠিক যুক্তি খুঁজে পাইনি। অবশ্য এ সময় ঘরে থাকি না। দূর থেকে লক্ষ করি– যত দিন যাচ্ছে দিনে দিনে হালকা হয়ে যাচ্ছে সুতপার দেহ। ডাক্তারের কথামতো ওর তো ক্রমশ শুকিয়ে যাওয়ার কথা তা তো হচ্ছেই। জিজ্ঞেস করেছিলাম ‘তার পর’। লীন হয়ে যাবে একদিন। ডাক্তার অবশ্য সে কথা বলেননি।

ডাক্তারের অভিজ্ঞতায় একটা সময়সীমা ছিল, দেড় মাস। ‘বড়জোর দেড় মাস’ কথাটা উচ্চারণের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছিলেন ‘বাড়ি নিয়ে যান।’ এই দেড়টা মাস ওরা রাখতে না চাওয়ার মধ্যে যে যুক্তি– এই পেশেন্ট চলে গেলে এখানে যে আসবে তাকে হয়তো এ কথা বলতে হবে না। যে অঙ্কের সমাধান পঁয়তাল্লিশ দিন। সেখানে এক্সের ভ্যালু কত ধরা হয়েছে জানা নেই। এভাবে কখন যে সুতপাকে এক্সের প্রতিতুলনায় নিয়ে গিয়েছি বুঝতেই পারিনি। এখানে কি আছে আমাদের বিবাহিত জীবন কত বছরের তার সংখ্যা অথবা আমাদের ভালোবাসার বয়স কত তার সংখ্যা? এসবের কি এই অঙ্কের জন্য ভীষণ প্রয়োজন? আমার তো মনে হয় অঙ্ক কষে বের করা উচিত টিউমারের গুচ্ছমূল কতখানি এলাকা দখল নিতে পেরেছে সুতপার মস্তিষ্কে। তার একটা বর্গক্ষেত্র পাওয়া গেলে এই দখলদারির চরিত্র বোঝা যেত।

মস্তিষ্কের জলের উপর টিউমার ভাসমান হলে একরকম কথা, ডাক্তার চেষ্টা করে দেখতেন ভাসমান বস্তুকে তুলে আনবার। তা হত মস্তিষ্কের শূন্যতায় যার জন্ম তাকে সেখান থেকে উৎখাত করে দিতে পারলেই খানিকটা নিরাপদ। আর যদি স্থির বিরাজমান হয় তবে ধরে নিতে হবে অসম্ভব এক উৎখাতের কথা ভাবা হচ্ছে। যতক্ষণ পর্যন্ত মস্তিষ্ক জীবিত ততক্ষণ তা করা যায় না বলেই এই অঙ্কের অবতারণা। এভাবেই তৈরি হয়ে যায় অদ্ভুত এ অঙ্কের শর্তাবলি, যা দেড়মাস।

ডাক্তার কথা শেষ করেছিলেন ‘স্কাল যখন ঠিকঠাক সেট হয়ে গেছে, কোনও ইনফেকশন নেই, পেশেন্টকে বাড়ি নিয়ে যান। প্রতিদিন নিয়ম করে মাথাটা মুণ্ডন করবেন।’ এই পদ্ধতিতে পেশেন্টের মনে হবে মাথার যন্ত্রণার হাত থেকে রেহাই পাওয়ার একটিমাত্র পথ। কেন না ওর তো মাথাভরতি চুল ছিল, অপারেশনের সময় সেই চুল কামিয়ে ফেলা হয়েছে। জ্ঞান ফিরে দেখেছে মাথায় ব্যান্ডেজ, এরপর একসময় তা খুলে ফেলা হলে মুণ্ডন করা মাথা দেখে চুলের কথা মনে পড়বেই, তারপর ক্রমাগত মুণ্ডন করা মাথা দেখতে দেখতে ধরে নেবে মাথার চুলগুলো আর ফিরে আসবে না, এই মেনে নেওয়ার মধ্যে একদিন আর বুঝে ওঠা সম্ভব হবে না কতখানি যন্ত্রণা।

এমনকি, মৃত্যু যখন ঠিক মুহূর্তে এসে উপস্থিত হবে তা ঠিকমতো বুঝে ওঠা সম্ভব হবে না– এ কথা অবশ্য ডাক্তার মুখে উচ্চারণ করেননি তা সত্ত্বেও কথার মধ্যেই আছে তা। এসব কথাবার্তার মধ্যে হঠাৎই বলে বসি– একটা ডেথ সার্টিফিকেটের ভীষণ প্রয়োজন হবে তারপর।

–লোকালি ম্যানেজ হবে না?

