স্বগতোক্তিপ্রায়

সৈয়দ কওসর জামাল

 

১৯

অন্ধকার স্থায়ী হয় যত, চোখের সহনশীলতা তত বেড়ে যায়
অকস্মাৎ যদি তীব্র আলো ঢুকে পড়ে, ঝনঝন শব্দে ভেঙে যায় কাচ
এক একটি রশ্মি তীক্ষ্ণ সূচের মতো এসে বিদ্ধ করে চোখ
যে মুখ অন্ধ আয়নায় ক্রমশ কর্কশ, অপস্রিয়মান, তারো চোখে বিদ্যুৎ
কাচের মতো ঝুরঝুর খসে পড়ার আগে আমি অসহায় চেয়েছিলাম
লক্ষ করেনি কাচ, তার চোখে ছিল হিমালয় পর্বতমালার হিম
আমি তো সামান্য প্রাণী, ধ্বংসস্তূপ থেকে বেরিয়েই ঘৃণায় ডুবিয়েছি পা
তুমি সমুদ্র হয়ে এতদূর এগিয়ে এসে ভিজিয়ে দিচ্ছ গোড়ালি অব্দি
এমন আশ্বাস কখনো চাইনি বলে কি লেলিয়ে দেবে কাঁটাতার প্রহরীবেষ্টনী
আর মাথার ওপরে নক্ষত্রলোক থেকে ঝুলে থাকবে ত্রিলোকব্যাপী যূপকাষ্ট
তার আগেই রুদ্ধ শ্বাস, ভয়ে অসময়ে ঝরেছে পর্ণমোচী বৃক্ষের পাতা
গ্রীষ্মপ্রধান দেশে রেনফরেস্টের কথা বলাও বিলাসিতা গণ্য হবে
অথচ সবুজের কী প্রত্যক্ষ বর্ণনা জাঁকিয়ে বসেছে ধ্বংসস্তূপের ওপর
আর আমি কিছু রং বাঁচিয়ে লাগিয়ে দিচ্ছি বৃষ্টিহীন ম্যাড়মেড়ে দিনের গায়ে….

 

২০

ত্রিকালজোড়া সঞ্চিত যত অবিশ্বাস পাথরের ধর্ম মেনে স্থাণু হল
কেন অবিশ্বাস, এ প্রশ্ন করার আগে এসো পাথরকে গড়িয়ে দিই নীচে
যতো হাঁকডাক করি, লক্ষ করছি পাথরের আয়তন বেড়ে যায়
মুখে তীব্র ভ্রুকুটির চিহ্ন নিয়ে সেও আমাকে লক্ষ করতে থাকে
পাথরেরও চোখ আছে এই বিশ্বাস থেকে আমি আর সরাসরি দেখি না
এই বিবশ অথচ শত্রু শত্রু সম্পর্কের মধ্যে কোনো অঝোর বৃষ্টি নেই
আড়াল যা কিছু তা ওই প্রাচীন কাল থেকে ভেসে আসা এক গান
গানের ওপারে যে উপত্যকা চিত্রবৎ অথচ সপ্রাণ তাকে কবিতায় ডাকি
কবিতা মানে কিছু চতুর্দশপদী যার ভিতরে তির্যক চোখের ছায়া
পাঠক ভেবেছে বুঝি অন্ধ সমরাস্ত্র আজ কবিদের হাতেও গর্জায়
আমিও কি তাকে ভুল করে নক্ষত্রআকাশ থেকে ছুটে আসা টর্পেডো ভাবিনি
আজ যাকে বাদলহাওয়া বলে প্রশ্রয় দিই তারও উড়িয়ে নেওয়ার শক্তি
পাথরের গায়ে হাত রাখতেই অনুভব করি দ্রব হওয়ার বাসনা তার
সন্দিগ্ধ দৃষ্টি নেই মেঘলা আকাশ অনন্ত দুহাত মেলে মানুষের খুব কাছে….

 

২১

বড়োসড়ো ঝান্ডার ওপরে তুমি উড়িয়েছ শ্বেতপতাকা, আমার তাতে কী
আমি বাতাসের মধ্যে গোপনে ছড়িয়ে দিয়েছি পারমাণবিক ক্রোধ
দূর থেকে লক্ষ করছি তোমার প্রতিটি গতিবিধি কতো দিশাহীন, ভ্রষ্ট
তুমি যতই রোদের গায়ে লিখে রাখো দ্বন্দ্বদীর্ণ মানুষের প্রণয় কাহিনি
আমি দেখি কীভাবে প্রতিটি গাছের পাতা থেকে টেনে নিচ্ছো ক্লোরোফিল
আহা, জীবন এরকমই, কত ধরনের পথ মিশেছে এই ক্যালাইডোস্কোপে
তবু অন্ধের হস্তীদর্শন, শপথ করে বলি, এই হল কাঁটাতার, এগিয়ো না
ওদিকে সন্ধ্যার মুখে প্রজাপতি ওড়ে, সন্ধ্যারতির শব্দে অন্য দৃশ্য মানা
যতই ইষ্টদেবের উদ্দেশে দুহাত কপালে ওঠে, বিদ্যুৎ খেলে যায় কোষে
প্রদাহের বিষ বিবশ করে রাখে স্নায়ু মেধা স্মৃতি ও সমস্ত অক্ষরলিপি
যারা জানে জীবন সমীহজাগানো ধর্মগ্রন্থের মতো এবং তা স্মৃতিধার্য
তাদের কাছে ইতিহাস পুরাণ এক হয়ে আকাশে মেঘের মিনার গড়েছে
তুমি তার প্রবাহের চোরা স্রোত, সন্ধ্যাসংগীত হয়ে ঢুকেছো শত্রুর গুহায়
আকাশের সব পাখি সত্যিই কি ঘরে ফিরতে পারবে আজ…..

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 899 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

  1. দুর্দান্ত সব কবিতা। কি শক্তিশালি বুনন শব্দের, চিন্তার। বিস্ময় জাগে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*