–শুরু থেকে তো আপনি দেখছেন! যেন যে দায়িত্বটা যিনি নিয়েছিলেন তিনিই তার শেষ পরিণতির কথা ঘোষণা করেন এরকমই কিছু একটা বলতে চেয়েছিলাম। সুতপার শেষ ইচ্ছের কথাই বলা হচ্ছে যেন আমার মুখ দিয়ে। একটা মোবাইল নম্বর দিয়ে জানিয়ে দিলেন, ‘ব্যাপারটা ঘটে গেলে জানাবেন, সময় করে চলে যাব।’

ঘটনাটি ঘটে যাওয়ার পর সহজ বুদ্ধিতেই তা বোঝা যে সম্ভব এর জন্য বিশেষ মেডিক্যাল সায়েন্সের জ্ঞান দরকার নেই। সাধারণ বুদ্ধি থাকলেই চলবে তারপর আর কেবিন ছেড়ে না দেওয়ার কোনও কারণই থাকতে পারে না। অবশ্য এর জন্য সুতপার সঙ্গে কোনও কথাই বলিনি, কেননা রোগের শুরুই হয়েছিল কথা না বলা দিয়ে। সকালে অফিস যাওয়ার ব্যস্ততার মধ্যে যে কথা হয়েছে তার মধ্যে কোনও অসঙ্গতি খুঁজেও পাওয়া যায়নি কিন্তু সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরেই সবকিছুই অন্যরকম হয়ে যায়। সাতটা কথা বললে একটি কথার উত্তর, যে কথা প্রথমে বলা হয়েছে তার। বাকি কথার উত্তর নেই। একসময় জানিয়ে দেয় কথা বলতে ইচ্ছেই করছে না তার। এ ক’বছরের মধ্যে সব কথা শেষ হয়ে যাবে হঠাৎ করে। শেষ হয়ে যাওয়ার মধ্যে কিছু তো কারণ থাকতেই হবে সেটা না জানা থাকায় ওকে ঝাঁঝিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম– কিছু না বললে বুঝব কেমন করে কী হয়েছে?

এ কথার উত্তর নেই কোনও। বিভ্রান্ত হয়ে সন্দীপকে মোবাইলে ধরি।

–এত রাতে ফোন করছিস, কী হয়েছে?

–সুতপা কথা বলছে না।

–কাল সকালে বলবে, শুয়ে পড়।

ঘড়িতে রাত পৌনে দুটো। সুতপাকে জোর করে শুইয়ে দিয়ে নিজেও শুয়ে পড়ি। ফ্যানের হাওয়ায় সুতপার খোলা চুল এসে পড়ছিল চোখেমুখে, এখানে কিন্তু ঘুমের ব্যাঘাতের কথা উঠছে না কেননা এই শুয়ে থাকার মধ্যে ঘুমের কোনও প্রশ্ন নেই। সুতপা ঘুমোচ্ছে ঘুমের ওষুধে। একসময় চেষ্টা করেও খাবার টেবিলে অবধি না নিতে পেরে ঘুমের ওষুধ দেবার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছি। খোলা চুলে ও কোনওদিনই শুতে আসে না। রাতের অন্ধকারে মেঘের গর্জন তোলবার জন্য ইচ্ছে করেই বিছানাতে এসেছে নামমাত্র। যা হাতে গোনা যায় এবং ব্যতিক্রম। এখন কিন্তু অন্যধারার ব্যতিক্রমী পরিবেশ তৈরি হতে চাচ্ছে। কিছুতেই বুঝে ওঠা সম্ভব হচ্ছে না হঠাৎ কেন সুতপার কথা বলতে ইচ্ছে না হওয়ার। সাধারণত যেমন হয় ভোরের দিকে চোখ লেগে আসে, তখন হয়তো আমার সমস্ত মুখ সুতপারই চুলে ঢেকেছিল। বুঝতেই পারিনি।

ঘুম ভাঙার পর দেখি সুতপা উঠে বসে আছে কিন্তু খাট থেকে নামতেই পারছে না। জেগে গেছি বুঝতে পেরে দিনের প্রথম কথাটি বলে ওঠে ‘নামতেই পারছি না।’ সুতপাকে বাথরুমে পৌঁছে দিলে পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা আমার উপস্থিতিকে ভ্রূক্ষেপের মধ্যে না এনে সে তার কাজ সেরে উঠে দাঁড়ালে দাঁত মাজিয়ে চেয়ারে বসিয়ে দিলে নির্বাক চাউনি চালিয়ে আমার গেরস্থালি কাজকর্ম দেখে যায়। চা বানাতে বানাতে সন্দীপকে আবার মোবাইলে ধরি। এবারে সে সব কথা শোনে ধৈর্যের সঙ্গে, তারপর বলে ‘দশ মিনিট পর তোর সঙ্গে কথা বলছি।’ এই দশ মিনিটের মধ্যে সে তার কাজের যা লিস্ট তা থেকে সময় বের করতে পারবে কি না, পারলে কোন সময়? এসব ভাবনার মধ্যে আবার সন্দীপের কল।

–তুই সোজা নার্সিং হোমে চলে আয়, দশটা নাগাদ।’

তবে, এই দশ মিনিট, নার্সিংহোমে যোগাযোগ, হয়তো ওর ডাক্তার দাদাও আছেন। তা হলে রোগ কী কোনও চোরাকুঠুরিতে বন্দি? সেখানে প্রবেশ করতে হলে প্রখর রৌদ্রের ভিতর সুপক্ব গমখেতের পেন্টিং, সেখানে একদিক দিয়েই বাতাস বয়ে যাওয়ার স্থির ইঙ্গিত ধরা, সেই ছবি যতক্ষণ পর্যন্ত সরিয়ে নেওয়া না হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত রোগের কাছে পৌঁছনোর সব রাস্তাই বন্ধ।

সুতপার কেমন যেন মাসতুতো ভাই সন্দীপ কিন্তু আমার বন্ধু। সে বাড়ি থেকে রওনা হচ্ছে সে কথা জানিয়ে দিল। সুতপাকে শাড়ি পরানো আমার পক্ষে অসম্ভব, সালোয়ারটাও ঠিকমতো পরে উঠতে পারছে না, একটি পা’র ভিতর দুটি পা ঢুকিয়ে দিচ্ছে বারবার। শেষপর্যন্ত একটি পা’কে সালোয়ারের বাইরে রেখে যখন নিশ্চিন্ত হই দ্বিতীয় পা’টি সেখানে ঢোকানো সম্ভব নয় তখন দ্বিতীয় পা-এর নির্দিষ্ট স্থানে ঢুকিয়ে কামিজের হাত দুটো কোনওমতে ঢুকিয়ে মাথা দিয়ে গলিয়ে দিয়ে চুলে হাত দিতেই ‘না’ বলে ওঠে। প্রায় টলতে টলতে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেই গুছিয়ে নেয় চুল। কোথায় যাচ্ছি সে সম্পর্কে কোনও প্রশ্ন না রেখেই নিবিষ্ট মনে দরজা লক করা দেখে। লিফট যত নিচে নামছে ততই যেন অতলে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তিরতির করে কেঁপে উঠছে। আতঙ্কের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে কোনও আওয়াজ বেরিয়ে আসছে না মুখ দিয়ে। সবসময় যেন মনে হচ্ছিল তার পায়ের তলার মাটি সরে যাচ্ছে সেজন্যই আঁকড়ে ধরে রেখেছিল আমাকে।

সন্দীপ নার্সিংহোমেই দাঁড়িয়েছিল, সুতপাকে ধরে নিয়ে সোজা তার ডাক্তার দাদার চেম্বারের সামনে বসিয়ে দেয়। ডাক্তারের নাম নেমপ্লেট থেকে দেখে নিয়ে ছুটলাম ফর্মালিটি সারতে। ফিরে এসে দেখি ডাক্তারের দেখা সারা, কেবল আমার অপেক্ষায় বসে আছে সবাই। কাগজটা হাত থেকে নিয়ে ডাক্তার জিজ্ঞেস করেন, কবে থেকে শুরু?

গতকাল।

এবারে সন্দীপের দিকে চেয়ার ঘুরিয়ে বলেন, ‘তুই ওকে স্ক্যান ডিপার্টমেন্টে নিয়ে যা, রিপোর্ট লাগবে না, শুধু প্লেটটা নিবি। আমি এখানে থাকতে থাকতে একবার দেখে নিই। ওদের বলে দিচ্ছি।’

স্ক্যানের টাকা জমা দেবার জন্য আবার ছুটলাম।

স্ক্যানের প্লেট হাতে নিয়েই গম্ভীর। যা ভেবেছিলাম তাই। ওপেন করতেই হবে যা অল্প বয়স।

তারপর?

ঠেকিয়ে রাখা যাবে।

কিন্তু টিউমারের শিকড় সূক্ষ্ম স্নায়ুকে ঢেকে এমন এক বিস্ময়কর বিমূর্ত করে তুলেছে সুতপার মস্তিষ্ক তাই কিছু না করে যথাস্থানে সহাবস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

পনেরো দিনের ন’দিনের দিন নার্স ডিউটি শেষ করে চলে যাওয়ার সময় ‘ডাক্তারকে খবর দিন’ বলে আর দাঁড়ায়নি। ডাক্তারের বিশেষ নম্বরে ফোন করে বলি ‘ঘটে গেছে’। তিনি কীভাবে পৌঁছোবেন তা জেনে নেন। বাড়ি ফেরার পথে এসে সুতপাকে দেখে বলেন– ‘এখনও সব শেষ হয়নি।’ সকালে আসবেন। কিন্তু সকালে তিনি আসেননি। সন্দীপের হাতে তার নিজের অঙ্ক যে ঠিক ছিল তা লিখিতভাবে জানিয়ে দিয়েছেন।

তখনই মনে পড়ে গেল গতরাতে ‘এখনও সব শেষ হয়নি’ কথাটা শোনার পর খুঁজে গেছি সুতপা যদি থেকে থাকে, তা কোথায়? যেমন এম.আর.আই. করে ডাক্তার খুঁজতে চেয়েছিলেন সুতপার শরীরের মধ্যে কোনখানে লুকিয়ে আছে এর বীজ। খুঁজে পাননি। গতরাতে আমিও খুঁজে পাইনি চেনা শরীরের ভিতর কোথায় এখনও সুতপা।  

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 899 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*